September 28, 2015

পনেরোটি মিথ্যে . . .




উৎস গুগল ইমেজেস


. . . যা আমি নিজেকে অহরহ বলে থাকি।

১। কালকের দিনটা আজকের দিনের থেকে লম্বা হবে। আজকের দিনটা চব্বিশ ঘণ্টার ছিল, কালকের দিনটা অন্তত ছাব্বিশ ঘণ্টার হবে। কারণ আজ আমি যে কাজগুলো সময়ের অভাবে করে উঠতে পারিনি - রেওয়াজ, ব্যায়াম এবং পড়াশুনো - সেগুলো সব আমি কাল করব।

২।  প্রতি বছর শারদীয়া আনন্দমেলা আমাকে কিনতেই হবে, কারণ শারদীয়া আনন্দমেলার সঙ্গে আমার শৈশব কোনও না কোনও ভাবে জড়িয়ে আছে।

৩। আমি দিনের পর দিন ঠাকুমাকে ফোন না করলেও ঠাকুমা ঠিকই বুঝবেন যে আসলে আমি তাঁর কথা রোজ ভাবি। তাঁর চোখের সামনে যখন ছিলাম, তখনকার মতোই, কিংবা তার থেকেও বেশি ভালোবাসি।

৪। অর্চিষ্মান আমাকে যতখানি মাতৃমুখী এবং মাতৃনির্ভর মনে করে আমি আসলে অতখানিও নই।

৫।  আমার প্রতিশোধস্পৃহা নেই।

৬। আমি এখন আমার জীবনের অন্যতম সুখের সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। অতীতের পরাজয়ের স্মৃতি আমাকে আর অবিরত ধাওয়া করে না।

৭। পরের লং উইকএন্ডে আমি বাড়ি গোছাব। বিলোনোর জন্য যে জামাকাপড়গুলো গত একবছর ধরে গুছিয়ে রাখা আছে সেগুলো যথাস্থানে পৌঁছব।  

৮। এই শেষ। পরের বার হলে সিনেমা দেখতে এসে তিনশো টাকা দিয়ে তিন মুঠো পপকর্ন আমি আর কিনব না। এ জিনিস করা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে . . .

৯। এক প্যাকেট ক্রিম ক্র্যাকার রীতিমত বৈধ ডিনার। বিশেষ করে বাড়িতে একা থাকলে।

১০। পৃথিবীতে পড়ার জন্য এত বই আছে, আর সময় এত কম। আগাথা ক্রিস্টি আর সত্যজিৎ রায়ের একশোবার পড়া বইগুলো আবার পড়ে সে দুর্মূল্য সময় আমি নষ্ট করব না।

১১। আমি যদি আমার সমস্যাগুলোকে সমস্যা বলে স্বীকার না করি তবে তারা নিজে নিজেই সমাধান হয়ে যাবে।

১২। মগজের থেকে মনের কথা শুনে চলা সবসময়েই ভালো।

১৩। স্বত্ব আর সত্ত্ব-র বানান এবং অর্থের পার্থক্য নিয়ে আমি আত্মবিশ্বাসী। প্রতিবার ব্যবহার করার আগে অভিধান খুলে দেখার কোনও প্রয়োজনই বোধ করি না।

১৪। আমার সময় আছে। যদিও আর দুমাস পর আমার পঁয়ত্রিশ হবে। যদিও আমি জানি গত পঁয়ত্রিশ বছর যে গতিতে কেটেছে আগামী পঁয়ত্রিশ বছর তার থেকে পঁয়ত্রিশ গুণ দ্রুত কাটবে। তবু আমার সময় আছে। দায়িত্ব পালন করার, স্বপ্ন পূর্ণ করার। অনেক, অনেক সময় আছে।

১৫। আমি চেষ্টা করছি। আমার যতটুকু সামর্থ্য আছে, যতখানি সময় আছে, যে পরিমাণ সদিচ্ছা আছে, সবটুকু দিয়ে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।

  

September 27, 2015

ফাঁকিবাজি



শ্রীকান্ত আর ইন্দ্রনাথ-এর গল্পে ছিনাথ বহুরুপী আবির্ভূত হওয়ার ঠিক আগে সন্ধ্যেবেলায় ভাইবোনদের পড়তে বসার দৃশ্য ছিল মনে আছে? পড়ুয়াদের দলের নেতা ছিলেন মেজদা। তাঁর কড়া পাহারায় ভাইবোনদের পড়াশোনায় ফাঁকি দেওয়ার কোনও সুযোগ থাকত না। জল খাওয়া, বাথরুম যাওয়া ইত্যাদি পড়া ফাঁকি দেওয়ার রাস্তা আছে সে সব বন্ধ করার জন্য নানারকম অভিনব উপায় বার করেছিলেন মেজদা। এই সব কাজ করার জন্য সবাইকে আবেদনপত্র জমা দিতে হত, মেজদা সে সব পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে তবে ভাইবোনদের পড়া ছেড়ে ওঠবার অনুমতি দিতেন। এই সব করতে গিয়ে তাঁর নিজের পড়ার বেজায় ব্যাঘাত হত সন্দেহ নেই, কিন্ত তিনি সে নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিলেন বলে মনে হয় না। দুঃখের বিষয় হচ্ছে যাদের পড়ানোর জন্য মেজদার এত বলিদান, তাদেরও গোটা সময়টা অ্যাপ্লিকেশন লিখতে আর পাশ করাতেই চলে যেত, পড়া কতখানি হত সেটা তর্কের বিষয়।

আমার মায়েদের ছোটবেলাতেও এ ধরণের নিয়ম চালু ছিল জানতে পেরেছি। তবে অ্যাপ্লিকেশনের বদলে মায়েদের ছিল ঘুঁষি মারার ব্যবস্থা। সন্ধ্যেবেলা একসঙ্গে সবাই পড়তে বসত। জল খেতে হলে একবার মাটিতে ঘুঁষি মারা হত। বাথরুমে যেতে গেলে দুবার। কোন বাথরুমে যাওয়া হচ্ছে, ছোট না বড়, সেই অনুযায়ীও ঘুষির সংখ্যার তারতম্য হত। সেজমাসি এসবের সাক্ষী থাকতেন না বলাই বাহুল্য, কাজেই এত অনুমতির ঘটা কীসের জন্য জানতে চাইলে মা বলেছিলেন, অনুমতি না, স্রেফ একে অপরকে জানান দেওয়ার জন্যই নাকি এই ব্যবস্থা। যাতে নিজেরাই নিজেদের পড়াশোনার পারফরম্যান্সের ওপর পাহারা রাখা যায়। গণতান্ত্রিক উপায়ে।

ওপরের দুটো ঘটনা দিয়ে আমি যেটা বোঝাতে চাইছি যে কাজে ফাঁকি দেওয়ার অনেক রকম উপায় আছে। টিভি দেখে, ঘুমিয়ে, গল্পের বই পড়ে, ইউটিউব দেখেও যেমন কাজে ফাঁকি দেওয়া যায়, সেরকমইকাজ কী করে আরও ভালো করে করা যায়সেই নিয়ে মাথা খাটিয়েও করা যায়। এই রকম ফাঁকির সুবিধে হচ্ছে এতে বিবেকদংশন থাকে না. বা থাকলেও কম থাকে। নিজের মনকে চোখ ঠারানো যায়। এই সত্যিটা মেজদা ও তাঁর ভাইয়েরা জানতেন, আমার মামাবাড়ির লোকেরা জানতেন, আমার বড়বেলার এক বন্ধুও জানত।

সেই বন্ধু পড়াশোনা নিয়ে ভয়ানক সিরিয়াস ছিল। পরীক্ষা আসার চার মাস আগে ক্লাস বাংক করা বন্ধ করে দিত,  সিনেমা দেখত না, ফুচকা খেত না। পাছে শরীর খারাপ হয়ে পড়ার সময় নষ্ট হয়। পড়াশোনার প্রতি এত নিবেদিতপ্রাণ আমি আমার জীবনে আর কাউকে দেখিনি। আমরা জমা দেওয়ার আগের রাতে পুরোনো হোমওয়ার্ক খুঁজতে বেরোতাম, বন্ধুর ফোল্ডারে গত পাঁচবছরের সব হোমওয়ার্কের প্রতিটি প্রশ্ন ও সমাধান জমা করা থাকত। মাইক্রোর ফোল্ডার লাল রঙের, ম্যাক্রোর নীল, ইকোনোমেট্রিক্সের সবুজ। বন্ধুর নোটের খাতায় প্রশ্ন আর উত্তর আলাদা আলাদা কালিতে লেখা থাকত।

আশ্চর্যের ব্যাপারটা হচ্ছে এত নিষ্ঠা কিন্তু নম্বরে প্রতিফলিত হত না। হতেই হবে সে রকম কোনও কথা নেই। আমার এক বন্ধু দাবি করেছিল যারা যে সাবজেক্টকে যত বেশি ভালোবাসে বা যে সাবজেক্টটা যত ভালো বোঝে তারা সেটায় সবথেকে কম নম্বর পায়। আমি আবার এত শক্ত যুক্তি বুঝি না, আমার হিসেবে বলে বেশি পড়লে বেশি নম্বর পাওয়া যাবে। কাজেই যে বন্ধু এত পড়ে সে কেন নম্বর পায় না সেটা নিয়ে আমার একটা খটকা লেগে থাকত।

খটকাটা কাটল তার রুমে একদিন পড়তে গিয়ে।

গিয়ে দেখলাম যা আশা করেছিলাম তাই। টেবিল পরিপাটি করে গোছানো। রং মিলিয়ে ফোল্ডার থরে থরে সাজানো। দেওয়ালে মোটিভেশনাল পোস্টার, টেবিলে সরস্বতীর মূর্তি। আমি বই খুলে বসলাম, সে ঘর গুছোতে লাগল।  বলল, না হলে নাকি তার পড়ায় মন বসে না। আমি পড়তে থাকলাম, সে ঘর পরিপাটি করে গুছোলো, সাজানো বইয়ের তাক আবার কেঁচে গন্ডুষ করে সাজালো, নতুন পাওয়া নোটের বান্ডিল পাঞ্চ করে ফোল্ডারে ফোল্ডারে ঢোকালো, রং মিলিয়ে মিলিয়েপোস্ট ইটসাঁটল, (পাছে খুঁজে পেতে অসুবিধে হয়) গা ধুতে গেল, গা ধুয়ে এসে সরস্বতীর সামনে ধূপ জ্বালল। শেষটা ঘরের পরিবেশ যখন কণ্বমুনির আশ্রমের মতো হয়ে উঠেছে, আর আমি যখন ব্যাগ গুছিয়ে আমার রুমের দিকে রওনা দিচ্ছি, তখন সে আমাকে বলছে, “চল, আমিও তোর সঙ্গে বেরোবো, এক কাপ কফি লাগবে, দেখলি তো সন্ধ্যেটা কোথা দিয়ে কেটে গেল, এখন রাত জাগতে হবে।

মোদ্দা কথাটা হচ্ছে ফাঁকি দেওয়ার অনেকরকম উপায় থাকতে পারে। এবং সে উপায়গুলোকে দেখে অনেকসময় ফাঁকি বলে চেনাও যায় না। আমি নিজেও এ জিনিস করে থাকি। নিচে আমার কতগুলো ফাঁকি দেওয়ার উপায়ের কথা লিখলাম, যেগুলো খালি চোখে দেখলে চট করে ধরা যাবে না যে আমি ফাঁকি দিচ্ছি। সত্যিটা কেবল জানে আমি আর আমার কাজ। আর এই জানবেন আপনারা।

১। ওয়ার্ম আপ: আমার কাজে ফাঁকি দেওয়া শুরু হয় কাজ শুরুরও আগে। অফিসে পৌঁছেই যে কাজ শুরু করে দেওয়া যায়, বা ওয়ার্ড ফাইল খুলেই টাইপ করা শুরু করা যায়, এই খবরটাই যেন আমার জানা নেই। কাজ শুরু করার আগে আমি বসি ওয়ার্ম আপ করতে। অফিসে সে ওয়ার্ম আপের দৌড় গুগল নিউজ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে, তাও  কর্তৃপক্ষের রক্তচক্ষুর কথা মনে পড়ে সে ওয়ার্ম আপে কিছুক্ষণ বাদেই ক্ষান্ত দিতে হয়, কিন্তু বাড়িতে হলে আর রক্ষা নেই। ওয়ার্ম আপ করার ছুতোয় আমি গুগল নিউজ মিনিটে মিনিটে আপডেট করে পড়েছি, বিবিসির পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ডকুমেন্টারি গোটা দেখেছি, এমনকি ক্যান্ডি ক্রাশের লাইফ শেষ না হওয়া পর্যন্ত খেলে গেছি, এমনও ঘটেছে। সারাদিন ওয়ার্ম আপ করতে করতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে রাতে ঘুমোতে চলে গেছি এ ঘটনাও বিরল নয়।   

২। টু ডু লিস্ট: লিস্ট বানিয়ে কাজ করা যে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির একটা অন্যতম উপায় সেটার অনেক প্রমাণ আছে। পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা অনেকেই লিস্ট বানিয়ে কাজ করতেন। বিলিতি ব্যক্তিত্বরা তো করতেনই, আমাদের বিধানচন্দ্র রায়ও নাকি করতেন। ডাক্তারি, রাজনীতি মিলিয়ে সারাদিনে বিধানচন্দ্রের নাওয়াখাওয়ারও সময় মিলত না। অথচ সেই বিধানচন্দ্র নাকি দিনের শুরুতে, যখন বাকি সবাই নাকে দড়ি দিয়ে ছুটবে বলে প্রস্তুত হচ্ছে, আধঘন্টা চুপ করে বসে থাকতেন। একদিন তাঁর এক ঘনিষ্ঠ লোক আর না থাকতে পেরে বলেই ফেললেন, যে এই সময়টা এভাবে নষ্ট করা কি ডাক্তারবাবুর উচিত হচ্ছে? তখন ডাক্তারবাবু মিষ্টি হেসে বললেন যে ওই আধঘন্টা বাজে খরচ নয় মোটেই। ওই সময়টা তিনি সারাদিনে কী কী কাজ করবেন সেটা মাথার ভেতর ছকে নেন, অর্থাৎ মাথার ভেতর তাঁর সেদিনের টু ডু লিস্ট লেখেন। সেই আধঘণ্টা সময় যদি তিনি এই কাজের পেছনে না খরচ করেন তাহলে তাঁর গোটা দিনই মাটি।

কিন্তু টু ডু লিস্ট বানিয়ে কী করে গোটা দিন মাটি করা যায় সেটা শেখার জন্য আমার কাছে আসতে হবে। লিস্টের যত কাজ বাকি পড়ে থাকে, আমার লিস্ট বানানোর উৎসাহ তত পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক এমনকি বার্ষিক টু ডু লিস্টও বানিয়ে দেখেছি আমি - কোনওটাই কাজে লাগেনি, বা আমি কাজে লাগাতে পারিনি। সাধারণ টু ডু লিস্ট বানিয়েছি, বিষয়ভিত্তিক লিস্ট বানিয়েছি (অর্থাৎ কি না একদিনে অবান্তরের কাজের লিস্ট, অফিসের কাজের লিস্ট, ব্যক্তিগত কাজের লিস্ট), সময়ভিত্তিক লিস্ট (সকালের, দুপুরের, বিকেলের), সব লিস্টেরই কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

এমন নয় যে আমি নিজের এই স্বভাবে লজ্জিত নই। টু ডু লিস্টের কার্যকারিতা প্রমাণের জন্য, টু ডু লিস্টের সম্মান রাখার জন্য  এমনও হয়েছে যে আমি একটা কোনও কাজ করে তারপর সেটা টু ডু লিস্টে অন্তর্ভুক্ত করেছি। যাতে অন্তত কোনও একটা আইটেমের পাশে টিক চিহ্ন দিতে পারি। তারপর দেখা গেছে কেবল চা খাওয়া, চুল আঁচড়ানো আরটু ডু লিস্ট বানানোর পাশে টিক দেওয়া গেছে, সেই লিস্টের বাকি সব আইটেম যেমন ছিল তেমনি পড়ে আছে।

৩। মোটিভেশন সংগ্রহ: আমার আরেকটি ফাঁকি দেওয়ার উপায় হচ্ছে কাজ করার মোটিভেশন সংগ্রহ করা। এর মধ্যে বিখ্যাত (এবং কর্মিষ্ঠ) লোকেদের টু ডু লিস্ট সংগ্রহকরণ , দৈনিক রুটিন পর্যবেক্ষণ, উৎপাদনশীলতা সংক্রান্ত ওয়াল পেপার সাঁটন ইত্যাদি পড়ে। এসব করতে আমি যত মোটিভেটেড অনুভব করি কাজ করার বেলা যদি তার পাঁচ শতাংশও করতাম, আজ আমার জীবনটার চেহারা অন্যরকম হত।

দুঃখের বিষয়টা হচ্ছে যে আমি খেয়াল করে দেখেছি, এই সব শক্ত শক্ত ইনজিরি কথা, মোটিভেশন, ডেডিকেশন, ইন্সপিরেশন - যখন আমি জানতাম না, তখন আমার এগুলোর একটারও অভাব ছিল না। যত দিন যাচ্ছে ততই শব্দগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠছে আর মানেগুলো হয়ে পড়ছে দুর্বল।

আমার নিজের জীবনে তো এই বদলটা দেখছিই, কিন্তু এটাও কি হতে পারে যে মোটিভেশন শিকারের অভ্যেস প্রজন্মের সঙ্গে সঙ্গেও বাড়ছে?  আমার আগের প্রজন্মের একজন কর্মী লোককে আমি কাছ থেকে দেখেছি, তিনি আমার মা। ঘরের বা বাইরের - যে কোনওরকমের কাজের অভাব হলে মায়ের হাত পা কাঁপতে শুরু করে, টেনশন হয়, এ আমার নিজের চোখে দেখা। মাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে তিনি মোটিভেশনের অভাব হলে কী করে থাকেন। তাতে মা এমন অদ্ভূত চোখে আমার দিকে তাকালেন যেন ডিকশনারির বাইরে ওই শব্দটা তিনি কোনওদিনও শোনেননি।

৪। অর্গানাইজেশন: ওপরে আমার যে বন্ধুর কথা বলেছিলাম, তার ফোল্ডারেরা এখন আমার ফোল্ডারদের দেখে লজ্জা পাবে। তফাৎ হচ্ছে শুধু তার ফোল্ডারেরা ছিল রক্তমাংসের, আমার ফোল্ডারেরা বৈদ্যুতিন। অফিস ও বাড়ির কমপিউটারে, ড্রপবক্স ও গুগল ড্রাইভে, যেখানে পেরেছি আমি ফোল্ডার বানিয়ে রেখেছি। কাজের ফোল্ডার, অকাজের ফোল্ডার। একই জিনিস চার জায়গায় চারটে ফোল্ডারে সেভ করা আছে। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে, দরকারের সময় একটাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু কি ফোল্ডার, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রয়েছে বুকমার্কিং। যা পাচ্ছি, বুকমার্ক করে রাখছি। আর এসব রাখতে গিয়ে কাজের সময় কোথা দিয়ে পালাচ্ছে চোখে দেখা যাচ্ছে না। সমস্যাটা কোন পর্যায়ে গেছে সেটা বোঝানোর জন্য আপনাদের দুখানা স্ক্রিনশট দেখাই দাঁড়ান।



৫। রিসার্চ: পেটের দায়ে করতে করতে এখন এই ব্যাপারটা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমন ঢুকে গেছে যে গবেষণা ছাড়া এখন কোনও কাজ করার ক্ষমতা হারিয়েছি। অভ্যেসটা কাজের ক্ষেত্রে হয়তো কাজে লেগেছে, কিন্তু বাকি সব কাজ মাটি করেছে। যে কোনও জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার আগে আমি যে পরিমাণ সময় সে জায়গাটা সম্পর্কে রিসার্চ করে নষ্ট করি সে সময়ে আরও তিনটে বেড়ানো প্ল্যান করে ফেলা যায়। একটা জুতোর ক্যাবিনেট কিনতে গিয়ে আমি গোটা বাড়ির ফার্নিচার কেনার গবেষণা করে ফেলি। তবে এই গবেষণা সব থেকে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে অবান্তরের পোস্ট লেখার সময়। বোনাস কুইজের কথাই ধরুন। কোনও একটা প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে লাগসই একটা গল্পের লাইন মনে পড়ে যায় (নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রেই সেটা ফেলুদার কোনও গল্পের হয়) কিন্তু অবিকল সেই লাইনটা তো মনে পড়ে না, কাজেই তখন গল্পটা খুঁজে বার করে লাইনটা খুঁজে বার করতে হয়। আর একবার গল্প খুঁজে পেলে সেই গল্পটা তো পুরোটা না পড়ে ছাড়া যায় না, কাজেই। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এই খোঁজাখুঁজির তবু একটা মানে থাকে। যেমন আগের অনুবাদটা করার সময় রাঁচি শহরের কাছাকাছি অঞ্চলের আদিবাসী মহিলাদের নাম খোঁজার গবেষণাটা কাজের ছিল, কিন্তু ওই অঞ্চলের চার্চের ওয়েবসাইটে ঢুকে ঢুকে সেখানকার আধিকারিকদের ঠিকুজিকুষ্ঠি জানাটা নিতান্তই অকাজের। এই পোস্টটা লেখার সময়ও আমি গবেষণার বাতিককে সংযত রাখতে পারিনি। টু ডু লিস্ট সংক্রান্ত কোটেশন খুঁজতে গিয়ে আমি ঝাড়া দেড়টি মিনিট নষ্ট করেছি। দেড় মিনিট শুনতে হয়তো সামান্য মনে হচ্ছে, কিন্তু তিনতিনটে দিন টানা ছুটির পর, টু ডু লিস্টের নব্বই শতাংশ কাজ বাকি থেকে যাওয়ার পর, এবং অবান্তরের পরবর্তী পোস্ট রেডি না থাকার পরিস্থিতিতে রবিবার সন্ধ্যে সাড়ে ছটায় দেড় মিনিটের মূল্য প্রায় দেড় দিনের সমান।

আপনি কী কী অভিনব উপায়ে কাজে ফাঁকি দেন?


September 26, 2015

সাপ্তাহিকী




শিল্পীঃ বিল ওয়াটারসন



I think we judge talent wrong. What do we see as talent? I think I have made the same mistake myself. We judge talent by people's ability to strike a cricket ball. The sweetness, the timing. That's the only thing we see as talent. Things like determination, courage, discipline, temperament, these are also talent.
                                                             ---Rahul Dravid

শুরু করার আগে ভেবেছিলাম গোল্লা পাব, শেষে গিয়ে দেখি এগারোটার মধ্যে নটাই ঠিক হয়েছে।
টাকাকড়ি গয়নাগাঁটির বদলে রুটির ব্যাংক। লিংক পাঠিয়েছে চুপকথা।

বাঁদর যদি আপনার ক্যামেরা দিয়ে সেলফি তোলে, তবে সে সেলফির স্বত্ত্ব কার, বাঁদরের না আপনার?


বেশ কিছুদিন ধরে বড়লোক দেশেফ্রম স্ক্র্যাচখাবারদাবারের হুজুগ চলছে। এই ভদ্রলোক সত্যি সত্যিফ্রম স্ক্র্যাচস্যান্ডউইচ বানিয়েছেন। নিজে সবজি ফলিয়ে, গরুর দুধ দুইয়ে চিজ বানিয়ে, সমুদ্রের জল থেকে লবণ নিষ্কাশন করে। সে স্যান্ডউইচের দাম কত পড়েছে বলে আপনার ধারণা?

সেলফি স্টিকের থেকেও বিরক্তিউৎপাদক কিছু আছে কি? এই যে, সেলফিস্পুন

বিহাইন্ড এভরি হিরো, দেয়ার ইজ ওয়ান সাইডকিক। 

অন্যের দৈনিক রুটিনের কথা জানতে ভালো লাগে? তাহলে এই লিংকে ক্লিক করে দেখতে পারেন।

অণুগল্প, কিন্তু সামান্য অন্যরকম অণুগল্প। অক্সফোর্ড অভিধানের নমুনা বাক্য জড়ো করে লেখা অণুগল্প।


বলছে বিগিনারদের ফোটো তোলার জন্য কমপ্লিট গাইড। 

সারা পৃথিবীতে এই সুরটা দিনে ১৮০ কোটি বার শোনা হয়, অর্থাৎ সেকেন্ডে কুড়ি হাজার বার। আমি আপনি আরেকবার শুনলে ক্ষতি নেই।

আমাদের বাড়িতেও এই রহস্যজনক ব্যাপারটা ঘটে। আপনার বাড়িতে?



September 23, 2015

বিশ্বাস



মূল গল্পঃ The Burial of Tom Nobody
লেখকঃ Richard Vincent

*****

নেকেড আই কেম ফ্রম মাই মাদারস উম্ব, অ্যান্ড নেকেড আই উইল ডিপার্ট; দ্য লর্ড গেভ অ্যান্ড দ্য লর্ড হ্যাস টেকেন অ্যাওয়ে।

চার্চের প্লাস্টারচটা দেওয়াল আর নড়বড়ে পায়াওয়ালা সারি সারি বেঞ্চের ঘুণধরা কাঠে ধাক্কা খেয়ে শব্দগুলো নেতানো ফুলের মতো টুপটাপ ঝরে পড়ল। যেন তাদের কোনও ভার নেই, কোনও ধার নেই, কোনও অর্থ নেই, প্রতিধ্বনি নেই। এই পৃথিবীর বাস্তবতায়, রোদ বৃষ্টি ঝড়ে যেন তাদের কোনও জায়গা নেই। কেশে গলা পরিষ্কার করে নিয়ে আমি বললাম, “মে দ্য নেম অফ দ্য লর্ড প্রেজড।”  

কপালে বুকে আর দুকাঁধে দ্রুত আঙুল ছুঁইয়ে ওরা উঠে পড়ল। ওরা মানে জনা আষ্টেক যারা ছড়িয়েছিটিয়ে বসে ছিল ঘরে। যারা এখনও আসে। আমি জানি এ কাজটা করতে ওদের কতটা ঝুঁকি নিতে হয়। বাজারের কাছটাতে, যেখানটায় জটলা করে বসে থাকে এ শহরের মাথারা, তাদের চোখে চোখ না ফেলে চোখের সামনে দিয়ে চোখ নামিয়ে দ্রুত পা চালাতে হয়। তবু কেন প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে আসে ওরা? কোনও স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে? চার্চের কাছ থেকে কোনও সুবিধে পাওয়ার আশায়?

ছি ছি, এ সব কী ভাবছি আমি? নিজের বিশ্বাসে টান পড়ছে বলেই কি অন্যের বিশ্বাসের ওপর সংশয় জাগছে আমার? জোবের কথা মনে পড়ল। ওল্ড টেস্টামেন্টের ক্রুদ্ধ, প্রতিশোধস্পৃহ ঈশ্বরের পরীক্ষার ঝড়ে সবকিছু হারিয়েও যার বিশ্বাসের শিখা অনির্বাণ, অকম্পিত। আর  সামান্য প্রতিকূলতার মুখে পড়ে আমার কি না বিশ্বাসে টান পড়ছে? এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজলাম আমি। আমাকে শক্তি দাও, পিতা। আমাকে তোমার প্রতি বিশ্বস্ত রাখো। তোমাতে অবিচল রাখো।

পাঁচিলের গায়ের বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে আমার সাইকেল দাঁড় করানো থাকে। সেদিকে এগোতে এগোতে আমি পকেট থেকে মোবাইল বার করলাম। বাঁদিকের সবুজ ফোন আঁকা বোতামটা টিপলেই রিসেন্ট কলসের লিস্ট, দ্বিতীয়বার টিপলে লিস্টের প্রথম যে নম্বরটা সেটা ডায়াল হতে শুরু করবে। আমি ফোন কানে ধরে হাঁটতে থাকলাম। উল্টোদিকের ফোনটা বেজে যাচ্ছে। কেটে দেব? শুয়ে আছে? কিন্তু এখন তো শুয়ে থাকার কথা নয়। শরীর খারাপ হল নাকি?

হ্যালো?” গলাটা ধরা ধরা। সকাল থেকে তো এ রকম ছিল না।  

রেণু? শরীর ঠিক আছে তো?”

তোমার হয়ে গেল?”

হ্যাঁ। তোমার কি শরীরটা আবার খারাপ করল নাকি?”

ভালো হল?”

ভালো বলতে রেণু কী বোঝায় আমি জানি না। চার্চভর্তি লোক মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে ফাদারের সারমন শুনছে? শুনতে শুনতে তাদের জীবন বদলে যাচ্ছে, অন্ধকারে আলোর দিশা পাচ্ছে তারা সবাই??

ওই হল একরকম।গলায় ফুটে ওঠা অধৈর্য চাপা দিতেই আমি বললাম, “আচ্ছা আমি রাখছি বুঝলে? চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য কিছু আনব?”

তোমার ইচ্ছে হলে এনো।

আহা, তোমার কিছু ইচ্ছে থাকলে বল? আচ্ছা, আমি তেলেভাজা নিয়ে আসবখন। মুড়ি দিয়ে খাওয়া যাবে।”   

তোমার মতো এনো।

আমি দুজনের মতোই আনব। তোমার ইচ্ছে করলে খাবে, না খেলেও কোনও অসুবিধে নেই। ঠিক আছে?”

দেরি কোর না। সাবধানে এস।

এ সময়টা সন্ধ্যে নামে ঝপ করে। পশ্চিমের আকাশটা লাল কমলা বেগুনি ধূসর মিলিয়ে অদ্ভুত সুন্দর হয়ে আছে। সেদিকে চোখ রেখে প্যাডেলে চাপ দিলাম। বাজারে যতক্ষণে পৌঁছলাম ততক্ষণে সাদা হ্যালোজেন জ্বলে গেছে দোকানে দোকানে। বাজার মানে ছড়িয়েছিটিয়ে গোটা বারো দোকান। আজ থেকে পনেরো বছর আগে, যখন আমি এখানে প্রথম এসেছিলাম, তখনও অবিকল এইরকমই ছিল। একমাত্র তফা হচ্ছে যে তখন সবার আশা ছিল একদিন এই ছোট বাজার বড় হবে। আমারও ছিল। অনেক আশা। আমি মনের মতো করে গোড়া থেকে কাজ শুরু করব। চার্চ বাড়বে। স্কুল বসবে। হাসপাতাল হবে, হাসপাতালে বিনা পয়সায় দুঃস্থদের চিকিৎসা হবে। সানডে স্কুল বসবে চার্চের বারান্দায়। চকচকে পালিশ করা মেহগনির মতো ত্বকওয়ালা ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আসবে। পরিষ্কার ছিটের জামা পরে তারা চার্চের বাগানে দৌড়বে, খেলবে, পড়বে। ভালোমন্দের প্রভেদ জানবে। মানুষকে ভালোবাসতে শিখবে। সমবায় সমিতি খুলব আমরা। ছেলেদের হাতে টাকা দিলে সস্তা মদের পেছনে উড়ে যায় সব। আমরা মেয়েদের হাতে টাকা দেব। মায়েদের হাতে টাকা দেব। ট্রান্সফার পাকা হওয়ার আগে আমাকে সঙ্গে নিয়ে আশেপাশের গ্রাম চেনাতে নিয়ে গিয়েছিলেন চার্চের পূর্বতন ফাদার। দেখেছিলাম কী অসামান্য অপূর্ব আল্পনা দিয়ে নিজেদের কুঁড়েঘর সাজিয়েছে ওরা। তালপাতার ওপর কী অসামান্য ছবি এঁকেছে। সে সব ছবির আমরা প্রদর্শনী করব। দেশবিদেশের আর্ট গ্যালারি থেকে ডাক আসবে আমাদের হাতের কাজের। আমাদের শিল্পের।

কিছুই হয়নি। রাজনীতির বদলানো হাওয়ায় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত একটি শহরতলির সম্ভাবনার কুঁড়ি ক্রমশ শুকিয়ে গেছে। গত পনেরো বছরে চার্চে নতুন পনেরো জন সদস্যও আসেনি। যারা ছিল তাদেরও বেশিরভাগই নিঃশব্দে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছে। বুকের ক্রসকে জামার তলায় লুকিয়ে ফেলেছে, বিশ্বাসকে আস্তিনের তলায় গুটিয়ে নিয়েছে। আশেপাশের জঙ্গলের মাথার ওপর দিয়ে চার্চের চুড়োটা এখনও জেগে আছে। এখনও ওটা এ শহরের সবথেকে উঁচু বাড়ি। কিন্তু আর কতদিন থাকবে কেউ জানে না। আমি জানি। বেশিদিন নয়।

তেলেভাজার দোকানের সামনে বেশ ভিড়। সাইকেলটাকে রাস্তার এপাশে স্ট্যান্ড করিয়ে আমি এগিয়ে গেলাম। দুয়েকজন সরে গিয়ে জায়গা করে দিল। এরা সব মাঝবয়সী। একসময় চার্চে যেত। এখন আর যায় না। ওদের জায়গায় আমি হলে আমিও হয়তো যেতাম না। আমি যাই, কারণ না গিয়ে আমার উপায় নেই। কারণ আমি আমার জীবন পিতার পায়ে উসর্গ করেছি। তিনি আছেন, তাই আমি আছি। তিনি যতদিন আছেন, এই আকাশবাতাস অন্তরীক্ষ যতদিন আছে, আমার এই নশ্বর শরীর যতদিন আছে, ততদিন তাঁর কাজ করে যাওয়া ছাড়া আমার উপায় নেই।

দোকানের ভেতর উনুনের আঁচ গনগন করে জ্বলছে। তার ওপর কালো কুচকুচে প্রকাণ্ড লোহার কড়াইয়ে ফুটন্ত তেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে গগন। ওর ঠাকুরদা খনিতে কাজ করত। কাশির সঙ্গে রক্ত তুলতে তুলতে মারা গিয়েছিল। গগনের বাবা পবন মাহাতোর বয়স তখন চার। আমি আসার পর আমাকে এ সব কথা আমাকে বলেছিল পবনই। তখন বউছেলেমেয়ে নিয়ে পবন মাহাতো রীতিমতো সংসারী। গগনের ঠাকুরদা মারা যাওয়ার পর পবনের সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছিল চার্চ। পবনকে খনিতে ঢুকতে হয়নি। চার্চের ফাদারের কাছে এক দুই গুনতে আর ইংরিজিতে নিজের নাম সই করতে শিখেছিল। দিনমজুরির কাজ করত পবন। যে কদিন কাজ পেত না, চার্চের বাগান করত, মাটি কোপাত, গাছ পুঁতত, ছোটখাট মেরামতির দেখাশোনা করত। চার্চের বাগানের পাঁচিল ঘিরে যে সারি দেওয়া কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়া গাছের সারি, সে সব পবন মাহাতোর হাতের কাজ। গায়ে অদ্ভুত জোর ছিল পবন, গাধার মতো খাটতে পারত। ধপধপে সাদা সবল দাঁতের সারি বার করে হাসত কথায় কথায়। রবিবার সকালে পাড়াশুদ্ধু লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক নিয়ে আসত প্রার্থনার জন্য। ওই বাগানে মাটি কোপাতে কোপাতেই মুখ থুবড়ে পড়ে মরে গিয়েছিল একদিন।

গগনের জন্য মালির কাজটা আমি খালি করে রেখেছিলাম। ও করতে চায়নি। চার্চের গোলামি থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছে। শুনেছি গত বছর পাঁচ মাইল দূরের মন্দিরে যে গণ- ঘরওয়াপসি হয়েছে তাতে গগন মাহাতোও ছিল। তার প্রতিদান হিসেবে বাজারে এই চপের দোকান খোলার অনুমতি পেয়েছে। ফুল ফোটানোর বদলে চপ ভাজা। যার যাতে সুখ।

রোজ যা বলি আজও তাই বললাম।দুটো ফুলুরি আর দুটো আলুর চপ।গগন জিনিসগুলো তুলে কাগজের ঠোঙায় পুরে চিমটি করে মশলানুন ছড়িয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমি তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু অন্যান্য দিনের মতো আজও গগন আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেলআমি কী করে বোঝাব ওকে, ওর বিশ্বাসের সঙ্গে, ওর ধর্মাচরণের সঙ্গে আমার সঙ্গে ওর সম্পর্ক নির্ভরশীল নয়। ঘর আলাদা হতে পারে, কিন্তু আমাদের মাথার ওপরের আকাশ তো একই।

ঠোঙাটা হাতে ধরে সাইকেলের দিকে এগোচ্ছি, এমন সময় পকেটের ভেতর মোবাইলটা বেজে উঠল। নম্বরটা দেখে ভুরু কোঁচকালাম।

কী হল, রেণু?”

সঞ্জীব, বাগানে কারা ঘুরছে।

কী বলছে রেণু? এত ফিসফিস করে বলছে কেন?

হ্যালো? রেণু? শুনতে পাচ্ছি না, জোরে বল। কী হয়েছে?”

সঞ্জীব! বাড়ির আশেপাশে কারা ঘুরছে, সঞ্জীব! আমার ভীষণ ভয় করছে। তুমি কোথায় সঞ্জীব?” রেণুর গলা অসম্ভব কাঁপছে।

কারা ঘুরবে? কেউ ঘুরছে না রেণু, তুমি ভুল দেখছ। ভয় নেই সোনা, এই আমি গগনের দোকানের সামনে, বাড়ি পৌঁছতে আর ঠিক পাঁচ মিনিট লাগবে।

সঞ্জীব, ওরা দরজা খুলে ঢুকে পড়েছে সঞ্জীব! ওরা বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েছে!

রেণু, তুমি শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দাও, আমি আসছি . . .

আমার কথা শেষ হওয়ার আগে একটা তীক্ষ্ণ চিকারের প্রতিক্রিয়ায় আপনা থেকে ফোন ধরে থাকা আমার হাতটা কান থেকে ছিটকে গেল। রেণুর চিকার

না না না! ছেড়ে দাও, আমাকে ছেড়ে দাও! সঞ্জীঈঈঈব!

ফোনটা তুলে ক্রেডলে রেখে দিল কেউ।

দুসেকেন্ড লাগল আমার নিজেকে সামলাতে। খাবারের ঠোঙা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে গিয়ে সাইকেলে বসে প্যাডল করতে শুরু করলাম। আমার হৃপিণ্ড উল্কার গতিতে দৌড়চ্ছে, তার থেকেও দ্রুত ছুটছে আমার মগজ। ওরা কি তবে আঘাত হানলএ রকম যে হতে পারে সে তো আমি জানতাম। ওরা তো বারবার আমাকে সাবধান করেছিল। কিন্তু রেণুকে কেন, হা ঈশ্বর, রেণুকে কেন? রেণু তো কোনও দোষ করেনি। দিতে হলে আমাকে শাস্তি দাও, ঈশ্বর। রেণুকে রক্ষা কর, আমার দুর্বল, অসহায় রেণুর ওপর আঁচ আসতে দিও না পিতা।

বাড়ির দরজার সামনে সাইকেল ছুঁড়ে ফেলে দৌড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলামসারা বাড়ির আলো জ্বলছে। সন্ধ্যে হতে না হতে রেণু সারা বাড়ির আলো জ্বালিয়ে রাখে। ওর নাকি ভয় করে। চার্চের গায়ে অত বড় বাগানওয়ালা অত পুরোনো বাড়িতে, পা ফেললে যেখানে আদ্যিকালের কাঠের মেঝে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করত, সেখানে রেণুর কোনওদিন ভয় করেনি, আর অথচ এখানে এই বাগানহীন দুকামরার বাড়িতে নাকি করে। ইলেকট্রিক বিল বেশি আসার কথাটা মাথায় এসেছিল আমার, কিন্তু রেণুর কালিপড়া চোখের দিকে তাকিয়ে আমি আর কিছু বলিনি।

দুটো ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম, কুয়োতলা, পরীক্ষা করতে আমার লাগল ঠিক দুমিনিট। রেণু নেই। কিন্তু ছিল। ওষুধ আর চন্দনগন্ধের পাউডার মেশানো রেণুর গায়ের গন্ধটা শোবার ঘরের হাওয়ায় এখনও মিশে আছে। কয়েক মুহূর্ত আগে মাথা রেখে শুয়েছিল রেণু, বালিশে তার ছাপ স্পষ্ট ফুটে আছে। খাটের পাশে রাখা ফোনের রিসিভারটা তুলে নিলাম। এখনও উষ্ণ। আর কয়েক মুহূর্ত আগে নিজের জ্বোরো আঙুলে এই রিসিভার চেপে ধরে আমার কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিল রেণু, আমি . . .

রিসিভারটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি খানিকক্ষণ। কাকে ফোন করব? পুলিশকে? পুলিশের সঙ্গে আমার শেষ মোলাকাত হয়েছে মাসছয়েক আগে। যেদিন শেষবারের মতো দলবল নিয়ে এসে চার্চের বাড়ি ছাড়ার হুমকি দিয়েছিল। ওখানে নাকি আমাদের আর থাকা চলবে না। ও বাড়ি উন্নয়নের কাজে লাগানো হবে। কী একটা এন জি ও-র অফিস হবে। তারা স্কুল খুলবে। আদিবাসীদের ছেলেমেয়েরা সেখানে এসে পড়বে। মিড ডে মিল রান্না হবে। আমি একবার জিজ্ঞাসা করব ভেবেছিলাম, এখন যে প্রতি রবিবারে স্কুল বসে? বিনা মাইনেয় সেখানে পড়ে আদিবাসীদের ছেলেপুলেরা? চার্চের রান্নাঘরে দল বেঁধে রান্না করে শীলা, জয়া, দ্রৌপদী, শুকরি, একসময় রেণুও কোমর বেঁধে রাঁধত ওদের সঙ্গে, সামান্য রান্নাই, তবু সে রান্নাই কত তৃপ্তি করে খায় ছেলেমেয়েগুলো? তাতে ক্ষতিটা কীসের?

পারিনি। চুপচাপ চলে এসেছিলাম। তারপর থেকে ও বাড়ি খালি পড়ে আছে। এন জি ও-র নাম লেখা একটা ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে কেউ। ব্যস, আর কিচ্ছু নেই। কর্মকর্তা নেই, মিড ডে মিল নেই, একটিও শিশু নেই। আমার শরীরের ভেতর প্রচণ্ড রাগ পাকিয়ে উঠছে, আমি সমস্ত মন দিয়ে পিতার কাছে শান্তি প্রার্থনা করেছি। ক্ষমা করে দিতে চেয়েছি। পারিনি। ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা করার শক্তি দেননি।

কিন্তু এখন আমাকে পারতেই হবে। এখন আমাকে বিশ্বাস রাখতেই হবে। পুলিশের ওপর, প্রশাসনের ওপর, মানুষের ওপর। আমার নিজের জন্য নয়। আমার রেণুর জন্য। ডায়াল করলাম। রিং হচ্ছে। কেউ তুলছে না কেন?

হ্যালো?ঘুম জড়ানো পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।  

হ্যালো, থানা? আমার স্ত্রী-কে কেউ অপহরণ করেছে।

কী হয়েছে? কে বলছেন? স্পষ্ট করে বলুন, কেটে কেটে যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে না।

আ-আমি সেন্ট জনস চার্চ থেকে সঞ্জীব বিশ্বাস বলছি। রেণুকে . . . আমার স্ত্রীকে কেউ কিডন্যাপ করেছে। আমাদের বাড়ির ভেতর থেকে। শিগগিরি কাউকে পাঠান।

ঠিকানা বলুন।নিরাসক্ত গলা।

ফোনটা রেখে দিন, ফাদার।

চমকে পেছন ফিরলাম। আমার ঘাড়ের কাছে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। লোক না, ছেলে। বছর পঁচিশের। ছেলেটার মুখ পাথরের মতো নিষ্প্রাণ, ফ্যাকাশে। মুখের সব রক্ত যেন কেউ শুষে নিয়েছে। এই ছেলেটাই কি এক্ষুনি আমার নাম ধরে ডাকল? ছেলেটা আমাদের শোবার ঘরে ঢুকল কী করে?

ফোনটা রেখে দিন।

হ্যালো? ঠিকানা বলুন। হ্যালো? কোথা থেকে বলছেন?” ওপাশের গলাটা থেকে ঘুম কেটে গেছে।

ফোনটা রেখে দিন, ফাদার। আপনার স্ত্রী ঠিক আছেন।

কোথায় আমার স্ত্রী? তোমরা আমার বাড়িতে ঢুকলে কী করে?”

হ্যালো, হ্যালো? লাইনে আছেন? ঠিকানাটা বলুন।

ফোনটা রেখে দিন ফাদার। আপনার স্ত্রীকে যদি অক্ষত অবস্থায় ফের পেতে চান তবে ফোন রেখে আমার সঙ্গে আসুন।

কোথায় যাব? কোথায় নিয়ে গেছ তোমরা রেণুকে?”

ফোনটা কাটুন। প্রশ্ন পরে করবেন।ছেলেটার গলা শক্ত হল।

হ্যালো? হ্যালো? হ্যালো? লাইনে আছেন?”

আমি ফোনটা নামিয়ে রাখলাম। ছেলেটা আমার হাত ধরে টান দিল। আমি ঝটকা দিয়ে ছাড়াতে চাইলাম, পারলাম না। হাড়সর্বস্ব আঙুলগুলো সাঁড়াশির মতো চেপে বসেছে আমার হাতের ওপর।

রেণুকে কোথায় রেখেছ তোমরা? শিগগিরি বল, নইলে ফল ভালো হবে না।

আপনার স্ত্রী ঠিক আছেন। তবে কতক্ষণ থাকবেন বা আদৌ থাকবেন কি না সেটা সম্পূর্ণ আপনার ওপর নির্ভর করছে। আপনাকে আমাদের একটা কাজ করে দিতে হবে। ছোট্ট কাজ। তারপর স্ত্রীকে ফের পেয়ে যাবেন।

কী কাজ?”

নাথিং ডিফিকাল্ট। চলুন।

ছেলেটার পেছন পেছন বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলাম। চাঁদের আলোয় চারপাশের জঙ্গল আলো হয়ে রয়েছে। টানা ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর প্রাণের সাড়া নেই কোথাও। এ জায়গাটা শহরের একেবারে প্রান্তে। যখন এখানে এসেছিলাম তখন নিজেদের ক্ষত সারানোর জন্য লোকচক্ষুর আড়ালের এই নির্জনতাকে আশীর্বাদ মনে হয়েছিল। এখন মনে হল আশেপাশে পাড়াপ্রতিবেশী থাকলে এত সহজে হয়তো দুর্ঘটনাটা ঘটতে পারত না। রেণুর চিকার শুনে কেউ হয়তো সাহায্য করতে এগিয়ে আসত।

হেঁটে হেঁটে বাড়ির উত্তর দিকে চললাম। এদিকে একটা পরিত্যক্ত গলি আছে। আমাকে নিয়ে গলির ভেতর ঢুকে পড়ল ছেলেটা। একটা ছায়া অন্ধকারে ওঁত পেতে আছে। বেশ বড় একটা ভ্যান। ভ্যানের দরজাটা টেনে সরিয়ে ভেতরে আমাকে ঠেলে দিল ছেলেটা। আমি হুমড়ি খেয়ে পড়লাম গাড়ির ভেতর। একটা শরীরের ওপর। শরীরটা আর্তনাদ করে উঠল। মহিলার গলা। রেণুর নয়।

আস্তে।ছেলেটা ধমকে উঠল।

চল্‌।আমাকে ভেতরের দিকে ঠেলে গাড়িতে ঢুকে দরজা টেনে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল ছেলেটা।

একটা মৃদু হলুদ আলো জ্বলল গাড়ির ভেতর।

শিবু! লাইট নেভা।

আলো নিভল না। সাবধানতার থেকে বড় হয়ে উঠেছে শিবুর বন্দীকে চোখে দেখার কৌতূহল। সামনের সিট থেকে একটা মাথা ঘুরল আমার দিকে। দুটো চোখ। চোখদুটোর চারপাশে মূখ বলে কিছু নেই। খালি পোড়া চামড়া। নাক নেই, ঠোঁট নেই। মুখের জায়গায় খালি একটা ফুটো। সেটা দিয়ে লালা ঝরে ঝরে চারপাশটা ভিজে গেছে।

আমার গলা দিয়ে আপনা থেকেই একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল। ছেলেটা বলল, “ঘাবড়াবেন না ফাদার। একটা অ্যাক্সিডেন্টে শিবুর চেহারাটা একটু বিগড়ে গেছে, কিন্তু গায়ের জোর একই রকম আছে। কাজেই যা করার ভেবেচিন্তে করবেন।

গাড়ি চলল। আমি দুজনের মাঝখানে চেপে বসে আছি। নড়াচড়ার জায়গা নেই। ডানদিকের মহিলা অসম্ভব কড়া একটা সুগন্ধী মেখেছেন। উকট গন্ধ। আমার গা গুলিয়ে উঠছে। মাথা ঝিমঝিম করছে।

আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ তোমরা? আমার স্ত্রী কোথায়?”

“বলছি তো, চিন্তা করবেন না।”

একে দিয়ে হবে?” সেন্টের সঙ্গে এবার জর্দার গন্ধ মিশল   

চেষ্টা করে দেখতে হবে।

ভিয়া একুই সাপিয়েনতেস এসতিস ইন অকুলিস্‌ ভেসত্‌রিস্‌ এ কোরাম ভোবিস্‌মেত এপসিস্‌।জর্দার গন্ধ ভকভকিয়ে উঠল।

নীরবতায় বুঝলাম আমার মতো ছেলেটাও হকচকিয়ে গেছে।

ভিয়া একুই সাপিয়েনতেস এসতিস ইন অকুলিস্‌ ভেসত্‌রিস্‌ এ কোরাম ভোবিস্‌মেত এপসিস্‌।এবার গলাটা অনেক বেশি ঝাঁঝালো।

ছেলেটাও খেঁকিয়ে উঠল।লাটিনফ্যাটিন জানে না এ।

Woe to those who are wise in their own eyes and clever in their own sight? ল্যাটিন না হয় জানে না, ইংরিজিও জানে না নাকি? এ কাকে ধরে এনেছিস? কী করে এ চার্চে গিয়ে? দুহাত আকাশের দিকে তুলে হ্যালেলুইয়া হ্যালেলুইয়া করে চেঁচায়?”

আমি ধরে এনেছি? তা তুমি নিজে গেলেই পারতে? পছন্দমতো বাইবেলে দিগগজ ফাদার ধরে আনতে? শালা, লোক খুঁজতে খুঁজতে দুনিয়া উজাড় হয়ে গেল, ইনি এখন ল্যাটিনের ফ্যাকড়া তুলছেন। যত্তসব।

ইসায়া। ইসায়া ফাইভ টোয়েন্টি ওয়ান।

কী?”

“‘ভিয়া একুই সাপিয়েনতেস এসতিস ইন অকুলিস্‌ ভেসত্‌রিস্‌ এ কোরাম ভোবিস্‌মেত এপসিস্‌ইসায়া ফাইভ টোয়েন্টি ওয়ান।

ছেলেটা লাফিয়ে উঠল।হয়েছে? শান্তি? এ জানে। একে দিয়ে হবে আমাদের কাজ। আমি জানি। আমার মন বলছে।

গাড়ি শহর থেকে বেশ খানিকটা বেরিয়ে এসেছে এতক্ষণেদুধারে জঙ্গল আরও ঘন হয়েছে। দীর্ঘ ছায়ারা ঘিরে এসেছে রাস্তার ওপর। গাড়িটার বাঁদিকের হেডলাইটটা খারাপ বোধহয়। সামনের উইন্ডশিল্ড দিয়ে দেখতে পাচ্ছি একটামাত্র হলুদ আলো কালো পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে পিছলে যাচ্ছে।

ঝুঁকে পড়ে সামনের সিটের পেছনের পকেট থেকে খচমচ করে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট বার করে আনল ছেলেটা। প্যাকেটটা খুলে তার ভেতর হাত ঢুকিয়ে মুঠো করে কী একটা বার করে, সেটা মুখে পুরে সশব্দে চিবোতে চিবোতে আমাকে জিজ্ঞাসা করল, “চানাচুর খাবেন?”

সাড়া না পেয়ে আমার বুকের সামনে দিয়ে মহিলার দিকে ঠোঙাশুদ্ধু হাত বাড়িয়ে দিল। মহিলাও নিরুত্তর রইলেন।  

অ্যাই শিবু, চানাচুর খাবি?”

একটা ঘোঁত শব্দ হল শুধু। মাথাটা দুদিকে নড়ল। ছেলেটা চানাচুর খেতে শুরু করল।

এ সব ভয়ানক খাটুনির কাজ। এই সব অপেক্ষাটপেক্ষা। খিদে পেয়ে যায়।

কীসের অপেক্ষা?” আমি জিজ্ঞাসা না করে থাকতে পারলাম না।

এই, ঠিক লোক খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষা। একবার পেয়ে গেলে সব ছেড়েছুড়ে ফিরে যাওয়া যাবে।

কোথায়?”

বাড়ি। বাড়ি ফিরে যাব। খুব ঘুমোব।

গাড়ির ভেতরের হাওয়ায় হঠা একটা উদাসী ছোঁয়া লাগল মনে হল। সেটা কাটিয়ে দিতেই বোধহয় ছেলেটা জিজ্ঞাসা করল, ছোটবেলায় কী হতে চেয়েছিলেন?”

কে? আমি?”

আপনি না তো কে? নিশ্চয় পাদরি হতে চাননি?”

মহাকাশচারী। অ্যাস্ট্রোনাট।

হলেন না কেন?”

চুপ করে রইলাম।

অবশ্য চার্চের ফাদার ব্যাপারটাও একরকম মহাকাশচারীর কাছাকাছিই হল। সেই আকাশ, তারাফারা, ডিভাইন ব্যাপারস্যাপার নিয়েই তো গল্প।

আর থাকতে পারলাম না।

আমি আর একটাও কথা বলতে চাই না তোমাদের সঙ্গে। আমার স্ত্রী কোথায়? কোথায় রেখেছ তোমরা রেণুকে?”  

কতবার বলা হবে যে আপনার স্ত্রী ঠিক আছেন? হ্যাভ সাম ফেথ, ওকে?”

জানালার কাঁচ সামান্য নামিয়ে খালি প্যাকেটটা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিল ছেলেটা। একঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া আমার গা ছুঁয়ে গেল। আঃ। বুকের ভেতরটা ভারি হয়ে আসছে হঠাৎদমবন্ধ লাগছে। জানালার কাঁচ একটুখানি নামিয়ে দিতে বলব? একটু হাত পা ছড়াতে পারলে আরাম লাগতে পারত মনে হচ্ছে। কিন্তু তার জায়গা নেই। আমি চোখ বুজে সিটে মাথা হেলালাম। সেন্ট, ঘাম, চানাচুরের গন্ধ মেশানো ভ্যাপসা, বিষাক্ত হাওয়া আমার শ্বাসনালীর ভেতর দিয়ে ঢুকে সারা শরীর ছেয়ে ফেলতে থাকল।

উঁ উঁ উঁ....

এক ঝটকায় চোখ খুলে গেল আমার। একটা মৃদু শব্দ হচ্ছে কোথাও। আমার মাথার পেছনে সম্ভবত। মৃদু, কিন্তু নির্ভুল। মুখ চাপা দেওয়া অবস্থায় কথা বলার চেষ্টা করলে যে রকম শব্দ হয় সেরকম। গাড়ির মধ্যেই কোথাও হচ্ছে। আমার মাথার পেছনে। আমি ছিটকে উঠে বসলাম।

আওয়াজটা কীসের?”

ধুস্‌শালা। অ্যাই শিবু, ভালো করে ক্লোরোফর্ম দিসনি?”

গুম গুম গুম। কেউ বন্ধ কিছুর ওপর আঘাত করছে।

গাড়ি থামাও!আমি ঝাঁপিয়ে পড়ে ড্রাইভারের গলা চেপে ধরলাম। শিবু চিকার করে উঠল। আদিবাসীদের গ্রামে উসবের আগে শুয়োর কাটার সময় জন্তুগুলো যে রকম চেঁচায় অবিকল সেই চিকারস্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে আমার রক্ত জল হয়ে যেত ও চিকার শুনে। আমি হাতের চাপ বাড়ালাম। স্টিয়ারিং-এর ওপর শিবুর কন্ট্রোল আলগা হয়ে গেছে। গাড়িটা বিপজ্জনক ভাবে বেঁকে যাচ্ছে রাস্তার এদিকওদিকে। পেছন থেকে মহিলা আর ছেলেটা আমার দুহাত চেপে ধরে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। ছেলেটা চেঁচাচ্ছে ফাদার! ফাদার! ভালো হবে না কিন্তু। শিবুকে ছেড়ে দিন।

আমার প্যান্টের ডান পকেটে চৌকো যন্ত্রটার অস্তিত্ব আমি টের পাচ্ছি অনেকক্ষণ থেকে। ধস্তাধস্তিতে পকেটের ওপর চাপ আলগা হয়ে গেছে, নিমেষে শিবুর গলা থেকে হাত সরিয়ে পকেটে হাত দিয়ে ফোনটা বার করে আনলাম।  

গাড়ি থামাও! নইলে আমি পুলিশকে ফোন করব।হাতে ফোনটা ধরে নিজেকে হঠাৎ শক্তিশালী মনে হচ্ছে। একটু আগের ক্লান্তির লেশমাত্র টের পাচ্ছি না।

আপনি ওসব কিচ্ছু করবেন না। করার হলে আগেই করতেন। তাছাড়া আপনার স্ত্রীর কথাটাও ভাবুন।ছেলেটা সোজা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

গুম গুম গুম।

আমি ফোনের বোতাম টিপতে শুরু করলাম। ওয়ান . . .

ছেলেটা আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু দরকার ছিল না। তার আগেই পেছন থেকে দুটো দাঁত এসে বিঁধে গেছে আমার হাতের পাঞ্জায়। প্রচণ্ড ব্যথায় আমার মুঠো আলগা হয়ে গেছে, ফোন ছিটকে পড়ে গেছে গাড়ির অন্ধকার মেঝেতে। আমার হাত বেয়ে কিছু একটা নামছে। উষ্ণ। থকথকে।

গুড জব, ভেরি গুড জব মেরি।ছেলেটা আমার কলার চেপে ধরলছেলেটার মুখটা এখন আমার মুখের খুব কাছে। জানালার কাঁচ পেরিয়ে আসা চাঁদের আবছা আলোয় আমি ওর চোখের তলার কালি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ওর ঠোঁটের দুপ্রান্তের থুতুর বিন্দু। বিন্দুগুলো ছিটকোতে শুরু করল আমার মুখের ওপর।

আপনি কি ভাবছেন আমরা ইয়ার্কি করছি? অ্যাঁ? ইয়ার্কি হচ্ছে এটা? একটা কাজ, একটা ছোট্ট কাজ করার জন্য আপনাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যাতে আপনি বেগড়বাঁই না করেন তাই গ্যারান্টি হিসেবে আপনার বউকে কিছুক্ষণের জন্য জমা রাখা হয়েছে। আপনার বউ ঠিক আছে। সেফ। সিকিওরড। এর মধ্যে কোন কথাটা আপনার মগজে ঢুকছে না ফাদার? অ্যাঁ? কোন কথাটা?”

ওটা কে? কে আওয়াজ করছে?”

ছেলেটা আমার কলার ছেড়ে দিল।

আপনার স্ত্রী নয়।

ওকে আটকে রেখেছ কেন?”

কারণ আছে।

আমাকে যে কাজের জন্য নিয়ে যাচ্ছ তার সঙ্গে কি ওই লোকটার কোনও সম্পর্ক আছে?”

হ্যাঁ। কী কাজ সেটা জিজ্ঞাসা করবেন না। সময় হলে জানতে পারবেন। এ কাজ আপনি আগেও লক্ষ বার করেছেন। সোজা কাজ।

গুম গুম আওয়াজটা থেমে গেছে। গোঙানির শব্দও আর শোনা যাচ্ছে না। আমার ভেতরের সবটুকু শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে। আমি সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজলাম। কী করেছে লোকটা? আমাকে কী কাজ করতে হবে? আর কাজ যদি আমাকেই করতে হবে তাহলে রেণুকে লুকিয়ে রেখেছে কেন? রেণুর কথা মনে পড়ে আমার বুক মুচড়ে উঠল। রেণু যেখানেই থাকুক, ওকে কষ্ট দিও না ঈশ্বর। কাউকে ওকে কষ্ট দিতে দিও না।

ছেলেটা গুনগুন করে গান গাইছে। একটা হিন্দি সিনেমার গান। আজ সন্ধ্যেবেলা গগনের দোকানেই বাজছিল। সন্ধ্যেটাকে এখন কত দূরের মনে হচ্ছে। কতক্ষণ হয়েছে, একঘণ্টা, দেড়ঘণ্টা, নাকি তারও বেশি? ঘটনাগুলো কি সত্যি ঘটছে? নাকি পুরোটাই স্বপ্ন দেখছি? এই দমবন্ধ করা আবিল বাতাস, আমার বুকের ভেতরের চাপ, হেডলাইটের আলোয় আলোকিত সামান্য কয়েকহাত পিচের রাস্তা, রাস্তার দুপাশে জঙ্গলের ছায়া, মাথার পেছনে ওই গোঙানি স্বপ্ন কি এত স্পষ্ট হয়? আর এই যে আমার ডান হাতের পাঞ্জার ঝিম ধরা ব্যথাটা, এই যে চিটচিটে হয়ে ওঠা ক্ষত, সেটাও কি স্বপ্ন?

ছেলেটার গুনগুনানি থেমে গেছে। শিস দিয়ে উঠেছে ছেলেটা।

আমার তন্দ্রা ছুটে গেল। ছেলেটার এক হাতে একটা টর্চ। টর্চের আলোয় দেখতে পাচ্ছি ছেলেটার কোলে আমার ওয়ালেটটা খোলা পড়ে আছে। ওটা আমার বাঁ দিকের পকেটে, ছেলেটা যেদিকে বসে আছে, রাখা ছিল। আমার তন্দ্রার সুযোগে বার করে নিয়েছে কখন। ওয়ালেটের ভেতর দামি কিছু নেই। খুচরো টাকা, কয়েকটা জরুরি ঠিকানা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নম্বর, এ টি এম-এর পাসওয়ার্ড লিখে রাখা কাগজ। আর যেটা ছিল সেটা এখন টর্চের আলোর সামনে।

ও বাবা, ফাদারের মানিব্যাগে সুন্দরী মহিলা!

আমি ছোঁ মেরে ছবিটা কেড়ে নিতে গেলাম। ছেলেটা দ্রুত হাত সরিয়ে নিল।  

কে এটা?”

লুচ্চা, শালা।জর্দার গন্ধের সঙ্গে এবার একরাশ ঘৃণা ছিটকে এল অন্য পাশ থেকে।

রেণু। আমার স্ত্রী।

ছেলেটার মুখ হাঁ হয়ে গেছে।

এটা? আপনার বউ?”

ছবি দেখতে এপাশ থেকে উগ্র সেন্টের গন্ধটা ঝুঁকে পড়ল আমার গায়ের ওপর।

আমি জবাব দিলাম না। ছেলেটার দোষ নেই। কেউই চিনতে পারে না। রেণুকে পনেরো বছর আগে যারা সশরীরে দেখেছে, তারাও নয়। আমিই কি পারি? সারাদিন ঘরের ভেতর প্রেতাত্মার মতো নিঃশব্দ পায়ে ঘুরে বেড়ানো ওই লোল, রুক্ষ চামড়ায় ঢাকা শরীরটাকে আমার রেণু বলে মেনে নিতে? মাঝে মাঝে ওয়ালেট খুলে পনেরো বছর আগে তোলা ছবিটার দিকে যখন তাকিয়ে থাকি একটা অদ্ভুত পাপবোধ হয়। মনে হয় পরকীয়া করছি। অসুখে ভুগে ভুগে কুসিত হয়ে যাওয়া স্ত্রীকে লুকিয়ে অন্য এক মহিলার ছবি বুকের ভেতর বয়ে বেড়াচ্ছি। যে মহিলা আমার স্ত্রীর থেকে অনেক বেশি সুন্দরী, অনেক বেশি কামনার। অনেকবার ভেবেছি ছবিটা ফেলে দেব। পারিনি। মনে হয়েছে যদি রেণুর এই চেহারাটা আমি ভুলে যাই? যদি ভুলে যাই যে ওই কগাছি চুলসর্বস্ব কংকালসার যে দেহটার সঙ্গে আমি বাস করি রাত্রিদিন, যাকে খাওয়াইদাওয়াই, ভোলাই, ঘুম পাড়াই, সেটার মধ্যে এই ছবির রেণু, আমার এত আদরের, এত অহংকারের রেণুই আসলে আছে কোথাও?  

কী করে হল?”

অ্যাঁ?”

বলছি, এ রকম কী করে হল?”

অসুখে।আমার দুশ্চিন্তাটা একধাক্কায় তিনগুণ হয়ে ফিরে এল। কোথায় রেখেছে এরা রেণুকে? একটানা বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে না রেণু। আজ রাতের ওষুধগুলোও তো পড়ল না।

দেখাশোনা করে কে? নাকি ভাড়া করা লোক আছে?জর্দা আর সস্তা সেন্টের গন্ধ কথা বলে উঠল।  

আমি করি।

ভালো লাগে? ক্লান্ত লাগে না? মনে হয় না, কী কপাল?”

মনে হয়, আমি ভাগ্যবান। সেবা করার সুযোগ দিয়ে ঈশ্বর সবাইকে পৃথিবীতে পাঠান না।

“ছবিটা চার্চের পাশের বাড়িতে তোলা তো? এখন যেখানে এন জি ও চলে?”

ছেলেটা বিশ্রী শব্দ করে হাসল।

এন জি ও না হাতি। সব শালা ধাপ্পাবাজ। এন জি ও-র নাম করে আপনাদের ভাগিয়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে হাউসিং হবে। অত বড় বাগান, হাওয়া হল বলে।

“অত বড় বাড়িতে দু’জনে থাকতে ফাঁকা লাগত না?” মহিলা জিজ্ঞাসা করলেন।

এই পরিস্থিতিতেও আমি না হেসে পারলাম না।

ফাঁকা কোথায়। সবসময় লোক আসত তো। বাচ্চারা আসত পড়তে, খেলতে।

আপনাদের বাচ্চা হয়নি কখনও?”

রেণুর . . . আমাদের শারীরিক অসুবিধে ছিল।

ছিক্‌ ছিক্‌ করে মুখে শব্দ করলেন মহিলা। সান্ত্বনাসূচক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন বোধহয়, এমন সময় ছেলেটাশ্‌শ্‌শ্‌শ্‌করে উঠল। ছেলেটার সামান্য আগের রিল্যাক্সড ভাবটা কেটে গেছে। শরীর টানটান করে ছেলেটা তাকিয়ে আছে সামনের রাস্তার দিকে। মেঘ সরে গেছেদুপাশের মহীরুহদের গুঁড়ি বেয়ে স্রোতের মতো চাঁদের আলো নেমে আসছে মাটিতে। হেডলাইট আর চাঁদের আলোর পাশাপাশি আরও একটা আলো যোগ হয়েছে এখন। একটা হলুদ আলো, অনেক দূরে, কিন্তু স্পষ্ট। মিনিমাম পাঁচ সেলের টর্চ। ফাঁকা রাস্তায়, হেমন্তের রাতের হালকা কুয়াশার মধ্যে জ্বলজ্বল করছে।

মহিলা চাপা গলায় চিৎকার করে উঠলেন, “পুলিশ! মাই গড!”

সামনের সিট থেকে একটা গরগর গোঙানি শুরু হল।

শিট্‌। শিবু, প্যানিক করবি না, স্পিড নর্মাল রাখ। বোতলটা কোথায় গেল?”

ছেলেটা উবু হয়ে সিটের তলায় কী খুঁজতে লাগল। টর্চের আলোটা ক্রমশ এগিয়ে আসছে। আমি দ্রুত চিন্তা করতে লাগলাম। এই আমার শেষ সুযোগ। এখনই যা করার করতে হবে। চিকার করব? এদের কাছে কি অস্ত্র আছে? চিকার করলে কি আঘাত করবে? এমন সময় আমার ছুটন্ত হৃপিণ্ডের শব্দ ছাপিয়ে আরেকটা শব্দ শুরু হল। গুম গুম গুম।

ফাক্‌, ফাক্‌, ফাক্‌শিবু, এরপর থেকে আর কোনওদিন যদি তোর হাতে আমি ক্লোরোফর্মের দায়িত্ব দিয়েছি। অপাহিজ, শালা। এই তো!

একটা অস্ফুট উল্লাসের চিকার করে ছেলেটা উঠে বসল। টর্চের আলোটা একেবারে কাছে এসে গেছে।

ছেলেটা একটা তীব্র গন্ধওয়ালা বোতল আমার মুখে ঠুসে ধরল।

ক-কী করছ!

গিলুন। গিলুন শিগগিরি। মেরি, ওদিকের হাতটা চেপে ধর।

আমি খাই না এসব, এসব কী খাওয়াচ্ছ তোমরা আমাকে। সরিয়ে নাও, শিগগিরি সরিয়ে নাও বলছি।

ঝাঁঝালো, তেতো, তীব্র দুর্গন্ধওয়ালা তরল আমার বুক পুড়িয়ে নিচে নেমে গেল।

বোতলটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছেলেটা নিজের প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাল। একটা বন্দুক এখন ওর হাতে। নলটা এখন ঠিক আমার কপালের দিকে তাক করা। এত কাছ থেকে বন্দুকের নল দেখিনি আমি কোনওদিনও আগে।

কোনওরকম চালাকির চেষ্টা করবেন না ফাদার। আপনার বউ ভালো আছে। নিরাপদে আছে। ট্রাস্ট মি। যদি কোনওরকম বেগড়বাঁই করেন তাহলে এটা ব্যবহার করতে আমি দ্বিধা করব না, সে ব্যাপারেও আমাকে ট্রাস্ট করতে পারেন।

টর্চের আলো একেবারে কাছে এসে গেছে।

শিবু, গাড়ি থামা।

গাড়ি থামল। টক টক টক। জানালার কাঁচের বাইরে একটা আবছা মানুষের অবয়ব।

ছেলেটা দ্রুত বোতলটা সিটের তলায় ছুঁড়ে দিয়ে জানালার কাঁচ নামালআমার ডান কানের পাশে একটা প্রায় অশ্রুত গুনগুন শুরু হয়েছে। মহিলা প্রার্থনা করছেন।

জানালা নেমে গেল। জানালার ওপারের উর্দিপরিহিত মানুষটার মুখ স্পষ্ট হয়ে উঠেছেবাচ্চা ছেলে। সদ্য চাকরিতে ঢুকেছে মনে হয়। না হলে এই রাতে এ সব দিকে কেউ রাস্তায় রাস্তায় ডিউটি দিয়ে বেড়ায় না।

এনি প্রবলেম, স্যার?

আপনাদের গাড়ির বাঁদিকের হেডলাইটটা জ্বলছে না।

আমার বুকের ভেতর অসম্ভব জোরে হাতুড়ি পিটছে কেউ। আমি চোখ বুজে একবার করুণাময় যিশুর মুখ মনে করার চেষ্টা করলাম। যন্ত্রণাবিদ্ধ, করুণাস্নাত মুখ। আরেকজনের শীর্ণ, ক্লিষ্ট মুখ আমার বন্ধ চোখের পাতার ওপর ভেসে উঠল। আজ থেকে অনেকদিন আগে, অনেক বছর আগে যাকে সমস্ত বিপদ, সমস্ত আঘাত থেকে রক্ষা করার শপথ নিয়েছিলাম আমি

সরি স্যার। আসলে আজ জার্নি শুরু করার আগেই ব্যাপারটা নোটিস করলাম। রাস্তায় তো দোকানটোকান বিশেষ . . . শহরে পৌঁছেই . . .”

ভাই, আমাকে এরা জোর করে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার স্ত্রীকেও এরা ধরে রেখেছে। প্লিজ হেল্প আস, প্লিজ প্লিজ!

মহিলা শিউরে উঠে মুখ চাপা দিলেন। ছেলেটার মুখ থেকে তেলতেলে হাসিটা মুছে গিয়ে একসেকেন্ডের জন্য একটা বিস্ময় আর আতংক মেশানো ভাব ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল।

স্যার, এ আমাদের বন্ধু। সারা রাস্তা ড্রিংক করেছে, ওর কথায় কান দেবেন না।

না না, আমি এদের বন্ধু নই, আমি সঞ্জীব বিশ্বাস, আমি সেন্ট জন’স চার্চের ফাদার।

পুলিশ ছেলেটা ঘাবড়ে গেছে। সেকেন্ডকয়েক নিচ্ছিল কী করা উচিত সেটা ভাবতে, কিন্তু ঠিক এই সময় এমন একটা ঘটনা ঘটল যেটা ছেলেটার মন থেকে সমস্ত সন্দেহ মুছে দিল।

গুম গুম গুম গুম গুম। প্রচণ্ড জোরে। আমরা সবাই শুনতে পেয়েছি। খোলা জানালা দিয়ে শব্দটা পুলিশটার কানেও গিয়ে পৌঁছেছে

ওটা কীসের আওয়াজ?”

ক-কীসের আওয়াজ? কোথায় আওয়াজ?”

গাড়ির পেছনে একজনকে এরা বন্দী করে নিয়ে চলেছে ভাই, প্লিজ, প্লিজ হেল্প আস।

স্যার, ও কমপ্লিটলি মাতাল হয়ে গেছে স্যার, ওর কথায় কান দেবেন না।

গুম গুম গুম গুম গুম।

ডিকিটা খুলুন। এক্ষুনি। নামুন গাড়ি থেকে। নামুন!

ছেলেটা জবাব দিল না। আমি টের পেলাম আমার কোমরের কাছ থেকে একটা চাপ আলগা হয়ে গেছে। বন্দুকের নলটা এখন তাক করা আছে জানালার বাইরে। ছেলেটার হাতটা একটুও কাঁপছে না। পুলিশটা অবাক হয়ে গেছেআতংক, ভয়, বিস্ময় মিশিয়ে একটা অদ্ভুত অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে ওর মসৃণ, সদ্য কৈশোর পার করা মুখটাতে।

চোখ ধাঁধানো একটা আগুনের ফুলকি, কান ফাটানো একটা শব্দবাইরের শূন্যতাটার ওপর জানালার কাঁচটা উঠে গেল।

শিবু, চালা।

এই ঘটনাটার দায় সম্পূর্ণ আপনার, ফাদার।ছেলেটার গলা অদ্ভুত রকমের শীতল মহিলা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।

আপনাকে অনেকক্ষণ ধরে বলা হচ্ছে এটা খেলা নয়। আপনি কেন কিছুতেই মেনে নিতে চাইছেন না যে আপনাকে কোনও ক্ষতি করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না, আপনার স্ত্রী যেখানে আছেন সুস্থ আছেন, সেফ আছেন। ডু উই লুক লাইক ক্রিমিন্যালস টু ইউ? এই . . . এই এক্ষুনি যে ঘটনাটা ঘটলছেলেটার গলা কেঁপে গেল, “এসব আমাদের কাছে জলভাত নয়। ইট অ্যাফেক্টস আস। অথচ আমরা এগুলো করতে বাধ্য হই, বারবার হয়েছি, কারণ আপনাদের মতো কিছু ম্যাচিওরড লোক আমাদের অত্যন্ত সিম্পল, স্ট্রেটফরওয়ার্ড কয়েকটা ইনস্ট্রাকশন, রাদার রিকোয়েস্ট মানতে পারেন না। ইউ জাস্ট কান্ট ডু ইট।”

আমি জবাব দিলাম না। চোখ বুজে সিটে মাথা হেলিয়ে রইলাম। আমার মাথার ভেতরটা, গোটা শরীরের ভেতরটাই যেন খালি হয়ে গেছে। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। রেণুর কথাও না। খালি বাচ্চা ছেলেটার অবাক হয়ে যাওয়া মুখটা . . .

বেশ খানিকক্ষণ পর গাড়ি দুলে উঠল। চোখ খুলে দেখলাম রাস্তা ছেড়ে মাঠে নামছে গাড়ি। জঙ্গল ফুরিয়েছে। ধু ধু করছে মাঠ। মেঘ কেটে গেছে, চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক।

গাড়ি থামল। একে একে গাড়ি থেকে নামল সবাই। যা সন্দেহ করেছিলাম তাই, চাঁদের আলোয় মাঠের ওপর উবু হয়ে বসে থাকা মানুষের মতো দেখাচ্ছিল যে জিনিসগুলোকে সেগুলো আসলে হেডস্টোন। একটা গোরস্থানে নিয়ে এসেছে এরা আমাকে।

“শিবু, কফিনটা নামা।”

ভ্যানের পেছনদিকের দরজা খুলে, টানতে টানতে, হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে একটা কফিন বার করে আনল শিবু। একটা প্রমাণ সাইজের কফিন, ছেলেটা আর মহিলা এদিকওদিক তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কেউ সাহায্য করার উপক্রমও করল না। লোকটা কি মানুষ না দানব? এবার আমার নজর গেল মাটির দিকে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে হাত পাঁচেক দূরে একটা গর্ত খোঁড়া আছে।

ছেলেটা বলল,ঠিকই ভেবেছেন ফাদার। আমরা এই বাক্সটা কবর দেব, আপনাকে গোটা ব্যাপারটা একটু নিয়মমতো করে দিতে হবে।”

“রেণু কোথায়?

“এই বাক্সের ভেতর নেই।”

“রেণু কোথায়?”

হাল ছাড়ার ভঙ্গি করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ছেলেটা।

“শিবু, ঢাকনা তুলে দেখিয়ে দে।”

কফিনের ঢাকনা উঠে গেল।

ভেতরে একটা লোক শুয়ে আছে। লোকটার দুহাত দুপা জড়ো করে দড়ি দিয়ে বাঁধা, মুখে একটা কাপড়ের ফেট্টি। সেই ফেট্টির ওপর দিয়ে লোকটার চোখদুটো আতংকে ফেটে পড়ছে। চোখদুটো এবার আমার দিকে ফিরল। জোড়া হাতদুটো কাঁপতে কাঁপতে বুকের কাছে উঠল একবার। ফেট্টির ভেতর থেকে ক্রমাগত গোঙানির শব্দ আসছে। আমার গলার ভেতরটা শুকিয়ে খটখটে হয়ে গেছে।

“আমি খুন করতে পারব না।”

ছেলেটা হাসল। “আপনাকে খুন করতে হবে না। আমাদের দেখে আপনাদের যা-ই মনে হোক না কেন, খুনোখুনিতে আমরা বিশ্বাস করি না। আপনি শুধু রিচুয়ালটুকু সেরে দেবেন। আমরা কফিনটা নামিয়ে মাটি চাপা দিয়ে দেব। তারপর কাজ আপনি হয়ে যাবে।”

মহিলা আমার হাতে একটা কী যেন গুঁজে দিলেন। একটা বাইবেল।

“এই কাজটা তো তোমরা নিজেরাই করে নিতে পারতে।”

“পারতাম, কিন্তু সেটা ঠিক হত না, হত কি? আফটার অল, যে যত বড় নরকের কীটই হোক না কেন, একটা পবিত্র কবর সকলেরই প্রাপ্য। তাই না? আর সে কাজটা একজন পাদরি ছাড়া আর কে করতে পারে?

“এ কে? কী করেছে?”

“কেউ না। কিচ্ছু করেনি। নাথিং।”

আমি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছেলেটাও আমার চোখের থেকে চোখ সরাচ্ছে না।

“আমি এ কাজ করব না।”

“করতে আপনাকে হবেই, ফাদার। আপনার স্ত্রীর কথা ভাবুন।”

“না না না, আমি এ কাজ করব না। কিছুতেই না।”

ছেলেটা আকাশের দিকে তাকাল। আঙুল দিয়ে চিবুক ঘষছে ছেলেটা। “হুম্‌। আপনি একে বাঁচাতে চান। জ্যান্ত মাটিচাপা হয়ে মরতে দিতে চান না। ভেরি গুড। কিন্তু তার দাম কী হবে? পরিবর্তে আপনি কি স্যাক্রিফাইস করবেন?”

“কীসের স্যাক্রিফাইস? তোমরা কি পাগল? আমি স্যাক্রিফাইস কেন করব?”

“শিবু, বার কর।”  

এবার ভ্যানের পেছন থেকে বেরোল একটা চেয়ার। চেয়ারে একজন বসে আছে। তার হাতদুটো চেয়ারের পেছনে জড়ো করে বাঁধা। গোড়ালিতে দড়ি। মুখে একটা কাপড়ের পট্টি। পট্টিটার ওপর আর নিচ দিয়ে দুটো ঠোঁট বেরিয়ে রয়েছে। অচেতন মাথাটা বুকের ওপর নেতিয়ে পড়ে . . . না, মাথাটা ধীরে ধীরে সোজা হচ্ছে, নাড়াচাড়ায় জ্ঞান ফিরে এসেছে বোধহয়। মানুষটা চোখ মেলে তাকাল। সামান্য টলে আমার মুখের ওপর এসে থামল দৃষ্টিটা।

অনেকদিন আগের একটা ছবি মনে পড়ে গেল আমার। রাঁচি শহরের একটা ছোট চার্চ। চার্চের লালনীলসবুজ জানালার কাঁচে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে ভেঙে সূর্যের রশ্মি এসে পড়েছে। সেই রশ্মি ঘিরে এক অদৃশ্য ত্রিভুজের তিন বিন্দুর মতো দাঁড়িয়ে আছি আমি আর রেণু আর ফাদার গোমস। রেণুর পরনে একটা সুতির শাড়ি, মাথায় একটা সাদা রঙের সস্তা নাইলনের ভেল। ভেলের এপার থেকে আমি রেণুর মুখটা দেখতে পাচ্ছি। ফুলের মতো নরম, নিষ্পাপ। আর কয়েক মুহূর্ত পর যে ওর পেছনের গোটা জীবনটা ওর নাগালের বাইরে বেরিয়ে যাবে, আর কখনও সেটায় ফিরে যাওয়া যাবে না, এই ভয়ানক সত্যিটা জানা সত্ত্বেও রেণুর দুচোখ কী অদ্ভুত নির্ভয়, নিঃশঙ্ক।

আমি কিছুতেই এই ঘৃণ্য কাজ করব না। তোমরা যা খুশি করতে পার।

ভেবে নিন, ফাদার। যে কোনও একটা রাস্তা আপনাকে বেছে নিতে হবে। হয় এই কফিনটাকে কবর দিতে আমাদের সাহায্য করুন, নয় নিজের স্ত্রীকে চিরবিদায় জানান।”

অসম্ভব গুমোট লাগছে। একটুও হাওয়া নেই কোথাও। আমি মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকালাম। চাঁদের চারপাশে ঘিরে এসেছে গনগনে লাল রঙের মেঘের দল। বৃষ্টি নামার আগে নাকি এরকম হয়।

“আমি বাছব না।”

“বাছবেন। ব্যাপারটা আপনি যতটা শক্ত ভাবছেন ততটা নয়। ভাবুন একবার। এই লোকটাকে আপনি চেনেন না। এ সারাজীবনে কী অন্যায়, অপরাধ করেছে আপনি জানেন না। কিন্তু আপনি আপনার স্ত্রীকে চেনেন। শি ওয়াজ, ইজ, আ গুড উওম্যান। আপনি একজনকে বাঁচান, অন্যজনের চিন্তা ঈশ্বরের কাছে ছেড়ে দিন। আপনি নিশ্চয় জানেন, অ্যাট লিস্ট জানা উচিত, তিনি অন্যায় বিচার করেন না।”

ঘাড়ের কাছে ক্লিক করে একটা আলতো শব্দ হল। সঙ্গে সঙ্গে একটা চেনা গন্ধও নাকে এসে লাগল। বেশিদিনের চেনা নয়, মাত্র কয়েক ঘণ্টার। পোড়া বারুদের গন্ধ। যে নলটা থেকে গন্ধটা বেরিয়েছিল সেটা এখন আমার কানের ঠিক পাশে। কিছুক্ষণ আগে ব্যবহার হওয়ার প্রমাণ হিসেবে সেটা থেকে এখনও একটা উষ্ণ ভাপ বেরোচ্ছে। আগেরবারের মতো এবারও সেটা আমার দিকে তাক করা নেই, সোজা স্থির করা আছে সামনের দিকে। রেণুর দিকে।

চাঁদ থেকে মেঘ সরে গেল। রেণু এবার বন্দুকটা দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়েছে ওর দিকে তাক করা একটা বন্দুকের নলের পাশে আমি স্থির, নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছি। আমি হাতের বইখানা শক্ত করে চেপে ধরলাম। আমাকে পথ দেখাও, পিতা। রেণুকে রক্ষা কর।

“আমি এ কাজ করব না।”

“এই আপনার শেষ কথা?”

শেষ কথা।

“ভেরি গুড।”

ছেলেটা নড়েচড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“ম্যাডাম, আপনার স্বামী আপনাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমি আপনাকে জানাতে চাই যে আমি ওঁকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত করার অনেক চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু উনি শোনেননি। অতএব, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হন।”

একটা কান ফাটানো শব্দে আকাশবাতাস খানখান হয়ে গেল। আমি ছেলেটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম কিন্তু পেছন থেকে দুটো বলশালী হাত এসে আমাকে জাপটে ধরেছে। আমি প্রাণপণে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগলাম কিন্তু ওই দানবিক শক্তির বিরুদ্ধে আমি অসহায়। আর ঠিক তক্ষুনি একটা চিৎকারে আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।

সঞ্জীঈঈঈব!

রেণুর গলা! রেণু বেঁচে আছে! রেণুর চেয়ারের পেছনে মহিলা গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, খুলে দিয়েছেন ওর মুখের বাঁধন। রেণু হাউ হাউ করে কাঁদছে।

সঞ্জীব, আমাকে বাঁচাও সঞ্জীব।

আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম। ওর হাতের বন্দুকটা তখনও রেণুর দিকে স্থির।

“আ-আমি রাজি।”

“গুড। আসুন।” বন্দুকটা কোমরে গুঁজে ঝুঁকে পড়ে মাটি থেকে বাইবেলটা কুড়িয়ে হাত দিয়ে দু’বার চাপড় মেরে সেটার ধুলো ঝেড়ে গর্তের দিকে এগিয়ে গেল ছেলেটা। গর্তের মধ্যে কফিনটা অলরেডি নামানো হয়ে গেছে।

আমি বলতে শুরু করলাম।

“দ্য লর্ড ইজ মাই শেফার্ড; হি লিডেথ মি ইন দ্য পাথস্‌ অফ রাইট্যুয়াসনেস। দো আই ওয়াক থ্রু দ্য ভ্যালি অফ দ্য শ্যাডো অফ ডেথ, আই উইল ফিয়ার নো এভিলঃ ফর দাউ আর্ট উইথ মি; গুডনেস অ্যান্ড মার্সি শ্যাল ফলো মি অল দ্য ডেজ অফ মাই লাইফ অ্যান্ড আই উইল ডোয়েল ইন দ্য হাউস অফ দ্য লর্ড ফর এভার। আমেন।”

মুঠো করে মাটি ছুঁড়ে দিলাম আমি বন্ধ কফিনের ওপর। আমার পাশে তিনজন হাতে মাটি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেউ নড়ল না। অসীম নিস্তব্ধতার মধ্যে খালি রেণুর ফোঁপানি শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ মহিলা কথা বলে উঠলেন।

“ইউ বাস্টার্ড, ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড।”

আমি চমকে তাকালাম। ছেলেটা অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হতাশা, দুঃখ, রাগ সব মেলানোমেশানো একটা অভিব্যক্তি। ছেলেটা খুব ধীরে ধীরে মাথা নাড়তে শুরু করল।

“স্যাড, স্যাড, স্যাড ফাদার। আমি সত্যি ভেবেছিলাম আপনি পারবেন। এরা মানতে চায়নি। আমার মন বলছিল, পারলে আপনিই পারবেন। আপনার মধ্যে একটা কিছু ছিল। কিন্তু আপনিও . . .”

“কী বলছ কি তোমরা? কী পারব?”

“আপনি এই লোকটাকে বাঁচাতে পারতেন। আপনি কি ভাবলেন আমরা সত্যি সত্যি আপনার স্ত্রীকে মেরে ফেলব? আর ফেললেও সে জন্য আপনি সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষের, যে আপনার কোনও ক্ষতি করেনি, তার প্রাণ অবলীলায় নিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? ইউ কুড হ্যাভ সেভড হিম, ফাদার। আপনার স্ত্রীর পরিণতি লর্ডের হাতে ছেড়ে দিতে পারতেন। স্ত্রীর প্রাণের জন্য প্রার্থনা করতে পারতেন। তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখতে পারতেন যে লর্ড উড সেভ হার। তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখতে পারতেন আপনি ফাদার, ফেথফুল হতে পারতেন! ফেথ! রিমেমবার? যে ফেথ-এর কথা সকালসন্ধ্যে গরিব লোকগুলোর মাথায় গজাল মেরে গোঁজেন আপনি? ফেথ? নিজের জীবনে কবে সেই ফেথের প্রমাণ দিতে পারবেন ফাদার? কবে?”

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলাম।

“স-সেটা তো বাইবেল, এটা তো বাস্তব জীবন, লর্ড এখানে এভাবে সাড়া দেন না . . .”

“দিতেন।” মহিলা চেঁচিয়ে উঠলেন। “দিতেন, যতদিন না তোদের মতো ঠগেরা তাঁর প্রতিনিধির ছদ্মবেশে পৃথিবীর লোকের সঙ্গে, আমাদের সবার সঙ্গে প্রতারণা করে বেড়াতিস। ততদিন ঈশ্বর সাড়া দিতেন।” হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন মহিলা। “হা ঈশ্বর, আর কতদিন আমাদের পরীক্ষা নেবে, আর কতদিন আমাদের ঠিক লোক খুঁজে বেড়াতে হবে?”

এরা কি উন্মাদ? নাকি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছে? আমি আর একমুহূর্ত না ভেবে গর্তের মধ্যে লাফিয়ে পড়লাম। লোকটাকে বাঁচাতেই হবে আমাকে। লোকটা আর গোঙাচ্ছে না কেন? এই তো একটু আগেই . . . কফিনটার ডালাটা পাথরের মতো ভারি . . . হে ঈশ্বর, আমাকে শক্তি দাও . . .”

“ছেড়ে দিন ফাদার। আপনি আর কিছু করতে পারবেন না। তাছাড়া লোকটার মরাই উচিত। লোকটা ভণ্ড, প্রতারক। আপনাকে আমি গোড়া থেকে বলে আসছি এটা খেলা নয়। এটা একটা পরীক্ষা। পরীক্ষায় আপনি ফেল করেছেন। আপনারা সবাই।”

ছেলেটা মুখ ফিরিয়ে নিল।

“শিবু, মহিলাকে বাড়ি নিয়ে যা। সাবধানে যাবি।”

“আমি? আমার কী হবে?”

“আপনি আমাদের সঙ্গে যাবেন। শিবু, আগে এদিকে আয়। এর মুখটা বাঁধ। আরেকটা কফিন বার কর।”

*****

একতলা দোতলা রান্নাঘর কুয়োতলা সব ঘুরে দেখতে রেভারেন্ডের বেশ খানিকক্ষণ সময় লেগে গেল। বয়স হয়েছে। হাঁটুতে বাত। নাঃ, কেউই বাড়িতে নেই। না তাঁর স্ত্রী, না মেয়ে। গেল কোথায় সব? ভুরু কুঁচকে ভাবার চেষ্টা করলেন রেভারেন্ড। কোথাও যাওয়ার কথা ছিল কি? আজকাল কী হয়েছে তাঁর, সব কথা ভুলে ভুলে যান।  

ফাদার?”

অ্যাঁ?” ভাবনার স্রোত ছিঁড়ে গেল রেভারেন্ডের। একটা ছেলে তাঁর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রোগা। ফ্যাকাশে মুখ। চোখের কোটরে গভীর কালি। যেন অনেকদিন ঘুমোয়নি।

আপনাকে আমাদের সঙ্গে আসতে হবে। খুব জরুরি দরকার।

ক-কিন্তু আমার বাড়ির লোকজন সব কোথায় গেল খুঁজে পাচ্ছি না।

আমরা খুঁজে দেব। চিন্তা করবেন না। কিন্তু আগে আপনাকে আমাদের সঙ্গে আসতে হবে। চলুন।ছেলেটা রেভারেন্ডের সামান্য কাঁপতে থাকা হাত ধরে তাঁকে বাড়ির বাইরে বার করে নিয়ে গেল।

*****

আমার চোখের ওপর কালো পট্টির অন্ধকার। আমার হাত দুটো মোটা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। আমার ঠোঁটের ওপর মোটা খসখসে কাপড়ের বাঁধন। আমি এখন একটা কফিনের মধ্যে। কফিনটা একটা চলন্ত গাড়ির মধ্যে। কিন্তু আমার বুকের মধ্যে ঈশ্বর আছেন কি? আছেন, আছেন, থাকতেই হবে। এখন আমাকে সব সংশয় ঝেড়ে ফেলতেই হবে। আমি জানি তুমি আছ। তুমি ছাড়া আর কেউ নেই, কখনও ছিল না। এই ঘোর উন্মাদদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা কর পিতা। পিতা, পিতা, পিতা . . . কোথায় তুমি . . .

আমি প্রাণপণে চিৎকার করতে লাগলাম। দড়ি বাঁধা হাতদুটো দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকলাম কফিনের কাঠের দরজাটার গায়ে।

*****

উঁ উঁ উঁ....

একটা তন্দ্রার ঘোরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন রেভারেন্ড। কোথায় তিনি? ওহ, সেই গাড়িটার ভেতর। এরা তাঁকে তাঁর স্ত্রীকন্যার কাছে নিয়ে যাবে বলেছিল। কিন্তু আর কতক্ষণ লাগবে যেতে? একটা মৃদু শব্দ হচ্ছে কোথাও। গাড়ির মধ্যেই কোথাও হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। মুখ চাপা দেওয়া অবস্থায় কথা বলার চেষ্টা করলে যে রকম শব্দ হয় অনেকটা সেরকম। মাঝে মাঝে গুম গুম একটা আওয়াজও শোনা যাচ্ছে। বন্ধ দরজায় আঘাত করলে যেমন শব্দ হয়, তেমন।

“ওটা কীসের শব্দ?”

“শব্দ? কই, কোনও শব্দ নেই তো?” তাঁর পাশে বসে থাকা মেয়েটা বলল। “আপনি ভুল শুনছেন।”

তা হবে। বয়স হয়েছে তো, কী শুনতে কী শোনেন কিছু ঠিক নেই। নিশ্চিন্ত মনে সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজলেন রেভারেন্ড। অন্ধকার রাস্তায় একখানা হেডলাইটওয়ালা ভ্যানগাড়িটা হিংস্র শ্বাপদের মতো ছুটে চলল।


 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.