October 05, 2016

এ মাসের বই/ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (২)/ লাভ সেক্স আর ধোঁকা



সেপ্টেম্বর মাসে দু’টো ভয়ানক ইন্টারেস্টিং বই পড়লাম। যেচে আনইন্টারেস্টিং বই আমি পড়ি না, কিন্তু আমার পড়া সব ইন্টারেস্টিং বইয়ের মধ্যেও এরা ইন্টারেস্টিং। দু’খানা বইই বাঙালির দুই কেচ্ছা নিয়ে লেখা। 


*****

মোহান্ত এলোকেশী সম্বাদ/ শ্রীপান্থ



তারকেশ্বরের কাছে কুমরুল গ্রামে নীলকমল মুখোপাধ্যায় নামে এক গরিব ব্রাহ্মণ থাকতেন। রূপসী এলোকেশী ছিল তাঁর প্রথম পক্ষের সন্তান। নবীনচন্দ্র ব্যানার্জির সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। নবীনচাঁদ চাকরি করত কলকাতায়। সেটা আঠেরোশো সত্তরের দশক। তখন ঘণ্টায় চারটে করে তারকেশ্বের লোকাল চলত না; কলকাতা প্রায় বিদেশই বলা চলে। নবীনচাঁদ থাকত কলকাতায়। এলোকেশী থাকত বাবা আর সৎমার সংসারে। 

এলোকেশীর বাড়ির লোকের তারকেশ্বর মন্দিরে আনাগোনা ছিল। সাধারণ ভক্তের মতো নয়, তার থেকে খানিক বেশিই। খোদ মোহান্তের খাস অনুগত ছিলেন তাঁরা। মন্দিরের অন্দরমহলে অবাধ যাতায়াত ছিল। 

অন্দরমহলটি দেখার মতো। তারকেশ্বর আর আশেপাশের অনেক শিবমন্দির নিয়ে একটা ঘোঁট মতো ছিল, তারকেশ্বরের হেড পুরোহিত, মোহান্ত ছিলেন সেই ঘোঁটের সর্বেসর্বা। বিপুল ঐশ্বর্য, অগাধ ক্ষমতা এবং সে ক্ষমতার অকথ্য অপব্যবহার। 

এলোকেশী কাণ্ডের ভিলেন মাধবচন্দ্র গিরি মোহান্ত ছিলেন মন্দিরের ইতিহাসে এগারো কিংবা বারো নম্বরের মোহান্ত। লোকে বলে এলোকেশীর সৎমার সঙ্গে এই মাধবগিরির ফষ্টিনষ্টি ছিল। এই সৎমা আর সৎমার এক সহচরীই এলোকেশীকে প্রথম মাধবগিরির কাছে নিয়ে যায়। ছুতোটা ছিল ছেলে হওয়ানোর, কিন্তু উদ্দেশ্যবিধেয় শুরু থেকেই অন্য ছিল। এলোকেশীর বাবা নাকি সবই জানতেন। কিন্তু মোহান্তর কৃপাদৃষ্টির (অলৌকিক নয়, নিতান্তই পার্থিব) লোভে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। 

এলোকেশী কী চেয়েছিল সেটা জানার উপায় নেই, তবে সে তখন ষোলো বছরের মেয়ে, তার চাওয়া না চাওয়া পরিণতি খুব একটা বদলাত বলে মনে হয় না। প্রায় এক বছর খানেক ধরে মোহান্ত আর এলোকেশীর সম্পর্ক চলল, তারপর নবীন বাড়ি এল, আসা মাত্র গ্রামের হিতৈষীরা তার কান ভাঙালো। 

নবীন বউকে ভয়ানক ভালোবাসত। এলোকেশী পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল। নবীনচাঁদ বউ নিয়ে পালাতে চাইল। (এই অংশটুকু ঘটেছিল বন্ধ ঘরের মধ্যে, কাজেই প্রমাণ করা শক্ত।) খবর এল মোহান্ত পালাবার সব রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। হতাশ, লাঞ্ছিত, ফাঁদে পড়া নবীন আঁশবটির এক কোপে এলোকেশীর মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করে ফেলল। 


কারওরই সন্দেহ হিল না যে নবীনচাঁদ খুন করেছে, কিন্তু একটা বিরাট অংশের জনগণের মত ছিল যে নবীন প্রেমে ‘পাগল’ হয়ে এ কাজ করেছে। স্ত্রীকে ভালোবাসাই স্বামীর পক্ষে যথেষ্ট প্রশংসনীয়, কুলটা স্ত্রীকে ভালোবাসলে সে স্বামী প্রায় সেন্টহুডের মনোনয়ন পেতে পারে। নবীনচাঁদের প্রতি সহানুভূতির বান ডেকেছিল সারা বাংলায়। হুগলির কোর্টের জুরিরা তো নবীনকে বেকসুর খালাস দিয়েই দিচ্ছিলেন, নেহাত বিচারকের চোখের চামড়া ছিল, তিনি জুরিদের রায়ের নাকচ করে কেস পাঠালেন হাইকোর্টে। হাইকোর্টের বিচারে নবীনচন্দ্র খুনি সাব্যস্ত হল এবং তার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হল। 

জেলে গিয়ে একটা কাজের কাজ করেছিল নবীনচাঁদ। সেটা হচ্ছে মাধবগিরির নামে পরস্ত্রীগমনের মামলা ঠোকা। সেশন কোর্ট, হাই কোর্ট ঘুরেও মোহন্ত পার পেলেন না। সাজা হল দু’হাজার টাকা জরিমানা আর তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড। 

তারকেশ্বরের মোহান্তদের বিরুদ্ধে এই ধরণের অভিযোগ কিন্তু নতুন নয়। মানুষের অন্ধবিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠা একটা অবিসংবাদিত ক্ষমতার দুর্গে খুনজখম ধর্ষণ আকছার হত। তাদের মধ্যে কোটিকে গুটিক হয়তো আদালত পর্যন্ত পৌঁছত। এলোকেশীর ঘটনার প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে আঠেরোশো চব্বিশ নাগাদ আমাদের মাধবচাঁদ মোহান্তর এক যোগ্য পূর্বসূরি নিজের রক্ষিতার স্বামীকে খুনের দায়ে ফাঁসি পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নিয়ে অত জলঘোলা হয়নি যত হয়েছিল এই মোহান্তর তিনবছরের ঘানি ঘোরানো নিয়ে। 

এলোকেশীর মামলা নিয়ে তবে এত জলঘোলা হল কেন? মামলা চলতে চলতেই সে বেচারির বাবা, সৎ মা সব মরে গিয়েছিল, বেঁচে থাকলেও তারা কত কাজে লাগত বলা মুশকিল। তাহলে জলঘোলাটা করল কে? করল সমকাল। ইংরিজি শিক্ষা তখন ঘন মাকড়সার জাল ফুঁড়ে উঁকি মারছে, খবরের কাগজ অর্থাৎ মিডিয়ার ক্ষমতা অসীম। গানে, কবিতায়, ছড়ায়, ব্যঙ্গে, তামাশায় নাটকে মোহান্ত-এলোকেশীর ঘটনা বাংলা সংস্কৃতির আকাশ ছেয়ে ফেলেছিল। শ্রীপান্থ সে সব ছড়া, গান, কবিতা জোগাড় করে বইয়ে ছেপেছেন। পড়লেই ডেকে ডেকে সবাইকে শোনাতে ইচ্ছে করে। যেগুলো না শুনিয়ে পারছি না, সেগুলো এই রইল। 

প্রথম গানটা লক্ষ্মীনারায়ণ দাসের ‘মোহন্তের কি এই কাজ!!’ থেকে। লক্ষ্মীবাবু লক্ষ্মী চিনতেন, লোহা গরম থাকতে হাতুড়ি মারলেন, আঠেরোশো তিয়াত্তরে এলোকেশী খুন হল,  ওই বছরেই নাটক লিখলেন। মধুসূদন দত্তের ‘শর্মিষ্ঠা’ থিয়েটারে মাছি তাড়াচ্ছিল, সে নাটক তুলে দিয়ে লক্ষ্মীনারায়ণের কেচ্ছা নাটক চালু হল, লোকে এসে ফিরে যেতে লাগল। সেই নাটকের একটি গান এরকম। 

আয় গো আয় মোহন্তের তেল নিবি কে। 
হুগলির জেলখানায় তেল হতেছে।।
এ তেল এক ফোঁটা ছুঁলে, টাক ধরে না চুলে, 
বোবায় মাখ্‌লে ফোটে কথা, বাঁজার হয় ছেলে; আবার 
কালায় মাখলে কানে শোনে, পঙ্গু বেড়ায় বুক ঠুকে।।
ও যার পতি বিদেশে, যদি কেনে এক সিসে, 
তেলের গুণে মনের টানে সেই দিনে আসে, 
আবার প্রবাসে সে যায় না কভু, কাল কাটায় বাসে সুখে।।
এ তেল রাখিলে ঘরে, মনের ময়লা সাফ করে, 
হুড়ক মেয়ে সদাই মরে স্বামীর তরে; আবার লক্ষ্মীরা সব
হয়ে সংসারের কাজে থাকে।।
এ তেল নয় গো সামান্য, কোরো না অমান্য, 
যেমন রোগী তেম্‌নি তেল, এর নাম লম্পট চৈতন্য;
সোদরায় ভক্ত বিটেল মাখলে এ তেল, 
যারা ভুগচে মোহন্তের রোগে।।
এ তেল খুব উপকারী হয় সকলেরি, এই বেলা
নে আর পাবি নে, খদ্দের ঝুঁকেছে ভারি;
ঘানি বেশিদিন আর চলবে নাকো, কবে
বলদ যায় শিঙ্গে ফুঁকে।।


প্যারিমোহন কবিরত্নের ‘গীতাবলী’তে দেখি মোহান্ত-এলোকেশীর ঘটনা সমাজের কীরকম প্রগতিশীলতা এনে দিয়েছে অজান্তেই। কর্তা বলছেন তিনি নির্বংশ থাকবেন সেও ভি আচ্ছা, তবু পরিবারকে সন্তানকামনায় তারকেশ্বরে হত্যে দিতে দেবেন না। (যদিও সংসারটি “দ্বিতীয় পক্ষের", প্রথম পক্ষের ব্যাপারে কর্তা এতখানি কনসার্ন দেখাতেন কি না কে জানে।) 

তোমা বিনে সংসারে কে আছে আর, 
তোমায় না দেখলে চোখে
দেখি জগৎ অন্ধকার;
ছেলে না হলোত বয়ে গেল
এ-বংশ নির্ব্বংশ ভাল, 
তবু অতিথে ঔষধ দেওয়া সবে না।।
তুমি ছেলে হবে বলে দিলে হত্যে
গলায় দড়ি দিয়ে আমি হব আত্মহত্যে,
কেন যাবে সেখানেতে মরতে
প্রাণ গেলে দিব না এ কাজ করতে
ওষুধ খেতে আর যে যাবে
সে ভাতারের মাথা খাবে, 
এ বয়সে আর আমাকে মেরো না।

সবথেকে চমৎকার হচ্ছে ছবিগুলো। কালীঘাটের শিল্পীরা জহুরি ছিলেন, এই অসামান্য সুযোগ তাঁদের চোখ এড়ায়নি। লন্ডনের মিউজিয়ামে রাখা মূল ছবিগুলোর রঙিন প্রতিলিপি জোগাড় করে এনে বইতে ছাপা হয়েছে। কোয়ালিটি সত্যিই খুব ভালো। ছবিগুলো দেখার জন্যই বইটা কাছে রাখা যায়। আমরা জোর বাঁচা বেঁচেছি। আনন্দ-র ভদ্রলোক আমাদের মুখচেনা হয়ে গেছেন, বাজারে দেখা হলে দু’পক্ষই হাত তুলি, বললেন, এই আড়াইশো টাকার লটের লাস্ট দু’কপি ছিল (সত্যিই, আমাদের কপিটা ফার্স্ট হ্যান্ড হলেও একটু পুরোনো দেখতে। মলাটের মেরুদণ্ডের ওপরের অংশটুকু, যেটা ধরে টেনে টেনে শেলফ থেকে বারবার নামানো ওঠানো হয়, সেই জায়গাটা সামান্য ছেঁড়া।) নতুন লট আনতে দিয়েছি, দাম করেছে চারশো টাকা।



*****

বর্ধমানের প্রতাপচাঁদ/গৌতম ভদ্র

বর্ধমানের রাজবংশের শুরু হয়েছিল সেই আকবরের সময় যখন পাঞ্জাবের কাপুর বংশের সঙ্গম রাই, তীর্থযাত্রায় যেতে যেতে এই বর্ধমানে এসে ডেরা বাঁধলেন। তিনি অবশ্য জমিদার ছিলেন না, তাঁর জীবিকা ছিল ব্যবসা ও মহাজনী কারবার। শাহজাহানের সময় মোগল সেনা বাংলাদেশের কোন এক বিদ্রোহ থামাতে যাচ্ছিল, বর্ধমানের কাছাকাছি এসে তাদের রসদে টান পড়ল। সঙ্গম রাইয়ের নাতি আবু রাই তখন বর্ধমানে ঠাকুরদার ব্যবসা দেখভাল করছিলেন, তিনি গায়ে পড়ে নবাবের সেনাদের রসদ পাঠালেন। খুশি হয়ে নবাব আবু রাইকে কোতোয়াল নিয়োগ করলেন। এর পর আবুর ছেলে নাতিপুতি ক্রমশ নিজেদের বুদ্ধিবলে, এবং অবশ্যই মোগলদের নেকনজরে থেকে নিজেদের প্রতিপত্তি বাড়াতে থাকলেন এবং জমিদারি পত্তন হল। 

এগুলো ইতিহাস। এবং বোরিং। বর্ধমানের রাজপরিবারের ইতিহাসে সবথেকে ইন্টারেস্টিং ঘটনাটা ঘটতে লেগে যাবে আরও দেড়শো দুশো বছর, মোগলরা গিয়ে ব্রিটিশ এসে যাবে আর বর্ধমানের তখতে বসবেন রাজা তেজেন্দ্র বা তেজচাঁদ। ছ ছ’খানা বিয়ে করে মোটে একটি ছেলের বাবা হতে পেরে তেজচাঁদের দুঃখের সীমা ছিল না। সেই একটি ছেলে ছিলেন প্রতাপচাঁদ। নানকিকুমারীর গর্ভে তিনি জন্মেছিলেন সতেরোশো একানব্বই সালে। তারপর তেজচাঁদ আরও খানদুয়েক বিয়ে করেন, শেষ বিয়ে করার সময় তেজচাঁদের বয়স ছিল তেষট্টি আর তাঁর নববধূ বসন্তকুমারী ছিলেন এগারো বছরের। 

এত অত্যাচারের ফল অচিরেই ফলল। যৌনব্যাধিতে অকেজো হয়ে তেজচাঁদ রিটায়ার করলেন। জমিদারির হাল ধরলেন প্রতাপচাঁদ। গুচ্ছের সৎমা আর তাদের বুদ্ধিদাতাদের সামলানো এমনিই সোজা ছিল না, কিন্তু খতরনাক ছিলেন সৎমা কমলকুমারী আর তার ভাই এবং জমিদারির দেওয়ান পরানচাঁদ। 

আঠেরোশো একুশে এক অজানা অসুখে প্রতাপচাঁদ মারা গেলেন। রাতের অন্ধকারে তাঁর সৎকার সারা হয়েছিল। পরে সে বিষয়ে নানারকম পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য শোনা যায়। এর বারো বছর পর, আঠেরোশো চৌত্রিশ সালে অলখ শাহ নামে এক সন্ন্যাসী উদয় হলেন, যাকে দেখলেই প্রতাপচাঁদের কথা মনে পড়ে। পুরোনো লোকেরা, যারা কমলাকুমারী আর পরানচাঁদকে সইতে পারত না, হইহই করে উঠল। সন্ন্যাসীও নিজেকে প্রতাপচাঁদ বলে দাবি করলেন।

তখন জমিদারিতে বসেছেন তেজচাঁদের দত্তক নেওয়া ছেলে মহতাবচাঁদ আর দেওয়ানি করছেন পরানচাঁদ, তাঁরা তো বিপদে পড়লেনই, ইংরেজরাও ব্যাপারটা সুনজরে দেখল না। এই নতুন সন্ন্যাসীকে ঘিরে হঠাৎ করে যে একটা গোলযোগ পাকিয়ে উঠেছে, এটা তাদের কাছে নেহাতই উটকো ঝামেলা। আঠেরোশো চৌত্রিশ থেকে আঠেরোশো আটত্রিশ পর্যন্ত নানা টানাপোড়েন, দাঙ্গাহাঙ্গামা, মামলামোকদ্দমার পর অলখ শাহের দাবি নাকচ হয়ে গেল। সন্ন্যাসী প্রতাপচাঁদ জাল প্রতাপচাঁদ হিসেবে প্রমাণ হলেন। 

সেক্স, খুনে ভরপুর মোহন্ত এলোকেশীর রোমহর্ষক কেচ্ছার তুলনায় এই জাল রাজার কেচ্ছা খুবই ম্যাড়মেড়ে। কিন্তু একদিক থেকে জাল প্রতাপচাঁদের কেচ্ছা এলোকেশী মোহান্তর কেচ্ছাকে মাত দিয়েছিল, এ ছিল বড় ঘরের কেচ্ছা। সেকালের নানা হেভিওয়েট লোক, যেমন রামমোহন রায়, বর্ধমানের রাজবাড়ির সঙ্গে আগে থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, কাজেই ‘ফুটেজ’ জোগাড় করতে এ ঘটনার কোনও কমতি হয়নি। ইয়ং বেঙ্গলের দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জি তেজচন্দ্রের আট নম্বর, বালিকা বধূ  বসন্তকুমারীর সঙ্গে ইলোপ করে বিয়ে করেছিলেন। 

আনন্দ প্রকাশনীর ইতিহাস গ্রন্থমালা বলে একটা সিরিজ আছে, যার আট নম্বর বই হচ্ছে গিয়ে এই বর্ধমানের প্রতাপচাঁদ। কেচ্ছাকে কেন্দ্র করে লেখা হলেও এ বই একেবারেই ইতিহাস বই। তাই শ্রীপান্থর মোহান্ত এলোকেশী সম্বাদ-এর তুলনায় এর চলন অনেকটাই বেশি গম্ভীর। জাল প্রতাপচাঁদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমকালীন ইতিহাসের একটা জাল বিছিয়েছেন ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্র। বইটি উপসংহার বাদ দিয়ে ন’টি চ্যাপ্টারে লেখা, তার দুয়েকটির সঙ্গে প্রতাপচাঁদের গল্পের সোজাসুজি সংযোগও নেই। যেমন তিন নম্বর চ্যাপ্টারের নাম হচ্ছে ‘বাঙালির জমিদার-ভাবনা’।  অন্য একটি চ্যাপ্টারে, যেখানে প্রতাপচাঁদের মামলা কোর্টে উঠেছে, সেখানে মফস্‌সল আর সদর আদালতের ভেতরে যে একটা হায়ারার্কির লড়াই ছিল, সে ব্যাপারে বিশদে বলা হয়েছে। অষ্টম চ্যাপ্টারে লোক চেনা না-চেনার উপায় প্রসঙ্গে লক, লাইবনিৎজের থিওরির কথাও এসেছে।

কিন্তু আমার সবথেকে ভালো লেগেছে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা চ্যাপ্টারখানা। কৈশোরে বঙ্কিমচন্দ্রের দাদা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘জাল প্রতাপচাঁদ’ বইখানা পড়ে গৌতম ভদ্রর বাঙালির ইতিহাসের এই পর্বটির প্রতি প্রথম কৌতূহল জাগে। সে কৃতজ্ঞতা তিনি জ্ঞাপন করেছেন ‘ঐতিহাসিক ও তার ইতিহাস’ চ্যাপ্টারে, যা রয়েছে বইয়ের গোড়ার দিকেই। এ চ্যাপ্টারে কোনটা ইতিহাস আর কোনটা ইতিহাস নয় সে গুরুগম্ভীর আলোচনাও যেমন আছে, তেমনি সঞ্জীবচন্দ্র মানুষটির কথাও আছে। আমি এতদিন ভাবতাম প্রতিভাবান বাবামায়ের ছেলেমেয়ে হওয়াই বুঝি জগতের শ্রেষ্ঠ জ্বালা, এখন বুঝছি প্রতিভাবান ভাইয়ের দাদা হওয়ারও জ্বালা কম নয়। ‘মেজদা’র প্রতিভা ঠিক পথে প্রবাহিত হচ্ছে কি না সে নিয়ে বঙ্কিমের সর্দারি, জাস্ট ভয়াবহ। কিন্তু সে নিয়ে এখানে বলে লাভ নেই। আপনাদের জানার ইচ্ছে থাকলে বইটা জোগাড় করে পড়ে ফেলুন। 

*****

ছবির উৎস ইন্টারনেট


14 comments:

  1. Ei boiduto portei hobe mone hocche :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. অ্যাবসলিউটলি, তিন্নি। মচৎকার বই।

      Delete
  2. khub i interesting. porte hobe :)
    onek dhonnobad

    ReplyDelete
    Replies
    1. অরিজিত, ইন্টারেস্টিং সত্যি। রুবানশপ থেকে কিনতে পারেন অনলাইন, তবে শিপিং বেশি পড়তে পারে। আর যদি কাছাকাছি কলকাতা যাওয়ার থাকে তা হলে তো ল্যাঠা চুকে গেল।

      Delete
  3. Kuntala ... tomar last koyekta post ashte parini bole porte parini , ar etao porte parchina ekkhuni ... tai lekha niye kichu bolchi na apatoto.
    Pujo ta kete gele shomoye kore jompesh kore boshe porbo.
    Ekhon shudhu tomake 'Happy Pujo!' wish korte elam.
    Tomader pujo khub bhalo katuk. Khub anondo koro. Ar bhalo bhalo khabar kheyo.

    ReplyDelete
    Replies
    1. শর্মিলা, তোমাদেরও শারদীয়া শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা জানাই। খুব ভালো কাটুক পুজো। তুমিও খুব আনন্দ কোরো আর ভালো ভালো খাবার খেয়ো। হ্যাপি পুজো!

      Delete
  4. জাল প্রতাপচাঁদ মামলার অনেক রেফারেন্স অনেক বইয়ে পেয়েছিলাম, কিন্তু কাঠঅলস কিনা, খুঁটিয়ে পড়ার ইচ্ছে থাকলেও সেটা বাস্তবায়িত হয়নি কোনোদিন। আপনার দৌলতে পুরো ঘটনাটার একটা আন্দাজ পেলাম।
    আপনাকে এবং আপনার প্রিয়জনদের জন্য রইল শারদীয়া শুভেচ্ছা। ভালো থাকবেন, পুজো আপনাদের ভালো কাটুক।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আপনারাও পুজো খুব ভালো কাটান, দেবাশিস। খুব আনন্দ হোক। আপনাদের জন্যও শারদীয়া শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা রইল।

      Delete
  5. বর্ধমানের রাই বংশ বা পরবর্তী কালের রায় বংশের সম্মন্ধে ইদানিং কালে কমই লেখা পড়েছি যার থেকে তাদের সম্পর্কে ভালো ভাবে জানা যায়. ঘটনাচক্রে তারা আমার পূর্বপুরুষ। ধন্যবাদ কুন্তলা দি তাদের নিয়ে লেখার জন্য।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অ্যাঁ! তাই নাকি! এটা সিরিয়াসলি রোমহর্ষক, সূচনা। তবে বর্ধমানের রাইদের নিয়ে আমি তো জাস্ট তিনলাইন লিখলাম, এটাকে লেখা বলা চলে না। তিনশো বছরের ইতিহাস নিশ্চয় খুবই সমৃদ্ধ এবং জটিল।

      Delete
    2. তা বটে কিন্তু তোমার ব্লগের অনুরাগী পাঠিকা হিসাবে তুমি তাদের নিয়ে লিখেছো দেখে খুব ভালো লাগলো।
      পুজো খুব ভালো কাটিও। :)

      Delete
    3. তোমারও পুজো ভালো কাটুক, সূচনা।

      Delete
  6. bah darun post , duto ghotonai alga alga kore pora chilo kintu emon chomothkar review dile abar porteo eki rokom bhalo laglo ba tar beshi. Thank you :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. তোমাকে থ্যাংক ইউ, প্রদীপ্ত।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.