December 12, 2016

বার্ষিক জমাখরচ ২/৪ঃ ২০১৬ রেজাল্ট, ২০১৭ রেজলিউশন




২০১৬ রেজাল্ট

ফেল করার আসল ডেঞ্জার আমার মতে ফেল করা নয়। আসল ডেঞ্জার হল ফেল করা অভ্যেস হয়ে যাওয়াটা। আমার দ্বারা যে পাশ করা সম্ভবই না সেই জানার বীজ বপন হয়ে যাওয়াটা। নতুন বছরের রেজলিউশন নেওয়ার আগে পুরোনো বছরের রেজলিউশন রাখতে পারার পরীক্ষার সময় যখন এল, আমার এক্স্যাক্টলি এই কথাটা মাথায় এল। যে দেখে কী লাভ। ফলাফল তো জানাই। কিন্তু দু’হাজার সতেরোর আমার একটা রেজলিউশন হল সাহসী হওয়া। পাশ ফেল যাই হোক না কেন, সত্যেরে লওয়া সহজে। এখন থেকেই তার অন্যথা করা উচিত হবে না মনে করে আমি দেখতে গেলাম দু’হাজার ষোলোতে আমি কত খারাপ করে ফেল করেছি।

গিয়ে দেখলাম,আমার দু'হাজার ষোলোর রেজলিউশন ছিল 
রোজ সকালবিকেল পড়তে + লিখতে বসা, রোজ আধঘণ্টা করে সারেগামা সাধা, রোজ মেলাগ্রাউন্ডের মাঠে সাত পাক হাঁটা - জীবনের যে কোনও কাজে, প্রতিটি কাজে, 'রেগুলার' হওয়াই আমার দু'হাজার সালের রেসলিউশন। 

আরও একটা ছিলঃ রেগুলার বই পড়া।

সাহসী হওয়ার পুরস্কার হাতে গরম পেয়েও গেলাম। অ্যাকচুয়ালি, দু’হাজার ষোলোর রেজলিউশন আমার রাখা হয়েছে। জীবনের অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে আমি রেগুলারিটি আনতে পেরেছি। দুটি সচেতন চেষ্টায়, অন্যটি ঠেলায় পড়ে। প্রথম দুটি হল পড়া এবং লেখা। তৃতীয়টি হল রাঁধা।

পড়ার ব্যাপারটা আপনারা নোটিস করেছেন হয়তো। আমার এ বছরের টার্গেট ছিল পঞ্চাশটা বই। আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে পঞ্চাশের বেশিই পড়া হয়েছে। পড়ে আমার কী হাতিঘোড়া হল, দুহাজার সতেরোয় আমি কী পড়তে চাই, ক’টা বই পড়তে চাই, দুহাজার ষোলোর থেকে পড়ার প্যাটার্নে কোনও রকম বদল আনতে চাই কি না, সে সব আলোচনা বর্ষশেষের বই পোস্টের জন্য তুলে রাখলাম। 

লেখার রেগুলারিটির অবান্তর নিজেই একটা প্রমাণ। কিন্তু এ বছর আমি অবান্তরের বাইরের লেখাকে নিয়মিত সময় দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তাতে ফল ফলেছে কি না বা ফললেও কেমন ফলেছে, সে ভবিষ্যৎ বলবে। তবে একটা তফাৎ আমি নিজেই টের পাচ্ছি। আমার লেখার স্পিড বেড়েছে। টাইপিং-এর নয়, লেখার। আগে যে সময়ে আড়াইশো শব্দ নামিয়ে ধন্য হয়ে যেতাম, এখন সেই একই সময়ে পাঁচশো লিখতে অসুবিধে হয় না।

তিন নম্বর যে কাজটা রেগুলার করছি আজকাল, সেটা হল রান্না। রান্না নিয়েও একটা পোস্টের চিন্তা আছে মাথার মধ্যে, বেশি কথা সেখানেই বলা যাবে, কিন্তু গত এক বছরে পরিস্থিতি কতখানি বদলেছে সেটা বোঝাতে একটা উদাহরণ দিই। অর্চিষ্মানের জন্ডিস ধরা পড়ার পরপর, জানুয়ারি মাস নাগাদ আমি অফিস থেকে এসে একদিন ঢ্যাঁড়স ভেজেছিলাম। এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এ জিনিস আর যার পক্ষেই সম্ভব হোক, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এগারো মাস পর, গত সপ্তাহে আমি দু’নম্বর মার্কেটে নেমে মাংস কিনে বাড়ি ফিরে সেটাকে ম্যারিনেট করতে দিয়ে, ঢ্যাঁড়স ভেজে, টমেটো পেঁয়াজ দিয়ে ডাল আর আলু ফুলকপির শুকনো তরকারি রেঁধে, ডিঙি মেরে গ্যাসের নিচের র‍্যাক থেকে প্রেশার কুকার বার করে মাংস বসাতে যাব, এমন সময় বেল বাজিয়ে অর্চিষ্মান এসে পড়ল। এসেই “বিশ্বাস কর, লাগবে না” বলে হাত থেকে টানাটানি করে প্রেশারকুকার নিয়ে যথাস্থানে রেখে দিল। তারপর আমরা চা খেতে খেতে জয়ললিতার খবর শুনলাম। আমি সম্পূর্ণ চাঙ্গা ছিলাম। মাংস রান্না করতে আমার একটুও কষ্ট হত না। এমন তো হতে পারে না যে এগারো মাস বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার এনার্জি, গায়ের জোর ইত্যাদি বেড়েছে। ঢ্যাঁড়সভাজার কোয়ালিটি হয়তো একই আছে, কিন্তু রান্না করাটা যে আমার অনেক বেশি ধাতস্থ হয়েছে সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 


২০১৭ রেজলিউশন

“রেগুলারিটি”র থিম এ বছরও বহাল থাকবে। রেগুলারিটির নমুনা হিসেবে পড়া, লেখা, গান ও শরীরচর্চার কথা লিখেছিলাম আগের বছর, শেষ দুটো বিষয়ে দু'হাজার ষোলোতে চরম ফেল করেছি, সতেরোতে তার পুনরাবৃত্তি হলে চলবে না। পড়াসংক্রান্ত রেজলিউশনের খুঁটিনাটি আরও কিছু আছে, সেটা বর্ষশেষের বই পোস্টে বিশদে লিখব। তাছাড়াও আরও কয়েকটা বিষয়ের দিকে দু’হাজার সতেরোতে নজর দেওয়ার ইচ্ছে আছে, সেগুলো নিচে লিখলাম। 

১। সাহসী হব। বাঞ্জি জাম্পিং, হোয়াইট ওয়াটার র‍্যাফটিং সাহসী নয়। সে রকম সাহস বাড়লেও ভালোই হবে, কিন্তু আমি সে সাহসের কথা বলছি না। নিজের সিদ্ধান্তে স্টিক করার সাহস, প্রশংসা এবং নিন্দের মুখোমুখি হওয়ার সাহস ইত্যাদি বাড়ানো আশু দরকার। 

২। শ্রমের মাঝে বিশ্রাম কমাব। দশ মিনিট কাজ করে এক ঘণ্টা হাঁফ ছাড়ব না। 

৩। গানকে জীবনে ফেরত আনব। গান শেখা ছেড়েছি চোদ্দ বছর হয়ে গেল, কিন্তু গান গাওয়া ছেড়ে এত দীর্ঘদিন কখনও থাকিনি যতদিন দুহাজার ষোলোতে থেকেছি। এ ক্ষতি, এ ভুল শোধরাতেই হবে। আধঘণ্টার জন্য হলেও আমি রোজ রেওয়াজে বসব। দুনিয়া একেবারে এধারওধার না হয়ে গেলে দু’হাজার সতেরোতে রোজ আমি গলা দিয়ে সা বার করব। 

৪। রুটি করতে শিখব। বাড়ির রোজকার রান্না সবই আমি করতে পারি, এক রুটি ছাড়া। রুটিও পারি, তবে সেগুলো রুটি কম পাঁপড় বেশি হয়ে যায়। রুটির জন্য দ্বারস্থ হতে হয় মা তারা-র, পাঁচটাকা পিস, হাতে গড়া, গরম, নরম রুটি। পাঁচ টাকাটা সমস্যা নয়, সমস্যা হচ্ছে পরমুখাপেক্ষিতাটা। কাজেই প্রতিকারের চেষ্টা করে দেখতে হবে। প্রতিকার যে হবে সেটার আশা আছে বলেই আমি রেজলিউশনটা নিচ্ছি। আমি আজীবন চ্যাম্পিয়ন রুটি করিয়েদের মধ্যে বড় হয়েছি। সবাই বলে ভাত রান্না রুটি করার থেকে সোজা, আমার পিসি বলতেন, মা এখনও বলেন, রুটি করা অনেক বেশি সোজা। এঁটোকাঁটার ঝামেলা নেই, জল ঘাঁটতে হয় না, দ্রুত হয়। (সবথেকে বড় কথা, খেতেও বেটার)। রুটি করা যদি এত সোজাই হয়ে থাকে, তাহলে আমার সেটা না পারার কারণ নেই। 

৫। চপস্টিকে স্বচ্ছন্দ হব। প্লেটের শেষতম লেটুস কিংবা এক সেন্টিমিটার দীর্ঘ চাউমিনের টুকরো তুলে খেতে পারার মতো স্বচ্ছন্দ। ইচ্ছেটা অনেকদিনের। ডেলিভারির সঙ্গে কে জানে কবে একজোড়া চপস্টিক এসেছিল। বাড়িতে প্র্যাকটিস করা যাবে ভেবে যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম। তারপর যথারীতি যা হওয়ার তাই হল। সেদিন হাতাখুন্তির তলা থেকে বেরোল। রেজলিউশনের সিজনে চপস্টিকের পুনরাবিষ্কৃত হওয়ার এই সিগন্যালটা আমি অস্বীকার করতে পারলাম না। এতদিন শুধু আমি চাইছিলাম, এখন দৈবও চাইছে। অর্থাৎ সাফল্য নিশ্চিত। কাজেই এবার থেকে বাড়িতে ম্যাগি খেতে হলে চপস্টিক দিয়ে খাব। অর্চিষ্মানের অট্টহাসির পরোয়া না করেই। 


17 comments:

  1. osadharon sob resolution. porei mone jor pachhi. seriously. 2016 r safolyo sune besh bhalo laglo.

    fulkopir torkari, dharonsh, dal er sathe mangsho ta sottyi i barabari. nijeke institute theke fire ranna korte hoi bole eto gulo ranna korar modhye je sahos ta ache ta appreciate korte parchi. e prai heroic feat

    2 to apotti ache jodio. 1) ruti kora soja, ei ta mante chap lagche. je atar guro gulo charpase table e chorie pore, seta mocha sob theke kharap byapar. tobe gorom ruti oi gondho... e deshe ese baking, bhalo bread egulo aro bhalo bujhchi. 2) ar chopstick sotti khub kothin byapar. japan e gie dekhechilam bhater adhkhana tukro tule khachhe. ami o chesta korlam, khanik pore buro angul ar torjoni r connecting jaiga ta te oshojyo byatha suru holo, ki rokom ekta lock hoe gechilo jaiga ta. chopstick e khete hole sathe kung-fu ta sekhao joruri bole amar dharona. :D

    best of luck for 2017.

    sml

    ReplyDelete
    Replies
    1. সেই, টেকনিক্যালি রুটি করা সোজা হওয়ার কোনও কারণ নেই, কিন্তু আমার বাড়ির লোকজন ওইরকমই। সিরিয়াসলি, চপস্টিক দিয়ে লোকে ভাত খায় দেখলে আমারও দারুণ কমপ্লেক্স হয়। ভাত পর্যন্ত না গেলেও, চাউমিন পর্যন্ত আমি যাবই। নতুন বছর আর নতুন বছরের রেজলিউশনের জন্য আমার তরফ থেকেও অনেক শুভেচ্ছা রইল।

      Delete
    2. Ish ei prothom keu bollo ruti karar sab theke baaje byaparta. Ami bhishon hi five dichhi ei commenttake. Aamaaro oi aatar guro counter top theke shuru kore mejhe obdi chhoriye paraatai sab theke biroktikar laage. Kuntala, khub bhalo egochhe tomar resolution rokhha. Rannay to akebare droupadi hoye gele!

      Delete
    3. থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ, অমিতা। রান্নায় দ্রৌপদী একেবারেই হইনি, আমার দৌড় একেবারেই ডাল আর ঢ্যাঁড়সভাজা পর্যন্ত।

      Delete
    4. চপস্টিক দিয়ে যে ভাত খাওয়া হয় সেগুলোকে বাংলায় 'স্টিকি রাইস' বলে আর ইংরাজী নাম 'glutinous rice'. রান্নাও হয় আলাদা ভাবে - রাইস কুকারে মাড়-জারিত হয়ে। যিনি চপস্টিক দিয়ে নুডল খেতে পারেন তিনি সেই রকম ভাত ও খেতে পারবেন।

      বং দেশীয় - হাঁড়ি-জাতক - ফ্যান বিরহিত - ঝরঝরে ভাত চপস্টিক দিয়ে খেতে জ্যাকি চানের প্রপিতামহ-ও পারবেন না।

      Delete
    5. আমার বাড়িতে রাইস কুকার। কাজে চপস্টিকটা সেখানে ব্যবহার করা যাবে মনে হয়। বছরের ফার্স্ট হাফে নুডলসে সড়গড় হয়ে সেকেন্ড হাফে চপস্টিক দিয়ে ভাত খাওয়া ধরব।

      Delete
    6. আপনার ভাতটিকেও একটু আলাদা হতে হবে তার জন্য। নইলে ছড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা প্রবল।।

      https://en.wikipedia.org/wiki/Glutinous_rice

      তবে আপনার এই ঝুঁকি পূর্ণ উদ্যোগকে (পূর্ব এশীয় ভাত দিয়ে) বা দুঃসাহসিক অভিযানকে (সাধারণ বাঙালী আতপ বা সেদ্ধ চালে) আমি কুর্ণিশ জানাই।।

      Delete
  2. Kuntala , amay akta resolution er list banie de, khub darkar !!! tor 2016 er safolye ami khub khushi, :) agami bacharer gulo-o parbi mone hocche!khali attahashyo take thamanor chesta kor !:D tinni

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরে রেজলিউশনের সবার দরকার হয় না, তিন্নি। তোর এমনিই কাজ হবে, এই আমি বলে রাখলাম।

      Delete
  3. Ami na konodin resolution korini etodin. Ebaar mone hocche tomar moton gaan ta ke jibone phiriye anaar resolution ta korbo.
    Tumi rannar post o koro ... tomar recipe lekha porte khub bhalo lagey. Ruti amio bhalo parina.
    Dharosh bhaja r opor ekta post korbo naki? :-)

    ReplyDelete
    Replies
    1. নিশ্চয় নিশ্চয়, শর্মিলা। গানও গাও ঢ্যাঁড়সভাজার পোস্টও ছাপো।

      Delete
  4. Tor last resolution ta amar anek diner ichha ... jakhon i chopstick diye khete shuru kori 10 min pore haath byatha hoye jay ... ekta set kine o rekhechi barite dhatoshtho hobo bole .. kintu jakhon darkar takhon sei fork ase haathe ... Tor 2016 r resolution gulo complete korechis jene abhinandon !!! .. aar hya .. Happy Birthday !!

    ReplyDelete
    Replies
    1. কী কাণ্ড, তোর মনে আছে বৈশালী? থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ। চপস্টিক দিয়ে খেতে আমি শিখবই এ বছর।

      Delete
  5. Ami ruti banate pari na, gaan gaite pari na, chopstick diye boro boro sushi chhara kichu kheteo pari na.Tobe tomar blog pore sahosi hoye er modhye ekta kichu kore felte ichche korche. Also, e bochhor gari chalano ta shikhtei hobe. Hobei.

    ReplyDelete
    Replies
    1. অল দ্য বেস্ট, বিম্ববতী। তারপর লং ড্রাইভে সোজা পাহাড়।

      Delete
  6. Kuntala, du tinte tuccho prosongo chilo. Amar phone 9880041299 ar email anagx@outlook.com. Jetate subidhe, ektu contact kora sombhob?

    ReplyDelete
    Replies
    1. নিশ্চয়। আমি মেল করছি আপনাকে।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.