October 31, 2016

বইকথা ওয়েব ম্যাগাজিন/ ছোট গল্প 'উৎসর্গ'



ব্রিফ ছিল বই, লেখক বা কবিকে নিয়ে লেখার। শব্দসীমা ছিল না, তবে দু’হাজার শব্দের মধ্যে হলে ভালো।

কবি সম্পর্কে লেখার ধৃষ্টতা আমার নেই। বই সম্পর্কে লেখা যেত, কিন্তু শেষে ভেবে দেখলাম লেখককে নিয়ে লেখাই সবথেকে সহজ। বিশেষত লেখক ব্যাপারটার প্রতি যখন আমার আগ্রহ আছে। লেখক কী ভাবে লেখেন, কী ভেবে লেখেন এই নিয়ে যখন আমার মারাত্মক কৌতূহলই আছে। আর বইয়ের শুরুতে থাকা ওই উৎসর্গের পাতাটা নিয়েও। সব খাটুনিটা নিজে খেটে  সে লেখা একেতাকে উৎসর্গ করতে লেখকের কেমন লাগে সেটা নিয়েও। একদিক থেকে দেখলে সব লেখা কি নিজেকেই উৎসর্গ করা উচিত নয়? আফটার অল, গোটা খাটুনিটা তো নিজেকেই খাটতে হল। শুধু খাটতেই হল না, লজ্জাঘেন্নার মাথা খেয়ে সে লেখাকে পাঠকের দরবারে প্যারেডও করাতে হল। প্রশংসা পেলে প্রশংসা, পচা ডিম পেলে পচা ডিম। 

তবু কোনও লেখকই নিজেকে নিজের বই উৎসর্গ করেন না। কেন করেন না? কেন তাঁর এত সাধনার ধন নিজেকে বাদ দিয়ে বিশ্বশুদ্ধু সকলকে উৎসর্গ করতে ছোটেন? আমার সন্দেহ এর মধ্যে একটা সামাজিকতার ব্যাপার আছে। মাবাবা স্বামীস্ত্রী ছেলেমেয়েকে বই উৎসর্গ করতেই হয়, না হলে লোকে খারাপ ভাবে। 

কিংবা হয়তো সত্যিই লেখক বিশ্বাস করেন তাঁর বই লেখার পেছনে শুধু তাঁর খাটুনি নয়, অন্য অনেক মানুষের অবদান আছে। এই ব্যাপারটা নিয়েও আমার কৌতূহল আছে। লেখকের লেখার ক্রেডিট আসলে কার? লেখক কি নিজে আদৌ লেখেন? নাকি অন্য কেউ তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়? সে কে? 

‘বইকথা’ ওয়েব ম্যাগাজিনের প্রথম সংখ্যার জন্য যখন লিখতে বলল আমাকে অরিন্দম, তখন এইসব কথাই আমার মাথায় এল। আর লেখা হল ‘উৎসর্গ’ নামের একটি ছোট গল্প। দু’হাজারে হল না, প্রায় তিন হাজার শব্দ হয়ে গেল। 

এই রইল ‘বইকথা’র লিংক।  


আর এই রইল আমার গল্পের লিংক। 


যদিও অবান্তরকে ফাঁকি দিয়ে লেখা, তবু অবান্তরের পাঠকরা গল্পটা পড়লে আমার ভালো লাগবে। 


October 29, 2016

সাপ্তাহিকী



পৃথিবীর বৃহত্তম জীবন্ত জিনিস। নীল তিমির থেকে কত গুণ বড় তা হিসেব কষার উৎসাহ নেই। তবে এটুকু বলতে পারি চার বর্গ মাইল জুড়ে জিনিসটা থাকে। 

আমার চেনার মধ্যে একজনের এক মহিলা বস্‌ শনিরবিবার কিংবা ছুটির দিন কিংবা অফিসটাইমের বাইরে ইমেলের উত্তর দিতেন না। স্কাইপ মিটিং-এ রাজি হতেন না। মহিলাকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করত। বলত, অদ্ভুত। আমি বলতাম তাহলে পৃথিবীর সবারই অদ্ভুত হওয়া উচিত। ঘটনাচক্রে, মহিলা ফরাসি।



Brett pulled his tank top up over his head and stared at himself in the full-length mirror. He pushed down his jeans, then his boxers, and imagined the moment when Jennifer saw him nude for the first time. His feet were average-sized, and there was hair on his toes that he should probably take care of before tonight. He liked his legs just fine, but his thighs were wide and embarrassingly muscular. He tried standing at an angle, a twist at his waist. Some improvement. In that position, it was easier to see his ass and notice that it was not as pert as it had been at 22. He clenched both cheeks, hoping that tightened its look. He sucked in his tummy and pulled his pecs up high, trying to present them like pastries in a bakery window. Would she like him? Were the goods good enough? He pouted his lips and ran his hands over his thighs, masking their expanse. Maybe.

“… a 6-year-old girl and a male fetus were killed in the same car crash, the settlement for the fetus was calculated to be up to 84 percent higher than the girl’s, according to court records.”

এ রকম উইন্ডো সিট পাই তো বর্তে যাই। 

এ সব ব্যক্তিত্বচিহ্নিতকরণের খেলা অনেকটা রাশিফলের মতো। যা-ই বলুক না কেন, মনে হবে মিলে গেছে। বা এমন কিছু বলবেই, যেটা মিলবে। তবু টাইমপাসের জন্য খেলা। এটা ওই এবিসিডি খেলাটার একটা উন্নততর সংস্করণ। এরাও তাই তাই বলেছে যা বাকি সবাই বলে। আমি অন্তর্মুখী, ইমপালসিভ, প্রকৃতিপ্রেমী, মুখচোরা, ভীতু এবং লিডারশিপের উল্টো যা যা গুণ হয়, হতে পারে, হওয়া সম্ভব, সব আমার মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু এরা আরেকটা কথা বলেছে, যেটা অন্য খেলা বলেনি। ইন ফ্যাক্ট, এরা বলেছে পারসেন্টেজের হিসেবে আমি ওইটাই সবথেকে বেশি, বাকি সব বৈশিষ্ট্যের তুলনায়। আমি একমত। আমার মাথার ভেতরটা যদি আপনি দেখতে পেতেন তাহলে আপনিও একমত হতেন। 



October 26, 2016

৮, প্রিন্স আলব্রেশটস্ট্রাসে



উইলহেলমস্ট্রাসে আর স্ট্রেসেমানস্ট্রাসে। A অক্ষরের দুটো হাতের মতো এক বিন্দু থেকে দুদিকে বিস্তৃত। তফাৎ একটাই যে A-র পেট মোটে একবার কাটা থাকে, এখানে একাধিক। সবথেকে ওপরের পেটকাটা লাইনটার নাম আনহল্টারস্ট্রাসে। এই রাস্তা যেখানে স্ট্রেসেমানস্ট্রাসে গিয়ে জুড়েছে সেই বিন্দুতেই আমার হোটেল। আর দ্বিতীয় যে পেটকাটা রাস্তাটা, আনহল্টারের নিচে কাজেই আনহল্টারস্ট্রাসের থেকে লম্বা, উইলহেলম আর স্ট্রেসেমানকে জুড়েছে সেটার নাম হচ্ছে নিডারকিরশনারস্ট্রাসে। 

এই নিডারকিরশনারস্ট্রাসে আর উইলহেলমস্ট্রাসের মোড়ে একসময় একটা মস্ত প্রাসাদ ছিল। সেখানে থাকতেন প্রাশিয়ার রাজপুত্র প্রিন্স অ্যালবার্ট। তাঁর নামে এই রাস্তার নাম রাখা হয়েছিল প্রিন্স আলব্রেশটস্ট্রাসে। সেই রাস্তার নম্বর প্লটে উনিশশো পাঁচ সালে মিউজিয়াম অফ ডেকোরেটিভ আর্টসের বাড়ি বানানো হয়। উনিশশো তেত্রিশ থেকে মিউজিয়াম ব্যবহার হতে শুরু করে গেস্টাপো আর নাৎজি পার্টির সিক্রেট পুলিশের (শুৎজস্টাফেল বা এস এস) অফিস হিসেবে। উনিশশো চৌত্রিশে এই বাড়িতে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ইন্সপেক্টোরেট-এর হেডঅফিস খোলা হয়, যাদের কাজ হচ্ছে দেশের এবং অচিরেই বিদেশেরও কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের দেখাশোনা। উনিশশো ঊনচল্লিশে এ বাড়িতে রাইখ মেন সিকিউরিটি অফিস বসে। উনিশশো পঁয়তাল্লিশে মিত্রশক্তির বোমায় ৮ নম্বর প্রিন্স আলব্রেশটস্ট্রাসে উড়ে যায়। দুটো এরিয়াল ভিউ পাশাপাশি দেখা বেশ একটা গায়ে কাঁটা দেওয়া ব্যাপার। এই ছবিতে অট্টালিকা গাছ রাস্তা জমজমাট, ওই ছবিতে ফাঁকা। 

এখন ওই জায়গাটা অবশ্য একেবারে ফাঁকা নেই। একপাশে খানিকটা বার্লিন দেওয়াল, যার দেওয়ালে লাল রং দিয়ে কেউ লিখে গেছে WHY আর পায়ের তলায় ৮, প্রিন্স আলব্রেশটস্ট্রাসের বেসমেন্ট (কিংবা একতলার) ভাঙাচোরা খানিকটা। বাকি জমিটায় একটা বাড়ি। গাইড ঠিকই বলেছিলেন, মডেস্ট বিল্ডিং। দেখলে সুপারমার্কেট বলে মনে হওয়া বিচিত্র নয়। বাড়িটা আসলে একটা ডকুমেন্টেশন সেন্টার। স্থায়ী, অস্থায়ী দু’রকমেরই প্রদর্শনীর ব্যবস্থা আছে। আমরা দেখলাম সেন্টারের সবথেকে পরিচিত এবং স্থায়ী প্রদর্শনীটা। যার নাম এই জায়গাটা, এই বাড়িটা, এই তিনকোণা প্লটের ফালিটার সঙ্গে আশ্চর্যজনক রকম খেটে যায়। 

টোপোগ্রাফি অফ টেরর। 

প্রদর্শনী মূলত তৈরি উনিশশো তিরিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ পর্যন্ত তোলা ছবি দিয়ে। বীজবপন থেকে ধ্বংস। চট করে ভাবলে মনে হতে পারে লেখার থেকে ছবি ইতিহাসের অনেক বেটার, অনেক বেশি ভরসাযোগ্য মাধ্যম, কিন্তু তা নয়। কারণ সবার হাতে ক্যামেরা থাকে না। আর কার হাতে ক্যামেরা থাকবে সেটা একটা বিরাট তফাৎ গড়ে দেয়। কে ছবি তোলে আর কার/কীসের ছবি তোলা হয় সেটা একটা মারাত্মক গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতি।

শুরুর দিকের ছবিগুলো রীতিমত চনমনে। নাৎজি পার্টির পার্টি। বিয়ারের পিপের পাশে উল্লসিত জনতা। একজনের মাথার পেছনে অন্যজনের আঙুলের শিং। তারপর ইউনিফর্ম, পদমর্যাদা বুঝে আগুপিছু দাঁড়ানো। হাতে বিয়ারের গ্লাসের বদলে ব্যাটন। মুখে উল্লাসের বদলে কঠিন সংকল্প। পার্টি আর পুলিশ মিলেমিশে একাকার।

আরেকরকমের ছবিও পাশাপাশি চলে। ন্যায়ের ধারক হিসেবে নাৎজি পার্টির উত্থান। ভণ্ড, জালিয়াত ব্যবসাদারদের ধরে গরুর পিঠে চড়িয়ে রাস্তায় হাঁটানো হচ্ছে। গলায় ঝোলানো প্ল্যাকার্ডে কী লেখা আছে আমি পড়তে পারিনি, তবে প্রশংসাসূচক কিছু হওয়ার সম্ভাবনা কম। চারপাশে দল বেঁধে হাসতে হাসতে চলেছে সাধারণ মানুষ। মাবাবা ছেলেপুলে কাকাপিসে মাসিপিসি। গরুর পিঠে লাঞ্ছিত, অপমানিত শোষক দেখে তাদের উল্লাসের সীমা নেই। এরাই ময়দানে ভিড় করে এসেছে সভা দেখতে। হাতের প্ল্যাকার্ড উঁচু করে ধরেছে। ওয়েক আপ জার্মানি। 

ছবি বদলায়। সারা দেশ জুড়ে ক্যাম্প তৈরি হচ্ছে, সেখানে সব অপোগণ্ডকে পোরা হবে। যারা বসে বসে খায় তাদের খেটে খেতে বাধ্য করা হবে। শুধরে গেলে ছেড়েও দেওয়া হবে। কী মহৎ প্রচেষ্টা। কিন্তু এত ক্যাম্প কেন? এত বড় বড় ক্যাম্পই বা কেন? এত অপোগণ্ড কি আছে দেশে? আরে রোসো। সাপ্লাই উইল ক্রিয়েট ইটস ওন ডিম্যান্ড। যারা অলস, যারা পাগল, যারা দুর্বল, যারা হোমোসেক্সুয়াল, যারা ইহুদি, যারা পুরুষ কিংবা নারী কিংবা শিশু . . .  

বেসিক্যালি, যারা আমরা নয় তারাই অপোগণ্ড। আমরা যাদের অপোগণ্ড বলে দাগিয়ে দেব তারাই অপোগণ্ড। 

আরেকটা ছবি। গর্তের নিচে জমা হয়েছে মৃতদেহ, গর্তের ধারে উবু হয়ে বসা একটা লোক, লোকটার মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বীরের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে উর্দিপরা যুবক। পেছনে, যথারীতি, একদল দর্শক। গর্তের মৃতদেহ আর যুবকটির এক্সপ্রেশন যথাযথ। পেছনের দর্শকদের মুখে তেমন কোনও, অন্তত শুরুর দিকে যেমন ছিল, উচ্ছ্বাস নেই। দেখে দেখে সয়ে এসেছে। যার মাথায় বন্দুক ঠেকানো হয়েছে তার অতীত আমরা জানি না। তার ভবিষ্যৎ জানি, সেও জানে, দু’হাত সামনে, গর্তের তলায়। ও রকম ভবিষ্যৎ চোখের সামনে দেখতে কেমন লাগে আমার জানা নেই, তাই বোধহয় তার মুখে আমার চেনা কোনও অনুভূতি নেই। 

কোনও ছবিই ভোলার মতো নয়। কোনও মুখই ঝাপসা হওয়ার নয়। তবু সবথেকে বেশি মনে থেকে যায় ওই ভিড়ের চেহারাটা। নেতাদের পেছনে, মৃতদেহের চারপাশে। পঁয়তাল্লিশের পর যখন উল্টো মার শুরু হবে তখন যারা দু’হাত তুলে বলবে, আমরা একজন ইহুদিকেও মারিনি কাজেই আমরা নাৎজি নই। মারতে হলে ওদের মার, ফাঁসি দিতে হলে ওদের দাও। আমরা শুধু ন্যায়বিচারের সময় হাততালি দিতে দিতে পাশে হাঁটছিলাম, জাগো জার্মানি প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে মিছিলে যাচ্ছিলাম। আমাদের হাতে কোনও রক্ত নেই। আমাদের বিবেকে কোনও দাগ নেই। 

রাস্তায় নেমে হাততালি দেওয়ার দরকার নেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখে ফেনা তোলারও দরকার নেই। নিজের ঘরের নিরাপত্তায়, নিজের ইমেজ বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে, ঘরের জামা পরে, ঘরের কাপের চায়ে চুমুক দিতে দিতে, পা নাচাতে নাচাতে যদি কখনও বলি, ওরা ওইরকমই, ওদের বড় বাড় বেড়েছে, অনেক হয়েছে এবার পে ব্যাক টাইম, তাহলে আমিও ওই ছবিতে আছি।


October 22, 2016

সাপ্তাহিকী





রেডি হওয়ার সময় মনে পড়ে না। সেমিনারের দরজা ঠেলে কালো আর ধূসর, নিউট্রাল আর প্রফেশনাল সমুদ্রে পা দিয়ে আমার মনে পড়ে রং নির্বাচনে আবারও ভুল হয়ে গেল। আমাকে দেখে বেশিরভাগেরই নিশ্চয় এই কথাটাই মনে হয়। কপাল ভালো তাঁরা মনের কথা মনেই রাখেন। হাতে গোনা কেউ দৌড়ে এসে বলে, হয়তো ইয়ার্কি করেই, আই লাআআআভ ইন্ডিয়ান ক্লোথস। শুনে আমি খুশি হই। হাঁফ ছেড়ে ভাবি, যাক বাবা, হাল্লারাজা সেজে এসে তেমন ক্ষতিও হয়নি তার মানে।

ছবিতে আমার সঙ্গে আমার বন্ধু মাথিয়াস। 

*****
Traits don't change, states of mind do.
                                                                ― Elizabeth StroutOlive Kitteridge

 
Why do anything? (নিউ ইয়র্ক টাইমস)


আমি এঁকেফিমেল শিন্ডলারবলব না। আমি বরং এঁকে আইরিন সেন্ডলার বলেই জানব যিনি আড়াই হাজার ইহুদি বাচ্চার প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। 


ছবি



ভিডিও

Borrowed Time.




October 21, 2016

ছবিহীন বার্লিন/ ১



হোটেলে ঢোকার মুখে দেখেছিলাম রাস্তার ওপারে একটা ভাঙাচোরা সিংদরজা। সামনে থামওয়ালা একটা ঢাকা বারান্দা। মেঘলা আকাশের গায়ে ভাঙা মাথাটা কালো, পোড়া। দেখলেই বোঝা যায় একে সময় ভাঙেনি, ভেঙেছে মানুষ। বা মানুষের হাতে তৈরি বোমা। ভেবেছিলাম যদি এদিকমুখো ঘর পাই তাহলে ‘ভিউ’ ক্যাপশন দিয়ে সিংদরজাটার ছবি দেব অবান্তরে। 

ঘরে ঢুকে দেখলাম জানালার নিচে একটা পার্কিং লট, লট পেরিয়ে আরেকটা গগনচুম্বী হোটেলের গা, গা বেয়ে হু হু করে নামছে স্বচ্ছ সার্ভিস এলিভেটর। এলিভেটরের ভেতর একজন গাঁট্টাগোট্টা মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন হলুদ ট্রলিতে আলগোছে হাত রেখে। ট্রলির বিভিন্ন খোপে ঝাঁটা, সারি সারি ক্লিনিং লিকুইডের বোতল সাজানো। 

ঘরের ভেতরটাও মন ভালো করার মতো কিছু নয়। ভিট্রুভিয়ান ম্যান হয়ে শোওয়ার মতো খাট, খাটে দুধসাদা চাদর, ফুলকো বালিশ, উষ্ণ লেপ। পড়ার টেবিল, বসার এবং লোক বসানোর সোফা, আড়াল দিয়ে একখানা মাইক্রোওয়েভ আর ছোট্ট ফ্রিজ, ইলেকট্রিক কেটলি আর চা ব্যাগ। ঘরের বিভিন্ন কোণে মুড লাইটিং। এমন সাউন্ডপ্রুফিং যে কানের মধ্যে নীরবতা বুজকুড়ি তোলে। শীতল, কঠিন আরাম ঘিরে রয়েছে চতুর্দিক। এ আরামকে সহনীয় করে তুলতে পারে একমাত্র স্কাইপ। কিন্তু হাতের ঘড়ি বলছে দিল্লিতে এখন ভরা অফিসটাইম। এখনও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।  

দূরছাই বলে জানালা থেকে সরে আসতে যাব এমন সময় বাঁ দিকের মেঘ চিরে চিরে রোদ্দুর বেরোলো। তার আলোয় চকচক করে উঠেছে একটা হলুদ বাড়ির তিনকোণা কালো ছাদ, ছাদ ফুঁড়ে ওঠা লোহার ঢাকনা পরানো চিমনি। 

এই ছবিটাও তো দেখানোর মতোই ভেবে ফোনটার খোঁজ করলাম। এত কম সময় বলে ক্যামেরা আনিনি। ফোনে তোলা ছবিই অবান্তরে ছাপাব। ব্যাগের যেখানে ফোনটা থাকার কথা ছিল সেখানে নেই। যেখানে থাকার কথা ছিল না, সেখানেও না। প্লেন থেকে নামার সময় ছিল। পাসপোর্টের সঙ্গেই। পাসপোর্টটা ছিল ব্যাকপ্যাকের বাইরের ফ্ল্যাপে। হোটেলে ঢুকে রিসেপশনে সেটা দেখানোর সময় ব্যাকপ্যাক থেকে বার করতে গিয়ে দেখেছিলাম ফ্ল্যাপটা খোলা। নিজেকে বকেছিলাম এত বেখেয়াল হওয়ার জন্য। 

পাসপোর্টটা ছিল। এখনও আছে। ফোনটাও ছিল। এখন ফোনটা নেই।  

ফোনটা আমার এখানে কোনও কাজে লাগত না। রবিবার ভোরে এয়ারপোর্টে অর্চিষ্মানকে খুঁজে বার করতে লাগবে। কিন্তু তার এখনও দেরি আছে। তাছাড়া খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করলে দেখা হয়েই যাবে দুজনের। এ ফোনটা পুরোনোও হয়ে গিয়েছিল। বার দুয়েক হাত থেকে পড়ে স্ক্রিনটা ফেটে গিয়েছিল। একটা কোনও সেন্সর খারাপ হয়ে গিয়েছিল যার জন্য কল চলাকালীন স্ক্রিন অন্ধকার থাকত। অপর পক্ষ ফোন না কাটলে আমি ফোন কাটতেও পারতাম না। 

ফোনটা আমার এখন লাগত শহরের ছবি তুলতে। সে ছবি তোলা হবে না। ছবি ছাড়া বেড়ানোর গল্প কেমন হবে? 

*****

এদিকে এখন বেশ শীত। দশের নিচে। তার মধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে রোজই। সেই বুঝে একটা ছাতা এনেছিলাম। আমস্টারডামের  এয়ারপোর্টে সে ছাতা ধরা পড়ল। ভদ্রমহিলা মাথার ওপর ছাতা খুলে ঝাঁকিয়ে পরীক্ষা করলেন। সারাদুপুর জানালা দিয়ে মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে ফোনের শোকপালন করলাম। সন্ধ্যে ছ’টায় খেতে যাওয়া হল। হাঁটতে হাঁটতে সেই সিংদরজাটা পেরোলাম। এখানকার গাছে এখন ‘ফল কালারস’। প্লেন থেকে নামার সময় দেখেছিলাম সারা শহরটা লাল হলুদ রঙে ছেয়ে গেছে। সেই রং লাগা একটা গাছ সিংদরজাটাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। আমার পাশে পাশে হাঁটছিল টি। এর ষাট বছরের জন্মদিন পালন করেছিলাম আমরা দু’হাজার তেরোয়, কেক কেটে, মোমবাতি জ্বালিয়ে। স্ত্রীর সঙ্গে জার্মানি আর পোল্যান্ডের বর্ডার বরাবর দু’সপ্তাহের বাইক রাইড হলিডে পালন করে টি-ও আজকেই বার্লিন এসে পৌঁছেছে। টি আমাকে সিংদরজাটা দেখিয়ে বলল, এইটা ছিল আসল আনহল্টার বানহফ স্টেশন। (এখনও ওই নামের স্টেশন আছে, ওটাতেই আমি এসে নেমেছি ট্রেন থেকে। সে আধুনিক কলকব্জামণ্ডিত ঝকঝকে স্যানিটাইজড স্টেশনে সব আছে, এই ভাঙাচোরা সিংদরজার ঔদ্ধত্য আর গরিমাটা ছাড়া) এ ঢিলএকসময়ের ইউরোপের প্রকাণ্ডতম টার্মিনাস। তারপর যুদ্ধে বোমা পড়ে এর এই দশা হল। 

টি বলল, আমরা এখন যেখানে আছি, সেখানটা হচ্ছে জার্মান ইতিহাসের - টি থেমে যোগ করল, “গুড অ্যান্ড ব্যাড” - একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ব্র্যান্ডেনবুর্গ গেট,  রাইখস্ট্যাগ (পার্লামেন্ট) বিল্ডিং, বার্লিন প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ, হিটলারের বাংকার সব হাতের নাগালের মধ্যে। হোটেল থেকে সাড়ে চারশো মিটার হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম গুস্তাভ রেস্টোর‍্যান্টে আমাদের ওয়েলকাম ডিনারের জন্য।

সাড়ে চারশো মিটার? পাতা উল্টে গুগল ম্যাপের স্টিল শট দেখে অর্চিষ্মান চোখ কপালে তুলেছিল। এ কী রকম লজিস্টিকস বুকলেট? এই বুকলেট আমাদের কাছে পৌঁছেছিল মাসখানেক আগেই। যে সাড়ে তিনদিন আমরা এদের আতিথেয়তায় থাকব, সেই সাড়ে তিনদিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ শেডিউল। সকালে ব্রেকফাস্ট থেকে শুরু করে হলে জড়ো হওয়ার সময় থেকে শুরু করে কোন রাস্তায় কতখানি হেঁটে মিউজিয়াম, সেমিনার হল, বাসে চড়ার সময়, মাঝখানে লাঞ্চ ব্রেকে আবার কোন রাস্তায় কতখানি হেঁটে রেস্টোর‍্যান্ট, রাতে সাংস্কৃতিক শো দেখতে যাওয়ার সময় আবার কোন রাস্তা, কোন বাঁক, ক’পা সব লিখে ছবি এঁকে বুঝিয়ে দেওয়া। 

এবার তো তাও কম। এমনও ঘটেছে যে এক মাস আগে লাঞ্চের মেনু এসে পৌঁছেছে জিমেলে। টিক দাও কী খাবে, মাছ না মাংস। ডিপ ফ্রায়েড না স্টিমড। গ্লুটেন ফ্রি না লো প্রোটিন। যারা ফ্রি স্পিরিট তাদের হয়তো এত বাঁধাবাঁধিতে অসুবিধে হতে পারে। আমার হয় না। এরা যত বেশি ভাববে আমাকে ভাবতে হবে তত কম। আমার সারাজীবনের একটা বুকলেট কেন কেউ আমার মায়ের হাতে ধরিয়ে দেয়নি নার্সিং হোম থেকে বেরোনোর সময়, সেটাই আমার সবথেকে বড় নালিশ। 

তা বলে একেবারেই কি গোলমাল হয় না? কোনও কারণে যদি একটা ধাপ ভুল হয় তাহলেই তাসের ঘরের মতো পুরো প্ল্যান ভেঙে পড়তে থাকে। আসার সময় আমার কথা ছিল বাস ধরে ব্র্যান্ডেনবুর্গ আসার, সেখান থেকে ট্রেন নিয়ে আনহল্টার বানহফ। বাসে বসে চারদিক দেখতে দেখতে আসছি, বৃষ্টির জলে ধোয়া গাছের পাতা, পাথরের রাস্তার খাঁজে খাঁজে জমা ছোট জলের পুল, উঁচু দোকান, নিচু বাড়ি, পার্ক, মিউজিয়াম, দেওয়ালের আড়ালে কনস্ট্রাকশন সাইটে আকাশ ছোঁয়া জার্মান ক্রেন। মন দিয়ে দেখছিলাম, কারণ এবার এত কম সময়ের জন্য আসা যে ঘোরাঘুরির সময় প্রায় হবেই না। এমন সময় মাইকে ড্রাইভার জার্মান ভাষায় বক্তৃতা শুরু করলেন। পাশের সহৃদয় মেয়েটি আমাকে সেটা অনুবাদ করে দিল। ব্র্যান্ডেনবুর্গে কী একটা মিটিং হচ্ছে তাই রুট ঘুরিয়ে দেওয়া হল। 

হয়ে গেল আমার শহর দেখা। কাঠ হয়ে বসে সামনের বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকলাম যেখানে আমার নতুন স্টপেজের নাম ফুটে উঠবে। পাশ দিয়ে হুস হুস করে বেরিয়ে যেতে লাগল লালহলুদ পাতা, পাথরের খাঁজে জলের পুল, উঁচু দোকান, নিচু বাড়ি, পার্ক, মিউজিয়াম, জার্মান ক্রেন। নিজেই বুঝতে পারছিলাম এত টেনশনের কিছু হয়নি। বোর্ডের লেখার সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণাও হবে আর জার্মানে ঘোষণা হলেও স্টেশনের নাম আমার কান চিনতে পারবে। নিজেকে জোর করে জানালার দিকে ঘাড় ঘোরাতে বাধ্য করলাম। আর যেই না করলাম অমনি দেখি একটা উঁচু বাড়ি হুস করে বেরিয়ে যাচ্ছে যার মাথায় বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে B E H A L A। 

                                                                                                                             (চলবে)


October 18, 2016

চা + বই




এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে আবার ছুটি কেটে ফেরৎ আসা? আমার ডিরেক্টর এ জিনিস আশা করবেন না, কিন্তু এটা অফিস নয়, অবান্তর। যে কাজটার জন্য ছুটি চেয়েছিলাম সেটা ঘাড়ের ওপর খাঁড়ার মতো ঝুলে আছে এখনও, কিন্তু যে ভেবেছিলাম ফাঁকে ফাঁকে একটুও সময় বার করতে পারব না, সেটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।  তাই এই পোস্ট। হয়তো এই একটাই ছাপতে পারব, কিংবা আরও দু’চারটে, কিছু বলা যায় না। ছুটির আবেদনটা বলবৎ রইল।

এই ট্যাগের আইডিয়া এসেছে, আমার বইসংক্রান্ত সব আইডিয়াই আজকাল যেখান থেকে আসে, সেই বুকটিউব থেকে। আমার বই ভালো লাগে, চা বাড়াবাড়ি রকম বেশি ভালো লাগে। কিন্তু এ দুটোর থেকেই যেটা বেশি ভালো লাগে সেটা হচ্ছে চা খেতে খেতে বই পড়তে। তাই দুটোকে মিলিয়েমিশিয়ে দেওয়ার আইডিয়া দেখে লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। 

*****

রাস্তার ধারের ফোটানো চা। এ জিনিস বাড়িতে রেপ্লিকেট করা অসম্ভব। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত দোকানে রেপ্লিকেট করা অসম্ভব। মোড়ে মোড়ে পাওয়া যায়। স্বাদের রেঞ্জ বিরাট। কোনওটা ভীষণ ভালো কোনওটা না খেলেই হত। কিন্তু ব্যাপারটা এমন সর্বব্যাপী যে খাওয়াটা অলমোস্ট বাধ্যতামূলক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বই ছাড়া এই মুহূর্তে কারও কথা মনে পড়ছে না। 

ইংলিষ ব্রেকফাস্ট/ দার্জিলিং চাঃ কেউ বলতে পারে বোরিং, আমি বলব যখনই খাও যেখানেই খাও যেভাবেই খাও, ভালো লাগবেই। আমার জন্য এঁরা আগাথা ক্রিস্টি আর সত্যজিৎ রায়। যা লিখেছেন সব।

গ্রিন টিঃ এ চা খাওয়ার সঙ্গে ভালো লাগার কোনও সম্পর্ক নেই। রোগা হতে চাইলে খেতে হয়। যে কোনও পাঠ্য বই আর  সেলফ হেল্প বই এ গোত্রে পড়বে। 

হানি জিঞ্জার লেমন টি। এটাও স্বাস্থ্যের জন্যই খায় লোকে। কিন্তু গ্রিন টি-র সঙ্গে তফাৎটা হচ্ছে যে জিনিসটা খেতেও ভালো। খেলে মন পেট মাথা তিনটেই ঠাণ্ডা হয়ে আসে। এ রকম বই নিশ্চয় অনেক আছে কিন্তু সম্প্রতি এলিজাবেথ স্ট্রাউটের লেখা ‘অলিভ কিটরিজ’ পড়ার পর ওই নামটাই বলতে ইচ্ছে করছে। অক্টোবর মাসের বইয়ের তালিকায় এই বইটির কথা বিশদে থাকবে। 

লেমন মসালা টিঃ এই বস্তুটি নিশ্চয় নানারকমের হয়, আমি রাজুদার দোকানেরটার কথাই বলি। চা, চিনি, লেবু, জিরা মসালা, আমলকি, বিটনুন, চাট মশলা এবং আরও গোটাতিনেক সিক্রেট অনুপান মিলিয়ে টোটাল পয়সা উশুল। এর তুলনা নিঃসন্দেহে হ্যারি পটার।

আইস টিঃ শুরুতে ভালোই, মাঝপথ থেকে পুরো জল। ড্যান ব্রাউনের বই। আলাদা আলাদা বইগুলো তো বটেই, গোটা সিরিজটার সম্পর্কেও এই উপমাটা খেটে যায়। দা ভিঞ্চি কোড বেশ উপভোগ করেছিলাম। তারপর থেকে মান ক্রমশ পড়তে শুরু করেছে। ইনফার্নো শেষ করতে পারিনি। 

*****

ওপরের চা-গুলোর নাম শুনলে আপনার কোন কোন বইয়ের কথা মনে পড়ে জানার আগ্রহ রইল।


October 17, 2016

গুজরাট ভবন



লাঞ্চে যাওয়ার আগে কাজ তুলে রেখে এদিকওদিক করছি, ফোনে আলো জ্বলে উঠল। একদিকে সবুজ ফোন, একদিকে লাল কাটাচিহ্নর মাঝখানে অর্চিষ্মানের নাম। আমি ফোনের ওপরদিকে ডানকোণে তাকালাম। ১২ টা ২৫।

এখন অর্চিষ্মানের ফোন করার কথা নয়। ওর ফোন করার কথা ১ টা ২৫-এ। ফোন করে জিজ্ঞাসা করার কথা, কী খেলে? তখন আমার বলার কথা, রুটি আর ভিন্ডি/সীতাফল/লাউকি/সয়াবিন। তারপর উল্টে জিজ্ঞাসা করার কথা, তুমি? তখন ওরও বলার কথা, রুটি আর ভিন্ডি/সীতাফল/লাউকি/সয়াবিন। তারপর আমাদের দুজনেরই বিতৃষ্ণায় খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার কথা, তারপর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে, ঠিক আছে? ঠিক আছে। বলে ফোন ছেড়ে দেওয়ার কথা।

আমি ওর নামটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম কোনও খারাপ খবরের জন্য আমার তৈরি হওয়া উচিত নাকি। যা হওয়ার কথা তার বদলে অন্য কিছু হলে নির্ঘাত কিছু খারাপই ঘটেছে এইটা আঁচ করে নেওয়ার অভ্যেস অনেকের থাকে। আমার মায়ের আছে। মায়ের সঙ্গে আমার দৈনিক কথাবার্তার একটা রুটিন এইরকম। সকালে উঠেই, মানে ঠিক উঠেই না, মাকে ঘুম থেকে ওঠার সময় দিয়ে, এই ছ’টা নাগাদ, আমি মাকে ফোন করি। গুড মর্নিং বলি, আগের দিন কিছু ইন্টারেস্টিং ঘটেছে কি না, আজ কিছু ইন্টারেস্টিং ঘটার আশা আছে কি না খোঁজখবর নিই। সাড়ে আটটা নাগাদ অফিসে পৌঁছে একবার চট করে পৌঁছসংবাদটা জানিয়ে দিই। মা যদি সে সময় বাই চান্স ফোনের সামনে না থাকেন, বাবা ফোন তুলে গম্ভীর গলায় বলেন, ‘অ্যারাইভাল নোটেড’। বেলা এগারোটা নাগাদ ভদ্রতারক্ষার্থে মা একবার আমাকে ফোন করেন। দুটো থেকে চারটের মধ্যে, যে সময়টা চোখ আর খোলা রাখা যাচ্ছে না, কখন কে কোনদিক থেকে এসে মুচকি হেসে, ‘হ্যাভ আ কাপ অফ টি, কুন্তলা’ বলে চলে যায় সেই ভয়ে আরেকবার মাকে ফোন করতে হয়। এর বাইরে খবরের কাগজে বা টিভিতে হাস্যকর কোনও খবর পড়লে বা দেখলে, আলমারি গোছাতে গিয়ে পুরোনো খাতা, বউটুপি বেরিয়ে পড়লে, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে ঘুরে এলে ফোনাফুনি হয়। ব্যস। 

এরও বাইরে কখনওসখনও বসের বকা খেলে বা অবান্তরে কমেন্ট না পড়লে আমার মায়ের গলা শুনতে ইচ্ছে করে। তখন ফোন তুলে মা এমন গলায় 'কী হয়েছে, সোনা?' বলেন যেন মনে হয় উনি একটা অগ্নুৎপাত কিংবা জলোচ্ছ্বাস অনুমান করছেন। তাতে সুবিধেই হয় অবশ্য। পারস্পেক্টিভ পরিষ্কার হয়ে যায়। অগ্নুৎপাত কিংবা জলোচ্ছ্বাসের পাশে আমার হৃদয়ভঙ্গের অকিঞ্চিৎকরতাটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আমার মায়ের থেকেও খারাপ একজন ছিলেন আমাদের চেনাশোনার মধ্যেই। তাঁর তিন ছেলের একজন বাড়ির নিচের তলার মনিহারি দোকান চালাত, অন্যজনের ডেকোরেটরের অফিস ছিল পাশের পাড়ায় আর তৃতীয়জন যেতেন রেললাইন পেরিয়ে শাড়ির দোকানে। সাড়ে সাতটার পর এঁদের একজনও তাঁর ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে না ঢুকলে তিনি বুক চাপড়ে শুরু করতেন, ওরে আমার তিনটের একটা গেল রে।

আমি একসময় পর্যন্ত ভাবতাম, ইনি, আমার মা এঁরা সব ভিতুর ডিম। আর আমার মতো লোক, যারা খারাপ কিছু ঘটার সম্ভাবনাকে মনের কোণেও স্থান দেয় না কখনও, তারা আসলে সাহসী। ইদানীং মনে হয় ব্যাপারটা আসলে ঠিক উল্টো। আমি আসলে এতই ভিতু যে ভয়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস আমার নেই। এঁদের আছে।

আমি ফোনের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলাম আমার ভয় পাওয়া উচিত কি না। অদ্ভুত কিছু কি ঘটেছে? তারপর সে সাহস জোগাড় করতে পারলাম না। নিজেকে বোঝালাম এই ঘণ্টা চারেক আগেই আমাদের দেখা হয়েছে, আধঘণ্টা আগে চ্যাট হয়েছে আবার আধঘণ্টা বাদে চ্যাট হবে এবং ঘণ্টা চারেক বাদে দেখা, এর মধ্যে খারাপ কিছু ঘটার সম্ভাবনা শূন্য। 

সবুজ ফোন চিহ্নে হাত ছোঁয়ালাম। হ্যালো?

কুন্তলা!

জলোচ্ছ্বাস না হোক, একটা মিনি কালবৈশাখী তো বটেই।

আমার মনে ছিল না, আজ আমাদের লাঞ্চে কঢ়ি পকোড়া! ভয়াবহ। 

মনে পড়ে গেল। আমাদেরও আজ লাঞ্চে কঢ়ি পকোড়া। আমার ফেভারিট খাবার। তাছাড়া এরা বানায়ও চমৎকার বানায়। 

অর্চিষ্মান জানাল যে পুজোর মুখে এমন সুন্দর রোদ্দুর আর হাওয়া আর গরমহীনতায় কঢ়ি পকোড়া খেতে ওর মারাত্মক খারাপ লাগবে। 

গুজরাট ভবন যাবে?

আমার বরং সেই দিন গুজরাট ভবন গেলে সুবিধে হত যে দিন মেনুতে সীতাফল। কিন্তু বিয়ে মানে কম্প্রোমাইজ। রাজি হয়ে গেলাম। 

তাহলে বেরিয়ে পড়। কুইক। 

*****


স্টেট ভবনের ক্যান্টিনের বেশ কয়েকটা ক্যাটেগরি হয়। কোনওটার ভেতরবাহির দুটোই জমকালো (গোয়া, আসাম, বিহার), কোনওটার বাইরে ভেতর দুটোই ন্যাড়া (কেরালা, ওডিশা, অন্ধ্র, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড), কোনওটার বাইরে ন্যাড়া ভেতর ঝকঝকে (বঙ্গ, মহারাষ্ট্র)। গুজরাট ভবন পড়বে এই তিননম্বর দলে। চার বা ছ’জনের বসার টেবিল সাজানো পরিষ্কার, বড় হল। সপ্তাহের মাঝখানে যার বেশিরভাগই ভর্তি।

প্রথমে অবাক হয়েছিলাম, তারপর মনে পড়ল নবরাত্রি চলছে, স্ট্রিক্টলি শাকাহারী ভোজনালয়ে ভিড় হওয়াই স্বাভাবিক। গুজরাট ভবনের লাঞ্চে বৈচিত্র্যের বিড়ম্বনা নেই। থালি আর স্পেশাল থালি। থালিতে আসে ফারসান (অর্থাৎ অ্যাপেটাইজার) ঘি মাখানো রুটি, গাজর কড়াইশুঁটি দেওয়া ভাত, দু’রকম ডাল, দু’রকম তরকারি (একটা শুকনো একটা ঝোলঝোল)। স্পেশাল থালিতে ফারসান আইটেম একটার জায়গায় দুটো আর একটা মিষ্টি।  


তিনটে টাকনার একটা আচার তো বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু বাকি দুটোতে এগুলো কি, গাঢ় কমলা, ঢিবি ঢিবি? একটা তুলে জিভে ঠেকিয়ে বুঝলাম যা সন্দেহ করেছি জিনিসটা ঠিক তাই, গুড়।

খাবারেরও আগে এল ঘোল। ঠাণ্ডা, জিরের গুঁড়ো ভাসানো। দিল্লিতে এখন যা টেম্পারেচার চলছে তাতে ঘোলটা দরকারি। তারপর এসে গেল থালি। 


গুজরাট ভবনের খাবারের বর্ণনা যদি দিতে হয় তাহলে বলতে হবে খুব ভালো, পাকা হাতে রাঁধা বাড়ির রান্না। খেলে রসনা, মন এবং পেট তিনজনেই শান্তি পায়। ফারসানের ছোট্ট সামোসা আর ধোকলা, দুটোই এ ক্লাস। দুটো ডালের একটা রীতিমত মিষ্টি, সেটা আমি শেষ করতে পারিনি, কিন্তু এটাও বুঝেছি যে যাদের মিষ্টি ডাল খেতে আপত্তি নেই তাদের ও জিনিস ভালো লাগবে। অন্য ডালটি রাজমা এবং আরও কিছু ডালের সমাহার। রাজমা আমাদের দুজনেরই প্রিয়। আলু পনীরের ঝোলের কড়া হিং-এর গন্ধও দুজনেরই মনে ধরেছে। কুন্দরির শুকনো শুকনো তরকারিটা আমাদের বাড়িতে হয়, বহুদিন পর খেয়ে ভালো লাগল। আর মিষ্টির সবুজ রং দেখে চমকে গিয়েছিলাম। মুখে দিয়ে আরও চমক। একজনকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলাম জিনিসটা কীসের। 

জিনিসটা দুধি, অর্থাৎ লাউয়ের ক্ষীর। 

ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, কেন? আচ্ছা নহি হ্যায়? 

আচ্ছা বললে কম বলা হবে। বহোৎ আচ্ছা। গুজরাত ভবনের পরিবেশকদের ব্যবহারও ভালো। দুজনের পেটভরা খাবারের দাম হল আড়াইশো টাকা। বেরিয়ে ওলা ডেকে অফিসে ফিরে এলাম। গোটা ঘটনাটা ঘটাতে সময় লাগল দেড় ঘণ্টারও কম। 

*****

সামনের এক সপ্তাহের মতো সম্ভবত এটাই অবান্তরে শেষ পোস্ট। একটা কাজ সেরে রবিবার ফেরার কথা। তখন দেখা হবে। টা টা বাই বাই, আবার যেন দেখা পাই।



October 15, 2016

মিনি সাপ্তাহিকী




প্রবাদপ্রতিম রন্ধনশিল্পী জুলিয়া চাইল্ড-এর  টিভি শো-র সেট
উৎস ইন্টারনেট




আগাথা ক্রিস্টির স্মরণে তাঁর গল্পের সিনসিনারির ছবি দেওয়া স্ট্যাম্প বেরিয়েছে ব্রিটেনে। 


উনিশশো সাতাশ। মাটি থেকে দু’হাজার ফুট ওপর। এরোপ্লেনের পাখা। নৃত্যরত দশ বছর বয়সী। 


October 11, 2016

সাত থেকে এগারো



৭ই অক্টোবর, ২০১৬

আড্ডা। ফিশ ফ্রাই, ভাত, নারকেল দিয়ে ডাল, তরকারি, পাঁঠার মাংস এবং উমদা পায়েস। সৌজন্যে, সহৃদয় বন্ধু। সামনে চার-চারটে ছুটির দিন গা এলিয়ে পড়ে আছে। আজ রাতে যেমন ঘুম হবে তেমন অনেকদিন হয় না।


৮ই অক্টোবর, ২০১৬


সি আর পার্কের বাইরের পুজোর কোটা পূরণ করতে আগের বার গিয়েছিলাম কাশ্মীরী গেট, এ বার ফরিদাবাদের চার্মউড ভিলেজ। ভেতরে তখন উলুধ্বনি আর শঙ্খ প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। এই যে নাম দিতে চাওয়া অথচ লজ্জা পাওয়া প্রতিযোগীদের মাইকে চেঁচিয়ে নাম ধরে ডাকা হচ্ছে, তারা বলছেন, তুমি যদি যাও তো আমি যেতে পারি, সেক্রেটারি আর প্রেসিডেন্ট হলে জীবনে শাঁখে ফুঁ দাও আর না দাও নাম দিতেই হবে, চাঁদা তোলা আর ডেকরেটর ডাকার দায়িত্বের সঙ্গে এটাও একটা দায়িত্ব, তবে এক্সট্রা হাততালি গ্যারান্টিড, শেষমেশ যে পাড়ার নিরীহ আর মুখচোরাতম কাকিমা, হাসি ছাড়া যার গলা দিয়ে দ্বিতীয় শব্দ বেরোয়নি কখনও, তিনি "কী সোনা, রেজাল্ট কেমন হল?" বলে রাস্তার ওপার থেকে  চেল্লানো কনফিডেন্ট কাকিমার সাত সেকেন্ডের মাথা মুড়িয়ে সতেরো সেকেন্ড শাঁখ বাজিয়ে প্যান্ডেল মাত করে যাবেন, এই সব দেখতে আমার দারুণ লাগে। এই যে মণ্ডপের ভেতরের লোকেরা একে অপরকে চেনে, এইটা আমি বড় পুজোয় মিস করি। ছোটবেলায় কলেজ স্কোয়্যার আর মহম্মদ আলি পার্ক দেখে এই প্রশ্নটা আমাকে চিন্তিত করত। এ পাড়ার লোকগুলো কোথায়? তারা চেয়ার পেতে বসে নেই কেন মণ্ডপে? 

সি আর পার্কের পুজোর একটা ভালো ব্যাপার হচ্ছে একবার বেরোলে খানআষ্টেক দেখে ঢোকা যায়। এ সব দিকে সেটা অসুবিধে। শাড়িমাড়ি পরে ট্যাক্সি করে গিয়ে একটা ঠাকুর দেখে ফিরে আসা, মনের মধ্যে খোঁচা দিতে থাকে অকৃতজ্ঞের মতো। পরিশ্রম আর পয়সা উশুল হল তো? কিন্তু যদি ভাবি যে নতুন জামা পরে অর্চিষ্মানের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েছি, তাহলে আফসোসটা থাকে না। অচেনা রাস্তার ওপর ঝুঁকে পড়া অচেনা গাছ, গাছের ওপারেও গাছ, বাড়ি অফিস দোকান নয়।  চলতে চলতে হঠাৎ তুঘলকাবাদ ফোর্টের প্রকাণ্ড ভাঙাচোরা দেওয়াল। এতদিন দিল্লিতে থেকে এখনও দেখা হয়নি। শিগগিরি এ ভুল শোধরাতে হবে। 


৯ই অক্টোবর, ২০১৬

বাড়িতে ফোন করে ঠাকুমা হুইলচেয়ারে চেপে পাড়ার মণ্ডপে অঞ্জলি দিতে গেছেন শুনে নিজে যাওয়ার থেকেও ভালো লাগল। একটা সময়ের পর থেকে স্নেহ ঊর্ধ্বগামী।

সারা সকাল আরাম করে শেষ দুপুরে আমরা গেলাম জুলফিকর দেখতে। শ্রীজাত যদি অ্যাকটিংটা করবেন বলে ঠিক করেন, তাহলে জটায়ুর চরিত্রে অডিশন দিতে শুরু করতে পারেন। চেহারার দিক থেকে অন্তত কাস্টিংকে কেউ গালি দিতে পারবে না। সিনেমা দেখে বেরিয়ে ইরানি রেস্টোর‍্যান্টে স্যালাড অলিভিয়ে, চেলো কাবাব, চায়ের সঙ্গে খেজুর টা। 

পেটে যেটুকু জায়গা বাকি ছিল তাতে রাতে আরেকবার চা খাওয়া যেত। বিস্কুট দিয়ে খেলেও হয় কিন্তু অষ্টমী বলে কথা। অর্চিষ্মান গেল রাবড়ি আনতে। ফিরে বলল, রাস্তা জুড়ে থিকথিক করছে ভিড়। কে কী বিক্রি করবে ভেবে উঠতে পারছে না। চেনা ঝালমুড়িওয়ালা বিরিয়ানি বিক্রি করছে, বিরিয়ানিওয়ালা এগরোল, এগরোলওয়ালা ফুচকা, ফুচকাওয়ালা বিরিয়ানি। আমাদের সসেজসালামিহটডগ সাপ্লাই দেন যে সর্দারজী, তিনি দোকানের সামনে কড়াই পেতে মাংস ভাজতে লোক বসিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ওষুধের দোকানগুলোই সাইডে কিছু বেচছে না। কেন কে জানে। ওঁরা জেলুসিল ‘টু গো’ প্যাকেট নিয়ে দোকানের সামনে অস্থায়ী স্টল খুলতেই পারেন। বিরিয়ানি এগরোলের সমান বিকোবে।  


১০ই অক্টোবর, ২০১৬

ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই যেটা হল সেটা হল প্যানিক। চারদিনের ছুটির মধ্যে দু’দিন শেষ, যেটুকু পড়ে আছে সেটুকু শনিরবির ছুটির সমান। দুঃখে হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল। ভাগ্যিস নতুন জামা পরে বেরিয়ে পড়ার অপশন আছে। 


আমার ব্লকের পুজো। আমার মতে সি আর পার্কের সবথেকে সুন্দর প্রতিমা। আমি অন্য ব্লকে চলে গেলেও মতামত একই থাকবে। 


স্পনসর্ড প্রসাদ। ভেতরে আছে একটা পুঁচকে সন্দেশ, একটা পাঁচটাকা দামের নোনতার প্যাকেট আর একখানা শোনপাপড়ি। এমনি সময়ে আমি আমাদের-সময়-সব-ভালো-ছিল দলের আজীবন সদস্য, এই প্রসাদের ব্যাপারটা ছাড়া। আমাদের ওই সন্দেশের গুঁড়ো মাখানো গলা গলা কলা, কালো কালো পেয়ারা, বালি বালি আপেল - আমি একবার আক্ষরিক কাঁচকলা পেয়েছিলাম, চিবিয়ে খেয়েওছিলাম - তার থেকে এ প্রসাদ ঢের ভালো। 

মেলা গ্রাউন্ড

কালীবাড়ি

আজ দু’বেলাই বেরিয়েছিলাম। দু’বেলার দু’রকম উপযোগিতা। সন্ধ্যেবেলায় মণ্ডপগুলোতে ঢোকা যায় না যদি না লাইনে দাঁড়িয়ে ধাক্কা খাওয়ার রুচি থাকে, আর সকালে আলোর জাঁকজমকটা মিসিং। ফেরার পথে চাইনিজ খাওয়া হল। ডাইসড চিকেন উইথ গারলিক অ্যান্ড পেপার, নুডলস উইথ চিকেন অ্যান্ড প্রন, আর এই সব কিছু উইথ স্প্রাইট। যাওয়ার সময় হেঁটে হেঁটে ঠাকুর দেখতে দেখতে আড়াই কিলোমিটার দূরের দোকানে পৌঁছেছিলাম। খেয়ে উঠে সে হাঁটা আম-পচে-বেল। অটো নিলাম। সি আর পার্কের সব রাস্তা বন্ধ, বিশ্ব ঘুরে আসতে হল। মিটার উঠল তিরিশের বদলে ষাট টাকা। 


১১ই অক্টোবর, ২০১৬

রিষড়ার বাড়ির পুজোর বাসনপত্রের মধ্যে একটা ঘট আছে। কাঁসার গা, রোজ নারকেল ছোবড়ার ঘষা খেয়ে সোনার মতো চকচক করে। দৈর্ঘ্যে দেড় বিঘৎ, প্রস্থে প্রাপ্তবয়স্ক দুই তেলোর মাঝখান। বেজায় ভারি। ভেজা হাতে ধরলে যদি পিছলে যায়, আর গিয়ে যদি পায়েই পড়ে, তাহলে পা থেঁতলে যাওয়া নিশ্চিত। 

ওই ঘটে ধরে রাখা জলে পুজো হয় বাড়িতে। গঙ্গাজলেই পুজোর নিয়ম, তাছাড়া গঙ্গা এমন কিছু দূরেও নয়, নিয়মিত ইন্টারভ্যালে কেরোসিনের জাম্বো জ্যারিকেনে ভরে সে জল আনাও হয়, কিন্তু আনা ঝামেলা বলে সে জল জমিয়ে রাখা হয় স্পেশাল ইভেন্টের জন্য। এমনি দিনে ঘটের কপালে কলের জল নাচে। সেই জল ভরা নিয়ে আবার নানারকম নিয়মকানুন আছে। নিজেদের অসুবিধের নিয়মগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে বলেই প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে এসব আলটপকা নিয়মের আমদানি বলে আমার সন্দেহ। কলের জলেই পুজো হবে কিন্তু কলের জল বালতিতে রেখে সেই বালতিতে ঘটি ডুবিয়ে জল তুলে নিলে চলবে না। ডিরেক্ট কল থেকে ভরতে হবে। তাও আবার বাড়ির যে সে কল থেকে ভরলে হবে না। যে সব কলের জলে বাসন মাজা, কাপড় কাচা, স্নান করা হয় তাদের কাছে ঘট নিয়ে যাওয়া মহাপাপ। ঘটে জল ভরতে হবে বাগানের পবিত্র কল থেকে। যে ভরবে তার স্নান হয়ে যাওয়া মাস্ট। 

এতসব নিয়ম আছে বলেই ঘটটার প্রতি আমার, এবং আমার ধারণা বাড়ির সকলেরই রাগরাগ ভাব। বাসনের ঝুড়ির মধ্যে ঘট হয়ে বসে থাকা ঘটটা যেন একটা ওয়ার্নিং, এই বুঝি জল চলে গেল। স্নানে যাওয়ার তাড়া দেওয়ার কল। 

খালি আজ, বিজয়াদশমীর রাতে সে ঘটের অন্য মহিমা। তার ভেতর আজ সত্যি গঙ্গাজল, তার মুকুটে আজ বেছে তুলে আনা, গাঢ় সবুজ, কিনারায় ঢেউ তোলা, ফুটোহীন, নিটোল আমপল্লবের মুকুট, তার ঝকঝকে গায়ে টকটকে লাল সিক্ত সিঁদুরের স্বস্তিকাচিহ্ন। তবে আরও কিছু আছে বোধহয়। সম্মিলিত বিষাদধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে পুকুরের ছলাং করে ছিটকে আসা হিমজলের বিন্দু, মণ্ডপের খালি বেদীটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরের ধক করে ওঠাটা, এ সব তো হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না, যেতে পারে না, সব এসে ওই ঘটের গায়ের জ্যোতি হয়ে যায়। আজ ঘটের দিকে তাকালে বিশ্বাস করা শক্ত নয় যে এর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মাথা ঠেকালে এ সত্যি সত্যি আমার চাওয়া পূরণ করার ক্ষমতা রাখে। 

যদিও হোমওয়ার্ক করা না থাকলে ফস করে কিছু চাওয়া মুশকিল। গত পাঁচদিনের উত্তেজনায় হোমওয়ার্কের কথা মনেও পড়েনি,  এই এখন হাঁটু মুড়তে মুড়তে, ঠাণ্ডা মেঝেতে দুহাতের পাতার টেম্পোরারি বালিশ পাততে পাততে, মাথা ঠেকাতে ঠেকাতে ব্রেনস্টর্মিং চালিয়ে বেশিদূর যাওয়া যাবে না। বড়জোর 'সবার ভালো হোক' টাইপের ভাসাভাসা দাবি।  

এখন পুজোর উত্তেজনা নেই, এখন আমার হোমওয়ার্ক সারা। এখন আমার চাওয়ার জিনিসের অভাবও নেই, কিন্তু এখন ঘটও নেই। রাগ করেই হোক, বিরক্তি দেখিয়েই হোক, তাকে সঙ্গে নিয়ে বাগানের কলের দিকে আমি অগুন্তিবার হেঁটেছি। যদি সেসব কথা মনে রেখে, পুরোনো বন্ধুত্বের খাতিরে সে আমাকে মাত্র একখানা বরও দিতে রাজি থাকে, তাই একটা চেয়ে রাখলাম। আর কিচ্ছু চাই না, শুধু মনের, মগজের, লিভারের, হার্টের, লেখার, বলার, চিন্তার, ভালোবাসার, স্বপ্নের, সংকল্পের জোর দিও আমাকে, ঘট।

আপনাদের সবার জন্য আমার শুভেচ্ছা, কোলাকুলি আর অন্তরের ভালোবাসা রইল। শুভ বিজয়া।


October 08, 2016

সাপ্তাহিকী








খবরাখবর

জিনিয়াস যে নই সে তো প্রমাণ করার কিছু নেই, পাগল যে নই এটা দাবি করতে পেরে ভালো লাগছে। 

নোবেলজয়ীরা পুরস্কারের অর্থমূল্য কে কীভাবে খরচ করেন। 

পরীক্ষা এসে গেছে কিচ্ছু পড়া হয়নি এ দুঃস্বপ্ন ইউনিভার্সাল। কেন দেখি আমরা সবাই ও স্বপ্ন?


সিনেমাগুলো যতবার দেখি (বেশিবার নয়, প্রত্যেকটা একবার করে, তাও ব্যাটম্যানকে দেখতে নয়, ক্রিশ্চিয়ান বেলকে দেখতে) আমার এই প্রশ্নটা মনে জাগত। এতদিনে উত্তর পাওয়া গেল। 

ব্লাইন্ড ডেটে আমি মানুষ বা বই, কারও সঙ্গেই যেতে চাই না। 

তিরিশ বছর পর হারানো পোষা কচ্ছপ খুঁজে পেয়েছেন একটি পরিবার।

যে বসিয়া থাকে তাহার স্বাস্থ্যও বসিয়া থাকে, এমনকি শুয়ে পড়াও আশ্চর্য নয়। আমি তো সেইজন্য একশোবার করে জল খেতে উঠি।


ছবি



কুইজ

আমার বই পড়ার বহর দেখে এরা আন্দাজ করেছে আমার বয়স সতেরোর কম। আপনার?


October 07, 2016

রেডি



অক্টোবরের শুরুর দিকে নাগাল্যান্ড ভবন যাওয়া হয়েছিল। অফিসের লোকজন সঙ্গে ছিল, তাই ছবি তুলিনি, অবান্তরেও লিখিনি। স্টেট ভবন ক্যান্টিনে খেতে যাওয়া আসলে যতখানি স্টেট ভবন ক্যান্টিনে খেতে যাওয়া, ততখানি কি তার থেকেও বেশি অর্চিষ্মানের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত সময়ে অপ্রত্যাশিত জায়গায় দেখা করার মজা। সেটা এ ক্ষেত্রে হয়নি, তাই নাগাল্যান্ডকে না-চাখা স্টেট ভবনের লিস্টেই রেখে দিয়েছি এখনও। দুজনে খেয়ে এসে ব্যাখ্যান করে এসে আপনাদের জানাব। 

যাই হোক, ভবন যাওয়ার কথা উঠতে দল বাড়ানোর চেষ্টা করা হল। অফিসে যাদের ফুডি বলে পরিচিতি আছে তাদের চিহ্নিত করে প্রস্তাব দেওয়া হল। কয়েকজন রাজি হল, কয়েকজন হল না। এই দু’নম্বর দলের একজন ক’দিন আগেই Dzukou Tribal Kitchen-এ খেয়ে এসে খুব সুখ্যাতি করছিল। তাকে আমি বললাম, যাবে না কেন, চল। তাতে সে মুখ কালো করে বলল, না গো, সংযম করছি। 

কী সাংঘাতিক, কীসের? সে জানাল তার নাকি পেট ভালো যাচ্ছে না। 

আমি বললাম, সে তো ফুডিমাত্ররই হওয়ার কথা। খাবার যদি তোমাকে কাত না করতে পারল তা হলে আর তেমন খাবার খেয়ে লাভ কী। খাবারের কাছে হার মানাটাই তো ফুডির জিত। তখন সে বলল, হারব বলেই তো এখন জিতছি। পুজোয় বিরিয়ানি খেতে হবে বলে এখন খাচ্ছি না। 

বোঝাই যাচ্ছে পুজোর প্রস্তুতি লোকে শুরু করেছে অনেকদিন থেকে। আমার প্রস্তুতি এতদিন আগে থেকে শুরু হয়নি। আমার প্রস্তুতির অধিকাংশটাই বাহ্যিক চাপে। ফুটপাথে বাঁশের বেড়া যদি বসেই যায় সেদিকে তাকাব না বলে চোখ বন্ধ করে তো হাঁটা যায় না। এদিকের বেড়াহীন ফুটপাথের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে থাকা যায়, কিন্তু সেদিকে একতলা বাড়ির সমান উঁচু ব্যানারে কোন সন্ধ্যে কী প্রতিযোগিতা আর কোন শিল্পীর সমাহার ঘটা করে টাঙানো আছে।

দেরিতে হলেও নড়েচড়ে বসতেই হল। প্রথমেই ওই ক’দিনের টু ডু লিস্ট বানালাম। খাওয়া, পরা, ঘোরা। প্রথমে পরা-টা ট্যাকল করলাম। শাড়ির দোষের সীমা নেই, চলতে অসুবিধে, একগাদা অবান্তর কাপড়, গরম, লুটুরপুটুর, কিন্তু সবথেকে খারাপ হচ্ছে একশো রকম ঠ্যাকনার ব্যাপারটা। বাজার থেকে কিনে এনে পরে ফেললাম, হবে না। ব্লাউজ, শায়া, ফলস্‌, পিকো। যথারীতি সে সব কিছুই হয়নি যথাসময়ে। মা রিষড়া থেকে নতুন শাড়ি এনে পৌঁছে দিয়ে গেছেন, কোনও কোনওটা এসেছে আরও দূর দূর থেকে, পুরী কিংবা শান্তিনিকেতন, আমি সেগুলো রাস্তা পেরিয়ে দরজির দোকানে নিয়ে যেতে পারিনি। জীবনের বড় বড় ব্যর্থতার থেকে এই ছোট ছোট অপদার্থতাগুলোর গ্লানি কিছু কম নয়। মরমে মরে গিয়ে গত পরশু আলমারি থেকে শাড়ি বার করে দেখি সবক’টার ভাঁজের মধ্যে ইস্তিরি করা ম্যাচিং ব্লাউজ পরিপাটি রাখা। ফলস বসানো, পিকো সারা। 

আমি ভাবছি আমি দারুণ লায়েক হয়েছি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট, আসলে দেড় হাজার কিলোমিটার দূর থেকে মা-ই আমার জীবনটা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এখনও। 

অন্যদের পুজোর বাজারও হয়ে গেছে। বিশ্বের সবার জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী মুখস্থ করে রেখেছি, কিন্তু কে কী মাপের শার্ট পরে সেটা প্রত্যেক বছর ভুলে যাই কী করে সেটা একটা রহস্য। শাড়িকে অত গালি দিলাম, কিন্তু এই ব্যাপারে শাড়ি বেস্ট। ষোলো থেকে ছিয়াশি, সবার এক মাপ। এমনিতে সবাই বাজা মাত্র ফোন তোলে। কিন্তু দোকানে দাঁড়িয়ে পছন্দের জামা হাতে নিয়ে ফোন করুন, বেজে বেজে থেমে যাবে। শেষে বাধ্য হয়ে যেতেই হল কফি খেতে। এক চুমুক দিই, আর ফোনের দিকে আড়চোখে দেখি। শেষমেশ এল। ‘বাড়ি’ কলিং।  

করেছিলি, সোনা? 

করেছিলাম তো। শার্টের মাপ জানা গেল। তাতেও সমস্যার অন্ত নেই। বিয়াল্লিশ, চুয়াল্লিশের মাপ মুখস্থ করে এসে দেখি এদিকে সব মিডিয়াম আর লার্জ। দোকানের লোকজন কনভার্শনে সাহায্য করলেন। কিন্তু শেষটা নিজেদের চোখের ওপরই ভরসা করতে হল বেশি।

ওদিককার পাঠানো টাকা দিয়ে নিজেদের জামাকাপড়ও কেনা হল। শেষটা দেখা গেল যে সবাই সবাইকে উপহার দিয়েছে, কেবল আমি অর্চিষ্মানকে আর অর্চিষ্মান আমাকে ছাড়া। কিন্তু কী দেব? কিছুরই দরকার নেই আমাদের। ছোট বাড়িতে থাকি, অদরকারি জিনিস রাখার জায়গা নেই। তারপর একজনের কথা মনে পড়ল, যার দরকারের সীমা নেই। হলুদ এনে দিলে যার তেলের দরকার পড়ে, তেল এনে দিলে শ্যাম্পুর, ডাল এনে দিলে চালের, চানাচুর এনে দিলে যে মুখ ভেচকে বলে একটু পপকর্ন আনতে কী হয়েছিল? ইলেকট্রিশিয়ান চলে গেলে মনে করায় ওই কলটা কিন্তু পুরো বন্ধ হচ্ছে না।

আমরা বিরক্তি দেখালে আকাশ থেকে পড়ে বলে, নিজের জন্য চাইছি থোড়াই? আমার কি খিদে আছে? শখ? নাক? চোখ? মুখ? মগজ? সব তো তোমাদের জন্যই চাওয়া। 

সংসারকে জিজ্ঞাসা করলাম, কী চাও পুজোয়? বুঝলাম খুশি হয়েছে, কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ করল না। বলল, অনেকদিন ধরেই যে বলছ একখানা প্রেশার কুকার দেবে? আর যদি দাওই, তাহলে ভালো কোম্পানির ভালো ডিজাইনেরই…

বাকি রইল খাওয়া আর ঘোরা। খাব তো যত্রতত্র, ঘোরার অংশটায় খানিক অভিনবত্ব আমদানির আশা রেখেছি। সি আর পার্কের ঠাকুর না দেখে থাকা যাবে না, ইচ্ছে আছে দিল্লির এদিকওদিক যাওয়ারও। লোকজনকে জেরা করে বেশ কয়েকটা প্যান্ডেলের নাম জোগাড় করেছি। তারা নাকি সব প্রাইজ পাওয়া থিম পুজো। 

অবশ্য এখানকার প্রাইজ পাওয়া পুজো দেখে কলকাতার এঁদো গলির পুজোও হেসে হেসে হেঁচকি তুলে ফেলবে। আজ সকালেই কোন একটা চ্যানেলে দেখলাম কলকাতার সেরা পুজো, সেরা কলাবউ, সেরা লুচিসুজি ঘোষণা করছে। আমার হাতের ডিমসেদ্ধ হাতেই রয়ে গেল, বললাম পুজো তো শুরুই হল না এখনও! অর্চিষ্মান বলল, আছ কোথায়, কলকাতায় পুজো শেষ হতে চলেছে। আজকাল ওখানে পুজো হয় মহালয়া টু লক্ষ্মীপুজো। শুনেই আমার ভয়ানক প্রতিবাদের ইচ্ছে হল। আমাদের কালটা কত ভালো ছিল, যতদিনের হওয়া উচিত ঠিক ততদিনের, অর্থাৎ পাঁচদিনের পুজো হত। আজকালটা কী জঘন্য। 

তারপর মনে পড়ল, আমার ছোটবেলায় সবাই বলত পুজো চারদিনের। আমি ভাবতাম মানুষ এত পাষণ্ডও হয়? ষষ্ঠীটাকে ধরছে না? মোটে পাঁচদিন, যেটা পাঁচঘণ্টার দ্রুততায় কেটে যাবে, তার থেকেও একদিন বাদ দিয়ে দিচ্ছে? আমাকে দেখেও হয়তো আজকালকার কোনও শিশু ভাবছে, নিজে বুড়ো হয়েছে বলে দেখেছ, বলছে মহালয়া নাকি পুজো না! 

পুজো যে ক'দিনেরই হোক, পাঁচ কিংবা পনেরো, আমরা প্রস্তুত। ওই ক’টা দিন থেকে আনন্দ আর আরাম (দুটো একসঙ্গে হওয়া অবশ্য অসম্ভব) নিংড়ে নেওয়ার জন্য। আপনারাও রেডি আশা করি। আমার শারদীয়ার অনেক ভালোবাসা আর ভালোচাওয়া জানবেন। সবার পুজো খুব ভালো কাটুক। 


October 05, 2016

এ মাসের বই/ সেপ্টেম্বর ২০১৬ (২)/ লাভ সেক্স আর ধোঁকা



সেপ্টেম্বর মাসে দু’টো ভয়ানক ইন্টারেস্টিং বই পড়লাম। যেচে আনইন্টারেস্টিং বই আমি পড়ি না, কিন্তু আমার পড়া সব ইন্টারেস্টিং বইয়ের মধ্যেও এরা ইন্টারেস্টিং। দু’খানা বইই বাঙালির দুই কেচ্ছা নিয়ে লেখা। 


*****

মোহান্ত এলোকেশী সম্বাদ/ শ্রীপান্থ



তারকেশ্বরের কাছে কুমরুল গ্রামে নীলকমল মুখোপাধ্যায় নামে এক গরিব ব্রাহ্মণ থাকতেন। রূপসী এলোকেশী ছিল তাঁর প্রথম পক্ষের সন্তান। নবীনচন্দ্র ব্যানার্জির সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। নবীনচাঁদ চাকরি করত কলকাতায়। সেটা আঠেরোশো সত্তরের দশক। তখন ঘণ্টায় চারটে করে তারকেশ্বের লোকাল চলত না; কলকাতা প্রায় বিদেশই বলা চলে। নবীনচাঁদ থাকত কলকাতায়। এলোকেশী থাকত বাবা আর সৎমার সংসারে। 

এলোকেশীর বাড়ির লোকের তারকেশ্বর মন্দিরে আনাগোনা ছিল। সাধারণ ভক্তের মতো নয়, তার থেকে খানিক বেশিই। খোদ মোহান্তের খাস অনুগত ছিলেন তাঁরা। মন্দিরের অন্দরমহলে অবাধ যাতায়াত ছিল। 

অন্দরমহলটি দেখার মতো। তারকেশ্বর আর আশেপাশের অনেক শিবমন্দির নিয়ে একটা ঘোঁট মতো ছিল, তারকেশ্বরের হেড পুরোহিত, মোহান্ত ছিলেন সেই ঘোঁটের সর্বেসর্বা। বিপুল ঐশ্বর্য, অগাধ ক্ষমতা এবং সে ক্ষমতার অকথ্য অপব্যবহার। 

এলোকেশী কাণ্ডের ভিলেন মাধবচন্দ্র গিরি মোহান্ত ছিলেন মন্দিরের ইতিহাসে এগারো কিংবা বারো নম্বরের মোহান্ত। লোকে বলে এলোকেশীর সৎমার সঙ্গে এই মাধবগিরির ফষ্টিনষ্টি ছিল। এই সৎমা আর সৎমার এক সহচরীই এলোকেশীকে প্রথম মাধবগিরির কাছে নিয়ে যায়। ছুতোটা ছিল ছেলে হওয়ানোর, কিন্তু উদ্দেশ্যবিধেয় শুরু থেকেই অন্য ছিল। এলোকেশীর বাবা নাকি সবই জানতেন। কিন্তু মোহান্তর কৃপাদৃষ্টির (অলৌকিক নয়, নিতান্তই পার্থিব) লোভে মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। 

এলোকেশী কী চেয়েছিল সেটা জানার উপায় নেই, তবে সে তখন ষোলো বছরের মেয়ে, তার চাওয়া না চাওয়া পরিণতি খুব একটা বদলাত বলে মনে হয় না। প্রায় এক বছর খানেক ধরে মোহান্ত আর এলোকেশীর সম্পর্ক চলল, তারপর নবীন বাড়ি এল, আসা মাত্র গ্রামের হিতৈষীরা তার কান ভাঙালো। 

নবীন বউকে ভয়ানক ভালোবাসত। এলোকেশী পায়ে ধরে ক্ষমা চাইল। নবীনচাঁদ বউ নিয়ে পালাতে চাইল। (এই অংশটুকু ঘটেছিল বন্ধ ঘরের মধ্যে, কাজেই প্রমাণ করা শক্ত।) খবর এল মোহান্ত পালাবার সব রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। হতাশ, লাঞ্ছিত, ফাঁদে পড়া নবীন আঁশবটির এক কোপে এলোকেশীর মুণ্ডু ধড় থেকে আলাদা করে ফেলল। 


কারওরই সন্দেহ হিল না যে নবীনচাঁদ খুন করেছে, কিন্তু একটা বিরাট অংশের জনগণের মত ছিল যে নবীন প্রেমে ‘পাগল’ হয়ে এ কাজ করেছে। স্ত্রীকে ভালোবাসাই স্বামীর পক্ষে যথেষ্ট প্রশংসনীয়, কুলটা স্ত্রীকে ভালোবাসলে সে স্বামী প্রায় সেন্টহুডের মনোনয়ন পেতে পারে। নবীনচাঁদের প্রতি সহানুভূতির বান ডেকেছিল সারা বাংলায়। হুগলির কোর্টের জুরিরা তো নবীনকে বেকসুর খালাস দিয়েই দিচ্ছিলেন, নেহাত বিচারকের চোখের চামড়া ছিল, তিনি জুরিদের রায়ের নাকচ করে কেস পাঠালেন হাইকোর্টে। হাইকোর্টের বিচারে নবীনচন্দ্র খুনি সাব্যস্ত হল এবং তার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হল। 

জেলে গিয়ে একটা কাজের কাজ করেছিল নবীনচাঁদ। সেটা হচ্ছে মাধবগিরির নামে পরস্ত্রীগমনের মামলা ঠোকা। সেশন কোর্ট, হাই কোর্ট ঘুরেও মোহন্ত পার পেলেন না। সাজা হল দু’হাজার টাকা জরিমানা আর তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড। 

তারকেশ্বরের মোহান্তদের বিরুদ্ধে এই ধরণের অভিযোগ কিন্তু নতুন নয়। মানুষের অন্ধবিশ্বাসের ওপর গড়ে ওঠা একটা অবিসংবাদিত ক্ষমতার দুর্গে খুনজখম ধর্ষণ আকছার হত। তাদের মধ্যে কোটিকে গুটিক হয়তো আদালত পর্যন্ত পৌঁছত। এলোকেশীর ঘটনার প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে আঠেরোশো চব্বিশ নাগাদ আমাদের মাধবচাঁদ মোহান্তর এক যোগ্য পূর্বসূরি নিজের রক্ষিতার স্বামীকে খুনের দায়ে ফাঁসি পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই নিয়ে অত জলঘোলা হয়নি যত হয়েছিল এই মোহান্তর তিনবছরের ঘানি ঘোরানো নিয়ে। 

এলোকেশীর মামলা নিয়ে তবে এত জলঘোলা হল কেন? মামলা চলতে চলতেই সে বেচারির বাবা, সৎ মা সব মরে গিয়েছিল, বেঁচে থাকলেও তারা কত কাজে লাগত বলা মুশকিল। তাহলে জলঘোলাটা করল কে? করল সমকাল। ইংরিজি শিক্ষা তখন ঘন মাকড়সার জাল ফুঁড়ে উঁকি মারছে, খবরের কাগজ অর্থাৎ মিডিয়ার ক্ষমতা অসীম। গানে, কবিতায়, ছড়ায়, ব্যঙ্গে, তামাশায় নাটকে মোহান্ত-এলোকেশীর ঘটনা বাংলা সংস্কৃতির আকাশ ছেয়ে ফেলেছিল। শ্রীপান্থ সে সব ছড়া, গান, কবিতা জোগাড় করে বইয়ে ছেপেছেন। পড়লেই ডেকে ডেকে সবাইকে শোনাতে ইচ্ছে করে। যেগুলো না শুনিয়ে পারছি না, সেগুলো এই রইল। 

প্রথম গানটা লক্ষ্মীনারায়ণ দাসের ‘মোহন্তের কি এই কাজ!!’ থেকে। লক্ষ্মীবাবু লক্ষ্মী চিনতেন, লোহা গরম থাকতে হাতুড়ি মারলেন, আঠেরোশো তিয়াত্তরে এলোকেশী খুন হল,  ওই বছরেই নাটক লিখলেন। মধুসূদন দত্তের ‘শর্মিষ্ঠা’ থিয়েটারে মাছি তাড়াচ্ছিল, সে নাটক তুলে দিয়ে লক্ষ্মীনারায়ণের কেচ্ছা নাটক চালু হল, লোকে এসে ফিরে যেতে লাগল। সেই নাটকের একটি গান এরকম। 

আয় গো আয় মোহন্তের তেল নিবি কে। 
হুগলির জেলখানায় তেল হতেছে।।
এ তেল এক ফোঁটা ছুঁলে, টাক ধরে না চুলে, 
বোবায় মাখ্‌লে ফোটে কথা, বাঁজার হয় ছেলে; আবার 
কালায় মাখলে কানে শোনে, পঙ্গু বেড়ায় বুক ঠুকে।।
ও যার পতি বিদেশে, যদি কেনে এক সিসে, 
তেলের গুণে মনের টানে সেই দিনে আসে, 
আবার প্রবাসে সে যায় না কভু, কাল কাটায় বাসে সুখে।।
এ তেল রাখিলে ঘরে, মনের ময়লা সাফ করে, 
হুড়ক মেয়ে সদাই মরে স্বামীর তরে; আবার লক্ষ্মীরা সব
হয়ে সংসারের কাজে থাকে।।
এ তেল নয় গো সামান্য, কোরো না অমান্য, 
যেমন রোগী তেম্‌নি তেল, এর নাম লম্পট চৈতন্য;
সোদরায় ভক্ত বিটেল মাখলে এ তেল, 
যারা ভুগচে মোহন্তের রোগে।।
এ তেল খুব উপকারী হয় সকলেরি, এই বেলা
নে আর পাবি নে, খদ্দের ঝুঁকেছে ভারি;
ঘানি বেশিদিন আর চলবে নাকো, কবে
বলদ যায় শিঙ্গে ফুঁকে।।


প্যারিমোহন কবিরত্নের ‘গীতাবলী’তে দেখি মোহান্ত-এলোকেশীর ঘটনা সমাজের কীরকম প্রগতিশীলতা এনে দিয়েছে অজান্তেই। কর্তা বলছেন তিনি নির্বংশ থাকবেন সেও ভি আচ্ছা, তবু পরিবারকে সন্তানকামনায় তারকেশ্বরে হত্যে দিতে দেবেন না। (যদিও সংসারটি “দ্বিতীয় পক্ষের", প্রথম পক্ষের ব্যাপারে কর্তা এতখানি কনসার্ন দেখাতেন কি না কে জানে।) 

তোমা বিনে সংসারে কে আছে আর, 
তোমায় না দেখলে চোখে
দেখি জগৎ অন্ধকার;
ছেলে না হলোত বয়ে গেল
এ-বংশ নির্ব্বংশ ভাল, 
তবু অতিথে ঔষধ দেওয়া সবে না।।
তুমি ছেলে হবে বলে দিলে হত্যে
গলায় দড়ি দিয়ে আমি হব আত্মহত্যে,
কেন যাবে সেখানেতে মরতে
প্রাণ গেলে দিব না এ কাজ করতে
ওষুধ খেতে আর যে যাবে
সে ভাতারের মাথা খাবে, 
এ বয়সে আর আমাকে মেরো না।

সবথেকে চমৎকার হচ্ছে ছবিগুলো। কালীঘাটের শিল্পীরা জহুরি ছিলেন, এই অসামান্য সুযোগ তাঁদের চোখ এড়ায়নি। লন্ডনের মিউজিয়ামে রাখা মূল ছবিগুলোর রঙিন প্রতিলিপি জোগাড় করে এনে বইতে ছাপা হয়েছে। কোয়ালিটি সত্যিই খুব ভালো। ছবিগুলো দেখার জন্যই বইটা কাছে রাখা যায়। আমরা জোর বাঁচা বেঁচেছি। আনন্দ-র ভদ্রলোক আমাদের মুখচেনা হয়ে গেছেন, বাজারে দেখা হলে দু’পক্ষই হাত তুলি, বললেন, এই আড়াইশো টাকার লটের লাস্ট দু’কপি ছিল (সত্যিই, আমাদের কপিটা ফার্স্ট হ্যান্ড হলেও একটু পুরোনো দেখতে। মলাটের মেরুদণ্ডের ওপরের অংশটুকু, যেটা ধরে টেনে টেনে শেলফ থেকে বারবার নামানো ওঠানো হয়, সেই জায়গাটা সামান্য ছেঁড়া।) নতুন লট আনতে দিয়েছি, দাম করেছে চারশো টাকা।



*****

বর্ধমানের প্রতাপচাঁদ/গৌতম ভদ্র

বর্ধমানের রাজবংশের শুরু হয়েছিল সেই আকবরের সময় যখন পাঞ্জাবের কাপুর বংশের সঙ্গম রাই, তীর্থযাত্রায় যেতে যেতে এই বর্ধমানে এসে ডেরা বাঁধলেন। তিনি অবশ্য জমিদার ছিলেন না, তাঁর জীবিকা ছিল ব্যবসা ও মহাজনী কারবার। শাহজাহানের সময় মোগল সেনা বাংলাদেশের কোন এক বিদ্রোহ থামাতে যাচ্ছিল, বর্ধমানের কাছাকাছি এসে তাদের রসদে টান পড়ল। সঙ্গম রাইয়ের নাতি আবু রাই তখন বর্ধমানে ঠাকুরদার ব্যবসা দেখভাল করছিলেন, তিনি গায়ে পড়ে নবাবের সেনাদের রসদ পাঠালেন। খুশি হয়ে নবাব আবু রাইকে কোতোয়াল নিয়োগ করলেন। এর পর আবুর ছেলে নাতিপুতি ক্রমশ নিজেদের বুদ্ধিবলে, এবং অবশ্যই মোগলদের নেকনজরে থেকে নিজেদের প্রতিপত্তি বাড়াতে থাকলেন এবং জমিদারি পত্তন হল। 

এগুলো ইতিহাস। এবং বোরিং। বর্ধমানের রাজপরিবারের ইতিহাসে সবথেকে ইন্টারেস্টিং ঘটনাটা ঘটতে লেগে যাবে আরও দেড়শো দুশো বছর, মোগলরা গিয়ে ব্রিটিশ এসে যাবে আর বর্ধমানের তখতে বসবেন রাজা তেজেন্দ্র বা তেজচাঁদ। ছ ছ’খানা বিয়ে করে মোটে একটি ছেলের বাবা হতে পেরে তেজচাঁদের দুঃখের সীমা ছিল না। সেই একটি ছেলে ছিলেন প্রতাপচাঁদ। নানকিকুমারীর গর্ভে তিনি জন্মেছিলেন সতেরোশো একানব্বই সালে। তারপর তেজচাঁদ আরও খানদুয়েক বিয়ে করেন, শেষ বিয়ে করার সময় তেজচাঁদের বয়স ছিল তেষট্টি আর তাঁর নববধূ বসন্তকুমারী ছিলেন এগারো বছরের। 

এত অত্যাচারের ফল অচিরেই ফলল। যৌনব্যাধিতে অকেজো হয়ে তেজচাঁদ রিটায়ার করলেন। জমিদারির হাল ধরলেন প্রতাপচাঁদ। গুচ্ছের সৎমা আর তাদের বুদ্ধিদাতাদের সামলানো এমনিই সোজা ছিল না, কিন্তু খতরনাক ছিলেন সৎমা কমলকুমারী আর তার ভাই এবং জমিদারির দেওয়ান পরানচাঁদ। 

আঠেরোশো একুশে এক অজানা অসুখে প্রতাপচাঁদ মারা গেলেন। রাতের অন্ধকারে তাঁর সৎকার সারা হয়েছিল। পরে সে বিষয়ে নানারকম পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য শোনা যায়। এর বারো বছর পর, আঠেরোশো চৌত্রিশ সালে অলখ শাহ নামে এক সন্ন্যাসী উদয় হলেন, যাকে দেখলেই প্রতাপচাঁদের কথা মনে পড়ে। পুরোনো লোকেরা, যারা কমলাকুমারী আর পরানচাঁদকে সইতে পারত না, হইহই করে উঠল। সন্ন্যাসীও নিজেকে প্রতাপচাঁদ বলে দাবি করলেন।

তখন জমিদারিতে বসেছেন তেজচাঁদের দত্তক নেওয়া ছেলে মহতাবচাঁদ আর দেওয়ানি করছেন পরানচাঁদ, তাঁরা তো বিপদে পড়লেনই, ইংরেজরাও ব্যাপারটা সুনজরে দেখল না। এই নতুন সন্ন্যাসীকে ঘিরে হঠাৎ করে যে একটা গোলযোগ পাকিয়ে উঠেছে, এটা তাদের কাছে নেহাতই উটকো ঝামেলা। আঠেরোশো চৌত্রিশ থেকে আঠেরোশো আটত্রিশ পর্যন্ত নানা টানাপোড়েন, দাঙ্গাহাঙ্গামা, মামলামোকদ্দমার পর অলখ শাহের দাবি নাকচ হয়ে গেল। সন্ন্যাসী প্রতাপচাঁদ জাল প্রতাপচাঁদ হিসেবে প্রমাণ হলেন। 

সেক্স, খুনে ভরপুর মোহন্ত এলোকেশীর রোমহর্ষক কেচ্ছার তুলনায় এই জাল রাজার কেচ্ছা খুবই ম্যাড়মেড়ে। কিন্তু একদিক থেকে জাল প্রতাপচাঁদের কেচ্ছা এলোকেশী মোহান্তর কেচ্ছাকে মাত দিয়েছিল, এ ছিল বড় ঘরের কেচ্ছা। সেকালের নানা হেভিওয়েট লোক, যেমন রামমোহন রায়, বর্ধমানের রাজবাড়ির সঙ্গে আগে থেকেই ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, কাজেই ‘ফুটেজ’ জোগাড় করতে এ ঘটনার কোনও কমতি হয়নি। ইয়ং বেঙ্গলের দক্ষিণারঞ্জন মুখার্জি তেজচন্দ্রের আট নম্বর, বালিকা বধূ  বসন্তকুমারীর সঙ্গে ইলোপ করে বিয়ে করেছিলেন। 

আনন্দ প্রকাশনীর ইতিহাস গ্রন্থমালা বলে একটা সিরিজ আছে, যার আট নম্বর বই হচ্ছে গিয়ে এই বর্ধমানের প্রতাপচাঁদ। কেচ্ছাকে কেন্দ্র করে লেখা হলেও এ বই একেবারেই ইতিহাস বই। তাই শ্রীপান্থর মোহান্ত এলোকেশী সম্বাদ-এর তুলনায় এর চলন অনেকটাই বেশি গম্ভীর। জাল প্রতাপচাঁদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমকালীন ইতিহাসের একটা জাল বিছিয়েছেন ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্র। বইটি উপসংহার বাদ দিয়ে ন’টি চ্যাপ্টারে লেখা, তার দুয়েকটির সঙ্গে প্রতাপচাঁদের গল্পের সোজাসুজি সংযোগও নেই। যেমন তিন নম্বর চ্যাপ্টারের নাম হচ্ছে ‘বাঙালির জমিদার-ভাবনা’।  অন্য একটি চ্যাপ্টারে, যেখানে প্রতাপচাঁদের মামলা কোর্টে উঠেছে, সেখানে মফস্‌সল আর সদর আদালতের ভেতরে যে একটা হায়ারার্কির লড়াই ছিল, সে ব্যাপারে বিশদে বলা হয়েছে। অষ্টম চ্যাপ্টারে লোক চেনা না-চেনার উপায় প্রসঙ্গে লক, লাইবনিৎজের থিওরির কথাও এসেছে।

কিন্তু আমার সবথেকে ভালো লেগেছে সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে লেখা চ্যাপ্টারখানা। কৈশোরে বঙ্কিমচন্দ্রের দাদা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘জাল প্রতাপচাঁদ’ বইখানা পড়ে গৌতম ভদ্রর বাঙালির ইতিহাসের এই পর্বটির প্রতি প্রথম কৌতূহল জাগে। সে কৃতজ্ঞতা তিনি জ্ঞাপন করেছেন ‘ঐতিহাসিক ও তার ইতিহাস’ চ্যাপ্টারে, যা রয়েছে বইয়ের গোড়ার দিকেই। এ চ্যাপ্টারে কোনটা ইতিহাস আর কোনটা ইতিহাস নয় সে গুরুগম্ভীর আলোচনাও যেমন আছে, তেমনি সঞ্জীবচন্দ্র মানুষটির কথাও আছে। আমি এতদিন ভাবতাম প্রতিভাবান বাবামায়ের ছেলেমেয়ে হওয়াই বুঝি জগতের শ্রেষ্ঠ জ্বালা, এখন বুঝছি প্রতিভাবান ভাইয়ের দাদা হওয়ারও জ্বালা কম নয়। ‘মেজদা’র প্রতিভা ঠিক পথে প্রবাহিত হচ্ছে কি না সে নিয়ে বঙ্কিমের সর্দারি, জাস্ট ভয়াবহ। কিন্তু সে নিয়ে এখানে বলে লাভ নেই। আপনাদের জানার ইচ্ছে থাকলে বইটা জোগাড় করে পড়ে ফেলুন। 

*****

ছবির উৎস ইন্টারনেট


October 04, 2016

স্বধর্ম




"প্রত্যেক মনীষীরই একটি বিশেষ প্রতিভা থাকে - নিজের রাজ্যেই সে সিদ্ধ। কবির সিদ্ধিও তার নিজের জগতে; কাব্যসৃষ্টির ভিতরে। আমরা হয়তো মনে করতে পারি যে যেহেতু সে মনীষী কাজেই অর্থনীতি সম্বন্ধে - সমাজনীতি, রাজনীতি সম্বন্ধে, মননরাজ্যের নানা বিভাগেই, কবির চিন্তার ধারা সিদ্ধ। আমাদের উপলব্ধি করে নিতে হবে যে তা নয়। উপকবির চিন্তার ধারা অবশ্য সব বিভাগেই সিদ্ধ - যেমন উপ-দার্শনিকের। কিন্তু প্রতিভা যাকে কবি বানিয়েছে কিংবা সঙ্গীত-বা-চিত্রশিল্পী বানিয়েছে - বুদ্ধির সমীচীনতা নয়, - শিল্পের দেশেই সে সিদ্ধ শুধু - অন্য কোথাও নয়। একজন প্রতিভাযুক্ত মানুষের কাছ থেকে আমরা যদি তার শ্রেষ্ঠ দান চাই, কোনো দ্বিতীয় স্তরের দান নয়, তাহলে তা পেতে পারি সেই রাজ্যের পরিধির ভিতরেই শুধু যেখানে তার প্রতিভার প্রণালী ও বিকাশ তর্কাতীত। শেক্সপীয়রের কথাই ধরা যাক - তাঁর এক-একটি নাটক পড়তে পড়তে বোঝা যায়, মনোবৈজ্ঞানিকের কাছে যেমন করে পাই তেমন করে নয়, মানবচরিত্র ও মানুষের প্রদেশ সম্বন্ধে নানা রকম অর্থ ও প্রভূত সত্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেল কাব্যের সমুদ্রবীজনের গভীরে গভীরে মুক্তোর মতো, কিংবা কাব্যের আকাশের ওপারে আকাশে স্বাদিত, অনাস্বাদিত নক্ষত্রের মতো সব খুঁজে পাওয়া গেল যেন। কারণ এখন আমরা প্রতিভার সঙ্গে বিহার করছি যেই রাজ্যে যেটি তাঁর নিজস্ব। কিন্তু শেক্সপীয়রকে যদি ইংলন্ডের কোনো জনসভায় দাঁড়িয়ে প্রবন্ধ পাঠ করতে হতো এলিজাবেথীয় সমাজ সম্বন্ধে, আমি ধারণা করতে পারি না যে অন্য কোনো অভিজ্ঞ সমাজনীতিবিদের চেয়ে তা কোনো অংশে অসাধারণ কিছু হত (হয়তো হাসি তামাশা এবং যুক্তিহীন মুখর প্রশংসা থাকত সেই সমাজ ও সমাজপতিদের সম্বন্ধে)। কিংবা শেক্সপীয়রকে যদি ইংলন্ডের কোনো বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে ইংলন্ডের তখনকার রাজনীতি সম্বন্ধে বক্তৃতা দিতে হত, সে অভিভাষণের ভিতর কোনো বাগ্মিতা থাকত বলে মনে হয় না  - তা নাই বা থাকল - কিন্তু তেমন কোনো সারবত্তা থাকত না ইংলন্ডের তখনকার রাজনীতিজ্ঞদের আলোচনায়ও যেটুকু রয়েছে; কিংবা তার ঈষৎ প্রতিবিম্বও থাকত না শেক্সপীয়রের নিজের কাব্যে অন্যরকম সারবত্তার যে আশ্চর্য ব্যাপক গভীরতা আমাদের বিস্মিত করে। বৈষ্ণব যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমাদের কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। শেক্সপীয়রের সম্বন্ধে যে কথা বললাম রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধেও ঠিক সেই কথাই বলা চলে - সব কবির সম্বন্ধেই। অন্য সমস্ত প্রতিভার মতো কবি-প্রতিভার কাছেও শ্রেষ্ঠ জিনিস পেতে হলে যেখানে তার প্রতিভার স্বকীয় বিকাশ হবার সম্পূর্ণ সম্ভাবনা সেই শিল্পের রাজ্যে তাকে খুঁজতে হবে; সেখানে দর্শন নেই, রাজনীতি নেই, সমাজনীতি নেই, ধর্মও নেই - কিংবা এই সবই রয়েছে কিন্তু তবু এ সমস্ত জিনিস যেন এ সমস্ত নয় আর; এ সমস্ত জিনিসের সম্পূর্ণ সারবত্তা ও ব্যবহারিক প্রচার অন্যান্য মনীষী ও কর্মীদের হাতে যেন - কবির হাতে আর নয়।"

                                                                                         ---জীবনানন্দ দাশ, কবিতার কথা



October 02, 2016

এ মাসের বই/ সেপ্টেম্বর ২০০৬ (১)/ ছোট্ট একটা স্কুল, পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা



ছোট্ট একটা স্কুল/ শঙ্খ ঘোষ


উৎস গুগল ইমেজেস


শিশু সাহিত্য সংসদের সামান্য ময়লা হলুদ রঙের মলাটে সবুজ গাছে ঘেরা লাল ছাদ আর তিনকোণা দরজার মাথাওয়ালা চকমেলানো স্কুলবাড়ির ছবি দেখে সেটা তুলে নিয়েছিলাম। কেনার সিদ্ধান্ত নিতে আরও সাহায্য করল বইয়ের দাম। ষাট টাকা মাত্র। 

"স্বাধীনতার কয়েক বছর আগে থেকে যে-স্কুলটিতে” শঙ্খ ঘোষ পড়েছেন, তারই স্মৃতিচারণ নিয়ে তৈরি বই ছোট্ট একটা স্কুল। কিছু উল্লেখ দেখে বোঝা যায় স্কুলটা ওপারবাংলার, ব্যস, নামধাম আর কিছু জানা যায় না।  

তবে বোঝা যায় যে স্কুলটা ভালো। বা বলা উচিত অন্যরকম। ভালো স্কুল আজকাল মোড়ে মোড়ে, চিলেকোঠায় চিলেকোঠায়, বেসমেন্টে বেসমেন্টে। তাদের সঙ্গে একে গুলিয়ে ফেললে বিপদ।এই স্কুলের দায়িত্ব যাদের হাতে তাঁরা অন্যরকম। তাঁরা সিলেবাসের বাইরের পড়া পড়ান, ছুটির পর ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থীদের শশা খাইয়ে স্পেশাল ক্লাস নেন, বসন্তের রাতে খোলা মাঠে গিয়ে পাঁচ ব্যাটারির টর্চের আলোয় ছাত্রদের কালপুরুষ, সপ্তর্ষি, ধ্রুবতারা চেনান। এই স্কুলে ক্লাসে ক্লাসে গণতান্ত্রিক পার্লামেন্ট বসানোর আইডিয়া আসে হেডমাস্টারমশাইয়ের মাথায়, কিংবা ইনভিজিলেটরহীন পরীক্ষার কথা। বোঝান, পরীক্ষার হলে বাঘের মতো পাহারা দেওয়া মাস্টারমশাইদের উপস্থিতিটা যতটা না ভয়ের তার থেকে বেশি লজ্জার। বলেন, 

“কেন তোমাদের পাহারা দিতে হবে? ঘরে যদি কেউ না থাকে তাহলেই কি তোমরা এ ওর দেখে লিখবে? বই খুলে লিখবে? মাষ্টারমশাইরা কি কেবল সেইটে ঠেকাবার জন্য বসে থাকবেন ঘরে পুলিশ হয়ে? পরীক্ষার ঘর কি তবে একটা চোরপুলিশের খেলা? দেখো তো ভেবে? তোমাদের কি এইটুকুও বিশ্বাস করা যাবে না? শুধু সন্দেহই করতে হবে?” 

এই স্কুলে ভাষা আর সম্প্রদায়ের সম্পর্ক ছোটবেলাতেই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় যে শহীদুল্লাহ্‌-এর থেকে ভালো ফারসি জানতে পারেন আর শহীদুল্লাহ্‌ যে সুনীতিকুমারের থেকে বড় সংস্কৃতজ্ঞ হতে পারেন, দিনের আলোর মতো এই সোজা এবং স্বাভাবিক কথাটা এই স্কুলের ছাত্রদের ছোটবেলাতেই বুঝিয়ে দেওয়া হয়। সত্যি কথাটা জানার সঙ্গে সঙ্গে তাতে আরও একটা সুবিধে হয়। বড় হয়ে ভারি ভারি বই পড়ে এবং তত্ত্বালোচনা পড়ে এই সোজা সত্যিটা আবিষ্কার করে নিজের প্রগতিশীলতায় নিজে মুগ্ধ হওয়ার এবং বাকি সকলের অনগ্রসরতা দেখে তাদের মানুষ না মনে করার বিপদটাও কাটে।

অথচ স্কুলটা খুব চেনাও। এই স্কুলেও অভিভাবকরা ছিলেন, যারা মাস্টারমশাইদের সিলেবাসের বাইরের জিনিসপত্রের প্রতি অনুরাগের মর্ম বুঝতে পারতেন না, এই স্কুলেও ফাঁকিবাজ ছাত্ররা ছিল যারা বাংলা পরীক্ষায় অবধারিত একটি বর্ষার দিন রচনা লিখে আসত, এই স্কুলের সেই সেকালের ছাত্রদেরও আজকালকার স্কুলের একেলে ছাত্রদের মতো নতুন ক্লাসে উঠে নতুন বইয়ের মালিক হতে ভালো লাগত, মলাট দিয়ে তাতে পরিচ্ছন্ন লেবেল লাগিয়ে মালিকানার ঘোষণা ভালো লাগত, নতুন বছরের শুরু থেকেই মন দিয়ে পড়াশোনা করার ইচ্ছের (এবং আমার ঘোর বিশ্বাস এক সপ্তাহ যেতে না যেতে সে ইচ্ছের অন্তর্ধানের) ব্যাপারেও এ স্কুলের পড়ুয়াদের সঙ্গে অন্য স্কুলের পড়ুয়াদের আশ্চর্য মিল।

ছোট স্কুল নিয়ে লেখা বইয়ের আয়তনও ছোট। লম্বাচওড়ায় মোটে এক বিঘত, পাতার হিসেবে বাহান্ন পাতা। কিন্তু শঙ্খ ঘোষের বাকি সব ছোট বইয়ের মতোই, আসলে বইটা অনেক বড়। কারণ এই বইটা আপনি একবার পড়বেন না। অনেকবার পড়বেন। আর প্রত্যেকবারের পড়া যোগ করলে আসলে এটা হয়ে যাবে বিরাট একটা বই। আর শেষ করে যখন বইটা মুড়ে রাখবেন, কোথাও কোনও দুঃখের কথা না লেখা থাকলেও, রসগোল্লা ছুঁড়ে কুল পাড়ার বর্ণনা আর নাটকের স্টেজে গোলমালের গল্প দিয়ে বোনা হলেও, আপনার গলার কাছটা ব্যথা করে চোখ ভিজে যাবে। আর তখনই প্রমাণ হয়ে যাবে ছোট্ট স্কুল নিয়ে লেখা বইটা আসলে কতখানি বড়।


*****


পূজাবার্ষিকী ১৪২৩ আনন্দমেলা


উৎস গুগল ইমেজেস

এখনও কেন আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী পড়ি, সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। পড়ি, কারণ অভ্যেস। মানতে চাই না চাই, একটা নস্ট্যালজিয়ার ব্যাপার আছে। এই অভ্যেসটা আমি ছাড়তে রাজি নই। 

তাছাড়া না পড়েই বা কী করব। হয় ইউটিউব দেখব নয় গেম খেলব। দুটোর থেকেই আনন্দমেলা পড়া বেটার।

আনন্দমেলার কথা বলতে আমি প্রধানত ফিকশনের কথাই বলব। বিশেষত উপন্যাস। কমিকসের ছবির বিচার আমি করতে পারব না, করলে গল্পের বিচার করতে হবে। তবু বই খুলে যেহেতু কমিকসগুলোই আগে পড়ি তাই ওগুলোর কথাও বলা যাক। ফেলুদা কমিকস-এ এবার নয়ন রহস্য। গল্পটা আমার এমনিতেই খুব একটা সুবিধের লাগে না। সোনার কেল্লার অদ্ভুত বালক, কর্ভাস-এর সম্মোহনবিদ্যা জানা জাদুকর ইত্যাদি খাপচা খাপচা করে নিয়ে বানানো মনে হয়। হয়তো মনে হওয়াটা অযৌক্তিক কিন্তু মনে হয় যখন তখন তাকে আর অস্বীকার করি কী করে। 

এবারের সংখ্যার আরেকটি কমিকস হল সমরেশ বসুর লেখা অবলম্বনে ‘গোগোল কোথায়’। গোগোল হচ্ছে সেই ধরণের চরিত্র যারা বাবামায়ের কথা না শুনে অন্ধকার বাড়িতে ঢুকে বিপদে পড়ে। তারপর নানা বীরত্ব দেখিয়ে সে বিপদ থেকে নিজে মুক্তি পায় এবং রহস্য সমাধা করে অপরাধীদের ধরিয়ে দেয়। তখন সবাই তাকে ধন্য ধন্য করে। আমি এই রকম করে দাউদ ইব্রাহিমকে ধরিয়ে দিলেও আমার বাবামা আমার কান মুলে বলবেন, বারণ করেছিলাম তবু ওখানে গিয়েছিলে কেন। আমিও হয়েছি তাঁদেরই মতো নিড়বিড়ে আর গতে বাঁধা, তাই আমার এধরণের বীরত্বে মুগ্ধতার থেকে বিরক্তি বেশি লাগে। তবে এত বেশি বিরক্ত হওয়াও বিরক্তিকর, তাই না হওয়ার চেষ্টা করছি। 

এবার আনন্দমেলা পড়তে গিয়ে আবারও যে কথাটা টের পেলাম সেটা হচ্ছে আমার গানের মাস্টারমশাই কত বুদ্ধিমান লোক ছিলেন। উনি বলতেন, ওরে কী গাইছে সেটা কথা নয়, কে গাইছে সেটাই কথা। জীবনের সব ক্ষেত্রেই এ কথার সত্যতা টের পেয়েছি, লেখাও তার ব্যতিক্রম নয়। এবারের আনন্দমেলায় উপন্যাস আছে ছ’টি। একটির প্রেক্ষাপট ঐতিহাসিক (ভগবানের আপন বেশ, দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়), একটি ছোট ছেলের ডায়রির ফর্মে লেখা (বাঘার আশ্চর্য ডায়রি, ঋতা বসু), একটি কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক (অপারেশন অগ্রদূত, অনির্বাণ বসু), একটি পাড়ার বড়লোক এবং চায়ের দোকানে কাজ করা ছেলেদের বন্ধুত্ব নিয়ে (আনাড়ি, পারমিতা ঘোষ মজুমদার), একটি সমকালীন অ্যাডভেঞ্চার (রাতদুপুরে ভয়ঙ্কর, মণিশঙ্কর দেবনাথ), একটি মফস্বলের ব্যাংক ডাকাতি (বুদ্ধুস্যারের বুদ্ধি, তিলোত্তমা মজুমদার)। আর আছেন শীর্ষেন্দু, তাঁর ‘নন্দীবাড়ির শাঁখ’ গল্প নিয়ে। 

বাকি উপন্যাসগুলোর বিষয় বললাম আর শীর্ষেন্দুরটার বললাম না কেন? কারণ ও গল্পের বিষয় আপনারা সকলেই জানেন। গত দশ বছরে বিষয়ের কোনও পরিবর্তন হয়নি। এমনকি ছবিগুলোও এক। সেই গঞ্জ/মফস্বল সেটিং, সেই ধসে পড়া জমিদারবাড়ির আলাভোলা ছেলে আর তার চাকর, সেই কোনও একটা স্পেশাল জিনিসের (এক্ষেত্রে সেটা জমিদারবাড়ির মন্দিরের শাঁখ) পিছু ধাওয়া করা দুষ্টু লোক, সেই নিড়বিড়ে এক চরিত্র যিনি দুই দলের মাঝখানে পড়ে নাকাল, সেই কুস্তির আখড়া, এবং গল্পের শেষে সেই নিড়বিড়ে ভদ্রলোকের কুস্তির আখড়ায় গিয়ে বলশালী হয়ে ওঠার সংকল্প। 

এবং এই একই চর্বিতচর্বণ সত্ত্বেও শীর্ষেন্দুরটাই বেস্ট। কারণ সেই কী গাইছে আর কে গাইছে। তরতরে ভাষা আর গল্প বলার ভঙ্গি। অন্য গল্পগুলোও ভালো কিন্তু দীর্ঘ তথ্যমূলক প্যারাগ্রাফের এসে পড়া, সাসপেন্সের ইলাস্টিক টানতে গিয়ে ছিঁড়ে যাওয়া, শেষ পাতায় হুড়মুড় করে সব ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রবণতা ইত্যাদির প্রকোপ ভরপুর। 

ভালো লেখক ভালো লিখবেন এই যুক্তিতে আমার তিলোত্তমা মজুমদারের উপন্যাসখানাও ভালো লাগা উচিত ছিল কিন্তু স্যাডলি সেটা একটু ব্যতিক্রম হয়ে গেছে। তিলোত্তমার গল্পটা ভালোই, মুশকিলটা হয়েছে বড় বেশি “ভালো”। ও গল্পের মূল চরিত্রদের বাড়ির কেউ টিভি দেখে না, সবাই অংকে আর ফিজিক্সে তুখোড়, প্রতিবেশীর ছেলে রোজ ভোরে শুদ্ধ হিন্দুস্থানি মার্গসংগীত সাধনা করে, একটা সুর এদিক থেকে ওদিক হয় না। যে বেচারা ভিলেন, সে বেচারারই খালি চুলে স্পাইক। এই 'আদর্শ' পরিবেশের আমদানি করতে করতেই অধিকাংশ সময় চলে গেছে, ক্রাইসিস অর্থাৎ ব্যাংক ডাকাতির ভাগে সময় পড়ে গেছে কম। 

ছোটগল্পের মধ্যে আমার স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর মৌমাছি, পিঁপড়ে বা সুতো গল্পটি বেশ ভালো লেগেছে। 

আনন্দমেলা পড়ি কেন সেটা তো গোড়াতেই বলেছি, কিন্তু পড়ে এত নিন্দা করি কেন, সেটা আমার ধারণা পড়ি কেনর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। গল্পগুলো আমাকে উদ্দেশ্য করে লেখা নয়। আমার বুড়ো চোখে যা যা খুঁত ধরা পড়েছে, যাদের জন্য লেখা তারা হয়তো সে সব ধর্তব্যের মধ্যেই আনবে না। আর তাহলেই লেখা সফল। 



October 01, 2016

সাপ্তাহিকী



"স্বপ্ন তো অনেক দেখেছি। তবে একবার একটা ইন্টারেস্টিং স্বপ্ন দেখেছিলাম। কেওড়াতলা শ্মশান থেকে যে সিঁড়িগুলো নেমে গেছে জলের দিকে, ওটাকে অনেকে আদি গঙ্গাও বলে থাকেন, ওখানে গঙ্গায়  জোয়ার ভাঁটা আসে। কেন জানি না ওই ঘাটটাকে নিয়ে আমি অনেক স্বপ্ন দেখেছি। যা হোক, স্বপ্নটা ছিল এইরকম, আমি দেখলাম সেই ঘাটটায় একটা নৌকো এসে দাঁড়িয়েছে। ওটা যেন ঘাট পেরিয়ে গঙ্গা, গঙ্গা থেকে মোহনা তারপর সমুদ্রে পড়বে। …তো আমি দেখছি ঘাটে একজন মেয়ে মাঝি সেই নৌকার পাটনি। সে-ই নৌকা বাইবে আর কি। চারদিকে খুব ভিড়। অনেক টেম্পো বোঝাই জিনিসপত্র। এমন সময় দেখি ভিড় ঠেলে বঙ্কিমচন্দ্র আসছেন, সেই মাথায় শামলা যেমন সাজতেন আর কি। তাঁকে দেখেই মেয়ে মাঝি স্পষ্ট বীরভূমের ভাষায় বলল, আপনি ধড়াচুড়ো ছেড়ে আসেন কেনে। উনি তাড়াতাড়ি সব ছেড়ে-টেড়ে একটা খেটো ধুতি পরে এলেন।…।

…এরপর রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সঙ্গে বহু মালপত্র। তাঁকেও মাঝি এত জিনিসপত্র নিয়ে উঠতে দিলেন না। শুধু হাতে একটা চটি বই, সম্ভবত চতুরঙ্গ হবে, নিয়ে উঠে পড়লেন তিনি। সবচেয়ে হাইট হয়েছিল শরৎচন্দ্রের বেলায়। তাঁকে তো মাঝি সরাসরি বলেছিল, তুমি বাপু পরের খেপে। …পরের খেপ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তীরে দাঁড়ান যত শারদ ঔপন্যাসিকরা ছিল তাদের মালপত্র নিয়ে সরে গেল, আর যেমন গ্রিক কোরাসে হয় এমন একটা রব শুনলাম। জায়গাটা এক্কেবারে ফাঁকা হয়ে গেল, বেশ মনে আছে। তারপর দেখলাম মানিকবাবু এলেন। হাতে একটা টিনের সুটকেস দড়ি দিয়ে বাঁধা, তাতে লতাপাতা ইত্যাদি আঁকা। তো তাঁকে আমরা ঠেলেঠুলে নৌকায় তুলে দিলাম। কমলদা অর্থাৎ কমলকুমার মজুমদার গটগটিয়ে উঠে পড়লেন। সুনীলকে নিয়ে বেশ মজা হয়েছিল। সে কিছুতেই উঠতে চাইছে না আর আমরা তাঁকে তুলবই। এমনটা হতেই সুনীল শক্তির খোঁজ করল। কে যেন বলল, স্বপ্নে বোঝা যায়নি, শুধু তার কণ্ঠস্বর শুনেছিলাম, শক্তি তো আগেই একটা বয়া ধরে দূরে অপেক্ষা করছে। নৌকা এগোলেই সে উঠে পড়বে।…

…নৌকা ছাড়ার মুহূর্তে দেখেছিলাম কোথা থেকে একটা কাক কুয়াশার ভেতর থেকে উড়ে এসে মাস্তুলে বসল। এভাবেই স্বপ্নটা শেষ হয়েছিল, তো স্বপ্নটা বলার পর উৎপল (উৎপলকুমার বসু) বলেছিল কাক কোথায়, ওতো জীবনানন্দ দাশ। প্রান্তরের কুয়াশায় উড়ে যেতে দেখিনি কি কাক, পড়েননি?"

(৯-২-১৯৯৭ এ প্রতিদিন-এ 'খোয়াবনামা' নামে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটি লেখার অংশ। লেখাটিকে অনুলিখন বলে জানানো হয়েছে।) 

*****



ব্রেন সুস্থ রাখতে অষ্টপ্রহর কানে গান গুঁজে রাখা বন্ধ করুন। 

এম আই টি-র বিজ্ঞানীরা এমন ক্যামেরা বার করেছেন যা বন্ধ বই পড়ে ফেলতে পারে। 

আমার যদি অনেক টাকা থাকত তাহলে আমি অবান্তরের সব পাঠককে এই কার্ডটা পাঠাতাম। 

স্পয়লার সম্পর্কে আমারও ঠিক এই মত।

অর্চিষ্মান আর আমার সংসারে এই যন্ত্রটা একটা জরুরি সংযোজন হতে পারে। 

কুইজ/খেলা

অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে টাটকা যোগ হওয়া গোটা দশ শব্দের মানে বলতে পারেন কি না দেখুন তো। 

এই বইগুলো কেন ব্যান হয়েছিল বলুন দেখি। 

এ সপ্তাহের গান



 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.