অটবী ও জারুল







আমার একটা আফসোস যে স্টিফেন কিং- এর 'অন রাইটিং' বা অ্যান ল্যামটের 'বার্ড বাই বার্ড'-এর মতো লেখা নিয়ে লেখা, বা লেখাকে ঘিরে আত্মজীবনী বাংলা ভাষায় কেউ লিখলেন না কেন। লীলা মজুমদার যদি বলে যেতেন ওইরকম মায়া কী করে সৃষ্টি করা যায়, নীললোহিত যদি লিখে রেখে যেতেন কী করে দৃষ্টিকে ঘুরিয়ে নিয়ে একটা সাধারণ মানুষ/দৃশ্য/গল্পকে অসাধারণ করে তোলা যায়, শীর্ষেন্দু যদি এখনও লিখে রেখে যান রোজকার হরেদরে ভাষা ব্যবহার করে ওই রকম নাব্য গাম্ভীর্য কী করে বুনে চলা যায় - বাংলার লেখককুল এবং বাংলা ভাষা, সম্পদশালী হত।

কেউ কেউ বলবেন, কচু হত। ও সব কি আর শেখানো যায়? একজন বিদেশের এম এফ এ জাতীয় প্রোগ্রামে লেখা শেখানো হয় শুনে মুখ বেঁকিয়ে বলেছিলেন, কই আমাদের বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিককে তো ওই সব কোর্স করে লেখা শিখতে হয়নি, যত্তসব। অনেক লোকে এখনও বিশ্বাস করেন, সাহিত্যকর্ম, বগল বাজাতে পারা বা কান নাচাতে পারার মতো একধরণের ক্ষমতা, যা নিয়ে জন্মাতে হয়। টিপস দিয়ে শেখানো যায় না।

বোঝাই যাচ্ছে, আমি তাদের দলে পড়ি না। কারণ আমি অসুবিধেজনকরকম আশাবাদী। যদিও চল্লিশ বছর বয়স হল, আমি এখনও বিখ্যাত হওয়ার আশা ছাড়িনি, উপন্যাস লেখার স্বপ্ন ভুলিনি, লেখা শেখার আশা ছাড়া তো দূর অস্ত। এ আশার রোগ আমার মায়ের থেকে পাওয়া। মা পঁয়তাল্লিশ পেরিয়ে সেতার শেখার ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলেন, চল্লিশে লেখা শেখার আশা ছাড়লে আমি মায়ের মেয়ে নই।

সেই আশায় আমি দিবারাত্র অথরটিউব দেখি। ফিলার ওয়ার্ডস কাকে বলে, পয়েন্ট অফ ভিউ কী করে স্থির করে, সাইকিক ডিস্ট্যান্স খায় না মাথায় দেয় জিজ্ঞাসা করুন, গড়গড়িয়ে বলে দেব। থ্রি অ্যাক্ট স্ট্রাকচার, প্লটিং, প্যান্টসিং, ডিসকভারি রাইটিং - গল্প লেখার যতরকম কায়দা, সংজ্ঞা এবং শ্রেণীবিভাগ, সব আমার জিভের ডগায়, নখের আয়নায়।

আপনি বলতে পারেন, আর কী, বলছ যখন বিশ্বাস করছি, কিন্তু লেখা পড়ে তো...

এই কারণটার জন্য আমি অবান্তরে লেখা নিয়ে লিখতে ভয় পাই। গুছিয়ে জ্ঞান ফলালাম, আর লোকে পড়ে এসে কমেন্ট করল, (বা ডিনারে রুটি বাঁধাকপি খেতে খেতে পাশের লোকের সঙ্গে হাসাহাসি করল) "ডক্টর, হিল দাইসেলফ" বা "আপনি আচরি ধর্ম'" ইত্যাদি ইত্যাদি - তাহলে খুবই কান-গরম করা লজ্জার ব্যাপার হবে।

তবু ইচ্ছেটা যায় না। তাই ভাবছি, মাঝে মাঝে যদি লেখা নিয়ে আমি কী কী জানি সেটা না ফলিয়ে, লেখা নিয়ে কী কী আমি জানি না বা জানা সত্ত্বেও পারি না, সেই নিয়ে লিখি তাহলে বেশ সব কূল রক্ষা হয়। শখও মেটে, লোকের কাছে হাস্যাস্পদটাও একটু কম হওয়া যায়। আর লেখা নিয়ে লেখার একটা উত্তম সুযোগ হচ্ছে যখন নিজের লেখা কোথাও একটা ছাপা হচ্ছে সেই খবরটা দেওয়ার সময়। না হলে, এই রইল লিংক ইচ্ছে হলে পড়ুন না হলে ইগনোর করুন লিখে ক্ষান্ত দিতে হয়, মন খুঁতখুঁত করে।

আজ আমার লেখাসংক্রান্ত যে সমস্যাটার কথা বলব সেটা নিয়ে আগেও সম্ভবতঃ বলেছি, তবু আরেকবার বলছি। কারণ সেই সমস্যাটার প্রকোপ, আজ যে গল্পটা ছাপা হয়ে বেরিয়েছে তার ওপর প্রবলভাবে পড়েছে।

আমি একেবারে নাম রাখতে পারি না। অনেকে দারুণ দারুণ নাম রাখতে পারেন। আজকাল বড় বড় নাম রাখার চল হয়েছে। দুটো অধুনাপ্রকাশিত জনপ্রিয় বাংলা বইয়ের নাম বলছি -  'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি' এবং 'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও আসেননি'।

এক, এই নাম শুনলে একবার ভোলা কঠিন, দুই, আজকাল সব জিনিসই লোকে গুগল করে।  'রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি' যদি এত লম্বা নাম মনেও না থাকে, রবীন্দ্রনাথ + আসেননি লিখে এন্টার মারলেও হাইলি তিন চার নম্বরে বইয়ের খোঁজ পেয়ে যাবেন। আর যদি ধরুন বইয়ের নাম রাখতেন, স্রেফ, রবীন্দ্রনাথ; গুগল করলে আপনার বই কত নম্বর সাজেশনে আসত বলে আপনার মনে হয়?

গদ্যসাহিত্যের নাম রাখার আমার মতে সবথেকে উমদা উপায় হচ্ছে কবিতার দ্বারস্থ হওয়া। আমার প্রিয় তিনটে বইয়ের নাম যা এই মুহূর্তে মনে আসছে - Grapes of Wrath, Mirror Cracked from Side to Side, Drive Your Plow Over The Bones Of The Dead - প্রতিটি বইয়ের নামই কবিতার লাইন থেকে রাখা। বাংলা কবিতা অনুপ্রাণিত নামকরণের উদাহরণও পূর্বোক্ত একই লেখকের গুডরিডস লিস্ট থেকে পাচ্ছি, 'কেউ কেউ কথা রাখে'। 'রবীন্দ্রনাথ অনুপস্থিত' সিরিজের মতো ভালো হয়নি, বলতেই হচ্ছে।

আমার পক্ষে কবিতা থেকে নাম রাখা একেবারেই অসম্ভব, কারণ চয়েস খুবই লিমিটেড হয়ে যাবে। কাতুকুতু বুড়ো কিংবা হুঁকোমুখো হ্যাংলা টাইপের নাম দিয়ে কাজ চালাতে গেলে যে রকম গল্প লিখতে হবে, তত প্রতিভা আমার নেই, সে আমি এই চল্লিশ বছরে মেনে নিয়েছি। কাজেই আমার নামকরণের অন্য রাস্তা বাছতে হয়েছে।

আমার চরিত্রের সঙ্গে যেমন খাপ খায়, ঠিক তেমন রাস্তাই বেছেছি। ফাঁকিবাজি এবং দায়সারা। মেন চরিত্রদের নাম দিয়ে কাম সেরে দেওয়া। এ বারের চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের 'অটবী ও জারুল' গল্পের নামের পেছনেও সেই ফাঁকি আছে।

সামনের বারের গল্পে আমার লেখার আসল সমস্যা, ডেডলাইনের বাড়াবাড়ি রকম কাছে না এসে, ব্লাডপ্রেশার (আমার এবং সম্পাদকের) না বাড়িয়ে, মাথার চুল আরও দু'গাছি না পাকিয়ে লেখা জমা দিতে না পারা নিয়ে চর্চা করব।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এ নভেম্বর মাসের মেলট্রেনে বেরোনো আমার লেখা গল্পের লিংক নিচে রইল।



Comments

  1. ami goto mashe apnar blog er sondhan pelam. tarpor ekdom purano ta theke shuru korlam. porte porte 2014 er November porjonto esechi. eto moja kore nijer bodnaam korte shudhu ekjonkei dekhechi, tini holen Nobonita Debsen :). Khub moja pachhi. Apnar Ma, Thakuma, Baba sobai ke bhishon chena manush mone hochhe. Apnar sathe nijer onek mil o pachhi. Amar o facebook account nei...keno nei seta keu jiggasha korle uttor deoata kothin. Kintu amar bhetore jani uttor ta apnar motoi.....purano bandhobir honeymoon er chobi dekhte ba tar kena bishal barir chobi dekhte kano amar bhalo lagbe?
    Jai hok..likhte thaken, bhalo thaken. Ami araam kore apnar blog porte thaki. Majhe majhe ese comment kore jabo.

    ReplyDelete
    Replies
    1. অবান্তরে স্বাগত। আর্কাইভের দৈর্ঘ্য দেখেই বুঝতে পারছেন আমি এবং অবান্তর কত বুড়ো হয়েছি। তাতে একটা সুবিধে হচ্ছে যে আমাদের অনেক পুরোনো বন্ধু আছে এবং সে বাবদে আমরা মনে মনে খুবই গর্বিত। কিন্তু এখনও যে নতুন করে কেউ আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাতে চাইতে পারে সেটা একটা অবিশ্বাস-মেশানো ভালোলাগা আর কৃতজ্ঞতা জাগায়। থ্যাংক ইউ। আশা করি পরিচয় দীর্ঘজীবী হবে।

      Delete
  2. আমি একটা extended যৌথ পরিবারের নবম প্রজন্মের সদস্য। প্রজন্মটা আসলে এমনি বলা, যা ইতিহাস জানা/লেখা রয়েছে সব আগের আট পুরুষের। যেমন হয় আর কী!
    তো সেখানে খুব যত্ন করে একটা উল্লেখ আছে, ঐ জেলার শেষ নথিবদ্ধ স্বেচ্ছায় (!) সহমরণের ঘটনাটি আমার পরিবারের। প্রচ্ছন্ন গর্বের সুরটুকু চোখ এড়ায়নি।
    বহু বহুদিন পর এই লেখাটায় আমি একইরকম শিউরে উঠলাম।

    কুর্নিশ কুন্তলাদি। এমনই লিখতে থাকুন।

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, ময়ূরী। ভালোলাগা জানতে পেলে কেমন লাগে সেটা বলে বোঝাতে পারব না, তাই ক্ষান্ত দিচ্ছি। থ্যাংক ইউ।

      Delete
  3. গল্প ভালো লেগেছে। জারুল গাছ এই আমি বছর দুয়েক আগে থেকে চিনেছি।

    ReplyDelete
  4. Khub bhalo laglo Golpota Kuntala.

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, সায়ন।

      Delete
  5. বৈজয়ন্তীNovember 6, 2020 at 8:50 PM

    অনেকবার পড়ার পরেও বুঝে উঠতে পারলামনা, ঠিক কিজন্য গল্পটা আমার এতোটা ভালো লেগেছে। অনেকগুলো আলাদা আলাদা লেভেলে ছুঁয়ে গেলো।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, বৈজয়ন্তী, ভালো লাগাটা কনফার্মড তো? তাহলেই হবে। থ্যাংক ইউ।

      Delete
  6. Replies
    1. থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।

      Delete
  7. Darun likhecho Kuntala di eta.. ami jani na 4 number platform er pathok koto...Tobe onek besi manusher kache ei golpo pouchano uchit.. onnorokom bhalo lekha..

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, থ্যাংক ইউ, ঊর্মি।

      Delete
  8. চমৎকার লাগলো কুন্তলাদি।

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, প্রদীপ্ত।

      Delete
  9. Osadharon bhalo laglo. thank you.

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, ইন্দ্রাণী।

      Delete
  10. Oshadharon sundor laglo. Erokom ekta jarul to amra sobai pabona. Amader nijeder e hoe uthte hobe jarul gach

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, সুহানি।

      Delete
  11. আশা করি কুশলে আছেন। গল্পটা পড়ে আমার একটু মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। লিখে বোঝানোর চেষ্টা করছি।

    আগে বেশ কিছু 'slip of pen' বলেনি।
    1। গুলতির প্রেমিকের নাম শুভদীপ আর শুভজিৎ দুইই আছে।
    2। স্ত্রী আচারে উপস্থিত মহিলাদের লিস্টে দিদিশাশুড়ি নেই। পরে তিনিই মুখ্য।
    3। ঐ একই লিস্ট থেকে বর্তমানে বাড়িতে কতজন মেয়ে থাকেন যে বোঝা যাচ্ছে খুবই কম। অন্তত প্রথমে বলা প্রচুর মেয়ের সঙ্গে মিলছে না।

    কিন্তু এগুলি কোনটাই গল্পের মাধুর্য্য কম করে না। গল্প বলার আপনার যে কায়দা তা খুবই সুখপাঠ্য - প্লট এবং চরিত্র চিত্রণ দুইই সার্থক।

    তবে একটা কথা অনেক দিন ধরেই আপনাকে বলব ভেবেও বলা হয়নি। গল্পে আপনি এমন কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করেন, যেটা পড়ার সময় আলাদা করে খোঁচা না দিলেও পরে ভাবতে বসলে অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। আমি গল্প লেখার ব্যাকরণ সম্বন্ধে কিছুই জানি না, তবে কোথাও 'অতিকথন দোষ' বলে কিছু একটা পড়েছিলাম।
    আমার যেগুলো মনে হয়েছে, সেগুলো নীচে দিচ্ছি। এগুলো যে সবসময় অবান্তর তা নয়, তবে কতটা দিলে ভালো লাগবে সেই ব্যালান্সটা বোধহয় জরুরি। সেটা আপনিই ভালো বুঝবেন।

    1। নির্ভীকের ফিনান্সিয়াল ছক - বহুবার ঘুরে ফিরে এসেছে, সবগুলোর দরকার নেই বলে আমার মনে হয়।
    2। প্রথমে বাড়ির মেয়েদের বর্ণনা- "দেখা বলতে নাক, চোখ, মুখ, গ্রীবাভঙ্গি দেখার কথা হচ্ছে না, সে সব দেখতে গেলে কারও নাক খ্যাঁদা কারও চোখা, কেউ ফ্যাটফেটে কেউ অনুজ্জ্বল শ্যাম, চোখ কারও ড্যাবা কারও খুদি। বাড়ির লোকেরা দাবি করে নবজাতক জাতিকার নাকের ভোঁতা আর কপালের উঁচুটায় এখনও নাকি গাঙ্গুলিবাড়ির অব্যর্থ ছাপ খুঁজলে পাওয়া যায়, কিন্তু সেটা দেখতে চেয়ে দেখা হতে পারে।"
    3। শাড়ি কেনার প্রসঙ্গ।
    4। চায়ের সেট এবং কাকিমার চা খেতে চাওয়ার প্রসঙ্গ।
    5। শ্রাদ্ধ কিভাবে হবে সেই প্রসঙ্গ।
    6। শেষে শুভজিৎ/দীপের কি হল সেই প্রসঙ্গ।
    7। জারুল গাছের প্রোটেকশন কতটা এবং কেন দরকার সেই প্রসঙ্গ।

    তাছাড়া এই গল্পটা একটু প্রেডিক্টেবল হয়ে গেছে। সেই শ্বশুরবাড়িতে চিলেকোঠায় আরামকেদারার গল্পটার একটা কাউন্টার যেন। প্রথমটুকু পড়েই আন্দাজ করতে পারলাম।

    আমার কমেন্টের অতিকথন নিজগুণে মাপ করবেন।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরে মাপ করার কিছু নেই, চন্দ্রচূড়। আপনি যে এত পরিশ্রম করে আপনার মতামত জানালেন সে জন্য শুধু ধন্যবাদই প্রাপ্য আপনার। আপনার পয়েন্টগুলো মন দিয়ে পড়েছি, দেখা যাক কতটা কাজে লাগাতে পারি। থ্যাংক ইউ।

      Delete

Post a Comment