বান্ধবগড় ৩ (শেষ): কালচুরি


তালা জোনের গেটের বাইরে দিয়েও চরণগঙ্গা বইছে। উল্টোদিক থেকে মিছিল আসছে। দু'চারজন প্রাপ্তবয়স্কের তত্ত্বাবধানে গোটাতিরিশ কমলা পাঞ্জাবী সাদা পাজামা কিশোর, কমলা শাড়ি সাদা ব্লাউজ কিশোরী। গোড়ালি ডুবিয়ে চরণগঙ্গা পেরোচ্ছে।

জিপসি নদীর এপারে থেমে আছে। একই নদীতে ওদের সঙ্গে নেমে গেলে কমলা সাদা সব কাদা হবে। মিছিলের অগ্রে দুজন ছেলেমেয়ের হাতে ব্যানার। ব্যানারভর্তি বাণী আর এক ভদ্রলোকের বড় করে ছাপা মুখ। চেনা মুখ।

ভাবো, বিবেকানন্দের কোনও আইডিয়া ছিল এত বছর পর, বাংলাদেশ থেকে এত দূরে, এই জঙ্গলের মধ্যে গ্রামে সন্ধে নামার মুখে বাচ্চারা ওর ছবি নিয়ে নারীদিবসের মিছিল বার করবে?

অর্চিষ্মান বলল, এই দৃশ্যটা আমার মনে থাকবে।

মিছিলের দৃশ্যটা?

মিছিল। নদী। বাঘ। বিবেকানন্দ। জিপ। জঙ্গল। সূর্যাস্ত। আমরা।

মিছিল, কুঁচি ও পাজামা সামলে, নদী পার হয়ে গেল। জিপসি স্টার্ট দিল।

লবটুলিয়া এ রকমই ছিল, বল?

চন্দ্রিল ভট্টাচার্য জোরের সঙ্গে বলেছেন - গান গল্প সিনেমা প্রবন্ধের আমাদের জীবনে কিস্যু প্রভাব নেই। একটা গান আমাকে চিরদিনের মতো বদলে দিল, একটা কবিতা জ্ঞানচক্ষু পার্মানেন্টলি খুলে দিল, একটা সিনেমা চিরনরকে ঠেলে দিল - ও রকম হয় না। শিল্পটিল্প মূলতঃ সুপারফ্লুয়াস জিনিসপত্র যা সাময়িক অনুভূতির জন্ম দেয়। গোধূলি গগনে শুনে ভেসে গেলাম, পরক্ষণেই আনন্দবাজার অনলাইনে শোভনবৈশাখীর গণেশপুজো দেখে কুরকুরে মুখের বদলে নাকে ঢুকে যাচ্ছে।

চন্দ্রিল ঠিকই বলেছেন। তাছাড়া অত চিরস্থায়ী প্রভাবের দরকারটাই বা কী? ভালো লাগল, ভুলে গেলাম - এতে ক্ষতি কোথায়? বিশেষ করে সেটাই যখন স্বাভাবিক? অবধারিত? সত্যি? 

সত্যিতে আমাদের অস্বস্তি একটা কারণ হতে পারে। কাল রেগুলার কান মুলছে বলে কালকে জয় করা নিয়ে আমরা অবসেসড। পঞ্চাশ বছরের দমবন্ধ বিয়ে, পাঁচশো বছরের ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তুপ, লক্ষ বছরের ঝাপসা গুহাচিত্র - আমাদের আশ্বাস দেয়। ক্ষণকালের গীতি, যত সুরেই গাওয়া হোক না কেন, চিরকালের স্মৃতি না হয়ে উঠতে পারলে? কিস্যু হয়নি। 

আমার মনে হয় না গান গল্প কবিতা একবার পড়ে বা শুনে ভুলে গেলে তার মহিমা কিছু কম পড়ে। ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। যা থেকে গেছে বলে আমরা দাবি করি - তা থাকে শুধু সেমিনার, প্রবন্ধে, গবেষণাপত্রে। রোজকার বেঁচে থাকায় সে সব শিল্পের কোনও ভূমিকা নেই। সারা দিন পুঁজিবাদের জোয়াল ঠেলে রাতে একঘণ্টা যে গান শুনি, তাকে মুড রিল্যাক্স্যার হিসেবে গণ্য করাই ভালো, চিরন্তন শিল্পকর্মের থেকে।

তাছাড়া চিরন্তন মানেই ভালো কে বলল? আমাকে অমরত্ব অফার করলে আমি এক সেকেন্ড না ভেবে প্রত্যাখ্যান করব। উরসুলা কে লে গুইন-এর The Island of the Immortals যাঁদের পড়া আছে সবাই করবেন। পড়ারও দরকার নেই। কমন সেন্স থাকলে যে কেউ করবে। আমরা যে বিপদ থেকে দৌড়ে পালাচ্ছি সেই একই বিপদ আমাদের প্রিয় শিল্প ও শিল্পীর ঘাড়ে চাপানোর এত হাঁকপাঁক কীসের?

তার থেকে অনেক বেটার বিস্মরণকে নর্ম্যালাইজ করা। যদি মনে পড়ার হয়, পড়বে। এমন কোনও মুহূর্ত যদি আসে, দৈবের বশে বা র‍্যান্ডমনেসে, রোদ বৃষ্টি হাওয়া ঠিকঠিক অনুপাতে মেশে, ভিড় বাসের অন্য প্রান্তে ফোনের আনকমন রিংটোন বাজে - সব ছাপিয়ে কিছু, বা কেউ, এসে দাঁড়াবে। আবার ডুবে যাওয়ার আগে কয়েক মুহূর্ত সব ছাপিয়ে বিরাজ করবে। 

ঠিক যেমন কমলা পলাশ, রাঙা ধুলো, সরু নদী আর রোগা মিছিলের ককটেল যখনই ঘটবে, পশ্চিমি সূর্য একটা বিশেষ অ্যাংগেলে জঙ্গলশুদ্ধু সবুজে কমলা আগুন জ্বেলে দেবে - আরও একটা দিন চিরকালের মতো চলে যাওয়ার, আমাদের বেঁচে থাকাটা আরও একটুখানি ফুরিয়ে যাওয়ার ফিলিং বুকের মধ্যে জাগবে - দিনগত বিস্মরণের বালি ঠেলে উঠে আসবেন বাঙালির বিষাদবিধাতা বিভূতিভূষণ। গোটা পৃথিবীটা লবটুলিয়া হয়ে যাবে।

*****

চাবি নিতে নিতে রিসেপশনের ভদ্রলোককে বললাম, পাঁচটা বাঘ দেখেছি। হোটেলের পেছনে ওপেন এয়ার থিয়েটারে কফি পকোড়া খেতে খেতে প্রোজেক্টারে বান্ধবগড়ে বাঘের ইতিহাস, সীতাচার্জারের প্রেমকাহানি দেখতে দেখতে পাশের দম্পতিকে বললাম, পাঁচটা বাঘ, পঁচিশ মিনিট ধরে দেখেছি। বলতে বলতেই দেখতে আড়চোখে দেখছি একদল লোক হেঁটে হেঁটে চা কফির দিকে এগোচ্ছে। হাতে দস্তানা, পায়ে মোজা, গায়ে একটা হাফ একটা ফুল সোয়েটার, কানে ইয়ারমাফ, মাথায় মাংকিটুপি।

এতক্ষণ হোটেলটার সব ভালো হয়েও কী যেন নেই কী যেন নেই একটা খচখচ করছিল বুকের মধ্যে - কাটল। অর্চিষ্মানের দিকে তাকালাম। ওর চোখও মাংকিক্যাপ ফলো করছে। ওই টিমটিমে আলোতে, প্রোজেক্টরের নীল কাঁপুনিতেও স্পষ্ট, ওরও ফাঁকা লাগছিল এতক্ষণ, আর লাগছে না।

একটার বদলে পাঁচ পাঁচটা বাঘ দেখে বিপুল ব্যবধানে বাজি জেতার উদযাপনে, আর আমার জামানত জব্দ হওয়ার সান্ত্বনা দিতে, জিন অর্চিষ্মানই খাইয়েছিল। আলতো আপত্তি করেছিলাম, বেশি না। জয় যদি মানুষকে উদার না করে - চিন্তার। সে উদারতা অর্চিষ্মানের আছে দেখে আশ্বস্তই হয়েছি ।

*****

প্রথমেই সাসপেন্স শেষ করে দেওয়া যাক। পরদিন ভোরে খিতৌলি জোনে সাফারিতে, তার পরদিন ভোরে আর একবার তালার সাফারিতে গিয়েছিলাম। কোনওবারই বাঘ দেখতে পাইনি। ভালোই হয়েছে। দেখলেও কী দেখতাম? এক ঝলক হলুদ। এক ঝিলিক ল্যাজ। পরিবারের পাঁচজন সদস্য পঁচিশ মিনিট ধরে বাঁশবনে ঘাসবনে দৌড়ে, হেঁকে, হেলেদুলে রাস্তা তো আর পেরোত না। তার থেকে না দেখা বেটার। 

তবে জঙ্গলে বাঘ ছাড়াও অনেক কিছু দেখার থাকে, দেখেছিও। পরে বলছি। আগে খিতৌলি সাফারিতে হোটেলের ক্যান্টরে বিনা বুকিং-এ জায়গা পাওয়ার গল্পটা বলি।

সকালের সাফারির টিকিট আগের দিন বিকেলে বিক্রি হয়ে গেছে তবু ভোরবেলা অর্চিষ্মান বলল, চল কুন্তলা, একবার ট্রাই করা যাক।

ট্রাই করা মানে টিকিট কাউন্টারে যাব। ঘুরঘুর করব, যদি বাড়তি টিকিট নিয়ে কেউ ঘুরঘুর করেন। পাঁচটা পঞ্চান্নয় ঘর থেকে বেরিয়ে সাতান্নয় রিসেপশন পার হচ্ছি, এদিকওদিক থেকে বাবু, মাফলার গুলির মতো ছিটকোচ্ছে, একজন কর্তৃপক্ষ অফিসঘর থেকে কিছু একটা চিবোতে চিবোতে রুমালে হাত মুছতে মুছতে বেরোলেন। 

আমরা হাসলাম। উনি হাত তুললেন। ভঙ্গিটা 'রুকিয়ে' ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না।

অর্চিষ্মান বলল, ইয়ে আমাদের একটু তাড়া আছে, ভোরের সাফারিতে কোনও জিপসিতে দুটো জায়গা যদি পেয়ে যাই, তাই যাচ্ছি।

ভদ্রলোকের মুখ তখনও চলছে। হাত মোছা শেষ। শুকনো হাত নাড়িয়ে আবার দাঁড়াতে বলে কানে ঘাড়ে ফোন চাপলেন। রেজিস্টারের পাতা উল্টোচ্ছেন। অপরচুন মোমেন্টে উলটোদিকের লোক ফোন তুলেছেন। কারণ ভদ্রলোকের মুখও এই মুহূর্তেই খালি হয়েছে।

হ্যালো, হাঁ, দো ক্যান্সেলেশন থা না? ওকে।

ফোন রেখে ভদ্রলোক বললেন, চলে যাইয়ে।

আমরা হাঁ করে আছি, ভদ্রলোক তাড়া দিলেন। ক্যান্টর ছুট রহি হ্যায়, জলদি যাইয়ে। 

রিসেপশনের বাইরেই ক্যান্টর দাঁড়িয়েছিল। প্রায় ভর্তি। খালি একদিকের চাকার ওপরের দুটো সিট ফাঁকা। দৌড়ে উঠে বসে পড়লাম। দেড় মিনিটের মধ্যে ড্রাইভারদাদা উঠে ইঞ্জিন স্টার্ট দিলেন। দেড় মিনিট পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ইঞ্জিন ছাপিয়ে মানুষের গলা। 

কেউ পিছু ডাকছে। আহ্‌। একটা শুভ কাজে বেরোচ্ছি, কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই। 

ক্যান্টরশুদ্ধু সবার ঘাড় ঘুরে গেছে। একজন উর্দিপরা ভদ্রলোক, হাতে মিলিটারিছাপ ঢাকনা পরানো ঝুড়িবাক্স নিয়ে ক্যান্টরের দিকে এগোচ্ছেন।

এই বাক্সগুলো রিসেপশনে রাখা ছিল। সেগুলো একটা একটা করে তুলে লোকজন ক্যান্টরের দিকে হাঁটছিল। বাক্সে কী আছে আমরা জানি। ব্রেকফাস্ট। হোটেলের সাফারি নিলে পাওয়া যায়। কাল রাতে খেয়ে রুমে ফেরার আগে অর্চিষ্মান এমনিই একবার রিসেপশনে ঘুরতে এসেছিল। অর্চিষ্মান মাঝেমাঝেই রিসেপশনে ঘুরতে আসে। বলে, যাই একটু খবরাখবর নিয়ে আসি। যদি জিজ্ঞাসা করি কীসের খবর, বলে, খবরের কি অভাব আছে, কুন্তলা, গেলেই কিছু একটা বেরিয়ে পড়বে। খবরের তো দায় নেই আমাদের কাছে আসার, আমাদেরই খোঁজে খোঁজে থাকতে হবে। 

কাল রাতে ডিনারের পর খবর খুঁজতে অর্চিষ্মান আর অর্চিষ্মানের সঙ্গে আমি রিসেপশনে এসেছিলাম। এক দাপুটে ফ্যামিলি দাঁড়িয়ে সকালের সাফারির ব্রেকফাস্টের অর্ডার দিচ্ছিলেন। বাবা মা ছেলে মেয়ে। দাপুটে পরিবার। কনফিডেন্ট। পোহার সঙ্গে ভাজি কেন নেওয়া যাবে না, ভাজি নিলে কেন পুরি নিতেই হবে - এই রকমের কিছু একটা নিয়ে তর্ক করছিলেন।  সিস্টেমের ইনএফিশিয়েন্সি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছিলেন। 

ক্যান্টরের প্রথম চারটে সিটে তাঁরা আপাতত বসে আছেন। ভুরু কুঁচকে বিঘ্নের কারণ বোঝার চেষ্টা করছেন।

কারণ আমরাই। ঝুড়িবাক্স নিয়ে ভাইসাব আমাদের দিকে সোজা আসছেন।

ছে নম্বর?

হাঁ জি।

পায়ের সামনে চাকাঢাকা উঁচু মেঝেতে ব্রেকফাস্টের ঝুড়ি নামিয়ে রেখে ভদ্রলোক নেমে গেলেন। ক্যান্টর ছেড়ে দিল।

পরে দেখেছি, বাস্কেটে দুটো জলের বোতল, চারটে স্যান্ডউইচ -  দুটো শশাটমেটো, দুটো চিজ, দুটো কলা, ফয়েলে ইয়াব্বড় আটটা পুরি, জাম্বো টিফিনবাক্স ঠাসা আলুর তরকারি, দুই টেট্রাপ্যাক অরেঞ্জ জুস। নুন গোলমরিচ কেচাপের স্যাশে। কাঠের চামচ, কাগজের রুমাল। বাকিরা আগের দিন রাতে অর্ডার দিয়ে যা পেয়েছে, আমরা দেড় মিনিটে তাই পেয়েছি। যদি ধরেও নিই যে ক্যান্সেল করা খদ্দেরদের ব্রেকফাস্টটাই, তবু দেড় মিনিটের মধ্যে মনে করে সেটা তুলে দিয়ে যাওয়াও যথেষ্ট মনোযোগের প্রমাণ। তাছাড়া আমরা তো কিছুই বলিনি, পুরোটাই ওঁদের উদ্যোগে।

এই সব মুহূর্তে আমার কার্ট ভনেগাটের ওই লাইনটা মনে পড়ে।

“And I urge you to please notice when you are happy, and exclaim or murmur or think at some point, 'If this isn't nice, I don't know what is.”

লাইনটা আমি রোজ নিজেকে মনে করাই। কারণ রোজই লাইনটা মনে করার কোনও না কোনও সুযোগ ঘটে। 'হ্যাপিনেস' আর 'আই'-এর জায়গায় অন্য বিশেষ্য আর সর্বনামের পারমুটেশমন কম্বিনেশনেও বাক্যটা খেটে যায়। 

নোটিস হোয়েন আই অ্যাম লাকি। 

নোটিস হোয়েন পিপল আর সিনসিয়ার। 

নোটিস হোয়েন পিপল আর ডেডিকেটেড। কেয়ারিং। গুড অ্যাট হোয়াট দে ডু। 

মনে মনে, কখনও কখনও উচ্চারণ করেও, বলি - ইফ দিস ইজন'ট নাইস আই ডোন্ট নো হোয়াট ইজ। 

*****

ওঁদের ডেডিকেশন উপচে পড়লেও, আমাদের বুদ্ধি কম পড়েছিল। দিল্লিতে থেকে থেকে আমাদের বাকি ভারতবর্ষের গ্রীষ্মশীতের প্রতি একটা তাচ্ছিল্যের ভাব এসেছে। সোয়েটশার্ট প্যাক করতে গিয়েও থমকেছিলাম। দিল্লিতেই  লাগছে না, মধ্যপ্রদেশে লাগবে?

আমাদের ডাঁট মিসপ্লেসড না। নর্ম্যাল পরিস্থিতিতে গরম জামা সত্যিই লাগত না, কিন্তু পরিস্থিতি নর্ম্যাল নয়। খোলা ক্যান্টরের মাথায় বসে চলেছি। চারদিকে শহরের বদলে জঙ্গল। ধোঁয়ার বদলে বাতাস। বাড়ির বদলে গাছ। মানুষের বদলে বাঘ।

হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি লেগে গেল।

আমার অবশ্য অত কষ্ট হচ্ছিল না। ট্রেনিংগত কারণে আমি যে কোনও পরিস্থিতির ভালো মন্দ আরাম কষ্ট অপরচুনিটি কস্ট দিয়ে বিচার করি। এই মুহূর্তে যা ঘটছে সেটা না ঘটলে কী ঘটতে পারত মনে করে - দুটো পরিস্থিতির কস্ট বেনিফিট চুল চিরি। ফলাফল অনেক সময়ই চমকে দেয়।

বিনা সোয়েটারে কাঁপতে কাঁপতে বাঘ দেখতে বেরোনোর বিকল্প ? সোয়েটার পরে বুক ফুলিয়ে বাঘ দেখতে বেরোনো। এক ঘণ্টা পর সূর্য উঠলে আর তাপমাত্রা চড়লে সেগুলো ঘাড়ে করে ঘোরা। বাঘ দেখতে না পেলে ভারাক্রান্ত মন, সোয়েটারক্রান্ত হাত।

বৃষ্টিতে ছাতা ভুলে গোবরভেজা ভেজার বিকল্প? বৃষ্টি থামলে জলটপটপ ছাতা হাতে বিশ্বভ্রমণ।

কনভেয়ার বেল্টে ব্যাগের অপেক্ষায় বুকধুকপুকের বিকল্প? ক্যাবিন ব্যাগেজে যা ধরে সেটুকু প্যাক করে উঠে পড়া। বিয়ে বউভাত হলদি সংগীতে একই শাড়ি পরে ঘোরা। আমার ঘুরতে কোনও অসুবিধে নেই। যাদের দেখতে অসুবিধে হবে, ওয়েল।

সোয়েটার না থাকার আরও একটা বিকল্প সামনের চারটে সিট জুড়ে ছিল। কাল রাতে যারা দল বেঁধে ওপেনএয়ার থিয়েটারে ঢুকলেন, আজ সকালে যারা একে অপরকে বাবুসোনা বলে ডেকে ক্যান্টরে উঠছিলেন, সেই বাঙালি ফ্যামিলি। মধ্যপ্রদেশ দিল্লি ছাড়ুন, অ্যান্টার্কটিকার শীতও তাঁদের টলাতে পারবে না। সোয়েটার, চাদর, দস্তানা, মোজা, মাফলার, মাংকিক্যাপ।

ওভাবে প্রকাশ্যে বেরোনোর থেকেও কাঁপা বেটার। সরি নট সরি।

অর্চিষ্মান প্রবল মাথা নাড়ল। এই রকম শীতে কাঁপার থেকে মাংকিটুপি এনি ডে বেটার, কুন্তলা।

ওয়েল, গণতান্ত্রিক দেশ। সবার নিজের নিজের মত পোষণের স্বাধীনতা আছে। আমি কিছুই বলিনি। শুধু নিজের মতটা জানিয়ে রেখেছি। তুমি কবে থেকে মাংকিটুপি পরার সিদ্ধান্ত নেবে জানিয়ে দিয়ো, পাশের সিটে বসা ছেড়ে দেব। শত প্রেম দিয়েও ও জিনিস মেনে নিতে পারব না।

পরিবারটির সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। চমৎকার লোকজন। এক দম্পতি, দু'পক্ষের বাবামা, শিশুপুত্র। পাত্রপক্ষের বাবামা কিছুদিন গুড়গাঁওতে ছিলেন ছেলের পোস্টিং-এর সূত্রে - সি আর পার্ক থেকে মাছ আর মোচা হোম ডেলিভারি যেত। দামটা একটু বেশি কিন্তু কোয়ালিটি এত ভালো যে গায়ে লাগে না। রিষড়া চিনবেন না কেন, খুব চেনেন।

হাওড়া লিলুয়া বালি উত্তরপাড়া হিন্দমোটর রিষড়া। কেমন?

দারুণ। খালি বেলুড় আর কোন্নগরটা...

মানে?

লিলুয়া বেলুড় বালি আর হিন্দমোটর কোন্নগর রিষড়া...

ওই হল।

শ্রীরামপুরের বাজার থেকেও ভদ্রলোকের মাছ কেনার অভিজ্ঞতা আছে। কোয়ালিটির তুলনায় দামটা বেশ কম।

পরের দু'দিন ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ ডিনারে চায়ে হাই হ্যালো সারার পর দূরের টেবিলে বসে খেতে খেতে আমরা আলোচনা করছিলাম। আমি ওঁদের ভালোমানুষির দিকটা - অর্চিষ্মান ওঁদের সাহসের দিকটা বেশি করে পয়েন্ট আউট করছিল। এরও একটা গল্প আছে। অপ্রাসঙ্গিক কিন্তু প্রাসঙ্গিক ইজ ওভাররেটেড।

অনেক বছর আগে, অর্চিষ্মানের এক বন্ধু আর বন্ধুর বউ, দক্ষিণ ভারতের কুল শহর থেকে বৈষ্ণোদেবী না জয়সলমির কোথায় যাওয়ার পথে এক সন্ধে দিল্লিতে থেমেছিল। বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে আসার টাইম নেই না তাই অর্চিষ্মান গেছিল বাইরে ডিনারে দেখা করতে। অত বন্ধু লাগে তো নিজে বানাও আমার বন্ধুত্বের মাঝে টাং আড়িও না, বলে আমাকে ফেলে একাই গেল। আমি ফাঁকা ঘরে বসে কাঁদতে লাগলাম।

যথাযথ সময় পার করে মুরগিমাটন সাঁটিয়ে বাড়ি ফিরে অর্চিষ্মান বলল, আইনস্টাইন যে বলে গেছেন - ফ্রেন্ডশিপ ইজ দা গ্লু অফ এনি রিলেশনশিপ - ঠিকই। দু'জনকে দেখে এত ভালো লাগল। এমন স্ট্রং বন্ধুত্ব না থাকলে দাম্পত্য মধুর হয় না।

দেড়মাসের মধ্যে দু'জনের ডিভোর্সের খবর এল।

গড়াগড়ি খেয়ে হাসাতে (ডিভোর্সের খবরে নয়, অর্চিষ্মানের রুম রিড করার ছিরিতে) অর্চিষ্মান বলল, আরে আমি ঠিকই রিড করেছিলাম, কী হয়েছে শোনো আগে কুন্তলা, তারপর হেসো।

কেচ্ছার আশায় চোখ মুছে উঠে বসলাম। কিছুই পাওয়া গেল না। সেই  যে বৈষ্ণোদেবী না জয়সলমীর কোথায় যাচ্ছিল দু'জনে, সঙ্গে দু'পক্ষের বাবামা গেছিলেন। বেড়াতে গিয়ে বাবামায়েদের মধ্যে ঝগড়া হয়ে গেছে । ফিরে এসে ছেলেমেয়ের ডিভোর্স।

এটা কেউ করে? অর্চিষ্মান মাথা নেড়েছিল। বেড়াতেফেড়াতে যাওয়া অলরেডি সেনসিটিভ সিচুয়েশন, তার মধ্যে দু'দলের বাবামাকে নিয়ে? অর্চিষ্মানের মতে দোকলা বেড়াতে গেলেই এই ডিভোর্স ঠেকানো যেত। অর্চিষ্মান রুম পারফেক্ট রিড করেছিল। দুজনের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক বন্ধুত্ব ও ঈর্ষণীয় কমপ্যাটিবিলিটি ছিল, স্রেফ বাবামাকে নিয়ে বেড়াতে গিয়ে ডিভোর্স হয়ে গেছে।

হতে পারে। এই সব সম্পর্কটম্পর্ক কার সঙ্গে হয়, কেনই বা হয়, কেনই বা থাকে, কেনই বা যায় - কাঁটাকম্পাস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। দরকারও নেই। ছাড়াছাড়ির পর দু'জনেই নতুন সঙ্গী নির্বাচন করে ভরভরন্ত জীবনে ঢুকে গেছে। নিজের জীবনে ঠেকে এবং অন্যের জীবন দেখে - আমারও অনেক রকম শিক্ষা হয়েছে। অর্চিষ্মানের রিডিং হয়তো ঠিকই ছিল। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব সত্যিই ছিল। 

এবং সেটাই গোলমাল হয়েছে।

আইনস্টাইন ভুল বলেছেন। কিছু কিছু সম্পর্কে বন্ধুত্ব যত না বাঁচায় তার থেকে ডোবায় বেশি।

*****

বাঘ না দেখলেও মেঠো পথে বাঘের থাবার ছাপ আর গাছের গায়ে আঁচড় দেখলাম। হরিণ বাঁদর হাতি ময়ূর মাছরাঙা সারস, এমনকি শ্লথ ভালুকও। শ্লথ শুনলে আমার সামহাউ শ্লথতার ডিগ্রি সম্পর্কে বেশি কৌতূহল হয়। কত শ্লথ? যাওয়ার পথে দেখছি গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে, ফেরার পথেও কি থাকবে?

এক জায়গায় বাথরুমের জন্য থামা হল। সবাই নামল। আমি ফোন বার করে ক্যান্ডি ক্রাশ খুললাম। তারপর দেখি সবাই বাথরুমে যাওয়ার বদলে ক্যান্টরের একশো মিটার দূরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে।

এটা একটা এলিফ্যান্ট ট্রেনিং ক্যাম্প। গেটের ধারে একটা দেখেছিলাম, এখানে আরও একটা। তিনচারটে হাতি, একটা পুঁচকেও আছে। বড় হাতিগুলোর কী বড় বড় দাঁত বাপরে। একটা বড় হাতি শুঁড় দিয়ে ধুলো তুলে নিজের সারা গায়ে ছেটাচ্ছে। ক্যান্ডি ক্রাশে মন দিলাম। পাঁচ মিনিটে পাঁচটা লাইফ গন। ততক্ষণে লোক ফিরতে শুরু করেছে। হাতিদের এনক্লোজারের বেড়ার সামনে একা অর্চিষ্মান দাঁড়িয়ে আছে। স্থির হয়ে হাতির ধুলো ছেটানো দেখছে। 

হাজার হাজার গাছ, কোটি কোটি পাতা। সে পাতার শিরায়, বোঁটায়, কিনারায় কিনারায় রোদ। এক একটা গাছ রোদের পথ আটকেছে, তাদের ঝাঁকড়া মাথা ঘিরে সোনালি আউটলাইন, এক একটা গাছ ফুঁড়ে রোদ্দুর এপাশ ওপাশ চলে গেছে, মনে হচ্ছে গাছটা ভেতর থেকে জ্বলছে।

শয়নরত বিষ্ণু দেখতে যাওয়ার পথে একটি তীব্র বাঁকে আগের দিন দেখেছিলাম, সেদিনও ইতিউতি চোখে পড়ল। ইন্ডিয়ান ঘোস্ট ট্রি। পঞ্চাশ ফুট ফ্যাকাসে মসৃণ শরীর থেকে নির্লোম ডালপালা, রক্তশূন্য হাতের মতো ছড়িয়ে আছে। হাতের ডগায় কালচে ফুলের গোছা। জ্যোৎস্নারাতে এ গাছের দিকে তাকাতে দম লাগবে।

একটা লেকের ধারে কত রকম জানোয়ার যে জড়ো হয়েছে। জমিতে হরিণ, বাঁদর, শুয়োর। আকাশে শকুন, চিল। আমি যেটুকু ছবি তোলার চেষ্টা করি, অর্চিষ্মান করে না। ও-ও এই বিবিধের মাঝে মহান মিলন দেখে উঠে ছবি তুলতে লাগল।

পথের ধারে ধারে আগুন জ্বালানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও আগুন নিভে গেছে, কালো ছাইয়ের বর্ডার রাস্তার পাশ জুড়ে। ফায়ার ব্রেক। গ্রীষ্ম আসছে। দাবদাহ শুরু হল বলে। যদি এদিকে আগুন লাগে, পোড়ানোর মতো কিছু না পেয়ে ওদিকে এগোতে পারবে না।

এক রোমহর্ষক মুহূর্তে গাছের উঁচু ডালে একটি লেপার্ড দেখা গেল। চোখটোখ সরু করে। ঘন পাতার আড়ালে ডালে বসে অল্প অল্প ল্যাজ নাড়ছে। উত্তেজনার ব্যাপারই বটে। গাইড বললেন, একটু অপেক্ষা করলে আরও উত্তেজনা ঘটবে ম্যাডাম, নিচ দিয়ে হরিণ যাতায়াত করছে। সুযোগ বুঝলেই লাফাবে।

অর্চিষ্মান আশ্বাস দিল, সে রকম কিছু ঘটবে না কুন্তলা। মোস্ট প্রব্যাবলি। পাছে শিকারের সিন দেখে ফেলতে হয় ভয়ে ন্যাট জিও চিরকাল চোখ বন্ধ করে পেরিয়ে গেছি, লাইভ শিকার দেখতে চাই না।  যাতায়াতের পথে দু'বার চিকেন এবং মাটন সেন্টারে হাবিববাবু বা ওঁর কোনও স্যাঙাত মুরগি শিকার করছিলেন, তার সাউন্ড এফেক্টেই আমার হয়ে গেছে। লেপার্ডের হরিণ শিকার চশমাচোখে দেখার ট্রমা নিতে পারব না।

অর্চিষ্মান বলল, জঙ্গল তো শুধু পেখমমেলা ময়ূর আর লাফ দিয়ে রাস্তা পেরোনো কিউট বাঘের ছানার নয়, কুন্তলা। ওই বাঘের ছানা কোনও হরিণের ছানার মাংসে প্রতিপালিত হচ্ছে। যে বাঘ হরিণ মারছে, সে মরবে অন্য কোনও শক্তিশালী বাঘ বা একদল গউরের হাতে। জঙ্গল শুধু আলো আর সবুজের নয়, নবীন চারা আর মুকুলের নয়। জঙ্গল মৃত্যুর। বেঘোরে প্রাণ যাওয়ার। ক্ষমতাই শেষ কথা। সবল বাঁচবে, দুর্বল মরবে। অভয়ারণ্যের ভেতরে কেউ কাউকে অভয় দেবে না।

অফ কোর্স, এই ভাষায় বলেনি, এত কথাও বলেনি। আমি ভাবসম্প্রসারণ করেছি। আমার ভাবসম্প্রসারণ করতে জঘন্য লাগত, এবং জানতাম ছড়িয়ে লেখার থেকে গুটিয়ে লেখায় কেরদানি বেশি, তবু মাধ্যমিকে সারসংক্ষেপের বদলে ভাবসম্প্রসারণই করেছিলাম। কারণ বেশি পেনের কালি খরচ হলে বেশি নম্বর পাওয়া যায় - এটাই জেনারেল সেন্টিমেন্ট ছিল।

অর্চিষ্মান সম্ভবতঃ বলেছিল, কুন্তলা তোমার হৃদয়ভঙ্গ হবে বলে তো লেপার্ড উপোস দিয়ে বসে থাকবে না, ওকেও খেয়েপরে বাঁচতে হবে।

সে বাঁচুক। কিন্তু সে বাঁচার জন্য যদি রক্তারক্তি করতে হয়, তাহলে আমি চোখকান বন্ধ করে থাকব। লেপার্ড খেয়েপরে বাঁচুক, আমি ডিনায়ালে বাঁচব।

সুর কেটে গেল। এতক্ষণ আলো নদী, ফুল, পাতা, রোদ্দুর দেখছিলাম এবার ঝোপঝাড়ের মধ্য থেকে পচা মাংসের গন্ধ ছাড়তে লাগল। প্রকাণ্ড শাল পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠছে মিসলটো। মরণপণ সংগ্রাম। যে জিতবে সে বাঁচবে। যত জ্যান্ত গাছ, তত মরা। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ বসে, কারও মৃতদেহ কোমর থেকে সমকোণে বেঁকে গেছে। কেউ মরতে মরতে প্রতিবেশীর ঘাড়ে পড়েছে, মরে ভুত গাছের নিচ থেকে কোনওমতে মাথা তুলেছে নতুন চারা। একটা বিরাট, সতেজ গাছের গুঁড়ির অর্ধেকটা খাবলা মেরে তুলে নিয়ে গেছে কেউ, বেশি আগেও না, উন্মুক্ত কাঠের বাদামী তখনও দগদগ করছে। গাছটা বেঁচে যাবে হয়তো - যেন যায় - কিন্তু ক্ষত থেকে যাবে চিরদিনের মতো।

একটা ভালো, গাছটার একটা গল্প জমল। গাছটার যদি মেমোরি ভালো হয় আর গাছটার যদি পরে কখনও লেখালিখি করতে ইচ্ছে করে, কাজে দেবে।

"A little talent is a good thing to have if you want to be a writer, but the only real requirement is the ability to remember the story of every scar." - Stephen King

*****

মুখে যতই বলি জঙ্গলে বাঘ ছাড়াও আরও অনেক কিছু দেখার আছে, সে সব দু'ঘণ্টা ধরে দেখতে দেখতে হাই ওঠে। ঘুম তাড়াতে পেপার ফয়েল ছিঁড়ে শশার স্যান্ডউইচে কামড় দিয়েছি, গাইড বললেন, থোড়া রুক যাইয়ে, ম্যাডাম। সবাই মাংকিক্যাপট্যাপ শুদ্ধু ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। লজ্জা পেয়ে আধখাওয়া স্যান্ডউইচ আবার প্যাক করে ঢুকিয়ে রাখলাম। আধঘণ্টা পর একটা মাঠমতো জায়গায় ক্যান্টর থামল। 

জঙ্গলের প্রান্ত, দূরে গ্রামের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। গাছের ছায়ায় বাঁশের টেবিল বেঞ্চি ছাউনি। সাফারির সব জিপসি, ক্যান্টর এসে জুটেছে। সবার হোটেল থেকেই খাবারের ঝুড়ি দেওয়া হয়েছে মনে হয়, কেউ কেউ নিজ উদ্যোগেও এনেছে, সে সব বার করে বাঁশের টেবিলের ওপর মেলে খাচ্ছে। চারপাশে কিচিরমিচির পাখি,  ছুঁড়ে দেওয়া ছেঁড়া পুরির টুকরো খুঁটে খাচ্ছে। সাহেবমেমরা স্পেশাল সাফারিতে বেরিয়েছেন, তাঁদের খাবারের ঝুড়ি খুললেই ধপধপে সাদা তোয়ালে, বাঁশের টেবিলের ওপর সে তোয়ালে পেতে খাবার রাখা।

খাবার মানে ফল। কমলালেবু, তরমুজ আরও কী সব উজ্জ্বল রঙের ফল। সাহেবমেমরা সেগুলো খাচ্ছেন আর ক্যামেরা দিয়ে পাখির ছবি তুলছেন। আমাদেরও কলা দিয়েছে, যে জন্য আমরা গ্রেটফুল এবং যেটা আমরা খাব না। কেউ বেড়াতে গিয়ে পাগলের মতো কলা খায় না।

আমরা পুরি ভাজি খাব। মানে অর্চিষ্মান পুরিভাজি খাবে, আমি শুধু ভাজি খাব। ওই ঠাণ্ডা চ্যাপ্টা পুরি খেয়ে কে পেট ভরায়? আমি চামচ দিয়ে শুধু শুধু সেই স্বর্গীয় আলুর তরকারি খেতে লাগলাম, সাহেবমেমরা কমলালেবু ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে খেতে লাগলেন।  
 
খাওয়া শেষ হলে অর্চিষ্মান কফি আনতে গেল। অদূরে স্টোভ জ্বেলে চা কফি বানানো হচ্ছিল। আর সেই জিনিসটা, যা না হলে ভারতবর্ষ ভারতবর্ষ থাকবে না। ম্যাগি। আমি পুরির বদলে ম্যাগি খাওয়ার তাল করেছিলাম, কিন্তু অতটা আলু খেয়ে এমন পেট ভরে গেল যে তখন ম্যাগি খেলে ম্যাগির ওপর অবিচার। কফি খাওয়ার দরকার ছিল না, কিন্তু ওই রান্নাবান্নার জায়গায় এমন হইচই হচ্ছিল যে তার অংশ না হতে পারলে জীবনভর আফসোস থেকে যাবে। 

নর্ম্যাল কফি। লোকাল সস্তা ব্র্যান্ডের স্যাশে ছিঁড়ে অর্ধেকটা ঢেলে গরম দুধে গুলে দেওয়া। কিন্তু ওই জিপসির ভিড়ে, পুরিঠোকরানো চড়াইপাখি আর কমলালেবু-ঠোকরানো সাহেবমেম, ফাঁকা মাঠের ওপর নেমে আসা আকাশ, আকাশের নিচে গ্রামের বাড়ির নীল অ্যাসবেস্টসের ছাদ, চরতে থাকা গরুছাগলদের মাঝখানে বসে সে কফি আমার অমৃত ঠেকল। অর্চিষ্মানের মনে হয় অত ভালো লাগেনি, কারণ বলল আর খাবে না। দু'নম্বর কফি একা একাই খেলাম।

তৃতীয় দিনের তালা সাফারি শেষ করে আন্ধিরিয়া ঝিরিয়া পার হয়ে গেটের দিকে চলেছি। এটাই শেষ সাফারি। হয়তো এটাই শেষবারের মতো বান্ধবগড়। চারদিক দেখছি, এমন একটা কিছু যদি পাই যা দিয়ে এই মুহূর্তটা মনে করে রাখা যায়। 

পাওয়া গেল। একটা তেঁতুল গাছ। 

নবনীতা দেবসেনের একটা কথা আমি শরীরের প্রতি রক্তবিন্দু দিয়ে বিশ্বাস করি। পৃথিবীতে দুই প্রজাতির লোক হয়। রাজা আর প্রজা। কমন সেন্স যতটা বলে, রাজা তার থেকেও অনেক কম। সবাই আসলে প্রজা। 

নবনীতা লেখেননি, হয়তো পাঠকরা দুঃখ পাবে বলেই, দুটো গ্রুপ মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ। প্রজাকে সিংহাসনে বসিয়ে দিলে প্রজা রাজা হয়ে যায় না। রাজার রাজত্ব কেড়ে নিলে রাজা প্রজা হয়ে যায় না। ও জিনিস ভেতরে থাকে। ও জিনিস ফেক করা যায় না। 

গাছদের রাজাপ্রজা হয় কি না জানি না, যদি হয় তাহলে এই ইমলি কা পেড় নিঃসন্দেহে রাজা। সম্রাট। প্রায় অর্ধেক আকাশ ঢেকে ফেলা। সামনে থেকে গাছটাকে যতক্ষণ পারা যায় দেখলাম, ঘাড় ঘুরিয়ে যতক্ষণ পারা যায় দেখলাম। তেঁতুলসম্রাট আমার বান্ধবগড় ভ্রমণের শেষ মুহূর্তের স্মৃতির পেরেক হয়ে থাকলেন।

*****

জব্বলপুরের জন্য গাড়ি এসে গেল দেড়টায়। গাণ্ডেপিণ্ডে খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। চেক আউট করে অর্চিষ্মান 'একটু দাঁড়াও' বলে কোথায় যেন গেল, আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার পাশে কাউন্টারে কনুই রেখে দাঁড়িয়েছিলেন যিনি, আমাদের খিতৌলি সাফারির ক্যান্টর চালাচ্ছিলেন। 

আমি বললাম, চললাম। উনি বললেন, আরে ম্যাডামজি সেদিন আপনাদের বাঘ দেখা হল না। আমি বললাম, তাতে কী আরও কত কিছু তো দেখা হল। ভদ্রলোক বললেন, শের থা এক, খবর ভি মিলা থা, কিন্তু ভদ্রলোকের ঠিক পেছনে যে পরিবার বসে ছিল হোটেলে ফেরার জন্য এমন তাড়া দিচ্ছিল যে উনি আর সেই বাঘের পেছনে ধাওয়া করতে পারেননি। 

সেই দাপুটে পরিবার। যাঁরা রাতে পোহা আর পুরির সিস্টেমের ভুল ধরছিলেন।

অর্চিষ্মান যে বলে কুন্তলা, কনফিডেন্ট লোক দেখলেই সন্দেহ করবে, ভুল বলে না।

আমি বললাম, আহা জঙ্গলে তো আরও কত কিছু দেখলাম। কত গাছ। এত গাছ কি আমরা দেখি? গাছও তো প্রায় বাঘের মতোই বিরল হয়ে গেছে শহরে।

ভদ্রলোক বললেন, আপনার জমানার টুরিস্ট আর নেই, ম্যাডামজি। নতুন জমানার টুরিস্টদের তো চেনেন না। বাঘ না দেখলে গালমন্দ করে। বলে বান্দর দেখতে এসেছি নাকি এত খরচ করে?

জমানার হিন্টটা ইগনোর করলাম। করে বললাম, কেন বাঁদরে অসুবিধে কী? আমরা যেখান থেকে আসছি, সেখানে বাঁদরও কি এত দেখা যায় নাকি? বাঁদর কি গাছে ফলে?

এক উর্দিপরা বাচ্চা ছেলে যাচ্ছিল। ভদ্রলোক হেঁকে বললেন, অ্যাই, ম্যাডামজির গাড়ি এসে গেছে কি না দেখ।

আর চিতল, সম্বর, বারাসিংগা? আমাদের জানালার পাশ দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে যায়?

কেয়া পতা, উনকে ছত পে ভাগতি হোগি। ভদ্রলোক চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন। ছেলেটা ফিরছিল, বললেন, অ্যাই, দুটো জলের বোতল রেখে দে ম্যাডামজির গাড়িতে।

ভদ্রলোককে টাটা করে গাড়িতে উঠে পড়লাম। অর্চিষ্মান বলল, এদের কাস্টমার কেয়ার সত্যি ভালো। মনে করে জলের বোতলও দিয়েছে, দেখছ?

উদাস চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। সব ক্রেডিট লাফিয়ে নেওয়া বিশ্রী।

*****

দেড়টায় শুরু করে একবার কালো কফি আর একবার পালস লজেন্সের ব্রেক নিয়ে জবলপুর পৌঁছলাম পাঁচটার সময়। ছোট শহর। আমার ওই রকমই ভালো লাগে, অর্চিষ্মানের ম্যানহাটান ছাড়া মন ওঠে না। আমরা থাকব মধ্যপ্রদেশ টুরিজমের কালচুরি রিসর্টে। বেশি ঘুরব না। অনলাইনে সরকারি ডে ট্রিপে সবথেকে উঁচু শিব আর সবথেকে মোটা হনুমান মিলিয়ে প্রায় চোদ্দটা পয়েন্ট। দেখব না। অ্যাভারেজ ইজ ক্রিমিন্যালি আন্ডাররেটেড।

আমরা দেখব শুধু মার্বেল রক আর ধুঁয়াধার জলপ্রপাত। কিন্তু তার আগে ব্রেকফাস্ট খাব। 

মধ্যপ্রদেশের লোক্যাল খাবার খাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম আমরা। বাড়িতে থাকতে, ট্রেনে যেতে যেতেও অর্চিষ্মান ভিডিও দেখেছে। মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত থালি। পাঞ্জাবি কঢ়ি, রাজস্থানি ডাল আর কোথাকার কী যেন। যিনি টুর করাচ্ছিলেন,মেল্টিং পট-টট বলে ম্যানেজ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। 

এত বড়, এত প্রাচীন রাজ্যের নিজস্ব খাবার নেই? অফ কোর্স আছে। মালওয়া বাফলা, ইন্দ্রহার, বুন্দেলখণ্ডী বড়া, বাফেরি, মিড়া, মাহেরি, থোপা, ফাড়া। কড়কনাথ মুর্গ, বুন্দেলি গোশত। কিন্তু সেগুলো খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বান্ধবগড়ের হোয়াইট টাইগারে না হয় অত ঝামেলা সম্ভব না, টুরিস্ট যা চায় (বা ওঁদের মনে হয় টুরিস্ট যা চাইবে, চিকেন মটন পনির) তাই রাঁধতে হবে, কিন্তু জব্বলপুরেও হোয়াট টু ইট দিয়ে খুঁজলে প্রথমে যেটা আসে সেটা হচ্ছে দোসা। গায়ে কাঁটা দেওয়া সব দোসা। সেচুয়ান বাটার দোসা, চিলি পনির দোসা, এগ ঘোটালা দোসা।

ব্রেকফাস্টে সবাই দ্বারকা সুইটসের রেকোমেন্ডেশন দিয়েছেন। লোক্যাল ব্রেকফাস্ট, সেই পোহা জলেবি। গোটা মধ্যপ্রদেশেই পোহার দাপট, তার মধ্যেও সেরা ইন্দোরি পোহা। ইন্দোরি পোহার বিশেষত্ব হচ্ছে ব্যাপারটা কড়াইতে রান্না হয় না। ফুটন্ত জলের ওপর চালুনি জাতীয় কিছুতে রেখে চাপা দিয়ে রান্না হয়। অর্থাৎ ভাজার বদলে স্টিমড। তাতে সম্ভবতঃ দলা পাকানোর সিন্যারিওটা এড়ানো যায়।

গাড়ি করে দাদা নিয়ে চললেন। দেখে বা কথা শুনেই বুঝেছেন আমরা বাঙালি। জব্বলপুরে প্রচুর বাঙালি। দাদার মতে ফরটি পার সেন্ট। অধিকাংশই রাইফেল কারখানার কাজে এসেছিলেন, আর ফেরেননি। সুমিতামামির বাপের বাড়ি জব্বলপুর। আমরা বললাম, হ্যাঁ হ্যাঁ আমাদেরও একজন আছে জব্বলপুরের লোক। 

বাঙালি সম্পর্কে তিনটে অবজার্ভেশন দাদার। এক, বাঙালিরা ঘুরতে ভালোবাসে। দাদার যাত্রীদের আশি শতাংশ - উঁহু, শুধরে নিলেন দাদা - নব্বই শতাংশ বাঙালি। দুই, বাঙালিরা ঝগড়া করতে ভালোবাসে। দাদা তখন বাস চালাতেন। একবার রাতের বাসে এক বাঙালি ভদ্রলোকের ব্যাগ দুই বাঙালি ভদ্রমহিলার গায়ে পড়ে যাওয়াতে, কেয়া বতায়ে ম্যাডামজি, ওই দুই ম্যাডামজি অন্ততঃ আধঘণ্টা ধরে সবার ঘুম ভাঙিয়ে চিৎকার করেছিলেন। তিন, বাঙালিদের কাছে খাওয়ার থেকে জরুরি কিছু নেই। দশটার সময় ভরপেট খেয়ে যদি একটায় লাঞ্চের জন্য দাঁড়ানোর কথা হয় আর একটা পাঁচে যদি গাড়ি দাঁড় করানো না হয় তাহলেই, কেয়া বতায়ে ম্যাডামজি।

আর একটা ঘটনা বলে দাদার কথা শেষ করব। দাদা নাকি মিলিটারি সাপ্লাইয়ের গাড়ি চালিয়ে দূরদূরান্ত গেছেন। পানাগড়ও গেছেন।

আমি প্রথমটা বুঝতে পারিনি। অর্চিষ্মানের বুঝতে পারার কথা না। ওর ভূগোল আশ্চর্যরকম খারাপ। আসানসোল কোন জেলায় বলতে পারবে না। 

কয়েক সেকেন্ড পর আমি বললাম, পানাগড়? বর্ধমানের পানাগড়? আমাদের পানাগড়? যেখানে এয়ারপোর্ট আছে?

ওহি।

পানাগড় যাইনি, কিন্তু পানাগড়ের ওপর দিয়ে যাতায়াত করেছি অনেকবার। যতবার গেছি বর্ধমান লোক্যাল বা দ্রুতগামী রেলের জানালার শিকে বা কাচে নাক ঠেকিয়ে এক্সট্রা মনোযোগ দিয়ে পানাগড়ের দিকে তাকিয়েছি। আমাদের পাড়ার একটি মেয়ে প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে পানাগড় চলে গেছিল। মেয়ে পালানো ব্যাপারটার সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়। পাড়ায় ডাকাত পড়লেও অত উত্তেজনা দেখিনি।

দ্বারকা সুইটসে মারাত্মক ভিড়। লোক্যাল ভিড়। দাদা বললেন, সোমবার তাই সোজা ঢুকতে পেলেন, শনিরবি হলে লাইনে দাঁড়াতে হত। 

সোজা অবশ্য ঢুকতে পারিনি। ঢোকার মুখে দু’দিক থেকে দু’জন মহিলা এগিয়ে এলেন। এদিকের অল্পবয়স্কার কোলে শিশু। ওদিকের জন বয়স্ক এবং একলা। ওঁদের দেব বলে, কাকে দেব তখনও ডিসাইড করিনি, লাল পার্স খুলে হাতড়াতে লাগলাম। যে ডিনোমিনেশনটা খুঁজছি সেটা নেই। যেটা আছে, সেটা দেওয়ার ধক আমার নেই। অর্চিষ্মানকে বলছি, তোমার আছে? সে মাথা নেড়ে দোকানে ঢুকে পড়েছে।

কুঁচকে গিয়ে সরি সরি বলে দোকানে ঢুকে পড়লাম। খুবই অসভ্যতা হল। অবশ্য আমার অসভ্যতার দিকে নজর দিয়ে সময় নষ্ট করেননি কেউ। একে অপরকে দুষছেন। আমার বউনি হয়নি তুই এখন আসছিস কেন? 

আমারও বউনি হয়নি। তোরও আসা উচিত হয়নি।

পৃথিবীর সব প্রফেশনে প্রফেশনাল এথিকস থাকে। সে এথিকস পালন করার দায় থাকে। ট্রিকস অ্যান্ড রোপস শিখতে হয়। ভারতবর্ষের দেড়শো কোটি লোক আমাকে আন্টি সম্বোধন করে কিন্তু কোনও ভিক্ষুক শিশুর মুখে আমি আন্টি শুনিনি। রিসেন্টলি জি কে টু-তে একটি শিশু আন্টি ডেকে ফেলেছিল, পাশের শিশু, স্পষ্ট দেখলাম, প্রথম শিশুকে টিপুনি দিল এবং প্রথম শিশু স্মুদলি দিদিতে শিফট করে গেল। আমি ইম্প্রেসড হয়ে ওদের টাকা দিলাম।

*****


দুজনে দুটো স্পেশাল পোহা জলেবি অর্ডার দিলাম। স্পেশাল সম্ভবতঃ ওপরে ছড়ানো সেউভাজাটা। সামোসা, কচুরি, আরও নানারকম অস্বাস্থ্যকর ভাজাভুজিও পাওয়া যায়। তবু আমরা পোহা জলেবিই নিলাম। আশানুরূপ স্বাদ। খেতে খেতে আমার মনে হচ্ছিল সিঙাড়া নিলেই হত। 

খাবারের ভালোমন্দ নিয়ে আমার কিছুই বলার নেই। যে খাবার মানুষের পেট ভরায়, মন ভালো করে - তা খারাপ হয় না। কথাটা হচ্ছে আমার পোষাচ্ছে, না পোষাচ্ছে না।

ওই খাবারটার প্রতি আমার একমাত্র অভিযোগঃ খাবারটা আমার ভ্যালু সিস্টেমের সঙ্গে, বাতিকও বলতে পারেন, যায় না। যে প্লেটে পোহা সে প্লেটেই জিলিপি। অর্থাৎ জিলিপির রস চিঁড়ের গায়ে লাগে, আর জিলিপির সঙ্গে চিপকে চিঁড়েরা মুখে ঢুকে যেতে চায়।

আমার তাতেও অসুবিধে নেই। অর্চিষ্মানের সমস্ত মাথা নাড়া অগ্রাহ্য করে  বাঁ হাত দিয়ে জিলিপি তুলে  চিঁড়েদের টেনে টেনে বার করে প্লেটের একদিকে সরিয়ে রাখতে পারি। ডান হাতে জিলিপি তুলে ধরে বাঁ হাত দিয়ে একটা একটা চিঁড়ে ছাড়িয়ে নিতে পারি।

তার পরেও একটা পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন থাকে। আমার সঙ্গে ঘটেনি, কিন্তু অধিকাংশ লোকের সঙ্গেই ঘটছিল। বা বলা উচিত, তাঁরাই সেধে ঘটাচ্ছিলেন। সামোসা, কচুরি বা পোহা অর্ডার দিচ্ছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আরও একটা ইন্সট্রাকশন দিচ্ছিলেন। 

বনাকে দে না।

যেই না বলা, কর্তৃপক্ষ চোখা সামোসার দর্পিত নাক এক ঘুঁষিতে থেবড়ে, সুখী কচুরির পেট ফাঁসিয়ে, বিরাট বিরাট বালতিতে হাতা ডুবিয়ে থকথকে ঝোল, লাল সবুজ চাটনি, হলুদ সেউভাজা ছড়িয়ে পরিবেশন করছিলেন। 

আমি প্রাণপাত করে ফেললেও ও জিনিস থেকে সিঙাড়া কচুরির পুনর্নির্মাণ করতে পারব না। 

স্পেশাল প্লেটে যে পরিমাণ পোহা আর জিলিপি থাকে, একার পক্ষে শেষ করা অসম্ভব। অর্চিষ্মানের খিদে পেয়েছিল মনে হয়। নিজের পোহা শেষ করে আমার ফেলে রাখা অর্ধেক পোহা খেয়ে আবার কচুরি নিয়ে এল। বনাকে, অবভিয়াসলি। আমাকে জোর করে এক চামচ খাওয়াল। ওর ধারণা চুয়াল্লিশ বছর বয়সেও কোনও কিছু না খেয়ে দেখলে আমি বিচার করতে পারব না খাবারটা আমার ভালো লাগবে না খারাপ।

*****

হোয়াট ইজ ইম্পরট্যান্ট? জার্নি অর ডেস্টিনেশন? 

কোনওটাই না। ইট'স দা কম্প্যানি।

মার্বেল রক ডেস্টিনেশন হিসেবে যত চমৎকারই হোক, নর্মদার নীল জলে একশো ফুট উঁচু মার্বেলপ্রাচীরের ফাঁক দিয়ে ভেসে যাওয়ার জার্নি যত রোমহর্ষক - কম্প্যানিটি দেখার মতো ছিল। 

দু'হাজার পঁচিশের মার্চ মাসের মার্বেল রক ভ্রমণ আমার একটা কোর বিশ্বাসের রক ঝাঁকিয়ে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক ভ্রমণ। ঘাটে নামা থেকে আমাদের নিজস্ব বোটে আটশো টাকা দিয়ে আধঘণ্টা ভ্রমণের টোপ দেওয়া হচ্ছিল, আমরা দেড়শো টাকা দিয়ে আরও পনেরো জনের সঙ্গে একঘণ্টা ভ্রমণের জন্য গোঁ ধরে ছিলাম।

ভুল হয়েছিল।

অর্চিষ্মান বলবে, ভুল নয়, কুন্তলা। শিক্ষা। তাছাড়া একদিক থেকে দেখলে ওটাই বাস্তব আর বাস্তব থেকে পালানোটা সব ক্ষেত্রে বেস্ট অপশন না-ই হতে পারে।

হয়তো।

বোটে একটা বড় পরিবার উঠেছিলেন। দুই পুরুষের তত্ত্বাবধানে চারপাঁচজন মহিলা। কর্তৃপক্ষ এক পুরুষকে সরে বসতে বলায় রাগ দেখিয়ে দুমদুম করে নেমে গেলেন। অলগ বোট মেঁ যায়েঙ্গে। নাকি সরে বসতে বলার টোন পছন্দ হয়নি। বাকিরা সাধাসাধি করে ফিরিয়ে আনলেন। এর পর তাঁর অসুবিধে হতে লাগল গাইড কেন পানি বলছেন। পানি নেহি, জল বোলো। অন্ততঃ তিনবার বললেন। তারপর মার্বেল রকের একেবারে মাঝখানে গিয়ে দ্বিতীয় পুরুষটি আকাশবাতাস ফাটিয়ে জয় শ্রীরাম বলে উঠলেন, নৌকোশুদ্ধু লোক, আমি আর অর্চিষ্মান সহ চারপাঁচজন বাদ দিয়ে, জয় শ্রীরাম জয় শ্রীরাম চেঁচাতে লাগল। 

এমনও নয় যে জয় শ্রীরামটুকু বাদ দিলে রক্ষা পেত। মার্বেল রক তো ঘণ্টা দেখলেন, গোটা সময়টা ভিডিও কল করে চিৎকার করে নাতির সঙ্গে গল্প করলেন, ফোন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাকি দাদুদিদিমাদের দেখাতে থাকলেন, তাঁরা হাত নেড়ে উত্তেজিত গলায় হ্যালো মুন্নু হ্যালো চুন্নু করতে থাকলেন।

সবই দেড়শো ডেসিবেলে।

গাইডও কিছু কম যান না। দু'হাজার পঁচিশের ভারতবর্ষে জলের বদলে পানি বলার কার্ডিনাল সিন যদি মাপ করেও দিই, গোটা সময়টা গলা ফাটিয়ে চুটকি ছড়া বলে গেলেন, সবাই সে শুনে হাসলও। আমি এত গাধা, ভেবেছি পচা ছড়াগুলো অ্যাট লিস্ট অরিজিনাল, ফেরার পথে শুনি পাশের নৌকোর গাইড এক্স্যাক্টলি এক ছড়া বলছেন।

তাছাড়া দেখাবে তো এখানে অশোকা সিনেমায় করিনা নেচেছিলেন, ওখানে যিস দেস মেঁ গঙ্গা বহতি হ্যায়ঁ-তে বৈজয়ন্তীমালা নেচেছিলেন, এই দেখুন এখানে পাথরটা ঠিক জুতোর মতো দেখতে, ওখানে কেমন ঋষিমশাই বসেন পূজায়?

আমরা যে একটা অত্যাশ্চর্য, অলৌকিক অভিজ্ঞতার মধ্যে আছি, সেটা মনে করাতে একে অপরের শরণ নিতে হল। কে জানে কত কোটি বছর পুরোনো মার্বেলের পাহাড় কেটে নর্মদা চলেছে, সেই নর্মদায় ভেসে ভেসে আমরা চলেছি, ভাবতে পারো? দেখেছ, নোংরা মার্বেলে কোথাও নীলের আভাস কোথাও গোলাপির ছায়া? ওই দেখো জলের ছোট ছোট ঘূর্ণিতে রোদ্দুর পাক খাচ্ছে। পাথরের খাঁজে একটা পায়রা একা বসে আছে।

অর্চিষ্মানের কথা জানি না, আমি যদি জীবনে আর কখনও মার্বেল রকে যাই, উইদাউট ফেল, প্রাইভেট নৌকো নেব। গাইডকে কথা বলতে বারণ করব। তেমন তেমন এমারজেন্সিতে কথা যদি বা অ্যালাউ করা যেতে পারে, হাসানোর চেষ্টা খবরদার না।

ভেড়াঘাটের পঁচাত্তর মিটারের মধ্যে চৌষট্টি যোগিনীর প্রাচীন মন্দির। দাদা বললেন, সত্যি দেখবেন না? জানতাম অর্চিষ্মান লাস্ট মোমেন্টে মাইন্ড চেঞ্জ করবে। এতদূর এসেছি, দেখেই যাই। অর্চিষ্মানও জানত, আমার মত বদলাবে না। ভক্তিতে অলরেডি মাথা ভোঁ ভোঁ করছে, এর মধ্যে খটখটে রোদ্দুরে ভাঙাচোরা মূর্তি দেখে বেড়ানো রিস্কি। আমি ট্যাক্সিতে বসে থাকলাম। অর্চিষ্মান দেখে এল।

*****

শেষ দ্রষ্টব্য, জবলপুর এবং বান্ধবগড় ভ্রমণেরও, ধুঁয়াধার জলপ্রপাত। এত সার্থক নামকরণ দেখিনি। ধুঁয়াধারই বটে। বেশি উঁচু না, কিন্তু ধপধপে জলের তোড়ে চারদিকে মিহি ধোঁয়া, এত দূরে রেলিং-এর এপাশে দাঁড়িয়েও গায়ে ফিনফিনে ছিটে।

অর্চিষ্মান বলল, এসো কুন্তলা, ধুঁয়াধারের সামনে আমাদের ধোঁয়া হয়ে যাওয়া জীবনের অনারে সেলফি তুলি। তুললাম। রেলিং-এ হেলান দিয়ে আমরা দু'জন। পেছনে নর্মদা ঝমঝম ঝাঁপ মারছে।

দিব্যি দাঁত বার করা ছবি উঠল। এ ছবি দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না আমাদের জীবনে রোজ পঁচাত্তরটা করে আগুন জ্বলছে। বলবে দিব্যি ফুর্তিতে আছি।

রেলিং থেকে নেমে অর্চিষ্মান ওইদিকে চলল। বললাম, ট্যাক্সি তো এদিকে। অর্চিষ্মান বলল, যাই ওদিকটা একবার দেখে আসি। 

ওদিকে সবাই পুণ্য নর্মদায় ডুবকি দিচ্ছে। রিয়েল ইন্ডিয়া। কাজেই অর্চিষ্মানকে একেবারে ওর মধ্যে গিয়ে পড়তে হবে। দূর থেকে দেখলে চলবে না।

বেশিক্ষণ না, একবার দেখেই চলে আসব। বলে অর্চিষ্মান আমার কনুই ধরে টেনে নিয়ে চলল। রোদের তেজে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। ছাতা পেতে নারীপুরুষ শশা, জাম ও আরও নানা গ্রীষ্মকালীন ফল নিয়ে বসে আছেন। বাঁধানো রাস্তা ছেড়ে পাথরে পাথরে পা দিয়ে আমরা জলের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালাম।

জায়গাটা জাঙিয়া সেন্ট্রাল। স্বচ্ছ জলের নিচে পরিত্যক্ত জকির মেলা। অর্চিষ্মান উদার দৃষ্টি মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। আমার ঠিক আধফুটের মধ্যে দাঁড়িয়ে এক ভদ্রলোক গামছা জড়িয়ে প্যান্ট খুলছেন। আমি ঘাড় শক্ত করে সামনের দিকে তাকিয়ে আছি। ভদ্রলোক ঘষঘষ ঘষে প্যান্ট ধুচ্ছেন। প্যান্ট ধোয়া শেষ। এবার ভদ্রলোক গামছার ভেতর হাত ঢুকিয়ে জাঙিয়া খুলে আনছেন। 

অ্যাবাউট টার্ন করে হাঁটতে শুরু করলাম। অর্চিষ্মান পেছনে আসছে কি না দেখার অপেক্ষাও করলাম না।

আমাকে একবার এক মেমডাক্তার পরীক্ষা করেছিলেন। নিয়মরক্ষা জেনারেল চেকআপ। ঘরে ঢোকার পর নামধাম পরীক্ষা করে চেক আপের জন্য প্রস্তুতিমূলক ইন্সট্রাকশন দিয়ে উনি অন্য ঘরে কী করতে গেলেন। 

প্রস্তুত হয়ে বেডে বসে পা দোলাতে দোলাতে 'তুমি নির্মল কর' গুনগুনাচ্ছি, ডাক্তারদিদি ঘরে ঢুকে বললেন, ওহ্‌।

সেরেছে, কিছু ভুল করে ফেললাম নাকি? দিদি বললেন, কিচ্ছু ভুল হয়নি। ওঁর ওহ্‌ বলার কারণ হচ্ছে, যদিও উনি ফটিকস্বচ্ছ ইন্সট্রাকশন দিয়ে গিয়েছিলেন, অভিজ্ঞতা থেকে রেডি ছিলেন যে ফিরে এসে সেগুলো রিপিট করতে হবে। ইয়েস, দিস টু। অলসো দ্যাট।

দিদি বললেন, ইউ গাইজ আর ভেরি শাই। 

ঘণ্টা শাই। আমাদের বোল্ডনেস দেখতে গেলে ওঁকে এই সব পুণ্যঘাটে আসতে হবে। পাঁচ গুণতে পাবেন না, লোকে অশনবসন ত্যাগ দিয়ে হিমালয়ের রুট অর্ধেক পার করে ফেলবে।

*****

ধুঁয়াধারের সবথেকে গায়ে কাঁটা দেওয়া ঘটনাটাই লিখতে ভুলে যাচ্ছিলাম। ওই চল্লিশ মিনিটের মধ্যে অর্চিষ্মান পাঁচ মিনিটের জন্য হারিয়ে গেছিল। দিব্যি পাশে পাশে হাঁটছিল, হঠাৎ নেই।

লোকে কুম্ভমেলায় হারায়, এ রকম ফাঁকা নর্মদার ঘাটে হারায় নাকি? 

দু'দিন আগেই বাণপ্রস্থ নামের একটা চমৎকার সিনেমা দেখছিলাম। মা মরে যাওয়ার পর বৃদ্ধ বাবা নানা পাটেকরকে ছেলে আর ছেলের বউরা (বউরাই মাস্টারমাইন্ড, ছেলেরা ভেড়ুয়া) কাশী না কোথাকার ঘাটে ফেলে রেখে পালিয়েছে। সে রকম ইচ্ছাকৃত কিছু না করলে এখানে হারানো শক্ত। অর্চিষ্মান আমাকে ফেলে পালাচ্ছে না আমি অর্চিষ্মানকে ভাবতে ভাবতে ফোন বাজল।

কী গো, কোথায়?

আমি যেখানে থাকার কথা সেখানে। তুমি কোথায়?

অর্চিষ্মান যে জায়গাটা বলল, শুনতে আর বুঝতে চারবার অ্যাঁ? অ্যাঁ? করতে হল।

অর্চিষ্মান 'বস্‌' বলে ফোন কেটে দেওয়ার পর ওর ইন্সট্রাকশন যথাসম্ভব মনে করে, ফলো করে গিয়ে দেখলাম অর্চিষ্মান একটা দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দোকানটার বোর্ডে সত্যি সত্যি লেখা ‘নির্দোষ গগলস’। 

*****

সকালবেলা দাদা বলেছিলেন, এমনি জলেবি খেয়ে কী হবে, মাওয়া জলেবি খেয়ে দেখুন। গ্যারান্টি, ও জিনিস আগে খাননি। 

হোটেলের গেটের বাঁদিকেই গোপালজি সুইটস। গেলাম। মাওয়া জলেবি দিন বলাতে যেটা দিল সেটা দেখে অর্চিষ্মান আমার দিকে তাকাল, আমি অর্চিষ্মানের দিকে।  

এটা মাওয়া জলেবি?

এটাই। 

ছানার জিলিপি। অর্চিষ্মানের টপ থ্রি মিষ্টির একটা। চামচ দিয়ে কাটতে গিয়ে রীতিমত বলপ্রয়োগ করতে হল। তখনই সন্দেহ হয়েছিল। মুখে দিয়ে নিরসন। জিনিসটা ছানার জিলিপির মতো দেখতে, ছানার জিলিপির মতো খেতে নয়।

গোপালজিতে আরও একবার গেছিলাম। দোকানটার পরিবেশ দারুণ। প্রচুর স্থানীয় লোক আসেন, রাজাউজির বধ হয়। উল্টোদিকের ব্যাডমিন্টন অ্যাকাডেমি থেকে নারীপুরুষ, কাঁধে ব্যাডমিন্টনের ব্যাগ ঝুলিয়ে নীল ট্র্যাকসুট পরে এসে চা সামোসা খান। ওঁদের দেখে আমিও সামোসা খেলাম। সামোসাটা সত্যি ভালো ছিল। ভাইসাব হেল্পফুল হয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বনাকে দুঁ? মুখচোখ যথাসম্ভব শান্ত রেখে বলেছিলাম, থ্যাংকস বাট নো থ্যাংকস।

*****

পারিবারিক ট্র্যাডিশন মেনে জব্বলপুরেও কফিশপ খুঁজেছিলাম। ইন্টারনেটে তিনচারটের খোঁজ পাওয়া গেল, কিন্তু সেখানে গিয়ে ল্যাপটপ খাটিয়ে বসে পড়লে কেমন হবে শিওর হতে পারলাম না। এক ফোরামে একজন লিখেছেন দেখলাম, ওহ্‌ কালচার জব্বলপুর মেঁ আভি তক আয়া নেহি।

সত্যিমিথ্যে জানি না। নিজেদের বোঝালাম, কফিশপে গিয়ে ইউটিউব দেখার বিলাসিতা বাদ দিয়ে শুধু কফিই খাওয়া যাক। ইন্ডিয়ান কফি হাউসেই যাওয়া ঠিক হল। জব্বলপুরের ইন্ডিয়ান কফি হাউসের সম্পর্কে একজন লিখেছেন “বেস্ট। কফিশপ। ইন। ইন্ডিয়া।” ঠিক এইভাবেই। ফুলস্টপ দিয়ে দিয়ে। তারপর হয়তো মনে হয়েছে এত সুপারলেটিভে লিখলে যদি লোকে বিশ্বাস না করে, তাই নিচে এসে আবার লিখেছেন "বেস্ট কফিশপ ইন সেন্ট্রাল অ্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিয়া।"

এর পরেও না যায় পাষণ্ডে।

সেটাতেই যাওয়া হল। সুসজ্জিত। বাইরে বিয়েবাড়ির লাইটিং। ভেতরে ঝাড়লন্ঠন। আমাদের চেনা কফি হাউসের মতোই অনেক জায়গা। সেম ইউনিফর্ম। খালি সব কিছু অনেক উজ্জ্বল, ঝকঝকে। আর কর্তৃপক্ষের প্রসন্নতার? কোনও তুলনাই হয় না। অর্চিষ্মান বলল, কুন্তলা রোজ যদি লোকে এসে এক কাপ কফি ওয়ান বাই টু করে খায় আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে তা হলে কোনও কর্তৃপক্ষের মুখের ভাবই প্রসন্ন থাকে না।

তাও ঠিক।

গোপালজির উল্টোদিকে এক ভদ্রলোক ফুচকা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। খেলাম। ফুচকার পুরে আলুর বদলে ঘুগনি। ভালো? খারাপ? হু কেয়ারস। ফেলুদা আর ফুচকা - বানালে দেখব, পেলে খাব।

*****

সত্যি বলব? জব্বলপুরের যে জিনিসটা আমাদের কোনওদিন না ভোলার মতো ভালো লেগেছে, সেটা বাঘ দেখার উত্তেজনার সম্পূর্ণ উল্টো মেরুতে।

সেটা হচ্ছে জব্বলপুরের হোটেলে শুয়ে থাকা।

কুকুরবেড়ালপ্রীতির পর যে বদলটা নিজেদের চমকে দিয়েছে সেটা হচ্ছে হোটেলের আরামের প্রতি ভালোবাসা। পাঁচ বছর আগেও হোটেলকেন্দ্রিক ঘোরাকে মারাত্মক নিচু চোখে দেখতাম। আর্যনিবাস দিয়ে আমাদের সে পতনের পথে যাত্রা শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি যে কতখানি সঙ্গিন হয়েছে বুঝিয়ে দিল জব্বলপুরের মধ্যপ্রদেশ টুরিজমের কালচুরি।

আরও যেটা রিয়েলাইজেশন - এই ভালো লাগা, স্পেসিফিক্যালি, দুজনে আছি বলেই। টেকনিক্যালি একা থাকলেও আরাম একই থাকার কথা। রুম সার্ভিস, ধপধপে চাদর তোয়ালে, ডু নট ডিস্টার্ব। কিন্তু তুমি না থাকলে আমি কী করতাম? সারাদিন পর হোটেলে ফিরে এসে টিভি চালাতাম, কিছু একটা অর্ডার করতাম, তারপর বিছানার এক সাইডের চাদর তুলে, হয়তো পুরোটা ম্যাট্রেসের তলা থেকে টেনেও বার করতাম না, ওই টাইট চাদর পা দিয়ে যথাসম্ভব ঠেলেঠুলে (অর্চিষ্মান কৌতূহলী হয়ে জানতে চেয়েছিল, আমার পা অতদূর পৌঁছয় কি না) ল্যাপটপ বুকে নিয়ে শুয়ে থাকতাম। ফোনে গেম খেলতাম।

দুজনে থাকলে দাপটই আলাদা। ঘণ্টায় ঘণ্টায় ফোন তুলে চায়/কফি/ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ভেজিয়ে। টিভির চ্যানেল নিয়ে দরকষাকষি। বিছানায় বোর হয়ে গিয়ে ল্যাপটপ নিয়ে সোফায় শিফট। সাইজের লজিকে গুলি মেরে চেয়ারে অর্চিষ্মান, সোফাতে আমি। কালচুরি পুরোনো হোটেল। সময় ছাপ ফেলেছে, কিন্তু অসামান্য আরাম আর ভীষণ কাজের। ঘরের যে কোনও প্রান্তে বসে এদিকে তাকালে প্লাগ পয়েন্ট, ওদিকে তাকালে প্লাগ পয়েন্ট। আমি এই পয়েন্টে আমার পাওয়ার কর্ড গুঁজলাম, অর্চিষ্মান ওই পয়েন্টে ওর পাওয়ার কর্ড গুঁজল। টেবিলের কফি আলুভাজা সরিয়ে ল্যাপটপ রাখা হল। কাজ শুরুর আগে আরাম করে নেওয়া যাক। শিরদাঁড়ার গিঁট আরামে গলে গেল, আমি ঘষটাতে ঘষটাতে সোফার সঙ্গে অনুভূমিক হলাম। ডান পা সোফার পিঠে তুলে দিলাম যাতে বাঁ পা গোটা সোফা জুড়ে রাখা যায়।। অর্চিষ্মানও চেয়ারে যথাসম্ভব এলিয়ে পড়েছে, ওর ক্রিসক্রস পায়ের পাতা আমার গালের পাশে সোফার হাতলে। অর্চিষ্মান জোম্বি মারছে, আমি ক্যান্ডি ধ্বংস করছি। চোখ বুজে আসছে, ফোনশুদ্ধু হাত বুকের ওপর নেমে আসছে, জোম্বিজয়ের সুঁই সুঁই শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ছি।

এ রকমের ঘুম ভাঙেও অন্যরকম ভাবে। নো ঝটকা। আলতো করে চোখ খুলে যায়। অর্চিষ্মান চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে।

আরাম হচ্ছে, কুন্তলা?

হাই তুলি। হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিই। হাসি। হোয়েন হার্ট ইজ ফুল, ওয়ার্ডস আর ফিউ।

                                                                                                                                                         (শেষ)




Comments

  1. " গোটা পৃথিবীটা লবটুলিয়া হয়ে যাবে।"
    - আহা!

    ReplyDelete
  2. ওখানে বিবেকানন্দের ব্যানার নিয়ে মিছিলের কথায় আমিও অবাক হলাম।
    নৌকাভ্রমণের অভিজ্ঞতাটা রীতিমতো ভয়ের।

    ভালো বেড়ানো হলো আপনাদের - অনেক অভিজ্ঞতায় ভরা।

    ReplyDelete
    Replies
    1. বিবেকানন্দের সর্বভারতীয় প্রভাব ভাবা যায় না। এখন তো আরও বাড়ছে। নৌকোভ্রমণটা সত্যি ভয়ের ছিল, রাজর্ষি। যে কোনও দলের স্লোগানই, যদি আপনি সে দলের না হন, কানের কাছে ফুল ভলিউমে শোনা বেশ ইন্টিমিডেটিং।

      Delete
  3. এই লেখা পড়তে গেলে যা হয়, সেই জায়গায়, সেই সময়ে, সেই মুহূর্তে পৌঁছে যাওয়া , কুন্তলা যা দেখছেন, আমিও তাই দেখছি শুনছি, ফীল করছি একদম ঐ মুহূর্তে ঐ কালখণ্ডে; লেখকের সমস্ত অনুভূতি নিজের হয়ে গিয়েও পাশাপাশি আর একটা আশ্চর্য অনুভূতি- এলেখায় মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি আর সেটা কুন্তলাকে জানাতে চাইছি- আমারই দুটো সত্তা পাশাপাশি -কুন্তলার লেখা আমারই ভিতর থেকে বের করে এনেছে তাকে- স্বপ্নে যেমন হয় অনেকটা তেমনই-

    ReplyDelete
    Replies
    1. প্রশংসা স্মিতমুখে গ্রহণ করাই একমাত্র অপশন, কিন্তু এত কাছের লোক এত প্রশংসা করলেই বুকধুকপুক করে। সত্যিই ভালো লেগেছে? নাকি বন্ধুত্বের ছায়া? তারপর মনে করাই, বন্ধুত্ব বলেই বেশি করে বিশ্বাস করা উচিত। কারণ বন্ধু বানিয়ে বলে না।

      থ্যাংক ইউ, ইন্দ্রাণী। আমার তো লিখতে দারুণ লাগে, পৃথিবীতে আর কোনও কাজ করতে এত ভালো লাগে না, সে লেখা যদি কারও পড়তেও ভালো লাগে তাহলে সে আনন্দের সীমা হয় না।

      Delete
  4. Daaarun daarun darun bhalo laglo.. Indrani

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, ইন্দ্রাণী। আমারও ভালো লাগল।

      Delete
  5. প্রদীপ্তApril 15, 2025 at 10:34 AM

    ওইটে বড় সত্যি কথা, যে অযাচিত সাহায্য, ভালোবাসা, প্রশ্রয় এগুলোও যদি যথেষ্ট ভালো না হয় তাহলে আর কীসে হবে! আমিও প্রায়ই মনে করাই নিজেকে, যখন খুব ছোট ছোট তুচ্ছ জিনিসের জন্য হতাশ হই৷
    আগের পোস্টে কমেন্ট করেছিলাম কিনা মনে নেই, কিন্তু পঁচিশ মিনিটের সপরিবার বাঘেদের দেখার মতো অসাধারণ আনন্দদায়ক ঘটনার জন্যে আরেকবার লিখলে আশা করি কিছু মনে করবে না।

    আচ্ছা ভালো কথা তোমার লেখাগুলোআস্তে আস্তে অন্যরকম হচ্ছে, মানে ধাঁচটা সে টের পাচ্ছি, বলা হয়নি, আর পাঠক হিসেবে বেশ লাগছে। তারমানে এই নয় আগের গুলো অ-বেশ লাগতো। আমার দুইই ভালো লাগে(পুরোনো লেখা মাঝে মাঝেই পড়ি)।

    হোটেল কেন্দ্রিক ভ্রমণ পড়ে একটু দমে গেছি বটে, এরপর থেকে কী তবে এত ভালো ভালো ঘোরার গল্প আর পাবো না!।
    লম্বা কমেন্টের জন্যে আগাম দুঃখপ্রকাশ আর নতুন বছরের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, প্রদীপ্ত। তোমাকে আর ময়ূরাক্ষীকে, তোমাদের প্রিয়জনদের আমার নতুন বছরের অনেক শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা।

      একদমই। অযাচিত ভালো জিনিস যে কত পাই, সেটাও অগ্রাহ্য করার মতো নয়। হোটেলকেন্দ্রিক ভ্রমণ কেমন হবে সেটা নিজেরাও তলিয়ে ভেবে দেখিনি। দেখা যাক। বেড়াতে গিয়ে আর একটু বেশিক্ষণ হোটেলে থাকা, নাকি বেড়াতে না গিয়েই হোটেলে বসে থাকা - কে জানে।

      Delete
  6. Tomar lekha pore ar ki comment korbo Kuntala. Eto bhalo beralam tomar shonge, eto kichu dekhlam, eto kichu khelam ... mon bhore giyeche ekkebare. Ebaar shudu oi ghumta jodi petaam .... :-)
    Naboborsher shubheccha niyo tomra dujone.

    ReplyDelete
    Replies
    1. তোমাকে আর বি-কেও নববর্ষের অনেক শুভেচ্ছা ভালোবাসা, শর্মিলা। পুরোনো বন্ধুর দেখা পেলে মন এত ভালো হয়। আমি তো হান্ড্রেড পার সেন্ট ঘুমের দলে এখন। বেড়ানো, খাওয়া তো পড়েই আছে, ঘুমের সময় বইয়ে দেওয়া যাবে না।

      Delete

Post a Comment