June 20, 2015

Things I am Loving




গত শনিরবি হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই বৃষ্টি নেমেছিল দিল্লিতে। একেবারে মেঘ ডেকে, বিদ্যুৎ চমকে, ঝমঝম আওয়াজ করে, সোঁদা মাটির গন্ধ ছেড়ে। আমি তো অবাক। জুনের শুরুতে বৃষ্টি? দিল্লিতে? তারপর মা যখন জানালেন যে আবহাওয়া অফিস থেকে বলেছে এ বছর বৃষ্টি কম হবে, অন্যান্য বছরের তুলনায় মোটে নাকি অষ্টাশি শতাংশ, তখন রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল।

এখন আবার যে কে সেই হয়ে গেছে, কিন্তু সেই বৃষ্টির জের বেশ কদিন চলেছিল। বেশ কদিন সারাদিন মেঘেরা আড়াল তুলে সূর্যকে ঢাকা দিয়ে রেখেছিল, বেশ কদিন রাতে এসি নিভিয়ে জানালা খুলে ঘুমোনো গিয়েছিল। তাতে মাঝরাতে ঘুম ভাঙছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা মশার কামড়ে, গরমে ঘেমে নয়।

আর ওই সময়টাতেই এই পোস্টটার কথা মগজে আসতে শুরু করেছিল। থিংস আই অ্যাম . . .নামের ট্যাগটা বহুদিন একা পড়ে আছে, সেটাকে এই বেলা হৃষ্টপুষ্ট করে তোলা যাক। আচ্ছা, ভালো ভালো সব ব্যাপার ঘটে বলে মন ভালো থাকে, নাকি মন ভালো থাকে বলেই সাধারণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারগুলোও ভালো বলে ঠেকে? যাকগে এসব জটিল প্রশ্ন নিয়ে ভেবে মাথাগরম করে লাভ নেই, সোজা লিস্টে ঝাঁপানো যাক।

১। লিস্টের প্রথম দুটো জিনিসই ওপরের ছবিতে আছে। বৃষ্টির আগে যখন অমানুষিক গরমটা পড়েছিল তখন এই রেসিপিতে চা বানাতে শুরু করি। সকালবেলার চায়ে দুধ দেখলেও তখন আমার মাথা ঘুরে যাচ্ছিল। আমি চায়ে দুধের বদলে একটি করে পুদিনার একটি করে পাতা আর এক ফালি লেবু দিতে শুরু করলাম। এখন তো একটা ছোট  বাক্সে করে শুকনো পুদিনা পাতা অফিসেও নিয়ে যাই। লেমন টি ব্যাগের সঙ্গে একটা কি দুটো মিশিয়ে দিই। চমৎকার লাগে। আগে সকালের চায়ে ঘুম ছাড়ত, এখন মন ভালো হয়ে যায়।

আপনারাও খেয়ে দেখতে পারেন। ব্যাপারটা ভালো খেতে এটা যদি যথেষ্ট জোরালো যুক্তি না হয় তাই আমি আপনাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য ইন্টারনেট ঘেঁটে পুদিনা-চায়ের উপকারিতা খুঁজে বার করেছি। এই রকম চা খেলে নাকি IBS নামের এক কঠিন অসুখ সারে (জ্যোতি বসুর নাকি IBS ছিল। আনন্দবাজারের হেডলাইনে পড়েছিলাম।) তাছাড়াও ব্রণ উপশম হয়, রক্ত পরিষ্কার হয়, দেহ থেকে টক্সিন দূর হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।

সত্যি বলছি, এই সব প্রতিশ্রুতিতে কান দেওয়া আমি অনেকদিন হল ছেড়ে দিয়েছি। আমি সারাদিনে অন্তত চার লিটার জল খাই (কারণ সেই ছুতোয় অফিসের কাজ আর অবান্তরের লেখা থেকে একশোবার ওঠা যায়) আর অবান্তরের স্টেট ভবনের পোস্ট পড়ে যা-ই মনে হোক না কেন, আমি বেসিক্যালি রুটি আর কলমিশাক খেয়ে জীবনধারণ করি। এর থেকে হেলদি ডায়েট পৃথিবীর আর কেউ মেন্টেন করে বলে আমার জানা নেই। এবং আমার মুখে সর্বক্ষণই অন্তত সাড়ে তিনখানা করে ব্রণ বিরাজ করে।

দেখেশুনে আমি বাবার মতই মেনে নিয়েছি। কপালে (আর গালে, আর চিবুকে) যদি ব্রণ লেখা থাকে, তবে কোনও ডায়েট, কোনও ডাক্তারের সাধ্য নেই তাকে আটকায়। ঠিক যেমন কপালে ঝকঝকে, তুলতুলে ত্বক লেখা থাকলে কোনও সিঙাড়া, কোনও আলুর চপের সাধ্য নেই তাকে মাটি করে।

কিন্তু আপনারা যদি গুণাগুণ দেখে উৎসাহ বোধ করেন তাই বললাম। আমি পুদিনা চা খাই স্রেফ ভালো লাগে বলে। গরম জলে পড়ে যখন শুঁটকো পাতাটা ফুলের মতো ফুটে ওঠে, আর চুমুক দেওয়ার পর ঝাঁঝালো মিঠে গন্ধটা মুখের ভেতর ছড়িয়ে যায় তখন মনে হয় এ যেন সামান্য রোজকারের চা খাওয়া নয়, তার থেকে বেশি কিছু।

২। দ্বিতীয় ভালোলাগার জিনিসটাও পুরোটা না হলেও অল্প অল্প ওই ছবিতেই দেখা যাচ্ছে। আমার জানালার বাগান।

ঠাকুমা চোখ কপালে তুললেন বাস্তবের ঠাকুমা, যিনি রিষড়ার বাড়ির বিছানায় শুয়ে শুয়েই সারা পাড়ার খবর জোগাড় করছেন তিনি নন, আমার মাথার মধ্যে যিনি চব্বিশঘণ্টা বিরাজ করেন তিনি।

বাগান?!”

আচ্ছা বাবা, বাগান নয়। গার্ডেন। হয়েছে? ঊইন্ডোসিল গার্ডেন।

গার্ডেন আর বাগান একই কথা। বয়েজ স্পেলিং বুক পড়েছি আমি। আমাকে ভুজুং দিস না। এগুলো কী?”

একেবারে বাঁ দিকেরটা সিংগোনিয়ামএকটু থেমে আমি যোগ করি, “ইন এক্সকুইজিট অরেঞ্জ মেটাল প্ল্যান্টার মাঝেরটা অ্যাগলোনেমা হোয়াইট গ্রিন থ্রি ইন ওয়ান, ডানদিকেরটা ক্লোরোফাইটাম কোমোসাম। জিভে আটকে গেলে স্পাইডার প্ল্যান্টও বলতে পার। অবশ্য কেন যে স্পাইডার ভগবান জানে, তার থেকে ফোয়ারা প্ল্যান্ট বললে অনেক লাগসই হত। তার পাশেরটা . . .

এগুলো কোন কাজে লাগে?” অভদ্রের মতো আমার কথার মধ্যে কথা বলে ওঠেন ঠাকুমা

ফল দেয়? ফুল দেয়? পুজোয় লাগে? (শুধু সৌন্দর্যবৃদ্ধি করে যে সব ফুল তাদের ঠাকুমার ফুলের গোত্রে ফেলেন না), সকালবেলা উঠে কাঁচা পাতা চিবিয়ে নয় তো বেটে খেলে পেট ঠাণ্ডা হয়?”

উফ ঠাকূমা, সর্বক্ষণ পেট পেট কোরো না তো। মাথার কথাটাও একটু ভাব।

ওরে, ভুঁড়ি ঠিক না থাকলে মুড়িও ঠিক থাকে না রে। এই সহজ কথাটা যে কবে বুঝবি।

আমি ঠাকুমার কথায় কান দিই না।

এ কি তোমার দুর্গন্ধময় গাঁদাল পেয়েছ যে যখনতখন তুলে বেটে খেয়ে নেবে? এ সব অনেক উচ্চমার্গের গাছ। এদের মূল অবদানটা হচ্ছে এয়ার পিউরিফিকেশন অ্যান্ড স্ট্রেস রিডাকশনের ফিল্ডে পাঁচ মিনিট টানা তাকিয়ে থাকলেই বুঝবে হৃদপিণ্ডের গতি কমে আসছে, নিঃশ্বাসপ্রশ্বাস মোলায়েম হয়ে আসছে . . .

বুঝেছি। আগাছা।

চোখ ঘুরিয়ে ঠাকুমা আলোচনায় দাঁড়ি টানেন।

সে ঠাকুমার সংজ্ঞায় এ আগাছাই হোক বা আবর্জনা, আমার কাছে এরা গাছ। রীতিমত বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন, সংবেদনশীল গাছ। যেদিকে আলো সেদিকে পাতা বাড়ায়, জল দিলে দুদিন পরে ছোট ছোট নতুন পাতা বার করে। এমনকি বৃষ্টি পড়লে জানালা খুলে দিলে, মাথা নেড়ে নেড়ে থ্যাংক ইউবলতেও স্পষ্ট শুনেছি।

 যবে থেকে এই পোস্টটা মাথার ভেতর দানা বাঁধতে শুরু করেছে তবে থেকে ভেবে চলেছি এই ভালোলাগাটাকে পোস্টে রাখাটা উচিত হবে কি না ওপর ওপর দেখলে ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে কাজেই থিংস আই অ্যাম লাভিং পোস্টে ঘটনাটার জায়গা হওয়া উচিত। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলে ব্যাপারটা যতটা না ভালোলাগার তার থেকে বেশি অহংকারের। মায়ের মতে, সব পতনের মূলে যা।

যাই হোক, পতনই হোক বা উত্থান হোক, মাথায় এসেছে যখন বলেই ফেলি। ইদানীং আমাদের অফিসে লাঞ্চে ভবন/সদন/নিবাসের ক্যান্টিনে খেতে যাওয়ার একটা হাওয়া উঠেছে। আমি জানি যে স্টেট ক্যান্টিনে খেতে যাওয়াটা দিল্লি শহরের একটা অতি পুরোনো এবং চেনা টাইমপাস। সকলেই জানে যারা জানে না, তারাই পাগল। কিন্তু অনেক সময় জানার ওপরেও তো বিস্মরণের ধুলো পড়ে, তাই না? আমাদের অফিসের লোকজনেরও তাই হয়েছিল নির্ঘাত। আমার ঘন ঘন স্টেট ভবনে খেতে যাওয়া এবং খেয়ে এসে দুয়েকজনের কাছে গল্প করে বলার পর সে ধুলো সরে গেছে। সবাই এখন দল বেঁধে যাচ্ছে, কোনওদিন ওডিশা নিবাস, কোনওদিন জাকোই, কোনওদিন ভিভা লা ভিভা। যাওয়ার আগে মাঝেসাঝে আমার কাছে টিপস নিতে আসে। আমি মুখে খুব উৎসাহ দেখিয়ে বলি, “এখানে যাও ওখানে যাওকিন্তু মনের ভেতরে ভয় ভয় করে। আমার মতো বুড়োদের স্টেট ক্যান্টিনে খেতে ভালো লাগে বলে এ সব তরুণ তুর্কিদেরও যে ভালো লাগবে তার তো মানে নেই। সরকারি বাড়ির সরকারি চাল, কেঠো চেয়ারটেবিল, সরকারি পরিষেবার সংজ্ঞা এদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কি না সেই নিয়ে ভেতরভেতর টেনশন হয়।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত প্রতিবারই টেনশন অযথা প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিবারেই খেয়েদেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে ফিরেছে সবাই। কেউ কেউ আবার বাড়ির লোক সঙ্গে নিয়েও গেছে শুনেছি। যাক বাবা।

৪। তালিকার শেষ ভালোলাগাটা অটো থেকে দেখা একটা দৃশ্য। দিল্লিতে এখন মেশিন কা ঠাণ্ডা পানি’-র সিজন শুরু হয়েছে। দো রুপেয়া গিলাস। প্রতি ফুটপাথের এ মাথা ও মাথায় একজন করে ভুট্টাবিক্রেতা আর একটা করে ঠাণ্ডা পানির মেশিন। বেসিক্যালি, স্টিলের চৌকো ফ্রিজ। ফ্রিজের ওপর একটা ডাণ্ডা মতো উঁচিয়ে থাকে। সেটা হচ্ছে পাম্প। পাম্প চেপে ধরলে গায়ে লেগে থাকা কল থেকে কনকনে ঠাণ্ডা জল বেরিয়ে আসে। সে জল পরিবেশনের জন্য পাশে সাজানো থাকে সারি সারি উল্টোনো কাঁচের গ্লাস। যে সব বিক্রেতার সাজগোজের দিকে নজর থাকে তাঁরা গ্লাসগুলোকে তাসের বাড়ির মতো করে একটার ওপর একটা রেখে তাসের বাড়ির মতো সাজান। এঁদের মেশিনের ওপর আবার গোছা করে ধনেপাতাও রাখা থাকে, যদিও আমি কখনও কাউকে জলের সঙ্গে ধনেপাতা মিশিয়ে খেতে দেখিনি। তবে দেখনদার অদেখনদার সব রকম জলবিক্রেতার মেশিনের ওপরেই একটা চিৎ করা গ্লাসে ঠাসাঠাসি করে পাতিলেবু রাখা থাকে। আর চামচ ডোবানো একটা বয়ামে বিটনুন।

আমি যখন সকালবেলা অফিস যাই, এই ঠাণ্ডা পানিওয়ালারাও অফিস যান। বা অফিসটাকেই ঠেলে ঠেলে নিয়ে যান বলা ভালো। অত ভারি অফিস ঠেলা কি সোজা কথা? সকলেই বুদ্ধি করে শার্ট খুলে গাড়ির ওপর রাখেন, কিন্তু তাতে আর কত গরম কমে। ঘামে ভিজে তাঁদের গেঞ্জির রং গাঢ় হয়ে যায়। যে যার বাড়ির সামনেই কেন মেশিন নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন না সেটা একটা রহস্য। ফুচকাওয়ালা আর আইসক্রিমওয়ালাদের মধ্যেও এ ব্যাপারটা দেখেছি। মাঝরাতে দমদমে নেমে ত-কাকুর গাড়ি চেপে বাড়ি ফিরছি, বালি ব্রিজ থেকে নেমে রাস্তাটা যেখানে বাঁক নিয়ে হাওড়া পেরিয়ে হুগলিতে ঢুকছে সেখানে দেখি ফুচকাওয়ালাদের মৌনমিছিল চলেছে। লাইন দিয়ে একের পর একজন গাড়ি ঠেলে হনহন করে হাঁটছেন। কারও মুখে কথা নেই।

বাবা বলেছিলেন এতে নাকি অবাক হওয়ার কিচ্ছু নেই। কোন একটা জায়গার নাম বলেছিলেন ভুলে গেছি, শুধু মনে আছে সেটা অনেক দূর। এই সব ফুচকাওয়ালারা নাকি সবাই সেখানে থাকেন। রোজ সকালে ফুচকার গাড়ি ঠেলে এক, দেড়, দুঘণ্টা হেঁটে যে যার নির্দিষ্ট জায়গায় যান আবার রাতে হেঁটে হেঁটে ফিরে আসেন। আইসক্রিমওয়ালাদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। মাঝরাতে ইন্ডিয়া গেট থেকে মিছিল শুরু হয়, কোথায় গিয়ে থামে কে জানে।

সমতল রাস্তা হলে তাও একরকম। কিন্তু দিল্লির মতো শহরে, যেখানে ট্র্যাফিকের সুবিধে (আবহাওয়া-বিজ্ঞানীরা অবশ্য অনেকেই এতে কোনও সুবিধে দেখেন না। তাঁরা বলেন গলগল করে কার্বন মোনোক্সাইড ওগরানো বাহনের সুবিধে বাড়ানো মানেই পৃথিবী আর তার বাসিন্দাদের অসুবিধে বাড়ানো।) আর শোভাবর্ধনের জন্য ফ্লাইওভারে ছেয়ে ফেলা হয়েছে চারদিক, সেখানে এই গাড়ি ঠেলা অমানুষিক পরিশ্রম। বিশেষ করে জলের গাড়ি। অমানুষিকই নয়, প্রায় অসম্ভবও।

তাই গাড়িওয়ালারা একটা উপায় বার করেছেন। ফ্লাইওভারের মুখে পৌঁছে দুজন গাড়ি থামান। এবার একটা গাড়িকে দুজন মিলে ঠেলে ঠেলে ব্রিজের ওপরে তোলেন। সেখানে সেটাকে রেখে আবার ব্রিজের মুখে ফিরে আসেন। অন্য গাড়িটাকে দুজনে মিলে ঠেলে ব্রিজের ওপরে তোলেন। তারপর যে যার গাড়ি নিয়ে ব্রিজ থেকে নেমে যান।

সেদিন আমার বেরোতে সামান্য দেরি হয়ে গিয়েছিল। সাধারণত একটা সময়ের পর অটো পেতে প্রাণান্ত হয়, কিন্তু কী ভাগ্যিস সেদিন একজন অটো ভাইসাবও লেট করে স্ট্যান্ডে এসেছিলেন। লাফ দিয়ে চড়ে বসে রওনা দিলাম। সকালবেলা সামান্য পনেরো মিনিটের আগুপিছুতে ট্র্যাফিকের পরিস্থিতি কতটা বদলে যায় যতবার দেখি নতুন করে চমক লাগে। পনেরো মিনিটের লেট বাড়তে বাড়তে কুড়ি থেকে পঁচিশ মিনিট হতে চলল প্রায়, এমন সময় ডিফেন্স কলোনির মোড়ে পৌঁছে দেখি একজন জলওয়ালাও সেদিন লেট করে ফেলেছেন, ফ্লাইওভারের মুখে দাঁড়িয়ে জড়ানোমড়ানো শার্টটা দিয়ে মুখের ঘাম মুছছেন, আজ তাঁকে একাই গাড়ি ঠেলে তুলতে হবে, বাকি সব জলওয়ালারা আগে চলে গেছেন।

ভদ্রলোক ঠেলতে শুরু করলেন। পা যতদূর সম্ভব পিছিয়ে, মাথা দুহাতের মধ্যে গুঁজে। গাড়ি নড়ল। ভদ্রলোক জোর বাড়ালেন। গাড়ি এগোল। ইঞ্চিখানেক। আজ অনেক সময় লাগবে ভদ্রলোকের ব্রিজ পেরোতে। সিগন্যাল সবুজ হয়ে গেছে। ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে গাড়ি যাচ্ছে। সকালবেলা সবার তাড়া। বাইক, অটো, লাল কমলা ধুমসো সরকারি বাস, ইউ এন-এর নম্বরপ্লেট লাগানো এস ইউ ভি। ভেতরে সোনালি চুলের কজন বাচ্চা কলবল করছে। এদিকে নির্ঘাত একটা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল আছে, প্রায়ই দেখি গাড়িটাকে।

ভদ্রলোক ঠেলতে লাগলেন। দ্রুত চলতে থাকা গাড়িদের পাশে তাঁর জলের গাড়ির গতি আরও শ্লথ, আরও ঢিলে মনে হতে লাগল। গাড়িটা কি এগোচ্ছে আদৌ? নাকি ভদ্রলোক বৃথাই পরিশ্রম করে চলেছেন? কাউকে ডাকছেন না কেন। ফ্লাইওভারের মুখেই হনুমানজী না কার একটা মন্দির আছে, সেটার দরজার কাছে দিবারাত্র কয়েকজন বসে জটলা করতে থাকে। তাদের একজনকে ডেকে আনলেই হয়।

ওদিকের সিগন্যাল বন্ধ হয়ে আমাদের দিকের সিগন্যাল খুলল। অটো ভাইসাব খবরের কাগজ মুড়ে রেখে গাড়িতে স্টার্ট দিলেন। আর তক্ষুনি আমি ভদ্রমহিলাকে দেখতে পেলাম। হন হন করে ফ্লাইওভারের ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে আসছেন। প্রায় দৌড়চ্ছেনই বলা ভালো। মুখ গম্ভীর, শরীরের দুপাশে দুটো হাত প্যারেড করার ভঙ্গিতে এগোচ্ছে পিছোচ্ছে। পরনে ফুলছাপ কাপড়ের কামিজ, ঢোলা সালওয়ার, পায়ে ধপধপে সাদা স্নিকার। দিল্লি শহরের চেনা চেহারা।

আমাদের অটোটা বাঁক নিয়ে ফ্লাইওভারে উঠে এল। আর সেকেন্ডখানেকের মধ্যে জলওয়ালা ভদ্রলোককে পেরিয়ে এগিয়ে যাবে। এমন সময় দেখতে পেলাম ফুটপাথ থেকে মহিলা নেমে এসেছেন। জলওয়ালা ভদ্রলোকের পাশে দাঁড়িয়ে, পা পিছিয়ে দিয়ে, দুহাতের মাঝে মাথা গলিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ঠেলা মেরেছেন গাড়িটাকে। এক ঠেলায় গাড়ি গড়গড় করে গড়াতে শুরু করেছে।

আমি অটোর ফোকর থেকে যতক্ষণ পারা যায় মুণ্ডু গলিয়ে পেছন দিকে তাকিয়ে থাকলাম। গাড়ি তরতর করে এগোচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে ব্রিজের মাথায় পৌঁছে যাবে।

মেয়েদের নিয়ে গর্ব করার মতো জিনিসের অভাব নেই এখন পৃথিবীতে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, খুনি, বদমাশ, বিদ্বান, বিদূষক, পুলিশ, পরিব্রাজক সব ভুমিকাতেই তারা নিজেদের সফল প্রমাণ করেছে। কিন্তু দরকার পড়লে যে তারা রাস্তায় নেমে রোগা পানিওয়ালার গাড়িও ঠেলতে পারে, এটা দেখে সেদিন যে আমার কী গর্ব হল সে আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না।


16 comments:

  1. IBS, Irritable Bowel Syndrome. etake anandabazar eri kono akta michke reporter akbar kore diyechilo Irritable Bawal Syndrome. odvutvabe amar moneo ache seta.
    pudina cha er idea ta chomotkar. amio khabo ebar theke.
    thakumar sathe kalponik kothopokothon pore mon bhalo hoye gelo. amar baba ma o ei jukti diyei gach select koren. amader chhade sobi 'useful' gacher somabesh. even sedin dekhlam akta hristopushto puishak gach hoyeche. amader ager bariteo gadal gach chilo. barir karor pet kharap holei gadal er jhol ranna hobe sedin. ki gondho baba re baba.
    last er point ta pore amaro khub gorbo holo.

    ReplyDelete
    Replies
    1. গাঁদালপাতার অত্যাচার তুমিও সয়েছ শুনে শান্তি পাচ্ছি, কুহেলি। শেষের ঘটনাটা আমার অনেকদিন মনে থাকবে।

      Delete
  2. Chomotkar likechen kintu. Shesher ghotonata pore besh bhalo laglo.ar ruti kolmishak r byapar ta sune moja pelam. Lekha chalie Jan.

    Ekta mota-moton lok.

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, আপনার আত্মপরিচয় পড়ে মুগ্ধ। উৎসাহ দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। খুব ভালো লাগল।

      Delete
  3. Shesh bhalo lagata shob cheye bhalo laaglo!!

    Shuteertho

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমারও সুতীর্থ। হাই ফাইভ।

      Delete
  4. Osombhob bhalo laglo.. bishesh kore shesher golpota..

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ, ইনিয়া।

      Delete
  5. khub khuuub bhalo laglo post ta.. ar sesh ta pore ... ektu kochi knachader bhasa dhar korte bolte ichhe korchhe..."monta garden garden hoe galo"...

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ, ইচ্ছাডনা। ঘটনাটা দেখে আমারও মন ওই রকমই হয়ে গিয়েছিল।

      Delete
  6. aha sesher bhalo lata darun, erokom jinis dekha jay bolei to carbon monoxide wala prithibita oxygen pay :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. ঠিক ঠিক, প্রদীপ্তা।

      Delete
  7. Replies
    1. সত্যি বলে আরও বেশি ভালো, চুপকথা।

      Delete
  8. koyekta oti sadharon bapar..jegulo onno keu likhle eriye jeto bollei chole..segulokeo emon soros vabe likhechen..ghotona gulo sotti e sundor..kintu ei je "ghotona" theke 'gho','to' ar 'na' ke alada kore dekhleo segulo o kono onshe kom sundor noi :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, হংসরাজ। অবান্তরে স্বাগত জানাই।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.