February 13, 2019

অমৃতসর ৪ঃ কচৌরি, কুলচে, লস্যি




অমৃতসরের খাওয়ার জায়গা নিয়ে রিসার্চ করার থেকে ঝামেলার কাজ কমই আছে। টিক্কা থেকে ডাল ফ্রাই থেকে কুলচা থেকে লস্যি থেকে চাট থেকে আমসত্ত্ব - সবেরই লিজেন্ডারি দোকান থিক থিক করছে শহরে। তার ওপর কোন দোকান আগে ভালো ছিল, এখন পড়ে গেছে, কারা কারা হিডেন জেমস, পাশাপাশি দুটো দোকানের কোনটা আসল কোনটা জালি সে সব বাড়তি কনসার্ন তো আছেই। আবার নামের অল্প অদলবদল ঘটলে মিসগাইডেড হওয়ার চান্স খোলা। মানে কানহা সুইটস আর কানহালাল সুইটস, অশোক কুলচা আর অশোককুমার কুলচেওয়ালে কোনটায় খেলে ঠকবেন (কিংবা ঠকবেন না) সে নিয়ে চোখকান খোলা রাখতে হবে। 

তার ওপর আমরা থাকি দিল্লিতে। সহকর্মী থেকে সহযাত্রী থেকে ওলা উবারের ড্রাইভার ভাইসাব পর্যন্ত অমৃতসরের খাবারদাবার নিয়ে ইনফর্মড ডিসকোর্স চালাতে পারেন। না পারলেও, রিসোর্স পার্সন জানা আছে  বেশিরভাগেরই, হেল্পফুল হয়ে আলাপ করিয়ে দেবেন।

তবু আমরা রিসার্চ করেই গিয়েছিলাম। কারণ আমাদের হাতে দেড় দিন আর এই দেড় দিনে রাডারলেস শিপের মতো দৌড়োদৌড়ি করে লক্ষ্যে পৌঁছনো যাবে না। কী খাব, কোন দোকানে খাব, কখন খাব - সব আমাদের ছকা ছিল।  



চা-ব্রেকফাস্ট

অমৃতসরে ভারতবর্ষের বাকি সব শহরের মতোই ক্যাফে কফি ডে খুলেছে, টাউন হলেই দুখানা দেখলাম, কিন্তু দিন শুরু করার ট্র্যাডিশনাল তরিকা হল চা। বেশি করে আদা, এলাচ দেওয়া দুধ চা। একটা কথা সকলেই বলে দিয়েছিলেন, অমৃতসরে যাই খাও না কেন, যেখানেই খাও না কেন,  ফুড সাফারি খালি পেটে শুরু কোরো। একেবারে খালি তো আর থাকা যায় না। আমার দাদু গায়ত্রী মন্ত্র না জপে জলগ্রহণ করতেন না, চোখ খোলার পনেরো মিনিটের মধ্যে এক কাপ চায়ের সঙ্গে মোলাকাত না হলে আমার ধর্মসংকট উপস্থিত হয়। কাজেই যে রকম চা পেটে মিনিমাম জায়গা নেবে, অর্থাৎ দুধ চিনি ছাড়া লেবু চা, নিয়মরক্ষা এক কাপ খয়ে বেরিয়ে পড়লাম। 


আমাদের লিস্টের চায়ের দোকান ছিল কুপার রোডের গিয়ানি টি স্টল। হোটেল থেকে হেঁটে মিনিট কুড়ি। গিয়ানি ব্র্যান্ডের দোকানের অভাব নেই অমৃতসরে। কিন্তু ঠিক দোকানেই যে পৌঁছেছি তা নিয়ে কোনও সন্দেহই রইল না খদ্দেরদের দেখে। মাথায় কমলা পাগড়ি বেঁধে স্থানীয় সর্দারজিরা দোকানের সামনে বেঞ্চি পেতে বসে আছেন। হাঁটুতে এক হাত, অন্য হাতে চায়ের কাপ। হা হা হাসছেন যেন বাজ পড়ছে। আমি স্টিরিওটাইপিং করতে চাই না, রোগাভোগা সর্দারজিও কম দেখিনি অমৃতসরে, কিন্তু গিয়ানির দোকানের সামনে সেদিন সকালে যাঁরা বসে ছিলেন তাঁদের সত্যি সত্যিই যেমন বললাম তেমন দেখতে। দোকানের ভেতরে অলরেডি নানা ধরণের খাইয়ে। কেউই টুরিস্ট নয়। একলা সর্দারজী, দোকলা নন-সর্দারজি, স্কুল যাওয়া ছোট ছেলে আর ছেলের মা। মা চায়ে ডুবিয়ে ছেলেকে সামোসা খাইয়ে দিচ্ছেন। আমার কপালে কমপ্লানে ডোবানো মিল্ক বিকিস জুটত, মনে পড়ে বুক হুহু করে উঠল। কোণের টেবিলে চারজন পুলিসও দেখলাম। উর্দিটুরদি পরা। চার মাথা এক করে চোখমুখ নেড়ে খুব উত্তেজিত হয়ে কথা বলছেন।


চায়ের সঙ্গে নানারকম অস্বাস্থ্যকর টা পাওয়া যায়, যেমন সামোসা বললাম। কিন্তু সবথেকে অস্বাস্থ্যকর এবং ফেমাস হচ্ছে কচৌরি। বা বোমা বললেও চলে।

দু’গ্লাস চা আর দু’পিস কচুরি চাই বলা উচিত ছিল। দু’প্লেট কচৌরি অর্ডার করাতে পরিবেশক চারখানা বোমা আমাদের সামনে নামিয়ে রেখে গেলেন। ও জিনিস একটাও পুরো খেতে পারার কনফিডেন্স ছিল না আমার, আগের রাতে ডিনার বাদ দেওয়াতেই সম্ভবতঃ একটা গোটা শেষ করতে পারলাম। অর্চিষ্মান অন্যটায় চামচ বসিয়েও অর্ধেক পথ গিয়ে আর পারেনি। চাটনিটা পুদিনা চাটনির মতো দেখতে কিন্তু খেতে অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং। সম্ভবতঃ তেঁতুলের মিশেল আছে। বেশি এলাচটেলাচ দিলে অনেকসময় চায়ের সুগন্ধী শরবতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, গিয়ানির চা সে দোষমুক্ত। আমরা ‘ফিকি’ চা অর্ডার করার সাহস দেখাইনি কিন্তু এত কম মিষ্টি চা আমি আর অর্চিষ্মান রাস্তার দোকানে প্রায় খাইনি বললেই চলে। বোমার পাল্লায় সেই চাও পুরো শেষ করা গেল না। অর্ধেক খেয়ে বেরিয়ে এলাম।

অমৃতসরের খাবার জায়গা প্ল্যান করে যাওয়ার আরও একটা অসুবিধে সম্পর্কে আপনাদের সাবধান করে রাখি। প্ল্যান নিশ্চয় আপনি নিজের খাওয়ার ক্ষমতার এস্টিমেশন অনুযায়ী করবেন, সে এস্টিমেশন ভুল প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কাজেই লাস্ট মোমেন্টে প্ল্যানের অদলবদল করার জন্য তৈরি থাকবেন। আমরা যেমন ব্রেকফাস্টের আরও দুটো জায়গা শর্ট লিস্টে রেখেছিলাম, কানহা সুইটস আর কানহাইয়া লাল। ভেবেছিলাম সকালে চায়ের সঙ্গে একটা কচুরিতে আর কত পেট ভরবে, মাঝসকালের দিকে খেয়ে কানহাইয়ালালে গিয়ে একটু পুরী আলুর তরকারি, যা কি না সাধারণ তরকারির থেকে আলাদা এবং লৌঞ্জি নামে খ্যাত, খাব। পরদিন কানহা সুইটসে। প্রথমদিন বোমা হজম করতে আমাদের দুপুর দুটো বেজে গিয়েছিল আর দ্বিতীয় দিন কেন খাওয়া হয়নি পরে বলছি। 

কুলচা

অমৃতসরের সব খাবারদাবার নিয়েই রিসার্চ করা শক্ত শুরুতেই বললাম কিন্তু সবথেকে গোলমেলে গবেষণার খাবার হচ্ছে কুলচা। অমৃতসরি কুলচা। এ যেন পশ্চিমবঙ্গের কোনও এক পাড়ায় গিয়ে জিজ্ঞাসা করা, ভাই এখানে বেস্ট ফুচকা বা রসগোল্লা কে বানায় বলতে পার? ব্লগটলগ পড়ে, ভিডিওটিডিও দেখে অমৃতসরী কুলচার একাধিক লংলিস্ট, শর্টলিস্ট তো হয়েইছিল, শুক্রবার অর্চিষ্মানের উবারভাইসাব অমৃতসর যাওয়া হচ্ছে শুনে মহা উত্তেজিত হয়ে, কী যেন কী যেন নাম মনে পড়ছে না দাঁড়ান ভাইকে ফোন করি, বলে কাজিনকে ফোন করে অমৃতসরের বেস্ট কুলচার দোকানের নাম রেকমেন্ড করলেন। কারও সঙ্গে কারও রেকোমেন্ডেশনের মিল নেই, বলা বাহুল্য।

অর্চিষ্মানের এক কলিগই ঠিক বলেছিলেন। অমৃতসরি কুলচাকে বারে মে জাদা সোচোঁ মত। কহিঁ পে ভি খা লেনা। সারে আচ্ছে হ্যায়। 

কথাটা খাঁটি। বলাই বাহুল্য আমরা সারে কুলচা খেয়ে দেখিনি। দেড় দিনের ট্রিপে চা, ব্রেকফাস্ট, লস্যি, আমসত্ত্ব, মেন কোর্স খাওয়ার পর সারে কেন, দুইয়ের বেশি তিনজায়গার কুলচা চেখে দেখার চেষ্টাও বোকামি। কিন্তু অমৃতসরের রাস্তার দুপাশের অগুনতি রেস্টোর‍্যান্টের পাশ দিয়ে এই দু’দিন ক্রমাগত যাতায়াত করতে করতে একটা জিনিস আঁচ করতে পেরেছি। ও সব অনেক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেই আমরা উমদা খাবার খেতে পেতাম। শুধু কুলচা নয়, অমৃতসরের বাকি সব খাবারেরও স্বাদ অন্যান্য শহরের থেকে আলাদা। একটা ব্লগ না নিউজপেপার আর্টিকেলে পড়ছিলাম অমৃতসরের খাবারের এই কেরামতিটা কী জানতে চেয়েছেন লেখক। সিক্রেট মশলা? গোপন প্রণালী? তুকতাক? তাতে একজন অম্লানবদনে বলেছেন, পানি। অমৃতসরের পানিতেই রয়েছে অমৃত। ও দিয়ে যা রাঁধবে তাই ভালো খেতে লাগবে। 

অমৃতসরি কুলচা কাকে বলে? স্টাফড পরাঠা বললে খানিকটা অপমান করা হয়। বাঙালি বিয়েবাড়িতে আজকাল কুলচা (আবার প্রাপ্তবয়স্কও নয়, বেবি কুলচা) বলে যে জিনিসটা চ্যাৎনা পাত্রে পড়ে থাকে এবং অনভ্যস্ত হাতে চিমটে দিয়ে ব্যালেন্স করে পাতে তুলে নিতে গিয়ে পেছনের বুফের লাইন লম্বা হয়ে যায়, ওটা যদি কুলচা হয় তবে এটা কুলচা নয় আর এটা যদি কুলচা হয় তো ওটা আর যা খুশি হতে পারে, কুলচা ছাড়া। দিল্লির কুলচার সঙ্গেও অমৃতসরি কুলচা সম্পর্ক পাতাতে নারাজ। একজন অমৃতসরি কুলচা কনোসিওর দিল্লির কুলচা সম্পর্কে বলেছেন, ও কুলচা কিত্থে? ও তো স্টাফড তন্দুরি রুটি। 


কথাটা মিথ্যে নয়। অমৃতসরি কুলচা একরকমের ফ্ল্যাটব্রেড বটে, কিন্তু সে ব্রেড ফ্ল্যাট নয় মোটেই। তার পরৎ আছে থরে থরে। ওই থিন ক্রাস্টেই বাইরে মুচমুচে আর ভেতরে তুলতুলে। আমরা খাবারদাবারের ব্যাপারে দিল্লি ফুড ওয়াকের অনুভব সাপ্রার মতামতকে গুরুত্ব দিই। দিল্লিতে তো বটেই, ভারতের অন্যান্য শহরের খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রেও ওঁর সাজেশন আমাদের এখনও ডোবায়নি। অমৃতসরের তিনটি বিখ্যাত দোকানের কুলচা উনি চেখেছেন এবং রায় দিয়েছেন অশোককুমার কুলচেওয়ালা ওঁর ব্যক্তিগত ফেভারিট। আমরা অশোককুমার কুলচেওয়ালাতেই খাব ঠিক করলাম। প্রথমটা আমরা অশোক কুলচা আর অশোককুমার কুলচেওয়ালা গুলিয়ে ফেলছিলাম কিন্তু দুটো সম্পূর্ণ আলাদা দোকান এবং বেশ খানিকটা দূরত্বে।


তিনশো মিটার দূর থেকে অশোককুমার কুলচেওয়ালের ভিড় চোখে পড়ে। রাস্তায় পাতা চেয়ারটেবিলে শনিবার দুপুরের হট্টগোল। তবে ভিড়ের একটা বড় অংশ এস ইউ ভি-র ভেতরে খাবার আনিয়ে নিয়ে খাচ্ছে। আমরা নিলাম একটা অমৃতসরি কুলচা মাখ্‌খন মারকে আরেকটা আলুগোবি কুলচা মাখখ্‌ন প্লাস মিরচা মারকে। অরিজিন্যাল অমৃতসরি কুলচার পুর বিশুদ্ধ আলু। কিন্তু পুরের যা বৈশিষ্ট্য, অনেক রকম এক্সপেরিমেন্ট করা যায়। কাজেই কপি থেকে কিমা সবই চলে।


সাপ্রা অশোককুমার কুলচের পুরের বিশেষ করে প্রশংসা করেছিলেন, সত্যি চমৎকার। সঙ্গের যত চাও তত খাও টকমিষ্টি ছোলেটিও চমৎকার। একটা জিনিস খেয়াল করে দেখলাম, দিল্লির ছোলের যে একটা ভয়ানক মশলাদার গলায় শুকনো লংকার ঝাঁজে গলা বন্ধ করা মশলায় কালচে ব্যাপার থাকে, অমৃতসরের কুলচার ছোলে তার থেকে অনেক হালকা। অন্ততঃ আমরা যে যে কুলচা খেয়েছি সেখানে এই অভিজ্ঞতাই হয়েছে। অশোককুমার কুলচেওয়ালায় চোখ বুজে খেতে পারেন। চমৎকার, প্রাণভরানো, মনভরানো কুলচা।

আমাদের পাশে দুতিনটে অল্পবয়সী ছেলে বসে অনেকক্ষণ ধরে কুলচা অর্ডার করে পাচ্ছিল না, আমাদের অর্ডার মারাত্মক দ্রুত এসে যাওয়াতে তারা নিজেদের মধ্যে রেগে গিয়ে কী সব বলতে লাগল। ক্যামেরা শব্দটা শুনে বুঝলাম তাদের রাগের কারণ হচ্ছে আমরা ছবি তুলব বুঝে পার্শিয়ালিটি করে তাড়াতাড়ি খাবার দেওয়া হয়েছে। সত্যিই পার্শিয়ালিটি হচ্ছিল সম্ভবতঃ। ন্যাপকিন চাওয়া মাত্র দৌড়ে একটা না দুটো না একেবারে গোটা ন্যাপকিনের প্যাকেট দিয়ে যাওয়া হল। পাশের টেবিলের ছেলেগুলো এত রেগে গিয়েছিল যে সেই প্যাকেট থেকেই চার পাঁচটা ন্যাপকিন কেড়ে নিয়ে হাতমুখ মুছতে লাগল, কুলচা টেবিলে এসে পৌঁছনোর আগেই। 

ঝটপট থালা সাফ হয়ে গেল দুজনেরই। আমি ভাবছি আরেকটা খাই, অর্চিষ্মানের উঠি উঠি ভাব। বাবা, এতেই পেট ভরে গেল? আমি তো এখনও আরেকটা হেসেখেলে খেতে পারি। গর্ব করে কথাটা বলতে অর্চিষ্মান বলল, আমিও পারি। কিন্তু এই দেখ কী দেখাচ্ছে, বলে ফোনটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দিল।


গুগল ম্যাপ। ‘ইয়োর লোকেশন’ থেকে ‘কুলচা ল্যান্ড’ হেঁটে মোটে বারো মিনিট। কুলচা ল্যান্ড হচ্ছে অমৃতসরের সেই সব দোকানের মধ্যে অন্যতম যার প্রতিভায় হিডেনটিডেন কিছু নেই। অমৃতসরের সেরা কুলচার প্রায় সব লিস্টের এক দুই তিনের মধ্যে কুলচা ল্যান্ডের সিট বাঁধা। অর্চিষ্মানের প্ল্যানটা হচ্ছে পেটে যা জায়গা আছে তা কুলচা ল্যান্ডের কুলচা দিয়ে ভরানো। তাহলে অমৃতসরি কুলচার বেশ একটা তুলনামূলক স্টাডি করা সম্ভব হবে। আমরা টাকা দিয়ে হেঁটে হেঁটে চললাম কুলচা ল্যান্ডের দিকে। হেঁটে যাওয়া আরও একটা কারণ আছে, খাওয়া হজম করায়। কুলচা ল্যান্ডেও গিজগিজ ভিড়। 


কুলচা ল্যান্ডের মেনু। এখানেও আমরা একটা অমৃতসরি, একটা মসালা কুলচা নিলাম। অমৃতসরি কুলচার পুর সেই খাঁটি আলুসেদ্ধ, আর মসালা কুলচার আলুটা বেশ করে মশলা দিয়ে মাখা। 


অদ্ভুত। অসামান্য। অত্যাশ্চর্য। সেই খাস্তা এবং মসৃণতার অত্যাশ্চর্য সমন্বয়। আমি আর অর্চিষ্মানের সামান্য মতানৈক্য হয়েছে। আমার মতে কুলচা ল্যান্ডের মসালা কুলচা অশোককুমার কুলচেওয়ালের আলুগোবির থেকে বেটার। চুল পরিমাণ, কিন্তু বেটার। অর্চিষ্মানের ভোট অশোককুমারের প্রতি।

কিন্তু যে ব্যাপারটায় আমরা দুজনেই একমত সেটা হচ্ছে কুলচা ল্যান্ডের ছোলের পাশের খোপের টাকনাটির শ্রেষ্ঠত্বে। এখানে অশোককুমারের প্রতি যাতে অন্যায় না হয় তাই বলে নিই, কুলচা ল্যান্ডে দুটি পদ দেওয়া হয় কুলচার সঙ্গে। একটা ছোলে, আরেকটি এই টক টক, ঝাল ঝাল শশা পেঁয়াজ দেওয়া অমৃত রসটি। অশোককুমারের ছোলে এই দুটি পদ পাঞ্চ করলে যেটা হয়, অর্থাৎ টক ছোলে, সেটা। কুলচা ল্যান্ডের ছোলে আমাদের চেনা ছোলের অনেক কাছাকাছি (যদিও দিল্লির থেকে অনেক কম মশলাদার)। কিন্তু ওই টক চাটনিখানা, আমি সিরিয়াসলি বর্ণনা করতে অক্ষম। গলা দিয়ে নামার সময় সত্যি সত্যি আহা উহু বেরিয়ে আসে।

লস্যি

অমৃতসরে লস্যির দোকানেরও কম্পিটিশন প্রচুর। আহুজা মিল্ক হাউস থেকে শুরু করে গিয়ানি দি লস্যি।  হাথি গেটের গিয়ানি দি লস্যির ছবিটবি দেখে রিভিউটিভিউ পড়ে আমরা ওখানেই যাব স্থির করেছিলাম।  ঠিক করলাম হাথি গেট চলে যাওয়া যাক, তারপর হেঁটে গিয়ানি দি লস্যিতে পৌঁছনো যাবে। কুলচা হজমও হবে, হেঁটে শহর দেখাও হবে। 

উবার ডাকলাম। ভুবনেশ্বরে যেমন নাকের ডগায় ওলাউবার দাঁড়িয়ে থাকে, অমৃতসরে অতটাও নয়। পুলটুল নেই, মোটরবাইক দিয়ে শুরু করে তারপরেই প্রিমিয়ার। সে গাড়িও এত কম, এই দেড়দিনে আমাদের একজন ভাইসাবের গাড়ি রিপিট হয়েছে। ভাবুন। একই উবার ট্যাক্সি দু’বার। আরেকজনেরও রিপিট হয়েছিল, দু’বারই তিনি ক্যান্সেল করেছেন। আমাদের নাম পছন্দ হয়নি সম্ভবতঃ। কুলচা ল্যান্ড থেকে হাথি পোল নিয়ে যাওয়ার জন্য যিনি এলেন তিনিই সকালে আমাদের রঞ্জিত সিং মিউজিয়াম থেকে পার্টিশন মিউজিয়াম নিয়ে গিয়েছিলেন। রকমসকম দেখে বুঝতেই পেরেছিলেন আমরা হদ্দ টুরিস্ট, হাথিপোলের কাছাকাছি এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হাথি পোল যানা হ্যায় কে গিয়ানি দি লস্যি পিনা হ্যায়? আমরা লস্যি লস্যি বলে চেঁচিয়ে উঠতেই শর্ট কাটে একটা গলির মুখে নামিয়ে দিয়ে বললেন, সোজা হাঁটো, গলি যেখানে শেষ সেখানে গিয়ানির দোকান। আমরা গলিতে ঢুকে পড়লাম।

নতুন শহরের গলিতে হাঁটার অভিজ্ঞতায় জানি, সর্বদা সেকেন্ড ওপিনিয়ন নেওয়া জরুরি। হয়তো উল্টোবাগে হাঁটছি। গলিতে ঢোকার মুখেই এক দোকানে বসে থাকা এক বর্ষীয়ান ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম। গিয়ানি দি লস্যি এদিকেই তো? তিনি উবার ভাইসাবের দিকনির্দেশ রিপিট করলেন। নাকবরাবর চলে যান, গলি যেখানে মেন রোডে মিশছে সেখানেই গিয়ানি দি লস্যি। 

দু’ সেকেন্ড থেমে জুড়লেন। পহলেওয়ালা।

সেরেছে। তার মানে মোহিনীমোহন, আদি মোহিনীমোহন কেস। গলির মোড়ে পৌঁছে আবিষ্কার করলাম সত্যিই দুখানা গিয়ানি দি লস্যি। আমরা যেদিক থেকে আসছি সেদিক থেকে পহলেওয়ালাটি স্থাপিত হয়েছিল উনিশশো একুশ সালে, পরেরটি উনিশশো সাতাশ সালে। 


যে ভদ্রলোক আমাদের প্রথম অর্থাৎ উনিশশো একুশের গিয়ানি দি লস্যিতে খাওয়ার টিপ দিলেন, তিনি উনিশশো সাতাশে জন্মাননি কাজেই টুকলি নিয়ে তাঁর মাথাব্যথা থাকার কারণ নেই ধরে নিচ্ছি। এও হতে পারে ওঁর বাবা আসলি গিয়ানি টুকলি গিয়ানির তফাৎ বুঝিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ট্র্যাডিশন উনি রক্ষা করে চলেছেন। কিংবা সাতাশের বর্তমান দোকানির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত চটাচটি আছে। 

কারণ যাই হোক না কেন, আমরা ওঁর কথা মতো পহলেওয়ালা অর্থাৎ উনিশশো একুশ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া গিয়ানিতেই ঢুকে গেলাম।


দর্শনধারী যে গুণবিচারী ভুলে যান। মনে রাখুন, মাকাল ফলের দ্যোতনাটা অনেক বেশি উপযুক্ত এ পৃথিবীর পক্ষে। ম্যাড়মেড়ে স্টিলের গ্লাসে পেস্তাবাদামহীন গিয়ানির লস্যির চেহারা দেখে ভুলবেন না। লস্যির কিনারে ওই যে চামচের ডগা দেখতে পাচ্ছেন ওটাকে হেলাছেদ্দা করবেন না। ম্যাগো, এই রকম সারা গায়ে দই লাগা চামচ দিয়ে আমি খাই না, এক্ষুনি স্ট্র এনে দাও, বলে হাত পা ছুঁড়বেন না। স্ট্র এ সিচুয়েশনে আপনাকে বাঁচাবে না। এ লস্যির যতখানি চুমুক দিয়ে খাওয়ার, ততখানিই চামচ দিয়ে কেটে কেটে মুখে পুরে চিবিয়ে চিবিয়ে। কারণ অফুরন্ত মালাই। খাঁটি, বিশুদ্ধ মালাই। ভেবেছিলাম দোকানের বাইরে দাঁড়িয়েই খাব। তারপর দোকানের ভেতরে ঢুকে চেয়ার টেনে বসলাম।সকালের কচুরির পর শিক্ষা হয়েছিল, একগ্লাস লস্যিই নিয়েছিলাম, মুখোমুখি আমি আর অর্চিষ্মান, মাঝখানে লস্যির গ্লাস নিয়ে মিনিট দশেক কেটে গেল।

গিয়ানিতে আরেকরকম লস্যি প্রবাদপ্রতিম, পেড়া লস্যি। পাছে পেট কম ভরে, পুষ্টির খামতি হয়, সেই ভয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি মালাইয়ের সঙ্গে ক্ষীরের প্যাঁড়া, দোকানের সামনে কাঁচের বয়ামে যা সারি সারি সাজানো আছে, চারখানা গুঁড়ো করে মিশিয়ে দেওয়া হয়। সকালে একখানা বোমা কচুরি আর দুপুরে দু’খানা কুলচা খাওয়ার পর আমাদের আর পুষ্টির দরকার ছিল না, আমরা নরম্যাল লস্যিই অর্ডার করেছিলাম। তাছাড়া ততক্ষণে শিওর হয়ে গেছি যে অমৃতসরে আবারও আসা হচ্ছে, কাজেই প্যাঁড়া লস্যিটা পরের বার খাব। পরের বা উনিশশো সাতাশের গিয়ানির লস্যিও খাব। কনফিডেন্স আছে, সেটাও খারাপ হবে না।

(চলবে)

অমৃতসর ১
অমৃতসর ২
অমৃতসর ৩



8 comments:

  1. Dekhei khete ichhe korche..Delhi/Gurgaon te onek jaiga te 'Amritsari Kulcha'r dokan achhe..kintu sure je actual Amritsari kulcha nischoy onek bhalo..

    ReplyDelete
    Replies
    1. তা বলা যায় না, রণদীপ, হয়তো এন সি আরেও কোথাও কোথাও খাঁটি অমৃতসরি কুলচা পাওয়া যায় কিন্তু অমৃতসরে বসে অমৃতসরি কুলচা খাওয়ার মজা নিশ্চয় বেশি হবে।

      Delete
  2. boroi lobhoniyo khabar dabar. Youtube dekhe amritsari kulcha banate chesta korte pari kintu sei taste ki ar hobe :(

    ReplyDelete
    Replies
    1. আহা বাড়িতে বানানো খাবার কি আর রাস্তার খাবারের স্বাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে বানানো হয়, বাড়িতে বানানোর নিজস্ব একটা তৃপ্তি আর ফ্লেভারও তো থাকে।

      Delete
  3. খাবারদাবার নিয়ে তোমার লেখাগুলোর ওপর, ‘‌খালি পেটে পড়বেন না’‌ গোছের একটা নোটিস ঝোলানো উচিত!‌

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, থ্যাংক ইউ, শীর্ষ।

      Delete
  4. Buddhi kore khali pete porini... oto heavy Lassi amar pochondo na.. Amritsari kulcha ta icche roilo..

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, ঊর্মি।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.