June 07, 2019

সুইট বান



আমি সাধারণত মাঝসকালের চায়ের সঙ্গে কিছু খাই না। খাওয়ার জিনিসের অভাবজনিত কারণে নয়। আন্টিজির দোকানে জিরে বিস্কুট, টোস্ট, ফেন, মঠরি, দোকানের পাশে আংকলজির উনুন থেকে গরম রুটি নামতেই থাকে, ডাল কিংবা ভাজি, যেদিন যেটা থাকে, সেই দিয়ে খাও। কোনওটাই খাই না কারণ এক তো খিদে থাকে না। তাছাড়া এই গরমে ঠাণ্ডা জল (আর গরম চা) ছাড়া কিছু শরীরের ভেতর সেধে পাঠানোর চিন্তাও প্রাণঘাতী। 

কিন্তু কাল সকালে এমন একটা কাণ্ড ঘটল যে বিনা কোনও জোরাজুরি, বিনা কোনও ব্ল্যাকমেল, বিনা কোনও চক্ষুলজ্জা, এই সাতচল্লিশ ডিগ্রির বাজারেও আমাকে খেতে হল। দোকানের নিচু গ্রানাইট তক্তায় আমার ছায়া পড়ল, আন্টিজির বউমা চোখ তুলে তাকিয়ে, কেটলি নামিয়ে ফিকি চায়ের সসপ্যান হিটারে চড়ালেন। আমিও, যাক এখন বাধ্য হয়েই খানিকটা বেশি সময় অফিসের বাইরে কাটাতে হবে মনে করে সাইড করে দাঁড়িয়ে পাঁচিলে হেলান দিয়ে ক্যান্ডি ক্রাশ সোডা খুললাম। খুলতে একটু সময় লাগল, ফোনটা পুরনো হয়ে গেছে কিংবা সময় নষ্টের পাপের ভাগী হতে চায় না। ফোনের অকারণ সর্দারিতে বিরক্ত হয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, মঠরির বয়ামের পাশের প্লাস্টিকের প্যাকেটের চোখে চোখ পড়ে গেল। না, জিরে বিস্কুটের প্যাকেটটা না, ওটা তো রোজই দেখি, তার পাশেরটা।

চৌকো, মুখ ছেঁড়া। ভেতর দু’সারি জিনিস রাখা ছিল। একসারি অলরেডি শেষ। অন্য সারি এখনও অধরা। কাল একটা ভিডিওতে দেখছিলাম তিনটে মোটাসোটা বাদামী রঙের কুকুরছানা  ঘেঁষাঘেঁষি ঠাসাঠাসি করে শুয়ে আছে, শরীরের সঙ্গে শরীরের সংযোগস্থলে বেবি ফ্যাট উথলে উঠছে, অনেকটা সেই রকম।  

কেউ বলে বান, কেউ বলে বানরুটি, কেউ বলে সুইট বান (আমি এই দলে)। চার ইঞ্চি ব্যাসের গোল, মোটা, ফুসকো পাউরুটি, মিষ্টি মিষ্টি। একদিক সাদাটে, অন্যদিকের গাঢ় বাদামী পাতলা খোলসে অল্প ফাটল। পাউরুটির ভেতর লাল চেরির কুচো। বাস্তববাদীরা বলবেন, চেরির সঙ্গে ওর চোদ্দপুরুষের সম্পর্ক নেই। কপাল ভালো হলে ওটা স্রেফ রং করা পেঁপের কুচি আর খারাপ হলে সামথিং নন-বায়োডিগ্রেডেবল। 

তাতে কিছু এসে যায় না। আমি ওই সুইট বান একটা খাব। খিদে পেয়েছে বলে নয়, দেখেছি বলেই। একটা সময় ছিল, রোজ বিকেলে চায়ের সঙ্গে একখানা করে সুইট বান আত্মসাৎ করতাম। কেউ বিস্কুট খেত, কেউ জিলিপি, কেউ পকোড়া, কিন্তু আমি কেবল বানই খেতাম, সুইট বান। ও সময়ের অনেক ওঠাপড়া, অনেক অস্থিরতা, অনেক বিচলন, অনেক আসাযাওয়ার মাঝে যদি একটা নোঙরকে চিহ্নিত করতে বলা হয়, যার উপস্থিতি আমার জীবনে প্রশ্নাতীত, যার প্রতি আমার নিষ্ঠা অবিচল, সে হবে এই সুইট বান। 

ওটা ছিল আমার সুইট বান ফেজ।

কলেজের তিন বছর যেমন ফুচকা ফেজ। রোজ খেতাম। উইদাউট ফেল। স্কুলের শেষ কয়েকটা বছর, যে লপতে চার ফুট আট থেকে পাঁচ ফুট দুই হলাম এবং থেমে গেলাম, স্কুল থেকে ফিরে দাউদাউ খিদে অথচ তরকারি তখনও নামেনি। ভরসা চিনি। পিসি গ্যাসের ওপর থেকে গরম গরম রুটি থালায় ফেলছে, আমি রুটি ছিঁড়ে চিনি জড়িয়ে মুখে পুরছি। চিনির পাহাড়, রুটির গোছা নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ওই সময় কত কিছু শিখেছিলাম, মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ, কুকুরের অন্ত্রসিস্টেম, ম্যাঙ্গানিজের খনির লোকেশন - মাথার ভেতর সব মণ্ড পাকিয়ে গেছে, খালি রুটি চিনির ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়াটা জ্বলজ্বলে। ওটা আমার জীবনের রুটিচিনি ফেজ। 

ভকিল লেনে একসময় যেতে হত। বড় বড় বৃক্ষশোভিত ফাঁকা চওড়া পরিষ্কার রাস্তায় চায়ের দোকানও নেই। প্রথমদিনেই লাঞ্চটাইমে দূরে ভিড় চোখে পড়ল। ভিড় দেখলে উল্টোদিকে হাঁটাই আমার নীতি কিন্তু চোখ সরু করে ভিড়ের চরিত্র শান্তই মনে হল। চেঁচামেচিও কানে এল না। অন্নচিন্তা চমৎকারা, ভিড়ের দিকেই হাঁটলাম। 

একটা কিওস্ক। ইতিউতি বাইক, সাইকেল, একটা ঠেলাগাড়িও। কারও গলায় গামছা, কারও হেলমেট মাথার পেছনদিকে কাত হয়ে ছাতার কাজ সারছে। কাঁচের বাক্সে দু’রকমের বিকল্প। পুরি আর পুরির থেকে পরিধিতে ছোট, ফুলকো কচৌরি। কেউ কেউ সে সব আলুর তরকারি দিয়ে খাচ্ছে, আর কেউ কেউ শুধু লাল রঙের থকথকে, চিটপিটে মিষ্টি চাটনি দিয়ে। আমি চাটনি সহকারে একটা কচৌরি চাইলাম। চলে এল শালপাতার প্লেটে। চাটনিতে ডুবিয়ে কচৌরিতে প্রথম কামড় বসালাম আর শুরু হয়ে গেল আমার জীবনের কচৌরি ফেজ।

ওই কয়েকটা সপ্তাহ কী পড়তাম, কী ভাবতাম, কী বলতাম, কী বিশ্বাস করতাম, এমনকি জীবনে কোনও প্রেম ছিল কি না সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়েছি, কিন্তু রোজ দুপুরে যে মিষ্টি চাটনিতে ডুবিয়ে একটি করে খাস্তা কচুরি খেতাম যতদিন বাঁচব মনে থাকবে। ওই ফেজে আমার ওজনও কেজি দুয়েক বৃদ্ধি পেয়েছিল।

আবার আরেক ফেজে কমেওছিল। তখন সংসদ মার্গের সরকারি অফিসে বসছি বছরখানেক। কায়দা করে বললে বলা যায় ডেপুটেশন, কিন্তু আমার অফিসের সকলেই জানত ওটা আসলে নির্বাসন। আমার অবশ্য  খারাপ লাগত না। নতুন অফিসে সকলেই কাজের, সকলেই বন্ধুত্বপূর্ণ, সকলেই পণ করেছেন যে পৃথিবীর সব রেনফরেস্ট কচুকাটা হওয়ার আগে ওঁরা প্রিন্ট আউট নেওয়া থামাবেন না। প্রতিটি এফ ওয়াই আই ইমেল প্রিন্ট নিয়ে দশখানা ফাইলে রাখা হচ্ছে, বাথরুমের কল যথেষ্ট টিপে বন্ধ না করে জল নষ্টের বিরুদ্ধে সার্কুলার দশ কপি ছেপে বাথরুমের দেওয়ালে এক কপি সেঁটে, বাকি ন’কপি ন'টা ফাইলে গুছিয়ে রাখা হচ্ছে।

সেই সময়টারও আগামাথা ভুলে গেছি। অফিসের ভেতর ফোনের অবিরাম ক্রিং ক্রিং আর প্রিন্টারের ঘরঘর আর বাইরে মার্গ জুড়ে মিছিল। কিষানের, মজদুরের, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টদের, শিল্পী বুদ্ধিজীবীদের, চোরেদের। গ্রীষ্মের দুপুরে রাস্তার মাথায় মাচার ওপর থেকে মাইকে নেতার জ্বালাময়ী ভাষণ। খাওয়ার কথা মনে এলেই মাথা ঘুরত। ওই অফিসে থাকাকালীন আমার গোটা দিনের খোরাক ছিল এক কাপ চা আর এক প্যাকেট কুরকুরে। খিদে মিটলে ভালো, না হলে ঘণ্টাখানেক পর আরেকবার বেরিয়ে আরেককাপ চা আর আরেক প্যাকেট কুরকুরে। বছরখানেক পর ডেপুটেশন ফুরোলে আপন অফিসে ফিরলাম যখন, যারা সারাবছর নানারকম ডায়েটের পেছন দৌড়ে দৌড়ে হন্যে, আফসোস করেছিল। কে জানত নির্বাসন গেলে রোগা হয়ে ফেরা যায়? তাহলে না যাওয়ার কোনও কারণই থাকত না।

ভাবীজির চা হয়ে গিয়েছিল, টাকা দিয়ে, পার্স আর ফোন বগলে চেপে, বাঁ হাতের কাপে চুমুক দিয়ে, ডান হাত মুখের কাছে তুলে সাবধানে মিষ্টি বানে কামড় দিয়ে অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, জীবনে আরেকবার সুইট বান ফেজটা ফিরিয়ে আনলে কেমন হয়?


12 comments:

  1. Darun darun.
    Sweet bun amaro khub bhalo lage, ami obosso otake Banruti boli. Pune te ekta "state-of-the-art" breakfast ache, jar nam Bun Maska, oi banruti te makhon lagiye khawa.
    ami obosso Horlicks er dol e, banruti emni emnii khai :)
    Onek purano kotha mone pore gyalo Kuntala.

    ReplyDelete
    Replies
    1. এখানে ত্রিবেণী টেরাস ক্যাফে বলে একটা দোকানে গেলেই অর্চিষ্মান বান মাসকা অর্ডার করে। যেমন ভালো খেতে, তার থেকেও ভালো নাম।

      আমিও বানরুটি এমনি এমনি খাই, মাখনটাখনের প্রয়োজন বোধ করি না। হাই ফাইভ।

      Delete
  2. Eita pore amar purono kotha mone pore gelo.. Kolkatay kichudin tollygunge e ekta company te chilam .. sekhane alternate kore hoy jhal muri ar nahole gupta brothers bole ekta dokane paneer roll khetam.. ekdin giyei icecream cheyechilam bole bolechilo age roll ta kheye nin tarpore icecream dicchi.. ☺️☺️

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, এই গল্পটা দারুণ, ঊর্মি। এই রোজকার অভ্যেসগুলো খুব আদরের আর আরামের হয়।

      Delete
  3. jaygar songe khabarer association ta darun laglo. Bombay te 8/9 mash training e chilam chakrir surute. O sob diner katha mone bhable prothomei mone pore YWCA te thakakalin ultodike apurbo Chinese street food, wok e banato. Ar roj training theke firei ekta kore gota Good Day biscuit er packet sesh kora!

    ReplyDelete
    Replies
    1. এই অ্যাসোসিয়েশনটা অগ্রাহ্য করা শক্ত, কাকলি। গুড ডে বিস্কুটের প্যাকেট শেষ করাটা রিলেট করতে পারছি, তবে আমি শেষ করতাম ব্রিটানিয়া কোম্পানির বরবোন বিস্কুটের প্যাকেট। সেও ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়, সারাদিন আড্ডা মেরে রাতে পড়তে বসার আগে।

      Delete
  4. আমরা বলতাম মিষ্টি পাউরুটি এবং এখনও ভালো লাগে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ হ্যাঁ, এই নামটাও শুনেছি, নালক। আমার তো খুবই ভালো লাগে।

      Delete
  5. Mishti pauruti ar singapuri kola amar jibone ekta phase. . .

    ReplyDelete
    Replies
    1. ইনটারেস্টিং ফেজ মনে হচ্ছে রণিতা।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.