August 26, 2019

গত কদিনের বইপড়াঃ রুথ ওয়্যার



অনেকদিন বাদে বই পড়লাম। বই পড়া তেমন করে বন্ধ থাকেনি কখনওই, গোটা দুই উপন্যাস পড়েছি, পরিস্থিতির সঙ্গে তাল রাখতে দুয়েকটা গ্রিফ মেমোয়্যারও, কিন্তু সবই ছেঁড়া ছেঁড়া। বারবার নামিয়ে রাখা কিংবা পাতা উল্টোনোর সময় খেয়াল হওয়া 'এই পাতাটায় কী হল এক্ষুনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারব না' গোছের পড়া।

সবথেকে বাজে হল অ্যান ক্লিভসের ভেরা স্ট্যানহোপ সিরিজটা শেষ করার পর পি ডি জেমস-এর কর্ডেলিয়া সিরিজের দুটো বই পড়ে ফেলে দুই গোয়েন্দা, দুই লেখকের স্টাইল তুল্যমূল্য একটা পোস্ট ফাঁদব রেডি হয়েছিলাম, সে সবও মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সে সব কোন জনমের কথা।

গত দেড় সপ্তাহ ধরে সামান্য একটু বদল লক্ষ করছি। আগের মতো পড়তে পারছি। জামাকাপড় পরে ভাঁজ করব বলে পড়া, ফ্রিজের খাবার গরম করার বদলে মুড়ি চানাচুর দিয়ে ডিনার সেরে পড়ার মতো পড়া, অবান্তরে পোস্ট পরে করলেও চলবে বলে পড়া।

কী পড়ছি সে নিয়ে কোনও “রহস্য” নেই। আছে কি?

আর এই রহস্যের জোগান দিয়ে যিনি আমাকে ফের পড়ামুখো করেছেন তাঁর নাম রুথ ওয়্যার। ব্রিটিশ রহস্যরোমাঞ্চ লেখকদের দীর্ঘ এবং জ্বলজ্বলে ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। রুথ ওয়্যার আপাতত পাঁচটি উপন্যাস লিখেছেন। তাদের মধ্যে চারটে পড়ার পর আমার মনে হল এবার রুথ ওয়্যারের লেখা নিয়ে একটা পোস্ট লেখাই যায়। প্রথমে ঝট করে চারটে বইয়ের বিষয়বস্তু বলে নিই।

In a Dark, Dark Wood (2015) 
নোরা নামের একজন তরুণী তার প্রিয় এবং ছোটবেলার বন্ধুর হেনপার্টিতে (অ্যামেরিকান ভার্সানে ব্যাচেলরেট পার্টি, আমাদের সে রকম কোনও পার্টি হতে শুনিনি তবে হলে আইবুড়ো পার্টি বলা হবে সম্ভবত) আমন্ত্রিত হয়। টুইস্ট হচ্ছে যে নোরার বেষ্ট ফ্রেন্ড বিয়ে করছে নোরারই প্রাক্তন প্রেমিককে। আমার সঙ্গে এ ঘটনা ঘটলে আমি প্রেমিক এবং বন্ধুর নামে দু’ডোজ সিপ্রালেক্স বেশি খেয়ে আর তাদের মুখদর্শন করতাম না, কিন্তু এঁরা গল্পের হিরোইন, আমি নন। নোরা ‘যাক যা গেছে তা যাক’ গাইতে গাইতে উইকেন্ডের পার্টিতে যায়। সভ্যতার সংস্রবহীন সেই বাড়িতে নেটওয়ার্ক চলে না, সন্ধের পর কাঁচের দেওয়ালে চারদিকের ঘন জঙ্গলের ব্যাকগ্রাউন্ডে নিজেদের মুখের ছায়া ফুটে ওঠে।

পরিণতি, বোঝাই যাচ্ছে সেধে কুড়ুলে পা দেওয়ার থেকেও সাংঘাতিক।

The Woman in Cabin 10 (2016) 
একজন ‘পাফ পিস’ লেখা সাংবাদিক, লো ব্ল্যাকলক, অরোরা বোরিয়ালিস নামক বিলাসতরণীতে উত্তর সাগরে ক্রুজে যাওয়ার আমন্ত্রণ পান। পাশের কেবিনের (কেবিন নম্বর দশ) একটি মেয়ের সঙ্গে দৈবের বশে মহিলার আলাপ হয়। এবং সেই রাতেই মত্ত অবস্থায় ব্ল্যাকলক শুনতে পায় পাশের কেবিনের বারান্দা থেকে একটা চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে ভারি কিছু জলে ফেলে দেওয়ার শব্দ। দৌড়ে গিয়ে দেখে কেবিনের কাঁচের দরজা লেপে আছে লাল রক্ত। ঘটনার কথা কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা অবাক। কেবিন নাম্বার টেন? সেখানে তো কোনও অতিথি নেই। ব্ল্যাকলক যতরকম ভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে সত্যিই একটি মেয়ে ছিল ওই কেবিনে, সবাই মাথা নেড়ে নেড়ে বলে তুমি ভুল দেখেছ, কেউ ছিল না ওখানে। মেয়েটি সত্যি সত্যি উবে গেছে। কিন্তু ব্ল্যাকলক মেনে নিয়ে চুপ করে বসে থাকার পাত্রী নয়। সবার উপদেশ, হুমকি অগ্রাহ্য করে ব্ল্যাকলক মাঝসমুদ্রে খোঁজাখুঁজি চালিয়ে যায় এবং বিপদে পড়ে।

The Lying Game (2017)
রুথ ওয়্যারের লেখা আমার একমাত্র না পড়া বই হলেও বইয়ের মূল ভিত্তিটা আমার জানা। চার বন্ধু স্কুলের, একটা খেলা আবিষ্কার করে। নিজেদের মধ্যে সত্যি এবং সত্যি ছাড়া কিছুই বলবে না, কিন্তু পৃথিবীর বাকি সবার সঙ্গে তারা কেবল মিথ্যে এবং শুধু মিথ্যেই বলবে। স্কুলের শেষ বছরে চারজন একটা ঘোরতর গোলযোগে ফাঁসে এবং বহিষ্কৃত হয়। গল্প শুরু হয় তারও অনেক বছর পর যখন চারজনের এক বন্ধু বাকি তিনজনকে এস ও এস পাঠায়।

রুথ ওয়্যারের নামে দুঢোঁক জল বেশি খাওয়া ফ্যানেরাও এই বইটিকেই সব বইয়ের মধ্যে একটু কমা বলে দাবি করেছেন। কাজেই আমি ধরে নিচ্ছি যে না পড়ে খুব বেশি মিস করিনি। তবে হাতে পেলে নিশ্চয় পড়ব।

The Death of Mrs. Westaway (2018) 
গল্পের শুরুতে আমরা দেখি হ্যাল, ট্যারো কার্ড পাঠ এবং আরও নানা কারচুপি করে জীবনধারণ করে। অতি কষ্টে। সে কষ্ট এমন যে চড়াসুদে টাকা ধার করার পর মহাজনের গ্রাস থেকে বেরোতে পারছে না এবং ভাড়াটে গুণ্ডারা এসে মারধোর, ভাঙচুর করছে। এমন সময় চিঠি আসে হ্যালের নামে, হ্যালের ঠিকানায়। মাতামহী মারা গেছেন, হ্যাল যেন ফিউনারাল এবং তৎপরবর্তী উইলপাঠে অংশগ্রহণ করতে আসে।

হ্যাল জানে যে চিঠিটা ভুল করে এসেছে, কারণ চিঠিতে লেখা নাম হ্যালের মাতামহীর নয়। কিন্তু চিঠির বয়ান, কাগজ, এস্টেট ইত্যাদি শব্দ থেকে হ্যাল এও বোঝে যে সম্পত্তির পরিমাণ কম নয়। মরিয়া হ্যাল সিদ্ধান্ত নেয় সে চিঠির ঠিকানায় যাবে এবং ভুয়ো পরিচয় দিয়ে সম্পত্তির ভাগ নেওয়ার জালিয়াতিটা করবে। 

The Turn of the Key (2019)
নাম থেকেই হেনরি জেমসের বিখ্যাত উপন্যাসের উদ্দেশে হ্যাট টিপ স্পষ্ট। এক গভর্নেস, রোয়ান, অতি লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব পেয়ে শহর ছেড়ে প্রত্যন্ত কান্ট্রিসাইডে যায়। বড়লোকের বাড়ি। ‘স্মার্ট’ বাড়ি। অর্থাৎ কিনা 'পর্দা ফাঁক!' বললে পর্দা আপনাআপনি খুলে যায়, 'পর্দা বনধ্‌!' হাঁকলে উল্টোটা ঘটে। সুইচবোর্ডের বালাই নেই, হাত নাড়লে লুক্কায়িত প্যানেল আবির্ভূত হয়, আঙুল ছোঁয়ালে আলো জ্বলেনেভে চড়ানিভু হয়, গান বাজে। ভৌতিকতা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। এর পর ভূতের আবির্ভাব হয়। স্মার্ট বাড়িতেও ভূতেরা আগের মতোই আনস্মার্ট আছে এইটা দেখে ভরসাই জেগেছে আমার। তারা চিলেকোঠায় হাঁটে, পুতুলের কাটামুণ্ডু গড়িয়ে দেয় এদিকওদিক থেকে। তাছাড়াও হ্যাট টিপ যেহেতু, বদমেজাজি বয়স্ক পরিচারিকা এবং হ্যান্ডসাম হ্যান্ডি বয়ও আছে। এরপর যথারীতি নানা বিপর্যয় ঘটে যা নিয়েই রুথ ওয়্যারের সাম্প্রতিকতম উপন্যাস।

নিচে পয়েন্ট করে রুথ ওয়্যারের লেখার বৈশিষ্ট্যে আলোকপাত করার চেষ্টা করলাম। ব্যক্তিগত ভালোমন্দলাগাগুলোও এই সব হেডিং-এর নিচেই বলে দেব।

সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
রুথ ওয়্যারের সবথেকে বড় গুণ হচ্ছে যে থ্রিলারের থ্রিল তিনি পুরোমাত্রায় সৃষ্টি করতে এবং ধরে রাখতে পারেন। এই যেমন ধরুন, শেষ গল্পটা (এই বইটাই সদ্য শেষ করেছি কি না, তাই উদাহরণ এর থেকেই বেশি বেশি আসবে) শুরু হচ্ছে জেলে বসে গভর্নেসের উকিলকে চিঠির একাধিক বাতিল ধরতাই দিয়ে। অর্থাৎ কী না মহিলা বার বার চেষ্টা করছেন বয়ান শুরু করতে, পারছেন না। তারপর যেই না চিঠিটা উনি সত্যি সত্যি লিখে উঠতে পারলেন, জানা গেল একটি বাচ্চাকে খুনের দায়ে উনি জেলে আছেন, ট্রায়াল শুরু হবে একশো চল্লিশ দিন পর। কেমন থ্রিলিং ওয়েতে গল্প শুরু হল বলুন। পাঠককে পাতা উল্টে যেতে বাধ্য করার কায়দাটাও রুথ ওয়্যারের জানা। ওঁর লেখায় সেই বিরল ব্যালেন্স আছে। সাহিত্যগুণ আছে এবং কাব্যচেষ্টা নেই। রহস্যরোমাঞ্চ পড়তে গিয়ে এই জিনিসটা আমাকে যত ব্যথিত করে আর কিছু করে না। নিজেদেরকে 'সত্যি' সাহিত্যিক প্রমাণ করার জন্য লেখকরা যখন রহস্যের মারপ্যাঁচ ডকে তুলে ভাষার মারপ্যাঁচে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমি এমন লেখকও দেখেছি যিনি তাঁর কাস্টে এক কবিকে রেখেছিলেন যাতে গল্পের মাঝে মাঝেই কবিতা লেখার সুযোগ পান। সে মারাত্মক ব্যাপার।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য থ্রিলার লেখা শুরু করার আগে রুথ ওয়্যার পাঁচটি ইয়ং অ্যাডাল্ট নভেলা লিখেছিলেন, তাঁর অন্তত প্রথম দুটো উপন্যাসে সেই ছাপ অর্থাৎ শেষ কৈশোর-প্রথম যৌবনোচিত নাটকীয়তা, হঠকারিতা, নাটুকে সংলাপ ইত্যাদির প্রতি ঝোঁক স্পষ্ট। পরবর্তী উপন্যাসগুলোতে এই প্রবণতা অনেক কমে এসেছে। 

গথিক  
ভিক্টোরিয়ান বড় নির্জন বাড়ি, হন্টেড হাউস, চিঠির মাধ্যমে গল্প বলা, সমুদ্রতটের ছোট শহর, পুরোনো বন্ধুদের একত্র হওয়া ইত্যাদি গথিক ট্রোপ বার বার ফিরে আসে রুথ ওয়্যারের লেখায়। রুথ ওয়্যারের আরেকটা প্রিয় ট্রোপ হল, বদ্ধ জায়গায় সীমিত সন্দেহভাজন সহযোগে রহস্য ফাঁদা। সম্ভবত এই ট্রোপের জন্যই তাঁর কপালে 'আজকের আগাথা ক্রিস্টি' অভিধা জুটেছে, যে বিষয়ে পরে আসছি। 

নড়বড়ে নায়িকা
যে জিনিসটা রুথ ওয়্যারের প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রে তা হল নড়বড়ে নায়িকা। মানসিক অসুখের স্বীকার, ব্যক্তিগত জীবনে ঘা খাওয়া, প্রফেশনাল জীবনে ব্যর্থ। সোজা কথায় ভালনারেবল। এবং সেই ভালনারেবিলিটি তারা প্রকাশ্যে পরিধান করে চলেফিরে বেড়ায়।

আমি জানি এবং মানি যে নায়িকা রোগা মোটা ফরসা কালো লম্বা বেঁটে সতীলক্ষ্মী কুলটা ভালনারেবল ডোন্টকেয়ার সবরকমের হতে পারে। তবু আমার এইরকম নড়বড়ে নায়িকা অপছন্দ হওয়ার একটা কারণ হচ্ছে এই রকম নায়িকাকে ‘গাইড’ করার জন্য আশেপাশে কিছু চরিত্রের আমদানি হওয়ার ঘোরতর সম্ভাবনা থাকে। আমার কেন বয়স্ক নায়িকার গল্পের প্রতি ঝোঁক এতদিনে নিজের কাছে পরিষ্কার হল। নায়িকার বয়স বছর কুড়ি বাড়িয়ে দিলে এই সম্ভাবনাটা ঝট করে শূন্যে নামিয়ে আনা যায়। এই যেমন ধরুন ভেরা স্ট্যানহোপ, একশোটা খুঁত, কিন্তু কারও "এস, খুঁত সারিয়ে তোমার জীবনটা একটু গুছিয়ে দিই" বলার সাহস নেই। একবার কল্পনা করুন দেখি, মিসেস মার্পলের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ পকেটে হাত পুরে বলছে, "সব ঠিকই আছে তবে আধুনিক ফরেনসিক সায়েন্সটা যদি ফলো করিস তাহলে ডিটেকশনটা আরও ফ্ললেস করতে পারবি। বাট অ্যাজ আই সেড, ভালো হচ্ছে, চালিয়ে যা।"

কল্পনা করার পর আমার ভয়ানক ইচ্ছে হচ্ছে কাউকে দিয়ে মিস মার্পলকে এই উপদেশটা দেওয়ানোর। তারপর মিস মার্পলের মুখের ভাব (জোয়ান হিকসনের হলেও চলবে) দেখার।

স্রষ্টাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, তরুণী নায়িকা ভালনারেবল হলে বাস্তবতার খাতিরেই কিছু জ্যাঠার আমদানি করতে হয়। কিন্তু এই বিশেষ ব্র্যান্ডের জ্যাঠামোটা আমার বাস্তবে কেন, বইয়ের পাতাতেও দেখতে ইচ্ছে করে না।

স্ট্যান্ড অ্যালোন
লেখার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে এটা পড়া হয়তো উচিত নয়, কিন্তু ব্যক্তিগত বায়াসের মুখ চেয়ে প্রসঙ্গটা টেনেই ফেললাম। রুথ ওয়্যারের প্রতিটি বই যে আলাদা আলাদা মূল চরিত্রকে নিয়ে লেখা এটা আমার একটা ক্ষতি বলে মনে হয়। বিশেষ করে ওঁর মতো শক্তিশালী একজন লেখক, একটি স্থায়ী গোয়েন্দ চরিত্র তৈরি করতেই পারতেন। গল্পের পর গল্প ধরে একটা চরিত্রের সঙ্গে থাকতে থাকতে একটা বাড়তি ভালোলাগা, আরামের জায়গা তৈরি হয়। তখন আর শুধু গল্পের অপেক্ষা থাকে না, চরিত্রটাকে বা চরিত্রগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতিতে নতুন করে দেখতে পাওয়ার অপেক্ষাও তৈরি হয়। পাঠকের কাছে যা পাওনা।

এইবার সব প্রশ্নের শেষ প্রশ্নটায় আলো ফেলা যাক। রুথ ওয়্যার কি আজকের ক্রিস্টি?

আমার উত্তরটা সম্ভবত আপনারা জানেন। কিন্তু উত্তরটা দেওয়ার আগে আমি প্রশ্নটার হাস্যকরতা পয়েন্ট আউট করতে চাই। এই “অমুকে আজকের তমুক” আর “তমুকে যা লিখে গেছে আর কেউ কোনওদিন ধারেকাছে লিখতে পারবে না”, দুরকম সুইপিং কমেন্টই সমান অদ্ভুত। এখানে একটা কথা বললে লোকে রজ্জুতে সর্পভ্রমের দোষ দিতে পারে, তবু না বলে পারছি না। এ তুলনার বিড়ম্বনাটা মহিলা লেখকদের বেশি সামলাতে হয়। মহিলা রোল মডেল কম বলেই বোধহয়। গোয়েন্দা গল্প লেখে? ব্যস। কী লেখে কেমন লেখে অত চুল না চিরে যে দেড়জন মহিলা গোয়েন্দালিখিয়ের নাম জান একজনের সঙ্গে তুলনা করে দাও। খেল খতম পয়সা হজম।

রুথ ওয়্যার মোটেই ক্রিস্টির মতো নন। কোনও মিলই নেই। ওঁর লেখা পড়ে কাদের আগাথা ক্রিস্টির লেখার কথা মনে পড়েছে সেটা বরং সব রহস্যের সেরা রহস্য। রুথ ওয়্যার তাঁর মেন চরিত্রর কপালে ফুটে ওঠা প্রতিটি ঘামের বিন্দুর অনুভূতি বর্ণনা করেন, আর গোলাপবাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রতিবেশীদের ওপর নজর রাখার সময় গোলাপের গন্ধ মিস মার্পলের নাকে যাচ্ছে কি না, তা নিয়েও ক্রিস্টি মাথা ঘামান না। রুথ ওয়্যারের গল্পে গা ছমছমটাই মূল কথা, ক্রিস্টির গল্পে ধাঁধার উত্তর বার করা।

দ্বিতীয় তফাৎ গল্পের কাঠামো তৈরিতে। যা আমার মতে রুথ ওয়্যারের সবথেকে বড় খামতি, ক্রিস্টির যা অন্যতম অ্যাডভান্টেজ। আমি এখানে দুজনের তুলনা করছি না, কারণ গোয়েন্দাগল্পের স্ট্রাকচার বানানোতে ক্রিস্টি আমার পড়া বেশিরভাগ (ওয়েল, সব) লেখকের থেকে সেরা, আর রুথ ওয়্যার অনেকের থেকেই খারাপ। 'টার্ন অফ দ্য কি'-র কথাই বলি। উপন্যাসটির অধিকাংশ ‘অ্যাকশন’ বা ‘ঘটনা’ ঘটে গল্পের শেষ তিরিশ শতাংশে। এই খামতিটা অন্যান্য গল্পেও কমবেশি আছে।

এই সমস্যাটা হওয়ার কারণ আমার মতে রুথ ওয়্যারের সাইকোলজিক্যাল গথিক থ্রিলার লেখা। গা ছমছম ব্যাপারটা সেট আপ করতে অনেকটা সময় চলে যায়। হেনরি জেমস, এম আর জেমস, লাভক্রাফট, শার্লি জ্যাকসন, হালের সারা ওয়াটারস, গথিক সাসপেন্সের অধিকাংশ লেখকরাই ওই গা ছমছমে ভাবকে ইউ এস পি করে সার্থক সাহিত্য রচনা করে গেছেন। কিন্তু রুথ ওয়্যার তো শুধু সাসপেন্স তৈরি করছেন না, তার সঙ্গে মিশেল দিচ্ছেন রহস্যের। যা গল্পের শেষে একটা সুষ্ঠু সমাধান দাবি করে এবং রুথ ওয়্যার সে দাবি অস্বীকারও করেন না। ক্লাসিক রহস্যের ঘরানা অনুসরণ করে তিনি প্রতিটি গল্পের একটি যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দেন। এই দুইয়ের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওয়্যার খেলাটায় আরও পটু হয়ে উঠবেন এমন আশা করাই যায়।

রুথ ওয়্যার আমার মতে আধুনিক ইংরিজি রহস্যরোমাঞ্চ ঘরানার পড়ে দেখার মতো লেখক। যদি না পড়ে থাকেন পড়ে দেখতে পারেন। আর যদি অলরেডি পড়ে থাকেন তাহলে কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবেন।


11 comments:

  1. baah.. darun likhechen.. khnutiye porlaam

    The Woman in Cabin 10 (2016) - ei ta porechi.. bhalo legechilo.. jodio jahaje choRar aager ghotona aar shesher diker ghotona gulo aamaar ektu odbhut ba disturbing legechilo tokhon..

    tobe Christie jindabad any day..

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ ইন্দ্রাণী, কেবিন ১০-এ অনেক গোলমাল লেগেছিল আমারও। তবে পরের দিকের লেখাগুলো আরেকটু পরিণত হয়েছে বলেই আমার মনে হল।

      ক্রিস্টি জিন্দাবাদ।

      Delete
  2. "একবার কল্পনা করুন দেখি, মিসেস মার্পলের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ পকেটে হাত পুরে বলছে"

    Should be "Miss"

    ReplyDelete
  3. Bah, sundor review.
    Ruth Ware ami ektao porini, kaajei wishlist e jog korlam. :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. পড়ে দেখতে পারেন, অরিজিত। খুব একটা পস্তাবেন মনে হয় না।

      Delete
  4. কি সুন্দর করে প্লট গুলো তুলে দিলেন!
    পাঁচ রকমের প্লট! একটাও পছন্দ হবে না? হতেই হবে!
    আপনি পড়তে চাইবেন।
    আর এখানেই আপনার ভূমিকার সফলতা!
    সকলকে পড়তে আগ্রহী করা।
    আমার মন টেনেছে
    The Death of Mrs. Westaway (2018)
    এই প্লট টি।
    কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই ইংরেজি গল্পঃ এখনও পড়িনি(HS syllabus ছাড়া)!
    এগোতে পারবো তো?
    Baptu
    আর

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমার তো ধারণা, আমরা উচ্চমাধ্যমিকে যা পড়েছিলাম এই বইগুলোর বেশিরভাগই তার থেকে সোজা ইংরিজিতে লেখা। তাছাড়া গোয়েন্দাগল্পর ক্ষেত্রে এগোনোর সমস্যা কম। কে করেছে কে করেছে ভাবতে ভাবতেই গল্প শেষ। আপনি অ্যাটেম্পট নিয়ে দেখতে পারেন, পুরোটাই অভ্যেসের ব্যাপার।

      Delete
    2. আচ্ছা চেষ্টা করে দেখি।

      Delete
  5. Kalke In A Dark Dark Wood porlam.

    Byapar holo, eta bodhoy onar ekebarei prothom diker boi, sutorang haal er lekha na pore kichu bola uchit hobe na hoyto.

    Character build up ta amar chomotkar legeche. Ekta fictional manush ke, matro likhito bornona diye, background music chara khub i jolojyanto kore fotano ta amar kache sobsomoy bismoy er bostu. Protagonist etoi minmine, keu kichu bolleo mukh khulche na, majhe majhe ichhe korchilo boi e dhuke or kadh dhore ektu jhakiye di.

    Kharap legeche rohosyo boddo kom. Oi tumi ja bolle, main ghotonay aste 70% boi kabar. Abar ekta particular line pore dhorei neoa jay je main suspect ke. Seta bujhe giye ami adh ghonta khub ghyam niye ghurlam, but boi shesh korar moja ta pelam na.

    Boi ta kal bikele shuru kore aaj bikele shesh korlam. Majhe ekta gota raat. Christie hole raat ei shesh hoye jeto. Er cheye boro parthokko kii ba bolbo.

    ReplyDelete
    Replies
    1. প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গেই একমত, সুমনা। আমারও এইরকম পাপোষ হিরোইন অসহ্য লাগে।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.