September 07, 2020

রোল মডেল







কে কার গল্প বলার অধিকারী সেটা একটা ভেবে দেখার মতো প্রশ্ন। এবং বেশিরভাগ ভাবনা-উসকানো প্রশ্নের মতোই এ প্রশ্নের এককথার উত্তর নেই। একটা বিরাট রেঞ্জ আছে, নর্থ পোল টু সাউথ পোল। ওই পোলে যিনি বসে আছেন তিনি বলবেন, যার যার নিজের গল্প বলেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। একজনের শুধু সেই বাস্তবকেই গল্প করে বলারই অধিকার আছে যে বাস্তবের মধ্য দিয়ে সে নিজে গেছে। অন্যের বাস্তব নিয়ে গল্প ফাঁদতে যাওয়া পরের ধনে পোদ্দারি করতে যাওয়া ছাড়া আর কিছু না।

এই পোলের লোক অমনি লাফিয়ে পড়ে বলবেন, যাব্বাবা, এ যুক্তিতে তো রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টার লেখা উচিত হয়নি, দৈর্ঘ্য প্রস্থ কোনওদিক থেকেই তো ভদ্রলোকের সঙ্গে বালিকা রতনের কোনও মিল পাওয়া যায় না। আর শরৎচন্দ্রের মহেশ-এর জীবনচরিত লেখা নিয়েও তাহলে প্রতিবাদ করতে হয়। এগুলো যদি ছাড় দেওয়া যায়, ত্রৈলোক্যনাথের লুল্লুভূতের গল্প? সে তো সব অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনের তুঙ্গ অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন। এ যুক্তিতে তো স্রেফ আত্মজীবনী/স্মৃতিকথা ছাড়া সাহিত্যে আর কোনও রকমের ঘরানাই থাকা উচিত না।

বলা বাহুল্য, এর উত্তরে নেহাৎ ত্যাঁদড় না হলে কেউ বলে না, উচিত তো না-ই। বলে, আহা তা বলা হচ্ছে না। বলতে চাওয়া হচ্ছে যে কোনও জনগোষ্ঠী যদি একটি বিশেষ বঞ্চনা বা অত্যাচারের সিস্টেম্যাটিক্যালি ভুক্তভোগী হয়ে থাকে, তাহলে সে ভোগান্তির হাতে কলমে অভিজ্ঞতা না থাকলে সে বিষয়ে শিল্পসৃষ্টি না করতে বসাই ভালো। অর্থাৎ কি না একজন সাদার বর্ণবিদ্বেষের জাঁতাকলে পিষ্ট কালো মানুষদের কষ্ট কল্পনা করতে না যাওয়াই ভালো, ঔপনিবেশিকদের দলের লেখকের পরাধীন জাতির লাঞ্ছনা সাজিয়েগুছিয়ে না লেখাই ভালো, আজীবন উঁচুজাত হওয়ার যাবতীয় সুযোগসুবিধে চেটেপুটে ভোগ করে একজন নিচুজাতের মানুষের বঞ্চনা, লাঞ্ছনা কল্পনা করার মতো প্রতিভা আমার আছে আত্মবিশ্বাসে ভুগে, তাঁদের গল্প বলার দায়িত্ব ঘাড়ে না নেওয়াই ভালো।

অবশ্য আমি এমন অনেককে চিনি, যারা শোষক শোষিতের এই সপাট ভাগাভাগি এত সহজে মেনে নিতে রাজি নন। প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ দিয়ে সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। জীবনে প্রথম হোস্টেল। নিজের ঘর তখনও অ্যালট হয়নি। আর একজনের ঘরে থাকব। মাতৃভাষায় রুমমেটের সঙ্গে কথোপকথন চালাতে পারার আশ্বাস দিয়ে যাবতীয় আশংকা চাপাচুপি দিয়ে রেখেছি। সেই প্রথমবার তাঁর সঙ্গে দেখা, তাঁর ঘরে ঢোকা। মহিলা ইস্ত্রি করছিলেন। অভ্যর্থনা জানিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করলেন। বললাম। যা বুঝলাম, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি আমার নামের মুড়োটুকুই জানতেন, ল্যাজাটা সেই সবে গোচর হল।

তাঁর ঠোঁটে গভীর সাংকেতিক হাসি ফুটল।

বললেন, কনগ্র্যাচুলেশনস।

তখন আমি এখনকার থেকেও এক কোটি গুণ বেশি বোকা ছিলাম কাজেই এই আলটপকা অভিনন্দনের মানে বুঝিনি। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। স্রেফ উচ্চবর্ণ বাড়িতে জন্মানোর অপরাধে, এক্সট্রা পরিশ্রম, এক্সট্রা স্ট্রাগল করে, সংরক্ষণের কাঁটাছড়ানো রাস্তায় রক্তাক্ত পায়ে হেঁটে, সব ব্যাটার যাবতীয় ষড়যন্ত্রের মুখে নুড়ো জ্বেলে আমি যে আমার পূর্বপুরুষের হক্কের জমিদারিতে ফের ঝাণ্ডা গাড়তে পেরেছি, সেই অসামান্য অ্যাচিভমেন্ট বাবদেই অভিনন্দন।

এবারের চার নম্বরের গল্পটা লিখতে লিখতে মনে হচ্ছিল, এই সব দিক থেকে ভাবলে হয়তো আমার এই গল্পটা লেখা অনুচিত। আকারেপ্রকারে আমি আর আমার গল্পের হিরো একটাই গোদা বাক্সে পড়ি বটে; সেও মেয়ে আমিও মেয়ে, কিন্তু দুজনের সমস্ত মিলের ওইখানেই ইতি। গল্পের খাতিরে তাকে যে যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তার কণামাত্র আমাকে ফেস করতে হয়নি। হলে কী হত কল্পনা করতেও চাই না।

আমার সন্দেহ, উঁহু, বিশ্বাস -- আমার জন্য না হলেও এই গল্পের যাত্রা বহু মানুষের জীবনে জলভাত। অনিবার্য। সিস্টেম্যাটিক।

দোটানায় ভুগতে ভুগতেই তবু চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর জন্য লিখে ফেলেছি রোল মডেল নামের একখানা গল্প। এই রইল লিংক।



12 comments:

  1. Replies
    1. সত্যি? মন থেকে থ্যাংক ইউ, প্রদীপ্ত।

      Delete
  2. Bah khub bhalo..eta tomar baki lekhar theke besh onyorokom laglo ektu.. aro lekho.. ekta onno kotha bolei felchi.. Saturday school er program e tomar gaan er kotha khub mone porchilo Kuntala di.. tumi dekhecho sedin? tomader batch er ta bhison bhalo hoyeche..

    ReplyDelete
    Replies
    1. দেখেছি দেখেছি, ঘাপটি মেরে দেখেছি, ঊর্মি। তোরাও খুব ভাল করেছিস, সবাই খুব ভালো করেছে। সভথেকে অদ্ভুত লাগছিল দিদিভাইদের দেখে......সত্যিই কি ওই সময়টা এতদূরে চলে গেছে? অবিশ্বাস্য লাগে না, বল?

      Delete
  3. ভাগ্যিস দোটানা কাটিয়ে লিখলেন! খুব ভালো লাগল।

    ReplyDelete
    Replies
    1. অসংখ্য ধন্যবাদ, ময়ূরী।

      Delete
  4. Replies
    1. থ্যাংক ইউ, অন্বেষা।

      Delete
  5. দিনে দিনে আরো ভালো হচ্ছে তোমার নিজস্ব লেখা, খুব ভালো হয়েছে কুন্তলা|

    ReplyDelete
    Replies
    1. অসংখ্য ধন্যবাদ, অমিতা।

      Delete
  6. শেষটা কি আমি যা ভাবছি তাই? তাহলে কেঁপে গেলাম।

    ReplyDelete
    Replies
    1. শেষে এই মহিলা ওই মহিলার গালে ছুরি চালাবেন...এইরকম একটা কিছুর আঁচ দেওয়া আমার উদ্দেশ্য ছিল, অদিতি।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.