হোয়াট আই লাইক অ্যাবাউট ডোমেস্টিসিটি


প্রসেনজিৎ যখন জানতে চাইল মেলায় যাব কি না,  সবে বাড়ি ঢুকে হিটারের সঙ্গে প্রায় বডি কনট্যাক্ট করে লেপের ভেতর ঢুকেছি।

দিল্লির শীতের সেই দু’সপ্তাহ চলছিল যেখানে সবার সব কিছু জমে যাচ্ছে, রোদ উঠছে না, মনে হচ্ছে একটা ভেজা কুম্বলের স্ট্রেট জ্যাকেট কেউ পরিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে হাওয়ার তীরে হৃদপিণ্ড কঁকিয়ে উঠছে। আমি কোঁকাতে কোঁকাতেই আনন্দে লাফাচ্ছি, অর্চিষ্মান বলছে, মাগো এ যন্ত্রণা শেষ কর।

প্রসেনজিৎকে বললাম, বাড়িতে আগুন লাগলে খবর দিয়ো ভেবে দেখব বেরোব কি না।

নিজে লেপের ভেতর থেকে বেরোতে পারলে খবর দেব'খন, বলে আগের দিনের বেঁচে যাওয়া আলুভর্তা দিয়ে চারটে আলুপরোটা ভেজে, চার কাপ চা করে প্রসেনজিৎ চলে গেল। দু’কাপ অর্চিষ্মান এলে খাওয়া হবে, দু’কাপ পরোটা খেয়ে উঠে।

ও আর পেয়ারাও কেটে রেখে গেল।

প্রতি মাঝরাতের পেরি পেরি ফ্রাইজের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে কিছু করা যায় কি না ভাবছিলাম দু’জনেই। বয়স তো হচ্ছে। বলেছিলাম, সোজা তো। উইলপাওয়ার বাড়াও, কে এফ সি-কে জীবনের মতো ত্যাগ দাও, আলুভাজাকে বল ইটস নট ইউ ইটস মি।

অর্চিষ্মান বলেছিল, কুন্তলা, এটাই হচ্ছে তোমার সমস্যা। চরমপন্থা। চারদিন নিজেকে চাবুক মারবে, পাঁচদিনের দিন আলুভাজার পায়ে গিয়ে আছড়ে পড়বে। তার থেকে আলুভাজাও থাকুক, হেলদি কিছুও ধরা হোক।

তা বলে কিনুয়া মিলেট রাগি না। ও সব রাঁধতেফাধতে হবে। খেয়ে আবার থালাফালা মাজো। মুখফুখ ধুতে বাথরুমে ছোট।

ফল খেলে হয়। কমলালেবুর সিজন চলছে।

সেও তো ছাড়াতে হয়। তেমন হলে আঙুল দিয়ে রস গড়িয়ে পড়ে। তখন আবার টিস্যু কোথায় খোঁজ।

হেউ বলে দু'জনে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকলাম। পরদিন বাড়ি ফেরার পথে সফল-এর পেয়ারার ক্রেটে চোখ গেল। ছোটবেলায় একটা পার্টিকুলার ঋতুতে পাওয়া যেত বলেই স্মৃতিতে আছে, এখন সারা বছরই দেখি। স্মৃতির পেয়ারার সঙ্গে চেহারারও অমিল, একেকটাকে এক হাতে ম্যানেজ করা যায় না। যা ওজন, টিপ ভালো হলে কনকাশন গ্যারান্টি।

ওই সাইজের পেয়ারা কামড়ে খাওয়া যায় না। প্রসেনজিৎ সরু ফালি করে দু’চামচ নর্ম্যাল নুন, দু’চামচ বিটনুন, দু’ চামচ লংকাগুঁড়ো ছড়িয়ে রেখে যায়, আমি আর অর্চিষ্মান ক্র্যাক কোকেনের মতো খাই। ওই অমানুষিক সাইজের পেয়ারা রোজ অ্যাভারেজে দেড়টা করে নামাই। খাওয়ার পর ঝালঝাল লাল লাল আঙুল চাটতে চাটতে বলি, এ সব হেলদি খাবার থাকতে কারা মাঝরাতে আলুভাজা খায়?

মর‍্যাল হাই গ্রাউন্ড থেকে ভিউ নয়নাভিরাম। যারা দেখেছে জানে।

*

প্রসেনজিৎ আলুপরোটা ভেজে চা করে পেয়ারা কেটে বেরিয়ে গেল, লেপের তলা থেকে শুনতে পেলাম সিঁড়ির মুখে অর্চিষ্মানের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ঠাণ্ডা পড়া নিয়ে দুজনে স্মলটক করছে। তারপর আমাদের বাড়ির দরজা ধুম করে বন্ধ হল, ওরে বাবা কী ঠাণ্ডা কুন্তলা, বলতে বলতে অর্চিষ্মান শোওয়ার ঘরে এসে পড়ল, এসেই বলল, কী গো ওদিকে মেলা বসেছে এদিকে তুমি শুয়ে আছ, ওঠো ওঠো ওঠো ওঠো ওঠো ওঠো…

জামাকাপড় পরে নিচে নেমে বাড়ির দরজা দিয়ে বেরিয়ে মেলা গ্রাউন্ডের দরজা দিয়ে ঢুকে গেলাম।

অর্চিষ্মান বলল, এটা কি চিপেবসা না দেশবন্ধু গো?

উত্তর দেওয়ার আগে প্রশ্ন ঠিক করতে হল।

পে নয় পা। সা নয় স। চিপেবসা নয় চিপাবস। চিত্তরঞ্জন পার্ক বঙ্গীয় সমাজ।

আমার এ রকম নাম হলে আমি অ্যাক্রোনিম অ্যাভয়েড করতাম, চিপাবস কর্তৃপক্ষ আমার থেকে সাহসী, বুক ফুলিয়ে চারদিকে লোগোসহ নাম ছেপে রেখেছেন।

সহি বাঙালিত্ব মেন্টেন করে সি আর পার্কে দুটো সমিতি। চিত্তরঞ্জন পার্ক বঙ্গীয় সমাজ আর দেশবন্ধু। কী হয়েছে আন্দাজ করা শক্ত নয়। একটা এক নম্বরের কাছে অন্যটা দু’নম্বরের কাছে হলেও একরকম হত, চিপাবস আর দেশবন্ধু পাশাপাশি পাহাড়প্রতিম বিল্ডিং নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শত্রুর ঘাড়ে ঘেঁষটে না থাকতে পারলে শত্রুতার মজা নেই, আই গেস।

দুটো সমিতি হয়ে ভালোই হয়েছে। আমরা চিপাবস-র পৌষমেলাতে যাই, দেশবন্ধুর হস্তশিল্প মেলাতে। দেশবন্ধুতে ডাক্তার দেখাতে যাই, চিপাবস-তে নাটক দেখতে। বাচ্চাকাচ্চা থাকলে একটায় তাইকোন্ডু শেখাতে নিয়ে যেতাম, একটায় কুচিপুড়ি।

কোনওটার লাইব্রেরিতেই যাই না।

*

ব্লগে লিখছি মানে বুক ফুলিয়ে লিখছি না। জেনুইনলি লজ্জিত। অন্তর থেকে লজ্জিত। আমি দেশবন্ধুর লাইব্রেরি থেকে একটা বই তুলে এনে ফেরত দিইনি। নির্লজ্জের মতো সান্ত্বনা যদি খুঁজি - বইটা সুলভ এবং সস্তা, মুদ্রিত মল্য পঁচিশ টাকা। লজ্জা থাকলে সান্ত্বনা খুঁজতাম না। কাঞ্চনমুল্যের নিরিখে সস্তা হলেও, বাকি সব নিরিখে পৃথিবীর প্রতিটি বই অমূল্য।

দেরিতে ফেরত দিয়ে আসা যেত, ফাইন দিতেও কোনও আপত্তি ছিল না, তাও করিনি। প্রথম কয়েক সপ্তাহ কেটেছিল লজ্জা পেতে। তারপর ভুলে গেলাম। আবার মনে পড়ল। আবার লজ্জা পেলাম। আবার ভুলে গেলাম। এই করে এত সময় গেল যে এখন আর সে বই নিয়ে গিয়ে দাঁড়ানো যায় না।

সস্তা বই দামি বইও পয়েন্ট নয়। আমার বাড়িতে ফেলুদার একটা বইও নেই। কখনওই ছিল না। নো ফেলুদা, নো তারিণীখুড়ো, নো শংকু, নো ব্যোমকেশ, নো জুল ভার্ন, নো আগাথা ক্রিস্টি, নো শার্লক হোমস। সব আমি পড়েছি পাড়ার পাঠাগার থেকে। সরকারি স্টেটাস পাওয়ার আগে যে পাঠাগারের পনেরো বাই বারো ঘরে প্রতি সন্ধেয় পাড়ার জেঠুকাকুরা অফিসের পর পালা করে সাম্মানিক খাটন দিতেন।

হয়তো এই কারণেই বই যে একটা বিক্রয়যোগ্য পণ্য, সেটার যে একটা বাজার আছে, লাভক্ষতি আছে, সে লাভক্ষতির ওপর মানুষের এ ধারণার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে আমার সময় লেগেছে। এখনও যে খুব খেয়েছে তা নয়। বাস্তব পৃথিবী অন্য তালে ঘোরে জানা সত্ত্বেও আমার অবাস্তব পৃথিবীতে একশো পঁচিশ টাকা দিয়ে লাইব্রেরির লাইফটাইম মেম্বারশিপ নেওয়া যায়, নিয়ে জীবনভর বিনাপয়সায় বই পড়া যায়।

চাকা ও আগুন আবিষ্কারের পর আমার মতে মানুষের তৃতীয় কেরামতি লাইব্রেরি আবিষ্কার। বই নিয়ে ফেরত দিতে ভুলে যাওয়ার থেকেও, মানবসভ্যতার অন্যতম সভ্য সিস্টেমে অপারেট না করতে পারার অক্ষমতা আমাকে লজ্জিত ও ব্যথিত করে।

অর্চিষ্মান ছিছিক্কার করেছিল। একজন মানুষের পক্ষে যে কটা গর্হিত কর্ম সম্ভব, কুন্তলা, তার মধ্যে একটা লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে ফেরত না দেওয়া। এই যে তুমি দেশবন্ধুর বই ফেরত দিলে না আমার আর ওখানে মুখ দেখানোর অবকাশ থাকল না, আমাকে এখন চিপেবসা লাইব্রেরির মেম্বারশিপ নিতে হবে।

বকা খেতে খেতে ভুল ঠিক করা যায় না। জিভ কামড়ে চুপ করে থেকেছিলাম। মর‍্যাল হাই হর্সের ক্ষুরে ক্ষুরে খটখট তুলে ধুলো উড়িয়ে সি আর পার্কের দিগন্ত আঁধার করে চিপাবস লাইব্রেরির কার্ড বানিয়ে এল অর্চিষ্মান। ছ’মাস ঘুরতে না ঘুরতে কী হল সবাই জানে।

অর্চিষ্মান বলল, ছি ছি ছি, ছি ছি ছি, ছি ছি ছি।

যে অলরেডি কাতরাচ্ছে তাকে চাবুক মারার মতো মনের জোর আমার নেই। বললাম, বুঝতে পারছি তোমার খুবই খারাপ লাগছে। অ্যাট লিস্ট এইটা ভেবে সান্ত্বনা পেতে পার যে বইটা তো তেমন কিছু বিরল নয়, মোটামুটি সস্তাও…

অর্চিষ্মান বলল, সস্তাদামি পয়েন্টই নয়, কুন্তলা। পয়েন্টটা হচ্ছে আমি এমন একজন মানুষ যার চাকা আর আগুন আবিষ্কারের পরের সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেমে থাকার যোগ্যতা নেই। সবথেকে আফসোসের কী বল তো, এ রকম ছিলাম না। দশচক্রে আর সঙ্গদোষে কে যে কী হয়ে ওঠে।

*

মেলায় ঢুকতে ঢুকতে উত্তর থেকে বাউল, দক্ষিণপূর্ব থেকে লোকাল শিল্পীদের গীতবাদ্য, দক্ষিণ থেকে অ্যারিস্টোক্র্যাট ক্যাটারার অ্যান্ড সুইটস-এর ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড কড়াইয়ে ফুটন্ত তেলের ভাপ ভেসে এল। ভাজা ময়দার সুবাস।

অর্চিষ্মান রাধাবল্লভী ছোলার ডাল চা খাবে। আমি লুচি আলুরদম কফি। তখনও মেলা জমছে , ফাঁকা ফাঁকা টেবিল। আমারই হাঁটুর কাছে, অর্চিষ্মানকে প্রায় পায়ের আঙুল ছোঁয়ার মতো ভাঁজ হয়ে কচুরি ছিঁড়তে হচ্ছে। মাটিতে বাবু হয়ে বসে টেবিল থেকে খেলেই সুবিধে। আমরা লুচি কচুরি ছোলার ডাল আলুর দম খেতে থাকলাম। আমাদের ঘিরে 'এই যে', 'কী খবর', 'ফাইন্যালি ঠাণ্ডাটা পড়েছে', বইতে থাকল। পুজো প্যান্ডেলে শেষ দেখা হওয়া প্রতিবেশিতা পৌষমেলায় নিজেকে ঝালিয়ে নিচ্ছে। আমাদের দিকেও দুয়েকজন চকিত দৃষ্টিপাত করছিলেন, আমরা ঘাড় গুঁজে লুচিকচুরিতে মনোস্থাপন করে থাকলাম।

দিল্লিতে পাকাপাকি থাকার ব্যবস্থা করছি না কেন অনেকে জানতে চায়। দুঃখী মুখে বলি, আমাদের এখানে কেউ চেনে না বলে, কেউ ভালোবাসে না বলে। এই তো দেখো না, যুগযুগান্ত ধরে আছি, এখনও একজনও প্রতিবেশী হয়নি।

আসল কথা হচ্ছে আমাদের তরফ থেকেও প্রতিবেশী পাতানোর উৎসাহ ক্ষীণ। অর্চিষ্মান বলে, আমিও মানি - সি আর পার্কে বেশিদিন থাকলে আর বেশি লেপটা লাগালে দেশবন্ধু/ চিপেবসা-র (মুখ খুলেও বন্ধ করলাম) মেম্বার হতে হবে, কালীবাড়ির কমিটি নির্বাচনে - ব্যানার আর মিশন স্টেটমেন্টের ধুম দেখে যা প্রায় যুদ্ধ ভ্রম হয় - ভোট দিতে হবে, তারপর যথেষ্ট বুড়ো হলে আসুন আসুন বলে এই সব মেলায় প্যান্ডেলের সামনে ওই সিল্কের সাদার জামা পরা সোফায় নিয়ে বসাবে। ঘুরে ঘুরে কচুরি কফি চুসকি আর খেতে হবে না।

ওসবে আমরা নেই। বুড়ো হলে কলকাতা দৌড়ব। অর্চিষ্মানের ইন্টারেস্ট চপ এগরোল সংস্কৃতিচর্চায়, আমার ভাষায়। বেঁচে থাকতে ইংরিজি হিন্দিতে দাঁত ভাঙতে হল, মরার সময় বাংলা বলতে বলতে মরব। বাংলা ছাড়া কিচ্ছু বলব না। মেরে ফেললেও না। তার আগে যদি বছরখানেক পাই, অর্চিষ্মানের সঙ্গে ভিক্টোরিয়ায় বাদামভাজা, দক্ষিণাপণে ফুচকা, অক্সফোর্ড বুক স্টোরে কফি খেয়ে বেড়াব। বিকেলবেলায় নন্দনচত্বরে গিয়ে একটা ফিকি একটা নর্ম্যাল চা নিয়ে - অর্চিষ্মান বলছে আলুর চপও ফাটাফাটি বানায় ওখানে - একে অপরকে কনুই মেরে সেলিব্রিটি দেখাব।

পাড়ার লোকের সঙ্গে আই কন্ট্যাক্ট অ্যাভয়েড করি এদিকে ব্লু টোকাই-এর পাঁচজন রেগুলার সেমি-রেগুলার পাঁচজন বাঙালিকে দেখে লাফিয়ে হাত নেড়ে ফেলেছি। লুচি রাধাবল্লভী ফুরোয়নি, আলুর দম শেষ। এক্সট্রা আলুর দম যদি কেউ সেধে দিয়ে যায়, অর্চিষ্মানকে মিষ্টি করে বললে অর্চিষ্মান মাইন্ড করবে নাকি বলবে স্ট্রং ইন্ডিপেন্ডেন্টের এই নমুনা, নিজের এক্সট্রা আলুরদম নিজে জোগাড় করতে পারছ না - ভাবতে ভাবতে চামচ দিয়ে শালপাতার বাটিতে লেগে থাকা ঝোল চাঁচছি, অর্চিষ্মান বলল কুন্তলা দেখাও দেখি কেমন এক্সট্রা আলুরদম আদায় করে আনতে পার।

গেলাম। বন্ধুত্বপূর্ণতার রেগুলেটর পাঁচে ঠেলে। দুটো আলু দিলেই বর্তে যেতাম, দাদা চারটে আলু আর শালপাতার বাটি টুবুটুবু করে ঝোল দিলেন। সে বাটি নিয়ে মেলাগ্রাউন্ডের এবড়োখেবড়ো জমি পেরিয়ে অর্চিষ্মানের দিকে আসতে গিয়ে নারদের তেলভর্তি বাটি নিয়ে প্রদক্ষিণের ফিলিং হল। অর্চিষ্মান সাহায্যের লক্ষণ দেখাচ্ছে না, টেবিলের সামনে স্যালুট করে দাঁড়িয়ে আছে। দাদা এত বেশি আলুর দম দিয়েছিলেন যে এবার আমাদের লুচিরাধাবল্লভী শেষ হয়ে আলুর দম পড়ে থাকল। অর্চিষ্মান, ফেলে দাও কুন্তলা, বলে হাত মুছে এমন ভাবে টিস্যু প্লেটে ছুঁড়ে ফেলল যে বোঝা গেল পৃথিবী এধার ওধার হয়ে গেলেও ওর মত বদলাবে না।  

ফেলে দেওয়ার প্রশ্নই নেই। কেউ জোর করে দিলে ফেললে একরকম, নিজে যেচে নিয়ে ফেললে নরকবাস গ্যারান্টি।

মঞ্চে লোক্যাল শিল্পীদের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে কম্পিত মিহিকণ্ঠে সি শার্পে জনগণমন শুরু হয়েছে। অলরেডি দাঁড়িয়েই আছি। প্লেটে যে এক টুকরো আলু আর দু'চামচ ঝোল বাকি আছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা খাওয়া চালিয়ে যাব না খাওয়া বন্ধ করে অ্যাটেনশনে দাঁড়াব স্থির করতে করতেই জয় হে-র তেহাই পড়ে গেল।

অর্চিষ্মান বলল, চল ওদিকে কী আছে দেখে আসি। বলে মন দিয়ে কপালের বাঁদিক চুলকোতে থাকল। আমিও অনুসরণ করলাম। ওদিকে যাওয়ার ব্যাপারে না, কপালের বাঁদিক চুলকোনোর ব্যাপারে। সোশ্যাল সাইকোলজির কেউ ওই মুহূর্তে আমাকে দেখলে বলতেন আমি 'মিরর এফেক্ট' প্র্যাকটিস করছি। ক্যামেলিয়ন এফেক্টও বলে একে। তাঁরা বলতেন যে আমি এটা করছি যে কারণে জ্ঞাতে অজ্ঞাতে 'মিররিং' করে সবাই। উল্টোদিকের লোকের কাছে নিজেকে রমণীয় করে তোলার জন্য, তার ভ্যালিডেশন পাওয়ার জন্য।

অর্চিষ্মানের ভ্যালিডেশনের জন্য আমার ডেসপারেশন কারও অজানা নয়, অর্চিষ্মানের একটা "বাহ্‌" শুনতে ডিগবাজি খেতে রাজি সেটাও সত্যি। কিন্তু এই মুহূর্তে মিররিং-এর কারণ সেটা নয়। মেলার ওদিকে যেতে গেলে চিপাবস লাইব্রেরির স্টল পেরোতে হবে, যা আমাদের বাঁদিকে।

দুজনে কপালের বাঁদিক চুলকোতে চুলকোতে চিপাবস লাইব্রেরির স্টল পেরিয়ে গেলাম। পেরিয়েও হাত নামালাম না কারণ লাইব্রেরি স্টলের পরেই লাকি ড্র-র টেবিল। প্রতি বছর আমাদের পাকড়াও করে টিকিট কাটানো হয়। বলি, ঠিক আছে পঁচিশের দুটো দিন, তাঁরা বলেন ধুস পঁচিশে খালি উঠবে স্টাফড খরগোশ, পঞ্চাশ পঞ্চাশ একশো কিনলেই অডি, পর্শে, বেন্টলি। কাল দুপুরে ড্র হবে, ফোন পেয়ে যাবেন।

আজ পর্যন্ত পাইনি। পাওয়ার কথাও নয়। কারণ আমি বা অর্চিষ্মান কেউই লটারি-জেতা টাইপ নই।

*

ইদানিং মাথায় ঢুকেছে, আমার জীবনের সমস্ত ঝামেলার মূলে আমার সেন্স অফ আইডেন্টিটি। পুরোনো অফিসে একজন ছিলেন, প্রতি দিওয়ালি তাম্বোলায় জিততেন। এবং প্রাউডলি ঘোষণা করতেন যে আমি তো জিতবই কারণ আমি তো সব সময় লটারি জিতি।

বিজ্ঞানসম্মতভাবে উল্টোটা হওয়া স্বাভাবিক। উনি লটারি জেতেন তাই লটারি জেতার সঙ্গে নিজের আইডেনটিটি অ্যাসোসিয়েট করেছেন। কিন্তু উল্টোটাও কি সম্ভব? মানে আমি লটারি জিতি এটা যদি কেউ বিশ্বাস করে তাহলে কি তার লটারি জেতার চান্স বাড়ে? হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাস করলে হোমিওপ্যাথিতে অসুখ সারার মতো? আমি যে মনে মনে নিজেকে কুঁড়ে বলে জানি সেটাই কি আমার পরিশ্রমবিমুখতার কারণ? কষ্টমষ্ট করে একবার নিজেকে যদি বিশ্বাস করিয়েই ফেলি আমি মন্দ লিখি না, অবশেষে কি একদিন ভালো লিখে ফেলব?

*

আমি বিশ্বাস করি না আমি লটারি-লাগা টাইপ কাজেই প্রব্যাবিলিটি খাটিয়েও লটারি জিতব না, আইডেন্টিটি র ঘাড়ে চেপেও জিতব না। বাঁদিকের কপাল চুলকোতে চুলকোতে লাকি ড্র-র টেবিল পেরিয়ে মেলার ওদিকে পৌঁছে গেলাম, যেদিকে রাজস্থানী চুরন, আরবি আতর, বাঙালি জামদানি।

জামদানি কিনবে নাকি কুন্তলা? অর্চিষ্মান জিজ্ঞাসা করল। বললাম, আরে না না, এসবের আবার কী দরকার। অর্চিষ্মান বলল, তাহলে অন্ততঃ বান্টা খাও। না না, প্লিজ খাও, খেতেই হবে, এটাতে না কোর না প্লিজ।

মাঠের মাঝখানে বান্টা, চুসকি, ভেলপুরির জটলা। বান্টার সামনে গিয়ে অর্চিষ্মান বলল, দো বান্টা দেনা ভাইসাব। সোডা বোতলের ক্রেটের সামনে যে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে ছিলেন, চেঁচালেন, দো বান্টা। চেঁচিয়ে চুসকির সামনের ছেলেটার দিকে তাকালেন। চুসকির দোকানের ছেলেটা, দো বান্টা, চেঁচিয়ে ভেলপুরি ভাইসাবের দিকে তাকাল, ভেল ভাইসাব, দো বান্টা, চেঁচিয়ে সোডার বোতলের ক্রেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোকের দিকে মর্মভেদী দৃষ্টি হানলেন। ভদ্রলোক ফাঁদে পড়ার মতো মুখ করলেন। অর্চিষ্মান আমার কানে কানে বলল, এ মনে হয় বান্টা বানায় না, যার আসল বানানোর কথা সে নেই।

স্টপ গ্যাপ ভদ্রলোক প্লাস্টিকের গ্লাস নিলেন, পিতপিতে গ্লাস, ওঁর হাত থেকে আমার হাতে ট্রান্সফারের সময়েই তুবড়ে যাবে, তারপর আমার সিংগল ইউজের পর অন্যান্য জঞ্জালের সঙ্গে ভেসে ভেসে মহাসমুদ্রে চলে গিয়ে অলিভ রিডলে নবজাতকের মুখে আটকে দমবন্ধ করে তাকে খুন করবে। একটা অকথ্য নোংরা ডিব্বা থেকে অকথ্য নোংরা চামচ দিয়ে দু'চামচ মশলা গ্লাসে ঢাললেন, একটা অকথ্য নোংরা চিপুনি দিয়ে লেবু চিপলেন, তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে যখন স্ট্র-এর হোল্ডার থেকে স্ট্র নিয়ে সেই স্ট্র দিয়েই বান্টা গুলে আমাদের দিকে গ্লাস এগিয়ে দিলেন, নিঃসংশয় হয়ে গিয়েছিলাম বান্টাটা কেমন খেতে হবে।

এক্স্যাক্টলি সে রকমই খেতে হয়েছিল।

*

রবীন্দ্রনাথ নেতাজির পর বাঙালি যাকে শ্রদ্ধা করে সে হল টুপি। মেলার যেদিকে তাকাও টুপির স্রোত। চুল বাঁচাতেই হোক বা অন্য কোনও ভ্যানিটিপ্রসূত, মহিলারা যদি বা টুপি ছাড়া ঘোরেন পুরুষরা মাথা খালি রাখেন না। আমার এই পর্যবেক্ষণ অর্চিষ্মানকে জানাব বলে ঘাড় তুলেই চিত্ত চমৎকার।

এ কী, টুপি পরলে কখন? কেনই বা পরলে?

অর্চিষ্মান বলল, নিজের শিকড়ের প্রতি এত অশ্রদ্ধা ভালো নয়, কুন্তলা। এই তোমার মতো লোকেরাই বিদেশে গিয়ে নিজের নাম অ্যাকসেন্ট দিয়ে বলে আর দেশে ফিরে মিনারেল ওয়াটার ছাড়া খায় না।

আমি বললাম, অর্চিষ্মান মাংকি টুপি পরার দুর্দিনও যদি আসে, কথা দাও, টুপিটা কপালের কাছে গুটিয়ে রাখবে, খুলে গলা পর্যন্ত টানবে না।

অর্চিষ্মান বলল, উফ কুন্তলা, ওই দেখো মনোময় স্টেজে উঠে পড়েছেন। বলে কনুই ধরে টানতে টানতে স্টেজের দিকে নিয়ে গেল।

*

শনিবার ঘুম থেকে উঠে ব্লু টোকাই চলে গেলাম। যাচ্ছি কিন্তু, গেলাম কিন্তু, এই জুতো পরে ফেললাম কিন্তু, আচ্ছা টাটা বাই বাই শিগগিরি যেন দেখা পাই-এর উত্তরে লেপের ভেতর থেকে যে আওয়াজগুলো বেরোল তার বাংলা হচ্ছে কুন্তলা প্লিজ দূর হও আমি আসছি।

হলাম দূর। পঁয়তাল্লিশে পৌঁছে জীবনের যে দুটো নীতিকে নন-নেগোশিয়েবিলিটির সম্মান দিয়েছি তার একটা -  অপেক্ষা না করার। গুরুতর ব্যতিক্রম ছাড়া আমি কারও জন্য দাঁড়াই বা বসি না। অমুক সময়ে আসব, তমুক সময় ফোন করব - লোকজনের যাবতীয় প্রতিশ্রুতি আমার রুটিনে টুসকি পর্যন্ত মারে না। ওগুলো লোকে বলার জন্য বলে, আমিও শোনার জন্য শুনি। শুনে নিজের মতো চলতে থাকি। কেউ সত্যি সত্যি এসে পড়লে বা ফোন করলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিই।

একই নীতি অর্চিষ্মানের সঙ্গেও ফলাই। আগে ভাবতাম একই জায়গায় যাচ্ছি, অটোভাড়া বাঁচিয়ে একসঙ্গে যাব। সে ভ্রম ত্যাগ দিয়েছি। একাই এসেছি একাই যাব, মাঝখানে ব্লু টোকাই যেতে চলনদারের দাবি কীসের? অপেক্ষা করতে করতে ক্রমশঃ রাগের পারা চড়বে, আমি ছাই হব, অর্চিষ্মানের গায়েও আঁচ লাগবে, তার থেকে অনেক বেটার যে যার মতো বেরোনো।

চলে গেলাম। পছন্দের টেবিল বেছে বসে পড়লাম। অনু কোর্টাডো দিয়ে গেল। ঘন বাদামি সারফেসে ভাসন্ত ভগ্নহৃদয়। 

সরি ম্যাম, হার্ট থোড়া টেড়া হো গয়া।

কফি আর্ট প্র্যাকটিস করছে অনু, বলেছি আমার কফিতে ট্রায়াল দিলে আমার কোনও অসুবিধে নেই। বললাম, টেড়া হোক বেঁকা হোক, হার্ট ইজ হার্ট। আর হার্ট জিনিসটা যত ভাঙবে তত শক্তপোক্ত হবে। অক্ষত হৃদয়, জীবনের সবথেকে বড় অপচয়।

সেই ভগ্নহৃদয় কোর্টাডো, মাইক্রো চুমুক দিতে দিতেও শেষ হয়ে গেল। অর্চিষ্মানের পাত্তা নেই। জানুয়ারিটা অ্যাট লিস্ট না কাটলে অদরকারি কথা বলার রেজলিউশন ভেঙে ফেলা লজ্জার কাজেই দু’ঘণ্টা পর জলভরা চোখের ইমোজি পাঠালাম।

অর্চিষ্মান দাঁত বার করা ইমোজি ফেরত পাঠাল। আসছি আসছি কুন্তলা।

এল আরও দেড়ঘণ্টা পর। এসে টেবিলের উল্টোদিকে বসে ওর প্রথম, আমার দ্বিতীয় কোর্টাডো অর্ডার করে বলল, কুন্তলা তুমি একটা কিছু খাবারও নাও, খিদে পেয়েছে নিশ্চয়?

এত বেশি দরদ দিয়ে বলল যে জিজ্ঞাসা করলাম, মেলায় কী সাঁটালে শুনি?

ভাত, শুঁটকি মাছের ভর্তা, ফিশ চপ, চিকেন ফ্রাই, পাটিসাপটা। বলে চুপ করে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকল। একটা অ্যাপেটাইজারও খেয়েছে, মনে করতে পারছে না। তারপর সিলিং থেকে চোখ নামিয়ে বলল, লোকে কিছু অনুদার হয়, বস্‌।

দুপুরে নাকি বাচ্চাদের গ্রুপ ডান্সের কম্পিটিশন হচ্ছিল। শেষে একটা বাচ্চাদের দল উঠেছিল, একটু বেশি বয়সের, চোদ্দ পনেরো। খুব নাচগান হচ্ছিল। টাইম অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়াতে গান থামিয়ে নামিয়ে দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

আজ পর্যন্ত কোনও বুড়োকে বক্তৃতা সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে বলে নামিয়ে দিতে শুনিনি।

আসলে রাগ হয়েছে অন্য জায়গায়, অর্চিষ্মান বলল। বাচ্চাগুলো অবাঙালি। এবং ওই কম্পিটিশনে যে সব বাঙালি বাচ্চারা নাম দিয়েছে বা দিয়ে থাকে, আকৃতিপ্রকৃতিতে তাদের থেকে আলাদা।

ওহ। গুড ওল্ড শ্রেণীসংঘাত।

হ্যাঁ। তার মধ্যে হিন্দি গান চালিয়ে নেচেছে।

খাইসে।

সংস্কৃতির গুমোর বাঙালির কোথা থেকে এল যদি বোঝার চেষ্টা করিও, জাতগোত্রপদবীর মতো সে গুমোর বয়ে নিয়ে চলেছি কেন বোধের বাইরে। নিজেকেও দুর্বোধ্যই লাগে। হইচইতে কালরাত্রি ২ চালিয়ে বসে আছি, এদিকে মনে মনে নিজেকে মণীন্দ্র গুপ্তের মানসপুত্রীর মুকুট পরিয়েছি। সি আর পার্কেরও সেম সমস্যা। নিজের বাচ্চাকে ক্রমাগত 'স্টাফড পিজ কচৌরি খা লো বেটা' বলে যাব কিন্তু আমার থেকে গরিব অবাঙালি বাচ্চারা হিন্দিগান চালিয়ে নাচলে গান থামিয়ে নামিয়ে দেব। এই লোকগুলোই বড়লোক অবাঙালির সামনে পড়লে কী রেটে ঘাড় নোয়াবে আন্দাজ করতে অমর্ত্য সেন হওয়ার দরকার নেই।

*

পাঁচটা নাগাদ এনার্জিতে একটা নিম্নচাপ ঘটে। দু'জনে থাকলে সে নিম্নচাপ কাটাতে সুবিধেও হয়, অসুবিধেও হয়। একজনের কাজের ধুম লাগলে, সে 'আর একটু বসো আর একটু বসো' করলে অন্যজন টেনে দিতে পারে, আবার একজনের ফাঁকিবাজি তীব্র হলে সে 'ওঠো ওঠো, বাড়ি গিয়ে কাজ করবে'খন' করে অন্যজনের সদিচ্ছায় জল ঢেলে দিতে পারে।

সেদিন ফাঁকিবাজি জিতল, উঠে পড়লাম। অর্চিষ্মান বলল, একবার দেখে যাই, বলা যায় না। বলে সে দিকে হাঁটল যে দিকে ব্যাংগালোরের বিখ্যাত দোসার চেন 'বেনে' খুলেছে মাসতিনেক। খোলা ইস্তক দু’বেলা মাহেশের রথের মেলার মতো ভিড় হচ্ছে। অর্চিষ্মান অন্ততঃ পাঁচবার ঢোকার অ্যাটেম্পট নিয়েছে। কেন নিয়েছে ভগবানই জানেন, গোঁ চেপে গেছে সম্ভবতঃ। বাজারে গেলেই উঁকি মেরে লাইন দেখে 'হেউ' বলে।

যথারীতি একশো জন লাইনে দাঁড়িয়ে। ইডলিদোসা আগেও পছন্দ করতাম, নিরামিষ ধরার পর পছন্দ কমিটমেন্টে পরিণত হয়েছে, তা বলে লাইন দেওয়া? দিল্লির ঠাণ্ডায়? এতদিনে বুঝেছি লাইনটা দোসার জন্য নয়, লাইনটা লাইনের জন্য। সবাই যেখানে লাইন দেয় আমারও সেখানে লাইন দেওয়ার অওকাত প্রদর্শনের। লাইনে দাঁড়িয়েই রিল বানানো হচ্ছে। আমরা সে শিল্পসৃষ্টির সাক্ষী থাকতে থাকতে ব্রেক নিলাম। তারপর বাড়ি চলে এলাম।

বড় বেশি ঠাণ্ডা লাগছে, আজ মেলায় যাব না। না গেলেও রাস্তা পেরিয়ে মেলার ভাপ তো গায়ে আসেই। মনে তো পড়েই অ্যারিস্টোক্র্যাটের কড়াইতে গরম তেলের লুচি রাধাবল্লভীরা কেমন নাচতে নাচতে চলেছে, পেটপুরাণের বিরিয়ানি হাঁড়ির পর হাঁড়ি উড়ে যাচ্ছে, আসল বান্টা-স্পেশালিস্ট এসেছেন কি না কে জানে, না এলে স্ট্র দিয়ে গোলা বান্টা-ই গ্লাসের পর গ্লাস বিক্রি হচ্ছে।

এ সব মনে পড়লে উচ্ছেসেদ্ধ দিয়ে ভাত মেখে খাওয়া যায় না। অর্চিষ্মান কী সব অর্ডার করল। জিভের পক্ষে ভালো, স্বাস্থ্যের পক্ষে সুইসাইডাল। কিন্তু প্রসেনজিৎ পেয়ারা কেটে লংকাগুঁড়ো মাখিয়ে রেখে গেছে কাজেই আমরা বুক ফুলিয়ে সে সব অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলাম।

সেদিনের শিল্পী ছিলেন ঋষি পাণ্ডা। তাঁর সুন্দর গলার গান শুনতে পাচ্ছিলাম, ঘরের জানালা তালে তালে কাঁপছিল। আমরা তার মধ্যেই ভলিউম ভদ্রস্থ রেখে 'সার্চঃ দা নয়না মার্ডার কেস' চালালাম। উচ্চমানের কিছু না, কিন্তু কঙ্কনা আছেন আর কঙ্কনা থাকলে আমরা দেখি। অভিনয় করলে দেখি, ইন্টারভিউ দিলে দেখি।

ওটিটি সিরিজের বাজে হচ্ছে বড় টানে। চলছে তো চলছেই। ঋষি নীরব হলেন, জানালা শান্ত হল, সিঁড়িতে চটির চটপট তুলে প্রসেনজিৎ কৃষ্ণা রাজুরা ফিরে এল। তখনও নয়না মার্ডার ইনভেস্টিগেশন চলছে। তারপর যেটা হল, অমার্জনীয়। সিরিজ ওয়ান শেষ, বাকিটুকু সিরিজ টু-তে - যা কবে রিলিজ করবে এক্ষুনি বলা যাচ্ছে না - দেখবেন। ধুস বলে এদিক ফিরলাম, অর্চিষ্মান পিঠে খোঁচা মারতে লাগল। এই দেখো রেডিটে কী বলছে, কুন্তলা। বলে ইনভেস্টিগেশনসংক্রান্ত রেডিটের থিওরি উচ্চস্বরে রিডিং পড়তে থাকল। সিরিজটা নাকি একটা বিদেশি সিরিজ দ্বারা অনুপ্রাণিত কাজেই সবাই জানে কে খুন করেছে কী বৃত্তান্ত। অর্চিষ্মান বিদেশী সিরিজ না দেখেই খুনির নাম ঠিক আন্দাজ করেছে।

বলল, দেখেছ কুন্তলা, তুমি তো আমাকে কোনও ক্রেডিটই দিতে চাও না, এদিকে আমিই কেমন ধরে দিলাম, তুমি তো নির্ঘাত কী হল কিছুই বুঝতে পারোনি।

বললাম, আমি ধরে দিলে তো বলতে কুন্তলা আগেও দেখেছি তোমার মাথা বাজে গোয়েন্দাগল্পের লেখকদের সঙ্গে আশ্চর্য মেলে।

আমার সারকাজম অগ্রাহ্য করে অর্চিষ্মান রেডিটের থিওরি রিডিং পড়তে থাকল, আমি জেগে আছি  নিশ্চিত করতে নিয়মিত ইন্টারভ্যালে আমার পিঠে খোঁচা দিতে থাকল, জেগে আছি কনফার্ম করতে আমি হুঁ হাঁ করতে থাকলাম।

ম-এর প্রশ্নটা মনে পড়ল। হোয়াট ডু ইউ লাইক অ্যাবাউট ডোমেস্টিসিটি?

*

ম গাড়ওয়ালের মেয়ে। স্কুলে পড়ায়, ছবি তোলে, কবিতা লেখে। বরসাতি-তে থাকে। এদিকে ছাদের ঘরকে বরসাতি বলা হয়। টিপিক্যালি একটাই ঘর, কিচেন বাথরুম, আর ছাদ। বরসাতির হৃদপিণ্ড। কুল বন্ধুদের অনেকেই যৌবনে এ রকম বরসাতি-তে বাসা বেঁধেছিল। আমরা তাদের বরসাতিতে আড্ডা দিতে গিয়ে মুগ্ধ হতাম। ঘর ছোট ক্ষতি নেই, গোটা ছাদের মালিকানা? তাছাড়া আমার বন্ধুবৃত্তে অন্ততঃ, বরসাতিতে থাকত একটা পার্টিকুলার টাইপ। ঘরে পা দেওয়া মাত্র টিউবলাইট টান মেরে খুলে ফেলে, ক্রাফটমেলা থেকে কিনে আনা ম ফেরার পথে বা ফিরে নিজেদের মধ্যে বলাবলিও করতাম, অথচ নিজেদের জন্য ও রকম একটা বরসাতির কথা ভাবিনি কখনও।

ডোমেস্টিসিটির প্রায় সবই ভালো লাগে ম-এর। ঝাঁটপাট, মোছামুছি। জামা ভাঁজ করা, বিছানার চাদর পালটানো। 

ইফ সামওয়ান গিভস মি আ পোঁছা, ম্যায় ব্লু টোকাই কা ইয়ে সারে টেবল ডিপ ক্লিন কর দুঁ। দ্যাট উইল বি মাই আইডিয়া অফ হেভেন।

যথাসম্ভব বিনয়ের সঙ্গে চোখ গোল করেছিলাম। ম ফোন খুলে ওর বরসাতির ছবি দেখিয়েছিল।

দেখার মতোই। ঝিনুকের পর্দা, দেওয়ালে একটানে আঁকা পাখির ছবি, ঝালরঢাকা ল্যাম্পের হলুদ আলো পুরু ম্যাট্রেসের ভূমিশয্যার কিয়দংশ আলোকিত করেছে। ডোমেস্টিসিটিকে মর্যাদা না দিলে এমন ঘর বানানো যায় না।

ম বলল, ভেবেছিলাম একবার খাট কিনব, তারপর আর হয়ে উঠল না, একার জন্য বোঝই তো...

বললাম, অনেকদিন ধরেই সন্দেহ ছিল, তোমার ঘর দেখে নিশ্চিত হলাম। বুড়ো হওয়ার - শরীরে নয় - স্পিরিটে, বুড়ো হওয়ার প্রধানতম লক্ষণ হচ্ছে বিছানার ছুতোয় একটি হোঁদল কুতকুত খাট জোগাড় করা।

ম ঝলমল করল। আই রিয়েলি লাভ মাই বেড, টু বি অনেস্ট। ইট'স লাইক আ লিটল ওয়ার্ল্ড টু মি।

ছবিটা আবার দেখলাম। বিছানার বাঁদিকে ল্যাম্প, বই, ড্রয়িং খাতা, বইয়ের থাক। ডানদিকে চায়ের কেটলি, কাপ, টি ব্যাগ। ল্যাপটপ। যা লাগে, লাগতে পারে, সব দু'হাতের নাগালে নিয়ে ম রানির মতো শুয়ে থাকে রোজ। ফোন ফেরত দিলাম। ম জিজ্ঞাসা করল, সো, হোয়াট ডু ইউ লাইক অ্যাবাউট ডোমেস্টিসিটি?

*

এক কথায় নাথিং বলে দিতে পারতাম, কিন্তু এক কথার অধিকাংশ উত্তরদের মতো সে উত্তর সম্ভবতঃ ভুল হত। তাছাড়া গৃহপালন আমার রিভিলড প্রেফারেন্স। হ্যারিকেন হাতে হিমালয় চলে যেতে কেউ আটকাচ্ছিল না, তবু গুঁজে থেকে গেছি যখন কিছু তো ভালোলাগা আছে নিশ্চয়।

সে ভালোলাগা ঝাঁট দেওয়া নয়। ঝাঁট দিতে কান্না পায়, ঘর মুছতে মাথা ঘোরে, তিন ঘণ্টা রেঁধে কুড়ি মিনিটে খেয়ে ফেলা আমার অতি অযৌক্তিক মগজেও ঢোকে না। ঘর সাজানোও এড়িয়ে চলি, কারণ নান্দনিকতা বোধ আমার নেই এবং ও জিনিস না থাকলে সাজাতে নামলে কী হয় সবাই দেখেছে। তাছাড়া সাজানোর প্রপস নিয়মিত ঝাড়তেমুছতে হয়। ঝাড়ামোছায় আমার ইন্টারেস্ট ঝাঁট দেওয়ার থেকে কম, ঘর মোছার থেকে বেশি, রান্নাবান্নার সাপেক্ষে...শিওর নই।

কিন্তু ম তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আমার উত্তরের অপেক্ষা করছে। আমার মাথায় একটা বিশ্বাস জন্মাচ্ছে যে আমাকে একটা কিছু উত্তর দিতেই হবে এবং সে উত্তর 'জানি না' বা 'কিছুই না' হওয়া চলবে না। ঝপ করে একটা অ্যাকটিভিটি মাথায় এসে গেল।

বললাম, আমার বাসন মাজতে ভালো লাগে। বিশেষ করে বাসনটা যদি স্টিলের হয়। স্কচ ব্রাইট ঘুরছে, ফেনা হচ্ছে, আমি স্বপ্নের দেশে ঢুকে যাচ্ছি, সব তর্কে বলে বলে অর্চিষ্মানকে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছি।

*

মিথ্যে বলেছিলাম। বা সত্যের কান ঘেঁষে বেরিয়েছিলাম। বাসন মাজতেও আমার জঘন্যই লাগে। ইস্তিরি করার থেকে কম জঘন্য, স্টিল জঘন্য। তবু বাসন মাজা বললাম কারণ আগাথা ক্রিস্টি নাকি তাঁর অধিকাংশ বইয়ের আইডিয়া পেতেন বাসন মাজতে মাজতে। আগাথা ক্রিস্টি হওয়ার কল্পনাও করি না, বাসন মাজতে মাজতে আজ পর্যন্ত কোনও লেখার আইডিয়াও পাইনি, বরং ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে খেলতে পেয়েছি. কিন্তু ক্যান্ডি ক্রাশ গৃহস্থালির অংশ নয়।

কাজেই ম যখন জিজ্ঞাসা করল গৃহস্থালির কী ভালো লাগে আমার, ভাবলাম। তারপর অপেক্ষারত ম-এর মুখের দিকে তাকিয়ে কনফিডেন্টলি বললাম, আই লাআআআআভ ওয়াশিং ডিশেস।

*

গৃহস্থালির এতকিছু ম-এর ভালো লাগে অথচ আমার কিছুই ভালো লাগে না কেন ভাবতে বসলাম। সম্ভবতঃ গৃহস্থালির সংজ্ঞায় কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে। বা গৃহের সংজ্ঞায়। আমার কাছে ঘর বেসিক্যালি সৈন্যশিবির। কারণ আমার কাছে জীবন বেসিক্যালি যুদ্ধ। যে যুদ্ধে আমি রোজ গোহারা হারছি। যতদিন বাঁচব, হারব। অর্চিষ্মান হয়তো জিতছে, জানি না, কিন্তু রোজ বাড়ি ফিরে জুতো ছাড়তে ছাড়তে যে রকম 'বাবাগো মাগো চা আছে নাকি গো' করে, বিজয়গর্ব বলে তো বোধ হয় না।

আমরা গোহারা হারি, তা বলে যুদ্ধ শেষ হয় না। পরদিন আবার গোহারা হারতে বেরোতে হয়। ক'ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি। এই ক'ঘণ্টায় বাইরে রক্তগঙ্গা বয়ে যাক, আমাদের এই ওয়ান অ্যান্ড হাফ বি এইচ কে-র শিবির তাক করে কামান দাগার নিয়ম নেই। গৃহস্থালি আমার কাছে টু ডু লিস্ট নয়। একটা অনুভূতি। ফিলিং। যুদ্ধবিরতির ফিলিং। আর যুদ্ধবিরতি আমার জন্য শিবিরের শোভাবর্ধনের সময় নয়, কানায় কানায় আরাম, টইটম্বুর আলস্য আর নিশ্ছিদ্র নিশ্চিন্তি আর নিরাপত্তার। কবচকুণ্ডল চেয়ারের পিঠে ছুঁড়ে ফেলে হইচই দেখার।

টু ডু লিস্ট শেষ করা যায়, অনুভূতি অধিকাংশ সময়েই উনিশবিশ হয়ে যায়। বা নব্বই দশ। কোনও কোনও মুহূর্তে আলস্য আরাম নিশ্চিন্তি একেবারে একশোয় একশো পায়। খারাপ ওটিটি দেখে বিরক্ত হয়ে একজনের ঘুমোনোর চেষ্টা, অন্যজনের রেডিট রিডিং পড়ার মুহূর্তটা যেমন পেয়ে ছিল। এই মুহূর্তগুলোতে নিজেকে টোকা মেরে দেখেছি, ম-এর ম্যাট্রেস-বিছানার মতো। যা যা হলে চলে যাবে, যা যা না পেলে - সব আছে। এই মুহূর্তরা প্রায় পূর্ণাঙ্গ। প্রায় নিটোল। প্রায় পূর্ণ।

এক্সটারন্যাল ভ্যালিডেশনই শুধু মিসিং। ও হ্যাঁ, এক্সিসটেনশিয়াল ড্রেডও থাকে কিন্তু সে তো যতদিন এক্সিস্ট করব থাকবে।

Comments