বাড়িয়ে কমিয়ে
বাবার পনীরসংক্রান্ত স্ট্যান্সের অনমনীয়তা নিয়ে কথা হচ্ছিল। বাবার একশো টাকা দিলেও পনীর না খাওয়ার ঘোষণার ব্যাখ্যা দিতে আমি দাবি করছিলাম পনীরের প্রতি সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে বাবা ওই ভাবে কথাটা বলেছেন।
সব সময় যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক আর্থসামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক কারণেই লোকে বাড়িয়েচাড়িয়ে বলে তেমন নয়। কিছু লোকের স্বভাবই রং চড়িয়ে বলা। যেমন আমার। চিরাগ দিল্লির সিগন্যালে দাঁড়িয়ে অর্চিষ্মানকে বলছি - আরে আমি তো ঠিক সময়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম, অশোকা রোডে অটো আটকে আছে তো আমি কী করব - আমার মিথ্যে ঠিক এই স্টাইলের নয়। তার মানে এই নয় আমি স্টাইলের বাইরে মিথ্যে বলি না। তা-ও বলি, তবে আমার মিথ্যের মূল ভঙ্গিটা হচ্ছে সত্যের ওপর বিশ্বাসযোগ্যতার পোঁচ মারা।
আপনি কত শতাংশ জানি না, আমি পাঁচশো শতাংশ শিওর কাল সূর্য পূর্বদিকে উঠবে। পশ্চিমদিকে যে উঠবে না সে নিয়ে সাড়ে সাতশো শতাংশ। এক কোটি টাকা দিলেও আমি কাঁঠাল ছোঁব না। তিন কোটি দিলেও অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ সম্মেলনের কর্তৃপক্ষকাটিং লোকের সঙ্গে ঘেঁষব না। পাঁচ কোটি দিলেও রোদ্দুর রায়কে সিরিয়াসলি নেব না।
এখন সারানো মুশকিল। অনেকদিনের রোগ। ক্লাস সেভেনে স্বাতী বলেছিল, কুন্তলা, এশিয়ান পেন্টস-এর গুচ্ছ দাম, সামলে চড়া।
আমার সঙ্গে অর্চিষ্মানের পঁচিশ হাজার অমিলের এটা একটা। অর্চিষ্মানের আইডিয়া অফ উচ্চ প্রশংসা হচ্ছে, - একেবারে হরেদরে নয়। আমি পেঁয়াজকলিতে নুন ঠিক হলে ডাইনিং টেবিলে বসে নাচতে থাকি। এক ঘণ্টার মধ্যে মেসেজের উত্তর না এলে নোটিফিকেশন 'অলওয়েজ' মিউট করে কথোপকথন আর্কাইভ করে দিই। যাতে উল্টোদিকের লোকটা যদি বা যখন রিপ্লাই করে, রিফ্লেক্সে বা ভুলে তৎক্ষণাৎ উত্তর না দিয়ে ফেলি। যাদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বুঝতে পারি ইচ্ছে করে সাসপেন্স ক্রিয়েট করছে এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা যদি আলংকারিক হয়, কথোপকথন ডিলিট মেরে কন্ট্যাক্ট উড়িয়ে দিই।
প্রতিশোধ ঠাণ্ডা করে নেওয়া ওভাররেটেড। হয় ইমিডিয়েটলি নিন, না হলে চিরতরে ক্ষমা করুন। নিয়ে ফুরফুরে হন। ইমিডিয়েটই নিন বা ক্ষমাই করুন, ছেঁটে ফেলুন। সম্ভব হলে আক্ষরিক এবং পার্মানেন্ট ছাঁটন, অসম্ভব হলে হয়তো বাইরে থেকে সম্পর্ক-সম্পর্ক লুক মেন্টেন করতে হতে পারে কিন্তু আপনি জানবেন আর কোনওদিন শোধপ্রতিশোধের জায়গাটা তৈরিই হবে না। যতদিন বাঁচবেন, ততদিন। যতদিন না মরছেন, ততদিনও।
*
কখনও বিপদ এড়াতেও বাড়িয়ে বলতে হয়।
অর্চিষ্মানের স্বভাব ভালোলাগা খাবার আমাকে সাধাসাধি করা। নিজের পাতের ভালোর কিয়দংশ আমার পাতে চালানের চেষ্টা করা। যা সাধা সম্ভব তা তো সাধেই। যা অসম্ভব তারও ফাঁকফোকর বার করে ঝুলোঝুলি করে। চিলি চিকেনের নিচে চাপা পড়া ক্যাপসিকাম তুলে আমার থালায় ফেলে । চিলি পর্ক ফ্রাইয়ের ঝোল চামচ দিয়ে চেঁছে আমার ভেজ ফ্রায়েড রাইসের ওপর ঝাঁকায়।
পৃথিবীর বাকি সব লোকের ক্ষেত্রে পাত থেকে তোলাতুলির ঘোর বিপক্ষে, অর্চিষ্মানের সঙ্গে নয়। কারণ জানি অন্যরকম হতেই পারত। নিজের ভালো তো সাধলই না, উল্টো ভালো খারাপ (এমনকি অখাদ্য) পাশাপাশি রাখা থাকলে ভালোটা তুলে নিল। প্রত্যেকবার।
সে রকম লোকের সঙ্গ করার সুখ হয়েছে আমার। তাদের সঙ্গে না জুটে যে অর্চিষ্মানের কপালে জুটেছি, আমার ভাগ্য।
আমি বলছি না আমি পারফেক্ট, আমারও ঝামেলা প্রভূত। দ্রষ্টব্যঃ রাগ এবং চঞ্চলমতি। কোনওটাই কিউট লেভেলের নয়। ভালো জিনিসটা প্রতি বার নিজের জন্য তুলে নেওয়া - এই পার্টিকুলার ফ্লেভারের ঝামেলাটা নেই আরকি।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ঠাকুমা বলেছিলেন পৃথিবীতে পাঁচশো রকমের লোক থাকে। ঠাকুমার মতে সেটা অসুবিধের নয়। অসুবিধের হচ্ছে যখন একটাই লোক পাঁচশো রকমের হয়। লোক পাঁচশো রকম না ছত্রিশ রকমের সে নিয়ে ঠাকুমার সঙ্গে তর্কে নামব না। একই অঙ্গে বহু রূপের সুবিধে অসুবিধে আমার কনসার্ন নয়। আমাকে ভাবতে হবে আমি কোন রকমের লোকের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করব। বা একটা রকমারি লোকের কোন রকমগুলোতে মনোযোগ দেব।
আমার ঠাকুমা বলেছিলেন, সব বোতলের সিপি আছে। সব সিপির বোতল। কেরামতি বা কপাল হচ্ছে নিজের মাপমতো বোতল বা সিপি খুঁজে বার করা। ভালো জিনিস নিজের তুলে নেওয়া লোকের পালা এমন কারও সঙ্গে পড়া দরকার, যারও ভালোটা নিজের জন্য তুলে নেওয়ার ক্ষমতা আছে। তাহলে দ্রুত নিজেদের মধ্যে ইকুইলিব্রিয়ামে পৌঁছনো সম্ভব। মারামারি চুলোচুলি করে, অথবা কাউন্সেলর/গুরুদেবের মধ্যস্থতায়। একজন প্রত্যেকবার ভালো তুলে নেয় অন্যজন প্রত্যেকবার চক্ষুলজ্জায় বা সাহসের অভাবে বা অভিমানে হাত গুটিয়ে বসে থাকে - সে রকম জুটি হলে - যা আমার সন্দেহ দরকারের থেকে বেশিই হয়ে থাকে - একজনের জন্য দুঃখের সিন।
তেমনই মেজাজি লোকের সঙ্গে মেজাজি না হলেও, মেজাজে না ঘাবড়ানো লোকের দরকার আছে। রাগ দেখালে রাগের চোখে চোখ রেখে তোমার রাগ আমাকে টসকায় না বলতে পারা লোকের।
*
সেই আমাকেও কিছু ক্ষেত্রে অর্চিষ্মানের সদব্যবহারের সামনে বুক পেতে দাঁড়াতে হয়। যেমন স্ট্রবেরি স্মুদি উইথ পাইনঅ্যাপেল চাংকস। অর্চিষ্মান দাবি করে জিনিসটা অমৃতের মতো খেতে না, আক্ষরিক অমৃত। খেলেই অমর।
এক চুমুক খেয়ে দেখো। আচ্ছা, হাফ চুমুক। বলে উজ্জ্বল গোলাপি থকথকে হাফ তরলে উজ্জ্বল হলুদ আনারস ঝিকমিক করা গ্লাস আমার দিকে ঠেলে দেয়।
তিনবার ডিপ ব্রিদিং করে বলি, তুমি যদি আমাকে চাংক চাংক করে স্ট্রবেরির কাঁটা সারা গায়ে বিঁধিয়ে পাইনঅ্যাপেল জুসে চুবিয়ে রাখো তবুও এ জিনিসে চুমুক দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
কাম ডাউন, কুন্তলা। অর্চিষ্মান চোখ ঘুরিয়ে গ্লাস ফেরত নেয়। সেদিনের মতো প্রাণে বাঁচার উল্লাসে আমি আমার সল্টি ফ্রেশ লাইম সোডা এক চোঁ-তে শেষ করি।
*
বাবার পনীরপ্রতিরোধ নিয়ে এত লিখলাম , কিন্তু আমার ইস্যু পনীরের ছিল না। ছিল বাবার 'একশো' টাকার অ্যামাউন্ট চয়নে। বাড়িয়েই যদি বললেন তাহলে বাবা এককোটি টাকা দিলেও পনীর খাব না বললেন না কেন? একশো টাকার মতো একটা তুচ্ছ অ্যামাউন্ট বাছলেন কেন?
একশো টাকা বললেন বলেই কি আমি অত হাসলাম? বাবা যদি বলতেন, এক কোটি টাকা দিলেও খাব না তাহলেও কি আমার এত হাসি পেত?
সম্ভবতঃ, না।
কেন? রং চড়ালে কি দুঃখ আরও বেশি, আনন্দ আরও আনন্দের হয় না?
*
এই রকম একটা উচ্চকিত আবেগের প্রকাশ দেখে এলাম ভ্যালেনটাইনস ডে-তে। পনেরো ফেব্রুয়ারি ভোর না হতে অর্চিষ্মান হাওয়া হচ্ছিল কাজেই আমরা ঠিক করেছিলাম চোদ্দ তারিখটা মজায় মজায় ঠাসাঠাসি করে ফেলব। দরকারের বেশি এক সেট শ্বাসপ্রশ্বাসও বাড়িতে নেব না।
রোজই যাদের মজা হয় তাদের নতুন মজা বার করা মুশকিল। তাছাড়া যে বয়সে পৌঁছলে চেনা মজা বেশি পে অফ দেয় আমরা সে বয়সে পৌঁছে গেছি। অ্যামেরিকান ব্রু-তে ব্রেকফাস্ট করে ব্লু টোকাইতে এলাম। নরম্যাল দিনে দুজনে ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ দুই-ই কফি দিয়ে রিপ্লেস করে থাকি, কিন্তু আজ আনন্দ করতে হবে আর আনন্দ মানে ইন্দ্রিয়সম্ভোগ আর ইন্দ্রিয়ের মধ্যে জিভের পুজো সহজতম। পিট’স ডেলি আমাদের প্রিয় দোকানের রোটেশনে নবতম সংযোজন। সেখানে লেট লাঞ্চ সেরে বাড়ি এলাম।
সম্ভোগের শেষ আইটেম অডিওভিশুয়াল কম্বো। দর্শন শ্রবণকে একসঙ্গে অ্যাটাক করব। পপকর্ন থাকলে জিহ্বাও জুটবে। সাধারণতঃ সিনেমাতেই যাই,কিন্তু ভারত রঙ্গ মহোৎসব চলছিল। চোদ্দ তারিখ প্রেমের সন্ধেয় প্রেমের নাটক 'সোজন বাদিয়ার ঘাট'। টিকিট কেটে রেখেছিলাম।
উনিশশো তেত্রিশ সালের কবিতা, স্পয়লারসীমা অতীত হয়ে গেছে। সোজন দুলির বাল্যবন্ধুত্ব পিউবার্টিতে প্রেমে পরিণত হয়। তারপর হিন্দু মুসলমান, উঁচুনিচু জাত নিয়ে প্রত্যাশিত ঝামেলা, দুজনের পলায়ন, সংসার সংসার খেলার ক্ষণস্থায়ী স্বর্গসুখ, নারীহরণ কেসে সোজনের সাত বছর জেল, দুলির নিজস্ব জীবনে ভেসে যাওয়া, জেল খেটে বেরিয়ে জাহাজে চড়ে ঘাটে ঘাটে ঘুরে সোজনের দুলিঅন্বেষণ, প্রাপ্তি, প্রেমিকপ্রেমিকার মিলন ও যুগ্ম আত্মহনন।
সে একেবারে আবেগে লটপট গল্প। বিয়ের পারমিশন পাওয়া যাবে না বুঝে যখন দুলিরূপী দ্যুতি এসে সোজনরূপী গৌতমকে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন, দুই সম্প্রদায়ে যুদ্ধ লাগবে আরও না জানি কী কী হবে, শুধু দুটো মানুষের প্রেম চরিতার্থ করার জন্য এতখানি ড্রাস্টিক ডিসিশন ঠিক হবে কি না ভেবে সোজন মাথা চুলকোচ্ছ , দুলি আকাশবাতাস সূর্যতারাকে সাক্ষী রেখে নিজের প্রেমের ইজাহার করছে, সোজনকে পেলে দুলির কী হবে, না পেলে কী হবে ইত্যাদি, সে শুনে যার বাটিকের লাল রুমাল স্যাঁতসেঁতে না হয় তার ক্ষুরে ক্ষুরে।
নাটক শেষের পর, এল টি জি অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে চিমটের এই হাত কোপারনিকাস মার্গ ধরে হেঁটে গিয়ে ওই হাত ভগওয়ানদাস মার্গের মোড়ে চায়ের দোকান। ডিনার তখনও বাকি, রাতও হয়েছে, কিন্তু ও রকম একটা অভিজ্ঞতার পর চা ব্রেক নন-নেগোশিয়েবল। আমরা চা খেতে থাকলাম, উল্টোদিকে দূরদর্শনের ঝুপসি বাগানের উঁচু উঁচু গাছে ঠ্যাকনা দেওয়া প্রকাণ্ড স্ক্রিনে মিউটে সিরিয়াল চলতে থাকল। অভিনেতাদের চোখ মুখ শাড়ি পাঞ্জাবী থেকে রানি, বেগুনি, সবুজ, গোলাপি, সোনালি রুপোলি আভা, মূলতঃ রানি ও বেগুনি, মান্ডি হাউস গোল চক্করের ছাতিমগন্ধ ছাওয়া আকাশবাতাসে ঘুলেমিলে গেল।
অর্চিষ্মান বলল, আবার সেই কথাটা প্রমাণ হল। পৃথিবীর বাকি ইমোশন প্রকাশের ক্ষেত্রে খাটুক না খাটুক, প্রেমের ক্ষেত্রে ডিরেক্টনেস অলওয়েজ ওয়ার্কস।
বাঁ হাতেই হায়েস্ট ফাইভ দিলাম।
মহিলা যখন ওই ডায়লগগুলো বলছিলেন, অর্চিষ্মান দৃশ্যটার কথা মনে করল, আমারই কেমন লাগছিল।
অর্চিষ্মানকে কেমন লাগাতে হলে ক্ষমতা চাই। জসিমুদ্দিনের ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে দুলির চরিত্রে দ্যুতি ঘোষ হালদারের ক্ষমতাও।
একশোবার বলেছি। আই লাভ ইউ এমনি এমনি সব ভাষায় ঢুকে পড়েনি। শিল্পসাহিত্যেও প্রেমপ্রকাশে ডিরেক্টনেসের শ্রেষ্ঠত্ব পুনঃপুনঃ প্রমাণ পাওয়া গেছে। বেস্ট কোয়ালিটির ভালোবাসা ইজ অলওয়েজ হাতের তাস দেখিয়ে বাসা। বাংলার শ্রেষ্ঠ দুটি ভালোবাসার গানের কথা ভাবুন। আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস, দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী দীর্ঘ দিবস মাস। এক্সিবিট নাম্বার ওয়ানঃ
এক্সিবিট নাম্বার টুঃ খোদার কসম জান, আমি ভালোবেসেছি তোমায়।
এক্সিবিট নাম্বার থ্রি হিসেবে যে হরিয়ানভি গানের কথা বলব সেটাকে গান বলছি জানলে বাবা হতাশ হবেন। হতাশা হরিয়ানভিসংক্রান্ত নয়, রুচি সংক্রান্ত। আমি নিজেও হতাশ, কিন্তু সে অনুভূতি জলভাত হয়ে গেছে।
ব্যয়রন। শুনেছেন? আমার শোনার কথা নয়, কারণ ইউটিউবের 'ট্রেন্ডিং' ট্যাব আমার আছোঁয়াই থাকে। অর্চিষ্মান এ সব ব্যাপারে আপ টু ডেট। প্রথমবার শুনে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কারণ ও রকম ঢিপ ঢিপ তালের সঙ্গে পাঁচালি পড়ার মতো লাইন বলে যাওয়া গান নয়। কিন্তু ওই ঢিপ ঢিপ ক্রমাগত পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে একধরণের ট্রান্স তৈরি করতে পারে যা মনোসংযোগে সহায়ক। সাধারণতঃ কাজে বসলে যে কোনও একটা গান লুপে চালিয়ে বসি। শব্দ, মুড, আবহের একটা নিশ্ছিদ্র ও অপরিবর্তনীয় দেওয়াল তৈরি হয়। নতুন তাল (ব্যয়রন গোত্রের গানের ক্ষেত্রে তালের নতুনত্ব অপ্রাসঙ্গিক), নতুন সুর (উপরে দেখুন), নতুন কথার সঙ্গে প্রতি সাড়ে তিন মিনিটে নতুন করে ব্রেনকে দিয়ে প্রসেসিং করানোর প্রয়োজন পড়ে না। সে দেওয়াল ব্যয়রন দিয়েও হতে পারে, অলির কথা শুনে বকুল হাসে দিয়েও হতে পারে আবার মল্লিকার্জুনের খট দিয়েও হতে পারে।
ব্যয়রন পাঁচালির কয়েকটা লাইন এই রকমঃ জিথ্ ভি গয়া রে তেরি ইয়াদ খড়ি পায়ি ম্যায়নে। জিন্দগি সারিয়া মেরি তেরি লিখ্খি লায়ি ম্যায়নে।
জিওভানি’স রুম আমার আজীবনের টপ ফাইভ প্রেমের গল্পের একটা। অনেক বছর আগে ইউটিউবে বইটির রিভিউ শুনেছিলাম। খটমট রিভিউ শেষ করে রিভিউয়ার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, বইটা তো পড়বেনই, যদি জীবনে কোনওদিন জিওভানির রুমের মতো রুম পান কিছুক্ষণ হলেও বসবেন।
জীবনে এমন কারও সঙ্গে যদি মোলাকাত হয় যাকে দেখে মনে হয় একে ‘জিন্দগি সারিয়া মেরি তেরি লিখ্খি লায়ি ম্যায়নে’ বলা যেতে পারে তাহলে উত্তরে সে কী বলবে হিসেব না কষে বলে দেওয়াই ভালো।
উচিত।
*
বেগুনি-আভা সিরিয়ালকে টাটা করে আমরা উবার ধরে ডিনারের উপযুক্ত ভেনুর দিকে ধাবিত হলাম। পছন্দের প্রথম দুটো দোকানই গলাপর্যন্ত ভর্তি, ওয়েটিং টাইম মিনিমাম একঘণ্টা। অলরেডি সাড়ে ন’টা বেজে গেছে, আমরা হেউ বলে সি আর পার্ক ফিরে এলাম। ফ্লেমিং ওয়ক যত ভর্তিই হোক না কেন, দুটো সিট জুটেই যায়। সেদিনও গেল। যথারীতি ভালো লাগল।
এই সবের মধ্যে মধ্যেই আলোচনা চলছিল। নাটক দেখতে কী ভালো লাগে। গৌতম হালদার যতক্ষণ স্টেজে থাকেন কেমন অন্যদিকে তাকানো যায় না, দিল্লি ভালো কিন্তু কলকাতায় থাকলে আরও কতবেশি নাটকথিয়েটার দেখা যেত। অর্চিষ্মান বলল, কুন্তলা একটা প্রেমের গল্প লেখ। কোনও কায়দা না করে। নো জটিলতা। সহজসরল প্রেমের গল্প।
প্রেম সহজসরল হয় নাকি?
আহা, তুমি হওয়াবে।
জানালার বাইরে সরে সরে যাওয়া দিল্লির রাত দেখতে দেখতে আমার প্রত্যক্ষ করা যাবতীয় প্রেমের স্টক নিতে থাকলাম। নাইন্টি পার সেন্টক বাতিল হয়ে গেল, বাকি দশ পারসেন্ট কেশব নাগের অনুশীলনীর শেষ পাঁচটা অংককে লজ্জা দেবে।
মাথার ভেতর প্রেমের লিস্টে নাম কাটছি, অর্চিষ্মান বলছে, এই যেমন ধর সোজন দুলির প্রেমের মতো, নিপাট নিখাদ।
চুপ করে আছি দেখে বলল, মনে হচ্ছে একমত নও।
বললাম, আহা আমার একমত হওয়া না হওয়ায় কী এসে যায়। ভাবছিলাম অন্য লোকটা বিপদে পড়তে পারে জেনেও প্রেমের জন্য ঝুলোঝুলি করা কি সত্যিকারের প্রেম? কেস হলে তো নারীহরণেরই হবে। পুরুষহরণের কেস তো হয় না। অন্ততঃ তখন হত না ফর শিওর।
অর্চিষ্মানের মন তখনও দুলির জন্য দ্রব হয়ে রয়েছে। বলল, আহা কুন্তলা, তুমি তোমার সেনসিবিলিটি দিয়ে প্রায় নব্বই বছর আগে লেখা চরিত্রকে জাজ করলে কী করে হবে। আমি বললাম, না না, জাজ করছি না। কিন্তু সেনসিবিলিটি যেমন সময়সাপেক্ষ অনেকটা ব্যক্তিসাপেক্ষও বটে। উনিশশো তেত্রিশের দুলির উনিশ বছর আগের ললিতা হলে ব্যাপারটা অন্যভাবে হ্যান্ডল করত সম্ভবতঃ।
ললিতা কে?
গুরুচরণের অনাথ ভাগ্নি, যার পাশের বাড়ির দুষ্টু উকিল নবীন রায়ের ছোটছেলে শেখরের সঙ্গে কেমন কেমন চলছে। ললিতার বয়স তেরো, শেখরের বয়স পঁচিশ কিন্তু সালটা উনিশশো চব্বিশ তাই সবাই চোখ উল্টে আছে। ললিতা শেখরের সেটিং হয়েই যাচ্ছিল, এমন সময় নবীন রায়ের অর্থগৃধ্নুতা থেকে বাঁচতে গরিব গুরুচরণ, গিরীনের প্ররোচনায় বাড়িশুদ্ধু ব্রাহ্ম হয়ে গেলেন। দুই বাড়ির মাঝে পাঁচিল উঠল। গিরীনের সঙ্গে ললিতার বিয়ে ঠিক হল।
শেখরের বুক ধুকপুক করতে থাকল। প্রেমে নয়। গিরীনের ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোনোর সম্ভাবনা আঁচ করে কয়েকদিন আগে অন্ধকার ছাদে ললিতার সঙ্গে মালাবদল করেই শুধু শেখর ক্ষান্ত দেয়নি, "তাহাকে বুকের উপর টানিয়া লইয়া তাহার মুখচুম্বন করিয়াছিল।"
এই খবর বাইরে বেরোলে কী হবে বোঝার বুদ্ধি শেখরের ছিল। কিন্তু ভয়ের কারণ ছিল না। কারণ ললিতা চুপ করে থাকল। মানে যেখানে বলার দরকার সেখানে ছাড়া। ছাদের কোণে গান্ধর্ব মতে বিয়েও ললিতার কাছে বিয়েই ছিল, কাজেই সে গিরীনের কাছে বরের নাম উল্লেখ না করে নিজের বিবাহিত স্ট্যাটাস উন্মোচন করেছিল। শেখর নিজে ঘাপটি মেরে থাকলেও, তিন বছর ললিতার খোঁজ না নিলেও শেষ দিকে ললিতার কথা মনে করলে তার মনে “ঘৃণার ভাব” জাগত। কারণ মানুষ এ রকমই হয় আর শেখর মানুষ।
অন্যদিকে, সোজন যে সোজন টের পেয়ে সোজনের আনা সব গিফট ফেরত দিয়ে দেয় দুলি। ফিরে যেতে বলে। সোজন বিনা বাক্যব্যয়ে ফিরে গিয়ে জাহাজে বসে বাঁশি না কী একটা বাজাচ্ছে, দুলির কানে সে বাঁশির সুর বিষ ঢালে। দুলি স্বামীকে বলে যাও গিয়ে বাঁশি বন্ধ করে এস। স্বামী পূর্বকাণ্ড টের পেয়ে হিংসুটেপনা করে সোজনের ক্ষতিসাধন করতে পারেন কি না ইত্যাদি ভাবার ব্যান্ডউইডথ খরচ করে না।
দুলি মনে হচ্ছে আমার মতো। বিন্দুমাত্র কষ্ট সহ্য করতে পারে না। বাকিরা যা ভোগে ভুগুক, আমার একইঞ্চি কষ্ট হলে চলবে না।
আমি দুলির জীবনও বাঁচিনি, ললিতার জীবনও না। তাছাড়া দুজনের এইসব হৃদয়পুরের জটিলতা ঘটছে যখন দুজনেই সম্ভবতঃ টিন এজার। ডেফিনিটলি বাইশের নিচে। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে বাচ্চা মেয়েদের প্রেমের দোষগুণ, লাইফ চয়েসের ভালোমন্দ বিচার আমার মতো বেহায়ার পক্ষেও লজ্জাজনক। কাজ নেই তাই এ সব লিখছি। দুলিললিতার প্রসঙ্গ তুলে অন্য একটা পয়েন্ট প্রুভ করার চেষ্টা করছি।
পয়েন্টটা হচ্ছে যেনতেনপ্রকারেণ প্রেম নামিয়ে দেখিয়ে দেওয়াকে আমাদের শিল্পসাহিত্যে এবং রিয়েল লাইফে খুবই বেশি নম্বর দেওয়া হয়। জুলিয়েটের অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে গেলে, কয়েকবছর পর রঞ্ঝার অন্য একটি বা দুটি বা তিনটি মেয়েকে ভালো লেগে চতুর্থ মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলে, অনিমেষ মাধবীলতার প্রেমের মানচিত্রে অন্য পুরুষ নারীর কিছু বোল্ড কিছু লাইট রেখা ফুটলেই, ব্যস। রেডিটে ইউটিউবে নিঃসংশয় লোকজন এসে লিখে যাবে - ওটা ট্রু লাভ নয়।
নিজেরা যে কোনও মুহূর্তে মরে যেতে পারি বলেই হয়তো টিকে যাওয়া নিয়ে আমরা এই লেভেলে অবসেসড।
*
সোজন বাদিয়ার ঘাট দেখে আসার পর পর বা আগে আগে বা ওই সময়ে ডেভিড সোলয়-এর বুকারজয়ী উপন্যাস ‘ফ্লেশ’ পড়ছিলাম। অ্যানি আর্নোর প্রতি ভালোলাগা কমন পড়াতে সায়ন বলল, সোলয় পড়েছিস? আমি বললাম, না। সায়ন বলল, পড়ে ফেল। ‘ওককে বস্’ বলে পড়ে ফেললাম।
সোলয় হচ্ছেন ‘কমিয়ে বলা’র দীর্ঘ ট্র্যাডিশনের মশালবাহক। অ্যানি আর্নো, ওটেশা মশফেঘ, জোন ডিডিয়ন, রেমন্ড কার্ভার এবং অবভিয়াসলি, পাপা হেমিংওয়ের ট্র্যাডিশন। যা ঘটছে তা কী করে ঘটা সম্ভব ধরে ফেলার চেষ্টায় জোন ডিডিয়ন শুনেছি হেমিংওয়ের বই খুলে টুকতেন, স্লাউচিং টু বেথলেহেম পড়তে পড়তে আমার ডিডিয়নের গোটা বই টোকার কথা মাথায় আসেনি বলতে পারি না।
সোলয় বলেছেন, ফ্লেশ লেখা হয়েছে ভার্জিনিয়া উলফ-এর জেকব’স রুম-এর ডিরেক্ট অনুপ্রেরণায়। প্লটের নয়, স্ট্রাকচারের। এক একটা মুহূর্তের পেরেকে টাঙাতে টাঙাতে একটা গোটা জীবনের গল্প বলে দেওয়া।
জেকব’স স্টোরি পড়িনি। পড়লে হয়তো ফ্লেশ পড়তে বসে মনে পড়ত। কিন্তু সোলয়ের বই আমাকে সম্পূর্ণ অন্য একটা বইয়ের কথা মনে করাল। মিলের নয়, অমিলের আশ্চর্যতায়।
হ্যানা ইয়ানাগিহারা-র আ লিটল লাইফ।
অমিল নিয়ে ভাবতে বসে মিলের লিস্ট লম্বা হতে থাকল। দুটো বইকে অমিল দিয়ে জুড়তে পারার মৌলিকতায় যে আত্মশ্লাঘা বোধ করছিলাম, উবে যেতে লাগল।
প্রথম মিল, বুকার কানেকশন। ডেভিড সোলয়-এর ফ্লেশ দু’হাজার পঁচিশে বুকার পেয়েছে। আ লিটল লাইফ দু’হাজার পনেরোতে পেতে পেতেও মার্লন জেম ব্রিফ হিস্টরি অফ সেভেন কিলিংস-এর কাছে হেরেছে। সে বছরে জাজমেন্ট প্যানেলে নাটকীয় লোকজন ছিলেন মনে হয়।
ফ্লেশ ও লিটল লাইফ দুটো উপন্যাসই ‘আর্ক অফ লাইফ’ নিয়ে। দুটি মানুষের বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে মাঝবয়স। বা মাঝবয়স পার।
দুটো উপন্যাসেরই প্রোটাগনিস্টই পুরুষ।
এই মিলটি প্রণিধানযোগ্য। অর্চিষ্মানের সঙ্গে আমার সেই আলোচনার কথা আগে অবান্তরে লিখেছি। মেয়েদের গল্প খালি লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে কেন হবে, বসে বসে ঝালমুড়ি খাওয়া নিয়ে কেন হবে না, অত্যাচার মানে কেন রেপেই চলে যেতে হবে, লেডিস কামরায় ধাক্কাধাক্কি নিয়ে কেন লেখা যাবে না ইত্যাদি। অর্চিষ্মানের (এবং জিম সরভ-এরও) মতে গল্প এমন হলেই ভালো যে মেন চরিত্র পুরুষ হোক বা নারী, প্লট একই থাকবে।
সে রকম হয় না, কারণ গল্প তৈরি হয় জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে আর জীবনের অভিজ্ঞতা তৈরি হয় জাত ধর্ম লিঙ্গ বয়স গায়ের রং দৈর্ঘ্য প্রস্থ বি এম আই শহর গ্রাম গরিব বড়লোক বাংলা মিডিয়াম ইংরিজি মিডিয়াম দিয়ে। আমরা যেগুলোকে “নর্ম্যাল” গল্প বলে ভাবি প্রত্যেকেই আসলে একটি বিশেষ পরিচিতি ও পরিস্থিতির কনফিগারেশনের গল্প। আমাদের কন্ডিশনিং, ভাষা - যা হান্ড্রেড পারসেন্ট ভাবনা ও দৃষ্টিকে একাধারে স্বচ্ছ ও আচ্ছন্ন করে - সে সব গল্প এক বা অন্যরকম ঠেকে। দিদার পুলিসের সিনেমা হয়ে যায়্ মর্দানি নারীকেন্দ্রিক। প্রথম প্রতিশ্রুতি নারীকেন্দ্রিক উপন্যাস, পথের পাঁচালী জাস্ট উপন্যাস।
অর্চিষ্মান বলবে, কুন্তলা, এখানে ‘কেন্দ্রিক’ কথাটার আভিধানিক অর্থ ধরলে হবে না। সোশিওকালচারাল দ্যোতনা ধরতে হবে। ‘কেন্দ্রিক’ হয় তখন, যখন কেন্দ্রের চরিত্র তার আইডেন্টিটির ওপর সিস্টেমিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে, বা ব্যর্থ হচ্ছে বা মেনে নিচ্ছে। মোদ্দা কথা, কোনও ভাবে রিঅ্যাক্ট করছে। প্রথম প্রতিশ্রুতি ক্লিয়ারলি সত্যবতীর নারী হিসেবে সমানাধিকার আদায়ের লড়াইয়ের গল্প তাই সেটা নারীকেন্দ্রিক, অপুর সে রকম কিছু নেই, তাই সেটা জাস্ট গল্প।
অর্চিষ্মানের সঙ্গে তর্ক চালিয়ে যাব। ব্রিজারটন, স্নেপের চরিত্রে কালো অভিনেতার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইত্যাদি উদাহরণ টেনে। সেগুলোতে তো অ্যাপারেন্টলি কোনও সিস্টেমিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখেটুখে দাঁড়ানো নেই। তা বলে কি সিদ্ধান্তগুলো এমনি? কসমেটিক? বৃহত্তর উদ্দেশ্যরহিত? অর্চিষ্মান বলবে, অফ কোর্স উদ্দেশ্য আছে, কিন্তু যেহেতু বিদ্রোহ নেই তাই ব্রিজারটনকে রেস"কেন্দ্রিক" বলা যাবে না। হ্যারি পটারও রাতারাতি রেস"কেন্দ্রিক" হয়ে উঠবে না। এই করতে করতে একঘণ্টা পর অর্চিষ্মানের কী হবে জানি না, আমার সব গুলিয়ে যাবে। তর্ক কোথা থেকে শুরু হয়েছিল, শুরুতে কে সভার কোন পক্ষে বলছিল, এখন কে কোন পক্ষে বলছে, দুজনে একই যুক্তির এদিকওদিক বলে যাচ্ছে কি না। শেষমেশ হেউ বলে ভালো কিছু খাবারের সন্ধানে বেরোব।
ফ্লেশ ও লিটল লাইফ, দুই পুরুষের গল্প। বা দু’রকম পৌরুষের। বা সমাজের পারসেপশন অফ পৌরুষের। কোনও পুরুষ যথেষ্ট পুরুষালি প্রতিভাত না হলে তার প্রতি পিতৃতন্ত্রের ট্রিটমেন্টের গল্প হচ্ছে আ লিটল লাইফ। ফ্লেশ-এর ইস্তেভান স্পেকট্রামের অন্য প্রান্তে। আলফা পৌরুষের পপুলার সংস্করণের প্রতিনিধি। যৌনতা দ্বারা চালিত, যোদ্ধা, মনের কথা মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই। সাইলেন্ট ও ব্রুডিং।
ইস্তেভান ও জুড দু’জনের জীবনই ট্রমামণ্ডিত। ইউটিউবের রিল থেকে ট্রমার বৈশিষ্ট্য যা যা জেনেছি, অনেকগুলোই জুড ও ইস্তেভানের প্রসঙ্গে খেটে যায়। ট্রমা এককালীন হলেও (জুডের অবশ্য বারংবার) ভ্যাকুয়ামে ঘটে না, জীবন জুড়ে তার ছাপ পড়ে।, কিন্তু ট্রমা সত্ত্বেও ইস্তেভানের জীবন নানা বাঁকে বয়। কখনও দুর্ভাগ্যের খাদে, কখনও সৌভাগ্যের চূড়ায়।
একটা ইন্টারেস্টিং রিল দেখলাম সেদিন। একজন সাইকায়াট্রিস্ট বলছিলেন, ট্রমা যে শুধু ক্ষতিই করে তা নয়। তিনি দাবি করলেন, পৃথিবীর যাবতীয় বিলিওনেয়ার সি ই ও-দের অধিকাংশই নাকি ট্রমাটাইজড।
কুড়িপঁচিশ বছর আগে সফল বাঙালিদের বাথরুম নিয়ে আনন্দবাজারে বিশেষ ক্রোড়পত্র ছাপা হয়েছিল। মেধার পোলে ভল্ট খেয়ে জার্মানিতে ল্যান্ড করা এক বাঙালির বাথরুম ছিল সে তালিকায়। বাথটাবটা না থাকলে ভার্সেই বলে ভুল হতে পারত।
ভদ্রলোকের শৈশবকৈশোর কেটেছিল উত্তর কলকাতার শরিকি বাড়িতে। সাত শরিকের রান্নাঘর আলাদা ছিল। বাথরুম কমন। বিকেলে যখন বন্ধুরা মাঠে বল পেটাত ভদ্রলোক ঘাড় গুঁজে পড়তেন, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে সবাই কিউপিডপুজোয় মগ্ন থাকত ভদ্রলোক রাত জেগে পড়তেন। সবাই বলত, উফ কী ড্রাইভ, ওফ কী অ্যাম্বিশন।
আসল কথা জানতেন সেই ভদ্রলোক। আর জেনেছিলাম বাথরুম ক্রোড়পত্রের পাঠকরা। আর এই আপনি জানলেন। ভদ্রলোককে তাড়া করছিল একটা বাথরুমের ট্রমা। নাকে দড়ি দিয়ে টানছিল অন্য একটা বাথরুমের স্বপ্ন। ঠেলা ও টানের এই পার্টিকুলার খাপে খাপ মানুষকে দিয়ে যে অসাধ্য সাধন করিয়ে নিতে পারে, কোনও অ্যাম্বিশনের ঠাকুরদার কর্ম নয়।
*
ইয়ানাগিহারার আ লিটল লাইফ ম্যাক্সিমালিস্ট উপন্যাস। জুডের অন্তর্মহলের প্রতিটি গুপ্ত ঘর, বারান্দা, ঘুলঘুলিতে ফ্লাড লাইট জ্বালেন ইয়ানিগিহারা। পাঠককে কিডন্যাপ করে চোখের পাতা খুলে ভুরুতে সেলোটেপ দিয়ে সাঁটেন যাতে সাড়ে সাতশো পাতা জুড়ে পাঠক জুডের প্রতিটি ক্ষত টেকনিকালারে দেখতে বাধ্য হয়, প্রতিটি আর্তনাদ ডলবি সাউন্ডে শুনতে। যে ইরোটিক উল্লাসে একই অত্যাচারের বর্ণনা একবার একে আর একবার তাকে দিয়ে দেওয়ান, ট্রমা পর্ন বললে দোষের কিছু নেই।
ইয়ানাগিহারা কিছুই বাদ দেন না, সোলয় কিছুই বলেন না। কেউ যদি ইস্তেভানকে বলে, কেঁদো না, পাঠক বোঝে ইস্তেভান কাঁদছে। অন্য পুরুষের মাথাভর্তি চুল দেখে ইস্তেভান ঈর্ষার সামান্য কামড় খেলে পাঠক আন্দাজ করে ইস্তেভানের টাক পড়ে যাচ্ছে বোধহয় ।
এই সব হাবিজাবি এড়িয়ে যাওয়ার সংযম দেখাতে পারা একরকম। কিন্তু বড় বড় ঘটনা? জীবনের মাইলস্টোন? সোলয় সেখানেও সংযমী। অ্যাকচুয়ালি, প্যারানয়েড। পাছে পাঠক ইস্তেভানের মনের ভেতর উঁকি দিয়ে ফেলে। ইস্তেভান জুভেনাইল ডিটেনশন সেন্টারে নির্বাসিত হয়, ডেভিড সোলয় দেড় পাতা খালি ছাড়েন। ইস্তেভান হাংগেরিয়ান আর্মির হয়ে ইরাক যুদ্ধে যায়, সোলয় সিগারেট খেতে ওঠেন। আড়াই পাতা - ফ্যাটফেটে ফাঁকা। ইস্তেভানের সন্তান জন্মায়। সোলয় সেদিনের মতো ল্যাপটপ বন্ধ করে আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলে শুতে যান।
ফিরে আসেন যখন ইস্তেভান জেল থেকে ফিরে এসেছে, যুদ্ধ থেমে গেছে ইস্তেভানের ছেলে বড় হয়ে গেছে।
*
পাঠক হাঁ। ওইখানেই কি আসল খেলা দেখানোর সুযোগ ছিল না? শো, ডোন্ট টেল-এর হদ্দমুদ্দ করে যুদ্ধের বিভীষিকা, সন্তান জন্মের পরিপূর্ণতা, জেলের নারকীয়তা আঁতিপাতি মেলে পাঠকের হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে অনুভূতির স্রোত বওয়ানোর প্রলোভন কোনও সেলফ-রেসপেক্টিং লেখক অতিক্রম করে কী করে?
ডেভিড সোলয়ের মাথায় কী চলছিল জানি না, হয়তো তিনি ভাবছিলেন সারাদিন যুদ্ধের খবর লুপে চালিয়ে বসে আছে যারা, সোশ্যাল মিডিয়ায় গর্ভসঞ্চার থেকে লিঙ্গপরিচয় উন্মোচনের পার্টি থেকে জন্মমুহূর্তের ক্লোজ আপ প্রত্যক্ষ করছে, তাদের বানান করে এসব বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার নেই।
এও হতে পারে, ডেভিড সোলয় পাঠককে নিজের থেকে বেশি বিশ্বাস করেন। নিজের কল্পনা খাটাতে দেন। হতেই পারে তাছাড়া ভাবতে ভাবতে পাঠক হয়তো ইস্তেভানের দুঃখ এত বেশি কল্পনা করে ফেলল, যা সোলয় ভাষায় প্রকাশ উঠতে পারতেন না।
ইয়ানাগিহারাকে কন্ট্রোল ফ্রিক দাগিয়ে দেওয়া যায়। বা লিটল লাইফ-কে ট্রমা পর্ন। হয়তো ইয়ানাগিহারার অন্য একটা উদ্দেশ্য আছে। পরিযায়ী শ্রমিককে দিয়ে থুতু চাটানোর রিল দেখে মুড খারাপ হতে শুরু করলেই বুড়ো আঙুল ঠেলে রসুনভর্তার রেসিপিতে চলে গেলাম - মানি প্ল্যান্টের ফাঁক দিয়ে শুকনো লংকা চটকানো দেখছি অল্প হাঁ মুখে - ইয়ানাগিহারা হয়তো আমাদের এই পলায়নপরতার বিলাসিতা অ্যালাউ করতে চান না। মেবি ইয়ানাগিহারার সাড়ে সাতশো পাতার উপন্যাস আসলে উপন্যাসের ভেকে “মর্যাল অ্যাটেনশন”-এর বুটক্যাম্প। যে ক্যাম্পের লক্ষ্য পাঠককে আরামের অ্যামনেশিয়া ছিঁড়ে বার করে আনা। দিনভর ঘুরে ঘুরে বাজেট বুঝে ট্র্যাজেডিশপিং-এর ভুত ঝাড়ানো। ইয়ানাগিহারা হয়তো সুস্যান সনট্যাগের সঙ্গে ঝাণ্ডা উড়িয়ে একমত। “গ্র্যাচুইটাস ভায়োলেন্স” বলে কিছু হয় না। সহমানবের ক্লেশ, ফিল্টার ছাড়া প্রত্যক্ষ করার ক্ষমতা নৈতিক প্রাপ্তবয়স্কতা অর্জনের লক্ষণ। অত্যাচারিতের ডিগনিটির প্রতি ন্যূনতম স্বীকৃতিজ্ঞাপন। আমি তাকিয়ে থাকলে অত্যাচারিতের কষ্ট কম হবে না ঠিকই, কিন্তু চোখ সরিয়ে নিলে নিশ্চিত বেইমানি হবে।
ডেভিড সোলয়ের জগত হয়ত পোস্ট-স্ট্রাকচারালিস্ট। যেখানে শব্দ অর্থের বাইনারি ভঙ্গ হয়েছে। অর্থ আপাতত শব্দের জেলখানা থেকে বেরিয়ে অস্থির, বহমান ও সদা-পরিবর্তনশীল। এ পরিস্থিতিতে ভাষার ওপর কতখানি ভরসা রাখতে পারেন সোলয়? হতে পারে তিনি রোল্যাঁ বার্থের সঙ্গে একমত, ঈশ্বরের সঙ্গে সঙ্গে লেখকও মরেছেন। ড্রাফট রেখে। সেই ড্রাফট রংচঙে মলাটবন্দী হয়ে পাঠকের হাতে হাতে পৌঁছবে, তারপর পাঠকের পাঠ ও ভাষ্য দিয়ে বই হয়ে উঠবে। একাকী লেখকের নহে তো লেখা, মিলিতে হবে দুইজনে।
ইস্তেভানের আউটলাইন এঁকে, পাতা ফাঁকা রেখে সোলয় উঠে গেলেন ওই ফাঁক আসলে আমাদের জন্য। আমার জন্য। আমি এবার আমার অভিজ্ঞতা, কল্পনা, দৃষ্টি, উপলব্ধি ও অনুভূতির রংপেনসিল ঘষে ইস্তেভানকে তৈরি করব।
লিটল লাইফ-এর সাড়ে সাতশো পাতার আশ্চর্য যাত্রা পেরিয়ে জুডকে চেনার আর কিছু বাকি থাকে না। সাড়ে তিনশো পাতার ফ্লেশ শেষ করে ইস্তেভানও - আমার অর্চিষ্মানের আপনার হাতে গড়া ইস্তেভান - দেদীপ্যমান হয়ে ওঠে।
*
শেষমেশ সবই ব্যক্তিগত পছন্দ। ব্যক্তিগত পছন্দও আকাশ থেকে পড়ে না, বীরবল না নাসিরুদ্দিনের চুটকির মতো, যার যেটা নেই তার সেটা বেশি দামি মনে হয়। নিজে বাড়িয়ে বলি বলে কমিয়ে বলার সাহস যারা দেখাতে পারেন তাদের এক্সট্রা সম্মান করি। আমার গল্প বলতে বসলে এশিয়ান পেন্টসের ডিব্বা কম পড়ে যায় বলে, যা ঘটেছে যেটুকু ঘটেছে - আন্ডারলাইন, বোল্ড, ইট্যালিকস, ছাড় টাইমস রোমান বারো ফন্টে যারা লিখে দিতে পারে - তাদের হিংসে হয়।
সোজন জেল খেটে বেরিয়েছে, দুলিকে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে ঠিক ঘাটে এসে ভিড়েছে। দুলি সোজনকে চিনতে পেরেছে।
কেউ কথা বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এক সেকেন্ড, দু'সেকেন্ড, তিন চার পাঁচ সেকেন্ড না। ততক্ষণের, যতক্ণে পাঠক বুঝতে পারে এ নীরবতা অ্যাকসিডেন্টাল নয়। এ নীরবতা ডায়লগ ভুলে যাওয়ার উশখুশহীন।
এর আগে কত কথা বলেছে দুলি, আকাশবাতাসকে সাক্ষী রেখে। সোজনকে না পেলে দুলির কী হবে, দুলিকে না পেলে সোজনের কী হবে, একে অপরকে না পেলে দুজনের কী হবে, দুজনের প্রেম কত গভীর কত খাঁটি কত অথেনটিক বানান করে করে বুঝিয়েছে।
এখন আর কিছুই বলার নেই। মহাকাল ঘনিয়েছে। যা যাওয়ার তা গেছে। কে স্বার্থপর কে বোকা-র হিসেব তামাদি হয়ে গেছে। কে অ্যাংশাস কে অ্যাভয়েডেন্ট তাও অবান্তর। মাঝখানের কয়েকটা বছর, যেন কয়েকটা জন্ম। জীবনের একমাত্র দায় বেঁচে থাকার, সে তাই করেছে। স্বার্থপরতা, অসহায়তা, প্রেম, বিচ্ছেদ, স্মৃতি, বিস্মরণ পার হয়ে এই টুকরো কুড়িয়ে মুভ অন করেছে।
এখন দুটো নতুন, ভাঙাচোরা মানুষ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। অর্থ মৃত, ভাষা ভাঙা। সেই সুযোগে সাদা পাতায় অবয়ব ফুটে উঠছে। সংলাপহীনতায় সত্যি প্রকট হয়ে উঠছে। প্রেম বিরহ শোক দুঃখের পালা শেষ। আর কিছু বাকি নেই। মরে যাওয়া ছাড়া।
*
চন্দ্রিল ভট্টাচার্যের ওই কথাটাতেই ফেরত আসতে হয়। শিল্পের ভালোমন্দ চাঁচাছোলা বা আলপনার নয়। ব্যাপারটা সত্যি বা মিথ্যের। কীভাবে বলছি-র থেকেও যেটা বলছি সেটা কতটা সত্যের কাছাকাছি যেতে পারছে সেটা ম্যাটার করে বেশি।
কার সত্যি, কবেকার সত্যি সে প্যাঁচালে পড়ার পরিসর এটা নয়, আমার ক্ষমতাও নেই।
বাবার একশো টাকা দিলেও পনীর না খাওয়ার ঘোষণায় চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার মতো হাসির চোটে চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হল পেল কারণ বাবা সত্যি বলেছেন। এক কোটি বললে ব্যাপারটা মিথ্যের টেরিটরিতে ঢুকে পড়ত। একশো টাকা দিলে বাবা পনীর খাবেন না। একশো হাজার দিলে? নো স্ট্রিংস অ্যাটাচড, নো ফাইন প্রিন্ট - একপিস পনীর খাও আর একশো হাজার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢোকাও?
আমি দেড়শো পারসেন্ট শিওর, বাবা খেয়ে নেবেন। কারণ বাবা প্রেজুডিসড, পাগল নন।
আমিও নই। বিশ্বাসযোগ্যতার এশিয়ান পেন্টস চড়াতে চড়াতে সত্যি মিথ্যেতে গিয়ে ঠেকবে ঠেকবে করছিল। ফিরিয়ে আনছি। একশো টাকা দিলে বঙ্গসম্মেলনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষির প্রস্তাব এক মিনিটে ঠুকরে দেব, এক কোটি দিলে? সম্মেলনের প্যান্ডেলের সব বাঁশ একা ঘাড়ে বয়ে দেব বটেক।
রোদ্দুর রায়ের কেসে, ওয়েল . . .
Comments
Post a Comment