লেস
আগরওয়ালজির গুমটির পাশে দাঁড়িয়ে ব্রেক নিচ্ছিলাম। অর্চিষ্মানও ছিল। র এগোল। গাইজ, আই নিড অ্যাডভাইস।
র-এর আবির্ভাব আকস্মিক কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয়। অনেকদিন আগে আমাকে বলে রেখেছিল। ওর জীবনে নাকি একটা সমস্যার উদ্ভব হয়েছে যেটা সমাধানের জন্য বুড়ো লোক দরকার। আমার ফ্রেন্ড সার্কেলে বুড়ো বলতে তোমার কথাই মনে পড়ল, কাজেই। এনি ডে এনি টাইম বলে টাইপে ফেরত গিয়েছিলাম। র-এর দ্বিধা নিয়ে দ্বন্দ্ব বোধ করিনি। পঁচিশ বছরের চলিয়েবলিয়ে ভালো দেখতে ছেলের জীবনে দ্বিধার বৈচিত্র্য থাকে না।
র কনফার্ম করল। রিমেমবার, ওয়ান্স আই হিন্টেড ইউ ...
রিমেমবার, রিমেমবার।
র-এর জীবনে দুই রোম্যান্টিক সম্ভাবনার আগমন হয়েছে। একজন মনে করে জীবন একটা কিছু হয়ে ওঠার। নিজে হয়ে ওঠার এবং আশেপাশের লোককে হইয়ে ওঠানোর। র-কেও ক্রমাগত উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত করে। একদিন জিম বাদ পড়লে মোটিভেশনাল রিল পাঠায়।
দ্বিতীয়জন মনে করে দুজনে মিলে মোটা হওয়াই ট্রু লাভ।
র-এর দুজনকেই পছন্দ। র কনফিউজড বিয়ের জন্য কোন জন বেশি উপযোগী হবে। অভিজ্ঞ বিবাহিত হিসেবে আমাদের ভোট নিতে এসেছে।
ব্যাপার শুনে আমাদের পিলে কতটা চমকাল, চমকানির কতটা প্রকাশ করলাম কতটা গিললাম, গিলে দুজনে মিলে কী কী উপদেশ দিলাম - ডিটেলে যাচ্ছি না। ওভারআর্চিং যেটা বলেছিলাম দুজনেই - অত ভেবো না। অত ভাবার কিছু নেই। যাকে একটু হলেও বেশি ভালো লাগছে তাকে ধরে ঝুলে পড়। এই ভাষায় বলিনি, এই ফিলিংটা দিয়েছিলাম।
র চোখ গোল করেছিল। নেহি নেহি সোচনা তো পড়েগা। ওয়ারেন বাফেট নাকি ইউটিউব রিলে বলেছেন (অন্য কেউও হতে পারেন, আমি সবসময় এক বড়লোকের সঙ্গে অন্য বড়লোক গুলিয়ে ফেলি) শাদি হচ্ছে দা সিংগলমোস্ট ইম্পরট্যান্ট ডিসিশন অফ ইয়োর লাইফ। আট বিলিয়ন লোকের মধ্যে সোলমেট খুঁজে বার করতে হবে। দা ওয়ান। দা ওনলি ওয়ান। দা ওনলিয়েস্ট ওনলি ওয়ান। বেটার হাফ। পার্টনার ইন ক্রাইম। যাকে সমস্ত পেটের কথা বলতে হবে। ফোনের পাসওয়ার্ড দিয়ে রাখতে হবে। কোথায় যাচ্ছি, কী খাচ্ছি, রক্তে অক্সিজেনের আওয়ারলি পূর্বাভাস। কারণ সে-ই থাকবে সংকটে ও সম্পদে। থিকে ও থিনে। হেলথে অ্যান্ড সিকনেসে। টিল ডেথ। আর সে রকম যদি একবার খুঁজে পাওয়া যায়, অথেনটিসিটির চাষ। আমি এক্স্যাক্টলি যেমন, তেমন থাকতে পারব। কান্না পেলে চেঁচিয়ে কাঁদব, কথা বলতে বিরক্ত লাগলে তিনদিন সাইন ল্যাংগোয়েজ। আমার ওয়ার্স্ট পসিবল বিহেভিয়ারে সে আমাকে গ্ল্যাডলি অ্যাকসেপ্ট করবে। সে এবং তার বিগতআগত আঠাশ পুরুষ। খেতে বসলে মুখ বন্ধ করে চিবোতে হবে না, হাঁচার সময় মুখ ঢাকতে হবে না। তেমন খাপে খাপ বাছতে পারলে বাথরুমের দরজাও বন্ধ করার দরকার হয় না শুনেছি।
র বলল, কাজেই বুঝেছ, ইউ লিটারেলি কান্ট ওভারথিংক দিস।
*
আমাদের মাথাও এ রকমই চলত নাকি গো?
খুব অন্যরকম চলা তো সম্ভব নয়।
তাও ঠিক।
সত্যি সত্যি দুঃখ হল। বেচারা। কী নাচছে তো জানে না। ভাবছে জীবনসমুদ্রে নিশ্ছিদ্র নৌকো নিয়ে নামবে, ভাসতে ভাসতেও যে নৌকো ফুটো হতে পারে - হবেই - সে সম্ভাবনার কথা মাথাতে আনছে না।
ওই বয়সে বোঝা সম্ভবও না। কারণ ও জানে না এত বেঁধেছেঁদে যাকে ও বিয়ে করবে সে পাঁচ বছর পরে আজকের লোকটা থাকবে না। ও নিজেও সম্পূর্ণ অন্য একটা লোকে পরিণত হবে।
*
অনেক বছর আগে তারা বাংলা টাইপের চ্যানেলে একটা অনুষ্ঠান হত, 'তর্কে বহুদূর' শিরোনামে সম্ভবতঃ। অনুষ্ঠানে আরও অনেক কিছু হত নিশ্চয়, সঙ্গে কার্টুনের সঙ্গে ভয়েসওভারে চালাক চালাক কথা বলা হত।
হেয় করছি না। বোকা বোকা কথা বলার থেকে চালাক চালাক কথা বলা বেটার। যে সব কথা শুনলে আমার মতো লোকেরা ভাবে উফ কী দিল, কিন্তু আমার থেকে বুদ্ধিমানেরা ধরে ফেলে যে কথাটার আসলে কোনও মানে নেই। বা যে মানেটা দাঁড়াচ্ছে তাতে অসংখ্য ছিদ্র।
এক এপিসোডে সে রকম একটা বাক্য শুনেছিলাম। সময় ডোবে না, সময় ডোবায়। স্ক্রিনে অ্যানিমেশনে বিগ বেন ঢেউয়ে ডুবে যাচ্ছিল। বা যাচ্ছিল না। না হলে আর প্রতিপাদ্য সত্যি হবে কী করে।
সময় কী করে সে নিয়ে আজকাল মাঝে মাঝে ভাবি। অনেকটা সময় চলে গেছে বলে। আর বেশি বাকি নেই বলেও। যত ভাবা দরকার তত ভাবতে পারি না, কারণ সময়কে চোখে দেখতে পাই না। অদর্শন দীর্ঘ হলে ভাবনাও ফিকে হয়ে আসে।
*
সময় দেখতে পাই না কিন্তু কী কী ডুবিয়েছে সে তো স্পষ্ট দেখি। কাকে কাকে। প্রথম ডিনার ডেটে অর্চিষ্মানকে ইমপ্রেস করতে ব্যাংভাজা অর্ডার করেছিলাম, সেই আমি আট বছর হল মাছমাংস ছেড়ে বসে আছি। মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর আতংকে যে অর্চিষ্মান কলকাতায় শান্তিতে ফুচকা খেতে পারত না, এখন রেগুলারলি মহিলা সহকর্মীদের সঙ্গে বোলিং করতে যাচ্ছে। দু'নম্বরে পঁচিশজন মহিলার মাঝে দর্পিত লাইটহাউস হয়ে দাদাকে বলছে, আমারটায় ঝাল দেবেন। দু'প্লেট সেরে কনুই মেরে জিজ্ঞাসা করছে, আর এক প্লেট নিয়ে হাফ হাফ খাবে?
এগুলোকে যদি পারসোন্যাল গ্রোথ বলে ধরেও নিই, যুগ্ম জীবনটাও ভোল পালটেছে। সংগীত বাংলায় পাগলু টু-র গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে রেডি হত যে দুটো লোক তারা মরে ভুত। মেট্রোতে কোঅর্ডিনেট করতে গিয়ে এ এই দরজা দিয়ে নেমে ও ওই দরজা দিয়ে উঠে জহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে দৌড়োদৌড়ি করত যে দু'জন তারাও হওয়া। তার বদলে যারা আমাদের বাড়িতে, আমাদের নামে, আমাদের প্যান কার্ড পাসপোর্ট আধার নিয়ে বাস করছে, আমার বন্যতম স্বপ্নে আমি তাদের কল্পনা করিনি।
বা যা হয়েছে সেটাই হওয়ার কথা ছিল অল অ্যালং। আমি ছাগল বলে ভুলভাল জল মেপেছিলাম। কারণ এখনও আচমকা একএকটা সুতো হাতে চলে আসে যা টানতে শুরু করলে অনেক বছর আগে পৌঁছনো যায়। সেই গোড়ার লোকদুটোতে। ব্যাংভাজা পর্যন্ত নয়, কিন্তু রেস্টোর্যান্ট থেকে বেরিয়ে, নাকি তার পরের রাতে, সিনেমা দেখে বেরিয়ে গিজগিজে নির্ঘুম শহরের রাস্তায় হাঁটছে যে দু'জন।
দু'হাজার দশের ফেব্রুয়ারির রাত বদলে দু'হাজার ছাব্বিশের মে মাস হয়ে গেছে। আমার মাথায় আর গুনে গুনে ছাব্বিশটা চুল পাকতে বাকি। অর্চিষ্মান এখনও রাত জাগে। আমি এখনও তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ি। আমাদের অধুনা শহরও আমারই মতো, দশটা বাজতে না বাজতে হাই তুলে ঝাঁপ ফেলে। তবু আমরা চান্স পেলেই রাতবিরেতে সেই ঘুমন্ত শহরের এদিকসেদিক ঢুঁ মেরে বেড়াই।
*
রাত হলে সব অন্যরকম হয়ে যায়। কোনও কোনও রাতে বেশি অন্যরকম। মালচা মার্গের আমোর বিস্ত্রো - যখনই যাই ভালো লাগে বলে ঘন ঘন যাই। সকালে যাই, সকাল দুপুরের মাঝে যাই, সন্ধেয় যাই, সন্ধে রাতে, রাতে। সেদিন বেশি রাত হয়ে গিয়েছিল। কাচের জানালার গা বেয়ে টু-সিটার টেবিলগুলোর তিন নম্বরে বসেছিলাম। আমাদের ফেভারিট। একে একে দোকান ফাঁকা হয়ে গেল। একটা কিছু ছিল, আমোরের জানালার কাঁচ বেয়ে টুনি বাল্ব জ্বালিয়েছিল। বসে বসে টুনি বাল্বদের দুলুনি দেখছিলাম। গাছগুলোও মাথা নাড়ছিল। ঝাঁপ ফেলে দেওয়া দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে দুলুনির দাপট টের পেলাম। মালচা মার্গের আম জাম নিম তেঁতুলের পাতা বর্শার স্পিডে উড়ে এসে নাকেমুখে বিঁধে যাচ্ছিল।
ওই ঝড়ের মধ্যে উবার পেলেই অদ্ভুত হত। যারা অ্যাকসেপ্ট করছিল, ক্যান্সেল করে দিচ্ছিল। আধঘণ্টা ধরে ওই ঝড়ে মালচা মার্গের এ মোড় থেকে ও মোড় দৌড়োদৌড়ি করেছিলাম। একটুও ভয় লাগছিল না। দাঁড় করানো জিপের জানালায় কনুই রেখে একজন পুলিস হেউ মুখে ফোন দেখছিলেন। কিছু না পেলে পুলিসকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতে বলতাম।
আর এক রাতে ফোর এস থেকে বেরিয়েছিলাম। আলো-নেভা কিওস্কে পণ্ডিতজির ছায়া নড়ছিলচড়ছিল। গুলকন্দের ডিব্বা আর গুটকার প্যাকেট কার্টনে পুরছিল। আমরা দৌড়লাম, আশপাশ থেকে আরও ছায়ারা দৌড়ল। সিংগল যুগল মিলিয়ে ছ'সাতটা ছায়া পণ্ডিতজিকে ঘিরে ধরল।
এক ছায়ার ফোনের ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় পণ্ডিতজি পান বানালেন। মশলা অর্ধেক প্যাক হয়ে গেছে, কোই নহি, যা আছে তাই দিয়েই তোফা হবে। সিগারেটও সারি অন্দর চলি গয়ি, কোই নহি, যা যা বাইরে আছে তার থেকেই দিন। একটা ছেলে, ভিড়ের মধ্যে সব থেকে ছোট বা ছোটর দিকে, বলল মেরা ট্রিট, বলে কারও কোনও কথা না শুনে রাত একটার সময় পাঁচটা র্যান্ডম লোককে পানসিগারেট খাইয়ে দিল।
দিল্লি শহরে দুপুর একটার সময় এই ঘটনা ঘটলে আমি আমার নাম বদলে ফেলব।
*
অর্চিষ্মানের সঙ্গে মাচুপিচুর মাথায় পাশাপাশি দাঁড়াব ভেবেছিলাম। এখনও ভাবি। এডিনবরার বিষণ্ণ সিঁড়িতে হাঁপাব, সেন্ট মেরি মিড টাইপের কোনও একটা গ্রামের চার্চসংলগ্ন ছোট বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ভাবব, এই ভিকারেজের স্টাডির টেবিলে হয়তো গুলি খেয়ে কেউ পড়ে ছিল। হতেও তো পারে?
হয়নি। সন্দেহ চাড়া দিচ্ছে হয়তো কোনওদিন হবে না। কারণ আমার কল্পনাশক্তি অসম্ভব খারাপ। কী কী হওয়া সম্ভব সেটা আমি মাপতেই পারিনি। খেয়ালি চাউমিনে প্রাণভরে আজিনামোটো ছিটিয়েছি। তলিয়ে ভেবে দেখলে হয়তো দেখতে পেতাম, কল্পনাগুলোর কপোলতার ডিগ্রি কী সাংঘাতিক।
তাহলে অর্চিষ্মানের ইচ্ছেগুলো পূরণ হল না কেন? অর্চিষ্মান তো তলিয়ে ভেবেছে। তলিয়ে ভাবার আর এক নাম অর্চিষ্মান। অর্চিষ্মানের আর এক নাম তলিয়ে ভাবা। অর্চিষ্মান গত ষোল বছর ধরে বলছে অন্নপূর্ণা বেস ক্যাম্পে গেলে হয়।
হয়নি।
এই জায়গায় এসে বুক কেঁপে যায়। ষোল বছরে যে অর্চিষ্মানের ইচ্ছে পূরণ হল না তার পেছনে কি আমার অবদান নেই? অন্য কারও সঙ্গে বিয়ে হলে, যেমন ধরা যাক ওই মহিলা, রোজ ব্লু টোকাই আসার পথে কোমরের স্ট্র্যাপে জলের বোতল কবজিতে ফিটবিট বেঁধে যিনি দৌড়ন শীতগ্রীষ্মবর্ষা একদিনও বাদ দেন না, তার সঙ্গে বিয়ে হলে অর্চিষ্মান অন্নপূর্ণা কেন, এতদিনে শিওর এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে পৌঁছে গেছে।
সে জন্যই বোধহয় অর্চিষ্মান অপশন দেয়নি। যেদিন এসে বলল, কুন্তলা স্প্যানিশ শিখবে? তার পরের দিন অফিস থেকে বেরিয়ে অ্যাডমিশনের লাস্ট ডেটে হনুমান মার্গের ইন্সটিটিউটো সেরভানতাসে লাইন দিয়ে দুজনের নাম লিখিয়ে ফেলল। ফোন করে বলল, সবাই যা বাচ্চা যদি দেখতে।
গত দু'মাস শনিরবি, একটা থেকে চারটে, একক্লাস শিশুপরিবৃত হয়ে আমি আর অর্চিষ্মান এসপানিওল শিখছি। উনো দোস ত্রেস কুয়ার্তো সিনকো। নসস্ত্রোস ভসস্ত্রোস। এল লা লস লাস উন উনা উনোস উনাস। লোকে ক্লাসমেট থেকে বরবউ হয়, আমরা বরবউ থেকে ক্লাসমেট। একটাই টেক্সটবই কিনে দুজনে টানাটানি করে পড়ছি। জিভ বার করে হোমওয়ার্ক করছি। একে অপরকে পড়া ধরছি। একটা পরীক্ষাও দিয়ে ফেলেছি। পরীক্ষায় আমার থেকে একনম্বর বেশি পেয়ে অর্চিষ্মান যা করছে, আমি করলে কম্পিটিটিভ, ইগোটিস্টিক ইত্যাদি বিশেষণে কান পাতা যেত না।
এখন সকালে আমাদের টিভিতে গুয়ান্তানামেরা চলে। এনরিকে ইগলেসিয়াস ফের এন্ট্রি নিয়েছেন। বাইলামোস মানে এতদিনে পরিষ্কার হয়েছে। বাইলার মানে হচ্ছে টু ডান্স। '-আর' অন্ত ক্রিয়াপদ। ধাতুরূপ বাইলো, বাইলাস, বাইলা, বাইলামোস, বাইলাইস, বাইলান। বাইলামোস হচ্ছে বাইলারের নসস্ত্রোস-এর (বাংলার উত্তম পুরুষ সর্বনামের বহুবচন, বেসিক্যালি 'আমরা') ধাতুরূপ।
লা বাম্বা আর লা কুকারেচা-ও রোটেশনে চলে। লা বাম্বা হচ্ছে পার্টিসংগীত। লা কুকারেচা, বোঝাই যাচ্ছে একটি আরশোলার জীবনগাথা। রোজ - তোদোস লোস দিয়াস - লা বাম্বা নয় লা কুকারেচা নয় বাইলামোস নয় গুয়ান্তানামেরা চালিয়ে আমরা রেডি হই। চেঁচিয়ে গলা ছাড়ি তেমন ফুর্তিতে থাকলে হাতপাও নাড়ি। বলাবলি করি বি-লেভেল পাস করলে বার্সিলোনা যাবে?
*
এই সবের মধ্যে একদিন একটা উদযাপনের ছুতো এল। ফোর এস-এ জায়গা না পেয়ে পাশের একটা বারে গেলাম। নাম ভুলে গেছি। বেরোলাম যখন এগারোটা বেজে গেছে কিন্তু কারওরই বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে নেই।
অর্চিষ্মান বলল, এক জায়গায় যাবে? সজ্ঞানে ভয়ংকর খারাপ লাগত কিন্তু এই পরিস্থিতিতে সহনীয় হতেও পারে। ও নাকি কোন কোলিগের সঙ্গে আগের সপ্তাহে গেছিল।
উবার ডেকে চলে গেলাম কনট প্লেস। নোংরা অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উঠে ময়দান সাইজের বার। লাইভ গীতবাদ্য চলছে। অন্ততঃ সত্তর জন মানুষ যাদের গড় হাইট ছ'ফুট আর গড় ওয়েট নব্বই কেজি, জোড়াপায়ে ধাঁই ধাঁই লাফাচ্ছে।
কোণের টেবিল বেছে বসলাম। 'বারি বরসি খট্ন গিয়া সি' কণ্ঠায়, বুকে ধাক্কা মারতে লাগল। অর্চিষ্মান বলল, ভালো না? আমি বললাম, মচৎকার।
*
র-এর সঙ্গে দেখা হয় প্রায় রোজই। দাড়ি রেখেছে। দুটোর মধ্যে কোনটা কাটল, মোটা নাকি মোটিভেশনাল, নাকি দুটোই? নাকি নতুন কেউ এল যার দাড়িওয়ালা লুক পছন্দ? মুখে হাই হ্যালো করি। মনে মনে বলি, অত ভেবো না। মনে রেখো, জীবন আর সংসারের সাফিক্স যে সমুদ্র্ সেটা র্যান্ডম নয়। কেউ যে বলে না সংসারডোবায় নেমে পড়েছি বা জীবনপুকুরে সাঁতার কেটে কেটে হাঁপিয়ে গেলাম - কারণ আছে। ক্লিশে এমনি এমনি ক্লিশে হয় না। জীবন, সংসার, বিয়ে - পাড়ার পুকুর নয় যে নামার আগেই ওই পার দেখতে পাবে। সাঁতারের শেষে কূলে ভেড়ার গ্যারান্টি নেই। যদি কেউ দিয়ে থাকে গুল দিচ্ছে।
ঘাবড়ানোর কিছু নেই। সাঁতরাতে থাকো। পার নেই। কিন্তু চর আছে। সাঁতরাতে সাঁতরাতে ক্লান্ত হলে সেগুলোতে জিরোতে পার। সে চরেদের প্রতিটির জলবায়ু আলাদা, মুড আলাদা। একটায় চৌরাশিটা নরকের কুণ্ড গনগন জ্বলছে তো অন্যটা ইডেন গার্ডেন। হামিন আস্তো হামিন আস্তো হামিন আস্তো বলতে না বলতে চর গুবগাব ডুবতে শুরু করবে।
ঝাঁপ মারো। সাঁতরাও সাঁতরাও সাঁতরাও।
সিগে নাদান্দো। সিগে নাদান্দো। কে সেরা সেরা।
*
আমরাও সাঁতরাচ্ছি। এই চর থেকে ওই চর। দূরে টুনি বাল্ব জ্বালা চরেরা ঢেউয়ের মাথায় দুলছে। কে জানে কারা থাকে ওই সব চরে। হয়তো সেই সব কুন্তলা ও অর্চিষ্মানেরা, আমরা একে অপরের সঙ্গে সাঁতরে গেলাম বলে যারা নিজেদের মনের মতো হয়ে উঠতে পারল না। ওদের মধ্যে কোনও একটা চরে হয়তো অর্চিষ্মান কোমরে ইলেকট্রোলাইট গুঁজে একদৌড়ে অন্নপূর্ণায় চড়ছে।
সময় ডোবাবে। ডোবাবেই। গ্যারান্টি। কিন্তু সময়কে সময় দিলে আবার নতুন কিছু এনে হাজির করতেও পারে। সাবস্টিটিউট নয়, সান্ত্বনা নয়, সম্পূর্ণ র্যান্ডম কিছু। নাকের বদলে নরুন। লে পাগলু ডান্স-এর বদলে লে কুকারেচা। অন্নপূর্ণার বদলে... হোপফুলি এমন কিছু যাতে সাঁতার চালিয়ে যাওয়া যায়।
জানি, এই নতুন কিছুর গ্যারান্টি নেই। আসতেও পারে, না এলেও নালিশ নেই কোন। আর কিছু পাই না পাই, নালিশ করলে বালিশ ছাড়া কিছু জুটবে না সে জানি।
*
নোংরা, অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে দেখলাম কনট প্লেস আরও ফাঁকা হয়ে গেছে। আশেপাশে যাঁরা ঘোরাঘুরি করছিলেন তাঁরা দেখতেশুনতে মানুষের মতোই আবার অল্প অল্প দেবতার ছায়াও আছে। হয় রাতেই বেরোন নয়তো সারাদিন ক্যামোফ্লেজে পৃথিবীর বুকে হেঁটেচলে বেড়ান। কিছু অটো ইতিউতি দাঁড়িয়ে। রেডিয়াল রোড জুড়ে পোলকা ডটের মতো সাদা কালো বাদামি ঘুমন্ত কুকুর। তাদের প্রতি আমাদের ইন্টারেস্ট বুঝে নিকটবর্তী অটোভাইসাব বললেন, মেরে অটো কে অন্দর ভি সো রহা হ্যায়, দেখো। সত্যিই একটা কুকুর অটোর মেঝেতে গোল্লা পাকিয়ে ঘুমোচ্ছে।
অর্চিষ্মান বলল, হাঁটি চল।
চললাম। পূর্ণিমা ছিল। উঁহু, দু'দিন আগে চলে গেছিল। অল্প টোল খাওয়া চাঁদের আলো, উঁচু উঁচু সাদা বাড়িদের সাদা থামেদের শরীরে ঠাণ্ডা আগুনের মতো জ্বলছিল। কনট সার্কল আমাদের ঘিরে প্রসারিত হচ্ছিল। শীতল উদাসীন সাদা থামেদের কালো ছায়া আরও লম্বা। সেই উজ্জ্বল, উদ্ভট সাদাকালো স্বপ্নের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ক্রমশঃ ছোট হয়ে যাচ্ছিলাম।
আমাদের ঘিরে এই গোল চক্কর, থামের পর থাম, লম্বা লম্বা ছায়া - আমাকে পিরানেসিয়ান প্রিজন মনে করিয়েছল। কিন্তু পিরানেসির জেলখানা তো নোংরা, কালো, ঘুপচি। এই জ্যোৎস্নার জেলখানার সঙ্গে বরং অন্য এক পিরানেসির জেলখানার মিল আছে। সুসানা ক্লার্কের দু'হাজার কুড়ির উপন্যাসের নায়ক পিরানেসি। এই আধুনিক পিরানেসিও থাকে এক জেলখানায় যাকে ও 'হাউস' বলে। উন্মুক্ত, উজ্জ্বল সে হাউসে পিরানেসি একমাত্র বন্দী। হাউস ঘিরে অনন্ত সমুদ্র। সে সমুদ্রের শোঁ শোঁ শুনতে শুনতে পিরানেসি হাউসের ঘর থেকে ঘরে ঘুরে বেড়ায়।
উবার ডাকা হল। অটোর নম্বর জেনে নিয়ে চশমার ওপর হাতের পাতার সানসেট করে মোড়ের দিকে তাকিয়ে থাকলাম - সংসদ বা খড়ক সিং-এর মধ্যে কোনও একটা - যেদিক থেকে অটো আসবে। অর্চিষ্মান কী সব বলছিল, আমি ঠোঁটে হাত রেখে শশশ্ করলাম। যা অন্ধকার, কনসেনট্রেট না করলে মিস হয়ে যাবে।
অর্চিষ্মান বলল, কুন্তলা এখন যে অটো আসবে, যদি আসে অ্যাট অল, আমাদের জন্যই আসবে। তোমাকে অত কনসেন্ট্রেট করতে হবে না।
শুনে আমার এত হাসি পেল, এত হাসি পেল যে হাসির চোটে বেঁকে গেলাম। অর্চিষ্মান বলল, বস্, এত হাসির কিছু বলা হয়নি।
জানি হয়নি। কিন্ত রাতবিরেতে টোটোর মতো আর একটা সুতোও সেই শুরুর দিন থেকে ছেঁড়েনি। কত রসিকপ্রবরের কত হাসির কথা শুনলাম কিন্তু অর্চিষ্মানের হাসির কথায় - যা অর্চিষ্মান দাবি করে আদৌ হাসির নয় কারণ আমার ধারণা হাসির কথা বলাকে অর্চিষ্মান মনে মনে নিচু চোখে দেখে - আমার যত হাসি পেয়েছে, এখনও দিবারাত্র সকালবিকেল পায়, আর কারও কোনও হাসির কথায় তত পায় না।
কাজেই আমি হাসতে থাকলাম। হাসতে হাসতে টের পেলাম জ্যোৎস্নাসমুদ্রে জোয়ার এসেছে। ঢেউয়ের ধাক্কায় কনট সার্কেল, যাবতীয় মার্গ ও রোডেদের নোঙর ছিঁড়ে ভাসছে। পালিকা বাজার ভাসছে। জাতীয় পতাকা ভাসছে। অটোরা ভাসছে। ঘুমন্ত কুকুরেরা ভাসছে।
আমরাও ভাসছি। আমি আর অর্চিষ্মান। ক্ষয়াচাঁদের অলৌকিক জ্যোৎস্নার সমুদ্রে ভেসে ওঠা চরে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ভাসছি। আমি ভাসতে ভাসতে হেসে গড়াচ্ছি, অর্চিষ্মান ভাসতে ভাসতে আমাকে দিকে তাকিয়ে হতাশ মাথা নাড়ছে।
*
ফেলিস আনিভারসারিও, অর্চিষ্মান। গ্রাসিয়াস পোর এসতাস ত্রেসে আনিয়োস মারাভিয়োসোস। ই পোর মুচোস মাস আনিয়োস খুনতোস।
চল এডিনবরা যাই।
Comments
Post a Comment