ম্যাকলিওডগঞ্জ ১
একবার আই এস বি টি পৌছনোর পথে জ্যামে দেড়ঘণ্টা ফেঁসে ভয় ধরে গেছে, সাড়ে দশটার বাস ধরতে সাড়ে ন’টায় পৌঁছে গেলাম।
চল্লিশ বা একচল্লিশ বা বেয়াল্লিশ নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে বাস ছাড়বে। অর্চিষ্মান লাইভ ট্র্যাকিং করছে। বাসটা নাকি একজায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, এগোচ্ছে না। স্বাভাবিক। আমরা আগে পৌঁছেছি কাজেই বাস দেরি করবে। এটাই জগতের নিয়ম আর জগত বেনিয়মে চলে না। অর্চিষ্মান হেউ বলে কোথায় চলে গেল। আমি বসে থাকলাম। চারপাশে ভারতবর্ষ ঢেউ খেলছে। অর্চিষ্মান এসে বলল, বাসটা এইইই জাস্ট ওখানে দাঁড়িয়ে আছে, হ্যাঁ হ্যাঁ কম্পাউন্ডের ভেতর। বলে আবার চলে গেল। আমি বসে আছি। ভারতবর্ষ ফুলছে ফাঁপছে হাসছে দৌড়চ্ছে সিট খুঁজছে ঘাম মুছছে বাঁদর বাচ্চার পিঠে গদাম করে মারছে। এক মহিলা গাইড আত্মবিশ্বাসী গলায় ফোন কানে লোক জোগাড় করছেন। ক্যান ইউ সি মি আই অ্যাম ওয়েভিং মাই হ্যান্ডস। মহিলা আমার থেকেও বেঁটে। এই কুরুক্ষেত্র পানিপথ অঞ্চলে উনি ফুল স্ট্রেচ হাত তুললে অর্ধেক জনসংখ্যার কান পর্যন্ত পৌঁছবে না। অর্চিষ্মান আসছে। বাসটা এতক্ষণ যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে খবর দিয়ে চলে যাচ্ছে। আমাদের বাসটা বাদ দিয়ে অন্য বাসেরা আসছে যাচ্ছে। একটা বলতে হবে, আই এস বি টি-তে বাস দাঁড়ায় না, আসামাত্র ছেড়ে দেয়। ব্যাংগালোর থেকে হিমালয় দেখতে আসা একজোড়া ছেলেমেয়ে সে রকম একটা বাসে উঠে চলে গেল। আমি বললাম হ্যাভ আ নাইস ট্রিপ, তারা বলল সেম টু ইউ। অর্চিষ্মান আসছে। গাইড মহিলার সমস্যা নেই অর্চিষ্মানের, অনেক দূর থেকে ওর মাথা দেখা যায়। কাছে আসতে হাতের পলিথিনটা চোখে পড়ল। একটা নাচোস একটা লে’স একটা বিংগো টেড়েমেড়ে।
যাক। খুচুরমুচুর ছাড়া রাতভর বাসে ওঠা আমি ভালো চোখে দেখি না। খুচুরমুচুর প্রসঙ্গে, রাস্তাতে কত পাওয়া যাবে, মাঝরাতে তো একবার থামবেই সেখান থেকে নিয়ে নেওয়া যাবে’খন, টাইপের সেন্সিবিলিটির প্রদর্শন যারা করে তাদের অপছন্দ করি, বসতে হলে তাদের পাশের দুটো চেয়ার ছেড়ে বসি, রাস্তায় দেখা হলে না চেনার ভঙ্গি করে চলে যাই।
তাহলে আমি নিজে সেগুলো জোগাড় করিনি কেন? এই যে কুড়ি মিনিট ধরে বসে আছি সুলভ শৌচালয়ের দিকে মুখ করে, আমার আর শৌচালয়ের মাঝে একটা বাচ্চা ছেলে যাবতীয় খুচুরমুচুরের সম্ভার নিয়ে বসে আছে, উঠে গিয়ে কিনিনি কেন? আর যদি শৌচালয়টয় নিয়ে এত নাকটেপাটিপি থাকে তাহলে বিকেলে ব্লু টোকাই থেকে ফেরার পথে কিনলেই পারতাম। লাভলিনজির দোকানের সামনে দিয়েই তো এলাম। রোজই আসি, রোজই কিনি। কারণ সংসারে রোজই কিছু না কিছু ফুরিয়ে যায়। আজ মুড়ি, কাল ম্যাগি, পরশু স্কচ ব্রাইট। যেদিন কিছুই কেনার থাকে না সেদিনও দাঁড়াই। দাঁড়িয়ে চারদিক দেখতে থাকি যতক্ষণ না কিছু একটা নেওয়ার ইচ্ছে বুকের মধ্যে জাগছে। আজ সে রকম একটা দিন ছিল। শেষমেশ পাঁচ টাকা পিসের দুটো মাঞ্চ কিনে চলে এসেছি। রাতে বাসের জন্য খুচুরমুচুর নিতে হবে মনে থাকা সত্ত্বেও নিইনি।
কারণ নেওয়ার কথা মনে পড়তে কতগুলো ব্যাকড্রপ মনে পড়েছিল। পাহাড়ি শহরের ঘিঞ্জি বাসস্টপ, সমুদ্রতটের শহরের ঝকঝকে ট্রেন স্টেশন। আমি সিট পেলে বসে আছি, না পেলে দাঁড়িয়ে। অর্চিষ্মান দূর থেকে হেঁটে হেঁটে আসছে। হাতের পলিথিনে অস্বাস্থ্যকর খাবার।
সবই তো ফুরিয়ে যায়, এই ছবিটা যতদিন থাকে থাক।
বাস ঢুকছে। একদিকে পড়ে থাকা বমি অ্যাভয়েড করে অন্য দিক দিয়ে হেঁটে গেলাম। যার যার ল্যাপটপ ব্যাগ বাদ দিয়ে দুজনের জামাকাপড়ের কমন ব্যাগ অর্চিষ্মান বাসের নিচে ঢুকিয়ে দিয়ে আসছে। ভারতবর্ষের দুটো রাজ্যের লোক মনে হয় ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ ভূমিষ্ঠ হয়। এক ফালি প্যাসেজ দিয়ে অন্ততঃ বারোটা দানবাকৃতি বাস বিভিন্ন অ্যাংগলে বেঁকেচুরে বেরোচ্ছে। মাঝে মাঝে একজন চেঁচিয়ে “আবে রুক্ক যা ইয়ার” বলছে, তা ছাড়া সম্পূর্ণ মসৃণতায় ব্যাপারটা ঘটছে।
আমাদের সিট নম্বর ওয়ান সি ওয়ান ডি, অর্থাৎ সামনের কেউ সিট হেলিয়ে নাকের ওপর পড়বে না। সিটে সেটল করে একে অপরের দিকে তাকালাম।
ফাইন্যালি।
ফাইন্যালি।
*
প্রায় দু’বছর বেড়াতে যাইনি। এবারের বেড়াতে যাওয়া প্রায় দশা কাটানোর মতো। বেড়াতে যেতে কেমন লাগে নিজেদের মনে করানোর। নিজেদের গায়ে “বেড়াতে ভালোবাসি” সেঁটে রাখা লেবেলের সত্যতা প্রমাণের। এত হাই স্টেক বেড়াতে যাওয়ায় চাপ থাকতে পারত। এমন জায়গায় যাওয়ার যেখানে আগে কেউ যায়নি, বা গেলেও আমাদের মতো করে মর্ম তো ডেফিনিটলি বোঝেনি। ব্লাডি টুরিস্টস।
অর্চিষ্মান বলল, কুন্তলা তুমি ভালো দেখে একটা জায়গা বেছে ফুডিং লজিং বাসটাসের বুকিংটুকিং সেরে আমাকে জানিয়ে দিয়ো। আমার ভয়ানক কাজ, দম ফেলার সময় নেই। বলে হোয়াটসঅ্যাপ নিভিয়ে বাহাত্তর ঘণ্টার জন্য অদৃশ্য হল।
সময় আমারও নেই। ক্যান্ডি ক্রাশের মহকুমা স্তরে চ্যাম্পিয়নশিপ চলছে। কিন্তু সে সব বললাম না। বলা যায় না বলে নয়, বলব না বলে। মাথায় এল আর বলে ফেললাম অত বোকা আর নেই। এখন সব নিড টু নো বেসিস। মুখ বুজে ম্যাকলিওডগঞ্জ বাছলাম। এই একটা জায়গায় অর্চিষ্মানের চোখ বেঁধে দিলে আর আমার চশমা খুলে নিলেও পৌঁছে যাব। তিব্বতের থেকেও সহজ রাস্তা। বাড়ি থেকে আই এস বি টি, আই এস বি টি থেকে ধরমশালা ম্যাক্সিমাস মলের মোড়, মোড় থেকে ট্যাক্সি বা শেয়ারড জিপে ম্যাকলিওডগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড, স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে হোটেল।
রাত বারোটার সময় মুরথলের শিবা ধাবায় নৈশাহারের জন্য বাস থামল। শিবা ধাবা হচ্ছে অম্রিক সুখদেব ধাবার ঠিক পাশেরটা। আমার পছন্দ আর একটু দূরের, আর একটু নির্জন ধাবা। রাত আরও ঘনাবে। আমি বাসের সিটে বসে যত গভীর ঘুমোনো যায় তত গভীর ঘুমে নিমগ্ন থাকব। অর্চিষ্মান ধাক্কা দিয়ে বলবে, ওঠো কুন্তলা, নামো। আমি বলব, আমার খিদে নেই। অর্চিষ্মান বলবে, এখন নেই কিন্তু একটু পরেই পাবে। বেড়াতে যাওয়ার পথে মাঝরাত্তিরেও একটা লোকের যুক্তি এত টনটনে থাকে কী করে ভাবতে ভাবতে হাই তুলতে তুলতে দেখব তমসাচ্ছন্ন রাজপথের পাশে একটা দৈত্যাকার ধাবা গজিয়ে উঠেছে। শরীরময় পেঁচানো টুনি লাইট জ্বলছেনিভছে। এত ঝিকিমিকিতে অন্ধকার কমার বদলে বেড়েছে। বাকি দূরপাল্লার বাসেরা হয় তখনও পৌঁছয়নি বা একটু আগে দল বেঁধে বেরিয়ে গেছে। বাস থেকে নেমে অর্চিষ্মানের সঙ্গে ধাবাটায় ঢুকতে ঢুকতে ভাবছি, এই হচ্ছে সে রকম জায়গা যেখানে ইউ ক্যান চেক আউট এনি টাইম ইউ লাইক বাট ইউ ক্যান নেভার লিভ।
মুরথলের ধাবারা ভাইব চেকে ডাহা ফেল। মাহেশের মেলা লেগেই আছে। ব্যবহারিক অসুবিধেও আছে। এই ভিড় ধাবায় আধঘণ্টায় অর্ডার দিয়ে খেয়ে বিল মিটিয়ে বেরোনো যায় না। সিটে বসতে গেল পাঁচ, অর্ডার দিতে গেল সাত, অর্ডার আসতে গেল আরও তেরো মিনিট। পাঁচ মিনিটে কোনওমতে পরোটা গলায় ঠুসে অর্চিষ্মান বিল জোগাড় ও মেটানোর জন্য দৌড়োদৌড়ি করতে লাগল। আমি বসে বসে থালা থেকে কাঁটায় গেঁথে একটা একটা আলুজিরা মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে স্বামীস্ত্রী বা অন্য কোনও দীর্ঘস্থায়ী পার্টনারশিপবিষয়ক আমার একটা পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে নিতে থাকলাম।
উঁচু জল নিচু জল সমান হওয়ার মতো এই ধরণের সম্পর্কেও সব কিছু বেড়ে কমে একটা ইকুইলিব্রিয়াম সেট হয়। অন্ততঃ আমাদের ক্ষেত্রে হয়েছে। অর্চিষ্মানের কথা বলা বেড়েছে, আমার কমেছে। আমার অ্যাংজাইটি কমেছে, অর্চিষ্মানের বেড়েছে। এই যে বাস ছেড়ে দেবে ভয়ে দৌড়োদৌড়ি - এ সব আমার করার কথা। অর্চিষ্মানের ধীরেসুস্থে খেতে খেতে বলার কথা, ওরে বাবা কুন্তলা, বাস আমাদের ছেড়ে চলে যাবে না, ছাড়ার আগে ফোন করবে। অত টেনশনের কিছু নেই।
এখানে না হয় বাস ছেড়ে চলে যাওয়ার মতো হাফ-সিরিয়াস ব্যাপার, রবিবার সকালে হোটেলের মনোরম বারান্দায় বসে ব্রেকফাস্ট খাচ্ছি, খেয়ে উঠে ধরমকোট গেলেও হয় না গেলেও কেউ কান মলে দেবে না, অর্চিষ্মান হোটেলের বুফের বাইরে ওমলেট করে আনতে বলেছে, আসতে দেরি করছে বলে অর্চিষ্মানের নাকি অ্যাংজাইটি হচ্ছে। পয়েন্টটা নোট করে রেখেছি, এর পর ব্লু টোকাইতে বা অন্য কোথাও কেউ প্রেমভালোবাসা বিয়েশাদি নিয়ে টিপস চাইতে এলে বলব, এমন কাউকে বেছো, কয়েক বছর পর তুমি যার মতো হয়ে গেলে বা যে তোমার মতো হয়ে গেলে তোমার অস্বস্তি হবে না।
যতক্ষণে অর্চিষ্মান লোক খুঁজে বিল জোগাড় করল আমার আলুজিরা শেষ। ভাইসাব অর্চিষ্মানের সঙ্গে দাদা বেংগলি হ্যায় কেয়া ইত্যাদি খেজুর করছিলেন। আমি ফোন খুলে খুলে কিউ আর কোডের দিকে গুগল পে তাক করেছি দেখে খেজুর থামিয়ে আমার দিকে ফিরে বললেন মাতাজি টিপ দে দেনা কাইন্ডলি।
বাসে আমাদের ঠিক পেছনের দুটো রো নিয়ে একটা বাঙালি গ্রুপ বসেছিল। বংশগত বা বৈবাহিক সম্পর্কে জড়িত না হলে একে অপরের সঙ্গে অত রুক্ষ টোনে কথা চালিয়ে যাওয়া যায় না। প্রথমে খিটিরমিটির চলল সিট হেলানো নিয়ে। তারপর ব্যাগ ওপরের বাংক থেকে কতবার নামানো হচ্ছে সেই নিয়ে। খেয়ে ফেরার পর বাচ্চা কেঁদে উঠল। তখন রাগপ্রকাশ চলল এই রাত বারোটার সময় কাদের খাওয়ার দরকার পড়ে যে বাস থামাতে হয় ইত্যাদি নিয়ে। রাগ মূলতঃ দেখাচ্ছিলেন একজন, বাকিরা সে সব রাগের কিছু কিছু এড়াচ্ছিলেন কিছু কিছুর যোগ্য জবাব দিচ্ছিলেন।
প্রেমভালোবাসা জাতীয় আবেগ শক্ত ঠেকলেও আমার ধারণা রাগ জিনিসটা আমি বুঝি। রাগের রকমসকম, চলনবলন, ঘনত্ব, নাব্যতা, প্লবতা। এই যে ক্ষণে ক্ষণে রাগ, এটা মনের মতো না হলে রাগ, ওটা অসুবিধেজনক হলে রাগ - এলোমেলো ও মাথামুণ্ডুহীন মনে হলেও পঁচানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে এই সব রাগের উৎস ও গন্তব্য এক এবং স্থায়ী। এমন কিছু বা এমন কেউ, যার প্রতি রাগিয়ে সরাসরি রাগ প্রকাশ করে উঠতে পারছেন না বা প্রকাশ করতে ভয় লাগছে।
রাত শান্ত হয়ে এলে, পেছনের রো-এরা ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চিত হয়ে ফিসফিস করে এই সব নিয়ে কথা হচ্ছিল। রাগিয়ের বয়স কম কাজেই সম্ভবতঃ জীবনের প্রতি পার্মানেন্টলি চটে যাওয়া কেস নয়। একটা কারণ খুবই অবভিয়াস। উনি একটা ভীষণ কঠিন কাজ করতে করতে যাচ্ছেন, সেটা হচ্ছে নীরব বাসে চিৎকার করা বাচ্চাকে শান্ত করা। কাজটায় রাগিয়েকে একাই করতে হচ্ছে, চলনদারেরা কেউ সহযোগিতা করছে না।
অর্চিষ্মান বলল, কুন্তলা, জীবনসমুদ্রে সবাই তো সমান জোরে সাঁতার কাটছে না। কেউ খুব জোরে হাত পা ছুঁড়ছে, কেউ চিৎসাঁতারে ভাসছে। যারা হাত পা ছুঁড়ছে তাদের হাফিংপাফিং তো একটু বেশি হবেই।
জীবনে এক লাইন ক্রিয়েটিভ রাইটিং না করে অর্চিষ্মান যে নিয়মিত পকেট থেকে এই সব বাক্য বার করে সেটা আমার কাছে একাধারে গর্বের আর হতাশার। বাস ফুলস্পিডে চলছে। দু’ধারে সাঁই সাঁই করে সরে যাচ্ছে অন্ধকার। বাসটা খুবই ভালো। এর আগে যে সব ভলভোটলভোতে চেপেছি তাদের তুলনায় আরামদায়ক। প্রায় ঝাঁকুনিশূন্য। অর্চিষ্মান চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। আমি জীবনসমুদ্র আর সাঁতার নিয়ে ভাবছি। পাঁচমিনিট পর অর্চিষ্মানকে খোঁচা দিলাম।
আমি মনে হয় চিৎসাঁতার, না গো? বা সাঁতারই নয় অ্যাট অল, জাস্ট ভেসে থাকা।
অর্চিষ্মান এমন মুখ করে চোখ বুজল যেন এ বিষয়ে ওর কোনও মতামত নেই। ও মেটাফরে ভালো হতে পারে অভিনয়ে খুবই খারাপ।
কাঁচে মাথা ঠেকালাম। ওদিক থেকে অন্ধকারও কাঁচে মাথা রাখল। সমুদ্র সাঁতার এই সব নিয়ে ভাবতে থাকলাম। আমি জানি সবার জীবনসমুদ্র সমান নয়। এমন অনেক সমুদ্র আছে যেখানে পড়লে সাঁতার বাটারফ্লাই না ব্রেস্টস্ট্রোক এ সব ভাবার ফুরসৎ নেই, ভেসে থাকা নিশ্চিত করতেই সব এনার্জি বেরিয়ে যায়। আমি ভাবছিলাম আমার এবং আমার কাছাকাছি সমুদ্রদের নিয়ে, যে সবে সাঁতারের ভ্যারাইটি অভ্যাস করার অবকাশ আছে। সে সব সমুদ্রে সেখানে খুব হাঁসফাঁসিয়ে সাঁতার কাটার, ফ্র্যাংকলি, আমি কোনও কারণ পাই না। চিৎ হয়ে ভাসলেই বা ক্ষতি কী?
আর ভাসবই যখন আরাম করে ভাসাই ভালো। চোখ বুজি। অন্ধকার, জলরাশি হয়ে আমাকে ঘিরে ধরে, আমি পিঠের নিচে প্রশস্ত, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি পুল ফ্লোট পেতে নিই, হাত নেড়ে ক্যারিবিয়ান নীল পানীয়ের অর্ডার দিই, গ্লাসে স্ট্র-য়ের পাশে ছোট ছাতা গোঁজা।
শেষরাতে ঘুম ভেঙে যায়। জানালার পর্দা টানিনি। দিগন্তে ছায়া ছায়া পাহাড়। একটা বড় ঝিল টাইপের ব্যাপারের ওপারে সূর্য উঠছে। সূর্যের রং, ব্লিংকিট খোলা পেলেই কুন্তলা তোমার এই কিপটেমো বন্ধ কর তো, বলে আমার বেছে রাখা ডিম ফেলে অর্চিষ্মান যে ডিমগুলো কার্টে তোলে তাদের কুসুমের মতো।
অর্চিষ্মানকে টোকা মেরে তুলে দেখালাম। কিছুক্ষণ পর ভাইসাব দশ মিনিট ওয়াশরুম ব্রেক ঘোষণা করলেন। আমরা ওয়াশরুম যাব না, আমরা চা কফি খাব। চা-টা আশ্চর্য রকমের ভালো ছিল। আশা বেড়ে যাওয়ায় কফিও ট্রাই করলাম, ভালো না দুধ বেশি। গর্ভিণী কুকুর আর লিকপিকে কুকুরছানারা আশান্বিত মুখে ঘোরাঘুরি করছিল। খেতে দিই খেতে দিই ভাবতে ভাবতেই হর্ন। উঠে পড়লাম। আড়াইঘণ্টার মধ্যে ধরমশালায় ঢুকে গেল বাস।
(চলবে)
Comments
Post a Comment