December 30, 2014

লখনৌ/ পর্ব ১




‘গাট ফিলিং’ ব্যাপারটা বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে খুব কাজে দেয় দেখেছি। অন্তত আমার দেয়লক্ষ লক্ষ বছর আগে আমি আর অর্চিষ্মান একবার ঘন্টা তিরিশেকের জন্য ম্যাকলিওডগঞ্জ বেড়াতে গিয়েছিলাম। হোটেল বুক করা ছিল, আবহাওয়ার পূর্বাভাস আশানুরূপ ছিল, বাসট্রেন সব টাইমে ছিল। শুধু আমার মনটাই ছিল কেমনকেমন। মোচড় দিতে গিয়ে তানপুরাটার কান হয় একচুল বেশি ঘুরে যাচ্ছিল নয় কম। বন্দিশ ঘুরে ফিরে সমে পড়ছিল ঠিকই, কিন্তু মাথা দুলে উঠছিল না।

বাসের জানালা থেকে দূর পাহাড়ের মাথায় ম্যাকলিওডগঞ্জের ছায়া দেখা যেতে না যেতে আবহাওয়া অফিসকে কাঁচকলা দেখিয়ে অঝোর বৃষ্টি নামল, নামী হোটেলের দামি গিজার বিগড়ে গেল, জানালা দিয়ে বাইরের মেঘলা টিপটিপে পিছল কনকনে দুপুরের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে বিরক্ত হয়ে আমরা ঘুমোতে চলে গেলাম। ঘুম যখন ভাঙল তখন সবথেকে লম্বা পাইন গাছটার মাথা থেকেও রোদ্দুর হাওয়া, খাদের নিচ থেকে কুয়াশা পাকিয়ে পাকিয়ে উঠতে শুরু করেছে। শুধু বৃষ্টিটাই রয়েছে আগের মতো, চলছে সেই ঢিমে তেতালায়। চা দিতে এসে ভাইসাব জানালেন, “আরে সাব, কেয়া বাত কর রহে হো, ধূপ নিকলা তো থা! পুরে দো ঘণ্টে কে লিয়ে। বঢিয়া ধূপ। ওয়ান টু থ্রি-কা সাবমেমসাব খুব ঘুমঘামকে শপিং করকে লায়া। আপলোগ সো রহে থে কেয়া?”

বড়দিনে লখনৌ যাওয়া যাক স্থির করার পর যখন চব্বিশ তারিখ রাত বা পঁচিশ তারিখ সকালের টিকিট পাওয়া গেল না (এমনকি তকালেও না), যাকেই বললাম যে আমরা লখনৌ যাচ্ছি বত্রিশ ঘণ্টার জন্য তারাই বলল “ইস, বড্ড টাইট হল কিন্তু”, রাত দশটার পর মেরুক্যাবের জানালার বাইরে কুয়াশার ভেতর দিয়ে যখন জীবনে প্রথমবার চোখে পড়ল কালকাজী মার্কেটের ঠাসাঠাসি দোকানের সারিতে জ্বলন্তনিভন্ত ‘লখনৌ কি মশহুর টুণ্ডে কি কাবাব আউর উল্টে তাওয়া কি পরানঠা’ (কালকাজী! আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কাগজের প্লেনে ঠিকানা লিখে ছুঁড়লে যেটা কালকাজীতে পৌঁছে যায়, সেই কালকাজীতে টুণ্ডে কাবাব ফেলে রেখে আমরা কি না পাঁচশো কিলোমিটার দূরে চলেছি, এই শীতের রাত্তিরে?) রাজধানী এক্সপ্রেস যখন সকাল সাতটার বদলে বেলা এগারোটায় চারবাগের লখনৌ স্টেশনে ঢুকল (আর আমাদের লখনৌবাসের আয়ু বত্রিশ ঘণ্টা থেকে কমে আঠাশ ঘণ্টা হয়ে গেল), প্রিপেড অটো/ট্যাক্সি বুথে গিয়ে দেখলাম চারদিক খাঁ খাঁ করছে, ‘একসাথ তিনচার গাড়ি’ ইন করে যাওয়াতে অটো এবং ট্যাক্সি দুইই নিশ্চিহ্ন, ‘কব মিলেগা পাতা নেহি’ --- তখনও, আশ্চর্যজনক ভাবে, আমাদের মনোবলে একটুও ভাঁটা পড়েনি।

কারণ আমাদের দুজনের ‘গাট’ই বলছিল, এই বেড়ানোটা আমাদের ভালো হবে।

অমনি কোথা থেকে একটা অটো এসে হাজির। গোটা লাইন হইহই করে উঠল। অটোওয়ালা বেজায় গাম্ভীর্য নিয়ে এসে কাউন্টারে কনুই রেখে হেলে দাঁড়িয়ে লাইনের প্রথমজনকে গন্তব্য জিজ্ঞাসা করলেন। মুখ দেখে বোঝা গেল উত্তর পছন্দ হয়নি। দ্বিতীয়জনের উত্তরও না। তৃতীয়জনেরও না! চার নম্বরে দাঁড়ানো আমরা যেই না চেঁচিয়ে বললাম, ‘ছে নম্বর সপরু মার্গ, ইউ পি টি ডি সি কা গোমতী হোটেল?’ অমনি তিনি কাউন্টারের দিকে মুখ ফিরিয়ে অত্যন্ত ব্যাজার মুখে বললেন, ‘ইন লোগো কা পর্চি বনা দিজিয়ে, জনাব।’

চারবাগ থেকে সপরু মার্গ মোটে চার কিলোমিটার রাস্তা যেতে তিনটে জিনিস পরিষ্কার হয়ে গেল। এক, মনীষী চেনার জন্য লখনৌয়ের জবাব নেই। সংস্কৃতি রাজনীতি নির্বিশেষে ভারতবর্ষের ইতিহাসে যতরকম মনীষীর আবির্ভাব হয়েছে, লখনৌয়ের মোড়ে মোড়ে তাঁদের একখানা করে মূর্তি আছে। রাণাপ্রতাপ থেকে রবীন্দ্রনাথ, কেউ বাদ পড়েননি।

দুই, হিন্দির দাপট। অফিসকাছারি স্কুলকলেজ মায় হাসপাতাল শুদ্ধু সবেরই নাম বিশুদ্ধ হিন্দিতে এবং শুধুই হিন্দিতে লেখা। মুখ্য মহাপ্রবন্ধক, উচ্চ ন্যায়ালয়।

তিন, সিগন্যালের অনুপস্থিতি। গোটা শহরটায় একটাও সিগন্যাল নেই, যেগুলো আছে তাদের অর্ধেক খারাপ, বাকি অর্ধেক কেউ মানার প্রয়োজন বোধ করছে না। গোটা শহরের ট্র্যাফিক চলছে হর্নের বদান্যতায়। হর্ন যার, রাস্তা তার।

হোটেলে নামিয়ে দিয়ে অটোজনাব বললেন যে তিনি আমাদের লখনৌ ঘুমিয়ে দিতে পারেন। আমরা না বলাতেও তিনি ঝুলোঝুলি করতে লাগলেন। আমাদের দেখেই বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন বোধহয় আমাদের বেশি পয়সা নেই, তাই বললেন, পয়সা নিয়ে যেন মাথা ঘামানোর কোনও দরকারই নেই, তিনি আমাদের সস্তায় ঘুমিয়ে দেবেন’খন। অতি কষ্টে তাঁকে নিরস্ত করে হোটেলের ভেতর সেঁধোনো গেল। সেঁধোনোর আগে আমি বললাম, “বহোৎ বহোৎ শুক্রিয়া ভাইসাব।” আর অমনি অর্চিষ্মান মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করল, “উর্দুটা কি লখনৌয়ের মুখ চেয়ে?” আমি পা ঠুকে বললাম, “আলবত।” রোমে গেলে যখন রোমান তখন লখনৌয়ে গিয়ে লখনৌয়ি নয় কেন?

হোটেলে ঢুকে টিভি চালিয়ে সাদা বিছানায় গড়িয়ে পড়ার বিলাসিতার উপায় নেই আমাদের। আঠাশের মধ্য থেকে একঘণ্টা অলরেডি কাবার। চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে, দু’কাপ চা গলায় ঢেলে দুর্গা বলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য পুরোনো লখনৌ।

দেখতে না দেখতে চৌক এসে গেল। চৌকের বর্ণনা দেওয়া খুব সহজ। মানুষ, ঘোড়া, ষাঁড়, জঞ্জাল দিয়ে একটা বোমা বেঁধে, সেটাকে রঙের বালতিতে চুবিয়ে যদি তাতে আগুন দেওয়া যায়, তাহলে পরিণতি হবে চৌক। ধনীগরিব, মানুষ নামানুষ, সাফাইজঞ্জাল, নিয়মবেনিয়ম, নতুনপুরোনোর এমন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ভাবা যায় না। এটা অবশ্য শুধু লখনৌয়ের নয়, যে কোনও পুরোনো জায়গারই বৈশিষ্ট্য। নিয়মের বাতিক নতুনদেরই থাকে। নতুন শহরের সব বারিঘরদোর দেখবেন অবিকল একে অপরের মতো দেখতে। মানুষগুলোও। নিজেদের মধ্যে বৈচিত্র্যকে জায়গা দেওয়ার সাহস তাদের নেই। পুরোনোদের সে ভয় নেই। পুরোনোরা জানে কেউ কারও মতো হয় না। হওয়া সম্ভবই না। তাই তারা নির্দ্বিধায় সবাইকে, সবরকমকে অনায়াসে নিজের পাশে জায়গা করে দিতে পারে।

লখনৌয়ের ইতিহাস অতি প্রাচীন। সেই রামচন্দ্র যখন যুদ্ধটুদ্ধ সেরে বনবাসটনবাস সাঙ্গ করে অযোধ্যা ফিরলেন, তখনকার। ফিরে রামের মনে হল, লক্ষ্মণের এই অতুলনীয় ভ্রাতৃভক্তির স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে একটা পুরস্কার দেওয়া উচিত। কী দেওয়া যায় কী দেওয়া যায় ভাবতে ভাবতে তাঁর একটা জায়গার  কথা মাথায় এল। অয্যোধ্যারই অল্প একটু কোণা ভেঙে দিয়ে দিলে কেমন হয়? ভাবতেই রামের বুকে শেল বিঁধল। তাঁর এত সাধের অয্যোধ্যা! এতদিন, এত দুঃখভোগের পর হাতে আসা অয্যোধ্যা! যে অয্যোধ্যায় সুগন্ধী ধূপের ধোঁয়া ভরদুপুরে আকাশ অন্ধকার করে রাখে আর নরনারীর অঙ্গবিভূষণ মণিমুক্তোরাশি থেকে বিচ্ছুরিত আলোয় নগর আলোকিত হয়ে থাকে, সেই অযোধ্যার একটুখানিও লক্ষ্মণকে ছেড়ে দিতে রামের মন সরল না। ভাবতে ভাবতে অবশেষে একটা জায়গার কথা মাথায় এল রামচন্দ্রের। অয্যোধ্যা থেকে জায়গাটা বেশি দূর নয়, গোমতী বরাবর চল্লিশ মাইল হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যায়। সেটা দিয়ে দেওয়া যাক।

সেই ত্রেতাযুগের পর ইতিহাসে লখনৌ আবার ভুস করে নাক ভাসালো বাদশা আকবরের সময়। এর মাঝখানে নানারকম তালগোল হয়েছিল, শাটল ককের মতো অওয়ধ একবার এই বাদশার হাত থেকে ওই বাদশার কোঁচড়ে গিয়ে পড়ছিল। এই গোটা সময়টাতেই খাতায়কলমে অওয়ধ সাম্রাজ্য স্বাধীন ছিল, কিন্তু বাস্তবে তাকে কারও না কারও দাদাগিরি সইতে হত। তারপর অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণগুলো সব একে একে প্রকট হয়ে উঠতে লাগল, তখন অওয়ধের রাজারা একটু ঝাড়াপাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পেলেন।

এদের মধ্যে সবথেকে চোখে পড়ার মতো যিনি ছিলেন তাঁর নাম – সাদাত আলি, আদি নিবাস – পারস্যের খুরাসান। পারস্যের খুরাসান থেকে আসা অনেক লোক তখন মোগলদের সেনাদলে নাম লেখাতেন আর আশায় আশায় থাকতেন কখন বাদশা খুশি হয়ে তাদের জমিজায়গা উপহার দেবেন। সতেরোশো বত্রিশ সাল নাগাদ সাদাত আলির কপাল খুলল, বাদশা তাঁকে অওয়ধের নাজিমের তখ্‌ত দিলেন। তাঁর নাম হল নাজিম ওয়াজির। সাদাত আলি করিৎকর্মা লোক ছিলেন, অচিরেই প্রোমোশন পেয়ে তিনি হয়ে গেলেন নবাব ওয়াজির। পদমর্যাদায় যাকে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।

মোগল সাম্রাজ্যের তখন শ্বাস উঠেছে। সিংহাসনে ওঠানামা প্রায় মিউজিক্যাল চেয়ারে পরিণত হয়েছে, যাঁরা উঠছেন নামছেন তাঁদের নাম কেউ কখনও শোনেনি। সাদাত আলি দেখলেন এই সুযোগ, বাদশার উপহার দেওয়া জায়গিরকে নিজের খানদানি জায়গির বানিয়ে ফেলার। তাঁর মৃত্যুর পর তখতে বসলেন জামাই সফদরজং, সফদরজঙের জমানা ফুরোলে সিংহাসনে চড়লেন তাঁর ছেলে সুজাউদ্দৌল্লা। সতেরোশো পঁচাত্তর সালের ছাব্বিশে জানুয়ারি অওয়ধের রাজধানী ফৈজাবাদে চোখ বুজলেন নবাব সুজাউদ্দৌল্লা আর অমনি তাঁর ছেলে আসফুদ্দৌল্লা লোকলস্কর লটবহর নিয়ে এসে পড়লেন লখনৌয়ে। অওয়ধ সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ফৈজাবাদের নটেগাছ মুড়োলো, শুরু হল লখনৌয়ের।

লখনৌয়ের বলার মতো যত ল্যান্ডমার্ক, রুমি দরওয়াজা, বড়া ইমামবাড়া, ভুলভুলাইয়া, ছোটা ইমামবাড়া, সব বানিয়েছিলেন এই আসফুদ্দৌল্লা।


এই হচ্ছে রুমি দরওয়াজা। সতেরোশো চুরাশি সালে বানানো ষাট ফুট উঁচু এই দরজাটিই ছিল একসময় লখনৌয়ের প্রধান প্রবেশদ্বার। শোনা যায় প্রাচীন কনস্ট্যান্টিনোপলে নাকি হুবহু এই রকম দেখতে একটা দরজা ছিল। তিনশো তিরিশ সালে কনস্ট্যানটাইন দ্য গ্রেট, বাইজ্যানটাইম শহরে নিজের রাজধানীর পত্তন করলেন আর তাকে আদর করে তার নাম দিলেন ‘নতুন রোম’। সেই নতুন রোমে নাকি Sublime Porte নামে একটা দরজা ছিল যার অনুকরণে এই রুমি দরওয়াজা তৈরি। নতুন রোমের দরজার অনুকরণে বানানো দরজার নাম দেওয়া হল রুমি দরওয়াজা।

এত কথা আমি জানলাম কোত্থেকে? ইন্টারনেট। নেহাত গত কয়েকমাস ধরে সংগীত বাংলায় নাগাড়ে বাদশাহী আংটির প্রোমোশনে আবীর ক্যামেরাকে বলছেন, এই দেখুন আমার পেছনে রুমি দরওয়াজা, তাই রক্ষে, না হলে ওটা যে রুমি দরওয়াজা সেটাই জানা মুশকিল হত। এ এস আই-য়ের তরফ থেকে নিয়মমতো একখানা আকাশি বোর্ড গেঁথে রেখে গেছে।  “This monument has been declared to be of national importance under the . . .” ইত্যাদি চর্বিতচর্বণের মতো লিখে কাজ সারা আছে। তার বেশি কিছু জানতে গেলে আপনাকে গাইডের দ্বারস্থ হতে হবে।

এই সব দেখি আর অবধারিতভাবে অন্য দেশের সঙ্গে তুলনাটা মাথার মধ্যে চলে আসে। এই যদি ওদের দেশ হত, ঝেড়েমুছে, সেলোফেন পেপারে মুড়ে, এমন করে লেবেল সেঁটে রাখত যে অতি সামান্য জিনিসও দেখে তাক লেগে যেত। মনে হত, না জানি কী ব্যাপার। এদিকে আমাদের দেশে এত সম্পদ, চরম অযত্নে যেমনতেমন করে ফেলে রাখা। কেন কে জানে। দরকারের থেকে বেশি আছে বলেই বোধহয় ফেলেছড়িয়ে নষ্ট করাটা আমাদের অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে।

বড়া ইমামবাড়ায় গিয়ে জানা গেল, জুম্মার নামাজ চলছে, বেলা দেড়টা অবধি দরজা বন্ধ। আমরা ঠিক করলাম এই সুযোগে ছোটা ইমামবাড়াটা ঘুরে আসা যাক। ছোটা ইমামবাড়ায় নামাজ হয় না, গেলেই ঢুকে পড়া যাবে।     

এটাই হচ্ছে মসজিদ আর ইমামবাড়ার মধ্যে তফা। ইমামবাড়া হচ্ছে মহরমের দিন কারবালার যুদ্ধে হত শিয়া ইমাম হুসেন ইবন আলি (যিনি হজরত মহম্মদের নাতি), তাঁর পরিবার ও অনুচরবৃন্দের স্মরণের উদ্দেশ্যে নির্মিত সৌধ। তাই ইমামবাড়াকে হুসেনিয়াও বলা হয়। মসজিদে যেমন ফি শুক্রবারে যেমন নামাজ পড়তেই হয়, হুসেনিয়ায় সে রকম বাধ্যবাধকতা নেই।


ছোটা ইমামবাড়া বানিয়েছিলেন নবাব মহম্মদ আলি শাহ, যাঁকে ওয়াজিদ আলি শাহের দাদু বললেই বরং চিনতে সুবিধে হবে। ইমামবাড়ার ভেতরের চমৎকার রঙিন বেলজিয়াম কাজের কারুকাজ দেখে, আশপাশটা একটু ঘুরতে ঘুরতেই দেড়টা বেজে গেল। আমরা বড়া ইমামবাড়ার দিকে হাঁটা দিলাম। পথে দেখলাম সাতখণ্ডা, এও মহম্মদ শাহের বানানো। কুতুব মিনার আর পিসার হেলানো মিনারের অনুকরণে সাততলা মিনার বানাতে চেয়েছিলেন মহম্মদ শাহ। কিন্তু বাড়ি চারতলা উঠতেই নবাব মারা গেলেন, মিনার নামে সাতখণ্ডা আর কাজে চারখণ্ডা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সাতখণ্ডা থেকে একটু এগিয়েই দেখলাম আকাশের গায়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেড়শো বছরের পুরোনো ঘণ্টাঘর। তার মাথার কাছে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে লাল নীল হলুদ সবুজ ঘুড়ির দল। ঘুড়ির সুতো বেয়ে চোখ নামিয়ে আনলেই দেখা যাবে ঘণ্টাঘরের মাঠে দৌড়ে বেড়াচ্ছে একদল শিশু। দূরদূরান্ত থেকে বেড়াতে আসা নয়, ওই মাঠের আশেপাশের বস্তিতে জন্মানো, ওই মাঠে খেলেধূলে বড় হওয়া।

দূর থেকে তাদের দুর্বোধ্য কলকল শুনে হয়তো আবার আপনার এটাও মনে হবে, কী লাভ হত এই ঘণ্টাঘরটাকে সেলোফেন মুড়ে রাখলে? মাঠের চারদিকে পাঁচিল তুলে পাহারা বসিয়ে দিলে কার কোন উপকারটা হত? গোটাচারেক ট্যুরিস্টকে মোহিত করে দেওয়া যেত হয়তো, কিন্তু বেঘোরে মারা পড়ত খেলার মাঠটা।

কীভাবে ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখা ভালো? পুতুলখেলার মতো করে, চকচকে জামাকাপড় পরিয়ে, সাজিয়েগুছিয়ে? নাকি একটা জীবন্ত, চলন্ত, বাড়ন্ত সভ্যতা দিয়ে তাকে ঘিরে রেখে? যে সভ্যতার হৃদপিণ্ড এখনও ধকধকাচ্ছে, প্রতি স্পন্দনে ঘাম, বিষ, আবর্জনা, ঘৃণা, ও ভালোবাসার উষ্ণশোণিত ছুটিয়ে দিচ্ছে প্রতিটি শিরায়, সেই সভ্যতার ধরাছোঁয়ার বাইরে তুলোয় মুড়ে? নাকি তার অস্তিত্বের অঙ্গ করে, প্রতিদিনের সংগ্রামের সাক্ষী করে?


বড়া ইমামবাড়া। নবাব আসফুদ্দৌল্লার বানানো বলে একে আসাফি ইমামবাড়াও বলা হয়। বড়া ইমামবাড়ার মধ্যে আছে আসাফি মসজিদ, ভুলভুলাইয়া আর বাউলি অর্থাৎ কুয়ো।

আসাফি মসজিদ

ইমামবাড়া যেহেতু একটি শোকের ঘটনার স্মরণে বানানো, সেই জন্য ওই দেখুন ওর দরজায় উড়ছে কালো পতাকা।

ঘুরে ঘুরে দেখলাম সব। আমি ছোটবেলায় আগেও একবার দেখেছি শুনে অর্চিষ্মান দাবি করল আমার এবার গাইড ছাড়াই ভুলভুলাইয়াতে ঢুকতে এবং বেরোতে পারা উচিত। সে পরীক্ষা দেওয়ার অবশ্য সুযোগ হল না, কারণ গাইড ছাড়া ওখানে ঢোকা বেআইনি।

বর ইমামবাড়ার অভ্যন্তর। স্থাপত্যের এমন কারসাজি যে ওইপ্রান্তে দেশলাই জ্বালানোর শব্দ এপ্রান্ত থেকে শোনা যায়।

ইমামবাড়ার ছাদ। ইমামবাড়ার ছাদ থেকে দেখা লখনৌ। 

ভুলভুলাইয়ার বারান্দা।

বাউলি

আপনাদের কি একটা কথা খেয়াল আছে? যে সকাল থেকে আমাদের পেটে এক কাপ চা ছাড়া আর কিছু পড়েনি? উঁহু, প্যান্ট্রি কার না থাকায় রাজধানীর মারি বিস্কুটও না। আর ঘড়ির কাঁটা যে তিনটের ঘর পেরিয়েছে অনেকক্ষণ? আর আমরা যে ক্রমাগত হেঁটে চলেছি? প্রায় একহাত উচুউচু নবাবি সিঁড়ি বেয়ে ক্রমাগত উঠছি আর নামছি? খিদেয়, ক্লান্তিতে আমাদের যে মরোমরো দশা হয়েছে, সে কথা কি একটুও খেয়াল আছে আপনাদের?

আপনার কী বলছেন আমরা জানি। বলছেন, “খিদে পেয়েছে তো খেলেই পার। লখনৌয়ে সিগন্যাল না থাকতে পারে, কিন্তু খাবার নেই সে কথা অতি বড় শত্রুতেও বলতে পারবে না।”

তাহলে আমরা বলব আপনারা ঠিকই বলেছেন। লখনৌয়ের হোয়াট টু সি, হোয়াট টু বাই, হোয়্যার টু স্লিপ ইত্যাদির জন্য যদি সব মিলিয়ে পাঁচশো শব্দ বরাদ্দ থাকে তাহলে ‘হোয়াট টু ইট অ্যান্ড হোয়্যার’-এর জন্য পাঁচশো পাতাও কম পড়বে। আমরা হিসেব করে দেখেছিলাম, আমাদের ভাগ্যা জুটবে দুটো লাঞ্চ একটা ডিনার। বাঃ, ভালোই হয়েছে। একটা লাঞ্চে কাবাব খাব, একটা লাঞ্চে বিরিয়ানি, আর মাঝখানে চাট দিয়ে লাইট ডিনার সেরে নিলেই খেল খতম।

'কী খাব'র পর এবার ‘কোথায় খাব’র পালা। এ প্রশ্নটা আগেরটার থেকে ঢের বেশি শক্ত। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে না সূর্য পৃথিবীর সেই নিয়েই এখনও পৃথিবীর সবাই সহমত হতে পারেনি, লখনৌয়ের কোন দোকানের কাবাব আর বিরিয়ানি সেরা সে ব্যাপারে ঐক্যমত্যের আশা করাই অন্যায়। তারপর আরও নানারকম ব্যাপার আছে। ধরুন সবাই বলল, "টুণ্ডে কাবাবির কাবাব ভালো।" অমনি একজন পেছন থেকে মুচকি হেসে বলবেন, “টুণ্ডে একসময় ভালো ছিল, এখন আর সে কোয়ালিটি নেই। যারা খবর রাখে তারা জানে, আসলি গালাওটি পাওয়া যায় অমুক জায়গায়।” এই না বলে আস্তিন থেকে তুরুপের তাস বার করার মতো করে তিনি একখানা “হিডেন জেম”-এর হদিশ দিলেন।

সবার হদিশ শুনতে গেলে আপনার পাগল হওয়া ছাড়া গতি থাকবে না। তাই আমরা সে রাস্তায় যাইনি। টুণ্ডেতেই খাব ঠিক করে রেখেছিলাম। সে সিদ্ধান্ত আরও অটল হল যখন অর্চিষ্মান একদিন অফিস থেকে ফিরে এই ঘটনাটা বলল। ওর এক সহকর্মীর মাসির বাড়ি লখনৌয়ে। অর্চিষ্মান একদিন সহকর্মীকে লখনৌয়ে কী কী দেখার জিনিস আছে জিজ্ঞাসা করতে যেতে সে খুব লজ্জা পেয়ে নাকি বলেছে, “আমি বলতে পারব না ভাই, আমি তো কিছু দেখি না, লখনৌ যাই, টুণ্ডেতে খাই, ফেরৎ চলে আসি।”

কিন্তু টুণ্ডেতে খাব বললেই তো হবে না, কোথাকার টুণ্ডে সেটাও তো বলতে হবে? আমিনাবাদের না চৌকের?

ভেবে ভেবে আমাদের যখন মাথার সব চুল পেকে যাওয়ার উপক্রম এমন সময় হঠা একদিন অশোকাঙ্কুরের সঙ্গে রাস্তায় দেখা। ইকনমেট্রিক্স, ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি এবং গ্রাঞ্জ লাইফস্টাইস, সব বিষয়ে একাধারে এত জ্ঞান আমি অশোকাঙ্কুর ছাড়া আর কোনও লোকের মধ্যে দেখিনি। আমাদের সংকট শুনে অশোকাঙ্কুর চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে বলল, “সি। আমিনাবাদে বিফ পাবে না, চৌকে বিফ ছাড়া অন্য কিছু পাবে না।”

আমরা বললাম, “ওকে।”

অশোকাঙ্কুর বলল, “দু’নম্বর ভেবে দেখার বিষয়টা হচ্ছে চৌকেরটা অরিজিনাল টুণ্ডের। আমিনাবাদের দোকানটা টুণ্ডের ছেলে খুলেছে।"

আমরা বললাম, “বুঝলাম।”

অশোকাঙ্কুর সিগারেটে একটা টান দিয়ে একটু হেসে বলল, “আমিনাবাদের টুণ্ডের দোকান স্যুটেবলি নোংরা, তবে চৌকেরটা আরও বেশি নোংরা।”

এর পর আর কথা চলে না। ইমামবাড়ার গেট থেকে বেরোনোর সময় আমরা দ্বাররক্ষীকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ভাইসাব, চৌক কা টুণ্ডে কাঁহা হোগা?”

শুনে ভাইসাব একেবারে হেসে লুটোপুটি। “আরে মেমসাব, চৌক কে টুণ্ডে তো লাখো মিলেগা, আপকো চাহিয়ে টুণ্ডে কি কাবাব।” আমরা ভয়ানক অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, “হাঁ হাঁ, কাবাব কাবাব।” ভাইসাব আমাদের রাস্তা বাতলিয়ে দিলেন, তাও আবার শর্টকাট।

আমরা হাঁটা লাগালাম।  উন্মুক্ত নর্দমা, পূতিগন্ধময় ভাগাড়, গায়ে জামা এবং পায়ে জুতোর নামগন্ধহীন শিশুদের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে। চলতে চলতে আবার চৌকের মোড় এসে গেল। আমরা চৌক পেরিয়ে নাকবরাবর চললাম। হাঁটছি তো হাঁটছি। হাঁটছি তো হাঁটছি। ততক্ষণে গোড়ালি আর কোমর জানান দিতে শুরু করেছে যে তারা ক্লান্ত, পেট থেকে থেকে ডাক দিয়ে জানান দিচ্ছে যে সে ক্ষুধার্ত।

আমরা সকলকে টুণ্ডে কাবাবির ঠিকানা জিজ্ঞাসা করতে করতে চললাম। সকলকে বলাটা একটু ভুল হবে। বাড়িঘর রাস্তাঘাট বাদ দিয়ে, কোনও নির্দিষ্ট দোকানের ঠিকানা জিজ্ঞাসা করার আমার নিয়ম আছে। আমি কক্ষনও ওষুধের দোকানওয়ালাকে ওষুধের দোকানের ঠিকানা, দরজির দোকানওয়ালাকে দরজির দোকানের ঠিকানা জিজ্ঞাসা করি না। কেন সেটা উদাহরণ দিয়ে বলি।

এই যে একচিলতে ফালির মাথায় রং দিয়ে আঁকাবাঁকা অক্ষরে “বব্বুকা লেজেন্ডারি কাবাব পরাঠা’ লিখে একটা ডেকচির পেছনে ম্লান মুখে বসে আছে বব্বু আর বব্বুর বন্ধু, লিজেন্ড হওয়া তো দূর অস্ত, পঁচিশ বছর বয়স হতেই দুজনের এখনও বিস্তর দেরি, তাদেরকে গিয়ে অন্য কোনও কাবাবের দোকানের ঠিকানা জিজ্ঞাসা করার কলজে আর যারই থাকুক, আমার নেই। আমরা ওদের দোকানের দিকে এগোচ্ছি দেখে ওদের মনে আশা জাগবে, উঠে দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধ লখনৌয়ি তহজিব সহকারে ভীষণ আগ্রহের সঙ্গে বব্বু বলবে, “আইয়ে আইয়ে, তশরিফ রাখিয়ে, বতাইয়ে আপকা কেয়া খিদমত কর সকতা হুঁ” আর আমি তার উত্তরে মুখ বেঁকিয়ে বলব, ‘আ মোলো যা, তোর খিদমত কে চেয়েছে, তোর কাবাব তুই খা গে, আমাকে টুণ্ডের রাস্তাটা বল দেখি” আর অমনি বব্বুর মুখের আলো নিভে যাবে – এই গোটা দৃশ্যটা কল্পনা করলেই আমার মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে।

কাজেই আমরা পথ চলতে চলতে বাদামওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলাম, বিস্কুটওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপেলওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আর কাবাবের দোকান দেখলেই হনহন করে হাঁটার স্পিড বাড়ালাম। সকলেই বলল, “আগে, আগে, আগে।” এমন সময় দূরে একটা দৃশ্য চোখে পড়ল।

রাস্তার পাশে চাদর পেতে, চাদরের ওপর একগাদা খুঁটিনাটি জিনিসপত্র সাজিয়ে একজন বয়স্ক বিক্রেতা বসে আছেন, আর তাকে ঘিরে বসেছেন আরও কয়েকজন বয়স্ক ভদ্রলোক। এঁরা অবশ্য মাটিতে বসেননি। রাস্তার ওপরেই কতগুলো কাঠের বেঞ্চি পাতা আছে, বসেছেন তাদের ওপর। হাত ঘুরিয়ে, দাড়ি দুলিয়ে ভয়ানক আড্ডা জমেছে। চণ্ডীমণ্ডপ নেই, রক নেই, গঙ্গার ঘাট নেই, আছে শুধু খোলা আকাশ আর সেই আকাশের তলায় কাঠের ল্যাগবেগে বেঞ্চি পেতে এঁরা ভরদুপুরে আড্ডা দিতে বসেছেন। নির্ভেজাল, খাঁটি আড্ডা।

দেখেই আমাদের মনে ভয়ানক ভক্তি জাগল। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা, চৌককে টুণ্ডে কাবাব কিধরসে যানা হোগা?”

আড্ডা থেমে গেল। ঘাড় ঘুরে গেল। এক নিমেষের নীরবতা। মোটা ঘোলাটে চশমা আমাদের মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার এক্স-রে করে নিল। বোঝা হয়ে গেল যা বোঝার।

“টুণ্ডে কাবাবি যানা হ্যায় বেটা? যাও যাও বিলকুল যাও। ইন্ডিয়া ফেমাস কাবাব নেহি, ওয়ার্ল্ড ফেমাস কাবাব।” এই না বলে তাঁরা রাস্তা বাতলে দিলেন। বাকিরা যা বলেছিল সেই রাস্তাই। আগে, আগে।

আমাদের আশার ফানুস চুপসে গেল। তবে কি ভুল ভেবেছিলাম? আশ করেছিলাম বাকিরা না জানে না জানুক, এঁরা লখনৌ শহরটাকে হাতের তেলোর মতো চিনবেন, সে আশা কি মিথ্যে? অন্যায়? ঘোলাটে চশমা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আমাদের মুখের দিকে। “শুক্রিয়া” বলে হাঁটা শুরু করতে যাব এমন সময় মেহেন্দি করা দাড়ি দুলে উঠল।

“অওর এক রাস্তা হ্যায়। শর্টকাট।”

জানতাম!

আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক উল্টোদিকে নাকি একটা গলি আছে। সোজা রাস্তা দিয়ে গেলে যত দূর, সে গলি দিয়ে গেলে টুণ্ডে কাবাবির দোকান তার অর্ধেক দূর। চমৎকার। কোথায়, কোথায়, কোন গলি? ঘোলাটে চশমা আঙুল তুলে রাস্তার ওপারের একটা জায়গা নির্দেশ করলেন।

আঙুল বরাবর তাকিয়ে আমি গলিটলি কিছু দেখতে পেলাম না। সেটা আশ্চর্যের কিছু নয়, আমি দেখতে পেলেই বরং আশ্চর্যের ব্যাপার হত, কিন্তু অর্চিষ্মানের মুখ দেখে বুঝলাম ও-ও দেখতে পায়নি। বলল, “চল, কাছে গিয়ে দেখি।”

বাস, অটো, রিক্সা, বাইক, ষাঁড়ের মিছিল ভেদ করে ওপারে পৌঁছলাম। কোথায় গলি? সারি সারি খুপরি দোকানের ঠাসা দেওয়ালে গলি তো দূর অস্ত, চুল গলার ফাঁকও নেই। এদিক হাঁটলাম ওদিক হাঁটলাম, নো গলি, নাথিং। খিদেয়, ক্লান্তিতে আমার কেমন রাগ হয়ে গেল। আমি জোরে জোরে বলে উঠলাম, “বস্‌স্‌স্‌, কোথায় বা টুণ্ডে আর কোথায়ই বা তার শর্টকাট গলি?”

যেই না বলা, অমনি একটা ঘটনা ঘটল। আমার আর অর্চিষ্মানের চোখের সামনে, রিলায়িবিল মেডিসিন শপ আর নরেশ পান ভাণ্ডারের ঠিক মাঝখান দিয়ে একটা গলি ভেসে উঠল ভুস করে। আমি আপনাদের এই গা ছুঁয়ে বলছি, ঠিক ওইখানটাতেই আমরা গত তিরিশ সেকেন্ড ধরে হাঁটাহাঁটি করছিলাম, কোথাও কোনও গলি ছিল না। অন গড ফাদার মাদার। আমি “দেখলে! দেখলে!” বলে চেঁচিয়ে উঠতেই অর্চিষ্মান আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে গলির ভেতর ঢুকে পড়ল। বুঝলাম, দেরি করতে চায় না। বলা যায় না, হয়তো দু’সেকেন্ডের জন্য খুলেছে, এক্ষুনি আবার বুজে যাবে।

গলির ভেতর পা দিয়ে আমাদের মাথা গুলিয়ে গেল। কোথায় লাগে নবাবের ভুলভুলাইয়া। সে তো যতই হোক ইঞ্জিনিয়ারের খাতায় আঁকা, রাজমিস্ত্রির হাতে বানানো। এ ভুলভুলাইয়া রীতিমত জ্যান্ত। ঠিক করে কান পাততে জানলে স্পষ্ট শোনা যাবে তার মৃদু নিঃশ্বাসপ্রশাস। এ ভুলভুলাইয়া তৈরি হয়েছে কে জানে কত শত বছর ধরে, হয়তো এখনও রোজ রোজ একটু একটু করে বদলাচ্ছে তার নকশা। রোজ একটু একটু করে নুয়ে পড়ছে নীলসাদা মার্বেলের কাজ করা ঝুলবারান্দা, ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে গলিটায় কামড় বসাচ্ছে দুপাশের উঁচু বারান্দা। এগোতে এগোতে যেদিন গলিটাকে গপ করে গিলে ফেলবে সেদিন আর একটা গলি জন্মাবে . . . হয়তো ওই . . . ওই টিউবওয়েলটার পাশ দিয়ে যেখান দিয়ে একটা সাইকেল বেরোলো এক্ষুনি। “ও দাদা শুনছেন, এটাই কি টুণ্ডে কাবাবির রাস্তা?” চেঁচিয়ে ওঠার আগেই আবার সেঁধিয়ে গেছে উল্টোদিকের দেওয়ালের ফাঁকে। এই বাড়িগুলোয় কারা থাকে? তারা দম নেয় কী করে? দোকানবাজার করতেই বা যায় কোথায়, সেই বড় রাস্তায়? দেখেছ, দোকানের কথা ভাবতেই একটা দোকান বেরিয়ে পড়েছে। দোকানের নাম ‘মাস্টারজী কি কাপড়ে সিলাই কি দুকান।’ এই ভরন্ত বেলায় অর্ধেক শাটার ফেলা কেন? অর্চিষ্মানের হাতের টান অগ্রাহ্য করে আমি শাটারের তলা দিয়ে মুণ্ডু গলিয়ে দিলাম। “ইয়ে টুণ্ডে কাবাবি কা রাস্তা হ্যায়, ভাইসাব?” যা ভেবেছিলাম তাই। আধবোজা শাটারের তলায় দিব্যি দোকান চলছে। দেওয়ালের দিকে মুখ করে সেলাই মেশিনের সামনে বসে আছে দু’তিন জন। কাউন্টারের পেছনে গলায় ঝুলিয়ে হাতে রঙিন ইরেজার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং মাস্টারজী। কাউন্টারের এদিকে গাঢ় বেগুনি রঙের সলমাচুমকি বসানো সালওয়ারকামিজ পরা একজন হৃষ্টপুষ্ট ভদ্রমহিলা। “ইয়ে টুণ্ডে কাবাবি যানে কা রাস্তা হ্যায়, ভাইসাব?” আমি হাল ছাড়ছি না। মাস্টারজীর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল কি? মাস্টারজীর ঘাড় নড়ছে। ওপরে নিচে। ইতিবাচক।

গলিটা কতক্ষণ আমাদের পথ দেখাল মনে নেই। হঠা একজায়গায় গিয়ে গলিটা নিজের মুখ খুলে আমাদের উগরে দিল, আর অমনি দেখলাম এদিকওদিক থেকে আমাদের গলিটার মতোই সরু সরু দুটো গলি এসে মিশেছে, আর সেই ত্রিবেণী সঙ্গমের ঠিক মধ্যিখানে গমগম করছে একটা দোকান।


টুণ্ডে কাবাবির দোকান। কোথাও নাম লেখা নেই, দরকারও নেই। রোজ সকালে যে সূর্য ওঠে, তার গায়ে কি নাম লেখা থাকে?

দোকানের মুখের বেশিরভাগটাই দখল করে রেখেছে উনুন আর উনুনের সামনে জটলা করা রসুইকরেরা। সে সবের পাশ কাটিয়ে চিলতে সিঁড়ি দিয়ে আমরা দোকানের ভেতর ঢুকে এলাম।

আর অমনি আবার ম্যাজিক।

একটা বিস্তৃত রহস্যময় গুহার মতো টুণ্ডে কাবাবির শতবর্ষপ্রাচীন দোকান আমাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করল। এত জায়গা! এই গলির ভেতর? উঁচু সিলিং থেকে কয়েকটা উন্মুক্ত সি এফ এল সাদা সি এফ এল বাল্ব ঝুলছে, তাতে গুহার অন্ধকার যেটুকু কেটেছে তাতে দেখতে পাচ্ছি কতগুলো চেয়ারটেবিল, তাদের মধ্যে কয়েকটায় কয়েকজন ছায়ামূর্তি বসে আছে। আর দেখতে পাচ্ছি দেওয়ালে কে জানে কতদিনের তেলকালিঝুলের ছোপ, কোণায় রাখা নোংরা গ্যাস সিলিন্ডার। সিলিন্ডারের পাশে দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে রাখা লাল হ্যান্ডেলওয়ালা ঝাঁটা। সেটা এখনও কাজে লাগেনি কারণ মেঝের ঠিক মাঝখানটায় কে যেন জল ফেলে রেখেছে, তাতে ভাসছে একটা প্লাস্টিক আর গুটকার মুখ খোলা প্যাকেট।

আরও একটা জিনিস চোখে পড়েছে আমার ততক্ষণে। ঝাঁটা ঠেসান দেওয়া দেওয়ালের উল্টোদিকের দেওয়ালে ঝুলন্ত একটা ছবি। এককালে রঙিন ছিল। ফ্রেমের ভেতর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, আর কেউ নয়, স্বয়ং টুণ্ডে কাবাবি। জনাব হাজি মুরাদ আলি।

হাজি মুরাদ আলির বাপপরদাদারা বহুদিন ধরে নবাবদের তাঁদের হাতের কাবাব খাইয়ে আসছিলেন। কোনও এক নবাবের (কেউ কেউ বলে কোনও হেঁজিপেঁজি নবাব নন, খোদ ওয়াজিদ আলি শাহ) দাঁত পড়ে যাওয়ায় তাঁর চিবোনোর ক্ষমতা লোপ পেয়েছিল, কিন্তু মাংস খাওয়ার শখ বাকি ছিল ষোলো আনা। তখন নবাবের ইন্দ্রিয়সম্ভোগ চরিতার্থ করতে তৈরি হল গালাওটি, মুখে দিলেই গলে যায়, এমন কাবাব। জনাব হাজি মুরাদ আলি এই ধরণের কাবাব বানাতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। পুরোনো লখনৌয়ের আকবরি গেটের কাছের এক গলিতে দাঁড়িয়ে হাজি মুরাদ তাঁর কাবাব বিক্রি করতেন। শোনা যায় সে কাবাবে নাকি একশো পঁয়ষট্টি রকমের মশলা পড়ত, চন্দনকাঠের গুঁড়োশুদ্ধু।

স্বাদেগন্ধে হাজিসাহেবের কাবাব তো সেরা ছিলই, কিন্তু সে কাবাবের আরও একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। অ্যাকচুয়ালি, বৈশিষ্ট্য কাবাবের ছিল না, ছিল হাজিসাহেবের। তাঁর একটি হাত ছিল বিকল। আজ থেকে একশো বছর আগে ভদ্রতা, সংবেদনশীলতা ইত্যাদির সংজ্ঞাগুলো অন্যরকম ছিল, যার পায়ে অসুবিধে তার নাম যা-ই হোক না কেন সবাই থাকে ‘লংড়ে’ বলে ডাকত, যার হাতে অসুবিধে তাঁকে ‘টুণ্ডে’ বলে।

গুহার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভাবছি এর পরের ধাপটা কী, এমন সময় পেছন থেকে একটা চিকার ভেসে এল।    

“দো কাবাব লাগাও!”

অমনি একটা রোগামতো ছোকরা, আঁটো অ্যাসিডওয়াশ জিনস আর ততোধিক আঁটো সাদা ফুলহাতা টিশার্ট পরা, দু’হাতে দুটো স্টিলের প্লেট এনে একটা টেবিলে ঝনাৎ করে ফেলেই আবার হাওয়া হয়ে গেল।

“আমাদের দিল নাকি গো?”

আশেপাশে আমরা ছাড়া আর কোনও অপেক্ষারত খরিদ্দার ছিল না, কাজেই ধরে নিলাম আমাদেরই দিয়েছে। এই জায়গাটার কায়দাকানুন ক্রমশ যেন স্পষ্ট হয়ে আসছে। গলি যেখানে নিয়ে যাবে, আমাদের গন্তব্য সেটাই; কাবাবের প্লেট যেখানে পড়বে, আমাদের টেবিল সেটাই।

মেঝের জল বাঁচিয়ে গুটিগুটি টেবিলে এসে বসলাম। বসতে না বসতেই ঝনাৎ করে আর একটা স্টিলের প্লেট এসে পড়ল। আর তার ওপর দু’খানা উল্টে তাওয়া কি পরাঠা।


একটুখানি রুটি ছিঁড়ে কাবাবে জড়িয়ে মুখে পুরলাম। আর অমনি আমার চোখের সামনে থেকে জল, ঝাঁটা, গুটকার প্যাকেট সব ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে গেল। মনে হল আমি একটা ভীষণ জমকালো কার্পেটের ওপর বসে উড়ে উড়ে চলেছি, কার্পেটের চারদিকে নীল আকাশের মধ্যে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে পেঁজা তুলোর মতো ধপধপে সাদা রঙের মেঘ। আমি সে মেঘের কোণা একটুখানি ছিঁড়ে যেই না মুখে দিয়েছি অমনি দেখি, ও মা এ তো মেঘ নয়, এ তো লখনৌয়ের চৌকের গলির টুণ্ডে কাবাব, একশো পঁয়ষট্টি রকমের মশলা দিয়ে বানানো, অল্প অল্প চন্দনকাঠের সুবাসও যেন পাওয়া যাচ্ছে?


আমরা খেয়ে চললাম। প্লেটের পর প্লেট শেষ হয়ে গেল, আর কোথা থেকে অ্যাসিড জিনস আর সাদাফুল হাতা টি শার্ট পরা ছেলের দল দৌড়ে দৌড়ে এসে খালি প্লেটের ওপর কাবাবশুদ্ধু প্লেট বসিয়ে যেতে লাগল। আমি অর্চিষ্মানের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, কেমন একটা অনির্বচনীয় আবছা হাসিতে ভরে আছে। বুঝলাম ও-ও কার্পেটে চড়ে ভেসে চলেছে মেঘের, থুড়ি, টুণ্ডে কাবাবের সমুদ্রের ভেতর দিয়ে। আহা, ভাসুক, ভাসুক, আনন্দ করে ভাসুক। এদিকে আমাদের রুটি শেষ হয়ে গেছে, একটা ছেলে দেওয়ালে হেলান দেওয়া লাল ঝাঁটাটা দিয়ে গুটকার প্যাকেট আর জমা জল ঝেঁটিয়ে ঝেঁটিয়ে জমা করছিল, এই ছেলেটা আগের ছেলেটা নয়, কিন্ত্ এর পরনেও অ্যাসিড ওয়াশ জিনস আর ফুলহাতা সাদা টি শার্ট, আশ্চর্য ব্যাপার। আমি তাকে আমাদের রুটির খালি প্লেটটা দেখালাম, সে ঝাঁটা ফেলে দৌড়ে গিয়ে একতাড়া রুটির বান্ডিল নিয়ে এসে তার থেকে একটা আমার পাতে তুলে দিল। ওই ঝাঁটাধরা হাত দিয়েই। হু কেয়ারস? আহা এই রুটিগুলো সদ্য ওই উল্টোনো কড়াইটা থেকে নামিয়েছে গো, একেবারে তপ্ত্ গরম। আচ্ছা, এরা এটাকে পরোটা কেন বলে? পরোটা তো কেমন শক্ত আর মোটা হয়, এ তো আমাদের লুচির থেকেও মোলায়েম। কী বলছ ভাই? নতুন ব্যাচ কাবাব সবে নেমেছে? হ্যাঁ হ্যাঁ, নিয়ে এস এক, আচ্ছা দু’প্লেটই আনো বরং। ওরে বাবা, এ তো আরও উমদা দেখছি, পরোটা দিয়ে ছিঁড়ে মুখ পর্যন্ত আনার আগেই ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। আগের ব্যাচটা ওই টেকো লোকটা বানাচ্ছিল, এখন ওই টুপি পরা ভদ্রলোক কাবাবের দায়িত্ব নিয়েছেন, ইনিই বোধহয় হাজি মুরাদের ডিরেক্ট বংশধর, তাই না?

পেট কখন ভরে গেল, কখন কার্পেট থেকে বাস্তবের মাটিতে নেমে এলাম মনে নেই। ঘোর কাটল একটা ভয়ানক শব্দে।

আমাদের পাশের টেবিলের ভদ্রলোক। খাওয়া শেষ করে বেসিনে হাত ধুতে গেছেন। বেসিনটা আমার ডান কানের থেকে ঠিক তিন হাত দূরে। ভদ্রলোক সশব্দে কুলকুচি করছেন। একবার, দু’বার, তিনবার। ডেন্টাল হাইজিন নিয়ে ভয়ানক সতর্ক বোঝা যাচ্ছে। কুলকুচি শেষ। এইবার ভদ্রলোক জিভ ছুলতে শুরু করেছেন। আমার যদি ইচ্ছাশক্তির জোর থাকত তাহলে আমি এই মুহূর্তে নিজেকে সাময়িক বধিরত্বের বর দিতাম। অর্চিষ্মান আমার মুখটা দেখে হাসছে। জিভ ছোলা শেষ। এইবার ভদ্রলোক একটা আওয়াজ করলেন। ওঁর শ্বাসনালীর সমস্ত অবাঞ্ছিত পদার্থ ছিটকে বেসিনের ওপর বেরিয়ে এল।

আমি মরে গেছি। অর্চিষ্মানের চোখেমুখে দুঃখের লেশমাত্র নেই, বরং এখন আর হাসি চেপে রাখতে পারছে না। এইবার আমাকে উঠে ওই বেসিনে যেতে হবে। না গিয়ে উপায় নেই। হাত ভর্তি তেল। মেঘের মতো পরোটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে পোরার সময় এই মুহূর্তটার কথা মাথাতেই আসেনি।

কিন্তু যখন বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলাম তখন মনে ছিল! কখন কোথায় কাজে লেগে যায় ভেবে একটা ছোট্ট বোতল আমি ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম। এইবার সেটা কাজে লাগানোর সময় হয়েছে। বাঁহাত দিয়ে সন্তর্পণে শিশিটা ব্যাগ থেকে বার করে আনলাম। হ্যান্ড স্যানিটাইজার। দু’ফোঁটা হাতে নিয়ে ঘষলেই তেলের বংশ নির্বংশ, পড়ে থাকবে শুধু ফুলেল ঘ্রাণ।

আমি বসে বসে হ্যান্ড স্যানিটাইজ করতে লাগলাম। দেওয়াল থেকে হাজিসাহেবের গভীর, করুণ চোখদুটো আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি সে চোখে চোখ ফেললাম না। মনে মনে শুধু বললাম, “আমাকে ক্ষমা করে দাও হাজিসাহেব, এই তোমার দুটি পায়ে পড়ি।”

                                                                                                                                       (চলবে)

41 comments:

  1. daru darun ....ek nishwase porlam !!- tinni

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ, তিন্নি।

      Delete
  2. baadshahi angti dekhe obdhi bhabchi lucknow ta jete hobe.. ar ajkei emon opurbo lekha.. tomar live commentary er moto bornona.. uff darun lagche porte.. joldi next part ta lekho.. :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, ঊর্মি। লখনৌ ঘুরতে যাস নিশ্চয়, খুব ভালো লাগবে।

      Delete
  3. Darun ghurlam ... Lucknow darun laglo... next part er opekhai roilam...

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, ইচ্ছাডানা।

      Delete
  4. 1. DAROON lekha. 'Badshahi Angti' cinemar debacle tar por Lucknow er maan-somman bachatey eirom lekhar dorkar chhilo.

    2. Tomar lekha porte porte mone holo, Ram lok ta kirom jano iye.

    3. Ami kichhu bochhor aagey ekbar Lucknow giyechhilam apisher kaajey. Kaaj sheshey adh bela beche chhilo. Tokhon ekta auto chepe urdhoshwasey tundey kabab er dikey dourechhilam. Auto wala onek onunoy binoy korleo chikon er salwar kameez er dokaner dikey paa barai ni. Sheshmesh birokto mukhe bhodrolok dhomkechhilen "Aap kaise ajeeb tourist ho? Kuchh kharidna nahi chahte, sirf khana khana kar rahe ho!" :/

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, বিম্ববতী। তুমি কি বাদশাহী আংটি কলকাতায় দেখলে? আমি তো কবে এখানকার হলে আসবে আশায় বসে আছি।

      লখনৌয়ের অটোওয়ালাগুলো সত্যি, কিছু সেলসম্যান। সবসময় কিছু না কিছু গছাবার জন্য মুখিয়ে আছে।

      Delete
  5. আরে, আমরা তো বোম্বাইয়ের বোম্বেটের শহরে গিয়েছিলাম। আর আপনি দেখছি বাদশাহী আংটি। লখনৌ ভালো, কিন্তু পাহাড় আর সমুদ্র মিলিয়ে বোম্বে একেবারে চ্যাম্পিয়ন শহর মশাই। তবে মুম্বাইভ্রমনার্থীদের তো আর এরকম লেখার হাত নেই, তাই হেরেই গেল বোম্বে। লখনৌ বার দুয়েক গিয়েছি। তাই একটি খতেন নিই, আপনি কি কি টাচ করলেন।
    তেহজিব - চেক
    কাবাব - চেক
    স্থাপত্য - চেক
    গজল - পেন্ডিং
    পান - পেন্ডিং
    চিকনকাজের কুর্তি - পেন্ডিং

    লখনৌয়ের অটোওয়ালারা সেলসম্যান নয়, তারা কমিশন এজেন্ট। কুর্তার দোকানে নিয়ে গেলে কমিশন পাবে, তাই সেখানে নিয়ে যাবার জন্য ঝুলোঝুলি করে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. সে তো বটেই, দেবাশিস। ওদের কি আর নিজের দোকান আছে যে সে দোকানে বসে মাল বেচবে? তবে ঝুলোঝুলিটা বড় বেশি করে। হোটেল দিয়ে শুরু হয়েছিল, ফেরার সময় ট্রেন ছাড়তে আর পনেরো মিনিট দেরি, জ্যামে দাঁড়িয়ে প্রস্তাব দিচ্ছে ভালো চিকনের দোকানে নিয়ে যাওয়ার। হাসব না কাঁদব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

      আপ্নারা বোম্বে ভালো ঘুরেছেন শুনে খুব ভালো লাগল। ওখানকার আবহাওয়া নিশ্চয় দারুণ মনোরম। পান ঠিক সে অর্থে খাওয়া হয়নি বটে, কিন্তু অন্য একরকম পান খেয়েছিলাম সেটা পরের কিস্তিতে বলব।

      Delete
  6. prothome last weekend e badshahi angti, tarpor tomar ei lekha. lucknow ebar jetei hocche. next part er jonno wait kore roilam.

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ হ্যাঁ কুহেলি, লখনৌ যাওয়ার মতোই জায়গা। চলে যাও।

      Delete
  7. সরি, একটা কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। তশরিফ ফরমানো যায় না। তশরিফ আনতে বা রাখতে হয়। তশরিফ লাইয়ে অথবা তশরিফ রখিয়ে। মুড খারাপ থাকলে তশরিফ লে যাইয়ে ও বলা যায়, কিন্তু সেটা সখত বেইজ্জতি হয়ে যাবে, এবং খুনসে তার বদলা নিতে হবে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ। এক্ষুনি ঠিক করে দিচ্ছি। উর্দুর উৎসাহে যা তা লিখে গেছি আরকি।

      Delete
  8. বর্ণনা করা কাকে বলে, কোই তুম্‌সে পুছে, বর্ণনামাস্টার। তোমার লেখা হচ্ছে চিত্রকল্প সাহিত্য। আমি যখন লক্ষ্ণৌ গিয়েছিলাম, সারাদিন খালি চিকনশিল্পীদের কাছে বসে থেকেছি। তখন ওইটাই আমার centre of attraction ছিল। আজ তোমার লেখা পড়ে মনে হচ্ছে সত্যিই কাজটা একচক্ষু হরিণের মত হয়ে গেছে। আবার যেতে হবে আর তোমাকে তো নিজে থেকে না গেলে বেঁধে নিয়ে যেতে হবে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরে মালবিকা, আমাদেরও ঘোরা কিছু চক্ষুষ্মান হরিণের মতো হয়নি। খালি দুয়েকটা মিনার আর খাওয়া। চিকন কাজ তো দেখার মতোই বিষয়। ঠিকই করেছিলেন আপনি। লেখা আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম।

      Delete
  9. খুবই ভালো হয়েছে লেখা, সে কথা আর নতুন করে কি বলব। আপনার কাবাবের গলিটা দেখা যাচ্ছে রুম অফ রিকোয়ারমেন্টের মতন। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। আমার নিজের প্রথম লখ্নৌ দেখাও ঐরকম একদিনের ঝটিকা সফরে, এলাহাবাদ থেকে নৈনিতাল যাওয়ার পথ ব্রেক জার্নি করে। এতরকম খাওয়াদাওয়া হয়নি অবশ্য। গরমকাল ছিল, তাই ইমামবাড়া আর রেসিডেন্সি দেখতেই কাহিল হয়ে পড়েছিলাম।

    এ প্রসঙ্গে বলি, বাদশাহী আংটি দেখলাম। প্রচুর নিন্দে শুনছি সিনেমাটার, তবে আমার খুব ভালো লেগেছে। এটা মানছি যে কিছুর একটা অভাব। সেটা কি ঠিক জানিনা, হয়ত grandeur বলা যেতে পারে। তবে সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার যে বাদশাহী আংটির ফেলুদা-তোপসে কিন্তু সোনার কেল্লা বা জয় বাবা ফেলুনাথের ফেলুদা-তোপসে নয়। তোপসে ইস্কুলে পড়ে, ফেলুদা ব্যাঙ্কে চাকরির ফাঁকে শখের গোয়েন্দাগিরি করে। সেদিক দিয়ে আমার মতে (এটা ইন্টারনেটের বাইরে বললে নির্ঘাত মারধোর খাব) শুধু এপিয়ারেন্স-এ আবির সৌমিত্রর থেকেও মানানসই ফেলুদা। অভিনয়ের দিক দিয়ে নয় অবশ্যই, সৌমিত্রর মতন সাবলীল ভাবে ও রোলটা আর কোনদিন কেউ করতে পারবে বলে মনে হয়না। তবে সিনেমাটায় বইটা প্রায় হুবহু উঠে এসেছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ, সুগত। আমি তো ভাবছিলাম বারো নম্বর গ্রিমল্ড প্লেস। এগারো নম্বরের পাশেই তেরো নম্বর, সকলে ভাবে কর্তৃপক্ষ ভুল করেছেন বুঝি, কিন্তু আপনি যদি দুটো বাড়ির দেওয়ালের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে খুব মন দিয়ে ভাবেন যে আমি বারো নম্বরে যেতে চাই, তাহলেই ভুস করে চোখের সামনে বারো নম্বর ভেসে উঠবে।

      ইস, সবাই বাদশাহী আংটি দেখে ফেলেছে, খালি আমি বোকার মতো বসে আছি। চারদিকের গালিগালাজের মধ্যে আপনার মতামতটা সত্যি রিফ্রেশিং। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে সন্দীপ রায়কে (এবং ওঁর সিনেমাকে) পছন্দ করি। এবং বিশ্বাস করি সত্যজিৎ রায়ের ছেলে হয়ে না জন্মালে ওঁর কপালে আর একটু মানমর্যাদা জুটত।

      Delete
  10. Ses obdhi apni dewal er samne bollen khul ja sim sim ar goli beriye gelo!!! Btw eto chobi tobi je dichhen, porer bar kheye pete byatha hole amake dos deben na jeno..

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, অর্ণব, না সে ভয় নেই। বন্ধুরা লোভ দিলে পেট খারাপ হয় না।

      Delete
  11. উফফ দুর্ধর্ষ!! গলিটার নম্বর আবার nine and three quarters নয় তো !

    ReplyDelete
    Replies
    1. বারো নম্বর গ্রিমল্ড প্লেসও হতে পারে, রুণা, কিছুই বলা যায় না।

      Delete
  12. darun darun....r o ghorar apekkhay roilam

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, দেবশ্রী। আমিও সেই অপেক্ষাতেই আছি। তোমাকে আমার শুভ নববর্ষের অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই।

      Delete
  13. baap re! eto madhyamik-er 20 nomborer rochona! last-e ekta koteshaan jurey dilei 20-te 20 diye ditam :)
    jokes apart, lekhata durdanto hoyechhey.

    ReplyDelete
    Replies
    1. ইস, লাস্টে ভেবেছিলাম ওই যে ওই গানটা "যব ছোড় চলে লখনৌ নগরী" জুড়ে দেব, কেন যে দিলাম না...

      থ্যাংক ইউ, সোমনাথ। হ্যাপি নিউ ইয়ার।

      Delete
    2. Happy new year khub baaje cinema. Borong bola jak "ingriji noboborsher shubhechha"!

      Delete
    3. অলরাইট ভেরি গুড, সোমনাথ। ইংরিজি নববর্ষের অনেক শুভেচ্ছা রইল তোমার ও তোমার পরিবারের প্রতি।

      Delete
  14. aare yeh to mera shaher hai. Tumi badshahi angti dekhbe dyakho, kintu shatranj ke khiladi abar dekhe nitey bhulo na....jab chor chale lucknow nagari, kaho haal adam par kya guzri"

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরে বা, তুমি লখনৌয়ি নাকি শম্পা? খুব ভালো। আমি তো ইদানীং সর্বক্ষণ এই গানটা গুনগুন করছি।

      Delete
  15. দারুণ হয়েছে! বিশেষ করে 'একটুখানি রুটি ছিঁড়ে কাবাবে জড়িয়ে মুখে পুরলাম। আর অমনি আমার চোখের সামনে থেকে জল, ঝাঁটা, গুটকার প্যাকেট সব ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে গেল। মনে হল আমি একটা ভীষণ জমকালো কার্পেটের ওপর বসে উড়ে উড়ে চলেছি, কার্পেটের চারদিকে নীল আকাশের মধ্যে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে পেঁজা তুলোর মতো ধপধপে সাদা রঙের মেঘ। আমি সে মেঘের কোণা একটুখানি ছিঁড়ে যেই না মুখে দিয়েছি অমনি দেখি, ও মা এ তো মেঘ নয়, এ তো লখনৌয়ের চৌকের গলির টুণ্ডে কাবাব, একশো পঁয়ষট্টি রকমের মশলা দিয়ে বানানো, অল্প অল্প চন্দনকাঠের সুবাসও যেন পাওয়া যাচ্ছে?'
    ঐ দোকানে আমিও খেয়েছিলাম ২০০৫-এর ৩১শে ডিসেম্বার... এখনো ভুলিনি... পরের পর্ব কবে আসছে?

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরে থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ, তপোব্রত। টুণ্ডে কত ভালো লেগেছিল বুঝতে পারছি, কারণ দিনক্ষণ মনে আছে একেবারে। অবশ্য ভালো লাগার মতোই ব্যাপার।

      Delete
  16. Lucknow agey gechi, tobe tomar tuned kababir description pore abaro jete ichhey korchhey!

    ReplyDelete
    Replies
    1. চলে যাও, রুণা। লখনৌ আগে দেখেছ যখন নিশ্চয় জান, আর এক বার, কিংবা বার বার দেখলেও ক্ষতি নেই।

      Delete
  17. Anabadya lekhaa. kakahno jaoya hobe ki na janina.. kintu matramugdher mato pare gelam puro lekhata.

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।

      Delete
  18. Office er kaje faki die ektu edik sedik blog e ghure beracchilam. Ghum o pacchilo. Kintu abantor er sathe sathe hilli dilli r lakhnow ghute ghurte ghum ta kete gelo r somoy tao hush kore periye gelo. etodin khali golper boi pore katatam. Blog er neshata mone hocche ebar dhorei felbo apnar doulote- Suhani Mitra

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, আমি অন্য সব নেশার বিপক্ষে হলেও ব্লগের নেশার (বিশেষ করে সেটা যদি অবান্তর হয়) খুবই সপক্ষে, সুহানি। আপনার নামটা খুব অন্যরকম আর সুন্দর। মন্তব্য জানানোর জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

      Delete
  19. খাবারের বিল কতো এসেছিলো?

    ReplyDelete
  20. Uff, dibbi! Amar ebar Lucknow jawa lan kora chilo, kintu holo na aaaaaa!!!

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরেকবার প্ল্যান করে নিন।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.