December 05, 2014

২০১৪ রেজাল্ট ২০১৫ রেসলিউশন



আপনাদের মনে নেই হয়তো, কিন্তু আমার বেশ মনে আছে প্রায় এক বছর আগে অবান্তরে আমি একটা পোস্ট লিখেছিলাম। আসন্ন দু’হাজার চোদ্দো সালে আমি আমার জীবনে কী কী পরিবর্তন আনতে চাই সেই নিয়ে। ডিসেম্বর পড়ে গেছে। দু’হাজার চোদ্দো প্রায় শেষ। সময় এসে গেছে, কতটা পরিবর্তন এল আর কতটাই বা বাকি রয়ে গেল সে সবের হিসেব নেওয়ার।

হিসেব মেলার সম্ভাবনা প্রথমেই খানখান হয়ে গেল যখন আবিষ্কার হল যে দু’হাজার চোদ্দোর মুখ চেয়ে নেওয়া রেসলিউশনগুলোই আমার মনে নেই। চমৎকার। গলায় বিদ্রূপ ঢেলে, নিজের পিঠ চাপড়ে বললাম আমি। চমৎকার। স্কুলে বই নিয়ে যেতে ভুলে গেলে স-দিদিভাই যেমন বলতেন। স-দিদিভাই র- বা ম-দিদিভাইয়ের মতো রগচটা ছিলেন না। তাঁর হাতে স্কেল উঠতে দেখা যায়নি কখনও। এমনকি মেয়েদের কচি গালে বা কানে স-দিদিভাইয়ের হাতকেও উঠতে দেখা যায়নি কখনও। তবু মেয়েরা তাঁকেই ভয় পেত সব থেকে বেশি। স্কেলের অভাব স-দিদিভাই মিটিয়েছিলেন জিভের ধার দিয়ে। আর ভুরুর সামান্য উত্থান, আর ঠোঁটের কোণের সামান্য বক্রতা দিয়ে।

ধরে মারলে তবু সান্ত্বনা পাওয়া যায়, ভালোর জন্যই মারছে বুঝি। সংশোধনের আশায় পিঠে স্কেল ভেঙে দু’খানা করছে। কিন্তু যারা ওসব খাটুনির রাস্তায় যায় না, শাসন করতে গিয়ে যারা খালি মুখ বেঁকিয়ে বলে, “কিস্যু হবে না। বাবামা ফালতু স্কুলের মাইনে দিচ্ছে” তবে সন্দেহ হয় কিস্যু না হলেই বোধহয় তারা খুশি হবে। টিভি দেখতে দেখতে, কান চুলকোতে চুলকোতে বলবে, “বলেছিলাম।”

আমিও আমার মনকে বললাম, “কিস্যু হবে না। ঢাক পিটিয়ে লোক জানিয়ে খালি বছর বছর রেসলিউশন নাও আর ভোলো। বলেছিলাম।”

বই-ভুলে-যাওয়া মেয়ে যেমন মুখ নিচু করে পাশের মেয়ের বই ধার চাইতে যায়, আমার বকুনি-খাওয়া-মন তেমনি করে আগের বছরের রেসলিউশনস খুঁজতে গেল। গিয়ে তার মাথা লজ্জায় আরও নিচু হয়ে গেল। দেখা গেল গোটা বছরের জন্য রেসলিউশন ছিল মোটে তিনটে। মোটে তিনটে। সেটুকুও সে মনে রাখতে পারেনি। ছি ছি ছি। কিস্যু হবে না।

যাই হোক, যা হওয়ার হয়ে গেছে, মনকে আর লজ্জা দিয়ে লাভ নেই। আসল কাজ কতটা কী হয়েছে আসুন দেখি।

২০১৪ রেজাল্ট

১. দৈনিক আধঘণ্টা করে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজঃ করিনি। মাঝে মাঝে কোনও শনিবার সকালে আমার সঙ্গে সঙ্গে আমার বিবেকেরও ঘুম ভাঙলে মিনিট দশেক হাত পা নেড়েছি হয়তো। ব্যস, ওই পর্যন্তই। তার প্রমাণ ফুটে বেরোচ্ছে আমার সর্বাঙ্গ দিয়ে। চুল, ত্বক, হাড়, হজমশক্তি, মাথা, মন – সব খারাপ হয়ে গেছে। ব্যায়াম করলেই কি ভালো হবে? ডাক্তারবাবু বলেন, হবে হবে। মা বলেন, না হয়ে যাবে কোথায়। না করে যে কিছু হচ্ছে না, সে তো আমি নিজে দেখতেই পাচ্ছি।

এই রেসলিউশন রক্ষায় আমি পেয়েছি শূন্য।

২. ক্ষিদে পেলে খাওয়া, অক্ষিদেয় না খাওয়াঃ এই নিয়ম মেনে চলতে গেলে দু’হাজার চোদ্দো সালের নব্বই শতাংশ খাওয়া আমার বাদ চলে যেত। বেলা এগারোটার বিস্কুট, দুপুর আড়াইটের কফি, সাড়ে চারটের চা, ছ’টার ঝালমুড়ি – সব। বাদ গেলে ক্ষতি হত কি কিছু? অনেক ভেবেও বার করতে পারলাম না। হয়তো লাঞ্চ ডিনারের ক্ষিদেটা আর একটু বেশি পেত।

অর্থাৎ, এই রেসলিউশন রক্ষাতেও আমি গোল্লা পেয়েছি।

৩. প্রকাশ্যে কারও নামে নিন্দেমন্দ না করাঃ এটা একটু গোলমেলে রেসলিউশন। যদি বলি এই রেসলিউশন রক্ষায় আমি সফল হয়েছি তাহলে এই অবান্তরেরই কোনও পাঠক হয়তো আমাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলবেন, “সে কী কথা? এই তো সেদিন অমুকের সম্বন্ধে অতগুলো খারাপ কথা বললেন, অমুকে আপনার কোনও ক্ষতি না করা সত্ত্বেও। প্রমাণ চান তো চ্যাট খুলে দেখিয়ে দিচ্ছি।” কাজেই সে দাবি আমি করছি না। আমি শুধু এইটুকু বলছি যে আগের বছরগুলোর তুলনায় আমি পি এন পি সি অনেক কম করেছি। আড়ালে করেছি। মায়ের সঙ্গে করেছি, তিন্নির সঙ্গে করেছি, সবথেকে বেশি করেছি অর্চিষ্মানের সঙ্গে। কিন্তু আড্ডায় গোল হয়ে বসে হাঁটু চাপড়িয়ে একে গরু তাকে ছাগল বলার অপরাধটা আমি এ বছরে একবারও করিনি।

মোদ্দা কথা, এই পরীক্ষাটায় নিজেকে আধ নম্বর দিতে দিন, আপনাদের দুটি পায়ে পড়ি। ফেল তো করবই। একেবারে গোল্লা পাইয়ে ফেল করাবেন না দয়া করে।

তাহলে রেজাল্ট কী বেরোলো? তিনে আমি পেয়েছে আধ, একশোয় সতেরোও নয়। বাঃ। চমৎকার।

২০১৫ রেসলিউশন

আরও চমৎকার ব্যাপার হচ্ছে যে এর পরেও আমি আবার সামনের বছরের জন্য রেসলিউশন নেওয়ার সাহস দেখাচ্ছি। কেন দেখাচ্ছি সেটা বলার আগে আপনাদের একটা গল্প বলে নিই।

সাধারণত আমার আর অর্চিষ্মানের টিভি দেখার পছন্দ মেলে না। ওর ভালো লাগে রাজনীতি, আমার ভালো লাগে রঙ্গরস। ওর ভালো লাগে সিএনএন আইবিএন, আমার ভালো লাগে সংগীত বাংলা।

একমাত্র যে অনুষ্ঠানটা দেখা নিয়ে আমাদের পছন্দের কোনওদিন অমিল হয়নি সেটা হল কলকাতা সি আই ডি। এখন সিরিয়ালটা বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু যখন হত তখন ওটা দেখার জন্য আমরা দুজনেই একই রকম ব্যাকুল থাকতাম। অফিসফেরতা সি আর পার্কের গলি ফাঁকা পেলে দুজনেই দৌড়তাম পাছে শুরুটা মিস হয়ে যায়। সি আই ডি কলকাতা অফিসের দুর্দান্ত অফিসার রণজয় যখন ভুরু কুঁচকে, নাকের পাটা ফুলিয়ে, ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে, চিবুকে আঙুল ঘষতে ঘষতে বলতেন, “হুম্‌ম্‌ম, গুলি বুক দিয়ে ঢুকেছে, তার মানে . . . তার মানে . . . ইউরেকা! তার মানে নিশ্চয় কিলার ভিকটিমের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল” তখন দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাতাম।

“দেখলে কেমন বুদ্ধি খরচ করল? তুমি হলে পারতে?”

যে গল্পটা আমি আপনাদের বলতে যাচ্ছি সেটা কলকাতা সি আই ডি-র একটি পর্বের একটি দৃশ্যের গল্প। দৃশ্যটি ঘটছিল একটা খাঁখাঁ মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটা অ্যামবাসাডর গাড়ির মধ্যে। লোকেশন, সেট ইত্যাদি নিয়ে কলকাতা সি আই ডি-র কোনও রকম নাকউঁচু ভাব দেখিনি কোনওদিন। খাঁখাঁ হাইওয়েতে অদৃশ্য গাড়ির পেছনে চল্লিশ কিলোমিটার পার ঘণ্টা বেগে ধাওয়া করেছেন সি আই ডি-র গোয়েন্দারা, পার্কের বেঁটে পাতাবাহারের পেছনে অপরাধীর অপেক্ষায় বন্দুক হাতে গুঁড়ি মেরে বসে থেকেছেন। যে সব সিরিয়াল ভাবে দর্শকের চোখে দামি লোকেশনের ধাঁধা লাগিয়ে টি আর পি বাড়াবে, কলকাতা সি আই ডি তাদের দলে পড়েনি কখনও। কলকাতা সি আই ডি-র ইউ এস পি ছিল টানটান গল্প, তুখোড় অভিনয় আর বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ। বাজেটের খামতি মেটানো হয়েছে বুদ্ধি দিয়ে। একটা খালি ফ্ল্যাট পাওয়া গেলে সেটাকেই সন্ধ্যেবেলা সেটাতেই ভূতুড়ে হানাবাড়ির শুটিং করে, সেখানেই রান্নাবান্না খাওয়াদাওয়া গল্পগাছা সেরে শেষরাতে চট করে একটু চোখ বুজে নিয়ে সকালবেলা “অ্যাই কে আছিস, বোতলগুলো সরা, স্যার এখন এখান দিয়ে পিস্তল হাতে দৌড়বেন” বলে বাকি শুটিংটুকু সেরে নেওয়া গেছে।

যাই হোক, আমাদের দৃশ্যে দৌড়োদৌড়ির কোনও ব্যাপার ছিল না। ফাঁকা মাঠে একটা মারুতি ওমনির ভেতর দু’জন অপরাধী বসে বসে অপেক্ষা করছিল কতক্ষণে রণজয় স্যার আর স্যারের সাঙ্গোপাঙ্গ এসে তাদের কলার চেপে ধরবেন। বসে বসে নিজেদের মধ্যে আলাপ করছিল। এখানে আবার কলকাতা সি আই ডি-র মাস্টারটাচ, কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে অপরাধীর জীবনবৃত্তান্ত ফুটিয়ে তোলা। কত সংঘাত, জীবনযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে একজন সাধারণ মানুষ শেষে ক্রিমিন্যাল হয়ে ওঠে সেটা দেখানো।

আমাদের অপরাধীরাও মাঠে বসে তাদের লাইফস্টোরি আলোচনা করছিল। বড় অপরাধী ছোট অপরাধীকে বলছিল কীভাবে সে গাড়ি সারানোর গ্যারেজ খুলে সৎপথে জীবিকানির্বাহের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। সবাই তাকে কেমন নিচু চোখে দেখেছে আর রাস্তায় যেতেআসতে গ্যারেজের দিকে তাকিয়ে ঘৃণাপূর্ণ দৃষ্টিতে উচ্চারণ করেছে, “ব্লা-আ-ডি ম্যাকানিক।”

সামান্য দুটো শব্দ, কিন্তু তারা আমার মনে এমন গভীর ছায়াপাত করল যে কী বলব। আমি বক্তার সঙ্গে নিমেষে একাত্ম বোধ করলাম। কারণ বাইরে থেকে যাই দেখতে লাগুক না কেন, আমার ভেতরেও আছে একটা জ্বলজ্যান্ত, ব্লাডি ম্যাকানিক। ভাবটা কোথা থেক এল আন্দাজ করা বিশেষ শক্ত নয়, মায়ের কাছ থেকে। আমার মা-ও একজন আপাদমস্তক ম্যাকানিক। এত দিন ধরে এত ক্রোশ ঘুরে মা অবশেষে বুঝেছেন অন্য কারও, এমনকি নিজের মেয়েরও, দোষগুণ মেরামতি করা তাঁর কম্ম না। তাই সে আশায় তিনি নিজে হাতেই ছাই দিয়েছেন। কিন্তু নিজেকে মেরামতি করার স্বপ্ন মায়ের এখনও যায়নি। এখনও মা ছেনিবাটালি নিয়ে নিজের মনের এদিকসেদিক ঠুকছেন, রংতুলি নিয়ে এ খাঁজে সে খাঁজে বোলাচ্ছেন। নিজেকে ঘুরিয়েফিরিয়ে দেখে মায়ের মন ভরছে না। তিনি মাঝে মাঝেই আমাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করছেন, “হ্যাঁ রে সোনা, এ জন্মে কি আর একটু ভালো মানুষ হতে পারব বলে তোর মনে হয়? আর একটু কম কুচুটে? আর একটু কম বাচাল? আর একটু কম বোকা?”

আমি বলি, “প্রথম কথা তুমি যথেষ্ট বুদ্ধিমান, দ্বিতীয় কথা তুমি একটুও কুচুটে নও, তৃতীয় কথা কথাও তুমি এমন কিছু বেশি বল না। কার সঙ্গেই বা বলবে? লোক কোথায়?”

মা চুপ করে থাকেন।

আমি আতঙ্কিত হয়ে বলি, “দেখো মা, আর যাই করো, কথা কম বলার প্র্যাকটিসটা আমার ওপর অ্যাপ্লাই কোর না। অলরেডি জ্বালাযন্ত্রণার শেষ নেই, এর মধ্যে দিনে তিনবার যদি তোমার সঙ্গে আবোলতাবোল, অদরকারি, অবান্তর কথা না বলতে পারি . . . “

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। ভাব দেখান যেন ওঁর মোক্ষলাভের পথে আমিই মূর্তিমান বাধা।

বাবার এই সব হ্যাপা নেই। তিনি নিজেকে নিয়ে সুখী। উঁহু, একটু ভুল হল। নিজেকে নিয়ে অসুখী হওয়ার অপশনটাই বাবার নেই। বাবাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, “তুমি যেমন তার থেকে কিছু অন্যরকম হতে চাও কি না” বাবা খুব অবাক হয়ে বলবেন, “অন্যরকম কিছু হওয়ার হলে তো আমি অন্যরকমই হতাম। এ রকম তো হতাম না। হইনি যখন তখন নিশ্চয় এ রকম হওয়ারই আমার কথা ছিল, অন্যরকম হওয়ার ছিল না। সে নিয়ে তো ভেবে লাভ নেই।”

চোখ, নাক, হাত, পা, রাগ, রেগে শাট ডাউন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা, রাস্তা চেনার ক্ষমতা, বেড়াতে যাওয়ার বাসনা ইত্যাদি আরও বিস্তর ব্যাপারে আমি আমার বাবার কার্বনকপি হলেও নিজেকে মেরামতির বিষয়টায় আমি আদ্যোপান্ত আমার মায়ের মেয়ে। ব্লাডি ম্যাকানিক। অন্য কাউকে বদলানোর সাধ্য বা সাধ কোনওটাই আমার নেই, কিন্তু কেউ যদি, “বলে মানুষের নিজেরও নিজেকে বদলানোর ক্ষমতা নেই, সে যতই প্রাণপণ চেষ্টা করুক না কেন” তবে সে কথা আমার বড় কঠিন মনে হবে। সে কথা যতই সত্যি হোক না কেন। নিজেকে বদলাতে হয়তো আমি পারব না, ওই ‘প্রাণপণ চেষ্টা’টুকুর জায়গায় বারবার ফাঁকি পড়ে যাবে (কারণ আমার ‘আসল আমি’ অলস আর ফাঁকিবাজ) তবু চাইতে তো বাধা নেই। আর চাওয়ার জন্য এর থেকে ভালো সময় আর পাওয়া যাবে না।

একটা চকচকে নতুন ক্যালেন্ডারের চকচকে নতুন প্রথম পাতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজের চোখেই আর একটু পছন্দসই করে তোলার ইচ্ছেয় তাই আমি আবারও ২০১৫র জন্য রেসলিউশন নিচ্ছি।

২০১৫ রেসলিউশন

দু’হাজার চোদ্দোর রেসলিউশন গুলো কেন একটাও রাখতে পারলাম না তাঁর কারণ খুঁজতে খুঁজতে শেষে যে মূল কারণটায় পৌঁছলাম সেটা হচ্ছে সময়ের অভাব। ব্যায়াম করব? সময় নেই। খাওয়ার সময় খাব? সময় নেই। তাই যখনই সময় পাব মুখ চালাব। (পরনিন্দা পরচর্চার ইস্যুটায় অবশ্য সময়ের দোষ নেই, সে দোষ আগাপাশতলা স্বভাবের।)

সময় কেন নেই এই প্রশ্নটা করলে অবশ্য নিরুত্তর থাকতে হবে। কাজ তো একটাও ফুরোয়নি তাহলে সময়টা খরচ হল কীসে, এই মোক্ষম জায়গাটায় চেপে ধরলেই আর পালানোর পথ থাকবে না। অনেক ভেবে বলতে হবে, কেন ওই যে সারাদিন কাজের কথা ভাবলাম, চেষ্টা করলাম, মন বসাতে সুবিধে হবে ভেবে অডিওবুক শুনলাম, আর সাড়ে সাত মিনিট বাদে ঘড়ির কাঁটা যখন রাউন্ড ফিগারে পৌঁছবে তখনই কাজ শুরু করব ভেবে সাড়ে সাত মিনিট ধরে ক্যান্ডি ক্রাশ খেললাম, খেলতে খেলতে সাড়ে বারো মিনিট বয়ে গেল, তখন আবার নেক্সট রাউন্ড ফিগারের অপেক্ষা করলাম . . . এই সব করতে করতেই চব্বিশ ঘণ্টা ফুরিয়ে গেল।

দু’হাজার পনেরো সালে আমার চেষ্টা হবে সময়ের হিসেব রাখার। একটা দিনের শেষে যেন চোখ বুজলেই মনে করতে পারি দিনের কোন সময় আমি কী করছিলাম। কখন পড়ছিলাম, কখন লিখছিলাম, কখন ব্যায়াম করছিলাম, কখন গান করছিলাম, কখন চানাচূর খাচ্ছিলাম, কখন ক্যান্ডি ক্রাশ খেলছিলাম, কখন অর্চিষ্মানের সঙ্গে চা খাচ্ছিলাম।

সোজা কথায়, দু’হাজার পনেরোয় আমার জীবনের প্রতিটি দরকারি অদরকারি প্রতিটি কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় বার করতে চাই আমি। আমার রোজনামচায় ক্যান্ডি ক্রাশকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করতে চাই যাতে সে অন্য কারও ভাগের সময়ে থাবা মারতে না চায়।

*****


নতুন বছরে আপনারাও কি চাইছেন কিছু? আপনাদের ভেতরের ব্লাডি ম্যাকানিকও কি ইদানীং আপনাদের খোঁচাচ্ছে? বলছে, “এই সুযোগ, নিজেকে সারিয়ে নাও এই বেলা, নইলে পরে পস্তাবে”? নাকি আপনি তার গলা টিপে দিয়েছেন অনেক আগেই, কারণ আপনি জানেন মানুষ আসলে বদলায় না, তা সে যতই চাক না কেন।


31 comments:

  1. আহা, দুঃখ পাবেন না। প্রমিজেজ আর মেন্ট টু বি ব্রোকেন।

    আমার এক সহপাঠী, যে কিনা একটি বিরাট বিদেশি কোম্পানিতে ভয়ানক উঁচু পোস্টে চাকরি করে, সে একদিন ক্লেম করেছিল, যে তাকে নাকি রিমাইন্ডার দেওয়ার দরকার হয় না, কেউ কোনদিন দেয়নি। কি মুশকিল বলুন দিকি? অবশ্য সে ব্যাটা আজীবন এরকমই ছিল। আমরা যখন ক্রিকেট খেলতে যেতাম, তখন সে সি প্রোগ্রামিং প্র্যাকটিস করত।
    তার মত লোকেদের কথা হচ্ছে না। আমাদের মত সাদামাটা ভালোমানুষ যারা, তারা গুটি তিনেক রেজলিউশন ভুলে গেলে কিস্যু আসে যায় না। আসছে বছর আবার হবে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হবে হবে, দেবাশিস। কিন্তু আপনার বন্ধুকে রিমাইন্ডার দেওয়ার ব্যাপারটা বুঝিনি। কীসের রিমাইন্ডার? কেউ দেবেই বা কেন?

      Delete
    2. সরি, আরেকটু প্রাঞ্জল করে বলা উচিত ছিল। রিমাইন্ডার অর্থে আমাদের বলে না, যে মঙ্গলবারের মধ্যে অমুক রিপোর্টটা পাঠাতে। আর তারপর বুধবার সকালে আরেকটা ইমেল আসে, কই পাঠালে না তো। আপনার সাথে এর'ম হয় কি না জানিনা, আমার সাথে আকছার হয়। তা আমার সেই বন্ধুকে কেউ কোনদিন রিমাইন্ডার দেয়নি। দেবার নাকি প্রয়োজন হয়নি।

      Delete
    3. অ্যাঁ! রিমাইন্ডার না দিলে কাজ জমা দিতে আছে নাকি? কী সাংঘাতিক কথা। আপনার বন্ধুর ক্ষুরে ক্ষুরে নমস্কার।

      Delete
    4. ফোন করে বলব তাকে, যে আপনি তাকে গরু ছাগলের সাথে তুলনা করেছেন। ক্ষুর তো এদেরই হয়।

      Delete
  2. "২. ক্ষিদে পেলে খাওয়া, অক্ষিদেয় না খাওয়াঃ এই নিয়ম মেনে চলতে গেলে দু’হাজার সালের নব্বই শতাংশ খাওয়া আমার বাদ চলে যেত।" - "দু’হাজার সালের" বদলে "দু’হাজার চ‌‌োদ্দ সালের" হবে তো?

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ কৌশিক। ধরে দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ, ঠিক করে দিচ্ছি।

      Delete
  3. ক্ষিদে পেলে-ই খেতে হয়? তাহলে না ক্ষিদে পেলে সেই সময় গুলো কি করে কাটাতে হয়?

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমারও সেটাই প্রশ্ন।

      Delete
  4. তোমার এই রেজোলিউশনের 'বাতিক', কিছু মনে কোরো না, খুব মজাদার। একা একাই হেসে গেলাম। আর তোমার বাবা তো দেখছি একজন দুর্দান্ত মানুষ। ওঁকে নমস্কার জানাই। এইরকম মন, মানুষের জীবনে এক দুর্লভ সম্পদ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, মালবিকা।

      Delete
  5. Resolution vengechen to bes korechen. se to vangar jonnei... kintu kotha holo apni candy crush e kon level obdhi gelen??? ami 46 e atke gechi..

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমি ১০৭ এ আটকে গেছি, অর্ণব।

      Delete
    2. ছিয়াশিটা খুব খারাপ, অদিতি। আমি বহুদিন আটকে ছিলাম। তারপর হঠাৎ একদিন খুলে গেল। তুমিও লেগে থাকো, হাল ছেড়ো না।

      Delete
    3. Ami amar orddhangini r phone e candy crush kheli ebong khela niye jhhogra kori... 86 nombor level dekhe mone porlo okahne anekdin atke chhilam... tarpor ekdin topke giye ekhon bodh hoe 94-95 kothao ekta achhi!

      Delete
    4. ছিয়াশিটা খতরনাক।

      Delete
    5. Ki sanghatik! Tomra etojon Candy crush khelo?

      Delete
    6. তুমিও আমাদের দলে যোগ দাও, রুণা।

      Delete
  6. hihi. tomar first duto resolution kintu amar mone chilo. khub respect korechilam je tumi erom resolution nite parcho, ami just rakhte parbona bole chesta o korini. tumi chesta r jonyo akta part marking pabe kintu :P

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।

      Delete
  7. Amar mone hoy, resolution dorkar hoy seisob problemer jonno jar kono solution nei. Boring jibontake nijer valolaga- mondolagar rongtuli te buliye rongin kore , archokher bodole akasher dike ha kore obak chokhe takiye akashe mishe jawa chotto ghuri othoba bohu purono bondhuder sathe adda mere protidin bnachatai jotheshto challenging. Sadamatha ekgheye sthan kal money societyr coordinate theke beriye Mon ke aro niyomhara hisebhin kore turki naach nacho... Celebrate koro nijeke .. That's my mantra.

    ReplyDelete
    Replies
    1. খুবই ভালো মন্ত্র, হীরক।

      Delete
  8. Ekta onko nie goto der bochor dhore lore jacchi ... samner bochore eta namaboi. Etai resolution.

    ReplyDelete
    Replies
    1. Interesting. Amar o to ek e case. emonki amader naam o dekhchi ek. onko ta ki share kora jabe?

      Delete
    2. Bah amaro goto dui bochore ekta onko hoyeche.

      Delete
    3. সবার সব অংক মিলুক, এই শুভকামনা রইল।

      Delete
  9. 2014 r resolution gulo besh bhalo chhilo. Ogulo diyei suru kori tahole. bhaloi hobe, 1 bochhor lag a thakbo, simply copy kore nebo aager year er list ta.
    p.s.: eta resolution na, wish - chheler sathe onekta samay katabo.

    ReplyDelete
    Replies
    1. আশা পূর্ণ হোক, এই কামনা করি।

      Delete
  10. Aha Kolkata CID, ki bhaloi na laage .... jokhon e bhabi ki dakhbo ki dakhbo, CID ese uddhar kore :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. সিরিয়াসলি, শুভব্রত, রণে বনে খুশিতে মনখারাপে এমন লাগসই খোরাক আর একটিও আছে বলে আমার জানা নেই।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.