September 13, 2018

ক-এ . . .



গত তিন বছরে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের যা পরিবর্তন হয়েছে, নিজেরা সেটার মধ্যে দিয়ে না গেলে বিশ্বাস করতাম না। এবং এই ব্যাপারটা করতে পেরে আমাদের খানিকটা দেমাকই হয়েছে কারণ স্বাস্থ্যরক্ষার মুখ চেয়ে বা অন্য কোনও বিষয়ে জ্ঞানচক্ষু উন্মোচন করে যে এই বদল আনা যেত না সেই দূরদৃষ্টি আমরা দেখাতে পেরেছি। একমাত্র কোন রাস্তায় হাঁটলে লক্ষ্যপূরণ হবে গোড়াতেই চিনেছিলাম। বাজেট কাট। বাইরে কম খাব। টাকা বাঁচাব। বেড়াতে যাব। দিল্লি এন সি আরে যত বাংলা সিনেমা রিলিজ করবে, খাদ্যঅখাদ্য নির্বিচারে হলে গিয়ে দেখব।

সাফল্য আসার ছিল, এসেছে। দু’হাজার পাঁচ-ছয়ে বাইরে খাওয়াতে যত খরচ করতাম এখন ওয়ান থার্ড করি। তা বলে বাইরে খাওয়ার মোহ যে আমাদের ঘোচেনি, বাজেটের বেড়া খুলে দিলেই যে আমরা চটি হাতে পরে দৌড়ব সেও জানি। কারণ মাস শেষের আগের দু’দিন আমাদের চ্যাটে আসন্ন 'আচ্ছে দিন' উদযাপনের প্ল্যানিং ছাড়া আর কোনও কথা থাকে না। মাস শুরুর পরের সপ্তাহেই বাজেটের অর্ধেক উড়ে যায়। পরের তিন সপ্তাহ কুপন খুঁজে খুঁজে হয়রান। চিটিংও চলে টুকটাক। 'আজ সারাদিনে আমাকে কেউ অপমান করেনি' কাজেই আমার ট্রিট, 'আজ বস আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছে' কাজেই রাতে ভাতের বদলে দোসা ইত্যাদি। তবে বাজেট না থাকলে অনেক বেশি চলত। 

নতুন ভাড়াবাড়িটাও হেল্প করছে। এ বাড়ির ভেতর মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক থাকে না বলেছি বোধহয়। ফলত, ডেলিভারি ভাইসাব ফোনে পান না, দরজায় দাঁড়িয়ে থাকেন, অবশেষে কাউকে দিয়ে খবর পাঠান এবং আমরা যখন নিচে গিয়ে উপস্থিত হই আমাদের গুষ্টির তুষ্টি করেন। করাই উচিত, উনি দিল্লির ট্র্যাফিক পেরিয়ে পঁচিশ মিনিট এসেছেন, আমরা বসে বসে টিভি দেখছি; উনি আবার দিল্লির ট্র্যাফিকে ঝাঁপাবেন, আমরা পিৎজা খাব। কিন্তু মুখঝামটা শুনে শুনে আমাদের ভয় ধরে গেছে। খাবার অর্ডার হয়ে গেলেই দৌড়ে দৌড়ে চা বানাতে যাই, সিংকে কিছু থাকলে চট করে মেজে দিই, কিছু না পেলে খালি বোতলগুলোতে জল ভরি। যাতে দুমদুম করে দরজা বাজিয়ে যখন কেউ বলবে, 'বাইরে তো অর্ডার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দশমিনিট হল,' তখন পরিষ্কার বিবেকে বলা যাবে, 'আমি এতক্ষণ এই এই কাজ করেছি, এবার গালি খেয়ে খাবার নিয়ে আসার দায়িত্ব তোমার।'

এই সব মিলিয়ে আমাদের বাইরে না খাওয়ার রেজলিউশন রক্ষা হচ্ছে গড়িয়ে গড়িয়ে। টাকা বাঁচানো ছাড়া বাড়িতে খাওয়ার আরও একটা সুফল পাব ভেবেছিলাম, অফলাইন বা অনলাইন মেনু দেখে কী খাব ডিসাইড করার গুরুদায়িত্ব থেকে ছুটির সুফল। জন্মে থেকে 'থালায় যা দেওয়া হয়েছে যতখানি দেওয়া হয়েছে, ট্যাঁ ফোঁ না করে খেয়ে নাও,' শুনে শুনে ভেবেছিলাম বাড়িতে খাওয়া মানেই বুঝি পরাধীনতার মুক্তি। কত ডিসিশনের পাহাড় ভেঙে যে থালায় ওই জিনিসগুলো উপস্থিত হয়েছে আঁচমাত্র পাইনি। লোকের সঙ্গে কথা বলতে হবে জেনেও, বৃষ্টির পর কাদা জমবে জেনেও বাজারে যাওয়ার ডিসিশন। পুঁই শাক কিনলে কুমড়ো কিনতে হবে, কুমড়ো কিনলে বাড়িতে ছোলা আছে কী না মনে করতে হবে, ঝিঙে কিনলে পোস্ত কিনতে হবে, লাউ কেনার পর বাড়ি ফিরে বড়ির কৌটো খালি বেরোলেই চিত্তির।

বাড়াবাড়ি রকম ক্লান্ত লাগলে এখনও জোম্যাটো খুলে বসি। অর্ডার দিই। গালি খাই। পিৎজা চিবোই। পরদিন সকালবেলা অত কষ্টের লাউবড়ি থেকে সন্দেহজনক গন্ধ পাই। এটা আরেকটা আশ্চর্য ব্যাপার। রেস্টোর‍্যান্টে অর্ধেক বাটি চাউমিন ফেলে দিতে দু’বার পলক পড়ে না, বাড়ির ফ্রিজ থেকে আধ চামচ রান্না খাবার ফেলার আত্মগ্লানি?

অবর্ণনীয়। 


তাছাড়া বাড়িতে রাঁধলেই যে খাওয়ার মতো হবে তা তো নয়। শুরুতে যে বাজার করার কথা বললাম, সেখানেও সমস্যা আছে। তরকারি কীই বা কিনব? সেই আলু পেঁয়াজ কুমড়ো পটল। নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত অল্টারনেট করে ফুল আর বাঁধাকপি। বাজারে ওঠে আরও অনেক জিনিস। মোচা থোড় কচুর লতি। দূর থেকে নমো করে আলুপটল ব্যাগে পুরে চলে আসি। এক্সপেরিমেন্টের মুখ চেয়ে একবার শালগম কিনেছিলাম। মনে পড়েছিল বারান্দায় বসে ঠাকুমা একদিন আফসোস করেছিলেন, কতদিন শালগম খাননি। আলুটালু দিয়ে রাঁধার পর এক পিস মুখে দিয়েই মনে পড়েছিল আমার ঠাকুমা মুলোও দারুণ ভালোবেসে খেতেন। সে শালগম ফ্রিজে রাখা ছিল, বাটিটা ছুঁতে ভয় লাগত। অর্চিষ্মান কিছুদিন খেয়েছিল হয়তো, একা পুরো বাটি শেষ করেছিল মনে হয় না। সম্ভবত ফেলা গেছে। না, আমার কোনও গ্লানি নেই।

আজকাল আমরা এমন জিনিসপত্র কেনার চেষ্টা করি যা রান্না যেমনই হোক খেতে ভালো হবে, ফেলা যাবে না। কাজেই আমাদের বাড়িতে কিলো কিলো আলু আসে এবং ফুরোয়। বাকি তরকারিদের বৈতরণী তো পার করায়ই, নিজেরাও ভাজা সেদ্ধ, পোস্ত, মায় রোস্ট পর্যন্ত হয়।

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগতে পারে কিন্তু আলু ছাড়া আর যে জিনিসটা আমাদের কখনও ফেলা যায় না সেটা হচ্ছে করলা। দু’নম্বর মার্কেটে উচ্ছেও ওঠে, তবে আমরা কিনি না। কারণ করলাগুলো দিল্লির হলেও উচ্ছেগুলো নাকি আজকের রাজধানীতেই কলকাতা থেকে এসেছে, যে কোনও মুহূর্তে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে উঠে নিজেদের অথেন্টিসিটি প্রমাণ করে দেবে। তাই উচ্ছের দাম করলার এক্স্যাক্টলি দ্বিগুণ। 

আমরা করলা কিনি। সপ্তাহে দু'বার তো বটেই। আমাকে দেখলেই ভদ্রলোক (কেউ কেউ ডাকাতসর্দারও বলে) 'চারটে কলা আর করলা আন দেখি' হাঁক পাড়েন। অনেক সময় হয়েছে যে আমি পটলটটল নিয়েছি, স্রেফ মুখরক্ষার জন্য। শুধু করলা ভাজা বা আলু দিয়ে করলা ভাজা বা রিষড়ার বাড়িতে পাঁচফোড়ন দিয়ে অল্প ঝোল মতো আলুকরলার তরকারি হত - যে চেহারাতেই হোক না কেন, করলার বাটি সর্বদা চেঁচেপুঁছে সাফ হয়। এমনও হয়েছে ডাল তরকারি যেমন নেমেছিল তেমন ফ্রিজে ফেরত গেছে, গরম ভাতে ঘি আর করলাভাজা খেয়েই আমাদের পেট ভরে গেছে। টিফিনে রুটির সঙ্গে করলাভাজা নিয়ে দেখেছি। চমৎকার। অফিস থেকে ফিরে কী খাই কী খাই ভাবের সময় ফ্রিজের ঠাণ্ডা করলাভাজা চিবিয়ে দেখেছি, সেও দিব্যি। 

(করলার একমাত্র একটা রেসিপিই আমার পছন্দ নয়, অফিসের ক্যান্টিনের রেসিপি। সে রেসিপিতে একটাই ঝোল বানানো হয়। সে ঝোলে মাশরুম দিলে শাহী মাশরুম, পনীর দিলে শাহী পনীর, সয়াবিন দিলে শাহী সয়াবিন এবং করলা দিলে শাহী করেলা হয়ে যায়। বাকি সব শাহী আমি খেয়ে নিতে পারি, করলা পারি না। কী অপরিমেয় সম্ভাবনাকে থকথকে লাল ঝোলে ডুবিয়ে হত্যা করা হল ভেবে আমার কান্না পায়।)

বিকেল চারটে থেকে 'রাতে কী খাব গো' শুরু হলে কেউ মেনুতে করলার কথা মনে করালে চ্যাটবাক্সে স্মাইলির বন্যা বয়। ওলা বিশ্ব ঘোরালেও মেজাজ শীতল থাকে।

বাড়ি ফিরে খেতে বসে করলা মুখে পুরে খুশি হয়ে বলাবলি করি, 'বুড়ো হয়েছি তাতে কোনও সন্দেহই নেই, বল? করলা কি না সেকেন্ড ফেভারিট তরকারির জায়গা নিয়েছে।' একদিক থেকে দেখলে ঘটনাটা দুঃখের, কিন্তু আমি দুঃখ পাই না। ছোট সোনা বড় কুন্তলাকে দেখে জীবনের বাকি সব জায়গায় যত খুশি করুণা করুক, করলার মর্ম না বোঝার ব্যাপারে বড় কুন্তলা ছোট সোনাকে চিরদিন করুণা করবে। 



29 comments:

  1. Korola amar o khub priyo. Kintu apnar pochonder list e dwitiyo sthane begun chilo Na? Tahole ki ekhon tritiyo sthane neme eseche?

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, করলা এখানে যুগ্ম সেকেন্ড ফেভারিট, সুহানি। বেগুন এখনও আমার সেকেন্ড ফেভারিট। করলা থার্ড।

      Delete
    2. Begun er ki mahatyo, shunlei bojha jaye : https://youtu.be/48v1XlK353A

      Delete
    3. হাহা, চমৎকার, সোমনাথ।

      Delete


  2. বিকেল চারটে থেকে 'রাতে কী খাব গো' শুরু হলে কেউ যদি মেনুতে করলার কথা মনে করালে চ্যাটবাক্সে স্মাইলির বন্যা বয়। - কেউ চিটিং করছে না তো? 😉😉

    ওই সম্ভাবনার হত্যা ব্যাপারটা পড়ে 2 মিনিট হাসলাম। অনেকদিন পর মনের মত লেখা। 😋😋

    ReplyDelete
  3. korola ta ekhono sojhyo korte parina. amar alur pore go to sobji holo motorshuti. easy recipe dichhi, koraite ada foron diye tar modhye kota longka chire fele dao. erpor alu tukro tukro kore add koro, bhaja hole koraishuti dao ar tarpor ektu fresh roasted dhoneguro, nun ar chini diye dhaka diye dao. dibyi makho makho koraishutir ghugni hoye jabe.

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, চুপকথা। কড়াইশুঁটি ব্যাপারটাকে আসলে চিরকাল অলংকরণ ভেবে এসেছি।

      Delete
    2. ekbar baniye dekho. bhalo lagbe ashakori

      Delete
    3. নিশ্চয়, চুপকথা।

      Delete
  4. Karala amaro khub priyo!! Hyare sahi karala satti hay naki?!

    ReplyDelete
    Replies
    1. হয় না, তিন্নি। ওটা আমি আমার রসবোধ বোঝাতে অ্যাড করেছি।

      Delete
    2. http://www.khanapakana.com/recipe/a4cab81c-97a7-43f8-9fe4-52f6bf86c3e3/shahi-karela-musalam-

      Delete
    3. এটাও তো বানিয়ে দেখতে হবে মনে হচ্ছে।

      Delete
  5. Karola aar uchhe alaada alaada sabji ?? :O ami bhabtam same byapar ... karola-dal/sabji diye dal amar khub priyo ranna .. fastest solution to "amra sabji khai toh.." :D .... sahi karala khete hobe naa ... kintu ekta chabi dis .. shahi mutton/shahi paneer imagine korte parchhi .. kintu shahi karala !!! :O

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ, উচ্ছে/করলা দিয়ে তেতোর ডাল আমারও প্রিয়।

      Delete
  6. Ami ajke korola kine enechi. Kal radhbo. Yay!

    ReplyDelete
  7. Chhotobelay korola siddho chhara Baki Sab bhalo lagto. Ekhon siddho o bhalo lage. Boro hole samanyo holeo kichhu subidha achhe bote.

    ReplyDelete
  8. Tobe ajebaje khaoa onek komanoy kichudin age Shona ekta Kathay Amar onek upokar hoyechhe, ja ager onek somalochona, upodesh, arsho-ukti te hot ni. Hoyto kromohrashoman boyo:krom (chollishordho to) , ar kromobordhoman sharirik dhon-sompotti (sneho, shorkora) o kichhu probabhito korechhilo, kintu ta porokkho.
    Bochhor khanek age ek jaygay porlam kukhadyo control korte na parar karon Tumi nije nijeke jothesto somman koro na, atmo-somman namak fora ti ekhono tontone pakeni.
    Ei sune gaa chirbir Kore jwole gelo .. samanyo sufol o hoyechhe .. jodio dilli ekhono bahudur

    ReplyDelete
    Replies
    1. আপনি খুবই ভালো ছোট ছিলেন বোঝা যাচ্ছে, শিবেন্দু। করলা ভাজা ছোটবেলায় ভালোবেসে খাওয়া সোজা নয়। আলুকরলা সেদ্ধ দিয়ে ভাত দিলে আমার সত্যি আর কিছু লাগবে না, একেকসময় মনে হয়। বড় হওয়ার অনেকগুলো সুবিধেই আছে, বড়রা টের পাই না। আপনি স্বাস্থ্যকর খাবারের রাস্তায় নেমে পড়েছেন যখন দিল্লি অচিরেই হস্তগত হবে। শুভেচ্ছা রইল।

      Delete
  9. alu uchche bhaja amar o priyotomo veg ranna.sada bhat/hat ruti diye opurbo.
    amar darao baire khawa control hoy na..briani/roll hata poth e dokan..ar parina samlate..savings ar hoye othe na..

    পনীর দিলে শাহী পনীর,ei beparta veg restorant eo ek e..sob e shaahee..

    mojar lekha..darun laglo

    prosenjit

    ReplyDelete
  10. করলা ভাজা ভাত দিয়ে ভালোই লাগে বটে। তবে শাক ভাজাও ট্রাই করে দেখতে পারো রুটি দিয়ে চমৎকার লাগে। কে বলতে পারে কাল হয়তো করলা ফোর্থে নেমে গেল শাক এসে গেলো তিনে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমারও রুটি শাকভাজা প্রিয়, প্রদীপ্ত। এখানে লিখতেও গিয়েছিলাম, কিন্তু ঠিকমতো সেট করা যাচ্ছিল না, ধৈর্যও থাকছিল না, তাই ছাড়ান দিয়েছি। আমার এখন আলু করলার পরেই শাক। তবে শুকনো করে ভাজা।

      Delete
    2. উফ, বেগুন আবার মিস করে গেছি। আলু বেগুন করলা শাকভাজা। এতক্ষণে অর্ডার ঠিক হল।

      Delete
  11. Ei lekhata miss kore gechhilam. :)
    Korola amaro khub priyo khabar - kawra kore bheje ruti/bhat diye khete jompesh lage :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাই ফাইভ, অরিজিত। তবে ওই কড়া করে ভাজার পয়েন্টটা ক্রুশিয়াল। কড়া নন-কড়ার তফাৎ আকাশপাতাল।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.