January 12, 2019

বৃশ্চিক ২ এবং কেন আমার রহস্য গল্প লিখতে গায়ে জ্বর আসে




'বৃশ্চিক ১: একটি রহস্যরোমাঞ্চ কাহিনি সংকলন'-এর খবর আমি পেয়েছিলাম বইটি প্রকাশ হওয়ার কিছুকাল পরে এবং কিনেওছিলাম। কাজের কথা না বলা, মানুষজন্ম সার্থক করার টিপস না দেওয়া, মানবমনের গভীর অগভীর উপলব্ধি নিয়ে বকে বকে মাথা না ধরানো ঘরানার সাহিত্যের প্রতি আমার দুর্বলতা সর্বজনবিদিত। সেই সব ঘরানার গল্প নিয়ে বুক ফুলিয়ে একটা বই বেরোচ্ছে জেনে ভালো লেগেছিল।

বইটা হাতে নিয়ে আরও ভালো লেগেছিল। ভালো বাঁধাই, ভালো ছাপা, ভালো ছবি, ভালো পাতা। হাতে নিলেই বোঝা যায় ভালোবেসে বানানো। কয়েকটা গল্প মৌলিক, কয়েকটা অনুবাদ। দুয়েকটা চেনা নাম, বাকি অচেনা। কয়েকটা গল্প চমকে দিয়েছিল। টুইস্টে, প্লটে, ভাষায়, অনুবাদের সাবলীলতায়। 

কিন্তু সবথেকে বেশি চমকেছিলাম ক'মাস পর বৃশ্চিকের সম্পাদকমণ্ডলীর তরফে ঋজু গাঙ্গুলির মেল পেয়ে। বৃশ্চিক ২ রহস্যরোমাঞ্চ কাহিনীর সংকলন বেরোচ্ছে এবং সেখানে ওঁরা আমার একখানা গল্প রাখতে চান। মেলে একটা জিনিস খেয়াল করেছিলাম; ওঁরা 'আপনার লেখা' শব্দ দুখানা ব্যবহার করেছেন অর্থাৎ চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে যে ছায়া অবলম্বনের খেলাটা খেলি সেটা চলবে না। দুয়েকবার মেল চালাচালির পর ঋজু এটাও বলেছিলেন যে ভৌতিক বা আধিভৌতিক এড়াতে পারলেই ভালো।

অর্থাৎ আমাকে একখানা মৌলিক রহস্য ছোটগল্প ফাঁদতে হবে।

লাফিয়ে হ্যাঁ বলে দিয়েছিলাম। ঋজু যা ডেডলাইন দিয়েছিলেন তার মধ্যে একখানা মৌলিক রহস্য গল্প ফাঁদা, বাঁয়ে হাত কা খেল বোধ হয়েছিল। 

গল্প জমা দিতে দিতে অরিজিন্যাল ডেডলাইন পার হয়ে আরও তিনটে ডেডলাইন (যেগুলো আমি নিজেই সাজেস্ট করেছিলাম, প্রত্যেকটাই বাঁয়ে হাত কা খেল হবে মনে করে) এসে টাটা করে চলে গেল। ঋজু টুঁ শব্দ না করে অপেক্ষা করলেন। জন্মসূত্রে ধৈর্য এবং ঠাণ্ডা মাথা না নিলে জন্মালে কেউ চেষ্টা করে সম্পাদক হতে পারে না, ঋজু দুটো বরই নিয়ে জন্মেছেন।

দেরি হল কেন? এক তো নিজের বাঁ হাতের খেলা দেখানোর ক্ষমতার ওভারএস্টিমেশন। দুই, সময়ের গতি সম্পর্কে, এই এতখানি সময় পৃথিবীর মাটিতে কাটানোর পরেও অজ্ঞানতা। একঘণ্টা মানে কত খানি, সাত দিন মানে আসলে কতটা সময়, দেড় মাসের আসল দৈর্ঘ্য, ইত্যাদি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতনতা।

দ্বিতীয় কারণটা আরেকটু জটিল। কাজটাকে আমি একেবারে যে হেলায় নিয়েছিলাম তেমনও নয়। আমার গানের মাস্টারমশাই বুদ্ধিমান লোক ছিলেন, নানারকম দামি উপদেশ দিয়ে রেখেছিলেন। বলেছিলেন, কোনও কাজ খাটলে উতরোতে পারে আবার নাও পারে (খাটিয়ের ক্ষমতা আর কপাল ম্যাটার করবে), কিন্তু না খাটলে যে উতরোবে না সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আমি ভালো করে খেটেখুটে লিখব বলেই নেমেছিলাম। নতুন নোটখাতার ওপর বৃশ্চিক রহস্য গল্প লিখে নতুন পাতায় তারিখবার দিয়ে লেখা শুরু করার সিরিয়াসনেস নিয়ে নেমেছিলাম। 

কিন্তু ব্যাপারটা ক্রমেই সন্দেহজনক প্রতিভাত হতে লাগল। 

খুনের গল্পই যে লিখব সে নিয়ে নিঃসংশয় ছিলাম। কিডন্যাপ কিংবা ব্যাংকডাকাতির রহস্য নিয়ে লেখার মতো নিষ্পাপতা আর নেই। কিন্তু খুনের গল্প লেখার প্রথম এবং প্রধান অসুবিধে হচ্ছে খুনের জুতসই কারণ বা মোটিভ খুঁজে বার করা। কেন কেউ কাউকে একেবারে খুন করে ফেলবে, সে রকম একটা যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আমি এখনও বার করতে পারিনি। কথা বন্ধ না, কুশপুতুল দহন না, বসের কাছে লাগানো না, একেবারে খুন? গোয়েন্দাগল্প লেখকরা যতই বলুন না কেন, সম্পত্তি কিংবা প্রেম, কোনও কারণই একেবারে খুন করে ফেলার মতো যথেষ্ট নয়। খুন করে ফেলার যদি একটা কারণ থাকেও, খুন না করার অন্ততপক্ষে একশোটা কারণ বার করে দেওয়া যাবে।

তার ওপর সেই খুনের আগে যথেষ্ট প্যাঁচ খেলানো এবং খুন করে ফেলার পর অম্লানবদনে বসে থাকার মতো কলজেওয়ালা লোক আমি একজনকেও চিনি বলে মনে পড়ল না। আমি যাঁদের ভয়ানক ধূর্ত ধড়িবাজ বলে মনে করি, তারাও কেউ এ জিনিস ম্যানেজ করতে পারবে বলে মনে হল না। 

অতএব, গোটা ব্যাপারটা কল্পনা থেকে লিখতে হবে। যারা বলে কল্পবিজ্ঞান আর রূপকথাই খালি সম্পূর্ণ কাল্পনিক হয়, বাকি সব গল্পেই বাস্তব ছায়া ফেলে যায়, তারা কেউ কোনওদিন খুনের গল্প লেখার চেষ্টা করেনি।

কল্পনা করতে গিয়ে তিন নম্বর অসুবিধেটা হল। যা যা কল্পনা আমার পক্ষে করা সম্ভব সবই আর কেউ করে ফেলেছেন। প্লটে, গল্প বলার স্ট্রাকচারে, খুনী ধরার খেলায়, ধরা না দেওয়ার খেলায়, আগে খুনীর নাম বলে দিয়ে, খুনীর নাম আদৌ না বলে, সংলাপ, আত্মকথন, ফার্স্ট পার্সন, থার্ড পার্সন, ক্লু, রেড হেরিং যা নিয়ে যত রকম পারমুটেশন কম্বিনেশন করা সম্ভব, সব গোয়েন্দা গল্পের লেখকরা আগে করে গিয়েছেন।

এই সব নানা ঝামেলায় পড়ে আমার তিনখানা ডেডলাইন পেরিয়ে গেল। শেষমেশ আমি যেটা লিখে উঠলাম সেটাকে রহস্যগল্প বলা যায় কি না জানি না, বরং পারফেক্ট মার্ডার বা নিখুঁত খুনের ওপর আলোকপাতজনিত আলোচনা বলা যেতে পারে।

কী বললেন? পারফেক্ট মার্ডার হয় না? আমি বলছি হয়। আমার 'খুনের সহজপাঠ' ছোটগল্পে, যেটা 'বৃশ্চিক ২' রহস্যরোমাঞ্চ গল্প সংকলনের অংশ হয়ে দু'হাজার উনিশের কলকাতা বইমেলায় বেরোচ্ছে, সেটাই প্রমাণ করেছি আমি, সঙ্গে কিছু টিপসও দিয়েছি। যদি আপনাদের কারও পারফেক্ট মার্ডার করার দরকার পড়ে কখনও, দেখে নিতে পারেন।





বৃশ্চিক ২: রহস্যরোমাঞ্চ গল্প সংকলনের এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন অর্ক পৈতণ্ডী। আমার ভালো লেগেছে, মায়েরও ভালো লেগেছে। আপনাদেরও ভালো লাগবে আশা করি। আপনারা যদি কেউ বইটা কিনতে চান তা হলে নিম্নলিখিত তথ্যগুলো কাজের হতে পারে। 


বৃশ্চিক ২
প্রকাশক: অরণ্যমন
প্রকাশকাল: কলকাতা বইমেলা ২০১৯
পাওয়া যাবে:
অফলাইন~ অরণ্যমন (কলেজ স্কোয়্যার, মেলায় ৪৪৫ নম্বর স্টল), রিডবেংগলিবুকস্টোর, বইচই (ভারতী বুক স্টোর, মেলায় ৩৩৬ নম্বর স্টল)
অনলাইন: রিডবেংগলিবুকস, বইচই
পৃষ্ঠা ৩৪৪, মূল্য ২৭৫/- টাকা



19 comments:

  1. Aha, joy hok.
    Joy Aranyaman
    Joy Rijuda
    Joy Baki sokol k Jara Brishchik er songe jorito.
    Sobseshe, onek onek abhinandan kuntala, khobor ta Dewar jonyo. :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ, অরিজিত।

      Delete
  2. আরে তুমি বৃশ্চিক ১ পড়েছিলে? সেখানে এই অধমের একখান পাতে দেওয়ার অযোগ্য গপ্পো ছিল যে! (বৃশ্চিক ২ কিনছিই)

    ReplyDelete
    Replies
    1. পড়েছিলাম তো, অদিতি। আপনার গল্পটা খুব ভালোও লেগেছিল। অযোগ্য মোটেই নয়, দিব্যি গা ছমছমে সুস্বাদু।

      Delete
    2. ইয়ে, ধন্যবাদ, মানে 'আপনি'??? এক গল্পের গুঁতোতেই?!

      Delete
    3. এই রে সরি সরি। স্লিপ অফ ফিংগার। 'তোমার' গল্পটা হবে। ওই অংশটুকু ভুল হয়ে গেলেও, গল্পসংক্রান্ত বক্তব্যটা নির্ভুল।

      Delete
  3. দারুণ, দারুণ খবর !!! বইমেলায় আসছেন ?

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, অন্বেষা। যাব কি না এখনও ঠিক করিনি। দেখা যাক।

      Delete
  4. Arre arre, daroon byapar. Ebar boimelay Kolkatay thaka hobe na, kintu ekkhuni online thikanay giye hana dichchi darao.

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, বিম্ববতী।

      Delete
  5. এইটা ভালো হয়েছে, আমরা এতদিন বলছিলাম হচ্ছিল না, এখন বৃশ্চিকের কামড়ে আপনি মৌলিক গল্প লিখছেন।পড়ব।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, যা বলেছেন, নালক। থ্যাংক ইউ।

      Delete
  6. বইমেলায় নতুন লেখা নিয়ে নতুন বই প্রকাশ উপলক্ষে অভিনন্দন আর শুভেচ্ছা রইলো | খুব ভালো লেখা হবে জানা কথাই , কোনো একদিন হাতে পাবো এই আশায় রইলাম |

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, অমিতা।

      Delete
  7. অনেক অনেক অভিনন্দন । ভারী খুশী হয়েছি । তোমায় "নয়" বেরোনোর খবরেও খুব খুশী হয়েছি ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ।

      Delete
  8. Ei boita ki berolo? Noy o ki beriyechhe?

    ReplyDelete
    Replies
    1. নয় বেরিয়েছে, অরিজিত। বৃশ্চিক ২-ও এক পাঠকের হাতে দেখলাম মনে হল স্টলে দাঁড়িয়ে।

      Delete
  9. dhonyobad Kuntala. :)
    ebar online abhijan.........:D

    ReplyDelete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.