March 10, 2019

দুটো বই



লীলাবতী/ অদ্রীশ বিশ্বাস



লিরিক্যাল প্রকাশনী থেকে অদ্রীশ বিশ্বাসের 'লীলাবতী' বেরোচ্ছে শুনেছিলাম, কিন্তু কেনার কথা ভাবিনি। দোকানে গিয়ে বইটা হাতে নিয়ে কেনার সিদ্ধান্ত নিলাম। লিরিক্যালের বই সম্পর্কে এই কথাটা বলতে হবে। বইগুলো এত সুন্দর করে বানানো যে হাতে নিলে কিনতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সে কথা পরে হবে, আগে বইয়ের কথা বলি। 

'লীলাবতী' লেখকের মায়ের জীবন আশ্রয় করে লেখা। মায়েদের জীবনী লেখা একটা বেশ চালু ব্যাপার। লীলাবতী পড়তে গিয়ে জেরি পিন্টোর 'এম অ্যান্ড দ্য বিগ হুম'-এর কথা মনে পড়া আশ্চর্য নয়। দুটি বইয়েরই কেন্দ্রীয় চরিত্র মা। দুটো বইয়ের আরও একটি মিল হল জেরি পিন্টোর মা বাইপোলার ডিসঅর্ডারে ভুগতেন, লীলাবতীও শেষজীবনে মানসিক ভারসাম্য হারান। কিন্তু অমিলও আছে। প্রথম অমিলটা হচ্ছ জেরি পিন্টো সত্যি ঘটনা লিখবেন বলে শুরু করেও পরে মানসিক চাপ সহ্য না করতে পেরে ফিকশনে সরে যান, অদ্রীশ বিশ্বাস প্রতিটি ঘটনা, চরিত্র, তাদের নাম ঠিকানা পেশা সব বাস্তব রেখেছেন।

কিন্তু মনে হয় যেন গল্পই পড়ছি। প্রথম অনুচ্ছেদ লীলাবতীর কাঁথা সেলাইয়ের চেনা ফোঁড় ভুল করে ফেলার অসহায়তা এবং চন্দ্রাহত হওয়ার খবর দিয়ে শুরু হয়। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ থেকে শুরু হয় ফ্ল্যাশব্যাক। ওপারবাংলা থেকে লীলাবতীর এপারবাংলায় আসা এবং শিকড় পোঁতা থেকে। আসার সময় লীলাবতী নিজের প্রিয় আমগাছের একটি আমের আঁটি সঙ্গে করে নিয়ে আসে। দুই দেশের মধ্যে সে বীজ একটা কন্টিনিউটির মতো কাজ করবে, এই আশায় বোধহয়। সম্পূর্ণ অচেনা দেশে সেই আঁটি শিকড় পুঁততে একটা প্রতীক যেন। 

অন্য মায়েদের গল্প থেকে লীলাবতীর গল্প আলাদা হয়ে যায় কারণ লীলাবতী অত্যন্ত ব্যতিক্রমী মানুষ। এ দেশে এসে লীলাবতী ঘুরতে ঘুরতে এসে পৌঁছয়, শ্রীরামপুরের মাহেশে। আমার চেনা জায়গা। সেখানে ক্রমাগত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অবশেষে পুনর্বাসনের জমির অধিকার পাওয়া যায়। লীলাবতী ওদেশে থাকতে কোনওরকম রাজনৈতিক অভিঘাতের মুখোমুখি হয়েছিল এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবে চেতনা জাগ্রত ছিলই সম্ভবত বা পরিস্থিতি তাকে রাজনৈতিক সচেতন করে তুলেছিল তাও হতে পারে।

কারণ যাই হোক না কেন, শ্রীরামপুরে এসে লীলাবতী সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। পুনর্বাসনের অধিকারে অভিবাসীদের সংগঠনের নেতৃত্বের ভূমিকায় নামেন লীলাবতীর মা। প্রতিরোধ মিছিলে নেমে লীলাবতী গ্রেপ্তার হয়, আর জেলে তার আলাপ হয় মধুসূদন বিশ্বাসের। অদ্রীশ বিশ্বাসের বাবা। ক্রমে লীলাবতীর সংসার বাড়তে থাকে, নতুন দেশের মাটিতে শিকড় গাড়তে থাকে। একই সঙ্গে চলে লীলাবতীর বই পড়া, রাজনৈতিক চর্চা এবং সংসারপালন।

লীলাবতীর জীবনের ব্যক্তিগত ঘটনাবলীর সঙ্গে সঙ্গে সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির বয়ানও চলেছে বয়ে চলা ভাষায়। কথ্য ইতিহাসের ধারায় এই বই যে অমূল্য অবদান তাতে সন্দেহ নেই।

শুরু যা দিয়ে করেছিলাম, শেষও সেটা দিয়েই করি। বইটি ভারি দৃষ্টিনন্দন। পাতার ধারগুলো লাল রং করা, আলতা পরা পায়ের কথা মনে করায়।  এ ছাড়া প্রতিটি অনুচ্ছেদের শুরুতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের (বা একসময় যে সব জায়গা ভারতবর্ষের অংশ ছিল, যেমন সিন্ধ, পাকিস্তান) স্থানীয় হাতপাখার নকশা। এ ছাড়াও কয়েকটি পরিচ্ছেদের পাতার বিভিন্ন কাঁথা-স্টিচের নমুনা পাড়ের মত চলেছে। সব মিলিয়ে লীলাবতী বাড়িতে রেখে পড়ার মতো বই। 


কুরবানি অথবা কার্নিভ্যাল/ শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য



কুরবানি অথবা কার্নিভ্যাল আমি কিনব ঠিক করি লেখক শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের একটি সাক্ষাৎকার দেখার পর। উপন্যাসটি প্রোমোট করার উদ্দেশ্যে প্রকাশক গুরুচণ্ডালীর পক্ষ থেকেই ভিডিওটি বানানো হয়েছিল। বই প্রোমোট করার ক্ষেত্রে ইন্টারভিউ বেশ উপযোগী অস্ত্র দেখা যাচ্ছে। আমি আর অর্চিষ্মান বইমেলার আগ দিয়ে দুজন লেখকের দুটো ইন্টারভিউ দেখেছিলাম এবং দুটি বইই আমাদের কেনার ইচ্ছে হয়েছিল।

যাই হোক। শাক্যজিতের ইন্টারভিউটা দেখে আমার বইটা কেনার ইচ্ছে হয়েছিল কারণ ওই ইন্টারভিউতে গোয়েন্দাগল্প সম্পর্কে লেখকের মতামত আমার মতের সঙ্গে মিলেছিল। লেখক বলেছিলেন, সামাজিক দর্পণটর্পন হলে ক্ষতি নেই, কিন্তু সেটা পরের দু'আনা। তার আগে গোয়েন্দাগল্প হওয়ার জন্য একটা ভদ্রস্থ রহস্য আর একটা পদস্থ প্লটের প্রয়োজন। আমি ওঁর সঙ্গে একশো এক শতাংশ একমত।

কাজেই বইমেলায় গুরুচণ্ডালীর দোকানে গিয়ে বইটা কিনলাম। এবং পড়ে একটি বিষয় ভেবে অবাক হলাম। যে ইন্টারভিউতে আদৌ গোয়েন্দাগল্পের আকৃতিপ্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল কেন। কারণ বইটা গোয়েন্দাগল্প নয়। থ্রিলার বলে প্রচার করা হলেও থ্রিলারও নয়। যদি না একটা প্রেম টিকবে না টিকবে না, প্রেমিকপ্রেমিকা নিজেদের গোলমেলে আচরণ নিয়ে একে অপরের কাছে ধরা পড়বে না পড়বে না, মিছিল বেরোবে না বেরোবে না - এইসব দোলাচলসমূহকে আপনি থ্রিল বিচার করেন। অবশ্য লেখককে দোষ দেওয়া যাবে না কারণ ওই সাক্ষাৎকারে তাঁকে যখন নিজের বইয়ের বর্ণনা দিতে বলা হয়েছিল, তিনি গোয়েন্দা কিংবা থ্রিলার কোনও শব্দই ব্যবহার করেননি। বলেছিলেন, ছাত্র রাজনীতির দলিল। 

একেবারে খাঁটি বর্ণনা। কুরবানি অথবা কার্নিভ্যাল ছাত্র রাজনীতির আঙিনায় থ্রিলার নয়, ছাত্র রাজনীতি অবলম্বন করে লেখা একটি উপন্যাস। উপন্যাসের ধরতাইয়ে একটি অপরাধ আছে। রাজেন্দ্র তপাদার বলে একজন ছাত্র, একটি ছাত্র রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে। সেই উধাও হওয়াকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কয়েকটি দলের পরবর্তী কর্মপদ্ধতি নিয়ে শোরগোল শুরু হয়েছে। নামগুলো বদলে দেওয়া হলেও ফেডারেশন, ফোরাম, যুক্তমঞ্চ ইত্যাদি দলের ছায়ার পেছনে বাস্তবের রাজনৈতিক দলগুলোকে চিনতে কোনওই অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

বইটি দ্রুত পড়া যায়। সেটা বইয়ের আয়তনের জন্য যত না, শাক্যজিতের ভাষার জন্য তার থেকে বেশি। “ঝরঝরে ভাষা” লিখতে আমার সাধারণত বাধে, কারণ কার ভাষাই বা ঝরঝরে নয়? তাছাড়া ঝরঝরেত্ব ছাড়াও ভাষার আরও অনেক গুণ থাকা সম্ভব। শাক্যজিতের ভাষা বিষয়োপযোগী। তিনি বন্ধুদের কথোপকথন এবং রাতের ফাঁকা গলির বর্ণনা দুইই দক্ষতার সঙ্গে দিতে পারেন। তবে শাক্যজিৎ যেটা সবথেকে ভালো পারেন, মারাত্মক ভালো পারেন, তা হল চরিত্রচিত্রণ। ক্যাম্পাস নভেল, কাজেই হিরোহিরোইন ছাড়াও আরও অনেক চরিত্র আছে। এত ছাত্রের সবার চেহারা একেবারে স্পষ্ট  দেখা যা, কারও সঙ্গে কেউ গুলিয়ে যায় না, প্রত্যেকের ভাষা, রসবোধ স্বতন্ত্র। প্রতিটি চরিত্রের কার্যকলাপের পেছনের যুক্তি আপনি স্পষ্ট বুঝতে পারেন, যা স্রেফ ভালোলাগা মন্দলাগার থেকে সর্বদাই বেশি জরুরি। বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রেরই, হিরোহিরোইনশুদ্ধ, সাদাকালোর মাঝামাঝি অবস্থান, যা তাদের রক্তমাংসের হয়ে উঠতে সাহায্য করে। প্রমিত বলে চরিত্রটি বেশ পছন্দ হওয়ার মতো। আর পলাশ রীতিমত ফুরফুরে। প্রমিত, উদিত, পলাশদের আরও পড়তে মন চায়।

কুরবানি অথবা কার্নিভ্যালের প্রতি আমার প্রধান অভিযোগ উপন্যাসটির গতি। গতি বলতে সাধারণত যে অভিযোগটা মাথায় আসে, আমার নালিশ ঠিক তার উল্টো। কুরবানি অথবা কার্নিভ্যাল পড়তে পড়তে মনে হয় লেখক গল্পটা বলতে শুরু করার আগে বুকভরা দম নিয়েছিলেন, ছেড়েছেন গল্পের শেষ দাঁড়ি টানার পর। রুদ্ধশ্বাস দৌড়। আপনারা বলবেন কিন্তু গতিশীলতা কি এই ধরণের মূলধারার উপন্যাসের, যাকে আবার থ্রিলার বলে বিজ্ঞাপিত করা হচ্ছে, ক্ষেত্রে কাম্য নয়? কিন্তু এ উপন্যাসের এমন অনেক জায়গা আছে যে সেখানটায় ঘটনাপ্রবাহ আরেকটু আস্তে বইলে পড়তে যে শুধু ভালো লাগত তাই নয়, দরকার ছিল। বা এমন অনেক কিছু যেগুলো স্রেফ টপকে যাওয়া হয়েছে। যেমন, রাজেন্দ্র তপাদারের অন্তর্ধানটা। তার পরিণতি গল্পের শেষে দেওয়া আছে, কিন্তু সে স্রেফ শেষপাতায় গিয়ে ছাড়া সুতোয় গিঁট বেঁধে দেওয়ার মতো। কী যে হল, কেন হল, কে হওয়াল, এ সবে আরেকটু খেলানো কি যেত না? এ যেন চটি সিরিজের নাম দিয়ে বার করতে হবে বলে হলে গল্পটাকে ঠেসেঠুসে একটা নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাসংখ্যার বাক্সের মধ্যে পোরা হয়েছে, যেটুকু এদিকওদিক থেকে বেরিয়ে ছিল, ছিঁড়ে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে।

শাক্যজিতের পরের উপন্যাসও পড়ার ইচ্ছে রইল। সবথেকে বেশি ইচ্ছে রইল তাঁর লেখা গোয়েন্দাগল্প পড়ার। সমাজটমাজের দর্পণ হওয়ারও আগে একখানা জমজমাট প্লটের, জলজ্যান্ত চরিত্রের, ইন্টারেস্টিং গোয়েন্দাওয়ালা একখানা খেলানো, স্বাস্থ্যবান ডিটেকটিভ নভেলের। আমার ধারণা তিনি পারবেন।


6 comments:

  1. Bah, boi dutor alochona besh bhalo laglo Kuntala. :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, অরিজিত। নতুন কোনও ভালোলাগা বই পড়ে থাকলে জানাবেন প্লিজ। সন্ধানে আছি।

      Delete
  2. Recent kotogulo bhalo boi porlam botey, nam gulo niche dichhi.

    1. White Chrysanthemum - Mary Lynn Bracht : Dui Korean bon er kahini, jara eke oporer theke bichhinno hoye jay dwitiyo biswojuddher samaye. Japani soinik ra ekjon k tule niye chole jaay. Juddher onek morbidity ache boitay, tobe amar bhalo legeche.

    2. The Blind Assassin - Margaret Atwood: Ei boita hoyto apni porechhen, kenona eta besh purano boi (2000 probably). Na pore thakle porte paren, amar durdanto legeche. golper modhye golper modhye golpo, narrative darun r bhasha ekdom classic jake bole.

    3. Snap - Belinda Bauer: Besh bhalo ekta mystery, onekdin pore monta furfure hoye giyechilo eta pore

    4. The Summons - Peter Lovesey: Detective Peter Diamond series er tritiyo golpo eta. Lovesey onekgulo series lekhen, eta tar modhye ekta. Besh classical age er chhoa acche, songe 2-3 te subplot o, oi english golpe jemon thake r ki.

    5. Indranath Rudra samagra - 1: Adrish Bardhan - Age ediksedik kore Indranath Ruda'r golpo porleo ebare bari giye thhik korlam ektu structurally pori, tai prothom duto khondo niye esechhi. Golpo gulo bhaloi, obossoi sobgulo noy.
    Ei kota apatoto.
    Sonjojon hisebe boli, aajkal khub PG Wodehouse porchhi, Jeeves-Wooster series. prothome chhotogolpo gulo porlam (The World of Jeeves naam boitar), ekhon ek ek kore upanyas gulo porchhi, r prochur haschhi. :) :)

    Post ta oneeeeeeeeeek loma hoye gyalo :|

    ReplyDelete
    Replies
    1. এবং লম্বা উত্তরই আমার পছন্দ। আপনি যে ধৈর্য ধরে লিখলেন এত কিছু সে জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ, অরিজিত।

      আপনি ঠিকই গেস করেছেন, ব্লাইন্ড অ্যাসাসিন আমি পড়েছি এবং বাকি কিছুই পড়িনি। জিভস অ্যানড উস্টারের ছোটগল্প ছাড়া। উপন্যাসগুলোতে এবার হাত দিতে হবে। খুব কম লেখকের হাসির লেখা পড়লে মুখ থেকে সশব্দ হাসি বেরিয়ে পড়ে, উডহাউস নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। আমাদের তারাপদ রায়ও থাকবেন লিস্টে।

      আপনার লিস্টের বাকি বইগুলো জোগাড় করার চেষ্টা করব অবশ্যই। অনেক অনেক ধন্যবাদ আবারও।

      Delete
  3. Abar dhonyobad keno?
    Btw, apni "e masher boi" section ta abar niyomito chalu korun, onek notun notun boi-er sandhan pai okhane, r review porteo bhalo laage. :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. এ মাসের বই ফিরে শুরু করার আমারও ইচ্ছে আছে, অরিজিত। তবে অভ্যেস চলে গেছে তো, সইয়ে সইয়ে শুরু করতে হবে। দেখা যাক।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.