একটি ছোট্ট বিপ্লবের গল্প



ঘটে যাওয়ার এক সেকেন্ড আগে পর্যন্ত ঘটনাটা যে ঘটতে পারে কেউ কল্পনা করেনি। ঘটে যাওয়ার পরের মিনিমাম মিনিটতিনেক জনতার মুখেচোখে অবিশ্বাস লেপে ছিল।

কত হবে তখন, রাত সাড়ে ন'টা? ঘাম, ক্লান্তি, সিঁদুর মাখামাখি মুখ, চুল, মাথা। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে, ধুনোর গন্ধে লাংস বলছে, ছেড়ে দে। ঢাকিকে সরিয়ে দিয়ে, পাড়ার সুন্দর যুবকের আঙুল দায়িত্ব নিয়েছে ঢাকের কাঠির। সারা বছর দাঁড়িপাল্লায় চানাচুর আর বেসন মাপা আঙুল যে অত সুন্দর, খেয়ালই হয় না। উল্টে যাওয়া ধুনুচির আগুন উড়ে উড়ে পড়ছে, চেঁচিয়ে উঠছে জনতা, দৌড়ে গিয়ে গনগনে নারকেলের ছোবড়া সরিয়ে দিচ্ছে সাবধানীর দল, টলমল খালি পা ওর ওপরেই এসে পড়বে যে কোনও সময়। পড়লে তেমন কিছু যাবে আসবে না, কারণ বিকেলের সিদ্ধি এতক্ষণে ব্রেনের ভেতর সাম্রাজ্য ফেঁদে বসেছে। বিচক্ষণ আড়চোখ হাতঘড়ির দিকে, এবার শেষ কর সব। রাত হয়ে যাচ্ছে। বারণে তেমন জোর নেই। থামলেই সব শেষ। কাল সূর্য উঠবে কি না কেউ বলতে পারে না, এক বছর বাদে কে কোথায় থাকে না থাকে, মা দুর্গাও জানেন না।

নাচ ফের পিক আপ নিয়েছে এমন সময় ভিড়ের ভেতর থেকে কে যেন ছিটকে বেরিয়ে এল। কেউ চিনতে পারল, অধিকাংশই পারল না। যারা পারল তারা রুদ্ধশ্বাস ফিসফিসে বাকিদের জানিয়ে দিল।

ওই যে ওই কোণের বাড়িতে নতুন এসেছে, ওদের বাড়ির।

নতুন এসেছে যে সেটা বলার দরকার নেই। না হলে আমাদের সাতাশ নাকি সাঁইত্রিশ বছরের পুজোতে যে এ জিনিস যে ঘটেনি, ঘটে না, সেটা জানত। এই রকম চোখ বুজে, হাত পা ছুঁড়ে, সর্বাঙ্গ দুলিয়ে ধাঁই ধপাধপ নাচতে নেমে যেত না।

ওই শেষের রাত্তিরেও, যেখানে অব্যবস্থাটাই ব্যবস্থা এবং বেনিয়মটাই নিয়ম, সেখানেও আমাদের পাড়ার পুজোয় অলিখিত কিন্তু সুনির্দিষ্ট নিয়ম মানা হত। একটা নির্দিষ্ট ছন্দ। একদল হেঁইও বলে মূর্তি তুলে মণ্ডপের বাইরে এনে রাখবে, সরে যাবে, অন্যদল সিঁদুরের বাটি আর সন্দেশের পাঁচটাকার প্যাকেটওয়ালা থালা নিয়ে প্যান্ডেল দখল করবে। সঙ্গে দু'চারজন ছুটকোছাটকা, বগলে ভূগোল বই,  গমনোদ্যত পার্টির বিশেষ একজনের পায়ে ছুঁইয়ে রাখা দরকার, স্কুল খুললেই পরীক্ষা। প্রণাম এবং সন্দেশ মাখানোর পর্ব যতক্ষণ চলবে, অন্যদল ততক্ষণ ক্লাবঘরের ভেতর সিদ্ধি গুলবে এবং গিলবে। যাতে বরণ শেষ হলে আবার প্যান্ডেলের দখল নিয়ে মিনিমাম ঘণ্টা আড়াই নাচার পরিশ্রম অগ্রাহ্য করা যায়।

সে বছরও তেমনই হচ্ছিল। নাচ পিক আপ নিয়েছে, লেটলতিফ কাকিমা, জীবনে একদিনও অফিসে টাইমে না পৌঁছতে পারার রেকর্ডের অধিকারী, অপরাধী মুখে নিয়ে নৃত্যরত পাবলিকের ধাক্কা এড়িয়ে বরণ সারছেন, প্যান্ডেলের বাইরে রাত ঘন হয়েছে, ঢাকের শব্দ কান বেয়ে বুক আর গলার সংযোগস্থলে সেঁধিয়ে দপদপাচ্ছে। র‍্যাশনালিটির তিনটি সূত্র গঙ্গায় ভাসিয়ে সবাই আবেগ আর অ্যাড্রিনালিনের দলা, ওই মুহূর্তে চাইলে হিংসুটে ফার্স্ট বয়ও ক্লাসনোটস দিয়ে দেবে, সামান্য তফাতে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা সি পি এম নেতা মূঢ়তা জেনেও মুচকি হেসে কোলাকুলি অ্যাকসেপ্ট করে নেবেন, এমন সময় ভিড়ের ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল টিয়া। কোণের বাড়িতে নতুন আসা বছর পনেরোর মেয়েটি। নাচতে শুরু করল। দুই হাত মাথার ওপর তুলে, সারা শরীর দুলিয়ে, চোখ বুজে, বিশ্বসংসার ভুলে।div>

টিউবলাইট দপদপিয়ে নিভে গেল না, ত্রিপল ধসে পড়ল না, মা দুর্গার মুখের দিকে চট করে তাকিয়ে নিল সবাই, নাঃ হেলদোল নেই। সারা মুখে সিঁদুর আর আতা সন্দেশ মেখে হাসি হাসি মুখে তিনি ঘামছেন যেমন ঘামছিলেন।

উল্লাস আবার পিক আপ নিল। ঢাকের কাঠির শ্রান্ত হাত বদল হল, নতুন ধুনুচি সেজে এনে হাতঘড়ি-জেঠুর হাতে দিল একজন। জেঠু - হাওড়া টু তারকেশ্বর, গঙ্গার পশ্চিমপাড়ের অবিসংবাদিত ধুনুচি চ্যাম্পিয়ন - শেষ রাতের ওস্তাদের ভূমিকায় নামলেন, ভিড় সশ্রদ্ধায় সরে গিয়ে জায়গা করে দিল।

টিয়া, আমাদের ঐতিহ্যবাহী ডান্সপার্টির এককোণে নেচে যেতে লাগল; ওর ঘটিয়ে ফেলা বিপ্লবের তাৎপর্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন।

আর ভিড়ের ভেতর দাঁড়ানো আমি বুঝে গেলাম, ভবিষ্যতে রিপ্রেজেন্টেশনের তাৎপর্য নিয়ে যারা উদাসীনতা বা সংশয় দেখাবে, তারা কিস্যু জানে না। ভবিষ্যত, কারণ তখন রিপ্রেজেন্টেশন শব্দটা জানলেও ও শব্দ যে কোনওদিন আমার সান্ধ্যআড্ডার অংশ হওয়ার উদারতা দেখাবে, সে উচ্চাশা পোষণ করিনি। ঠিক যেমন প্রত্যেকবছর ভিড় করে পাড়ার ভাসানের নাচ দেখলেও কখনও নিজে নেচে ওঠার কথা কল্পনা করিনি। টিয়াকে দেখে প্রথমবার টের পেয়েছিলাম, চাইলে আমিও নাচতে নামতেই পারি। কেউ কিছু বলবে না। বলার কোনও কারণ নেই।

পারিনি, কারণ পারমিশন পাওয়া না পাওয়ার বাইরেও আমার প্রভূত সমস্যা আছে। সেগুলো যদি না থাকত, নাচতে নামার কথা কল্পনায় এলে যদি আমার হার্টফেল হওয়ার উপক্রম না হত, নাচলে আমাকে কেমন দেখাবে-র আতংক যদি অংক পরীক্ষায় গোল্লা পাওয়ার থেকে একশোগুণ বেশি না হত, তাহলে আমি যেখানে ভাসানের নাচ হতে দেখতাম, দুই হাত আকাশে তুলে ভিড়ে যেতাম। তারপর সামগ্রিক বিস্মরণ। তুরীয়ানন্দ।

প্রিয় গান, বই, সিনেমা, পার্টির নাম সবাই জিজ্ঞাসা করে, প্রিয় নাচের কথা কেউ জানতে চায় না। ভালোই করে একদিক থেকে, করলে ইমেজের মুখ চেয়ে হয় ব্যালে নয় মোহিনীআট্টম কিছু একটা বলতে হত। এবং সেটা মোটেই সত্যিবচন হত না।

এই স্বীকার করছি, আমার জীবনব্যাপী প্রিয়তম নাচ, ভাসানের নাচ।

সত্যিতে পারি না পারি, আমি আপনি সবাই যেন যে যার বুকের ভেতর ভাসানের নাচ নাচতে নাচতে জীবনের মধ্যে দিয়ে ভেসে যেতে পারি, এই আমার অন্তরের কামনা রইল।

শুভ বিজয়া।


Comments

  1. বৈজয়ন্তীOctober 31, 2020 at 6:16 PM

    ভাসান নাচ আমারও দারুণ প্রিয়, ওই এক রকমই পারি কিনা।
    এ বছর পুজোটা সত্যি কেমন ঢাকাচাপা দিয়ে কেটে গেল, টের পেলামনা।
    মেয়ের নতুন জামাগুলো পড়ে পড়ে ছোটো হচ্ছে বলেই শুধু একটু যা হাঁটতে বেরোনো হয়েছিলো।
    যাকগে, আসছে বছর আবার হবে, আগের চেয়ে ভালো হবে, এইটাই ভাবছি।

    বিজয়ার অনেক শুভেচ্ছা রইলো আপনার জন্যেও।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ভেরি গুড, বৈজয়ন্তী। কোনওদিন যদি দেখা হয় আর যদি হাতের কাছে ভাসানটাসান হতে থাকে, দুজনে মিলে নাচব, এই কথা রইল। সঙ্গী পেলে আমার আতংক কাটবে মনে হয়। সামনের বছরের পুজো ভালো হবেই, আমার মন বলছে। বাড়ির সবার জন্য অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা আর আদর রইল। শুভ বিজয়া।

      Delete
  2. Khub bhalo laglo.. keu ananda kore nachte dekhle bhalo lage.. seta bhasan hok ba khelay priyo team jitle.. hya amar mamabari Murshidabad, pujo r thek bhasan anek beshi interesting hoy : papiya

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ, সেটা আন্দাজ করতে পারছি, পাপিয়া। খোলা গঙ্গায় ভাসান প্রত্যক্ষ করার চার্মই আলাদা নির্ঘাত। আমাদের এদিকে দুর্গাপুজোয় অত মাতামাতি নেই, চন্দননগরে আর রিষড়ায় অল্পস্বল্প জগদ্ধাত্রী নিয়ে লাফালাফি আছে, এখানেও অনেকে এক্সক্লুসিভলি জগদ্ধাত্রীর ভাসানই দেখে, একসঙ্গে অনেক বেশি ঠাকুর, অনেক কম পরিশ্রমে দেখা হয়ে যায়।

      Delete
  3. Replies
    1. শুভ বিজয়া, সায়ন।

      Delete
  4. আগে একবার হয়েছে, ফের বলে যাই শুভ বিজয়া। অমন দুম করেই শুরু করে ফেললেই শুরু হয়ে যায়। আর হ্যাঁ ভাসানের নাচের সত্যিই কোনো বিকল্প নেই।

    ReplyDelete
    Replies
    1. শুভেচ্ছা বিনিময় বারংবার হলে ক্ষতি নেই, প্রদীপ্ত। আমার তরফ থেকে অনেক ভালোচাওয়া আর নাড়ুনিমকি রইল।

      Delete
  5. মনখারাপ করা, প্রবাসী জীবনের দুধের-স্বাদ-ঘোলে-মেটানো পুজোর রেষটুকুও না-থাকা একটা পুজো কাটালাম। তার মধ্যে আপনার লেখাগুলো সত্যিই সুন্দর পুজোর আমেজ বয়ে আনে। আপনার নতুন জামা পরে ঠাকুর (না) দেখতে যাওয়ার গল্প, নাচের গল্প, ফাদার ব্রাউন, সবই খুব ভাল লেগেছে। যদিও লক্ষীপুজো কেটে গেছে, আমি "কালীপুজো অবধি বিজয়া চলে" এই মতবাদে বিশ্বাসী, তাই আপনাকে আর অর্চিষ্মানকে শুভ বিজয়ার শুভেচ্ছা জানাই। কোভিডের সময়ে কোলাকুলি এমনিতেও ভার্চুয়ালই সেফ, সেটাও এখানে সেরে রাখলাম। লাভের মধ্যে এবার পুজোয় বাড়িতে তৈরী আলুর চপ, এগ-চিকেন রোল, শিঙাড়া আর পান্তুয়া খাওয়া হয়েছে। সেগুলো আর পাঠাতে পারলামনা। ফির কভি।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ইস, কী ভালো ভালো খাবার খেয়েছেন, সুগত। লোভ দিলাম। বিজয়া অবশ্যই কালীপুজো পর্যন্ত চলে, যারা বলে চলে না তারা... ওয়েল, তারা কী সেটা উহ্যই থাক। আপনি, পৌলমী আমার বিজয়ার প্রীতিশুভেচ্ছা জানবেন, অলির জন্য অনেক অনেক আদর রইল। শুভ বিজয়া।

      Delete
  6. দারুণ। বিলম্বিত শুভ বিজয়া।

    ReplyDelete

Post a Comment