October 18, 2020

মজাহীন পুজো



এবারের পুজোয় মজা হবে না, বলছেন কেউ কেউ। মাস্ক পুড়িয়ে কাছা উড়িয়ে আনন্দ করা যাবে না। হইহুল্লোড় নেই, দৌড়োদৌড়ি নেই, ভিড়ভাট্টা নেই। চাঁদা ওঠেনি বেশি। আলো জ্বলবে না। এ পুজো আবার পুজো নাকি?

পুজোয় আমাদের বাড়ি বেড়াতে আসার সময় তুতো ভাইবোনেরা (কেউ কেউ) হুবহু এই কথাই বলত। কোনও মানে হয়? পুজোয় সবাই কলকাতায় আসে, আর আমরা কি না মফঃস্বলে যাচ্ছি? তার থেকে বরং তোমরা এস, দেখে যাও কেমন হয় শহরের আনন্দের পুজো। তোমাদের দুঃখের পুজো উজিয়ে দেখতে যাওয়ার থেকে ঢের বেশি যুক্তিপূর্ণ হবে না কি সেটা?

তবু যাতায়াত হত দু'পক্ষেই। এখন যেমন ইচ্ছের জয় সর্বত্র, তখন তেমন কর্তব্যবোধের জমানা ছিল। অপছন্দের বা অসুবিধেজনক দূরত্বে থাকা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও নিয়ম করে যেত লোকে। দুঃখের পুজো সইতে হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও।

শহরতলির লোকদের পক্ষেও এই যাতায়াত খুব বেশি আনন্দের ছিল না। এমনিতে তো লোক-আসাসংক্রান্ত খাটনি - ডাল ভাতের বদলে ঘি ভাত, ট্যালটেলে মুসুরের বদলে ভাজা মুগ, চারাপোনার ঝোলের বদলে কচি পাঁঠার কষা, শুঁটকো চালতার চাটনির বদলে কাজুকিশমিশ পায়েস, বেডকভার বদলানো, জানালার পর্দা পাল্টানো। সবের ওপর উক্ত অতিথিদের আনন্দের পুজো ছেড়ে দুঃখের পুজো দেখতে আসার আত্মবলির মর্যাদারক্ষার্থে তটস্থ থাকা।

রিকশা থেকে নেমে মিষ্টির প্যাকেট হস্তান্তর করতে করতে অতিথিরা বলতেন, বাপরে বাপরে বাপ, ট্রেন লাইন তোরা থাকিস কী করে? কাজিন বলত, কী গো, তোমাদের পুজো হচ্ছে না নাকি এ বছর? কিছু টেরই পাচ্ছি না তো। মাইকফাইক বাজে না?

রীতিমত বাজে। এই তো সারাসকাল 'মহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো' লুপে চলছিল, তারপর অঞ্জলির মন্ত্রও এ বছর থেকে মাইকে পড়েছেন ঠাকুরমশাই। আরেকটু আগে এলেই...

আরও আগে? আত্মীয়রা শিউরে উঠতেন। সেই কখন বেরিয়েছি, বাপ রে বাপ রে বাপ।

আমরা অধোবদন হতাম। সত্যি, আমাদের বাড়িটা লজ্জাজনক রকমের দূরে। তাঁদের পরিশ্রমের মর্যাদা দিতে গাড়ি (অ্যামবাসাডর) ভাড়া করে যাওয়া হত শ্রীরামপুরের পুজো দেখতে। হাজার হোক সাবডিভিশন শহর। এককালে শ্বেতাঙ্গদের উপনিবেশ ছিল। গঙ্গার ধারে সুদৃশ্য থামওয়ালা কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, কলকাতার প্রেসিডেন্সির পরে, বলা বাহুল্য, কিন্তু দেশের বাকি সব কলেজের আগে!

এ সব দেমাকে চিঁড়ে ভিজত না, উল্টে আমাদের দুরবস্থা আরও প্রকটই হত। শ্রীরামপুরের পুজোগুলোও ম্যাডক্স স্কোয়ারের সামনে শ্রাদ্ধবাড়ি।

প্রোটেক্টেড ছোটবেলার একটা সুবিধে হচ্ছে বাকিরা যে কত সুখী আর আমরা যে কত দুঃখী সেই সত্যিটার থেকেও প্রোটেকশন পাওয়া যায়। বড় হয়ে, দেখেশুনে, চোখ খোলে। একবার এক চেনা লোক তার এক চেনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলেছিল, দাঁড়া দাঁড়া, তোদের যেন কী একটা কমন ব্যাপার আছে... প্রিয় বই...উঁহু… প্রিয় সিনেমা... রাদার সত্যজিৎ দ্যান ঋত্বিক.. উঁহু তাও না...ইস পেটে আসছে মুখে আসছে না.. অ্যাই কুন্তলা, তোর বাড়ি ট্রেনলাইনে না? কোথায় যেন? দত্তপুকুর?

না না, দত্তপুকুর তো শিয়ালদা লাইন, আমার লাইন হাওড়া। রিষড়া।

ইউরেকা! তুইও রিষড়ার লোক না? অতি টিপটপ ভদ্রলোককে মিউচুয়াল ফ্রেন্ড পাকড়াও করলেন।

সে ভদ্রলোক যত বলেন, লোক আবার কী? জন্মে থেকে মোটে পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি রিষড়ায় থেকেছেন, তারপরের জীবনটা এক্সক্লুসিভলি মেট্রো এবং মেগাপলিসে ঘুরে ঘুরেই কেটেছে। মুম্বাই, মিউনিখ, ম্যানহ্যাটান... তত আমাদের কমন চেনা বলে যান, চিনতিস নাকি একে অপরকে? কতদূর তোদের পাড়া? গঙ্গায় চান করতে যেতিস? ট্রেনে ডিমসেদ্ধ খেতিস?

আমার ভদ্রলোককে দেখে মায়াই হচ্ছিল। রিষড়ায় কাটানো ওঁর বিশ্রী, দুঃখী শৈশব, কৈশোর, প্রাকযৌবন বিষয়ে ততদিনে ওঁর চোখ ফুটে গেছে, তাই উনি সে দুঃখের কথা আর মনে করতে চান না।

একটু দেরিতে হলেও, আমারও মায়া কেটেছে। কী দুঃখের পুজোই না কাটিয়েছি শৈশবে। বিশেষ করে দাগ রেখে গেছে একটা দুঃখের অষ্টমী। যে দুঃখে সে বছরের অষ্টমীর জামাটারও অবদান ছিল। জামাটা মা এনে দিয়েছিলেন। বাড়ি থেকে ওই একটাই জামা হত। তবে সেজকাকু, ছোটকাকু, জেঠু, বড়, মেজ, ছোট মামা, বড়, মেজ, সেজ, ছোটমাসি মিলিয়ে আমার পুজো কালেকশন কম হত না। কোনটা কোন দিন পরা হবে সেই নিয়ে চিবুক-চুলকোতে হত। সাধারণতঃ সাদা, আকাশি, গোলাপি, কচি কলাপাতা ইত্যাদি 'লাইট' কালারের জামাগুলো (বাড়ির জামা অবধারিত এই গোত্রে পড়ত) ষষ্ঠী বা সপ্তমীতে পরা হত। আর দেখতেশুনতে হাল্লারাজার জোব্বার কাছাকাছি 'ডিপ' কালারের জামাগুলো, যেগুলো পরামাত্র গলগল ঘাম হয় আর গা কুটকুট করে, তুলে রাখা হত অষ্টমী আর নবমীর জন্য।

সে বছর কেন যেন মা আমার জন্য ওইরকম একটা গা কুটকুটে জামা কিনে এনেছিলেন। তার রং লাইট ঘিয়ে হলেও বাকি আর কিছুই লাইট নয়। চুমকিটুমকি বসানো। এদিকসেদিকে নেট, লেসের কারিকুরি।

কেন কিনে এনেছিলেন মা জামাটা ভগবান জানেন। তার আগের প্রতি বছর এবং পরের বছরগুলোতেও মা নিউ মার্কেট থেকে ছিট কাপড় কিনে এনে দেবশ্রী টেলারিং থেকে জামা বানিয়ে আনতেন। সে বছর কেন হঠাৎ শ্রীরাম আর্কেডে গিয়ে লিফটে চড়ে মহার্ঘ জামা কিনতে গিয়েছিলেন মা, রহস্য। থাকলে ফোন করে সমাধান করে নেওয়া যেত।

জামাটা যে দেখতে খুব চমৎকার ছিল তা নয়। দেবশ্রীর ক্যাটালগ দেখে বানানো ছিটকাপড়ের জামার বেশিরভাগই ওর থেকে সুদৃশ্য ছিল। পরে জেনেছি, সুন্দর দেখানোটা অনেকক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য হচ্ছে 'এক্সপেনসিভ' দেখানো। সে উদ্দেশ্য ওই জামা সফল করেছিল। আলো পিছলানো, সলমাচুমকি বসানো, হাত ছোঁয়ালে মোটা সুতির আশ্বাসের বদলে সরসরে সিনথেটিকের গা-শিরশিরানো মিলিয়ে জামাটা যে দামি সে আর বলে দিতে হচ্ছিল না। আমার ওয়ার্ডরোবে (গোদরেজ আলমারির একটা তাকের অর্ধেক) ও রকম জামা আর ছিল না।

মা নিজেও অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। বারবার বলছিলেন, একটু বেশি খরচ হয়ে গেল, কিন্তু ভালো হয়েছে না সোনা জামাটা? তোর পছন্দ হয়েছে? সত্যি সত্যি?

আমি জোরের সঙ্গে বলেছিলাম, মচৎকার জামা হয়েছে মা। কোথায় রেডিমেড, কোথায় হাতে বানানো। তাছাড়া হাতে বানানো মুখমোছা জামাদের মধ্যে না হয় থাকল একটা চুমকি বসানো রেডিমেড জামা। আফটার অল, বৈচিত্র্যই জীবনের সম্পদ।

তখন মা আর চেপে রাখতে না পেরে জামার দামটা বলেই ফেলেছিলেন। এ-গা-রো-শো টাকা।

শিউরানিটা কতটা চাপা দিতে পেরেছিলাম কে জানে। আমি তখন ডেইলি পাঁচ পাঁচ দশটাকা রিকশাভাড়া অ্যালাউয়েন্স পাই। হাজার টাকা ব্যাপারটা থিওরিতে সম্ভব জানি, বাস্তবে বিশ্বাস করি না।

মা নিশ্চয় করতেন, তবে তাঁর অস্বস্তিটা ছিল অন্য জায়গায়। অ্যাফর্ডেবিলিটি নিয়ে নয়, নীতির প্রশ্নে। খাইখরচ, বই কেনা, বেড়াতে যাওয়া, পোশাকআশাক, রেস্টোর‍্যান্টে খাওয়া - কোন খাতে কত খরচ করা যাবে তার একটা নির্দিষ্ট হিসেব বা আইডিয়া সে আমলের মধ্যবিত্তর ছিল। আর সে হিসেবের ভিত্তি ছিল বাঙালির বর্ণপরিচয়ের অরিজিন্যাল চার অক্ষর। ব-এ হ্রস্ব ই ল-এ আ-কার দন্ত্য স-এ হ্রস্ব ই ত-এ আ-কার। ও জিনিসের পাল্লায় একবার পড়লে সন্তানের চরিত্রগঠনের ওইখানেই ইতি। পাশের বাড়ির হিংসুটে পাকা বাচ্চা লাগবে না, নিজের বাচ্চা আপসে গোল্লায় যাবে।

দামি জিনিসের আরেকটা ঝামেলা হল, সে সস্তা সংসর্গে থাকতে পারে না। একটা দামি জিনিসের জন্য অন্য দামি জিনিস লাগে। দাম দিয়ে গ্যাজেট কিনলে ভয় হয়, চিমনিহীন রান্নাঘরের তেলমশলায় দামের চমক চটল বলে। নিজের লোভের ওপর তো আর রাগ করা যায় না, সব রাগ গিয়ে পড়ে পূর্বপুরুষের রান্নার ছিরির ওপর। যা পাচ্ছে ভেজে দিচ্ছে। যেমন অস্বাস্থ্যকর, তেমন গাঁইয়া। গাদা গাদা সম্বার-ফোড়ন, চটাসপটাস, ফুট ফাট, খুকখুক, হ্যাঁচ্চোম্যাচ্চো। ভদ্র জায়গায় রাঁধার উপায় নেই, স্মোক অ্যালার্ম বাজতে শুরু করবে। হাউ এমব্যারাসিং। চিমনিটা এ মাসে হয়ে যাক, পরের মাসের টার্গেট এয়ার ফ্রায়ার। হাওয়ায় শিঙাড়া ভেজে দেবে। খেতে যেমনই হোক, রান্নাঘর নোংরা হবে না।

মোদ্দা কথা, এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে ওই ফোর ডিজিট দামের জামা পরে টিউবলাইট জ্বালানো প্যান্ডেলে ঘুরে বেড়ানো যায় না। ঝাড়লন্ঠন মিনিমাম লাগে।

আর ঝাড়লন্ঠন চাইলে কলকাতা যেতে হয়। হোলনাইট ঠাকুর দেখার সাহস বা শক্তি আমাদের কারওরই ছিল না, কাজেই ঠিক হল খেয়ে উঠে বেলা থাকতে থাকতে কলকাতা গিয়ে ঠাকুর দেখে রাত থাকতে থাকতে ফিরে এসে শান্তিতে ঘুমোনো যাবে।

বুড়োদের গল্প বলতে এত সময় লাগে কেন জানেন? গল্পের স্টক বেশি হওয়াটা যত না কারণ, তার থেকে বড় কারণ হচ্ছে একটা গল্পের পেছনে মেলা তথ্যপ্রমাণ সাপ্লাই দিতে হয়। এক কথা একশোবার ইনিয়েবিনিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা চালাতে হয়। না হলে সবই 'গুল্প'-এর মত শুনতে লাগে।

এই যেমন নবীন প্রজন্ম আমার এই গল্পটা শুনে বলবে, অষ্টমীর সন্ধেবেলা ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুর থেকে ট্রেনে চড়ে এসে গঙ্গা পেরিয়ে শহরে ঢুকে ঠাকুর দেখে রাত হওয়ার আগে বাড়ি ফিরে ঘুমোবে, ইয়ার্কি হচ্ছে?

একটুও ইয়ার্কি না। অন গড ফাদার মাদার। এখন যেমন গায়ে তেল মেখে তৃতীয়ার দুপুররাতে না বেরোলে আধখানা ঠাকুরও দেখা যায় না, জ্যামে দাঁড়িয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে প্যান্ডেলের আলোর আভাস পেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়, আমাদের আমলে সে রকম ছিল না। আমরা অষ্টমীর দিন খেয়ে উঠে, চল চল সন্ধে নামলে ভিড় হয়ে যাবে, তাড়া দিতে দিতে জানালা বন্ধ করতাম, (আশ্বিন মাসের সন্ধেবেলা জানালা খোলা রাখলে যা মশা ঢুকবে, বাড়ি ফিরে আর ঘুমোতে হবে না। পুজোর দিনে মশারাও সপরিবারে বেরোবেন, গায়ে হাতে পায়ে দুই আঙুলের ফাঁকে, যেখানে চাপড় মারা তো দূরের কথা ভরপেট রক্ত খেয়ে উড়ে যাওয়ার পর আরাম করে চুলকোনোও যায় না, পাত পেড়ে ভোজে বসবেন),  ট্রেনে চড়ে শহরে গিয়ে, সারা সন্ধে ঠাকুর দেখে, গোড়ালির ওপরের নরম চামড়ায় জুতোর সেলাইয়ের জ্বলুনি সয়ে, রাতের ট্রেনে ঘামতে ঘামতে, হাই তুলতে তুলতে বাড়ি ফিরতাম। সিট পাওয়ার প্রশ্নই নেই, পা খুলে আসছে। টেনশন হচ্ছে যদি রিকশাস্ট্যান্ড ফাঁকা হয়ে যায় তাহলে আবার স্টেশন থেকে হেঁটে বাড়ি যেতে হবে (হত, প্রত্যেক বছর) আর নিজেদের মন্দবুদ্ধিকে শাপশাপান্ত করছি। কলেজ স্কোয়ারের ওই চিমসেমুখো ঠাকুর দেখার লাইনে ফালতু সময় নষ্ট হল। না হলে আরও দুটো প্যান্ডেল ঘোরা হয়ে যেত।

খেয়ে উঠতে না উঠতে নীল আকাশের সাদা মেঘ কুচকুচেবর্ণ ধারণ করে পৃথিবীর ওপর ফেটে পড়ল। বেলা চারটে নাগাদ কলকাতার উচ্চাশা ছেঁটে শ্রীরামপুরে নামিয়ে আনা হল। সন্ধে ছ'টার সময় বৃষ্টি যখন ধরল ততক্ষণে রিষড়ার চৌহদ্দির বাইরে বেরোনোর আশা অতি বড় অপ্টিমিস্টেও করবে না।

রিষড়াই সই। ধরাচুড়ো পরে বেরিয়ে হাফ মাইল পর পর চল্লিশওয়াটের বাল্ব জ্বলা ল্যাম্পপোস্টখচিত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে প্রথম প্যান্ডেলটার পাঁচশো মিটারের মধ্যে পৌঁছেছি, আবার নামল।

ক্যাটস অ্যান্ড ডগস বৃষ্টি। দৌড়ে একটা বন্ধ দোকানের ঝাঁপের নিচে পৌঁছতে পৌঁছতে নতুন জামা গায়ে সেঁটে গেল, কপাল বেয়ে জলের ধারা চশমার ওপর দিয়ে বইল। সঙ্গে হাওয়া। মাঝ-অক্টোবরের রাতে, অল্প অল্প কাঁপতে কাঁপতে, ভিজতে ভিজতে আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম, ঝড়ের দাপটে দু'হাত দূরের ল্যাম্পপোস্টের বাল্ব দপদপিয়ে নিভে গেল।

দোকানের চালের অপ্রতুল আশ্রয়ে আরও দুজন লোক ছিলেন, মনে আছে। তাঁরা অবশ্য পুজো দেখতে বেরোননি। একজনের হাতে পুরোনো রঙের ডিব্বায় আঠা, অন্যহাতে ব্রাশ, অন্যজনের হাতে গোল্লা পাকানো পোস্টারের তাড়া। বৃষ্টি নামার আগে পর্যন্ত তাঁরা এদিকসেদিক পোস্টার সেঁটে বেড়াচ্ছিলেন। কীসের পোস্টার দেখতে পাইনি, তবে মোটামুটি গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায় কাস্তে হাতুড়ি তারার। তখন ও সব দিকে অন্য কেউ বিশেষ ছিল না।

বললাম না, গুল্পের মতো শুনতে লাগে।

মিনিট পঞ্চাশ পর হাওয়া কমল। বৃষ্টি ধরার আশায় ছাই দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। অষ্টমীর রাত, খাঁ খাঁ রাস্তা, জলের ছাড়া আর শব্দ নেই কোথাও।

বাড়ি পৌঁছে মা গরম জল বসালেন, বৃষ্টির জল ধুয়ে ফেলতে হবে যাতে ঠাণ্ডা না লাগে। তারপর চা/কফি/গরম দুধ, ডিনারের পর্ব সেরে, মা সেই ভিজে জামা ইস্তিরি করতে বসলেন। সুতির জামা হলে নিংড়ে দুবার ঝাপটা মারলেই ঝামেলা মিটত। দামি জামার সঙ্গে ও সব হেলাছেদ্দা চলবে না।

ভেবেছিলাম আপনাদের মধ্যে যদি কেউ থেকে থাকেন, মজাহীন পুজো নিয়ে আফসোস করছেন, তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এই অষ্টমীর সন্ধেটার কথা লিখব। অনেকসময় লোকের দুঃখ দেখলে নিজের কষ্ট কম ঠেকে। লেখার পর বুঝছি তিন দশকেরও বেশি যত অষ্টমীর রাত মিলেমিশে একাকার, শুধু ওই মজাহীন অষ্টমীর রাতখানা জ্বলজ্বলে থেকে গেছে। জ্বলজ্বলেই, দগদগে নয়। রাতটার কথা মনে এসেছিল বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে। চশমা ছিল, কাজেই অজান্তে ফুটে ওঠা হাসিটা কল্পনা করছি না।

বলা যায় না, আপনার এ বছরের পুজোটাও আমার সেই বছরের পুজোটার মতো হবে হয়তো। মজাহীন, কিন্তু মেমোরেবল। বছর কুড়ি বাদে সব মজা বাষ্প হয়ে উড়ে গেলে হয়তো দেখবেন পড়ে আছে এই মেমোরিটাই।


4 comments:

  1. Khub sundor lekha Kuntaladi - amar nijer jiboner ak khub byaktigoto smritir kotha mone pore gelo. Akbar Ashtami te amader bondhu der sara raat ghorar plan hoye chhilo kintu khub sombhoboto kono bhul bojhabujhite ora gari book korar somoy amake count koreni :) - tai onek dhora churo pore ghor theke permission niye beriyeo ami kichhukhon badei fire esechhilam/ onek Ashtamir smritir moddhe oi barite katano sondhe tai khub mone pore akhono -

    NCR e weather khub bhalo hoye gelo bolo?

    ReplyDelete
    Replies
    1. অন্য কোনও পরিস্থিতিতে তোমার এই গল্পটা শুনলে আমি তোমার জন্য খুব দুঃখ পেতাম, রণদীপ, কিন্তু এই পোস্টের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দুজনেই জানি, আমার সেই ভিজে গোবর, অন্ধকার অষ্টমী আর তোমার বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েও ফিরে আসা সেই অষ্টমীর মাহাত্ম্যই আলাদা, বল? সেই আশাহত অষ্টমীর স্মৃতি সারাজীবন তোমাকে মুচকি হাসি উপহার দিক, আমার তরফ থেকে এই কামনা রইল।

      অর্চিষ্মান দাবি করছে ওয়েদারটা এতই ভালো যে ওর মনখারাপ হয়ে যাচ্ছে। যত্তসব।

      Delete
  2. দারুণ ..প্রতি লাইনে যে কত গল্প মনে পড়ল , কত কিছু মিলে গেল, কত জিনিস একরকম ছিল .. আমিও তো ওই এক ই ট্রেন লাইনে, তোমার থেকে একটু শহরের দিকে হা হা .. পুজো নিয়ে মায়া বা মনখারাপ বা আনন্দ দুটোই এখন ম‍্যানেজ করতে শিখে গেছি দেখে নিজের বেশ ভালই লাগে..

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, আমি সর্বদা রিষড়ায় পরিচয় দেওয়ার আগে সইয়ে নেওয়ার জন্য উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর ইত্যাদির কান টানি, ঊর্মি। উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর যে লাইনে, আমার বাড়িও সেই লাইনে। তাতে শক কম লাগে।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.