কে কার, কোথাকার



সেদিন জুমে একজন জিজ্ঞাসা করলেন আমি ইন্ডিয়ার কোথা থেকে।

ঔপনিবেশিক ইতিহাসের জন্যই হোক বা বর্তমানে দু’বেলা চিকেন টিক্কা খাওয়ার জন্যই হোক, আগেও দেখেছি, ইংল্যান্ডের অনেকেই ইন্ডিয়ার প্রতি নাড়ির টান অনুভব করেন। খবরাখবরও রাখেন গড়পড়তার থেকে বেশি। ইন্ডিয়ার লোক শুনে ক্ষান্ত দেন না, খতিয়ে দেখতে চান।

ইন্ডিয়া তো বিগ অ্যা* কান্ট্রি। ইন্ডিয়ার কোথায়?

কখনও কখনও খতিয়ে দেখা মন্দ লাগে না। এথনিসিটির সেমিনারে বাঙালি শুনে প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞাসা করেছিলেন বাংলাদেশের বাঙালি না ইন্ডিয়ার বাঙালি? এর আগে ভদ্রমহিলার অনেক বক্তব্যতেই মনে মনে ভুরু কোঁচকাচ্ছিলাম, প্রশ্নটা শুনে একটা প্রসন্নতা জন্মাল। যে দেখেছ, আমার ব্যাপারে তবু খায় না মাথায় দেয় কিছু আন্দাজ আছে। আমার স্কুল চিনতে পারাটাও আরেকটা শিওর শট ভালোলাগার আশ্বাস। লোকেশনের প্রান্তিকতার জন্যই হোক বা গুণপনার খামতিতে, আমার স্কুলকে একডাকে চেনার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। এদিকে স্কুলে কাটানো সময়টা নিয়ে গদগদ ভাব আছে আমার। কাজেই স্কুলটা কেউ চিনতে পারলে আমার মনে হয় আমাকেও চিনল একটুখানি।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে খতিয়ে দেখা অস্বস্তিতেও ফেলে।

এই যেমন আমি কোথাকার প্রশ্নটা। কিছু কিছু পরিসরে ইন্ডিয়া বলে ইতি টানা যায়, সে একরকমের নিশ্চিন্তি। কিন্তু অধিকাংশ পরিসরে, যেমন ধরুন কোনও ইন্ডিয়ান যদি প্রশ্নটা করেন, তাহলে এই উত্তরটা দিয়ে সারা যায় না। প্রিসাইজ উত্তর দিতে গেলে বলতে হয় রিষড়া। যেটার আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনও মানে থাকে না। রিষড়ায় থাকি বলাও যা, বাইশ দশমিক সাত দুই চার সাত ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ এবং অষ্টাশি দশমিক তিন চার তিন পাঁচ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থান করি বলাও তা। হুগলী জেলা বললেও পরিস্থিতির বলার মতো উন্নতি হবে না। বরং পশ্চিমবঙ্গ সেফার বেট।

যা-ই বলি না কেন, কলকাতার বলে কদাচ নিজেকে চালাই না। ও আগুনে মুখ পুড়েছে আগে। আমি যে স্রেফ কম কথায় লোকেশন বোঝানোর আরামের জন্য শহরটার নাম নিচ্ছি; নারকেলডাঙা কিংবা নাগের বাজারের পিন কোডের গরিমা গাপের বদুদ্দেশ্যে না; সে কথা কলকাতার লোকদের বুঝিয়ে উঠতে পারিনি।

চুরিচামারি করে সে আরাম জোগাড় করা যায় না কি? হয়তো যায়। কিন্তু স্যাডলি আমি জীবনে এমন জায়গায় পৌঁছতে পারিনি যেখানে দশ হাতের মধ্যে কোনও কলকাতার লোক আড়ি পেতে নেই। ঝুঁকি  নিতে না যাওয়াই ভালো।

অতএব তলিয়ে উৎস জানতে চাইলে আমি ভারতবর্ষের পূর্বদিকে পশ্চিমবঙ্গ নামের অঙ্গরাজ্যের  রাজধানীর কমবেশি তিরিশ কিমি উত্তরে গঙ্গার পশ্চিমকূলের শহরতলি ইত্যাদি প্যাঁচাল পাড়ি। সম্ভবত এতে ‘তারপর, কী চলছে?’-র উত্তরে “আজ্ঞে, আমি চান টান করেই পুঁইশাক চচ্চড়ি আর কুমড়ো ছেঁচকি দিয়ে চাট্টি ভাত খেয়েই অমনি বেরিয়েছি . . .“ এফেক্ট হয়, কিন্তু সুখের থেকে স্বস্তি ভালো।

এত ঝামেলা করি, কিন্তু কখনওই নিজেকে দিল্লির লোক বলে খেল খতম করি না। কেন করি না ভগবানই জানেন। এ শহরে থেকেছি অনেকদিন, বর্তমানে এ শহরেই থাকি, সবথেকে বড় কথা দিল্লির বলে নিজেকে চালালে দিল্লি খাঁড়া হাতে তাড়া করবে না।

দিল্লি কেয়ারই করবে না।

এ সব কারণের বাইরে আরও একটা সরল কারণ আছে নিজেকে দিল্লির দাবি করার। দিল্লি আমার ভালো লাগে।

কেন? 

জে এল এন স্টেডিয়ামের রিং থেকে চোখ ফিরিয়ে প্রশ্ন করল অর্চিষ্মান। শুনলে মনে হবে ওর দিল্লিতে থাকতে খারাপ লাগে কিন্তু সে রকম ধরে নেওয়ার কারণ নেই। নিজের মনের ভাব গোপন রেখে অন্যের মনের ভাব জানতে চাওয়ার গুণ ওর আয়ত্তে।

কাব্য করতে চাইলে করা যেত। সন্ধেবেলা ছাতিমের ঘ্রাণের ঝাপটা, দুপুরবেলা ত্রিবেণী ক্যাফের অডিটোরিয়ামের সিঁড়ির রোদ্দুরের তাত, শেষ রাতে এয়ারপোর্ট থেকে কানের ভেতর ফুল ব্লাস্টে 'মিশকালো রাত আর পিচকালো রাস্তাকে চিরে দিয়ে ছুটে চলে ট্রাক' (গানের লিংক) সহযোগে একের পর এক খাঁখাঁ ফ্লাইওভারের জয়রাইডের একাধার বিষাদ ও মুক্তির কথা তোলা যেত। কিন্তু তুললাম না।

বললাম, এই যে দিল্লি জুড়ে যত্রতত্র পার্ক, বাগান, সৌধ; বিকেল আর ইচ্ছে হলেই ঝপ করে উবার ডেকে (আমাদের থেকে কম আলসে হলে মেট্রো ধরেই যাওয়া উচিত) সে সব জায়গায় পৌঁছে যাওয়া যায়, দিল্লির এই ব্যাপারটা আমার মচৎকার লাগে।

ভালোলাগার যাবতীয় গুরুতর কারণ ছেড়ে এইটাই মনে পড়েছিল কারণ ওই মুহূর্তে আমরা বহুদিন ধরে যাব যাব করে অবশেষে উবার চড়ে চলেছিলাম সুন্দর নার্সারিতে, বিকেলবেলা বেড়াতে।  হুমায়ুন'স টুম্বের, যা আমাদের আরেকটি ভীষণ ভীষণ প্রিয় বেড়াতে যাওয়ার জায়গা, পেছনেই সুন্দর নার্সারি, যা  একসময় ছিল ষোড়শ শতাব্দীতে মোগলদের তৈরি করা আজিম বাগের ধ্বংসস্তুপ। নব্বই একর জায়গা সাজিয়ে গুছিয়ে, রং করে, গাছ পুঁতে, ঘাস ছেঁটে, ফোয়ারা বসিয়ে, ময়ূর পুষে, এমনকি ফ্যাবইন্ডিয়ার একটা আস্ত ক্যাফে ফেঁদে বানানোএবং গুচ্ছ গুচ্ছ লোক যাওয়া সত্ত্বেও ঝেড়েমুছে ঝকঝকে করে রাখা। প্রবেশমূল্য, একজন প্রাপ্তবয়স্কের, মোটে চল্লিশ টাকা।

অনেক জায়গায় তো চল্লিশও লাগে না। সুরম্য লোদি গার্ডেনের গেটের সামনে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে অটোভাইসাবকে বিশ্বাস করাতে ঘাম ছুটে গেছিল যে গার্ডেনে সর্বসাধারণের প্রবেশ অবাধ ও বিনামূল্য। যে কেউ পার্ক খোলা থাকলে গট গট করে ঢুকে পড়তে পারে, সৌধে চড়ে সেলফি নিতে পারে, সবুজ বেঞ্চি বা ঘাসে শুয়ে ভোঁস ভোঁস নাক ডাকাতে পারে, ডুরি শতরঞ্চি পেতে টিফিনবাক্স খুলে ছোলে ভাটুরে খেতে পারে। সব ফ্রি। ভাইসাব মানতেই চান না। বলেন, বি এম ডাবলিউ দাঁড় করিয়ে ডিজাইনার ডগি নিয়ে এ পার্কে ঢুকতে দেখেছি আমি পাবলিককে, বললেই হবে ফ্রি? শহরের সৌন্দর্যায়নের রাজনীতি অবশ্য এটাই চায়। পাহারা বসানোর দরকার নেই, পাঁচিল তোলার দরকার নেই, স্রেফ ঝাঁ চকচকে করে তুলে আপসে বাসিন্দাদের এক অংশকে শহরের অধিকার থেকে ব্রাত্য করে ফেলা যায়। 

তারপর ধরুন, মান্ডি হাউস। গিয়ে পড়লে এক কিলোমিটারের ব্যাসার্ধে নাটক, প্রদর্শনী, বুক লঞ্চ, সেমিনার, জলসা কিছু না কিছু লেগেই আছে। নামমাত্র কিংবা বিনা মূল্যে। ঘুরুন, ফিরুন, দেখুন, শুনুন, হাই উঠলে বেরিয়ে ঠেলাগাড়িতে লাইন দিয়ে ছোলে কুলচা খান। সহখাইয়েদের সঙ্গে দেশের দুর্দশা নিয়ে মাথা নাড়ুন কিংবা তফাতে ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে জাজ করুন। ফাঁকা থাকলে বেঞ্চিতে কিংবা ফুটপাথের নিচু বর্ডারে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে সঙ্গীর সঙ্গে বাঙালি চেনার খেলা খেলুন কিংবা জোড়াদের মধ্যেকার রোম্যান্সের ডায়নামিক্স ধরার (প্রেম হচ্ছে? প্রেম কাটছে? প্লেটোনিক? ফ্রেন্ডজোনড?)। আশেপাশে সেঁকা শকরকন্দের চাটের ঠেলা থাকবেই, সেও খেতে পারেন মুখে রুচলে। আমাকে সাধবেন না দয়া করে, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। আলুর মতো একটি সর্বাঙ্গসুন্দর খাবারের যে মিষ্টি এবং অখাদ্য সংস্করণ থাকতে পারে এটা জেনেই আমার যথেষ্ট হৃদয়বেদনা জেগেছিল, তাও "আহা খেয়ে দেখ, ভালোও তো লাগতে পারে' ইত্যাদি উপদেশে ঘাড় পেতেছিলাম, পরিণতি সম্পূর্ণ অবগত হওয়া সত্ত্বেও। পুরোটা শেষ করতে পারিনি, ভাইসাবের চোখ এড়িয়ে এগিয়ে এসে ডাস্টবিনে বিসর্জন দিতে হয়েছিল।

বেড়াতে যাওয়া সংক্রান্ত ভালোলাগাটায় একমত হলেও সংস্কৃতিচর্চার জায়গাটায় অর্চিষ্মান প্রতিবাদ জানাল। দিল্লির সংস্কৃতিচর্চার চরিত্র ওর পোষায় না । ওর মতে দিল্লিতে সংস্কৃতিচর্চা করে একটা বিশেষ গোষ্ঠীর লোক। বুক লঞ্চেও তারা, নাটকেও তারাই। এবং তাদের সাজপোশাক, ভাষা, ভঙ্গি চেহারা একটা বিশেষ টাইপের, যে টাইপটা আমাদের দুজনের টাইপের থেকেই আলাদা, কাজেই দুজনের কাছেই  অস্বস্তিজনক। ওর মতে দিল্লির তুলনায় অনেক বেশি স্বাভাবিক চেহারা, সাজপোশাকের, অর্থাৎ সাধারণ লোকেরা কলকাতার সংস্কৃতিমণ্ডলে ঘোরাফেরা করে। আমি অবশ্য মনে করি কলকাতার সংস্কৃতিচর্চারও একটা ইউনিফর্ম, ভাষা, ভঙ্গি, বৃত্ত আছে, সেখানেও চেনা পাপীদের ঠেলাঠেলি, কিন্তু যাক সে কথা। 

বাড়ি গেলে লাউয়ের ঘণ্টের খপ্পরে পড়তে হবে, তাই সুন্দর নার্সারি থেকে বেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে নিজামুদ্দিনের গলি ধরলাম। বৃহস্পতিবার ছিল, গান শুনতে দরগাতে ঢোকা যেত (যদিও জানি না, এখনও বৃহস্পতিবার বৃহস্পতিবার কাওয়ালির আসর বসে কি না) কিন্তু লক্ষ্যচ্যুত হলাম না। দরগার গেট পার হয়ে গালিবের দোকানে গিয়ে উপস্থিত হলাম।

পুঁচকে থামস আপ সঙ্গতে রুমালি রুটি, বাফ কাবাব, মাটন শিক খেতে খেতে অর্চিষ্মান বলল, কোনও জায়গা বিখ্যাত হওয়ার আগে এলে এবং পরে এলে কী অদ্ভুত লাগে না? তা লাগে বটে। আমরা প্রথম যখন এসেছিলাম, একে অপরকে চেনার আগে, আলাদা আলাদা, তখন গালিবের সর্বাঙ্গ টাইলে মোড়া ছিল না, টেবিল নড়বড়ে কাঠের, প্লেটও তোবড়ানো স্টিলের। গালিব বদলেছে। তার থেকেও বেশি বদলেছে আমার সঙ্গে গালিবের সম্পর্ক। কৎবেল আর কাকের যা, গালিব আর আমার সম্পর্ক এখন তাই।

যদিও সবথেকে জরুরি জিনিসটা একই আছে। জানাল অর্চিষ্মান। কোনও খাবারের দোকান (ভেবে দেখছি, শিল্পী সাহিত্যিক গাইয়ে বাজিয়ে লিখিয়েদের ক্ষেত্রেও একই কথা চলে) বিখ্যাত হয়ে গেলে একটা চেনা রব ওঠে বাজারে, যে  গেঁজিয়ে গেছে।  অর্চিষ্মান বলল, গালিবের কাবাবের কোয়ালিটি একটুও বদলায়নি। পনেরো বছর আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমন।

তারপর আমার ডিনারের খোঁজে যাওয়া হল খান মার্কেট। খেয়েদেয়ে বেরিয়ে বাজারের মেন গেটের সামান্য তফাতে উবারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি, পাতার ঝিরিঝিরির ফাঁক দিয়ে বাজারের হলুদ আলোর আভাস, অল্প অল্প ফুরফুরে হাওয়া মনে পড়াচ্ছে গেটের মুখে এক ভদ্রলোক ঝুড়ি ভরে বেলজুঁই নিয়ে বসেছেন।

অর্চিষ্মান স্বীকার করল। ওরও ভালো লাগে দিল্লি। 

এমন নয় যে স্বীকার না করলে টের পেতাম না। ওর দিল্লি ভালো লাগে জানি, কেন লাগে তাও জানি। আমি যদিও বেড়ানো আর খাওয়াদাওয়াবিষয়ক কারণের কথা আগে বললাম, কিন্তু আমারও দিল্লিকে ভালো লাগার প্রধান কারণ ওর সঙ্গে কমন। 

আমাদের দিল্লি ভালো লাগে কারণ দিল্লিতে আমরা বড় হয়েছি। সত্যি সত্যি বড় হওয়া যাকে বলে। 

হোস্টেলের গেটে দাঁড়িয়ে বাবামায়ের অটোকে বাঁক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখার পরমুহূর্ত থেকে যে  বড় হওয়াটা শুরু হয়। প্রথম কয়েকদিন সাবধানে পা ফেলি, অলিগলি বুঝে নিই। তারপর একদিন, গত কয়েকদিন দূর থেকে দেখে যে ক্লাসমেটকে দেখে বিশ্বপাকা ও বোদ্ধাসম্রাট মনে হয়েছিল এবং নিশ্চিত হয়েছিলাম সামনের কয়েক বছর আর যার সঙ্গেই হোক এর সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার সম্ভাবনা জিরো, ক্লাস শেষে ব্যাকপ্যাক কাঁধে তুলে বেরোতে বেরোতে গৌরচন্দ্রিকার বালাই না রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে যায়, আজ রাতে বাংলা গান হবে নর্মদা মেসে ডিনারের পর। আসিস।

রোজকার মতোই মা ফোন করেছিলেন ভিজিটরস’ রুমের ল্যান্ড লাইনে। সারাদিনের টুকিটাকি খবরাখবর দিয়ে ও নিয়ে ফোন রাখার আগে বলেছিলেন, ঘুমিয়ে পোড়ো। কাল আবার ক্লাস। হুঁহাঁ করে ফোন রেখে দিয়েছিলাম। গান শুনতে যাচ্ছি যে চেপে গিয়ে। কেন চেপে গেছিলাম জানি না যেমন, আবার জানিও। কারণ টের পেয়েছিলাম আমি বড় হয়ে গেছি। প্রতি মুহূর্তের ওঠাবসা, যাওয়াআসার খতিয়ান আর কাউকে জানানোর দরকার নেই। অনুমতি নেওয়ার তো নেই-ই।  

অর্চিষ্মানের বড় হওয়ার প্লটপয়েন্ট আলাদা হতে পারে, কিন্তু মূল আর্কটা একই। কলকাতায় থাকাকালীন বাড়ি টু স্কুল, স্কুল টু বাড়ি। চেনা বাস, চেনা রুট। দিল্লিতে ক্লাসের শেষে শহর চষে বেড়ানো বন্ধুদের সঙ্গে। একটা শহরকে কুড়ি বছর বসবাস করে যত চেনা যায় না, দু'বছরে অন্য একটা শহরের অনেক বেশি কোণাঘুঁজি আবিষ্কার করে ফেলা যায়।

আরও একটা কারণে আমি দিল্লিকে পছন্দ করি। 

প্রিয় টিভি গোয়েন্দা সিরিজের একটি গল্পের কথা মনে পড়ছে। এক নরকের কীট খুন হয়েছেন। অন্যতম সন্দেহভাজন ভিক্টিমের প্রাক্তন, যাঁর সঙ্গে কুড়ি না কত বছরের সংসার ভেঙেছেন ভিক্টিম, কচি শরীর ও মনের সঙ্গে নতুন বাসা বাঁধার আশায়। প্রাক্তন স্বাভাবিকভাবেই অত্যন্ত দুঃখিত, কুপিত, অপমানিত হয়েছেন কিন্তু যা করলে রাগ দুঃখ অপমানের জ্বালা কমতে পারত আমার মতে, অর্থাৎ কি না দরজাজানালা বন্ধ করে ঘরের কোণে বসে ক্ষতে ফুঁ দিয়ে, সে না করে তিনি বেরিয়েছেন প্রতিশোধের পথে। পিছু নিচ্ছেন, ফাঁকা ফোন করে উত্যক্ত করছেন, চাবি দিয়ে মহার্ঘ গাড়ির পালিশ খুঁড়ে দিচ্ছেন। শাস্তি দেওয়ার একটা প্রধান অসুবিধের দিক হচ্ছে কখনওই শিওর না হতে পারা যে শাস্তিটা যথেষ্ট হয়েছে কি না। গল্পেও তাই ঘটে। প্রাক্তন যত শাস্তি দেন, তত ডিগনিটি হারান, তত করুণার পাত্র হন এবং তত তাঁর রাগ ও মরিয়াপনা চড়ে। 

ভিক্টিম খুন হওয়ার পর বেরোয় প্রাক্তন খুন হওয়ার কাছাকাছি সময় অকুস্থলে ঘোরাফেরা করছিলেন। মোটিভ, অপরচুনিটি সবই  টইটম্বুর। তারপর অবশ্য বোঝা যায় যে তিনি কালপ্রিট নন এবং যা করছিলেন নেহাতই প্রতিশোধের মুখ চেয়ে। সব কালে কারনামে প্রকট হলে প্রাক্তন অল্প অল্প কাঁদতে শুরু করেন এবং সংবেদনশীল পুলিশ গোয়েন্দা বোঝেন যে এ কান্না ধরা পড়ার ভয়ে বা অপমানে বা আফসোসে নয়। যে লোকটা তাঁকে এত হেয় করেছেন, এত দুঃখ দিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে এত অন্যায় করেছেন, সেই লোকটার প্রতি শোকে। জেনুইন শোকে। 

গোয়েন্দা জিজ্ঞাসা করেন, হোয়াই? কাঁদতে কাঁদতে প্রাক্তন জবাব দেন, বিকজ উই ওয়্যার ইয়ং টুগেদার।

সি আর পার্কের অল্প দূরে পুরনো প্রস্তরযুগেও মানুষ ঘোরাঘুরি করত প্রমাণ পাওয়া গেছে, সে সব যদি ছেড়েই দিই, পরপর ছ'টি শহরের ধ্বংসস্তুপের ওপর উঠে দাঁড়ানো সাতনম্বর দিল্লির বুকে আমি যখন পা রেখেছি তখন দিল্লিকে ইয়ং বলা বাড়াবাড়ি। কিন্তু আমি ইয়ং ছিলাম। আমি আর অর্চিষ্মানও এ শহরে ইয়ং ছিলাম, একসঙ্গে। অর্চিষ্মান এখনও ইয়ং। আমার চোখে আজীবন থাকবে। আমরা এখন দিল্লির এমন অনেক জায়গায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই শুধু এই কারণে যে আমরা একসঙ্গে ওই জায়গাটায় আগে গেছি। চেনা রেস্টোর‍্যান্টের পার্টিকুলার টেবিল তাক করে থাকি, স্রেফ ওই টেবিলটায় বসে অতীতে সুন্দর সময় কাটিয়েছিলাম বলে। সিনেমা হলের পাশ দিয়ে আসতে আসতে মলিন কার্ডবোর্ড সাঁটা অন্ধ কাউন্টার দেখে মনে পড়ে ওই কাউন্টারে কত শতবার লাইন দিয়েছি, কত শতবার পপকর্নের পুঁজিবাদের গিলোটিনে গলা পেতেছি। দিগন্ত দিয়ে মেট্রো চলে যেতে দেখলে অর্চিষ্মানের কী হয় জানি না, আমার মন অব্যর্থ খারাপ হয়। মনে হয় ট্রেনটা আমার জীবনের একটা সময় নিয়ে চলে যাচ্ছে। আমার যৌবন, আমার তারুণ্য, আমার ইয়ুথ নিয়ে চলে যাচ্ছে। 

দিল্লির পথে পথে, বাঁকে বাঁকে, মেট্রোর ছুটন্ত কামরায়, শপিং মলের চলন্ত সিঁড়িতে, আমার, আমাদের ইয়ুথ রয়ে গেছে। 

বেড়ানোখেলানো সেরে ফিরে আসি আমাদের বাড়িতে, আমাদের পাড়ায়। সি আর পার্কে। যেখানে অবস্থানগত যাবতীয় অসুবিধে সয়েও আমরা গুঁজে গুঁজে থেকে যাই যাতে বাজারে গিয়ে বাংলা ছাড়া একটি অক্ষরও দাঁতের ফাঁক দিয়ে না বার করতে হয়। বাজারের বেঞ্চিতে লেবু চা নিয়ে বসে শলা করি বেগুনি খাওয়া উচিত হবে কি না। খিদে নেই, তাছাড়া ফ্রিজে লাউয়ের ঘণ্ট কালও প্রতীক্ষায় ছিল, আজও আছে। ভাইসাব স্কুটারের পাদানি ও পিলিয়ন রাইডারের সিটে ডাঁই করা খবরের কাগজ ও ম্যাগাজিন  যত্ন করে সাজান উল্টোদিকের সিমেন্টের রেলিং-এ, প্লাস্টিকের র‍্যাকে। সাজানো শেষ হলে বাকি বইপত্রের ওপরে অতিথিআগমনের অপেক্ষায় তুলে রাখা শৌখিন বেডকভারের মতো পেতে দেন  শারদীয়া আনন্দমেলা, আনন্দলোক, নবকল্লোল। দড়িতে মেলে দেন সুখী গৃহকোণ, সানন্দা আর দেশ।  

গরম বেগুনি মুখের ভেতর ম্যানেজ করতে করতে ভাবি এই পিটুলিগোলা আর কয়েকটা বছর। তারপর ব্যাক টু ভারতের পূর্বপ্রান্তের অঙ্গরাজ্যের গঙ্গানদীর তীরের কোনও শহর বা শহরতলিতে। আমি আদতে যেখানকার।

মনে মনে ধ্রুব জানা সত্ত্বেও, এ ত্রিভুবনে 'আমার' বলে যদি সত্যি কোনও শহর থেকে থাকে তাহলে সে দিল্লি। 

একটাই সান্ত্বনা, দিল্লি কেয়ার করবে না।


পুনশ্চঃ দিল্লি নিয়ে ভালো গান বলতে প্রথম যেটার কথা মনে আসে সেটা মনসুন ওয়েডিং-এর 'সুখবিন্দর সিং-এর গলায় আজ মেরা জি করদা-র চিত্ররূপের। আবার দেখতে বসে বুঝলাম গানের ভিডিওটায় দিল্লির অংশটুকু বেশ কম, যদিও আমার মতে ওইরকম সুন্দর করে দিল্লিকে আর খুব কম দেখানো হয়েছে। তার থেকে বরং এই গানটা (গানের লিংক) শুনুন। এটাও সিনেমার গান যদিও ভিডিওটা সিনেমার নয়। আমার সন্দেহ সিনেমার পরিচালকও চোরাগোপ্তা টান পুষে রেখেছেন দিল্লির প্রতি।

 

Comments

  1. Achha gaangulor ekhane dekha jachhe na keno bolo to? Mail ey kintu eshechhe!
    Lekhata darun - just darun!
    Ami ei goto 6 (almost) bochhorey kotota Bangalore'r hote perechhi jani na, mane (gradually diminishing tree cover wala) chowra avenues der premey porechhilam onekdin - shonge darun weather (Aug-Sep best months - brishti aar thanda - jome kheer!) - ghaam hoye na - edik odik du ekta pahar etc etc - kintu Kolkata'r jonno ekta alada prem aachhe. Oi ekta "coming home" feeling!
    বাঙালি চেনার খেলা খেলুন - eta ami khub kori! :-P

    ReplyDelete
    Replies
    1. ওই খেলাটা দেখা হলে খেলব তাহলে, কেকা। আমি কিন্তু শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, নিজে মুখেই বলছি। বেংগালুরু গেছিলাম এক বার। এক দীর্ঘ সম্পর্কের একরকম যবনিকা পাতের নিশ্চয়তা পেতেই। কাজেই শহরটা আমার গুড বুকে নেই। শুনেছি সুন্দর। প্রসন্নচিত্তে একবার যেতে হবে।

      এইখানে গানের লিংকগুলোর রং অন্য অক্ষরগুলোর সঙ্গে প্রায় এক, তাই আলাদা বোঝা যায় না সম্ভবত। কোডে গিয়ে সেটা বদলানোর ব্যান্ডউইডথ আমার নেই এই মুহূর্তে, তাই এবার থেকে ব্র্যাকেটে লিংক দিয়ে দেব। এটা আগেই করা উচিত ছিল, কারণ এই সমস্যাটা যে হচ্ছে আমি বুঝতে পারছিলাম। পয়েন্ট আউট করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ, কেকা।

      Delete
  2. অনেকদিন পর অবান্তরে এলাম। আরও আশ্চর্যের হচ্ছে 6 বছর পর দিল্লি এসে আপাতত CR পার্কেই রয়েছি। কালকেই হুমায়ূনস টুম্ব ঘুরতে গিয়েছিলাম। তাই এই মুহূর্তে এই পোস্টটা পড়তে একটু বেশিই ভালো লাগল। ভালো থাকবেন কুন্তলাদি।

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরে, আমাদের পাড়ায় তাহলে এখন। দিন ভালো কাটুক। তুমিও ভালো থেকো, ময়ূরী।

      Delete
  3. Lekhata khub khub bhalo laglo.

    ReplyDelete
    Replies
    1. আপনার ভালোলাগা সবসময় বাড়তি ভালোলাগা দেয়, সায়ন। ধন্যবাদ জানবেন।

      Delete
  4. hi five !! protyekti shobder jonyo! amar delhi baser first phase chilo du bochor aj theke thik dosh bochor age..kintu oi je uthlo by to delhi jai bol ekdin just saat diner notice e shohor bodlechilam..eka eka bari khujechi...eka eka koto oli goli ghorechi..sei dilli take moner modhye rekhe arekti shohore majher dosh bochor katiye dilam hyderabad...tar ekta nijosso bhalo laga ache..kintu oi je sheet grishmer bodol bujhte na para sob ati porichonno rastar majhe ami dilli kei miss kortam seta bujhi ekhon proti bikele chele ke niye uber e chepe ematha o matha ghorte jaoar jonyo..cheleo dibbi kalol bag CP Lodi garden khan market r bhokto hoye geche...thik eki bhabe amar phD guide bochor 15 bade dilli shift koren dilli te thakben bole...
    ar ami eu dosh bochor bade fire elam eka shudhu dilli te thakbo bolei:)...BTW CR park e jokhon e jai tomake ekbar khuje ni kintu..
    onar ekti kotha chilo, tumi dilli ke hajar gali dite paro kintu chere jete parbe na...tomar lekhata ekkhuni forward korlam take:)

    ReplyDelete
    Replies
    1. তোর পি এইচ ডি গাইডের সঙ্গে এ বিষয়ে আমার মিল দেখতে পাচ্ছি পারমিতা। দিল্লির অনেক কিছু অপছন্দ করি, কিন্তু ভালো না লেগেও পারে না। আমি অনেক ছোটবেলায় হায়দেরাবাদ গিয়েছিলাম একবার, মানে আমার মনে আছে গেছি, বাবা বলেন যাইনি, মাইসোরটাকে হায়দেরাবাদ বলে ভুল করছি। কে জানে কার স্মৃতি সত্যি। সত্যি হোক মিথ্যে হোক, আরেকবার হায়দেরাবাদ যাওয়ার ইচ্ছে আছে। দেখি কবে সুযোগ হয়।

      Delete
  5. khub khub bhalo laaglo.. aami dilli ek dubar gechi matro - tao chotobelay.. pore aabaar jawar icche thaklo.. besh b&b kore 3 maash okhan theke kaaj korbo aar shohorta bhalo kore dekhbo..


    bhalo thakben

    Indrani

    ReplyDelete
    Replies
    1. এটা ভালো আইডিয়া, ইন্দ্রাণী। কয়েকদিন না থাকলে শহরের ফিল পাওয়া শক্ত হয়।

      Delete
  6. তোমার ডুব দেওয়ার পোস্টটা দেখেছিলাম, তারপর আমিও ডুব দিয়েছিলাম, হ্যারি পটারে। প্রথম ইংরেজি বই এরকম নেশার মতো করে শেষ করা! সে যাই হোক, লেখাটা ভারী ভালোলাগল। ভালোলাগার জন্য যে পয়েন্ট গুলো বললে তার বেশী আর কিছু হয়না মনে হয়।

    ReplyDelete
    Replies
    1. বাহ, ভালো লাগল শুনে। কত বিতর্ক এল, গেল, কত লোকে কত খুঁত ধরল, কিন্তু প্রথমবার হ্যারি পটার পড়ার মগ্নতা রয়ে গেল। ওটা থাকবে। তোমারও তেমনই হয়েছে জেনে ভালো লাগল, প্রদীপ্ত।

      Delete
  7. Delhi amaakeo boro korechhe...

    ReplyDelete
    Replies
    1. করবেই। কেউ পালাতে পারবে না।

      Delete
  8. prothom boro howar shohor ke kokhono bhola jaay na. Ei karonei chennai amar kache special. prothom chakrir shohor, barir baire prothom eka thaka to. sarajibon special thakbe. abar bangalore keo mondo lage na, onekta ek karonei.
    delhi te ekbari gechi.. nitantoi boka tourist er moto berate jaowa seta, temon kichui dekha-shona hoyni..abantor porei bodhhoy delhi-r preme pore jabo.
    mishow rahasya-r gan ta amaro priyo, didi

    ReplyDelete
    Replies
    1. গানটা সত্যি ভালো, তাই না ঋতম? বাড়ির বাইরে প্রথম একা থাকাটা খুব ইম্পরট্যান্ট। আমারও বেশির ভাগ জায়গাই বোকা টুরিস্টের মতো দেখা। কাজেই।

      Delete
  9. শুধু এই কারনেই কোলকাতা আমার একা একা ঘুরে বেড়ালেও মনে হয়না আমি একলা । শহর সাথে সাথে হাঁটতে থাকে । দারুণ লাগলো তোদের পাশে পাশে কলকাতা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে । অনেক অনেক ভালোবাসা।

    ReplyDelete
    Replies
    1. এই সাহানা কি সেই সাহানা? সুস্বাগতম। পাশে পাশে হাঁটতে থাক। আমিও হাঁটছি।

      Delete

Post a Comment