গান শুনতে গিয়ে


পৌষমেলার শেষদিনে ছিলেন জয়তী চক্রবর্তী। জয়তীর গান আমার খুবই পছন্দ। জয়তীকেও আমার পছন্দ। জয়তীর ইন্টারভিউ হলে আমি হাঁ করে শুনি এবং নতুন করে সিদ্ধান্তে পৌঁছই, নাহ্‌ মহিলা সত্যিই পছন্দসই। আমার ধারণা জয়তীর গান আমার এমনিতে যত পছন্দ হওয়ার কথা তার থেকে বেশি পছন্দ জয়তীকে আমার পছন্দ বলে।

সবই যে পলিটিক্যাল অ্যাদ্দিনে সবাই জেনে গেছে, আমি টের পাচ্ছি সবই কী সাংঘাতিক পরিমাণ পার্সোন্যালও।

অর্চিষ্মান বলল, স্পিক ফর ইয়োরসেলফ, কুন্তলা। সবাই (গৌরবে বহুবচন ব্যবহারের বদভ্যেস আছে অর্চিষ্মানের, এখানে সবাই মানে ওকে ধরতে হবে) তোমার মতো ব্যক্তিগত অনুভূতির ক্রীতদাস নয়।

হতে পারে। হওয়াই উচিত। যারা ইমপার্সোন্যালি পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে পারেন তাদের আমি হিংসে করি, কারণ তাঁরাই ঠিক আমি ভুল, কিন্তু কিছু কিছু ভুল ঠিক করার জন্য পঁয়তাল্লিশ টু লেট। আমার বিশ্বদর্শনের বেসিস মূলতঃ ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত অনুভূতি অতিক্রম করতে আমার দম বেরিয়ে যায়।

তা বলে কি সবটাই ব্যক্তিগত? আমি যদি জয়তীকে দু'চক্ষে দেখতেও না পারতাম তবু আমাকে মেনে নিতেই হত জয়তী একজন দরের গায়ক। আমার পছন্দঅপছন্দ নিরপেক্ষে। জয়তীর গলায় প্রথমবার 'নিবিড় অমা তিমির হতে' শোনা আমার জীবনের একটা বিফোর-আফটার মুহূর্ত। ওই গানটা শোনার আগে আমি জয়তীর ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। আসলে পছন্দঅপছন্দের টেবিলের অনেকগুলো পায়া থাকে। ভেবে দেখেছি জয়তীর প্রতি আমার পছন্দের টেবিল তেপায়া। প্রথম পায়া, জয়তী গাইতে জানেন। দ্বিতীয়, আমার মতে জয়তী লোক ভালো। তৃতীয় ও শেষ পায়া, জয়তী গান করার সময় পর্যাপ্ত হাঁ করেন।

*

অনেক বাংলা পডকাস্টে সেলিব্রিটি অতিথি এলে একটা ছক ফলো করা হয়। সেলিব্রিটি বলতে সিনেমা থিয়েটারের সেলিব্রিটিই বলছি। যাদের মুখ সবাই চেনে, নাম সবাই জানে। নামের বানান না জানলেও। আলোচনা শুরু হয় ছোটবেলা দিয়ে কারণ মর্নিং শোজ দা ডে। তারপর কাজটা করতে তাঁর এখনও উত্তেজিত লাগে না লাগে না, কাজের প্রিজম দিয়ে দুনিয়াটাকে কী ভাবে দেখেন বা দেখেন না, আউটডোরে গিয়ে কী কী মজা হয় বা হয় না এই সব বুড়ি ছুঁয়ে বা না ছুঁয়ে কথা ঘুরে যায় তিনি আর কোন কোন সেলিব্রিটিদের চেনেন বা চিনতেন সে দিকে। কার বাড়িতে কে রেগুলার আসতেন। বাবার সঙ্গে কে বোতল খুলতেন। মাকে কে নিজের মায়ের মতো দেখতেন বা ভাইফোঁটা পেতেন। মাইল্ড খুনসুটিও অ্যাকসেপ্টেবল। কার কোলে বসে কার ছবি আছে। কে জেঠূু কে মাসি কে পিসি। কে কাকে ডাকনাম ধরে ডাকতেন।

আমার বহুদিনের সুপ্ত ইচ্ছে একটা হরর লেখার। অনেক রকম প্লট আসে মাথায়, একবার এটা একবার ওটা একবার সেটা। একটা প্লটের আইডিয়া ঘুরে ঘুরে আসে। প্রেক্ষাপটে কলকাতা শহর। সেলেব্রিটিসঙ্গ করা প্রোটাগনিস্ট সকালে উঠে আবিষ্কার করছেন তিনি আর কোনও সেলেব্রিটির ডাকনাম মনে করতে পারছেন না। এত বছরের কঠোর নেটওয়ার্কিং-এ তৈরি নক্ষত্র-নিকনেমের আর্কাইভ - খাঁ খাঁ।

আইডিয়া ভাবা আর সেটা গুগল ডকে নামানোর মধ্যে পরিশ্রমের পরিখা বিদ্যমান। অত পরিশ্রম কে করবে, হেউ। তার থেকে বসে বসে পডকাস্ট দেখা ভালো। লোককে নিয়ে হাসার দরকার নেই, দেখতে দেখতে আমারই লাইব্রেরি তৈরি হয়ে গেছে - টালিগঞ্জে কে বেণু, কে পুলু, কে বাবাই, কে বুড়ো, কে মিঠু, কে বুল্টি - সব আমার নখদর্পণে।

*

একদিন একটা পডকাস্টে বেণুদাকে নিয়ে কথা হচ্ছিল। বেণুদা, সবাই জানেন, সব্যসাচী চক্রবর্তী। একজন সেলিব্রিটি কেরিয়ারের শুরুতে বেণুদার সান্নিধ্য লাভ করেছেন শুনে পডকাস্টার তাঁকে বেণুদা সম্পর্কে কিছু বলতে বললেন।

এই ছোট সেলিব্রিটি নাকি বেণুদাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন অভিনয় কী করে শিখতে হবে। তাতে বেণুদা গম্ভীর মুখে বলেছিলেন, আগে ঘরের কাজ শেখো। ঝাঁটপাট, ধোয়াপাকলা, রাঁধাবাড়া, মাজাঘষা, কাচাশুকনো। শুনে মনে পড়ল, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ও একটা পডকাস্টে বলছিলেন, প্রথমবার অভিনয় শিখতে যাওয়ার পর নাকি জোছন দস্তিদার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, শুভেন্দুর ব্যাটা, অভিনয় করতে চাস? ঘর মুছতে পারিস? সোহিনী সেনগুপ্তও বললেন যে ছোটবেলায় ওঁর মা, স্বাতী সেনগুপ্ত ওঁকে বাড়ির সব কাজ শিখিয়েছিলেন। থিয়েটারকর্মীরা তো সবাই বলেন যে অভিনয় করার আগে নাকি তিন বছর ধরে সেট বানাতে, বাঁশ খাটাতে আর আলোর সামনে রংবেরঙের প্লাস্টিক ধরতে হয়। এই সব পেরিয়ে তারপর মুখে রং মেখে হাত পা নাড়ার চান্স পাওয়া গেলেও যেতে পারে।

অর্থাৎ অভিনয় শেখার আগে অন্য কিছু শিখতে লাগে। বাংলাদেশেই না, অ্যামেরিকাতেও লাগে। এক ইউটিউবারের ভিডিও দেখছিলাম। পূর্বাশ্রমে তিনি ছিলেন ডাক্তার। দিব্যি ডাক্তারি করে খাচ্ছিলেন এমন সময় জীবনে চল্লিশ ঢুকে গেল।

যাদের জীবনে চল্লিশ ঢুকেছে তারা জানে, যারা জানে না তাদের জন্য পাবলিক সার্ভিস অ্যানাউন্সমেন্টঃ চল্লিশ, বয়স না। চল্লিশ হচ্ছে অ্যাপোক্যালিপ্স। কল্কি অবতার। অ্যাদ্দিন যা চলছিল সেটাকে ছারখার করা চল্লিশের একমাত্র লক্ষ্য। দেখি একবার, বলে আপনার জীবনটাকে হাতে নেবে চল্লিশ তারপর হাঁটুতে রেখে মট্‌ করে দুইখান করে ফেরত দিয়ে হাত ঝাড়বে।

ডাক্তারদিদিরও তাই ঘটল। চল্লিশ এল এবং কুশলফুশল কাটিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ডাক্তার কেন হয়েছিলে? কার জন্য হয়েছিলে? হয়ে কেমন লাগছে? আনন্দ হচ্ছে? হচ্ছে না? সকালবিকেল কান্না পাচ্ছে? তোমার কান্না পেলে বিশ্বশুদ্ধু লোকের আনন্দ হয়ে লাভ কী?

মেমসাহেব সাহসী, দিলেন ছেড়ে ডাক্তারি। ভাবলেন এবার কী করা যায়। দুধ কর্নফ্লেক্স খেতে খেতে নিউ ইয়র্ক টাইমসের পাতা উল্টোচ্ছেন, নিউ ইয়র্ক সিটির এক হাইফাই অভিনয় শেখার ইন্সটিটিউটের অ্যাডে চোখ পড়ল।

অভিনয় শিখুন জীবন বদলান।

প্রাক্তন ডাক্তারদিদিমণি অ্যাপ্লাই করলেন। চান্স পেলেন। ক্লাসে গেলেন। অভিনয়দিদিমণি বললেন, চুপ করে স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকুন।

দাঁড়িয়ে থাকব?

দাঁড়িয়ে থাকবেন।

প্রাক্তন ডাক্তার স্টেজে উঠে নট নড়নচড়ন দাঁড়িয়ে থাকলেন। ফোন না দেখে। হাই না তুলে। গাল না চুলকে।

শরীরের নড়াচড়া থামিয়ে দিলেই মগজের নড়াচড়া থামানো যায় না। উল্টে অনেক সময় পিক আপ নেয়। মেমসাহেবেরও নিয়েছিল নিশ্চয়। নিয়ে নিউরনের কোন রুটে দৌড়েছিল সে নিয়ে মেমসাহেব বলেননি। আমার মাথা হলে কোন পথে দৌড়ত আমি সেটা লিখি।

ছি ছি ছি, ছি ছি ছি, এই ভাবে কেউ নিজের জীবন নষ্ট করে? সবাই ঠিক বলেছিল, ডাক্তারি ছাড়া ঠিক হয়নি। আর এরা কী লেভেলের চিটিংবাজ, টাকা নিয়ে এই সব ধ্যাষ্টামো। সবাই ঠিক ভয়ই দেখিয়েছিল, ডাক্তারি ছাড়াটা আত্মহন্তারক হয়েছে। চল্লিশ বছরে পৌঁছে এই পাঁঠামো কেউ করে কী করে। চ - ল্ - ল্‌ - লি --শ? ছি ছি ছি ছি ছি ছি।

ঝাড়া দু'দিন স্পটলাইটের নিচে, মঞ্চের মাঝখানে, সামনে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন মেমসাহেব। তৃতীয় দিন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে চমকানি, মগজের খাঁজে খাঁজে ঝলকানি জাগল। চেতনার চলটা খসে অরিজিন্যাল রং বেরিয়ে পড়ল। মেমসাহেব ক্যামেরার ভেতর দিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে মিষ্টি হেসে বললেন, অ্যান্ড আই ফাউন্ড মাইসেলফ।

অভিনয় করতে গেলে নিজেকে যে খুঁজে পেতে হয় একটা পডকাস্টে অনির্বাণ ভট্টাচার্যও বলেছিলেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুঁজতে হয় কি না সেটা বলেননি অবশ্য। আই গেস নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অনেক রাস্তা থাকে। দাঁড়িয়ে থাকা, ঘর মোছা, পডকাস্টে যাওয়া, সেলিব্রিটি ডাকনাম ধরে ডাকা। যত মত তত পথ।

বাই দা ওয়ে, এবার বইমেলাতে অনির্বাণ ভট্টাচার্যকে দেখলাম। চন্দ্রিল ভট্টাচার্যকেও দেখলাম। সবথেকে বড় কথা, ইন্দ্রাণীর সঙ্গে দেখা হল। আমরা অসমান মাঠে নড়বড়ে চেয়ারে বসে আলুভাজা আর থামস আপ খেলাম। ইন্দ্রাণী বা আমার জামায়, ভূলে গেছি, থামস আপ পড়ে গেছিল, দোকানের একটা বাচ্চা মেয়ে নিজে থেকেই বাড়তি টিস্যু দিয়ে গেল।

*

এ সব শুনে মনে হল অভিনয়ের শেখার জন্য আগে অন্য কিছু শিখতে লাগে। তারপর মনে হল হয়তো অভিনয় নয়, যে কোনও কাজ শিখতে গেলে আগে অন্য কিছু শিখতে লাগে। মূল জিনিসটার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন কিছু। মনে পড়তেই মনে পড়ল যে কথাটা মনে পড়ার দরকার ছিল না। জানাই ছিল। নিজের জীবনেই ভূরিভূরি এ ঘটনা ঘটেছে। কম্পিউটার শেখার আগে টাইপিং শিখতে হয়েছিল, সাঁতার শেখার আগে জল খাওয়া শিখতে হয়েছিল। শুধু অপ্রাসঙ্গিক জিনিস শিখতে হয়নি, বলা হয়েছিল যে এটা না শিখলে ওটা শেখা যাবে না। কুইক ব্রাউন ফক্স জাম্প ওভার দা লেজি ডগ আঙুলের নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসে না পরিণত হলে কম্পিউটার খোলা যাবে না। সবাই ট্রাইসাইকেল চালিয়ে পাড়া দাপাচ্ছে তো কী? আমার ছোট দু'চাকার সাইকেলের পেছনের চাকার দু'পাশের স্ট্যান্ড খুলে রাখা হবে। কারণ যত বার আছাড় তত বেটার ব্যালেন্স। সাঁতার শিখতে সবাই ওপারে অ্যাকাডেমিতে দড়ির ট্র্যাক বাঁধা পুকুরে যাবে, টুপি চশমা টায়ার পরে পুশ পুল রিকভারি, আমাকে জলে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে কারণ যত ভালো হাবুডুবু তত দ্রুত ভেসে ওঠা।

প্রথম গানের ক্লাসের প্রথম রবিবারের সন্ধেয় মাস্টারমশাই বলেছিলেন, সা রে গা মা জানিস?

জানতাম। আরও অনেক কিছু জানতাম, সা রে গা মা, ইমন ভৈরবের আরোহণ অবরোহণ বন্দিশ, মম চিত্তে নিতি নৃত্যে। জানতাম আমি তালেবর ছিলাম বলে নয়, মা জানতেন বলে।

মাস্টারমশাই বললেন, হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতে জানিস?

জানতাম, কারণ মাও জানতেন। মায়েরই হারমোনিয়াম। আমি গাপ করেছি। বাজিয়ে ও গেয়ে দেখিয়ে দিলাম। সা রে গা মা করে ওপরের সা, নি ধা পা মা গা রে করে নিচের সা-তে ফিরে, দুই হাত বেলো ও রিড থেকে সরিয়ে কোলে গুছিয়ে রাখলাম। তখন আমার ক্লাস থ্রি, কানের লতি পর্যন্ত ছাঁটা চুল, চোখে মাইনাস চার বা পাঁচ পাওয়ারের চশমা।

মাস্টারমশাই বললেন, বাহ। সবই তো জানিস। এবার হাঁ কর।

হাঁ করলাম। মাস্টারমশাই বললেন, আরও বড় হাঁ।

বিশ্বরূপ দর্শানোর মতো হাঁ করে ফেললাম। মাস্টারমশাই বললেন, নে এবার সা রে গা মা বল।

মা-তে পৌঁছতে পৌঁছতে অলস চোয়াল রেগুলার সাইজ হয়ে গেল। সাইজ ঠিক করে আবার যাত্রা শুরু হল। নি-তে পৌঁছে আবার হাঁ ঠিক করতে হল। নামার পথে যথক্রমে ধা ও মা-তে হাঁ রিভাইস করে অবশেষে সা।

মাস্টারমশাই বললেন, চমৎকার। গানের সবথেকে শক্ত ব্যাপার, সা রে গা মা পা ধা নি, তুই শিখেই এসেছিস। দ্বিতীয় শক্ত জিনিসটা আজ শিখলি, হাঁ করা। তৃতীয় শক্ত জিনিসটা, সোজা হয়ে বসা, শিখে ফেললে আমার তোকে আর কিছু শেখানোরই নেই। তখন আমিও গাইব তুইও গাইবি, সবাই মিলে গানটান গেয়ে হল্লা করা যাবে।

কয়েকবছর আগে ইউটিউব সাজেশনে কৌশিকী চক্রবর্তীর ছেলেকে বাড়িতে রেওয়াজ করানোর ভিডিও এসেছিল । ওইটুকু ছেলে সুপারফাস্ট তান করছে, কৌশিকী ছোটখাটো ভুল ঠিক করে দিচ্ছেন আর মাঝে মাঝে ছেলের মুখের মধ্যে তর্জনী ও মধ্যমা একসঙ্গে ঢুকিয়ে হাঁয়ের সাইজ বড় করে দিচ্ছেন। কারও যদি সন্দেহ থাকে যে মফঃস্বলের মাস্টারমশাইরা কে জানে কী সব হাবিজাবি বকে, আর থাকবে না আশা করি।

মোট কথা, ভালো গান আর পর্যাপ্ত হাঁ-সংক্রান্ত আমার একটা গোপন (এখন থেকে আর গোপন নয়) প্রেজুডিস আছে। একজন দিদিমা, নাতনির প্রেমিক হাওড়ার শুনে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হাওড়ার ছেলে ভালো হয়? আমারও তেমনি মনে মনে প্রশ্ন হাঁ ভালো না হলে গান ভালো হয় কি না। উল্টোটা হতে পারে সে জানি। প্রবল হাঁ করেও জঘন্য গাওয়া যায়, চোখকানের সামনে রোদ্দুর রায় আছেন, কিন্তু হাঁ না করলে সম্ভবতঃ ভালো গান বেরোয় না।

জয়তী চক্রবর্তী সুরে গান তো করেনই, গাওয়ার সময় পর্যাপ্ত হাঁ-ও করেন।

*

আমি আর অর্চিষ্মান পাশাপাশি চেয়ারে বসে জয়তীর গান শুনছিলাম। একটু পর আমাদের আর আমাদের সামনের সারির মধ্যবর্তী ফাঁকা দিয়ে একটা গ্রুপ ভেতরের দিকে খালি চেয়ারে বসতে গেলেন। দলের প্রথম দু’জন মাটি দিয়ে হেঁটে গেলেন, তিন নম্বর, যিনি সবথেকে লম্বা, সবথেকে ভারি এবং গোটা দলের মধ্যে যারই একমাত্র গোঁফ আছে - মাটিতে পড়ে থাকা একপাটি বাটার জুতো, যার মধ্যে আমার ডান পা ছিল - সেটার ওপর নিজের ফুল বডির ভার ন্যস্ত করে গেলেন।

না গেলেও পারতেন, কারণ বাটার জুতোর বাইরেও মাটি ছিল। যে মাটি দিয়ে ভদ্রলোকের যাওয়ার আগের দশ ও পরের চল্লিশ মিনিটে অন্ততঃ একশো লোক, হাতে বিরিয়ানির বাটি, কাবাবের প্লেট, চুসকির গ্লাস নিয়ে আপ থেকে ডাউন, ডাউন থেকে আপ হেঁটেছে এবং একজনও বাটার জুতো পাড়ায়নি। তাছাড়া আমার জুতোটা স্থিতিস্থাপক টাইপের, পাড়া দিলে শক্ত জমিতে যে পা পড়েনি, জুতোর মধ্যে যে একজন ফেলো হোমোসেপিয়েন্স-এর হাড়মাংস আছে বুঝতে পারার কথা। না বুঝলে নার্ভের গোলমাল আছে ধরে নিতে হবে। যদি ধরেও নিই ভদ্রলোকের নার্ভের গোলমাল আছে, আমি ব্যথার চোটে উঃ আঃ মাগো বাবাগো মরে গেলাম বাঁচাও - এসবের মধ্যে কিছু একটা বলে উঠেছিলাম। এবং আমার স্পষ্ট মনে আছে তখন জয়তী দুটো গানের মধ্যে জল খাচ্ছিলেন কাজেই চারপাশ যথেষ্ট নিস্তব্ধ ছিল, আমার আর্তনাদ ভদ্রলোকের কানে যাওয়ার কথা। যদি না ভদ্রলোক বধির হয়ে থাকেন।

প্রথমতঃ, একটা লোকের নার্ভের গোলমাল, কানে কালা হওয়া আনলাইকলি। ভগবান বেছে বেছে সব মার একজনকে মারবেন কেন, হাতের সুখ করার আরও আট বিলিয়ন বিকল্প আছে যখন। দ্বিতীয়তঃ, নার্ভের রোগ, বধিরতা এ সব এ ডি এইচ ডি নয় যে সি আর পার্কের এ থেকে পি ব্লক পর্যন্ত সবার হয়েছে। আমি একশো শতাংশ শিওর ভদ্রলোক (বা এই পর্যায়ে জাস্ট লোক) বুঝেছেন যে তিনি আমার একটা পীড়ার কারণ হয়েছেন কিন্তু স্বীকার করছেন না। করার লক্ষণও দেখাচ্ছেন না। সিটে বসে মুখ হাঁড়ি করে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন।

জয়তী ততক্ষণে পরের গান শুরু করেছেন।

গোটা ঘটনাটা আমাকে এতই কৌতূহলী করে তুলল যে, অমন নিখুঁত সুর, স্পষ্ট উচ্চারণ ও পর্যাপ্ত হাঁ-এর গান ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ হয় গেল। আমি অভদ্রতা যতটা সম্ভব অ্যাভয়েড করে হাঁ করে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ভদ্রলোকের হাঁড়ি মুখ, মহিলার থমথমে মুখ, কিশোরের বিষণ্ণ মুখ।

অ। স্বামীস্ত্রীর ঝগড়া হয়েছে। ধরে ফেলার তিন সেকেন্ডের মধ্যে জয়তীর গানের মধ্যে প্যান্ডেলভর্তি লোকের মধ্যে তাঁরা ঝগড়া শুরু করলেন। আঙুল নেড়ে, চেঁচিয়ে, শিরা ফুলিয়ে।

নিশ্চিন্ত হয়ে জয়তীতে মন পুনর্স্থাপন করলাম। রোজের রুটিনে যে সব রুদ্ধ আবেগ চাপাচুপি দিয়ে রাখা যায় - এই সব পৌষমেলা, পিকনিক, কারও বাড়ি নেমন্তন্নে যাওয়ার আগে বা নেমন্তন্ন থেকে ফিরে, টাইগার হিলের টপে দাঁড়িয়ে বা স্বর্গদ্বারের পাঁচিলে বসে - বেরিয়ে পড়ে। এঁদেরও পড়েছে। দুজনেই রেগেছেন। একজন বেশি রেগেছেন, সে রাগ ছিটকোতে ছিটকোতে চলেছেন, পথের মাঝখানে বোকার মতো বসে আছি, ছিটে আমার গায়ে না লাগলেই অদ্ভুত।

                                                                                                                                                    (চলবে)

Comments