তুলির চয়েস


এই পোস্টটা মূলতঃ পাতা ভরানোর। অনেকদিন খালি পড়ে আছে। পৌষমেলার অন্তিম পর্ব লেখাও চলছে। আরও অনেক কিছু চলছে, কিছুই শেষ হচ্ছে না।

নারীদিবসের পুণ্য অবকাশে আনন্দবাজারের রবিবাসরীয়-তে আমার একটা গল্প বেরিয়েছিল। গল্প চাওয়ার সময় আমাকে ওঁরা আটশো শব্দ আর সাত দিন বেঁধে দিয়েছিলেন। শব্দসংখ্যার ব্যাপারে জানি না, সময়সীমা কাজের জিনিস। না থাকলে কী হয় আমার জীবন তার প্রমাণ।

গল্পটা ছাপার আগে ওঁরা সম্পাদনা করেছিলেন, করবেন জানতাম, কোথায় কোথায় করবেন সে সম্পর্কেও আভাস ছিল। লাইনে লাইনে এত ইংরিজি শব্দ অ্যালাউ করবেন না, আর ওই অপ্রাসঙ্গিক 'ফাক'ও কাটবেন। 

তবু ওই সব শুদ্ধুই পাঠিয়েছিলাম। কারণ আমি শ্রমবিভাজনে বিশ্বাস করি। লেখকের কাজ লেখা, সম্পাদকের কাজ সম্পাদনা করা। আমার দ্বারা যদ্দুর হয় যা হয় আমি লিখব, তারপর সম্পাদক বুঝবেন  কী কাটবেন কী রাখবেন, আদৌ রাখবেন কি না। প্রকাশক বুঝবেন আদৌ প্রকাশ করবেন কি না। পাঠক বুঝবেন আদৌ পড়বেন কি না। এঁরা আমার লেখার এক লাইনও লিখে দেবেন সে আশা আমি করি না, কাজেই এঁদের কাজও এক কণাও আমি করে দেব না। অধিকাংশ বইয়ের শেষে ধন্যবাদজ্ঞাপনে দরাজ লেখকরা লেখেন - বই লেখা নাকি টিমওয়ার্ক। আমার বুক ধড়াস ধড়াস করে। আমার তো ধারণা ছিল  পৃথিবীতে যদি কোনও কাজ নন-টিমওয়ার্ক হয়ে থাকে সেটা হচ্ছে লেখা। এমনকি এটাও বলা যেতে পারে যে আমি লিখি কারণ এই একটা কাজ করতে দল বাঁধতে হয় না। দল জিনিসটাকে আমি ভুতের থেকেও বেশি ভয় পাই, কাঁঠালের থেকেও বেশি অপছন্দ করি। লেখা যেদিন দলবদ্ধ অ্যাকটিভিটিতে পরিণত হবে সেদিন আমার খেলা শেষ।  

ওঁরা ইংরিজি গালি বাদ দিয়েছেন, দিয়ে যে শব্দ দিয়ে বাক্যটা যে ভাবে রি-রাইট করেছেন আমার পছন্দ হয়নি। স্বাভাবিক, পছন্দ হলে তো ওই বাক্যটা আমিই লিখে পাঠাতাম। আরও কী কী শব্দ অদলবদল হয়েছে তাও মিলিয়ে দেখিনি। কারণ আমার লেখায় সত্যি বড় বেশি ইংরিজি, সব ধরে ধরে বাদ দেওয়ার ধৈর্য ওঁদের হয়েছে কি না মেলাতে হলে গল্পটা পুরোটা পড়তে হত। নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে পড়তে আমার শরীর খারাপ করে। এই পরিণতি এড়ানোর কতগুলো সুযোগ ছিল মনে পড়ে যায়। কাগজটা কিনিওনি। অর্চিষ্মানের একাধিকবার 'কী গো কাগজটা কেনো অ্যাট লিস্ট, এত বাড়াবাড়ির সত্যিই কোনও দরকার নেই কিন্তু কুন্তলা ' মৃদু ভর্ৎসনা হুঁ হাঁ করে কাটিয়ে গেছি। ও বামাল বাড়িতে রাখার প্রশ্নই নেই। ইন্দ্রাণী আত্মার আত্মীয় হয়ে হোয়াটসঅ্যাপে গল্পটার স্ক্রিনশট পাঠিয়েছিলেন, সেটা আঙুল দিয়ে টেনে বড় করে একবার যতটা ওপর ওপর সম্ভব চোখ বুলিয়েছি। যাতে বেশি কিছু চোখে না পড়ে।

তবু গল্পের নামে তো চোখ পড়েই যায়। আমার গল্পের নাম ছিল 'তুলির চয়েস'। সেটা ওঁরা বদলে 'তুলির পছন্দ' করেছেন। কেন বদলেছেন বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু এই বদলটা আমার পছন্দ হয়নি। অ্যাকচুয়ালি, ব্যাপারটা পছন্দঅপছন্দের নয়। এটা হয় না। এটা বদলানো যায় না। আমি জানি আমি অকারণ ইংরিজি ব্যবহার করি। তিন বাক্য আগের 'অ্যাকচুয়ালি'ই অকারণ। 'আসলে' লেখা যেত, কিছু না লিখলেও কিছু যেত আসত না, ইন ফ্যাক্ট, না লেখাই উচিত ছিল, চার শব্দ আগের ইন ফ্যাক্টের মতো, তবু লিখেছি। ইচ্ছে হল বলে। কেউ তো প্রশ্রয় দেয় না, নিজেই নিজেকে দিয়েছি।

'তুলির চয়েস'-এর চয়েস আমার আত্মপ্রশ্রয় নয়। এই 'চয়েস'-এর একটা বিপুল ব্যাগেজ আছে। এই চয়েসের বাংলা পছন্দ নয়। এই চয়েসের বাংলা হয় না। 

তবে এগুলো ম্যাটার করে না। মহাকালের নিরিখে তো করেই না, অতি ক্ষুদ্র পরিসরেও করে না। আমার গল্প ওঁরা ছেপেছেন আমি খুবই খুশি হয়েছি। গল্পটা নিচে থাকল। আমার অরিজিন্যাল ভার্শানটাই।   

*

তুলির চয়েস
কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়


তুলি। রাস্তায় নেমে পড়েছিল। সিগন্যাল লাল হয়ে গেছে না দেখেই। বিকট হর্ন দিয়ে একটা পালসার ফুলস্পিডে এল, তুলি লাফিয়ে ফুটপাথে ফেরত গেল।

ক্ল্যাসিক তুলি। যাচ্ছে, কিন্তু দেখছে না কোথায় কোনদিকে। হাঁটছে, যেন হাঁটার প্রক্রিয়ায় ওর কোনও হাত নেই। সিগন্যালে চোখ রেখে সামান্য পিক আপ নিলেই ক্রসিং পেরিয়ে যেতে পারত। তুলির পেছনের লোকটা যা করল। তুলিকে ওভারটেক করে বাঁক নেওয়া ট্র্যাফিক, হর্ন অগ্রাহ্য করে এপারে পৌঁছে এখন শিস দিতে দিতে চলে যাচ্ছে।

সিগন্যালে পা-ফাঁক লাল মানুষ গুণছে একশো আঠেরো, একশো সতেরো, একশো ষোল। তুলি দাঁড়িয়ে আছে। তুলির হেলদোল নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইয়ারফোনের জট ছাড়াচ্ছে।

আমিও দাঁড়িয়ে আছি অবশ্য। চাইলে পেরিয়ে যেতে পারতাম। আমার বাঁ কনুইয়ে গলানো ডান কনুই দিয়ে ফুলি টানও মেরেছিল। ছুটতে যাব, ক্রসিং-এর ওপারে তুলি আবির্ভূত হল। রিভার্স টান মারলাম। ফুলি থেমে গেল। বোঝেনি, হোপফুলি। শিওর বোঝেনি। কারণ ফুলি উত্তেজিত।

কী লেভেলের অন্ধ হলে ‘উইমেন’স এজেন্সি ইন পোস্টকলোনিয়াল ইন্সটিটিউশন্স’ প্যানেলে সবক’টা স্পিকার পুরুষ রাখে? কী না, অ্যাকাডেমিক এক্সেলেন্স। ভাস্ট বডি অফ ওয়ার্ক। হোয়াট অ্যাবাউট রিপ্রেজেন্টেশন?

রত্নাবলী কী বলছে? চোখের কোণ তুলিতে রেখে জানতে চাই।

কিস্যু না। ওর তো সব নৌকোয় পা দিয়ে চলতে হবে। তার মধ্যে ওই দীপক শ্রীবাস্তব বলছে, ফুল্লরা ইজ কারেক্ট। প্যানেলে সবাই পুরুষ এবং উচ্চবর্ণ। উই শুড পে মোর অ্যাটেনশন টু ইন্টারসেকশনালিটি। যেন হি গিভস টু ফাকস্‌ অ্যাবাউট ইন্টারসেকশনালিটি। অক্সফোর্ড থেকে ইন্টারসেকশনালিটিতে ডি ফিল করে এসেছে বলে সবেতে ওই ফোড়ন দিয়ে যাচ্ছে।

দীপক শ্রীবাস্তব। যন্তর মাল। আমাকে দেখলে এমন একটা হাসি দেয় যেন বাকিরা যেটা এখনও টের পায়নি, ও ধরে ফেলেছে।

ফুলির কনুই থেকে নিজের কনুই ছাড়াই। সিগারেট বার করি। লাইটার আড়াল করা হাতের ওপর দিয়ে তুলিকে দেখি। তুলি এখনও জট ছাড়িয়ে চলেছে। কতবার বলেছি, তুলি, আর একটু গোছালো হও।

আটানব্বই, সাতানব্বই, ছিয়ানব্বই।

অক্সফোর্ডের আগের ব্যাকগ্রাউন্ড কী মালটার?

বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি। হিস্ট্রি। গোল্ড মেডেলফেডেল নাকি।

চোখ কান খোলা রাখিস। ওরা আজকাল সর্বত্র ইনফিলট্রেট করছে। অ্যালাই হয়ে ঢুকে ফ্যাসিস্ত হয়ে বেরোবে।

আমি তুলির অ্যালাই হতে চেয়েছিলাম। তুলিকে ঠিক জায়গায় ফেলে দিতে পারতাম। দেশবিদেশের কনফারেন্স, প্যানেল, বুক রিলিজ। তুলি বলে গেল, দূর, আমার দ্বারা ও সব হবে না। কী সব কে জানে। এই যে ফুলি, আগাপাশতলা মিডিওকার। ঠিক সময় ঠিক জায়গায় পড়েছে বলে বুলি থামছে না।

তুলি লক্ষ্যহীন শূন্যতায় চোখ ভাসিয়ে রেখেছিল। কিছু একটা হয়ে যাবে।&

কিছু একটা হয়ে যাবে। এই বুলি কোথা থেকে শিখেছে তুলি আমি জানি। মগজপ্রক্ষালনের গর্ভগৃহ স্বচক্ষে দেখে এসেছি। তুলির বাবা, থার্ড গ্রেড কলেজে ইংরিজি পড়ায়, অ্যাম্বিশনের অ্যা নেই শরীরে। তুলির মা, হাউসওয়াইফ। হার্মলেস এবং হিসেবের বাইরে। ও বাড়িতে পেট্রিয়ার্কি বোঝানো গাধাকে দরবারি কানাড়া গাওয়ানো। চল্লিশ ওয়াটের টিউব জ্বালিয়ে চৌকিতে বসে বুক চুলকোচ্ছিল আর বোকার মতো হাসছিল তুলির বাবা।

আমি কী বলব। তুলির ভবিষ্যৎ তুলিই ঠিক করবে। তুলির চয়েস।

আহ্‌, চয়েস। সেই ম্যাজিক ওয়ার্ড। বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। চয়েস গাছ থেকে পড়ে না তুলি। তুমি ভাবছ তোমার চয়েস, আসলে নয়। তুমি ভাবছ তুমি স্বাধীন, আসলে নও। পিতৃতন্ত্রের অপ্রেসিভ ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে তুমি অপারেট করছ। তাছাড়া চয়েসেরও মুড়িমুড়কি ভুলঠিক আছে। আমি তোমাকে গাইড করব।

বোঝাতে বোঝাতে গলা চড়েছিল, আশপাশের টেবিল থেকে লোকজন তাকাচ্ছিল। তুলি নির্বিকার। ওই রকম চড়াই পাখির মতো চেহারা কিন্তু জমি কামড়ে থাকতে জানে। ঠ্যাঁটা টু দা পাওয়ার ইনফিনিটি।

সম্পর্কটা এমনিও থাকত না। মানসিকতার এত অমিল থাকলে হয় না। ফুলি ওই সময়েই জয়েন করল। সেও আর এক কাহিনি। টক্সিক বয়ফ্রেন্ড। বিদেশ থেকে পি এইচ ডি ফি এইচ ডি মেয়েরা এই সব সম্পর্কে ঢোকে এবং থাকে কী করে ভগবান জানে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বুঝিয়ে অবশেষে ব্রেক আপ হল। এত ভেঙে পড়েছিল ফুলি, চিয়ার আপ করতে উইকেন্ডে শান্তিনিকেতন প্ল্যান করেছিলাম। চেক ইন-এর সময়, রিসেপশপনিস্ট আমার দিকে, ফুলির দিকে, আবার আমার দিকে তাকাচ্ছিল। যতক্ষণে মনে পড়ল, যা হওয়ার হয়ে গেছে।

তুলির বাবার এক্স-ছাত্র।

শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে আমিই সম্পর্ক শেষ করার কথা বলেছিলাম। নাকি তুলি বলেছিল? হোয়াটেভার। এক বছর হতে চলল তো।

দশ মাস সতেরো দিন, টু বি প্রিসাইজ।

*

ফুলির ফোন বাজছে। আর সতেরো সেকেন্ডের মধ্যে সিগন্যাল ছাড়বে তবু ফুলি ফোনটা ধরবে। হাজারবার বারণ করেছি, তাও। মেয়েরা জাস্ট ডোন্ট লিস্‌ন্‌। তুলি একটাও কথা শুনল না আমার। ফুলি তুলির থেকে বেটার, কিন্তু শেষমেশ ডবল এক্স ক্রোমোজোম তো।

ফুলি উত্তেজিত গলায় কথা বলছে। একটা লোক হেলমেট পরা মুণ্ডু ঘোরাচ্ছে। ফুলির কাঁধে চাপ দিলাম। ফুলি গলা নামাল।

রত্নাবলীদি, ওরা ওদের মতো করুক, আমার দিকে একঝলক তাকাল ফুলি, আমরা একটা রিডিং গ্রুপ অর্গ্যানাইজ করি চল। সারা আহমেদের ফেমিনিস্ট কিলজয়ের ন্যারেটিভটা . . .

ফুলির কাঁধে হাত রাখলাম। সারা আহমেদ নয়, বেল হুকস্‌। স্ট্রাকচারাল অ্যাবসেন্স।

ফুলি শুধরে নিল। কিন্তু বলল না সাজেশনটা আমার। চাপ নেই, রত্নাবলীর সঙ্গে কালই দেখা হবে।

তিন দুই এক। লাল মানুষ ফের সবুজ, আকাশেবাতাসে হর্নের নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরণ । আমরা রাস্তায় নামলাম। ওদিক থেকে তুলিও নেমেছে। আমার দিকে এগোচ্ছে। আমাকে সত্যি সত্যি দেখেনি? নাকি ফুলি আছে বলে দেখতে চাইছে না?

কে জানে। তুলির চয়েস আমার বোধের অগম্য। তুলির কানে গান। তুলির চোখ লক্ষ্যহীনতায় স্থির। তুলির পদক্ষেপ গন্তব্যহীনতায় অচঞ্চল। তুলি এখন পাঁচ হাতের মধ্যে। দম বন্ধ করি। একটা অদৃশ্য বুদবুদ বানাই। এই অকথ্য শহরের সব কিছুকে, সবাইকে বার করে দিয়ে শুধু আমি আর তুলি, তুলি আর আমি।

তুলি, একবার চোখ তোল, একবার সব ভুলে যাও, একবার আমাকে তোমার চয়েস কর।

বুদবুদ ছিঁড়ে তুলি চলে গেল।

Comments