হোয়াট উই ডোন্ট হ্যাভ
মেলার ওপেনিং নাইটে গেয়েছিলেন মনোময় ভট্টাচার্য। খুবই দক্ষ শিল্পী। তালিম তো আছেই, বহুদিন ধরে স্টেজে উঠছেন, স্টেজ ক্রাফটও আয়ত্ত্ব। রামপ্রসাদ থেকে রবীন্দ্র থেকে নজরুল - সবই ভালো গান। এবং যথোপযুক্ত হাঁ করেন। কিন্তু সে তো জানাই কথা। কারণ ভালো গান গাইতে গেলে ...
রবীন্দ্রসংগীত ও রহস্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করলেন মনোময়। বলুন তো কী গাইব? বর্ষার গান, বিটের গান, সবার চেনা গান।
অর্চিষ্মান কানের কাছে মুখ এনে বলল, বল তো দেখি কুন্তলা কোন গান করবেন।
মন মোর মেঘের সঙ্গী?
অর্চিষ্মান বলল, উঁহু ওইটা গাইবে, আরে বল না, ওই যে গো, যে গানটায় যে উত্তমকুমার আর মাধবী মাঠের মধ্যে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে। ময়দানে সম্ভবতঃ তবে ইন্দ্রপুরী স্টুডিয়োতেও হতে পারে, হুলিয়ে বৃষ্টি পড়ছে, তার মধ্যে উত্তমকুমার হেঁটে হেঁটে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে এল, মাধবীও পিছু পিছু...নির্ঘাত তিন মাসের কম প্রেম।
বাজনা শুরু হল,মনোময়ের মনোমুগ্ধকর গলা বেজে উঠল।
চেনাশোনার কোন বাইরে, যেখানে পথ নাই নাই রে, সেখানে অকারণে যায় ছুটে...
মনোময় আঙুল তুললেন, প্যান্ডেল ফেটে পড়ল।
পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে, পাগল আমার মন জেগে ওঠে।
*
পৃথিবীর আট বিলিয়ন লোককে নিশ্ছিদ্র দুই দলে ভাগ করা যায়। যারা মঞ্চ থেকে শিল্পী গাইতে বললে গেয়ে ওঠেন, যারা ওঠেন না। সবাই জানে আমি আর অর্চিষ্মান এক দলে পড়ি না। কে কোন দলে, তাও সবাই জানে। মনোময় গাইতে বললেন, আমি গাইলাম। মনোময় মাইকশুদ্ধু হাত মাথার ওপর তুলে হাততালির ভঙ্গি করে হাততালিও দিতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, সেটা নিয়ে ভাবলাম। এই পৌষমেলাতেই দু’বছর আগে হাততালিসংক্রান্ত একটা ট্রমা ঘটেছিল। লক্ষ্মীছাড়া নামের কলকাতার বিখ্যাত ব্যান্ড এসেছিলেন, লোকে উদ্দাম নাচছে, আমি নাচার বদলে গাইতে গাইতে সোৎসাহ হাততালি দিচ্ছিলাম। গান থামার পর, গিটারিস্ট দেবাদিত্য - যিনি চাওম্যান-এর হোতা, তাতে আমার দুঃখ বেশি হয়েছে কারণ আমরা কট্টর চাওম্যান লয়্যালিস্ট, দিল্লিতে খোলার পর থেকে আমরা সর্বদা চাওম্যান থেকে ফ্রায়েড রাইস অর্ডার করি - আমার দিকেই সোজা তাকিয়ে বললেন, এত ভালো লাগে যখন বয়স্ক লোকেরাও আমাদের জেনারেশনের গানে হাততালি দেন।
সেই থেকে গত দু’বছর ধরে আমি আর কোনও গানের সঙ্গে হাততালি দিইনি। গেয়েছি, কিন্তু নো হাততালি। মনোময় যখন হাততালি দিতে বললেন সিরিয়াসলি কনসিডার করলাম হাততালি দেব কি না, তারপর কনসিডারও যে করছি সেই ভেবে নিজের প্রতিি বিরক্ত লাগল। বয়স যদি হয়েই থাকে তাহলে তো আর সময় নেই। হাততালি দিতে ইচ্ছে করলে হাততালি দেব, ডিগবাজি খেতে ইচ্ছে করলে ডিগবাজি খাব, বক দেখাতে ইচ্ছে করলে বক দেখাব। নতুন প্রজন্মের পুঁচকে ছোঁঁড়ারা কী বলছে সেই কনসিডার করে সময় নষ্ট করব কেন।
যা না চাইবার তাই আজি চাই গো, যা না পাইবার তাই কোথা পাই গো।
অর্চিষ্মানকে বললাম, পাগলা হাওয়াকে এতদিন বর্ষার গান ভেবেছি কেন কে জানে। এ তো আগাপাশতলা মিড লাইফ ক্রাইসিসের গান।
অর্চিষ্মান বলল, তুমি বেটার বুঝবে।
গান শেষ হল, প্যান্ডেল জুড়ে চটাপটপট হাততালি পড়ল। অর্চিষ্মান নর্ম্যাল হাততালি দিল, আমি দুই হাত মাথার ওপর তুলে হাততালি দিলাম। সত্যি কী ভালো গান মনোময়। বললেন, আবার রবীন্দ্রনাথ হোক?
হোক হোক।
তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে প্রাণে, তোমার খোলা হাওয়া। টুকরো করে কাছি আমি ডুবতে রাজি আছি, আমি ডুবতে রাজি আছি।
অর্চিষ্মান বলল, নাঃ, এই কাছাখোলা আর সেলফ স্যাবোট্যাজের জায়গাটায় তোমার সঙ্গে মিল পাচ্ছি। মেবি ইউ আর রাইট, মেবি এটা সত্যিই মিড লাইফ ক্রাইসিসের গান।
সকাল আমার গেল মিছে, বিকেল যে যায় তারি পিছে গো।
সত্য যখন সাবটেক্সট ছেড়ে টেক্সটে এসে পড়ে এমনকি অর্চিষ্মানের মতো সংশয়বাদীকেও হার মানতে হয়। ঠিক করলাম বাড়ি গিয়ে গীতবিতানের পি ডি এফ খুলে বসব। পর্যায়ভাগের আপডেশন দরকার। পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, বিচিত্র এবং মিড লাইফ ক্রাইসিস। এই সুযোগে দেখে নেব গানগুলো রবীন্দ্রনাথ পঁয়তাল্লিশের আশেপাশে লিখেছিলেন কি না।
ভেবেই মনে পড়ল, সকাল দুপুর বিকেল সবার জীবনেই আসে, কিন্তু সবার সকাল দুপুর এক সময়ে আসে না। দৈর্ঘ্যের তারতম্য হয়। অনেকের তো গোটা গোটা বেলা স্কিপ করে যায়। আমার যেমন পনেরো পার হতেই পঁয়ষট্টি ঢুকে গেছে। লাইফলং প্রৌঢ়ত্ব। ব্যাপারটা নিয়ে দুঃখেই ছিলাম, যতদিন না উল্টো উপসর্গটা নজরে পড়ল। অনেককেই আজকাল দেখি, আগেও ছিলেন নিশ্চয়, ইন্টারনেট আসার পর দৃশ্যমান হয়েছেন, যাঁরা বারোতেই আটকে গেছেন। বারোতে ঢুকে আজীবন বারোতে কাটিয়ে বারোতেই মরবেন। আমার অবস্থা এঁদের থেকে বেটার। আজীবন বারো থাকার থেকে আজীবন পঁয়ষট্টি থাকা।
কিন্তু আমার চিরপ্রৌঢ়ত্ব নিয়ে কথা হচ্ছে না, কথা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ যৌবন নিয়ে। রঞ্জন বন্দ্য্যপাধ্যায়ের সঙ্গে চন্দ্রিল ভট্টাচার্যর আমার রবীন্দ্রনাথ শিরোনামে ইন্টারভিউটার কথা মনে পড়ল। চন্দ্রিল বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথের যৌবন তো আর পাঁচজনের মতো হবে না, রবীন্দ্রনাথের যৌবন নির্ঘাত রবীন্দ্রনাথের মতোই প্রতিভাবান। কাজেই রবীন্দ্রনাথের মিড লাইফ পঁয়তাল্লিশ হবে না। সত্তরটত্তর হবে।
পরের গানটাও, মনোময় দাবি করলেন, সবার চেনা। সবাই মিলে গাইতে পারবে। সবাই যেন তাঁর সঙ্গে সঙ্গে গান।
চেনা? সহস্রাব্দের সেরা আন্ডারস্টেটমেন্ট। গাইতে বললে কথাটারও কোনও মানে নেই। মনোময় যদি সঙ্গে সঙ্গে গাইতে বারণও করতেন তবু আমাকে গাইতে হত। যদি চোখ রাঙিয়ে খামোশ্ বলে উঠতেন, তবু আমাকে গাইতে হত। যদি বন্দুকের নল মাথায় ঠেকাতেন, মুখ বন্ধ রাখতাম কিন্তু শরীরের প্রতিটি রোমকূপ গেয়ে উঠত।
আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই তুমি তাই গো।
মনোময় মাইক ঘোরালেন। গোটা সি আর পার্ক গাইল, তোমা ছাড়া আর এ জগতে মোর কেহ নাই কিছু নাই গো।
মনোময়ের সলিড প্রস্তুতি, দীর্ঘদিনের মঞ্চ অভিজ্ঞতা কিন্তু সরি নট সরি, এই গানটা ওঁর গান নয়। ওঁর দোষ নয়। বাংলায় লেখা কোনও প্রেমের গানই ওঁর নয়, আমার নয়, আর কারও নয়। যাঁর, হ্যামলিনের গিটার বাজিয়ে তিনি চলে গেছেন, বাংলার যত প্রেমের গান - লেখা হয়েছে, হবে, কোনওদিন হবে না - পিছু পিছু বৈষ্ণবঘাটায় তাঁর বাড়ি চলে গেছে। এই গানটা তো তিনি স্বজিহ্বায় ধারণ করেছেন, ইউটিউবে আছে, লাইভ রেকর্ডিং। বাকি সবার গাওয়ায় জল ঢেলে। তাও বেশ বেশি বয়সে। কিছুই অসুবিধে হয়নি কারণ প্রেমে পাক ধরতে বয়স লাগে।
তুমি সুখ যদি নাহি পাও, যাও সুখের সন্ধানে যাও—
আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয়মাঝে, আর কিছু নাহি চাই গো
অর্চিষ্মান বলল, কী সুন্দর লাইনগুলো না? তুমি সুখের সন্ধানে হৃদয়মাঝে … তারপর কী যেন? গাইতে গাইতে চোখ গোল করলাম। অর্চিষ্মান ডিফেন্সিভ হল। আহা, আগে শুনেছি, কিন্তু মুখস্থ নেই।
কোনদিন দাবি করবে পাঞ্জাবসিন্ধুগুজরাটমারাঠাদ্রাবিড়উৎকলবঙ্গ-র অর্ডার গুলিয়ে ফেলেছে।
আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস
দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী দীর্ঘ বরষ মাস।
আমার পাশে মাংকি ক্যাপ পরা ভদ্রলোক চোখ বুজে মাথা নেড়ে গাইছেন। সামনের সারির মাফলার পেঁচানো ভদ্রমহিলা গাইতে গাইতে চোখে আঁচল চাপছেন। ডানদিকের প্যান্ডেলের থার্ড বাঁশের পাশে একজোড়া ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এরা প্রতি ফাংশানে আসে, ওই বাঁশের পাশেই দাঁড়ায়, ভেবে দেখেছ কীইঈঈ-তে অ্যাংস্টে বেঁকে যায়, পিণ্ডারি পলাশের বনে দুই হাত মাথার ওপর তুলে নাচে, এই গানটা খুবই দরদী মুখে গাইছে। অর্চিষ্মান গাইছে তো না-ই, হাসি চাপতে গিয়ে নিঃশব্দে কাঁপছে।
সি আর পার্কের আদি নাম ইস্ট পাকিস্তান ডিসপ্লেসড পার্সন'স কলোনি ছিল বোঝা যায়। তোমাদের কিছু জেনারেশনাল আবেগ, বাপ রে বাপ রে বাপ।
মনোময় গাইলেন, যদি আরও কারে ভালোবাসো, যদি আরও ফিরে নাহি আস, গোটা ই পি ডি পি কলোনি, সরি, সি আর পার্ক গেয়ে উঠল, তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও, আমি যত দুখ পাই গো।
*
তুমি কি এটাকেই প্রেম বলে ভাব কুন্তলা?
মনোময়ের ফাংশান অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গেছিল। ফাংশান ফুরোলে বাড়ি ফেরারই কথা ছিল, তারপর ভাবলাম একবার দু'নম্বরটা ঘুরে যাই, যদি কিছু মজা পড়ে থাকে কুড়িয়েবাড়িয়ে ফিরব।
ফিরছিলাম। পৌষমেলার গল্প হচ্ছে কাজেই তখনও পৌষমাসই চলছিল। এই ভরা বাদর মাহ ভাদরে বসে সে পৌষরাত্রি কল্পনা করা টাফ। তবে কেমন আর হবে - ঠাণ্ডা ছিল, ল্যাম্পপোস্টের আলো ঘিরে ধোঁয়াশা দৃশ্যমান হয়ে ছিল, ছাতিমের গন্ধটন্ধও নির্ঘাত চারদিক ছেয়ে ছিল। হাঁটতে হাঁটতে অর্চিষ্মান আমাকে জিজ্ঞাসা করছিল, আমি এটাকেই প্রেম বলে ভাবি কি না।
কোনটাকে?
>আমি তোমারে পেয়েছি হৃদয় মাঝে আর কিছু নাহি চাই গো? তুমি যাহা চাও তাই যেন পাও আমি যত দুখ পাই গো?
>বললাম, নোপ। ছোটবেলায় নাটকনভেল পড়ে, গানটান শুনে ধরে নিয়েছিলাম প্রেম বোধহয় এ রকমই। অচিরেই ভ্রম ভাঙল। তখনও মচকাইনি। অসীম আত্মশ্লাঘাতে ভেবেছি বাকিদের প্রেম যেমন কোয়ালিটির হয় হোক, আমার প্রেম নির্ঘাত এই রকম কারণ আমি তো নট লাইক আদারস্। সে ডেলুলুও ঘুচেঁছে। বাকিরা ছ্যাঁচড়া হলে আমি ছ্যাঁচড়াশিরোমণি, আমার প্রেম মহৎ হবে কোদ্দিয়ে।
অবশ্য যদি হয় প্রেম বলে কিছু হয় অ্যাট অল।
এই সব ভাবতে ভাবতে ইউটিউবে একবাক্স বেড়ালছানা আর একবাক্স কুকুরছানার প্রথম আলাপের ভিডিও দেখছি, এমন সময় হাত লেগে পরের শর্ট চলে এল আর একজন গুরুদেব আবির্ভূত হয়ে বললেন, লাভ ইজ আ সুপারন্যাচারাল ইন্টেলিজেন্স। হিউম্যানস ডোন্ট হ্যাভ ইট।
(পরের পর্বে শেষ হবেই, প্রমিস। পরের পর্ব দ্রুত আসবে, ডবল প্রমিস)
Comments
Post a Comment