April 30, 2012

শনিবারের বারবেলা



হ্যালো হ্যালো হ্যালো। কেমন আছেন সবাই? দুদিন কী করলেন? কত মজা করলেন? অবান্তরকে মিস করলেন কি?

আমার উইকএন্ড ভালো কেটেছে। ঘুরে বেড়িয়ে, সিনেমা দেখে, বিবিমবাপ খেয়ে। কোরিয়ানরা ভারি ভালো রান্না করে কিন্তু।

শনিবার দুপুরে শহরের রাস্তায় বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। বেড়ানো মানে অনির্দেশ্য ঘোরাঘুরি। একটা রাস্তা ধরে নাকবরাবর হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সঙ্গের লোকের কনুই টেনে ধরে, “চলো এই গলিটায় কী আছে দেখে আসি” বলে গলির ভেতর বেমালুম ঢুকে পড়া। সে গলি পছন্দ না হলে আবার অন্য গলি। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে গেলে কফির দোকান আছে, গলির গোলকধাঁধায় খেই হারিয়ে গেলে আছেন হেল্পফুল পথচারী কিংবা পুলিশকাকু। এই করে টাইমপাস যতক্ষণ না বিকেলের শো-এর সময় হয়ে যায়। তখন একবালতি পপকর্ণ আর একগামলা কোক নিয়ে বসে 3Dতে জ্যাক আর রোজের প্রেম। জানি হাস্যকর, তবু যতবার দেখি, শেষদিকটা কীরকম কান্না কান্না পেয়ে যায়। অবশ্য কান্নার আর দোষ কী। জাহাজ ডুবছে, গরিব লোকেদের তালাবন্ধ করে রেখে খুন করা হচ্ছে, বাবামাকে হারিয়ে ফেলা বাচ্চা চেঁচিয়ে কাঁদছে, প্রেমিকাকে বাঁচাতে প্রেমিক মরে যাচ্ছে---কাঁদবেন না মানে? আপনার ঘাড় কাঁদবে। এতেও যদি কাজে না দেয়, পাছে কেউ খটখটে শুকনো চোখে স্মার্টলি হল থেকে বেরিয়ে পড়ে বলে, “ধুস এ আর কী, সে কেঁদেছিলাম বটে কাবুলিওয়ালা দেখে” তাই শাকের আঁটির মতো আছেন সিলিন ডিওন। ধরা গলায় এমন গান ধরবেন লাস্ট সিনে, 3D চশমার কূল ছাপিয়ে নোনতা জলের বাঁধভাঙা বৃষ্টি না নামিয়ে থামবেনা না।

কেঁদেটেদে, তাড়াতাড়ি চোখটোখ মুছেটুছে, “কই আমি কাঁদিনি মোটেই, বাজে কথা বললেই হল” বলে সিনেমাহল থেকে বেরিয়ে এসে আবার হন্টন। প্ল্যান হচ্ছে রাত্তিরের খাবার খেয়ে বাড়ি ফেরা, এদিকে পপকর্ণ আর সোডায় যে এত পেট ভরে, সেটা মাথায় ছিল না কারোরই। কাজেই আমরা ঠিক করলাম আরও খানিকটা হেঁটে খিদেটা চাগিয়ে তারপর দোকানে ঢুকে মালিকের ব্যবসা লাটে তোলার মতো করে খাব। হাঁটতে হাঁটতে একটা পার্কের মতো জায়গায় পৌছনো গেল। চারদিকে বেশ সামার সামার ভাব, ফুলছাপ ফ্রক আর হাফপ্যান্টের ছড়াছড়ি। ছেলেপুলেরা স্কেটিং বোর্ড নিয়ে কসরত করছে, প্রেমিকপ্রেমিকারা গুনগুন গল্প করছে, বাবামায়েরা ছেলেমেয়েদের পুতুলের মতো সাজিয়ে গুছিয়ে ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছেন। হ্যাপি ফ্যামিলির আগে আগে কিউট কুকুরছানা লাফাতে লাফাতে চলেছে।

লোকজনের এত সুখ দেখেশুনে প্রবল মনখারাপ সেট ইন করতে যাবে যাবে, এমন সময় একটা জটলার দিকে চোখ পড়ল। জটলা দেখলেই আমার পা সুড়সুড়িয়ে সেদিকে হাঁটা লাগায়, গোড়ালি প্রাণপণে উঁচু হয়ে ৫ ফুট ২ ইঞ্চিকে ঠেলেঠুলে আরও ক’ইঞ্চি বাড়ানোর চেষ্টা করে, ঘাড় এদিক ওদিক ঘুরে খবর সংগ্রহে নেমে পড়ে। “কী হচ্ছে দাদা?” মনখারাপকে গোল্লায় দিয়ে আমি জটলার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারি।

উঁকি মেরে দেখি জাপানি গানবাজনা হচ্ছে। একদল নন-জাপানি ছেলেমেয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত জাপানি সাজগোজ করে অর্ধচন্দ্রাকারে বসে গান গাইছে, ঢাকের মতো একরকম তালবাদ্য বাজিয়ে বাজিয়ে। পরে বাড়ি এসে উইকিতে দেখলাম ওটাকে বলে ‘তাইকো’। এই যে, ব্যাপারটা এইরকম দেখতে।




জটলা ততক্ষণে বাড়তে বাড়তে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেছে। লোকজন ভয়ানক মজা পাচ্ছে, হাততালি দিয়ে বাজনদারদের উৎসাহ দিচ্ছে, একটা ঝুঁটিবাঁধা ছোট্ট মেয়ে তো ঘুরে ঘুরে নাচতেই শুরু করে দিল। আমারও মনটা ভীষণ ভালো হয়ে গেল হঠাৎ। মনে হল, দেখ, এতো জটিলতা ভরা জীবনে, কেউ কেউ তো এখনও শুধু ভালোলাগে বলে রাস্তায় বসে গান গাইছে? শুধু গানই নয়, সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা সংস্কৃতির চর্চা করছে। হয়তো চর্চাটা খুব পাকা হচ্ছে না, দুএকজন জাপানি দেখতে (যতই রেসিস্ট শোনাক না কেন, চিনা, জাপানি, কোরিয়ান ঠিক করে আলাদা করতে পারিনা এখনও। তাই আমাকেও কেউ পাকিস্তানি বা বাংলাদেশি ভেবে বসলে মোটেই অবাক হইনা।) পথচারীকে মৃদু হেসে পাশ কাটিয়ে যেতে দেখেছি একটু আগেই, কিন্তু তাও চেষ্টা তো করেছে? যতটা পারা যায় ঐতিহ্যের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য উপযোগী সাজপোশাক করেছে, ধড়াচূড়া পড়েছে, পিচরাস্তায় হাঁটু মুড়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে। 

এদের সাথে কোনদিন একসাথে যোগা ক্লাস করলে বুঝতে পারবেন এই শেষের ব্যাপারটা কী সাঙ্ঘাতিক আত্মত্যাগ দাবি করে।

ভেবেটেবে আমি কীরকম অভিভূত হয়ে পড়লাম। আধঘণ্টাখানেক আগে দেখা টাইটানিকের প্রভাব তো ছিলই, তার ওপর জাপানি গান শুনে সত্যি সত্যি মনে হল কী সব ছোটখাটো বিষয়চিন্তায় ডুবে থাকি সর্বক্ষণ। নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে নিয়ে গুম হয়ে পড়ে থাকি, নিজের সমস্যা, নিজের কষ্ট, নিজের পাওয়া না-পাওয়ার হিসেব কষি। বাকি সবার সাথে নিজের অমিলগুলো গুনে গুনে বার করতেই অষ্টপ্রহর কেটে যায়, তাই মিলগুলো আর চোখেই পড়েনা।

বা এর সাথে হয়তো যৌবনের যোগ আছে কোথাও। যারা ফুটপাথে বসে বাজনা বাজাচ্ছিল, তারা সবাই ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী। তারা যত সহজে সবাইকে, সবকিছুকে আপনার বলে ভাবতে পারে, আমার ন্যাবা ধরা চোখ আর বীতশ্রদ্ধ মনের কাছে সেই উদারতার আশা করাই ভুল হয়তো।

পড়ার বই হাতে নিলেই যেমন ঘুম এসে যায়, তেমনি গভীর কথা ভাবতে গেলেই খিদে পেয়ে যায় আমার। আগেও দেখেছি। কাজেই গান শোনায় ক্ষান্ত দিয়ে বিবিমবাপের খোঁজে চলা শুরু হল। খেয়েদেয়ে, ঢেঁকুর তুলে, সন্ধ্যের হাওয়ায় ভেসে ভেসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেখি স্টেশনে নামার সিঁড়ির মুখটায় আরেকটা জটলা। এবার অবশ্য উঁকি মেরে দেখার দরকার হলনা, ভিড়ের মাথা ছাপিয়ে ঠুংঠাং করতাল আর ধুপধাপ ঢোল সহযোগে, প্রবল বিদেশি উচ্চারণে, “হ্যারে খ্রিশনা, হ্যারে খ্রিশনা, খ্রিশনা খ্রিশনা, হ্যারে হ্যারে” চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। সেই শুনতে কী ভিড় হয়েছে যদি দেখতেন। একদল ঝুঁটি বাঁধা হিপি প্রাণপণে হাত পা আকাশে তুলে ধাঁইধাঁই নৃত্য করছে, সবাই হামলে পড়ে তাই দেখছে। কেউ কেউ তো দলে ভিড়ে অলরেডি নাচতে শুরুও করে দিয়েছে।

ফ্রিকস।

যাই হোক। যে যা করে আনন্দ পায় পাক গে, আমার আর কী? বলুন? আপনারা কেমন সপ্তাহান্ত কাটালেন সেই গল্প শুনি বরং এবার। 


4 comments:

  1. bah, bhaloi katlo tahole tomar shonibar! :) amaro bhaloi ketechhe. weekend e r kono kicchhhu na kore sudhu khete r ghumote r youtube dekhte bhari moja lage.

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ আত্রেয়ী রাস্তাঘাটে ঘুরে সিনেমা দেখার থেকে শুয়ে শুয়ে YouTube দেখা কোন অংশে কম ভালো না।

      Delete
  2. বাহ! আপনিও টাইটানিক দেখলেন? খুব ভাল | তবে থাকতেন নেওয়ারকে, বুঝতেন ওই অচেনা গলিতে ঢুকে পড়ার পর ঠিক কি কি ঘটতে পারে | আর সিনেমা দেখে কাঁদবার দরকার হতনা! এই নিন আপনার ফ্রীক দের একটা ভিডিও - আপনার প্রিয় শহরে তোলা |

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহাহাহা, প্রাইসলেস সুগত। লাল রঙের লেদার কোট আর হলদে রঙের ঢোল বাজিয়ে হরেকেষ্ট নাম। কালে কালে আর কত কী যে দেখবো।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.