April 30, 2012

শনিবারের বারবেলা



হ্যালো হ্যালো হ্যালো। কেমন আছেন সবাই? দুদিন কী করলেন? কত মজা করলেন? অবান্তরকে মিস করলেন কি?

আমার উইকএন্ড ভালো কেটেছে। ঘুরে বেড়িয়ে, সিনেমা দেখে, বিবিমবাপ খেয়ে। কোরিয়ানরা ভারি ভালো রান্না করে কিন্তু।

শনিবার দুপুরে শহরের রাস্তায় বেড়াতে বেরিয়েছিলাম। বেড়ানো মানে অনির্দেশ্য ঘোরাঘুরি। একটা রাস্তা ধরে নাকবরাবর হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সঙ্গের লোকের কনুই টেনে ধরে, “চলো এই গলিটায় কী আছে দেখে আসি” বলে গলির ভেতর বেমালুম ঢুকে পড়া। সে গলি পছন্দ না হলে আবার অন্য গলি। হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে গেলে কফির দোকান আছে, গলির গোলকধাঁধায় খেই হারিয়ে গেলে আছেন হেল্পফুল পথচারী কিংবা পুলিশকাকু। এই করে টাইমপাস যতক্ষণ না বিকেলের শো-এর সময় হয়ে যায়। তখন একবালতি পপকর্ণ আর একগামলা কোক নিয়ে বসে 3Dতে জ্যাক আর রোজের প্রেম। জানি হাস্যকর, তবু যতবার দেখি, শেষদিকটা কীরকম কান্না কান্না পেয়ে যায়। অবশ্য কান্নার আর দোষ কী। জাহাজ ডুবছে, গরিব লোকেদের তালাবন্ধ করে রেখে খুন করা হচ্ছে, বাবামাকে হারিয়ে ফেলা বাচ্চা চেঁচিয়ে কাঁদছে, প্রেমিকাকে বাঁচাতে প্রেমিক মরে যাচ্ছে---কাঁদবেন না মানে? আপনার ঘাড় কাঁদবে। এতেও যদি কাজে না দেয়, পাছে কেউ খটখটে শুকনো চোখে স্মার্টলি হল থেকে বেরিয়ে পড়ে বলে, “ধুস এ আর কী, সে কেঁদেছিলাম বটে কাবুলিওয়ালা দেখে” তাই শাকের আঁটির মতো আছেন সিলিন ডিওন। ধরা গলায় এমন গান ধরবেন লাস্ট সিনে, 3D চশমার কূল ছাপিয়ে নোনতা জলের বাঁধভাঙা বৃষ্টি না নামিয়ে থামবেনা না।

কেঁদেটেদে, তাড়াতাড়ি চোখটোখ মুছেটুছে, “কই আমি কাঁদিনি মোটেই, বাজে কথা বললেই হল” বলে সিনেমাহল থেকে বেরিয়ে এসে আবার হন্টন। প্ল্যান হচ্ছে রাত্তিরের খাবার খেয়ে বাড়ি ফেরা, এদিকে পপকর্ণ আর সোডায় যে এত পেট ভরে, সেটা মাথায় ছিল না কারোরই। কাজেই আমরা ঠিক করলাম আরও খানিকটা হেঁটে খিদেটা চাগিয়ে তারপর দোকানে ঢুকে মালিকের ব্যবসা লাটে তোলার মতো করে খাব। হাঁটতে হাঁটতে একটা পার্কের মতো জায়গায় পৌছনো গেল। চারদিকে বেশ সামার সামার ভাব, ফুলছাপ ফ্রক আর হাফপ্যান্টের ছড়াছড়ি। ছেলেপুলেরা স্কেটিং বোর্ড নিয়ে কসরত করছে, প্রেমিকপ্রেমিকারা গুনগুন গল্প করছে, বাবামায়েরা ছেলেমেয়েদের পুতুলের মতো সাজিয়ে গুছিয়ে ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছেন। হ্যাপি ফ্যামিলির আগে আগে কিউট কুকুরছানা লাফাতে লাফাতে চলেছে।

লোকজনের এত সুখ দেখেশুনে প্রবল মনখারাপ সেট ইন করতে যাবে যাবে, এমন সময় একটা জটলার দিকে চোখ পড়ল। জটলা দেখলেই আমার পা সুড়সুড়িয়ে সেদিকে হাঁটা লাগায়, গোড়ালি প্রাণপণে উঁচু হয়ে ৫ ফুট ২ ইঞ্চিকে ঠেলেঠুলে আরও ক’ইঞ্চি বাড়ানোর চেষ্টা করে, ঘাড় এদিক ওদিক ঘুরে খবর সংগ্রহে নেমে পড়ে। “কী হচ্ছে দাদা?” মনখারাপকে গোল্লায় দিয়ে আমি জটলার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারি।

উঁকি মেরে দেখি জাপানি গানবাজনা হচ্ছে। একদল নন-জাপানি ছেলেমেয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত জাপানি সাজগোজ করে অর্ধচন্দ্রাকারে বসে গান গাইছে, ঢাকের মতো একরকম তালবাদ্য বাজিয়ে বাজিয়ে। পরে বাড়ি এসে উইকিতে দেখলাম ওটাকে বলে ‘তাইকো’। এই যে, ব্যাপারটা এইরকম দেখতে।




জটলা ততক্ষণে বাড়তে বাড়তে ছোটখাটো একটা ভিড় জমে গেছে। লোকজন ভয়ানক মজা পাচ্ছে, হাততালি দিয়ে বাজনদারদের উৎসাহ দিচ্ছে, একটা ঝুঁটিবাঁধা ছোট্ট মেয়ে তো ঘুরে ঘুরে নাচতেই শুরু করে দিল। আমারও মনটা ভীষণ ভালো হয়ে গেল হঠাৎ। মনে হল, দেখ, এতো জটিলতা ভরা জীবনে, কেউ কেউ তো এখনও শুধু ভালোলাগে বলে রাস্তায় বসে গান গাইছে? শুধু গানই নয়, সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা সংস্কৃতির চর্চা করছে। হয়তো চর্চাটা খুব পাকা হচ্ছে না, দুএকজন জাপানি দেখতে (যতই রেসিস্ট শোনাক না কেন, চিনা, জাপানি, কোরিয়ান ঠিক করে আলাদা করতে পারিনা এখনও। তাই আমাকেও কেউ পাকিস্তানি বা বাংলাদেশি ভেবে বসলে মোটেই অবাক হইনা।) পথচারীকে মৃদু হেসে পাশ কাটিয়ে যেতে দেখেছি একটু আগেই, কিন্তু তাও চেষ্টা তো করেছে? যতটা পারা যায় ঐতিহ্যের কাছাকাছি যাওয়ার জন্য উপযোগী সাজপোশাক করেছে, ধড়াচূড়া পড়েছে, পিচরাস্তায় হাঁটু মুড়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাজিয়ে চলেছে। 

এদের সাথে কোনদিন একসাথে যোগা ক্লাস করলে বুঝতে পারবেন এই শেষের ব্যাপারটা কী সাঙ্ঘাতিক আত্মত্যাগ দাবি করে।

ভেবেটেবে আমি কীরকম অভিভূত হয়ে পড়লাম। আধঘণ্টাখানেক আগে দেখা টাইটানিকের প্রভাব তো ছিলই, তার ওপর জাপানি গান শুনে সত্যি সত্যি মনে হল কী সব ছোটখাটো বিষয়চিন্তায় ডুবে থাকি সর্বক্ষণ। নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে নিয়ে গুম হয়ে পড়ে থাকি, নিজের সমস্যা, নিজের কষ্ট, নিজের পাওয়া না-পাওয়ার হিসেব কষি। বাকি সবার সাথে নিজের অমিলগুলো গুনে গুনে বার করতেই অষ্টপ্রহর কেটে যায়, তাই মিলগুলো আর চোখেই পড়েনা।

বা এর সাথে হয়তো যৌবনের যোগ আছে কোথাও। যারা ফুটপাথে বসে বাজনা বাজাচ্ছিল, তারা সবাই ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী। তারা যত সহজে সবাইকে, সবকিছুকে আপনার বলে ভাবতে পারে, আমার ন্যাবা ধরা চোখ আর বীতশ্রদ্ধ মনের কাছে সেই উদারতার আশা করাই ভুল হয়তো।

পড়ার বই হাতে নিলেই যেমন ঘুম এসে যায়, তেমনি গভীর কথা ভাবতে গেলেই খিদে পেয়ে যায় আমার। আগেও দেখেছি। কাজেই গান শোনায় ক্ষান্ত দিয়ে বিবিমবাপের খোঁজে চলা শুরু হল। খেয়েদেয়ে, ঢেঁকুর তুলে, সন্ধ্যের হাওয়ায় ভেসে ভেসে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেখি স্টেশনে নামার সিঁড়ির মুখটায় আরেকটা জটলা। এবার অবশ্য উঁকি মেরে দেখার দরকার হলনা, ভিড়ের মাথা ছাপিয়ে ঠুংঠাং করতাল আর ধুপধাপ ঢোল সহযোগে, প্রবল বিদেশি উচ্চারণে, “হ্যারে খ্রিশনা, হ্যারে খ্রিশনা, খ্রিশনা খ্রিশনা, হ্যারে হ্যারে” চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। সেই শুনতে কী ভিড় হয়েছে যদি দেখতেন। একদল ঝুঁটি বাঁধা হিপি প্রাণপণে হাত পা আকাশে তুলে ধাঁইধাঁই নৃত্য করছে, সবাই হামলে পড়ে তাই দেখছে। কেউ কেউ তো দলে ভিড়ে অলরেডি নাচতে শুরুও করে দিয়েছে।

ফ্রিকস।

যাই হোক। যে যা করে আনন্দ পায় পাক গে, আমার আর কী? বলুন? আপনারা কেমন সপ্তাহান্ত কাটালেন সেই গল্প শুনি বরং এবার। 


April 28, 2012

সাপ্তাহিকী






এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং-এর চূড়ো থেকে পৃথিবীটাকে দেখতে কেমন লাগে? ঠিক এইরকম

এমারজেন্সি। 

". . . overdoing email can be as detrimental to your IQ as smoking weed." ইয়ার্কি নয়, সিরিয়াসলি। 

যেসব আবিষ্কার না হলে মানবসভ্যতা এক ইঞ্চি এগোতে পারত না।

বিজ্ঞানের কথাই উঠল যখন তখন মাছ বনাম মাধ্যাকর্ষণের লড়াইয়ে কে জিতল জেনে নিন।

শুধু হাই তোলা সংক্রামক কে বলে?

যদি আপনি আমার মতো হন, আর আপনারও যদি জামাকাপড়ের তুলনায় হাওয়াই চটি বেশি হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে এই লিংকটায় অবশ্যই ক্লিক করবেন।

আলো দিয়ে আঁকা।

আপনাদের কথা জানিনা, আমি DJ Dave-এর ভয়ানক ফ্যান হয়ে গেছি। তাই এসপ্তাহেও তাঁর গান রইল। গানও বলতে পারেন, জ্ঞানও।

ঠিক আছে তবে, এসপ্তাহের মতো আসি? সোমবার আবার দেখা হবে। আপনারা সবাই ভালো হয়ে থাকবেন, বাবা মায়ের কথা শুনে চলবেন, সিগারেট কম খাবেন। টা টা।

একদম ওপরের ভূতুড়ে ছবিটা তুলেছেন Jamie. যেখানে সেখানে নয়, খোদ প্যারিসের ফ্যাশন সপ্তাহে।

April 26, 2012

বোরিং বুধবার



বুধবার আমার সারা সপ্তাহের সবথেকে বিশ্রী-লাগা দিন। বিশ্রী অ্যান্ড বোরিং। তার প্রধান কারণ হল দিনটার অবস্থান। এই মাঝামাঝি ব্যাপারটাই আমার জঘন্য লাগে। সে দিনই হোক, কিংবা অন্য কিছু। যেমন ধরুন টকঝাল চানাচুর, কিংবা কাঁচামিঠে আম। আমি সোমবার সকালের নির্মমতা বুঝি, শুক্রবার বিকেলের বাঁধনছাড়া আনন্দও। কিন্তু বুধবার আমার মাথায় ঢোকে না। আর বেছে বেছে বুধবারেই আমার সাথে যত খারাপ জিনিসপত্র ঘটে। মায়ের সাথে মনকষাকষি, বসের সাথে বাকবিতণ্ডা। জঘন্য। এতদিন বাদে মনে নেই যদিও, কিন্তু আমি নিশ্চিত আমার পার্ট ওয়ানের রেজাল্টটাও বুধবার বেরিয়েছিল। নির্ঘাত।

বুঝতেই পারছেন, বুধবারে আমার অবান্তরে ফেঁদে বসার মত বাজে গল্পেরও টানাটানি। গত চব্বিশ ঘণ্টায় বলার মতো কিছুই ঘটেনি। কিন্তু গত সপ্তাহে একটা ঘটনা ঘটেছিল, যেটা আপনাদের বলা হয়নি। গল্পটার একটা শিক্ষামূলক দিকও আছে, যেটা আপনাদের কাজে লাগবে।

আপনারা কি অফিসে গিয়েই বন্যার মতো কাজ শুরু করে দেন? সে করলে করতেই পারেন, কিন্তু আমি করিনা। পারিনা বলা ভালো। দিনের কাজ শুরু করার আগে আমার ওয়ার্ম আপ করতে লাগে। ইন ফ্যাক্ট আমার সারাদিনের একটা বড় অংশ বেরিয়ে যায় এই ওয়ার্ম আপ করতে গিয়ে। সকালে উঠে ধীরেসুস্থে চা খেতে খেতে সারাদিনের জন্য ওয়ার্ম আপ, পড়তে বসার আগে ঘণ্টাখানেক YouTube দেখে ওয়ার্ম আপ, অবান্তরের জন্য পোস্ট লেখা শুরু করার আগে হাজার খানেক চেনা অচেনা ব্লগে ঘোরাঘুরি করে ওয়ার্ম আপ।

সেরকম অফিসে গিয়েও একটা ওয়ার্ম আপের পালা থাকে, যখন আমি ফাঁকা অফিসে এদিক ওদিক হাঁটাহাঁটি করি, জলটল খাই, রেস্টরুমটা একবার এমনি এমনিই ঘুরে দেখে আসি। সেদিনও ওয়ার্ম আপ চলছিল যথারীতি, কফিরুমে দাঁড়িয়ে যত্ন করে স্টারার দিয়ে কফি গুলছিলাম, এমন সময় পেছন থেকে একজন এসে আমার কাঁধে টোকা মেরে বললেন, “শুনলাম তুমি নাকি হাত দেখতে পারো?”

আমি কীরকম ঘাবড়ে গেছিলাম সেটা আর ব্যাখ্যা করে বলার দরকার নেই নিশ্চয়। একে তো ওয়ার্ম আপে অপ্রত্যাশিত বিঘ্ন, তার ওপর ভদ্রমহিলাকে আমি ভালো করে চিনিই না। মানে চিনি, কিন্তু ওই আরকি। অফিসে যেসব সহকর্মীর সাথে লিফটে একা পড়ে গেলে কাষ্ঠ হেসে “হাউ আর ইউ” বলা ছাড়া আর কিছু করার থাকেনা, আর লিফটযাত্রাটা অনন্তের মতো দীর্ঘ মনে হয়, ইনি তাদের মধ্যে একজন। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম উনি আমাকে অন্য কারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। মুখের হাঁ বুজিয়ে সেই কথাটাই ওনাকে বুঝিয়ে বলতে যাবো, তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে গেল।

মনে পড়ে গেল যে চাকরিতে জয়েন করার একেবারে প্রথম সপ্তাহে, “মিংগল” করার প্যাথেটিক প্রয়াসে আমি ক্যাফেটেরিয়ায় বসে গোটা দুই প্রাণোচ্ছল যুবতীর হাত দেখে দিয়েছিলাম বটে। হাত দেখা মানে ওই আরকি--কটা প্রেম, কটা বাচ্চা, কটা এক্সট্রা ম্যারিটাল। তারা তখন খুব খিলখিলিয়ে হাসছিল, আমিও হাসছিলাম এবং পুরো ব্যাপারটাকে হাসাহাসি বলেই ধরে নিচ্ছিলাম, কিন্তু বোঝাই গেল তারা সেটা ভাবছিলনা। বিশেষ করে তাদের মধ্যে যাকে আমি এক্সট্রা ম্যারিটাল সংক্রান্ত সুখবরটা শুনিয়েছিলাম, তার জীবনে ইদানিং একটি পরপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে, এবং সে আর একমুহূর্ত দেরি না করে অফিসময় আমার নামে রাষ্ট্র করেছে, “শি ইজ সাইকিক, ম্যান।”

ভদ্রমহিলা ততক্ষণে আমার সামনে দুহাত বাড়িয়ে ধরেছেন, তাঁর চোখমুখ অলরেডি করুণ হয়ে এসেছে। আমি বারকয়েক তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমি ইয়ার্কি করছিলাম, আমি সত্যি এসব কিছু পারি না। কিন্তু কে কার কথা শোনে। শেষটায় আমাকে ওনার ম্যানিকিওর করা হাত দেখে বানিয়ে বানিয়ে একগাদা মিছে কথা বলতেই হল, আর উনি একশোবার করে আমাকে ধন্যবাদ টন্যবাদ দিয়ে, অভিভূত মুখ করে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিলেন।

আমিও আমার ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া কফির কাপ তুলে নিয়ে নিজের ঘরে ফেরত এলাম। আপাতত ক’দিন আর কফিরুম-মুখো হচ্ছিনা।

ব্যস এই হচ্ছে ব্যাপার। তাই বলছি, আর যাই করুন, হাত দেখা নিয়ে হাসাহাসি করবেন না। করলে নিজেই পস্তাবেন। তখন বলবেন না আগে সাবধান করা হয়নি।

April 25, 2012

শীঘ্রই আসিতেছে!


আমাদের ছোটবেলায় আনন্দবাজারে একটা বিভাগ বেরত। কবে বেরত, তার কী নাম ছিল কিচ্ছু মনে নেই, খালি মনে আছে বিভাগটায় নানারকম বিকল্প পেশার সুলুকসন্ধান দেওয়া হত। মানে ছেলে জয়েন্ট না পেলে বাঙালি বাবামায়েদের সামনে আর কী কী রাস্তা খোলা আছে, সেই ব্যাপারে খোঁজখবর আরকি। তাতে একদিন বেরিয়েছিল, কী করে সীমিত পুঁজিতে লাভজনক মাশরুম চাষ শুরু করা যায়, এমনকি চাইলে নিজের বাড়ির ছাদেই। সেটা পড়ে ভয়ানক উত্তেজিত হয়ে আমি যেই না ঘোষণা করেছি যে বড় হয়ে মাশরুম চাষি হব, বাড়িতে বেড়াতে আসা একজন বয়স্ক আত্মীয় আমাকে ধমকে দিয়ে বলেছিলেন, ওসব “ধড়িবাজি” না করে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে।

বুঝুন ব্যাপার। সাসটেইনেবল, স্মল স্কেল লোকাল ফার্মিং, বলে কিনা ধড়িবাজি।

অবশ্য বয়স্ক আত্মীয়কে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এককালে শুনেছি ছেলেদের কাছে বড় হয়ে জজ ম্যাজিস্ট্রেট বা “দুষ্টু উকিল” ছাড়া আর কিছু হওয়ার রাস্তা খোলা থাকত না। তখনও মেয়েদের স্বর্ণযুগ চলছে, তাদের অত কিছু হওয়াহওয়ির দায় নেই। একটা বয়স পর্যন্ত পুতুল খেল, তারপর বাচ্চা বানাও। পিসফুল। আমাদের সময়ে এল জয়েন্ট। কিন্তু ততদিনে মেয়েদেরও কপাল পুড়েছে। বাবামায়েরা তাদেরও ধরে ধরে জয়েন্টে বসাচ্ছেন। তবে অসুখটা কিনা গভীর, সারতে সময় লাগে। আমি হায়ার সেকেন্ডারিতে ইকো-জিও-ম্যাথ নিচ্ছি শুনে আমার মাসি, যিনি দুই পুত্রের গর্বিতা জননী, আমার মাকে বলেছিলেন, “মেয়ে বলে বেঁচে গেলি মণি, ছেলে হলে সায়েন্স না নিলে চলত না।”

কী ভাগ্যি মেয়ে হয়ে জন্মেছি।

তারও পর এল ম্যানেজমেন্ট। ম্যানেজ করার জিনিসেরও অভাব নেই, ম্যানেজারেরও না। কেউ বিজনেস ম্যানেজ করে, কেউ হোটেল ম্যানেজ করে, কেউ গরমের ছুটি আর পূজোর ছুটিতে লোকজনের বেড়াতে যাওয়া ম্যানেজ করে, পয়সা দিলে শুনেছি লোকে আজকাল আপনার বাড়ির বিয়ে, জন্মদিন, মুখেভাত পর্যন্ত ম্যানেজ করে দিয়ে যায়।

এখন চারদিকে কতরকম ভালো ভালো রংচঙে পেশার কথা শুনতে পাই। শুনি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। মনে মনে ভাবি ইস যদি আগে জানতাম। জানলে আমি গলফ বল ডাইভার ছাড়া আর কিচ্ছু হতাম না। সবুজ ভেলভেট মোড়া মাঠে, রোদে-ছায়ায় ঘুরে বেড়াতাম, ঠাণ্ডা পুকুরের জল দুই হাতে সরিয়ে সরিয়ে এক বুক দম নিয়ে হুপ করে ডুব দিয়ে টুপ করে হারিয়ে যাওয়া গলফ বল তুলে আনতাম, গুপ্তধনের মত। কিংবা টি টেস্টার! সারাদিন বসে বসে সুন্দর সুন্দর কাপপ্লেটে করে দেশি বিদেশি চা খাও, আর পয়সা পাও।

এসব ভাবনা যখন মাথায় আসে তখন জোর করে সরিয়ে দিই।  গানের লাইনটা ঈষৎ অদলবদল করে নিয়ে, “যেটা হল না হল না সেটা না হওয়াই থাক” গুনগুন করি মাথার ভেতর। এজন্মে আর অন্য কিছু হওয়ার বয়স নেই, এমনকি অন্য কিছু হওয়ার যোগ্যতা জোগাড়ের বয়সও পেরিয়ে গেছে। পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে তো দেখা যাবে।

কিন্তু ওই যে বলে, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়? খুঁজতে খুঁজতে এমন একটা পেশা অবশেষে বার করেই ছেড়েছি যেটার জন্য বয়সের বাধাটা কোন বাধাই না। ইন ফ্যাক্ট, বয়স একটু বেশি হলেই রোজগারের চান্স বেশি। তাছাড়া এ পেশায় ডিগ্রি ডিপ্লোমা ইত্যাদি চালকলা বাঁধা বিদ্যের কোন মূল্য নেই। যেটার আছে, সেটা কোন স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে শেখান হয়না।

আপনাদের কারো ‘লাইফ কোচ’ লাগলে বলবেন।

ভাবছেন সেটা কী রকমের কোচিং আবার? ভৌতবিজ্ঞানের নাকি ভূগোলের? আহা বললাম না, এই কোচিং-এর সাথে গতে বাঁধা শিক্ষাদীক্ষার কোন সম্পর্ক নেই?  যেগুলো গতে বাঁধা শিক্ষা শেখায় না, পারে না বলেই, আমার “এক্সক্লুসিভ লাইফ কোচিং” আপনাকে ঠিক সেই সেই ব্যাপারগুলোই গুলে খাওয়ায়। রোজকার জীবনের পথে চলতে গিয়ে যেসব সমস্যা আপনাকে প্রতিহত করে, আপনার মানসিক শান্তি ছিঁড়েখুঁড়ে দেয়, পরিস্থিতির সামনে নিরস্ত্র আত্মসমর্পণে বাধ্য করে, আমার “এক্সক্লুসিভ লাইফ কোচিং” আপনাকে সেসব সমস্যার মোকাবিলা করার জন্য তৈরি করে।

সোজা কথায় এ শিক্ষা জীবনের শিক্ষা। হ্যাঁ হ্যাঁ আপনার বাবা মা যেসব শিক্ষা আপনাকে সেই জন্ম থেকে ঘ্যানরঘ্যানর করে কানের কাছে দিয়ে চলেছেন, আপনি শুনছেন না শুনছেন তার তোয়াক্কা না করেই, সেটাই, কিন্তু বলাই বাহুল্য অনেক সায়েন্টিফিক পদ্ধতিতে বিতরণ করা। আমার এক্সক্লুসিভ লাইফ কোচিং ক্লাসের সিলেবাসে সবকিছুর টোটকা পাবেন, বসের সামনে মেরুদণ্ড সোজা রেখে কথা বলা থেকে শুরু করে প্রেমে প্রত্যাখ্যান হ্যান্ডেল করার টিপস পর্যন্ত। ইন ফ্যাক্ট আমার এক্সক্লুসিভ লাইফ কোচিং কোর্স কমপ্লিট করলে আর প্রত্যাখ্যাত হবেনই না কোনদিন, উল্টে যাকে চান তাকে প্রত্যাখ্যান করে বেড়াতে পারবেন, গ্যারান্টি।

ভেবে ভেবে ভাল বার করেছি না আইডিয়াটা? তবে আর দেরি কেন? আপনারা দলে দলে এসে আমার কোচিং ক্লাসে নাম লেখান, ভাল থাকুন, আমার আঙুল ধরে জীবনের বৈতরণী হেলায় পার করুন। যারা খারাপ আছেন তাঁরা তো আসবেনই, যারা ভাবছেন ভালো আছেন, তাঁরাও আসুন। দেখবেন আমি এক মিনিটের মধ্যে আপনার ভুল ভেঙে দেব।

তখন আপনারা ভেবে কূল পাবেন না যে আমাকে ছাড়া এতদিন আপনাদের চলছিল কী করে।

ও হ্যাঁ, এককালীন ডিপোজিট, মাসিক ফিজ, ডিসকাউন্ট, কালেভদ্রে ফ্রি গুডি ব্যাগ ইত্যাদি জরুরি বিষয়ে জানতে হলে আমাকে ই-মেল করুন। আমি অপেক্ষায় থাকব।

Opening soon
ছবি গুগল ইমেজেস থেকে 


April 24, 2012

Nothing good gets away.



steinbeckAPTHISONE_CROP.jpg
ছবি গুগল ইমেজেস থেকে

New York
November 10, 1958

Dear Thom:
We had your letter this morning. I will answer it from my point of view and of course Elaine will from hers.
First — if you are in love — that’s a good thing — that’s about the best thing that can happen to anyone. Don’t let anyone make it small or light to you.
Second — There are several kinds of love. One is a selfish, mean, grasping, egotistical thing which uses love for self-importance. This is the ugly and crippling kind. The other is an outpouring of everything good in you — of kindness and consideration and respect — not only the social respect of manners but the greater respect which is recognition of another person as unique and valuable. The first kind can make you sick and small and weak but the second can release in you strength, and courage and goodness and even wisdom you didn’t know you had.
You say this is not puppy love. If you feel so deeply — of course it isn’t puppy love.
But I don’t think you were asking me what you feel. You know better than anyone. What you wanted me to help you with is what to do about it — and that I can tell you.
Glory in it for one thing and be very glad and grateful for it.
The object of love is the best and most beautiful. Try to live up to it.
If you love someone — there is no possible harm in saying so — only you must remember that some people are very shy and sometimes the saying must take that shyness into consideration.
Girls have a way of knowing or feeling what you feel, but they usually like to hear it also.
It sometimes happens that what you feel is not returned for one reason or another — but that does not make your feeling less valuable and good.
Lastly, I know your feeling because I have it and I’m glad you have it.
We will be glad to meet Susan. She will be very welcome. But Elaine will make all such arrangements because that is her province and she will be very glad to. She knows about love too and maybe she can give you more help than I can.
And don’t worry about losing. If it is right, it happens — The main thing is not to hurry. Nothing good gets away.
Love,
Fa

ছেলের প্রেমে পড়ার চিঠি পেয়ে জন স্টেইনবেকের প্রত্যুত্তর


April 23, 2012

দ্বিতীয় রিপুর প্রত্যাবর্তন ও ফিজিওথেরাপি


নমস্কার, হাউ ডু’ইয়ুডু, কী খবর? কেমন কাটল উইকএন্ড? ঘুমটুম কেমন হল? খাওয়াদাওয়া কেমন হল? মনের সব ইচ্ছেটিচ্ছে পূরণ হল তো? নাকি বাকি রয়ে গেল কিছু কিছু? বাকি থাকলেই ভালো, পরের উইকএন্ডটার জন্য অপেক্ষার কারণ থাকবে।

আমার খবর ভালোয় মন্দয় মেশামিশি। ভালো খবরটাই আগে দিই আপনাদের। আমার ঠাকুমা অবশেষে উঠে বসেছেন। মানে এখনো এদিক থেকে একটু ঠেলা ওদিক থেকে একটু হেঁইয়ো টান দিতে হচ্ছে, কিন্তু চারদিকে “এই এই গেল গেল...ধর ধর…দেখে দেখে…এ-ই-ই-ই তো…” রব তুলে, প্রবল নড়বড় করতে করতে ঠাকুমা খাটের ওপর সোজা হয়ে উঠে বসতে পারছেন। আজ থেকে একমাস আগে যেটা অকল্পনীয় ছিল। শুধু বসছেনই না, উঠে বসে মুখের সামনে চামচে করা ধরা নরম খিচুড়ি আর বেগুনভাজা খাচ্ছেন, মমতার রাজত্ব কেমন চলছে খোঁজখবর নিচ্ছেন।

আমি পলিটিক্সের প দেখলে ছুটে পালাই বলে কী, আমার ঠাকুমার মতো রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিত্ব আমি খুব কমই দেখেছি।

আশা করা যাচ্ছে আর কিছুদিনের মধ্যেই ঠাকুমা নিজে নিজে হেঁটে বারান্দায় গিয়ে নিজের বাঁধা চেয়ারটায় বসে আশেপাশের কার বাড়িতে কী হচ্ছে সে নিয়ে গোয়েন্দাগিরি ফের চালু করতে পারবেন। বারান্দায় এ ক’মাসে খেলিয়ে সংসার পেতে বসা মশাদের মধ্যে অলরেডি ত্রাহিরব উঠে গেছে।

কীসে ঘটল এই মির‍্যাকল? ফিজিওথেরাপি। ইয়েস, যেটা আপনাদের ডাক্তারবাবুরা পই পই করে আপনাদের নিয়ম করে রোজ করতে বলেছেন, কিন্তু আপনারা রোজই, ধুর আজ থাক, কাল করব বলে কাটিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের সামনের বাড়িতেও একজন চব্বিশ ঘণ্টা শুয়ে থাকা দাদু আছেন, রোজ বিকেলে তাঁকে ব্যায়াম করাতে সাইকেল চেপে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট আসেন। আমার বাবা মা তাঁর হাতেপায়ে ধরে, বলতে গেলে ধরেই এনেছেন একরকম। দুনিয়াটা কত বদলে গেছে ভাবুন, আমাদের ছোটবেলায় সরস্বতীপূজোর সকালে পুরোহিত হাইজ্যাক হতে দেখেছি, আজকাল ফিজিওথেরাপিস্ট হাইজ্যাক হচ্ছে।

সে যাই হোক, সেই থেরাপিস্ট তো এলেন। আমার ঠাকুমা সাধারণত ডাক্তারবদ্যিদের একটুও ভাল চোখে দেখেন না। আর ইনি তো অনুমতি-টনুমতির অপেক্ষা না করেই ঠাকুমার হাতপা ধরে মোচড়ামুচড়ি করতে লেগেছিলেন। বাবামা ভয়ে ভয়ে ছিলেন ঠাকুমার প্রতিক্রিয়া নিয়ে, কিন্তু আবার মির‍্যাকল! বেরিয়ে গেল ভদ্রলোকের আদি বাড়ি বরিশাল। সোনার ওপর সোহাগা, তিনি ছোটবেলায় বরিশালে ছিলেন এবং সেখানকার কিছু কিছু স্মৃতি তাঁর মনে এখনো উজ্জ্বল।

এখন প্রতিদিন সকালে ফিজিওথেরাপিস্টের আসতে দেরি হলে ঠাকুমা এক মিনিট অন্তর অন্তর দেয়ালঘড়ির দিকে তাকান, আর এসে গেলে একটুও আপত্তি না করে হাত পা কোমর তাঁর জিম্মায় ছেড়ে দেন। ছেড়ে দিয়ে নিজের মনে পুকুরভরা মাছ আর গোয়ালভরা গরু সমৃদ্ধ শৈশবের স্মৃতির জাবর কাটতে থাকেন আর থেরাপিস্টের মালিশে তাঁর জরাজীর্ণ শরীরে একটু একটু করে প্রাণসঞ্চার হতে থাকে।   


ব্যস ভালো খবর এখানেই শেষ। এবার বাজে খবর।

বাজে খবরটা হচ্ছে এত রেসলিউশন-টিউশন করার পর, প্রায় এক বছর সে রেসলিউশনে অটল থাকার পর এই উইকএন্ডে আমার আবার রাগ হয়েছিল। সান্ত্বনা যদি খুঁজতেই হয়, তবে বলা যেতে পারে রাগের রকমের খানিকটা উন্নতি হয়েছে। কাপপ্লেট ভাঙা রাগের বদলে ই-মেল ডিলিট করা রাগ। ই-মেল, চ্যাট হিস্ট্রি, ফোন মেসেজ, স্কাইপ কথোপকথন সব উড়ে গেছে রাগের ঝড়ে, শুকনো পাতার মতো।

রাগ করার অংশটুকু খারাপ হয়েছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু কথাটা হচ্ছে, ডিলিট করতে দারুণ আরাম লাগে কিন্তু। এক একবার করে ডিলিট অল-এ ক্লিক করি, পাতার পর পাতা সময় কাটানোর সমস্ত প্রমাণ উড়ে যায়, আর মনে হয় লোকটাকে বেশ পৃথিবীর বুক থেকে মুছে দেওয়া গেল। মানছি দেরাজ খুলে চিঠির বান্ডিল বার করে কুচি কুচি করাটা আরও বেশি...কী বলবো...রিয়েল? খামসুদ্ধু চিঠি, তাকে আবার ‘চিরকালীন’ করার জন্য যত পারা যায় মোটা কাগজে লেখা হয়েছে, ছিঁড়তে গিয়ে বলপ্রয়োগের চোটে মুখচোখ বেঁকে যাচ্ছে, গলা দিয়ে দুচারটে বাছাই করা বিশেষণ বেরিয়ে পড়ছে, ফ্যা-অ্যা-অ্যা-শ আওয়াজ করে চিঠি মাঝখান থেকে দুখানা হয়ে যাচ্ছে...টোটাল পয়সা উশুল। যতক্ষণে সব চিঠি ছেঁড়া হবে, ততক্ষণে আপনার দেহে রাগ করার মতো শক্তি বাকি থাকবে না। ই-মেল ডিলিট করার মধ্যে এত অ্যাকশন নেই, ওটার মধ্যে প্রতিশোধটা অনেক বেশি শীতল, তাই ব্যাপারটা অনেক বেশি নৃশংস। স্রেফ টোকা মেরে একটা লোকের অস্তিত্ব আমার জীবন (আচ্ছা আচ্ছা ইনবক্স, একই হল) থেকে মুছে দিচ্ছি, তাও আবার শুয়ে শুয়ে। ভাবা যায়?

ব্যস, এই হল আমার সপ্তাহান্তের আপডেট। এবার আপনাদের কথা বলুন। 

April 21, 2012

সাপ্তাহিকী






Stickman!

কটি অনবদ্য ব্লগের যাত্রা শেষ হল এ সপ্তাহে।

সত্যি নাকি? মাকে জিজ্ঞেস করতে হবে তো।

প্লেনে চাপার অভিজ্ঞতা। সামান্য অন্য পারস্পেক্টিভ থেকে।

গাছে চড়ার আগে মাথায় রাখবেন।'

সবজান্তা ঠাকুমা।

সবশেষে এ সপ্তাহের গান। যোগা প্যান্টস পরে অরগ্যানিক কেল স্যালাড খেতে খেতে শুনলে বেশি আনন্দ পাবেন।

একদম ওপরে ডেজো হফম্যানের তোলা ছবিতে ক্যাসিয়াস ক্লে-র (তখনও মহম্মদ আলি হননি) বজ্রঘুষির আঘাতে কুপোকাত হচ্ছেন, কারা আবার, বিটলস।

এ সপ্তাহের মতো নটেগাছ মুড়োল অবান্তরের। সোমবার আবার দেখা হবে, ততদিন আপনারা সবাই ভালো হয়ে থাকবেন। টা টা।



April 19, 2012

Genetics 101





Photo by  René Maltête

Moments of Happiness


Joanna Goddard-এর ঝকঝকে ব্লগ, A Cup of Jo থেকে ঘুরতে ঘুরতে আমি এই লেখাটায় গিয়ে উপস্থিত হলাম। হয়ে জানলাম মুনস্টার একজন আধুনিক সুইডিশ গোয়েন্দার সহকারী পুলিশম্যান। যেহেতু মুনস্টার নিজেও আধুনিক পুলিশ, তাই সে চোরডাকাত খুনিদের পিছু ধাওয়া করার ফাঁকে ফাঁকে সুখ দুঃখ প্রেম ভালোবাসা মনখারাপ নিয়ে মাথা ঘামায়। মোটা দাগের পাবলিকরা যখন রবিবার সকালে টিভি খুলে বসে হাঁ করে মহাভারত দেখে আর লুচি খায়, তখন সে বসে বসে ভাবে, সুখ কাকে বলে? ব্লিস বলে আদৌ কিছু হয় কি? ভাবতে ভাবতে মুনস্টার পাশের ঘর থেকে তার বাচ্চা ছেলেমেয়ের হাসির আওয়াজ শোনে, খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে বউকে দেখে, নিশ্চিন্তে বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে মন দিয়ে খবরের পাতা উল্টোচ্ছে। অমনি মুনস্টারের কাছে সুখের মানে পরিষ্কার হয়ে যায়।

Münster “suddenly felt pain creeping up upon him: a chilling fear, but also a realization, that this moment must pass. This second of absolute and perfect happiness—one of the ten to twelve that comprised a whole life, and was possibly even the meaning of it.”

আমিও যেহেতু নিজেকে আধুনিক বলে চালাতে ভালবাসি তাই আমাকেও ঘন ঘন সুখ দুঃখ মোক্ষলাভ নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়। কাজকর্ম চুলোয় দিয়ে যখন তখন মনের নাড়ি টিপে ধরে বসে থাকি, ঘণ্টায় ঘণ্টায় মেজাজের ভালো থাকা খারাপ থাকা মনিটর করি, জ্বর মাপার মতো।

মুনস্টারের কথা আর এই লেখাটা পড়ে আমিও মোমেন্টস অফ হ্যাপিনেস নিয়ে উৎসাহিত হয়ে পড়লাম। ৩১ বছর কেটে গেল, দশ বারোটা না হোক, একটা দুটো সুখের মুহূর্ত নির্ঘাত আমার ভাগেও জমেছে? হাতের কাজ সরিয়ে রেখে গুনতে শুরু করলাম, গুনতে গুনতে এদিক ওদিক থেকে একটা দুটো করে সুখ বেরোতে লাগল। এই বেলা অবান্তরে লিখে রাখি। এবার থেকে যখন ঘুম ভেঙে কান্না পাবে, মনে হবে কেন শুধু আমার জীবনটাই এরকম বিশ্রী, পচা, জঘন্য, আনফেয়ার, তখন যাতে ফিরে এসে দেখতে পারি। 

বান্টি বলছে সবার জীবনের প্রথম ১০ বছরের নাকি সব মোমেন্টসই হ্যাপি, কিন্তু আমি তা মানি না। না মানার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে আমি জীবনে যে ক’টা চড়চাপাটি খেয়েছি সেগুলো সব ১০ বছরের ওপারে থাকতেই খেয়েছি। সেই মোমেন্টসগুলো আর যাই হোক হ্যাপি নয় কিছুতেই। তবে একটা মুহূর্তের কথা মনে পড়ছে । সাল মনে নেই, তারিখ পয়লা বৈশাখ। সেবছর নববর্ষ পড়েছিল শনি বা রবিবার কারণ মা বাড়িতে ছিলেন। সারা সকাল সংসারের জোয়াল ঠেলে, খেয়ে উঠে একটুও দম না নিয়ে, ঊষা সেলাই মেশিন নিয়ে বসে আমার জন্য নতুন জামা সেলাই করছিলেন মা । গলগল করে ঘামছিলেন, কারণ লোডশেডিং চলছিল। আমি মেশিনের সাথে প্রায় নাক ঠেকিয়ে বসে অপেক্ষা করছিলাম, কখন জামা বানানো শেষ হবে, আমি পরে বুচিদিদিকে দেখাতে যাব। জামা বানানো শেষ হল, সবকটা বোতাম লাগানোর সময় নেই, মা চুড়ি থেকে খুলে একটা সেফটিপিন জামায় লাগিয়ে দিলেন। আমি একদৌড়ে বেরিয়ে গেলাম, মাকে একটা থ্যাঙ্ক ইউ পর্যন্ত না বলে। কাল ফোনে সেই বরাদ্দ থ্যাঙ্ক ইউ টা মাকে বলতে মা খুব একচোট হেসে বললেন, ওটা নাকি তাঁরও একটা মোমেন্ট অফ ব্লিস।

পরের সুখের মুহূর্তটা বেশ ক’বছর বাদে। মাধ্যমিক শেষ হয়েছে সবে। রেজাল্ট বেরোতে তখনও দুমাস বাকি। ছুটি লুটেপুটে নিচ্ছি। দিদিভাইদের আঁচল ধরে ঝুলোঝুলি করে মুকুটমণিপুরে বেড়াতে যাওয়া হয়েছে। আম্রপালি হোটেল থেকে রাতের খাওয়া সেরে হেঁটে হেঁটে ইয়ুথ হোস্টেলে ফিরছি সবাই। মুকুটমণিপুরের খাঁ খাঁ রাস্তা চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। ভাস্বতী দিদিভাই আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছেন, “এত স্পষ্ট কালপুরুষ দেখেছ কখনো কুন্তলা?” আমি কালপুরুষের বেল্ট থেকে চোখ না সরিয়েই মাথা নেড়ে না বলছি। আমার কাঁধ বেড় দিয়ে রয়েছে স্বাতীর হাত। পদ্মিনীটা চিরকালই কবি টাইপ ছিল, রাস্তার ধার থেকে একটা নোংরা পলাশের ডাল কুড়িয়ে দোলাতে দোলাতে গুনগুন করে গান ধরেছিল। আর কিচ্ছু মনে নেই, খালি মনে আছে আমি প্রাণপণে বলছিলাম, এই মুহূর্তটা যেন কোনদিন না ভুলি...কোনদিন না...কোনোদিন না...

আমার দোষ নেই, যত দোষ আমার ষোল বছর বয়সের।

কাট টু ক্যাম্পাস। মাঝরাত পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। KV Ground-এর সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তীর্থদা গাইছে। কী গাইছিল সেটাও এখনো মনে আছে---Where Have You Been, My Blue Eyed Son---সায়ন পাশে বসে সিগারেট খেতে খেতে গলগল করে মুখ থেকে ধোঁয়া ছাড়ছে, আর সেই ধোঁয়া প্রথম শীতের রাতের কুয়াশার সাথে মিশে গিয়ে কীরকম যে একটা ব্যাপার হচ্ছে, আমি ঠিক বলে বোঝাতে পারব না। সত্যি বলতে কী ওরকম রাত আরও লক্ষ লক্ষ এসেছিল JNUতে। কিন্তু সেই সব রাতের থেকে ওই রাতটা আলাদা ছিল কারণ আমার প্রথম প্রেমটা ভেঙেছিল সেই রাতের ঠিক এক মাস আগে। ৩০ দিন মুখ প্যাঁচার মত করে ঘোরাঘুরি করার পর সেই রাতেই আমি “ধুত্তোরি” বলে আবার ঝাড়াপাড়া দিয়ে উঠেছিলাম। গান শুনতে শুনতেই হঠাৎ বুঝে গেছিলাম, মানুষের জন্য কেঁদে লাভ নেই। কাঁদতেই যদি হয় তবে CGPA-র জন্য কাঁদা ভাল। আমার এই রিয়্যালাইজেশনের কথা শুনে তীর্থদা বব ডিলানের মতো মুখ করে বলেছিল, “এই তো আমাদের কুন্তলা বড় হয়ে গেছে।” তারপর আমরা তিনজন রাত তিনটের সময় গঙ্গা ধাবায় গিয়ে বান অমলেট খেয়ে আমার বড় হওয়া উদযাপন করেছিলাম।

আহ, যৌবন!

আপনারা বোরড হয়ে যাচ্ছেন কি খুব? হবেন না প্লিজ, মেরে এনেছি প্রায়। আমার জীবনে আর কটাই বা সুখের মুহূর্ত থাকবে বলুন। কিন্তু এই মুহূর্তটার কথা না বললে আমার এখনকার বন্ধুদের প্রতি অবিচার করা হবে। যারা প্রতি শনিবার পাণ্ডা এক্সপ্রেসের তেলে চোবানো অরেঞ্জ চিকেন দিয়ে ডিনার সারার পর আইসক্রিম খেতে খেতে আমাকে আমার হোস্টেলের দরজা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে যেত। আমি ঝুলোঝুলি করতাম, “আরেকটু পরে যেও প্লিজ” বলে, তখন সামনের বেঞ্চিটায় বসে আর একঘণ্টা গল্প করত আমার সাথে। একটু-উ একটু-উ করে আইসক্রিম মুখে পুরতাম সবাই, যাতে একসাথে থাকাটা আরও অনেকটা লম্বা করা যায়। আমরা গল্প করতাম, আমাদের আশেপাশে বসন্তরাত্রির হাওয়া ফুরফুর করে বইত। কতো গল্প। আজ থেকে দশ বছর পর কে কোথায় থাকব, যেখানেই থাকি না কেন ছুটিতে ছুটিতে তো দেখা হবেই তাই না? পরেরদিনের সিনেমা দেখতে যাওয়ার প্ল্যান হতো, সামনের সপ্তাহে ফাটাফাটি পড়াশোনা করার সংকল্প হতো, তারপর নচ্ছার আইসক্রিমটা ফস করে ফুরিয়ে যেত, আর আমরা টা টা করে যে যার ঘরে চলে যেতাম। আমি মনেপ্রাণে জানতাম, ওই বন্ধুত্বের গন্ধমাখা শনিবারের রাতগুলো যদি বড় হতে হতে আমার গোটা জীবনটাই ছেয়ে ফেলে একদিন, আমার থেকে সুখী আর কেউ হবে না।

*****

ব্যস। এইকটা। হয়তো এইকটা বলেই এত স্পষ্ট, এত সুন্দর। এই দেখুন কবেকার কথা, কিন্তু তাও আপনাদের বলতে গিয়ে মনটা কী ভালো লাগছে, মনে হচ্ছে, ভাবা যায়? আমার মতো একটা হিজিবিজি লোকের জীবনেও এত সুখের মুহূর্তরা এসেছে? যেচে? শুধু আসেইনি, আবার আমার সাথে থেকেও গেছে। আমি যেখানে যেখানে যাচ্ছি, এরা আমার মাথার ভেতর শুয়ে শুয়ে যাচ্ছে, আসছে, উঠছে বসছে, ট্যাঁ ফো করছে না। আমার একলা থাকার সময়গুলোয় সেজেগুজে এসে আমার মন ভোলাচ্ছে। গলা জড়িয়ে ভালবেসে বলছে, যে যাচ্ছে যেতে দাও, আমরা তো যাচ্ছিনা কোথাও।

আপনার সুখের মুহূর্তের গল্প বলুন আমায় প্লিজ।


April 18, 2012

অপ্রিয় সত্যি



"' . . . if you trust in yourself . . .'
'Yes?'
' . . . and believe in your dreams . . .'
'Yes?'
' . . . and follow your star . . . ' Miss Tick went on.
'Yes?'
' . . . You'll still get beaten by people who spent their time working hard and learning things and weren't so lazy. Goodbye.'"


-Terry Pratchett in The Wee Free Men

April 17, 2012

বাবার মেয়ে



বড় হয়ে কী হব সে নিয়ে ছোটবেলায় বিস্তর প্রশ্নের মুখোমুখি সবাইকেই হতে হয়। প্রশ্নটা আমার খুবই শক্ত লাগত। আমি কখনই জানতাম না বড় হয়ে আমি কী হব, কাজেই হাসিমুখে চুপ করে থাকতাম। আর লোকে ভাবত সোনা কী শান্ত আর লাজুক। কিন্তু তাঁরা যদি একটু বুদ্ধি খাটিয়ে কী হতে চাইয়ের বদলে কী হতে চাইনা সেটা জিজ্ঞেস করতেন, তাহলেই আমি এক মিনিটও না ভেবে, একটুও লজ্জা না পেয়ে উত্তরটা বলে দিতে পারতাম। যে আমি মরে গেলেও অফিসে কাজ করতে চাইনা। আমার কাছে অফিস মানে তখন ছিল লজঝড়ে লিফটে চেপে সাততলার ওপরে উঠে খোপখোপ চেম্বার, সারি সারি ডেস্ক, ক্যাঁচক্যাঁচে সিলিং ফ্যান, ফাইল ওগরানো লোহার গোদরেজ আলমারি। যেরকম অফিসে আমার মা বাবা চাকরি করতে যেতেন।

তবে সবার ছোটবেলা একরকম হয় না। অনেকের দেখেছি একেবারে উল্টোটা হয়। “আমাদের তো বাড়িসুদ্ধু সবাই ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার”---অনেক বন্ধুকে খুব গর্বিত হেসে বলতে শুনেছি। আজকাল এর সাথে আরেকটা পেশাও যোগ হয়েছে। ফিল্মস্টারের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে সবাই ফিল্মস্টার হয়। আমি বাজি রেখে বলতে পারি বেবি বি-কে কেউ কখনো বড় হয়ে কী হতে চাও জিজ্ঞেস করে উত্যক্ত করবেনা।

লিখতে লিখতে একেবারে উল্টো একটা উদাহরণ মাথায় এসে গেলো। স্কুলশিক্ষক বাবামায়ের ছেলেমেয়েরা আজকাল দৌড়ে MBA পড়তে যায় শুনেছি। সেই যে ইংরিজিতে বলে না, স্কারড ফর লাইফ? সেরকমই কিছু একটা হবে নিশ্চয়।

হোয়াটেভস। যে কথা হচ্ছিল। কেউ বড় হয়ে পেশাগত ক্ষেত্রে বাবা মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চায়, কেউ চায়না। আমি চাইতাম না। শুধু না-চাইতামই না, দশটা-পাঁচটা অফিসের চাকরির প্রতি আমার বিবমিষা একসময় এমন তীব্র ছিল আমি অ্যানাকোন্ডা সংকুল রেন ফরেস্টেও ক্যামেরা ঘাড়ে করে যেতে রাজি ছিলাম, কিংবা ল্যাগবেগে উটের পিঠে চেপে ঠা-ঠা সাহারা মরুভূমিতে পেট্রোলিয়ামের খোঁজে ঘুরে বেড়াতে, তাতে যদি কোনমতে সপ্তাহে পাঁচদিন বি-বা-দী বাগ যাওয়াটা এড়ানো যায় স্রেফ এই আশায়। 

কী করে বাবা মায়ের থেকে একেবারে অন্যরকম কিছু হওয়া যায় সেই ভেবে ভেবে আমার দিনরাত কাটত। বাবা মা যেখানে হেঁটেচলে, বাজারদোকান করে, ডাক্তারখানা গিয়ে, পাড়াপড়শির সাথে আলাপ করে বেড়াতেন, কী করে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচা যায় সেই ভেবে ভেবে আমার রাতে ঘুম আসত না। 

সে অনেকদিন আগের কথা। এই ধরুন কম করেও বছর ১০-১২ তো হবেই।

গত সপ্তাহে YouTube-এ Above Suspicion-এর একটা এপিসোড দেখছিলাম। সেখানে প্রধান চরিত্র ডিটেকটিভ কনস্টেবল অ্যানা ট্র্যাভিস। টেস্টোস্টেরন টইটম্বুর ডিপার্টমেন্টে প্রত্যাশিত প্রতিকূলতা ঠেলেঠুলে উন্নতি করছেন, গোয়েন্দাগিরির স্বাভাবিক ক্ষমতা আর নীরব গোঁ সম্বল করে। একটা কেস প্রায় একা হাতে সমাধান করার পর একেবারে ওপরতলায় অ্যানার ডাক পড়ল। করমর্দন করে বয়োজ্যেষ্ঠ অফিসার জিজ্ঞাসা করলেন, “So you are Jack Travis’ girl?”

কেলি রাইলি খুব ভালো অভিনয় করেছেন, নাকি গোটাটাই আমি কল্পনা করেছি জানিনা, কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখলাম “Yes sir” বলার সময় অ্যানার মুখে অন্যরকম একটা আলো ফুটে উঠতে। নিজের যোগ্যতা নিজে প্রমাণ করার যে আলো, সেটা নয়। মা-বাবার যোগ্য সন্তান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার যে অন্য আলোটা, সেটা।

মনে আছে একদিন তারকেশ্বরের লেডিস কামরায় বসে চেঁচিয়ে গল্প করতে করতে কলেজ যাচ্ছিলাম। সুজাতা কী যেন একটা খুব মজার কথা বলেছিল, হাসতে হাসতে সিট থেকে পড়েই যাচ্ছিলাম প্রায়। পেছন থেকে টিপিক্যাল মা দেখতে একজন ভদ্রমহিলা পিঠে টোকা মেরে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “অর্চনার মেয়ে?” আমি থতমত খেয়ে ঘাড় নাড়তে বললেন, “হাসি শুনেই বুঝেছি।” বলে আবার পেছন ফিরে গম্ভীর মুখে উল বুনতে লাগলেন।

ঘটনাটা মনে পড়লে এখন আপনা থেকেই ঠোঁটে হাসি চলে আসে আমার। এখন মাঝে মাঝে ভাবি যদি ডালহৌসির সাততলায় অফিস হতো আমার কেমন হতো তবে? আমার মা বাবাকে যারা চিনতেন, তাঁরা আমাকে হাত নেড়ে কাছে ডেকে বাকিদের সাথে আলাপ করাতেন, “এ কে বলুন তো? কল্যাণদার মেয়ে” বলে। কুন্তলা নামটা যেমন ভালো, ‘কল্যাণদার মেয়ে’ বা “মিসেস ব্যানারজির মেয়ে’ নামগুলোও আজকাল খুব প্রিয় লাগে নিজের মাথার ভেতর, কেউ ঐ নাম ধরে আর ডাকে না বলেই বোধহয়। 

April 16, 2012

ইনসেনটিভ! ইনসেনটিভ!


সেই কবে থেকে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ইকনমিস্টদের মুখে রক্ত উঠে গেলো, এতোদিনে বিশ্বাস হলো তো?




একা থাকার পেছনে



কিছুদিন আগে নিউ ইয়র্ক টাইম্‌স-এ একটা লেখা বেরিয়েছিলো। একা থাকা নিয়ে। আরো দুচারটে লেখা চোখে পড়লো এদিক সেদিক, ওই একই বিষয়ে। প্রতিটি লেখাতেই বলছে একা থাকা লোকের সংখ্যা, আরো ঠিক করে বললে, ইচ্ছে করে একা থাকা লোকের সংখ্যা নাকি সারা বিশ্বে দিনে দিনে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আমি ভয়ানক আগ্রহ নিয়ে বিস্তর সময় নষ্ট করে লেখাগুলো পড়লাম কারণ আমাকে নিয়ে তো বেশি লেখালিখি হয়না, যা হয় লোভীর মতো চেটেপুটে পড়ি। কিন্তু পড়ে আমি সত্যি বলছি, হতাশ। যে যে কারণে লোকে একা একা থাকতে চায় বলছেন বিশেষজ্ঞরা, তার সাথে আমার কারণগুলো বেশিরভাগই মেলেনি। কেউ বেশি ঘুমোবে বলে, কেউ একা একা গান গাইবে বলে, কেউ আরও বেশি করে ক্রিয়েটিভ হবে বলে নাকি একা থাকে। আমি এগুলোর একটাও চাইনা। সে না হয় হলো, যেটা নিয়ে আমার সবথেকে আপত্তি, বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন--- এককালে যা ভাবা হতো যে একাবোকা হয়ে থাকলে পাড়ার লোকে ডাকখোঁজ করবে না, শেষটা দরজার বাইরে মাদার ডেয়ারির প্যাকেট জমতে দেখে হিন্দু সৎকার সমিতিকে ফোন করবে---ঘটনাটা নাকি সেরকম একেবারেই নয়। লোকের সাথে হ্যাং আউট করার ইচ্ছে থাকলেই বরং আপনার বেশি করে একা থাকা উচিত। সংসার করেছেন কি সোশ্যাল লাইফের গলায় দড়ি। শনিবার সন্ধ্যেয় ওয়াইল্ড পার্টি করতে চান, নাকি টেঁপিকে বগলদাবা করে গানের স্কুলে যেতে? রবিবার মাথাফাটানো হ্যাং ওভার নিয়ে বেলা বারোটার সময় ঘুম থেকে উঠতে চান, নাকি রাধাবল্লভী কিনতে পাড়ার শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্নে দশটা বাজতে না বাজতে লাইন দিতে? রবিবার বিকেলে প্রদর্শনীতে গিয়ে ঠাণ্ডা পানীয়ের গেলাস হাতে লাইক মাইন্ডেড লোকজনের সাথে সন্দীপ্ত কথোপকথন করতে চান নাকি পিসিমার বাড়ির ঠাণ্ডা সিঙ্গারা আর চিমসে রসগোল্লার প্লেট হাতে সামাজিকতা সারতে?   

মোদ্দা কথা হচ্ছে চার দেয়ালের মধ্যে নিজেকে আটকে রেখে কী হবে যখন সারা পৃথিবীটা বাইরে অপেক্ষা করে আছে? চারটে বন্ধুর সাথে সশরীরে আড্ডা মেরে লাভ কী যখন ফেসবুকে চারশো ফ্রেন্ডস আপনাকে লাইক করবে বলে রেডি?

যুক্তি অকাট্য, কিন্তু আমি তাও মানতে পার না। আমি মান্ধাতার আমলের লোক, আমার একা থাকার কারণগুলোও মান্ধাতার আমলের। একঘণ্টার বেশি দেড়ঘণ্টা কাউকে সহ্য করতে পারিনা, তাই একা থাকি। সোজা কথা।   

যদিও কথাটা খুবই সোজা, তবু আমার শখ হয়েছে এই সোজা কথাটাই সাজিয়েগুছিয়ে, ঘুরিয়েপেঁচিয়ে লিখি। ওই চকচকে ম্যাগাজিনগুলো যেরকম সুন্দর করে লেখে, বুলেট পয়েন্টস দিয়ে, সেরকম। আপনারা তৈরি তো?  

আমি একা থাকি...

১। যাতে সকালে উঠে কোনো অনামুখোর খপ্পরে না পড়তে হয়।

২। যাতে সকালের খবরের কাগজের ওপর আমার প্রভুত্ব অবিসংবাদিত থাকে।

৩। যাতে ঘুমচোখে চা বানানোর সময় মনে করে করে একটা কাপে চিনি, একটা কাপে স্প্লেন্ডা, একটা কাপে দুধ---এইসব ঝঞ্ঝাট না পোয়াতে হয়।

৪। যাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দু পা গিয়ে ফোন আনতে ভুলে গেছি মনে পড়লে ফিরে এসে ফোন নিয়ে বেরিয়ে দু পা গিয়ে ফোল্ডারটা ফুটনের ওপর রয়ে গেছে মনে পড়লে ফিরে এসে তালা খুলে, ফোল্ডার আর ফোন দুটোই মনে করে নিয়ে (এবার আর কিচ্ছু ভুলছি না কিছুতেই) বেরিয়ে দু পা গিয়ে তালা দিয়েছিলাম কিনা সন্দেহ হলে আবার ফিরে এসে দরজা ঠেলে পরীক্ষা করা যায়। কেউ হাসলো নাকি বিরক্ত হলো তার তোয়াক্কা না করে।

৫। যাতে লাঞ্চের সময় প্রতিদিন কাউকে ফোন করে “খেয়েছো?” জিজ্ঞেস করতে না হয়। আরও সাংঘাতিক, রোজ ফোন তুলে “খেয়েছি” উত্তর দিতে না হয়।

৬। যাতে অফিস থেকে ফেরার সময় ইচ্ছে হলে সিনেমা দেখে, বাইরে খেয়ে ফেরা যায়, একটুও অপরাধবোধে না ভুগে।

৭। কিংবা দোলনা চেপে।  

৮। যাতে অফিস থেকে ফিরে কোনোমতে ব্যাগট্যাগ ছুঁড়ে ফেলে অবান্তরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়া যায়। কোনোরকম আজেবাজে স্মল টকে গিয়ে সময় নষ্ট না করে।

৯। ডিনারে মাঝে একবার উঠে ম্যাগি খেয়ে আবার অবান্তরে ফিরে আসা যায়। আমি খেয়াল করে দেখেছি, কাকচক্ষুর আড়ালে ম্যাগি দিয়ে ডিনার সারলে নিউট্রিশন কিচ্ছু কম পড়ে না, কিন্তু লোকের সামনে খেয়েছি কি মরেছি। অথবা মরবো অচিরেই, এই রেটে চললে। রহস্য।

১০। যাতে রাতে লাইট জ্বালিয়ে, ল্যাপটপ চালিয়ে, অর্ধেক শরীর খাটের বাইরে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখেই ঘুমের অতলে তলিয়ে যাওয়া যায়। শোওয়ার আগে দাঁত ব্রাশ করেছিলাম কিনা সে বাবদে কাউকে কোনো কৈফিয়ত না দিয়েই।

*****

আপনি কেন একা থাকেন? বা থাকতে চান? 


April 14, 2012

সাপ্তাহিকী





একেই কি বলে সভ্যতা?

হিংসে হিংসে, সব হিংসে

আর আপনি ভাবছিলেন কিনা ডায়েটিং করে আর দৌড়ে রোগা হবেন?

সুতো দিয়ে বেঁধে রাখে থুতু দিয়ে চেটে।
ভর দিতে ভয় হয় ঘর বুঝি পড়ে


আর সবশেষে এই গানটা রইলো। একটাই উপদেশ, ভিডিওটা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে বিপদে পড়বেন না যেন। আপনাদের সপ্তাহান্ত খুব ভালো কাটুক। পরের সপ্তাহে আবার দেখা হবে। টা টা। 


*একেবারে ওপরের ছবিটা আব্রাহাম অরটেলিয়াসের তৈরি পৃথিবীর মানচিত্রের। ১৫৭০ সালের

April 13, 2012

ভালো বই ভালো ছবি



JNU তে গিয়ে দেখলাম ক্যাম্পাস একটাই কিন্তু ইউনিভার্সিটি আসলে দুটো। তাদের ক্লাসরুম আলাদা, সিলেবাস আলাদা, পরীক্ষা আর গ্রেডেশনের সিস্টেম আলাদা, শিক্ষক আলাদা। সবই যখন আলাদা তখন আর ছাত্রছাত্রীই বা এক হয় কেন, তারাও আলাদা। একদল ছাত্রছাত্রী সকালবেলা উঠে দুধপাউরুটি খেয়ে গাধার মতো মোট বইতে বইতে ক্লাসে যায়, বিকেলে লাইব্রেরি যায়, রাত্তিরে ঘুমোতে যায়। অন্য ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রীদের অত ঝামেলা নেই, ইচ্ছে হলো ক্লাসে গেলাম, হলোনা গেলাম না গোছের ব্যাপার। তাদের মূল শিক্ষাদীক্ষাটা হয় সন্ধ্যের দিকে ধাবায় বসে। বেশির ভাগ ক্লাস সিনিয়ররা নেন, তবে সহপাঠীরাও শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে যখন তখন। এখানে বিষয়ের বৈচিত্র্যও অন্য দলের থেকে অনেক বেশি। প্রেম, পরনিন্দা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে শুরু করে সিনেমা, তর্ক, ইকনমিক্স।

আমি এই ভালো ইউনিভার্সিটিটার ছাত্রী ছিলাম। আমার বেশ মনে আছে, প্রথমদিনের তর্কের ক্লাসটার কথা। দাদা বললেন, ভালো আর মন্দ বলে নাকি কিছু হয়না। কিংবা সংস্কৃতি অপসংস্কৃতি। সবটাই পারসপেকটিভ। সাদা কালো বলে কিছু নেই, রিয়্যালিটি আসলে একটা গ্রে এরিয়া। যেটা বুঝতে গেলে মিনিমাম একটা গ্রে ম্যাটার মগজে থাকতে লাগে।

আমি তখনও অর্বাচীন কিনা, তাই প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, বাঃ বললেই হলো ভালো মন্দ কিছু নেই? অ্যাদ্দিন যে বাবা মা ঠাকুমা পাখিপড়া করালেন এটা করোনা, ওটা করো; এটা করলে পাপ হয়, ওটা করলে ভগবান খুশি হন; গানই যদি শুনতে চাও তো জীবনমুখীর বদলে জোহরাবাই শোনো, বইই যদি পড়তে হয় তবে বটতলা না পড়ে বরং বিভূতিভূষণ ট্রাই করো। সেগুলো বুঝি ফালতু কথা?

দাদার গভীর হতাশামাখা মুখটা আমার এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে। দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে ধীরে ধীরে তিনি বলেছিলেন, “ছি ছি ছি, এইভাবে মগজধোলাই করে একটা গোটা জেনারেশনকে গোল্লায় পাঠাচ্ছে বুর্জোয়া গার্জেনগুলো?” তারপরেই হতাশা কাটিয়ে প্রবল উৎসাহে লাফিয়ে উঠে বলেছিলেন, “কুছ পরোয়া নেই, আমরা আছি কী করতে? এতোদিন শ্রেণিশত্রুরা তোকে যা যা ভুল বুঝিয়েছে, আমরা সে সব ধুয়ে মুছে তোর মাথায় নতুন থিওরি ঢুকিয়ে দেবো। ঘাবড়াস না কুন্তলা।”

আমার প্রথম হোমওয়ার্কটা ছিলো ভালোমন্দের সঙ্কীর্ণতা অ্যান্ড এলিটিজম থেকে মুক্ত হওয়া। সেদিন রাতে ভিন্ডির ঝোল দিয়ে রুটি খাওয়া সারা হলে আমি গুটি গুটি হোস্টেলের লাইব্রেরিতে গেলাম। আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম কী বই নেবো। লাইব্রেরিতে তখনও বিশেষ ভিড় হয়নি, বর্ণালীদি সবে রেজিস্টার খুলে তারিখটারিখ লিখছে, আমি চট করে কোণের আলমারিটা খুলে সারি সারি একরকম দেখতে বইয়ের মধ্যে থেকে একটা বই তুলে নিয়ে, সেটা ইস্যু করিয়ে একছুট্টে নিজের ঘরে ফিরে এসে বিছানায় বসে হাঁপাতে লাগলাম।

সেই আমার প্রথম মিলস অ্যান্ড বুন পড়া।  মানে পড়ার মতো করে পড়া। আগে দোলনের কাছে এক দু পিস দেখেছিলাম, পাতা উল্টে নাকটাক কুঁচকে রেখেও এসেছিলাম, আবার দোলনকে ধমকও দিয়ে এসেছিলাম, “এসব কী ছাইপাঁশ পড়িস?” বলে।

যাই হোক। দাদার কথা শোনার সুফল ফললো। মিলস অ্যান্ড বুন-এর ফ্যান হয়ে যেতে আমার ওই একরাতই লেগেছিলো। (আমি এতোদিন স্মার্টলি মিলস অ্যান্ড বুনস বলতাম, এখন উইকিতে দেখছি মিলস অ্যান্ড বুন...হোয়াটেভার)। আপনি এতোদিন যেখানে যা-ই অপপ্রচার শুনে থাকুননা কেন, আমি বলছি আপনাকে, মিলস অ্যান্ড বুন অত্যন্ত ভালো বই। বিনোদনের সাথে শিক্ষার নিখুঁত মেলবন্ধন। বিচিত্র সব সিরিজ, মডার্ন, চেরিশ, ডিজায়ার, স্পেশাল মোমেন্টস, হিস্টোরিক্যাল, ব্লেজ...কিন্তু প্লটের ঐক্য চোখে পড়ার মতো। আমি এতোদিনের রিসার্চে মোটে তিনটে প্লট খুঁজে পেয়েছি। এক, কন্যের বিলিওনেয়ার বাবা উইল করে সব টাকাপয়সা উকিলের কাছে জমা রেখে গেছেন, যতদিন না মেয়ের ২০ বছর বয়স হয়। উকিলটি দিব্যি মডেলের মতো দেখতে, পয়সারও অভাব নেই, কিন্তু তাও মেয়ের উকিলকে ঘোর অপছন্দ। আজকালকার মেয়ে, কীসে যে মন ওঠে ভগবানই জানেন। দু’ নম্বর প্লট হচ্ছে ধু ধু র‍্যাঞ্চে কাউবয় আর শহুরে মেয়ের প্রেম। তিন নম্বর প্লটে, কাউবয় আর উকিলের কিছু একটা পারমুটেশন, কম্বিনেশন। আমার অত মনে নেই, আজকের কথা নাকি?  

কোণের আলমারিতে যত মিলস অ্যান্ড বুন ছিলো সে সব গোগ্রাসে পড়ে শেষ করতে আমার বড়জোর মাসতিনেক লেগেছিলো। সেটা অবশ্য আমার কৃতিত্ব নয়, অভিজ্ঞ মিলস অ্যান্ড বুন পাঠক মাত্রেই জানেন, পুরো বইটা পড়ার জন্য লেখা হয়না। ইম্পরট্যান্ট জায়গাগুলো পাতা উল্টে উল্টে পড়ে নিতে হয়। পরের লাইব্রেরি কমিটির মিটিঙে আমি নতুন মিলস অ্যান্ড বুন কেনার খাতে পয়সা ধার্য করা হোক বলে খুব গলাবাজিও করেছিলাম। সে গলাবাজি কাজে দিয়েছিলো কিনা সেটা আমার মনে নেই। উফফ বলছিনা, আজকের কথা নয়?


ছবি গুগল ইমেজেস থেকে


*****

আরও একটা ভালো জিনিসের কথা বলবো আপনাদের আজ। আমার অনেকদিনই সন্দেহ ছিলো প্রতিভার ভাগবাটোয়ারার হিসেবটা ভগবানের একেবারেই আসেনা, এই ছবিগুলো দেখে সে সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হলো। আপনার এখনো সন্দেহ যায়নি? নিজের চোখেই দেখে নিন তবে।


April 12, 2012

ঘুরে দাঁড়ানোর মরীচিকা


এই ক’দিন আগে যে বইটা পড়ে উঠলাম, ‘সাঁঝবাতির রূপকথারা’, সে বইটা নিয়ে বলতে চাইলে অনেক কথা বলা যায়। যেমন ধরুন, কী অপরূপ ভাষা, কী অদ্ভুত শব্দচয়ন, কথার ওপর কথা সাজিয়ে কী নিটোল একটা ছবি এঁকে চলা, পদ্যলিখিয়েরা যে গদ্যলিখিয়েদের থেকে ঢের ভালো গদ্য লেখেন সেটার আরও একবার হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি, কিন্তু সেসব বলবো বলে আমি আজ অবান্তরে আসিনি।

যেটা বলতে এসেছি সেটা হচ্ছে, এই বইটাতেও দেখলাম প্রেমে দাগা খাওয়ার পর একজন ভয়ানক খেটেখুটে, দিবারাত্র পরিশ্রম করে, রাতজেগে পড়ে, দুর্দান্ত রেজাল্ট করে ফেললো। স্রেফ ছেলেটিকে ভুলবে বলে। প্রেমে পড়ার আগে, আর প্রেম ভাঙার পরে, মেয়েটি যেন দুটি সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ। আগে সে কল্পনাপ্রবণ, রোম্যান্টিক, হয়তো খানিকটা ছেলেমানুষই। আর পরে সে-ই মেয়েই দুনিয়াদার, নিজের ভালো নিজে বোঝা, পরিশ্রমী, একবগগা, নিজলক্ষ্যে স্থির, অচঞ্চল।   

ইকনমিকসে যাকে বলে স্ট্রাকচারাল ব্রেক---একটা ঘটনা, একটা দুঃখ, একটা হৃদয়ভঙ্গ, মানুষের জীবনে শুনেছি সেরকম একটা ব্রেক এনে দিতে পারে। শুধু সাঁঝবাতির জীবনে নয়, আরও অনেকের জীবনে এরকম হয় পড়েছি। দেখেছি, শুনেছি। একটা বক্তৃতা শুনে কেউ জীবনের মায়া ত্যাগ করে বিপ্লবের আগুনে ঝাঁপ দিয়েছে, একটা পরীক্ষায় ফেল করে কেউ শপথ নিয়ে পরের প্রত্যেকটি পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে, প্রেমিকা দাগা দেওয়ার পর আদা নুন খেয়ে লেগে সাফল্যের শীর্ষে আরোহণ করেছে। শুধু দেখিয়ে দেবে বলে। 

শুধু অচেনা অ্যানেকডোটস নয়, আমার চেনা অনেক বন্ধুবান্ধবও বলেছেন, “ওই রাতটা”, “ওই গানটা”, “ওই পরীক্ষার ওই রেজাল্টটা”... “আমার জীবন বদলে দিয়েছে।” ভালোর দিকে। অসহায়তার জায়গায় উদ্যম এনে দিয়েছে, অদৃষ্টবাদের বদলে পুরুষকারের জন্ম দিয়েছে। যেখানে কিছু ছিলো না, সেখানে এসে বাসা বেঁধেছে জেদ, নিষ্ঠা, তাগিদ, কঠোর পরিশ্রম।

অনেককে তো বলতে শুনেছি, ভাগ্যিস খারাপ জিনিসটা ঘটেছিলো জীবনে।

এসব শুনে কী যে উত্তেজনা হয় আমার কী বলবো আপনাদের। রক্ত গরম হয়ে ওঠে। মনে হয়, আছে আছে আশা আছে! এই ল্যাপাপোছা জীবন থেকে পালানোর সবকটা পথ এখনো রুদ্ধ হয়ে যায়নি। এক একটা প্রেমে ব্যর্থ হই, এক একটা পেপারে বি মাইনাস আসে, আর আমি ক্রমশ চাঙ্গা হয়ে উঠতে থাকি। এই বার! এই বার! এই বার কুন্তলার ভেতরের আগুন জেগে উঠবে। আজ রাতে যে কুন্তলা ঘুমোতে যাচ্ছে, কাল সকালে তার জায়গায় আনকোরা নতুন একটা কুন্তলা হাই তুলে, আড়মোড়া ভেঙে খাট থেকে নামবে।

আর নেমেই বিশ্বজয়।   

*****

এরপরের বাক্যটা কী হতে চলেছে সেটা নিশ্চয় আপনারা অলরেডি বুঝে ফেলেছেন, আমার আর বানান করে লিখে দেওয়ার দরকার নেই। নিজের জীবনে স্ট্রাকচারাল ব্রেকের অপেক্ষা করে করে আমি সিরিয়াসলি শ্রান্ত, ক্লান্ত, বীতশ্রদ্ধ। আমি জানিনা আমার ভেতরের আগুন জ্বালানোর জন্য আর ঠিক ক'টা ব্যর্থতা দরকার। আর ঠিক ক'টা প্রত্যাখ্যান আমাকে আমার এই অর্থহীন অস্তিত্বের ভেতর থেকে কলার ধরে হিঁচড়ে টেনে বার করে আনতে পারবে, আমার জানা নেই। 

সত্যি বলছি, আর জানার আশাও নেই। চাইও না। তার থেকে আমি বরং বসে বসে বাকি সব সফল লোকেদের ব্যর্থতার রূপকথা শুনবো। আমার চোখের সামনে দিয়ে লাইন দিয়ে সব শুঁয়োপোকা প্রজাপতি হয়ে যাবে, হাঁ করে চেয়ে চেয়ে দেখবো।

জঘন্য।


হোয়াটেভস। নিজের কাঁদুনি অনেক হলো, আপনাদের কথা বলুন। আপনার জীবনে এরকম স্ট্রাকচারাল ব্রেক এসেছে কখনো? সে ব্রেকের আগে আপনি কীরকম ছিলেন, আর এখনই বা কীরকম হয়েছেন? গল্পটা বলুন প্লিজ আমায়। শুনে আমি আপনাকে একটুও হিংসে করবো না, কথা দিচ্ছি। অন গড ফাদার মাদার।

April 10, 2012

ভালো গোয়েন্দা মন্দ গোয়েন্দা


কেমন আছেন? কেমন কাটলো আপনাদের সপ্তাহান্ত? কী কী খেলেন? কোথায় কোথায় ঘুরলেন? কী কী সিনেমা দেখলেন?

আমার উইকএন্ড যেমন কাটার কথা ছিলো তেমনি কেটেছে। শুয়ে বসে, মাথা চুলকে, কোথাকার জল কোথায় গড়াচ্ছে বস, কিচ্ছু ভেবে না পেয়ে। পিসফুল। কুলকাল। এক গত শুক্রবার রাত্তিরে FFC তে L.A. Confidential দেখানো নিয়ে বান্টির সাথে কিঞ্চিৎ গলাবাজি বাদ দিলে। 

L.A. Confidential-এর দোষটা কী? না একে হলিউড, তায় গোয়েন্দাগিরি। গোয়েন্দা গল্পের প্রতি লোকজনের এই অসীম অবজ্ঞাটা আমি সিরিয়াসলি বুঝে উঠতে পারিনা। গোয়েন্দা সিনেমা নাকি সিনেমাই নয়, গোয়েন্দা গল্প নাকি সাহিত্যই না। 

"ইন ফ্যাক্ট, ওটা সাহিত্যের নামে কলঙ্ক।"            

সে হতে পারে, কিন্তু আমার গোয়েন্দা সিনেমা দেখতে ভালোলাগে, গোয়েন্দা গল্প পড়তে ভালোলাগে। এতোটাই ভালোলাগে যে আমি আমার ইমেজ, সমাজ, সংসার, পুলিস---কিচ্ছুর তোয়াক্কা না করে বিকেলবেলা মিলেনিয়াম পার্কে বসে তার গলা জড়িয়ে তাকে চুমু খেতে পারি।

শুধু আমি কেন, আমার ধারণা অনেকেই পারে। 

গোয়েন্দাগল্পের মধ্যেই এই ব্যাপারটা আছে যে, চরম অবহেলা, লাঞ্ছনা, অপমান সয়েও সে যুগে যুগে, দেশে দেশে, কালে কালে চুম্বকের মতো নিজের চারপাশে পাঠকদের টেনে এনেছে। মক্ষিরানি যেমন চাকশুদ্ধু মৌমাছিকে নিজের মধুবলয়ের গণ্ডির ভেতর বেঁধে রাখে, পল্টুদা যেমন নিত্যনতুন চুটকি বলে বলে গোটা পাড়ার বেবাক কিশোরীর বৈকালিক মনোযোগ পকেটে পুরে রাখে, ঠিক তেমন। এবং একা গোয়েন্দাগল্পই এটা পারে। চারপাশে তাকিয়ে দেখুন, নিমেষে তিন চারটে গোয়েন্দাগল্পের পোকা বেরিয়ে পড়বে, কিন্তু মহাকাব্যের পোকা? ভ্রমণকাহিনির পোকা?

ওসব হয়না। ওসব সোনার পাথরবাটি।    

এই অন্ধ আনুগত্যের বদলে অবশ্য গোয়েন্দাগল্পকে তার পাঠকদের অনেক কিছু দিতে হয়। তাদের অজস্র বায়নাক্কা সামলাতে হয়। ‘সাহিত্য’ আমাদের মগজে না ঢুকতে পারে, কিন্তু তা বলে সাপব্যাঙ যাতা কিছু একটা লিখে আমাদের মাথায় টুপি পরানোর সাধ্য শিবের বাবারও নেই। আমাদের কষ্টিপাথর অতি নির্মম, মানদণ্ড অতি সূক্ষ্ম। তিলমাত্র গোঁজামিল আমাদের কাছে ক্ষমার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়, প্রতিভার চুলচেরা উনিশবিশ আমাদের চোখে পর্বতপ্রমাণ হয়ে ধরা পড়ে।     

তাছাড়াও ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ, বাছবিচার তো আছেই। কারো খুন চাই, কারো একাধিক খুন চাই, কারো অতি চালাক ডিটেকটিভের প্রায় হাবাগোবা স্যাঙাৎ চাই, কারো ধুতি পরা ডিটেকটিভ চাই, কারো সিগারেট খাওয়া ডিটেকটিভ চাই, কারো একেবারে প্রখর রুদ্র না হলে মন ওঠে না। আরও কতরকম যে আছে, এই মুহূর্তে মনে আসছে না। তবে একজায়গায় এক ছুঁৎমার্গী পাঠকের কথা পড়েছিলাম, যিনি নাকি প্রায় শেষ হয়ে আসা ভিক্টোরিয়া আমলের ছোঁয়াচলাগা ইংল্যান্ডের গ্রামের পটভূমিকায় রচিত না হলে, আর সে গল্পে চার্চ না থাকলে, আর সাসপেক্টদের মধ্যে সে চার্চের ভিকার না থাকলে, সে গোয়েন্দা গল্প পড়তে পারতেন না।     

আমার এতো প্যাকনা নেই বাবা। একটা পাতে দেওয়ার মতো গোয়েন্দা আর চার পাঁচটা রক্তাক্ত মৃতদেহ হলেই, আর শেষের দুতিন পাতার আগে মোটামুটি কিছু টের না পাওয়া গেলেই, ব্যস। আমার চলে যাবে। 

কিন্তু সেটুকুও কি শান্তিতে পাওয়ার জো আছে? কয়েকদিন আগে হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে মনে হলো, যদি বড় হয়ে গোয়েন্দাগল্প লিখে বিশ্বজয় করতেই হয়, তাহলে বোধহয় ওই ভিক্টোরিয়া আমলের ইংল্যান্ডের গ্রামের চৌহদ্দি থেকে আমারও বেরোনোর দরকার আছে। কনটেম্পোরারি বিশ্বগোয়েন্দাসাহিত্যে কোথায় কী হচ্ছেটচ্ছে, কে কী লিখছেটিখছে, অ্যাওয়ার্ড-শ্যাওয়ারড পাচ্ছেটাচ্ছে এসব একটু সমীক্ষা করে দেখা দরকার। মনে আসা মাত্র আমি পয়েন্টটা ছোট্ট নোটবুকটায় টুকে রাখলাম, (যেটা আজকাল রোজ মনে করে রাতে মাথার পাশে নিয়ে শুচ্ছি পাছে স্বপ্নের মধ্যে মাস্টারপিসের আইডিয়া এলেই ফস করে লিখে রাখতে পারি) যাতে সকালে উঠে ভুলে না যাই। পরদিন উঠে লাইব্রেরিতে একটা প্রাইজ পাওয়া আধুনিক গোয়েন্দা গল্পের অনুরোধ পাঠিয়ে দিলাম, সে বই দুদিনের মধ্যে B-এর র‍্যাকে ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ ট্যাগ লাগিয়ে হাজিরও হয়ে গেলো।    

সে বই পড়ে আমার যে কী দশা হলো কী আর বলবো আপনাদের। প্রথম পাঁচ পাতার মধ্যে সেই যে একখানা খুন হলো, তারপরের আড়াইশো পাতা ধরে চললো সেই নিয়ে ভ্যানতাড়া। শহরসুদ্ধু লোকের সাইকোলজিক্যাল সমস্যার নাড়িনক্ষত্র জানা হয়ে গেলো, তিনজোড়া প্রেম, একজোড়া এক্সট্রাম্যারিটাল, হেড গোয়েন্দার বিবাহবিচ্ছেদ, বিচ্ছেদোত্তর ডিপ্রেশন, সবের প্যাঁচাল পড়তে হলো বসে বসে। তার মধ্যে আবার প্রাকৃতিক বর্ণনা, ভাষার কারুকার্য, স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, ফ্যান্টাসি, প্রলাপ। লেখিকার কলমের কারিকুরি দেখতে হলো বসে বসে।

একেবারে যাচ্ছেতাই। ছ্যা ছ্যা।

যদি কালোর ভেতর ভালো কিছু খুঁজে বার করতেই হয়, তাহলে বলবো বইটা পড়ে আমার একটাই লাভ হয়েছে---আমি নিজে পাঠক হিসেবে গোয়েন্দাগল্পের থেকে ঠিক কী চাই, সেটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। প্রেম চাইনা। চাইলে টুইলাইট পড়বো’খন। কবিতা চাইনা, সেটা পাওয়ারও অন্য জায়গা আছে। আমি চাই হাড়হিম করা শয়তানি। খুন, জখম, রক্তারক্তি। আর চাই একজন তীরের ফলার মতো সোজা মানুষ। ভালোমন্দ, ঠিকবেঠিক, উচিতঅনুচিতের দ্বন্দ্বহীন একজন মানুষ, যিনি সেই শয়তানি আর শয়তানকে ঢিট করবেন। যাকে দেখতে আর পাঁচটা রক্তমাংসের মানুষের মতই হবে, কিন্তু যিনি আর পাঁচটা রক্তমাংসের মানুষের থেকে আলাদা হবেন। যিনি পয়সার জন্য নয়, সত্যের জন্য রহস্যের পিছু ধাওয়া করবেন। যিনি প্রেমকে ক্ষমার চোখে দেখবেন, কিন্তু নিজে ফস করে সাসপেক্টের প্রেমে পড়ে যাবেননা। যিনি দয়ালু হবেন, কিন্তু দুর্বল কক্ষনো হবেন না। তাঁর OCD থাকতে পারে, কিন্তু তাই বলে অন্যায়ের প্রতি পক্ষপাত? মরে গেলেও না।

এসব লিখেটিখে মনে হচ্ছে, কে জানে হয়তো সত্যিই আমি সাহিত্যচর্চা করার জন্য গোয়েন্দাগল্প পড়ি না। কেউই হয়তো পড়ে না। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন প্রত্যক্ষ করার আমাদের যে গভীর অবচেতন আকাঙ্ক্ষা; খারাপ আর বদমাশ লোকদের, গায়ের জোর না খাটিয়ে, অহিংস উপায়ে মেরে ঠাণ্ডা করে দেওয়ার আমাদের যে আজীবনের সাধ, সেটা মেটাতে পড়ি। অহিংস, কাজেই জেমস বন্ড চলবে না। মগজাস্ত্র নয়তো উলের কাঁটা সম্বল করে খুনি ধরে দিতে হবে আমাদের, তবে না বুঝবো কত বড় গোয়েন্দা? তাই বলে আবার একেবারে পার্থমেসো আর বুমবুমকে নিয়ে আলুপোস্ত সংসারও যেন কেমন কেমন। তাই না? আমার আদর্শ গোয়েন্দা হবেন এর মাঝামাঝি। সাধারণ লোকের ভিড়ের মাঝে মিশে থাকবেন, কিন্তু যার ওয়াক, হাইট, লুক, কুছ ভি অরডিনারি লোকের মতো না হোবে।   


ছবি Google Images থেকে


ব্যস, আমার মূল্যবান মতামত শেষ, এইবার আপনাদের পালা। আপনি কেন রাত জেগে গোয়েন্দাগল্প পড়েন? আপনার লেখা গোয়েন্দাগল্পের নায়ক কেমন হবেন?

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.