October 31, 2013

The Man Who Planted Trees



আজকের ভিডিওটার দৈর্ঘ্য সামান্য বড়। পুরো তিরিশ মিনিট আট সেকেন্ড। তবে যদি খেয়াল রাখেন যে এটা আসলে একটা ছোট গল্পের চিত্ররূপ, তাহলে এটাকে একটি মিনি সিনেমা বলে ধরে নিতে পারবেন, আর দৈর্ঘ্যের ব্যাপারটাও জাস্টিফাই করতে সুবিধে হবে।

গল্পটা আসলে ফ্রেঞ্চে লেখা, নাম L'homme qui plantait des arbres লেখকের নাম Jean Giono। গল্পের স্থান আল্পসের পায়ের তলার এক উপত্যকা, কাল বিংশ শতাব্দীর শুরু, পাত্র এক রাখাল।

রাখাল বলতে যে চেহারাগুলো আমাদের মনে ভেসে ওঠে, এক, দুষ্টুমিষ্টি বাচ্চা ছেলে মাঠে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে নয়তো মিছিমিছি ‘বাঘ! বাঘ!’ বলে চেঁচিয়ে লোক ডেকে আমোদ পাচ্ছে, (যদিও এ বেচারা রাখালের পরিণতিটা বিশেষ আমোদজনক নয়) আমাদের গল্পের রাখাল এ দু’জনের একজনের মতোও নয়।

বান্টি কোকের বোতলে চুমুক দিয়ে বলল, 'রাখাল বলতে তোমার খালি এই চেহারা মনে পড়ে? আর এরপরেও তুমি নিজেকে বাঙালি বুদ্ধিজীবী বলে দাবি কর?' আমি খানিকক্ষণ ভ্যাবাচাকা খেয়ে থাকলাম, তারপর মনে পড়ে গেল। বান্টি সেইসব মধ্যরাত্রির রাখালদের কথা বলছে, রবীন্দ্ররচনাবলীতে লাথি মেরে যারা কলকাতা শহরের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছে।

উঁহু, আমাদের গল্পের রাখাল এঁদের মতোও নন। ইন ফ্যাক্ট, আমাদের রাখালের একটা গল্পের নায়ক হয়ে বসার কোনও অধিকারই ছিল না, যদি না তিনি একটা গোটা বন নিজের হাতে বানিয়ে ফেলতেন। বন, বন থেকে গ্রাম, জনপদ, শহর ইত্যাদি ইত্যাদি।

আশা করি আপনাদের সিনেমাটা দেখতে ভালো লাগবে। গল্পের লেখকের কাছে আমার খালি একটাই অভিযোগ আছে। শেষের দিকটায় এতবার গড-কে ডেকে এনে, একটি রক্তমাংসের মানুষের প্রাপ্য ক্রেডিট গডের পায়ে সমর্পণ করার চেষ্টাটা না করলেই পারতেন। বিশেষ করে যখন সেই মানুষটার বাড়ির পাশে হইহই করে চলা মহাযুদ্ধের প্রসঙ্গে একটিবারও গডের ‘গ’ পর্যন্ত তিনি দাঁতের ফাঁক দিয়ে বার করেননি। যুদ্ধের ডিসক্রেডিট সব মানুষের, আর ভালো ভালো জিনিসের ক্রেডিট সব গডের, এ যুক্তিটা বোঝা সত্যি ভীষণ কঠিন।
   



October 30, 2013

জেঠু, গোবিন্দ আর পুঁটের গল্প



লাক্ষাদ্বীপ-জেঠুকে আমরা সবাই জেঠু বলে ডাকতাম বটে, কিন্তু দাদু ডাকলেও খুব বেমানান কিছু হত না। বছর দুয়েক আগে, প্রায় একশো বছর কমপ্লিট করে জেঠু মারা গেছেন। যৌবনে লাক্ষাদ্বীপে চাকরি করতে গিয়েছিলেন, সেখানেই সংসার পেতে, ছেলেমেয়ে মানুষ করে, শেষকালে আমাদের বাড়ির উল্টোদিকে এসে ঘাঁটি গেড়েছিলেন। জেঠুর সঙ্গে এসেছিলেন জেঠিমা, তাঁদের মেয়ে, মেয়ের জামাই, ছোটছেলে, ছোট ছেলের বউ। মেয়ে উত্তরপাড়ায় ফ্ল্যাট কিনে সংসার পাতল, ছোটছেলে বউসহ এবাড়িতেই থাকল। জেঠুর বড়ছেলে লাক্ষাদ্বীপের মেয়ে বিয়ে করে ওখানেই সেট্‌ল্‌ করেছে, তার আর এদিকে আসার আশা নেই।

কোনও বছর পুজোয় বাড়িতে থাকলে জেঠুজেঠিমাকে বিজয়ার প্রণাম করতে যেতাম। জেঠুর তখন বয়স নব্বই পেরিয়ে গেছে। শরীর গেছে, মাথারও যেতে বিশেষ বাকি নেই। প্রণাম সেরে, দাঁতভাঙা নাড়ু চুষতে চুষতে একঘণ্টা ধরে তাঁর শরীরের বিভিন্ন জায়গার বিভিন্ন রকম ব্যথাবেদনার বিবরণ শুনতে হত। পুরোটাই যে বাধ্যবাধকতা তা নয়। ব্যথার কথা শেষ হলে জেঠু ঝুলি থেকে আরও নানারকম ইন্টারেস্টিং গল্প বের করতেন। তাদেরই অপেক্ষায় বসে বসে টাইমপাস করা আর কি।   

‘তোমরা তো সব ছেড়েছুড়ে চলে গেলে, এদিকে পাড়ায় যে কী সব হচ্ছে সে তো খবর রাখ না।’

এই তো। ‘কী হচ্ছে জেঠু?’

জেঠু হুইলচেয়ার থেকে শরীরের ঊর্ধ্বাংশ অতি কষ্টে আমার দিকে ঝোঁকানোর চেষ্টা করতেন। বুঝতাম, কানে কানে কিছু বলার বলার চেষ্টা করছেন। আমি চেয়ারের পায়ার ওপর ভর দিয়ে কান এগিয়ে দিতাম জেঠুর মুখের কাছে।

‘আমাদের রমণী চক্কোত্তি আর ঘোষগিন্নি, আরে ওই যে তোমাদের পাশের বাড়ির ঘোষগিন্নি...’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝেছি বুঝেছি।’

‘প্রেম করছেন।’ জেঠুর মুখ অভক্তিতে কুঁচকে যেত।

অট্টহাস্যের ছিপিটা পেট থেকে ছিটকে বের হওয়ার আগেই আমি টপ্‌ করে নাড়ুটা মুখে পুরে দিতাম।

‘রোজ সকালে প্ল্যান করে একসঙ্গে মর্নিংওয়াক করতে বেরোয়। ভাবে কেউ বুঝি টের পায় না। আমি তো বারান্দায় বসে বসে সব দেখি।’

আমি প্রাণপণে নাড়ু চুষতাম। রমণীবাবু হচ্ছেন পাড়ার আরেকজন প্রবীণ জ্যাঠামশাই। আমাদের জেঠুর থেকে বছর বিশেকের বেশি ছোট হবেন না। আর ঘোষগিন্নিরও বয়স ষাটের ওপারেই হবে। নিয়মিত ফেশিয়াল করে গালের চামড়া টানটান রেখেছেন।

আমাকে ভুল বুঝবেন না, বুড়ো হলেই যে প্রেম হতে পারবে না, এরকম কোনও ধারণা আমার নেই। বরং বুড়োবয়সেই যে প্রেম জমে ভালো সে আমার বিলক্ষণ জানা আছে। কিন্তু তাও কেন আমাকে অত কষ্টে হাসি চাপতে হত সেটা বুঝতে গেলে আপনাদের আমাদের পাড়ায় গিয়ে শ্রী রমণী চক্রবর্তী এবং শ্রীমতী ঘোষকে (ঘোষজেঠিমার ভালো নামটা কাল সকালে ঠাকুমাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করব) একবার স্বচক্ষে দেখতে হবে।

বুড়ো বয়সে তো দূর অস্ত, আমি বিশ্বাস করি না এঁরা কেউ নিজেদের টিনএজেও প্রেম করেছেন বা প্রেমে পড়েছেন। রমণীমশাই নিজের থেকে গরিব লোক দেখা মাত্র যেরকম নির্বিবাদে তুইতোকারিতে নেমে আসেন আর ঘোষজেঠিমা যেমন তেজে ‘ওরে পাম্পটা চালা রেএএএ’ হাঁক পেড়ে জীবনের প্রত্যেকটা দিন শুরু করেন, তাতে প্রেমট্রেম ইত্যাদি সুকোমল ব্যাপারে তাঁদের কারোরই কখনও কোনও উৎসাহ ছিল বলে আমি বিশ্বাস করি না।

কিন্তু লাক্ষাদ্বীপ-জেঠু করতেন। তিনি মনেপ্রাণে জানতেন, রোজ সকালে এই যে ঘোষজেঠিমা আর রমণীবাবু মর্নিংওয়াক করতে বেরিয়ে তাঁর বারান্দার সামনে একে অপরকে ক্রস করছেন, একে অপরের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যবোধে টুক্‌ করে মাথা হেলাচ্ছেন, এ সবের পেছনে রয়েছে অবৈধ অসৈরন প্রেমের নির্লজ্জ বেহায়াপনা।

‘যাকগে, যে যা খুশি করছে করুক, আমার আর কদ্দিন।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দাদু হুইলচেয়ারের পিঠে এলিয়ে পড়তেন।

‘ছেলের বউ তো অলরেডি খেতে দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে...”

এই রে। আমি লাফ মেরে উঠে পড়তাম। এইবার জেঠুর প্রলাপ আমোদ ছাড়িয়ে গোলমেলে এলাকায় ঢুকে পড়েছে। ‘আচ্ছা জেঠু আসি?’ বলে গলা তুলে ‘জেঠি এলাম, বৌদি এলাম’ ঘোষণা করে গেট খুলে পগারপার।

জেঠু যাঁকেই সামনে পেতেন বলতেন। খবরের কাগজওয়ালা, দুধওয়ালা, ডাক্তারবাবু, কাজের মাসি, মিটার চেক করতে আসা ইলেকট্রিক অফিসের কর্মচারী, ফিজিওথেরাপিস্ট গোবিন্দ।

ছেলের বউ খেতে দেয় না, ছেলে কথা বলে না। আমার পেনশনের টাকা তো আমি চোখেই দেখতে পাই না, সব ওরা নিয়ে নেয়। বাঁচলাম কি মরলাম খোঁজ নেওয়ার বেলায় মেয়ের দেখা নেই, খালি বলে বাড়ি আমার নামে লিখে দাও।  

আর এমন সিরিয়াস মুখ করে বলতেন যে বিশ্বাস না করার কথা কারওর মাথাতেই আসবে না। বিশেষ করে যারা রমণীবাবু-ঘোষগিন্নির প্রেমের উপাখ্যান না শুনেছে তাদের মাথায় তো আসবেই না। আমি নিশ্চিত অনেকেই জেঠুর কথা অক্ষরে অক্ষরে বিশ্বাস করত। নিজেদের মধ্যে জেঠুর ছেলেমেয়ের পিণ্ডি চটকাত। বলত, সারাজীবন নিজের সমস্ত সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে, গলায় রক্ত তুলে, ছেলেমেয়ে মানুষ করার প্রতিদান তো এই।   

জেঠু যখন মারা গেলেন তখন আড়ালেআবডালে দু-একজন বলেওছিল, মরে বেঁচেছেন। সংসারে যা অবহেলা সয়েছেন। আমরা যারা রমণীবাবু-ঘোষগিন্নির গল্পটা খোদ জেঠুর মুখ থেকে শুনেছি, তারা ফিসফিসানিগুলো শুনে শিহরিত হয়েছিলাম। দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে বলেছিলাম, কি ভাগ্যিস জেঠু সেলিব্রিটি নন। তাহলে আর দেখতে হত না।

যেমন ধরা যাক, জেঠু যদি এককালের নামকরা ফুটবলার হতেন। বিস্মৃত, বঞ্চিত, ইন্ডিয়ান নির্বাচকদের অ্যান্টি-বাঙালি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে সারাজীবন ক্লাবস্তরে খেলে যাওয়া ফুটবলার নন, সারা ভারতের ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করা ফুটবলার। নস্ট্যালজিয়া কলামে যদি নিয়মিত কোনও না কোনও কেউকেটার বকলমে জেঠু-সংক্রান্ত স্মৃতির চর্বিতচর্বণ ছাপা হয়ে বেরত, তাহলে জেঠু মারা গেলে পর এই ফিসফিসানিগুলো কী চেহারা নিত?

উদাহরণের খাতিরে ফিজিওথেরাপিস্ট গোবিন্দর কথাই ধরা যাক। কেরিয়ারের একমাত্র সেলিব্রিটি ক্লায়েন্ট মারা যেতে গোবিন্দ দুঃখে একেবারে কাতর হয়ে পড়ত নিশ্চয়। মনের দুঃখ কাকে বলবে ভাবতে ভাবতে গোবিন্দের মাথায় হঠাৎ ঝিলিক খেলে যেত। কেন ওপাড়ার পুঁটেই তো আছে।

পুঁটের গল্পটাও ইন্টারেস্টিং। পটল দিয়ে শিঙিমাছের ঝোল খাওয়া মার্কা চেহারা, গোঁফের রেখা বেরোনর আগে থেকেই পাড়ার দেওয়ালপত্রিকায় তেড়ে বিরহের কবিতা লিখত। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, হঠাৎ একদিন শুনেছিলাম পুঁটে চাকরি পেয়েছে। উৎফুল্ল প্রকাশনীতে।

পাড়ার অনেকেরই চোয়াল মাটিতে ঠেকে গিয়েছিল। করেছে কি ছোকরা? দেওয়ালপত্রিকায় বিরহের কবিতা লিখে লিখে হাত পাকিয়ে সোজা উৎফুল্ল? পশ্চিমবাংলার সংস্কৃতির যাবতীয় ভাতকাপড়ের দায়িত্ব যারা নিজেদের কাঁধে বহন করে নিয়ে চলেছে, সেই উৎফুল্লে? প্রাথমিক শকের ভাবটা কেটে গেলে কেউ কেউ ব্যাপারটা সম্বন্ধে তলিয়ে খোঁজ নিয়েছিল। মুখ বেঁকিয়ে বলেছিল, আরে উৎফুল্ল মানে শনিবার শনিবার উৎফুল্লের যে সাপ্লিমেন্টটা বেরয়, যাতে যত রাজ্যের বানিয়ে বানিয়ে লেখা ব্যক্তিগত চিঠি আর ‘কান মুলছি/মুলতে চাই’ কলামগুলো ছাপে, পুঁটে চাকরি পেয়েছে সেই ডিপার্টমেন্টে।

সে নিন্দুকেরা যে ভাবেই ব্যাপারটা দেখুক না কেন, আমরা পুঁটের উন্নতিতে খুশিই হয়েছিলাম। বেশির ভাগ সময়েই লেখার নিচে বাই-লাইন থাকত না, কিন্তু আমরা কাগজ হাতে পেয়েই এ সপ্তাহে কোনটা পুঁটের লেখা সেটা চিহ্নিত করার খেলা খেলতাম নিজেদের মধ্যে। বিরহ নিয়ে কথাবার্তা থাকলে সাধারণত ধরে নেওয়া হত যে ওটাই পুঁটে লিখেছে। আফটার অল, ছোটবেলা থেকে বিরহ পুঁটের স্পেশালিটি।

গোবিন্দর সমস্যার এদিকে সমাধান হয়ে গেছে। জেঠুর সৎকারের পরদিন সকালেই এক নন-সেলিব্রিটি ক্লায়েন্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যান্সেল করে বাইক ভটভটিয়ে সে হাজির হল পুঁটের বাড়িতে। পুঁটে তখন তেল মেখে গামছা পরে বারান্দায় বসে উৎফুল্লের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকাশনীর দৈনিকে চোখ বোলাচ্ছিল, ওপাড়ার ঘুঁটে এ দৈনিকে চাকরি পাওয়ার পর থেকে পুঁটে বাড়িতে এটা রাখতে শুরু করেছে। এমন সময় অতিথি দেখে পুঁটের মেজাজ গরম হয়ে গেল। অফিসটাইমে কারা যে লোকের বাড়িতে খেজুর করতে আসে, ইনসেনসিটিভ কোথাকার। কিন্তু মুখের ভাব মনে গোপন করে, যথাসাধ্য পরিশীলিত কণ্ঠে পুঁটে জিজ্ঞাসা করল, ‘আরে গোবিন্দ যে? কী ব্যাপার? কী চলছে?’

গোবিন্দ চাবি ঘুরিয়ে বাইক থেকে নেমে গটগটিয়ে বারান্দায় উঠে এল। পুঁটে কাগজ খামচে ধরে অজান্তেই দু’পা পিছিয়ে গেছে। ছোটবেলা থেকেই গোবিন্দর ব্যায়ামে ঝোঁক, অতর্কিতে মুভ করলে পুঁটের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে না। গোবিন্দ মুখের পেশী কংক্রিটের মতো জমাট রেখে বলল, ‘স্কুপ আছে।’

হোয়াট? পুঁটের এবার হাসি পেয়ে গেছে। এ'রকম পাবলিকের কথা সহকর্মীদের কাছে পুঁটে শুনেছিল বটে। রাইটার দেখলেই নিজের জীবনের প্লট শোনাতে চায়, জার্নালিস্ট দেখলেই স্কুপের সন্ধান দিতে চায়। তবে ওর কাছেও যে লোকে স্কুপ দিতে আসতে শুরু করেছে এইটা ভেবে পুঁটের একটু একটু গর্বও হল।

গোবিন্দ পুঁটের তরফ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা করেই গড়গড়িয়ে নিজের স্কুপ বলে গেল। পুঁটে মুখ হাঁ করে পুরোটা শুনল, তারপর ঘুঁটের কাগজ কুচিমুচি করে গোল্লা পাকিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে গোবিন্দকে পাঁজরে টেনে নিল।

‘স্কুপ বলছ কী বস্‌, কেচ্ছা বল, কেচ্ছা! বস বস, কী খাবে বল, ঠাণ্ডা গরম?...আরে তা বললে কী করে হবে, এতদিন পর এলে। এই বুঁচি, চায়ের জল বসা তো...’

তারপর তো শুধু সময়ের অপেক্ষা। বাকি সব স্টোরি থামিয়ে রেখে কাগজশুদ্ধু লোক পুঁটের স্টোরির পেছনে পড়ল। গোবিন্দর ইন্টারভিউ নিল পুঁটে স্বয়ং। ‘আমার তো চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না, হাজার হোক আমি বাইরের লোক। তবু, অত বড় একটা লোক শেষজীবনে এত কষ্ট পেয়ে গেলেন...’ বলতে বলতে গোবিন্দর গলা বুজে এল। দু’দিনের ভেতর পনেরশ শব্দের সে ইন্টারভিউ ছাপা হল, গোবিন্দর পাসপোর্ট সাইজ ছবি সহযোগে। পুঁটের বস পুঁটেকে ঘরে ডেকে পিঠ চাপড়ে দিলেন। ডিপার্টমেন্টে রাতারাতি পুঁটের গণ্ডাগণ্ডা শত্রু সৃষ্টি হল।

সেই সব শত্রুদের কেউ কেউ প্রমাণের প্রসঙ্গ তুলেছিল। যাদের সম্পর্কে কথাগুলো বলা হচ্ছে, তারা কেউই তো কাল্পনিক নয়। সকলেই রক্তমাংসের মানুষ, কাদামাটির পৃথিবীতে হেঁটেচলে বেড়ান। এই টুইটারের জমানায় তাদের ট্রেস করতে কতক্ষণ? তার ওপর তারা আবার সেলিব্রিটি-সন্তান। খ্যাতির ছিটেফোঁটা পাননি, কিন্তু তার বিড়ম্বনাটুকু সয়েছেন ষোলআনা।

পুঁটের বস্‌ হাত নেড়ে উড়িয়ে দিলেন। বলেছেন, কেউ কিছু বললে বলবে, ‘পত্রিকার পক্ষ থেকে বার বার জেঠুর ছেলেমেয়েদের এসএমএস করেও কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।’ পুঁটে বাড়ি ফিরে, ‘কাঁকড়ার জাত কি আর সাধে বলে বাঙালিকে?’ বলে সমস্ত পরিশীলন হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে একটা চার অক্ষরের গালি দিল। বুঁচি ‘আঃ দাদা’ বলে ঝামটে উঠল, কিন্তু পুঁটে সেসব গায়ে না মেখে দাঁত বার করে হাসল। আজ ওর মেজাজ খুশ।

গোবিন্দও খুশি। পেপারে কোনওদিন ওর ছবি ছাপবে কে ভেবেছিল, অ্যাঁ? হাফপ্যান্ট-বেলার বন্ধুরা, যারা সব সাকসেসফুল হয়ে অ্যামেরিকায় ডেরা বেঁধেছে, যারা এতদিন ওর ফিজিওথেরাপির কথা শুনে জিভ টাকরায় ঠেকিয়ে চুকচুক করেছে আর বলেছে, ‘ছেলেটার মধ্যে কিন্তু পার্টস্‌ ছিল’, তাদের সারাজীবনে ক’টা ইন্টারভিউ ছাপা হবে কাগজে, তাও আবার উৎফুল্লে, সেটাই গোবিন্দ দেখবে এবার।

জেঠুর ছেলেমেয়েদের কী হল? হাতিঘোড়া কিছুই হল না। রাস্তাঘাটে ক’দিন পাড়াপড়শি এড়িয়ে চলল, বাজারের সবজিওয়ালা ক’দিন তিরিক্ষি ব্যবহার করল, আলুপটলের দাম কমাল না, ইরিটেটিং আত্মীয়স্বজনরা গোঁসা করে ফোন করলেন না (সেটা অবশ্য মন্দের বদলে ভালোই হল)।

আই মিন, মন্দের বদলে ভালোই হত। সবটাই তো কল্পনা। সেলিব্রিটি ফুটবলার হওয়া তো দূরের কথা, লাক্ষাদ্বীপ-জেঠু তো ফুটবলে লাথিই মারেননি কখনও, গোবিন্দর ছবিও কাগজে ছাপা হয়নি, পুঁটে এখনও ডিপার্টমেন্টের সবার সঙ্গে রুটিআলুভাজা টিফিন ভাগ করে খাচ্ছে রোজরোজ।

October 29, 2013

বইয়ের ব্যাপারে



আমার মতে, আবহাওয়ার পরেই যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলা সবথেকে সোজা সেটা হল বই। কারণ বই নিয়ে সকলেরই কিছু না কিছু বলার থাকে। থাকে বলেই আবার বই নিয়ে কথা বলাটা শক্তও বটে। বিশেষ করে বাঙালি সমাজের যে ক্রস্‌-সেকশনটা থেকে আমি এসেছি, চালকলাবাঁধা শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি, তাদের সঙ্গে তো ভীষণ শক্ত। কুকুর যেমন গায়ের গন্ধ শুঁকে লোক বিচার করে, আমরা তেমনি বুকশেলফ্‌ দেখে লোক বিচার করি। আমি অন্তত করি। পৃথিবীর যে কোনও দাঁড়িপাল্লার থেকে বইয়ের দাঁড়িপাল্লা আমার ফেভারিট। এ ব্যাপারে একটা কথা পরিষ্কার করে দেওয়া ভালো, মাপামাপির মধ্যে কিন্তু জাজমেন্টের থেকে মিলিয়ে নেওয়ার ভাবটাই বেশি। কেউ যদি চব্বিশ ঘণ্টা পাওলো কোয়েলহো পড়েন, আর কেউ যদি চমস্কি ছাড়া কিছুই পড়েন না, তাহলে আমার বুঝতে সুবিধে হয় যে দুজনের কেউই আমার “টাইপ” নন। ব্যস্‌, সেটুকুই। টাইপ না হলে ক্ষতি তো কিছু নেই। একেকজন একেক টাইপের হবে সেটাই তো স্বাভাবিক।

এই প্রসঙ্গে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর এক ইন্টারভিউতে শোনা একটা কথা মনে পড়ে গেল। অবান্তরে আগে বলেছি বোধহয়, তবু আবার বলছি। নীরেন্দ্রনাথের ঠাকুমা নাকি বলতেন, পাঁচশোটা লোক যদি পাঁচশো টাইপের হয় তাতে অসুবিধে কিছু নেই, অসুবিধে হচ্ছে তখনই যদি একটা লোকই পাঁচশো টাইপের হয়।

নীরেন্দ্রনাথের ঠাকুমাকে কাল্পনিক হাইফাইভ দেওয়া ছাড়া এর উত্তরে আমার আর কিছু বলার নেই।

আজ অবান্তরে বই নিয়ে কথোপকথন করার ইচ্ছে আমার আপনাদের সঙ্গে। আজকের সংলাপ অবশ্য যত না ‘বই’ নিয়ে, তার থেকে বেশি বই ‘পড়া’ নিয়ে। আমি আমার কথা আপনাদের বলব, তারপর আপনারা আপনাদের কথা আমাকে বলবেন। সে কথা মিললে ভালো, না মিললে আরও ভালো।   

১. বই না ই-বইঃ বই। ই-বই অবশ্য পড়ি না বললে ভুল বলা হবে, এ বছরের আনন্দমেলা আর দেশ, দুটো পুজোবার্ষিকীই পিডিএফ-এ পড়ছি। তবে হাতে ধরে পড়ার আরাম নেই। আরাম লাগে না বলে পড়তেও ইচ্ছে করে না। অতিকষ্টে মিতিনমাসি শেষ করেছি, দীপকাকু এখনও ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে চলছে। কিনড্‌ল্‌ জাতীয় জিনিসের যদিও সুখ্যাতি শুনছি খুব। একবার ওতে বই পড়তে শুরু করলে নাকি নেশা ধরে যাবে। আপনারা কেউ ব্যবহার করেন নাকি? কেমন লাগে?

২. একবারে একটা নাকি একসাথে অনেকগুলোঃ একবারে একটা। একসঙ্গে দু’তিনটে বই পড়া আমার কাছে একসঙ্গে দু-তিনটে বিয়ে করার মতোই ব্যাপার প্রায়। যতদিন পড়া চলছে আমি আমার প্রতিটি বইকে অখণ্ড মনোযোগ দিই, এবং প্রতিদানে তাদের কাছ থেকে অখণ্ড মনোযোগ দাবিও করি।

৩. বই ধার দেওয়ার পলিসিঃ পারতপক্ষে না। কেউ যদি মুখ ফুটে চেয়েই ফেলে তখন তাকে মুখের ওপর “বস্‌, আমি বই ধার দিই না” বলার মতো কুল আমি নই, কাজেই ধার দিতে হয়, কিন্তু আমার যদি লোকের পেটের কথা জেনে ফেলার শক্তি থাকত আর আমি যদি টের পেতাম যে কেউ আমার কাছ থেকে বই ধার নেওয়ার উদ্যোগ করছেন, তাহলে আমি কিছুতেই তাঁর সামনে পড়তাম না। পেটব্যথার অছিলায় ঘরের ভেতর লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতাম।

৪. বই ধার নেওয়ার পলিসিঃ ধার দিতে যখন নিজের এত কষ্ট, তখন অন্যকে জেনেশুনে সে কষ্টের মধ্যে ফেলি কী করে। অন্য লোকটা লাইব্রেরি হলে অবশ্য আলাদা কথা। তখন সপ্তাহে সপ্তাহে তার কাছে গিয়ে বই দাও বই দাও ঝুলোঝুলি করতে আমার একটুও বাধে না।

৫. বইসংক্রান্ত বদভ্যেস-যা আমার নেইঃ বইয়ে দাগ দেওয়া, পাতা মোড়া, মার্জিনে লেখা, হার্ডবাউন্ড বই খোলা অবস্থায় উল্টো করে রাখা, থুতু দিয়ে পাতা উল্টোনো।

৬. বইসংক্রান্ত বদভ্যেস-যা আমার আছেঃ মলাট না দিয়ে বই পড়তে শুরু করা, প্রথম পাতার ওপরের ডানদিকে নিজের নাম, বই কেনার তারিখ ও জায়গা লিখে রাখা, বইয়ের শেষ পাতা সবার আগে পড়ে ফেলা।  

৭. কোন ভাষায় বই পড়তে সবথেকে ভালো লাগেঃ বাংলা (লোকে কিছু অদ্ভুত প্রশ্ন করতে পারেও বটে। এরপর হয়তো জিজ্ঞাসা করবে রসগোল্লা আর কাঁচামুলোর মধ্যে কোনটা খেতে বেশি ভালো লাগে।)

৮. কোন বিদেশী ভাষায় বই পড়তে চাইঃ ডয়েশ

৯. ইন্টারনেটের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর বই পড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে না হয়নিঃ এই প্রশ্নের উত্তরটা খুবই দুঃখের। হয়েছে। আগে ফাঁক পেলেই বই পড়লাম, এখন ফাঁক পেলেই ইউটিউব দেখি।

১০. বই পড়ার সময়ঃ একমাত্র নেটহীন সময় আমি পাই অফিস যাতায়াতের সময়, আর আমার বই পড়াও এসে ঠেকেছে ওই সময়টুকুতে। তবে আমি ফাইট করার চেষ্টা করছি। নিজের জন্য নিয়ম করেছি, রাতে বিছানায় ঢুকে পড়ার পর থেকে নো ল্যাপটপ, ওনলি বই। রোজ যে নিয়মটা মানতে পারি তা বলব না, তবে আগের থেকে অবস্থা অনেকটা শুধরেছে সেটা ঠিক। কাজেই আশা আছে।

১১. বই পড়া হয়ে গেলেঃ যত্ন করে নিজের বুককেসে সেটা পুরে রেখে দিই। কাউকে দিয়ে দেওয়ার কথা ভাবলেও গায়ে জ্বর আসে। তবে এই জ্বরটা যে অকারণ সেটা জানি। যে বইগুলো দু’বার পড়ব না সেগুলো তো, লোককে না হোক, লাইব্রেরিকে দিয়ে দেওয়াই উচিত।

১২. কমফর্ট জোনের বাইরের বইঃ একেবারেই পড়ি না। ইন ফ্যাক্ট এটাও আমার বইসংক্রান্ত বদভ্যেসের মধ্যে লেখা উচিত ছিল।

মিলল?
           

October 28, 2013

মোনালিসা



প্যারিসে এসেছি দুসপ্তাহ কেটে গেছে, আর তিন-তিনটে উইকএন্ড। এখনও লুভ্‌র্‌ দেখা হয়নি। আত্মীয়স্বজনের কাছে মুখ দেখানো কঠিন হয়ে উঠেছে। শেষরাতে বাবা ফোন করে বলছেন, এখনও যে গেলি না, একদিনে যদি কভার করতে না পারিস, দ্বিতীয়বার যাওয়ার সময় হাতে রাখতে হবে তো। আমি কোনওমতে হাই চেপে বলছি, বাবা এখনও দেড়মাস বাকি আছে। বাবা বলছেন, দেড়মাস কত তাড়াতাড়ি কাটে সেটা খেয়াল আছে তোর? তুই গেছিস কদিন হল? জুন, জুলাই, সেপ্টেম্বর, অক্টো...এই তো চার মাস হয়ে গেল, দেড়মাস হতে কতক্ষণ?

স্থির করলাম, এই উইকএন্ডেই একটা এসপার-ওসপার করতে হবে।

একটাই রক্ষা, হোমওয়ার্কটা করা ছিল। কীভাবে যেতে হবে, কোথায় যেতে হবে, কখন যেতে হবে। লুভ্‌র্‌ খোলা থাকে মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি ছদিন। সব দিন নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, শনিরবিবার মিউজিয়াম খোলে সকাল নটায়, বন্ধ হয় ছটায়। মিউজিয়ামে কী কী দেখব সে অনুযায়ী বিভিন্ন দামের টিকিট পাওয়া যায়। আমি পার্মানেন্ট কালেকশনটাই দেখব, তাই দাম পড়বে মোটে বারো টাকা। অবশ্য পকেট থেকে একটি পয়সাও খরচ না করে লুভ্‌র্‌ দেখা যায়, প্রতি মাসের প্রথম রবিবার। সেদিন ধনীদরিদ্র সবার জন্য লুভ্‌রের দরজা হাট করে খোলা। আমার লেজেন্ডারি কিপটেমোর কথা যারা জানেন তাঁরা নির্ঘাত ভেবেছিলেন আমি এমন সুযোগ হাতছাড়া করব না, কিন্তু তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণীর মুখে ছাই দিয়ে আমি পুরো দাম দিয়ে টিকিট কেটে মোনালিসা দেখাই সাব্যস্ত করলাম। কত বারো টাকা আসবে যাবে, মোনালিসা তো জীবনে একবার।

অবশ্য লুভ্‌রে ঢুকব বললেই তো হবে না, কোন দিক দিয়ে ঢুকব সেটাও ঠিক করতে হবে। মিউজিয়ামে ঢোকার চারটি দরজা আছে। তাদের মধ্যে সিংহদরজা হচ্ছে গিয়ে পিরামিড, ড্যান ব্রাউনের দৌলতে যার জনপ্রিয়তা মিউজিয়ামের জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে গেছে অনেকদিন। অনলাইন ফোরামে ঘোরাঘুরি করে জানলাম, পিরামিডের সামনে সারাদিন আর্ট-অনুরাগীদের লাইন লেগেই থাকে। তাঁদের সঙ্গে ঠেলাঠেলির অমূল্য অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গেলে মিনিমাম ঘণ্টাখানেকের ধাক্কা। অনলাইন ফোরামে এও সতর্ক করা ছিল, পিরামিড দরজা দিয়ে না ঢুকলে লুভ্‌রে দেখাও যা না দেখাও তাই। তবু আমি ঠিক করলাম, সিংহদরজা মাথায় থাক, আমার পক্ষে ব্যাকডোরই যথেষ্ট।

ব্যাকডোর, অর্থাৎ Galerie du Carrousel. এক নম্বর মেট্রো লাইনের স্টেশন Palais Royal-Musee du Louvre, স্টেশন থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তার ওপর উঠে এলেই চোখে পড়বে Carrousel du Louvre, একটি আন্ডারগ্রাউন্ড শপিং মল। চলন্ত সিঁড়ি বেয়ে শপিং মলের ভেতর নেমে যাও, সোজা গিয়ে ডানদিকে বেঁকো, তীরচিহ্ন ধরে এগোও, খাঁ খাঁ টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কাটো, দুপাশে চোখ ধাঁধানো ব্র্যান্ড আউটলেটদের মাঝের প্রশস্ত বারান্দা দিয়ে হাঁটো, বেশি না, মিনিটখানেক, চোখের সামনের আবছা অন্ধকার ভেদ করে একটা আভা ফুটে উঠছে মনে হচ্ছে যেন...


দ্য ইনভার্টেড পিরামিড। নাকি চ্যালিস? ধারণের প্রতীক? নারীত্বের চিরন্তন চিহ্ন? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পালাতে পালাতে অবশেষে এর নিচে এসেই কি শয্যা পেতেছেন ইতিহাসের সবথেকে ঘৃণিত নারীটি, যার একমাত্র অপরাধ ছিল ভগবানের পুত্রকে মনুষ্যত্বে উন্নীত করা?

বাই দ্য ওয়ে, ফ্রেঞ্চরা যখন লুভ্‌র্‌ বলে তখন সেটাকে লুভ্‌, কিংবা তার কাছাকাছি শুনতে লাগে। ঘটনাটা জানার পর থেকে আমিও লুভ্‌ই বলছি। অবশ্য জায়গা বুঝে। বাড়িতে ফোন করে লুভ্‌ দেখে এলামবললে সকলে অ্যাঁ? কী দেখে এলি?” করে করে মাথা খারাপ করে দেবে, তাই বাড়ির লোকদের কাছে লুভ্‌র্‌ বলছি, সমঝদার বন্ধুদের কাছে লুভ্‌। আমার ইমপেকেবল্‌ ফ্রেঞ্চ উচ্চারণ শুনে তাঁরা যথোপযুক্ত মুগ্ধ হবেন এই আশায়। অবান্তরের পাঠকমণ্ডলীর সমঝদারিত্ব নিয়ে আমার মনে তিলমাত্র সন্দেহ নেই, তাই এই লেখাতেও এখন থেকে লুভ্‌ শব্দটিই ব্যবহার করা হবে।


লুভ্‌ মিউজিয়ামের ষাট হাজার ছশো স্কোয়্যার মিটার জায়গা জুড়ে পঁয়ত্রিশ হাজারেরও বেশি ওয়ার্ক অফ আর্ট প্রদর্শিত আছে। রিসার্চাররা এস্টিমেট করে জানিয়েছেন, সব ঠিক করে দেখতে গেলে একজন অ্যাভারেজ মানুষের সময় লাগবে নমাস। কাজেই বুঝতেই পারছেন, একটা প্ল্যান থাকা জরুরি। আনতাবড়ি আর্ট দেখে তো লাভ নেই, যা যা দেখলে চেনা লোকদের বলতে সুবিধে হবে সে সবের লিস্ট আগেভাগে তৈরি করে ব্যাগের ভেতর না রাখলে বিপদ।


আমি রেডি ছিলাম। পায়ে কনভার্স, ব্যাগে জলের বোতল, হাতে ম্যাপ নিয়ে। আমার নিজের হাতে, অনেক সময় নষ্ট করে বানানো ম্যাপ। কী কী দেখব, সেগুলো মিউজিয়ামের তিনটে মূল উইং-এর (Richelieu, Sully, Denon) কোথায় কোন তলার কোন কোণে গোঁজা আছে---সব গোটা গোটা করে সাদা কাগজে লিখে রেখেছিলাম। একটা আর্ট দেখে পরের আর্টে কী ভাবে পৌঁছতে হবে, সব পথনির্দেশ ছবির মতো করে টুকে নিয়েছিলাম।


মিউজিয়ামে ঢুকে এদিকওদিক খানিকক্ষণ হেঁটে বুঝলাম, আমার ম্যাপের সঙ্গে বাস্তব মিলছে না। এটা কী করে ঘটতে পারে আমার মাথায় ঢুকল না। ঢুকত, যদি জানা থাকত যে মিউজিয়ামের ভেতর যখনতখন আর্টের ঠিকানা বদল হয়। আমার ম্যাপে হয়তো লেখা আছে ভেনাস দে মিলো রাখা আছে Richelieu-র একতলার পাঁচ নম্বর ঘরে, কিচ্ছু ভুল লেখা নেই, কারণ অ্যাদ্দিন ওটা সেখানেই ছিল, কিন্তু আগের সপ্তাহেই কর্তৃপক্ষ সেটাকে রেখে এসেছেন Sully-র বেসমেন্টে। ভগবানই জানেন কেন। ফেং শুই-টুইয়ের ব্যাপার আছে নিশ্চয়। ছবিটবি তাও বুঝি, কিন্তু টন-টন ওজনের মার্বেলের মূর্তি ঘাড়ে নিয়ে ঘোরাফেরা করাটা শখে হতে পারে না।


সমাধান অবশ্য হয়ে গেল চটপট। আমার ম্যাপের বদলে মিউজিয়ামের ম্যাপ দিয়ে কাজ চালাতে হল এই যা। হলের মাঝখানে ইনফরমেশন সেন্টারে বুকলেট থরে থরে সাজানো ছিল। ইংরিজিতে লেখা বুকলেটটা খুঁজে হাতে নিয়ে দেখি, খেলানো ম্যাপে উইং আর তলা ধরে ধরে রংচঙে টিপ পরিয়ে অবশ্য-দ্রষ্টব্য আর্ট আইডেন্টিফাই করা আছে। যেগুলো না দেখলে জীবন বৃথা। দুর্গা বলে যাত্রা শুরু করলাম।


আপনার যদি আর্টে বিন্দুমাত্র উৎসাহ না থাকে, বিশ্বজোড়া যুদ্ধ দারিদ্র্য অনাহারের মধ্যে এক প্রাসাদ ভর্তি রংচঙে ছবি আর পাথরের তাল দেখতে যাওয়াটা যদি আপনার সিমপ্লি কুরুচিকর বলে মনে হয়, প্রতিবাদ হিসেবে লুভে গিয়ে যদি আর কিচ্ছু না দেখে শুধু একতলার ক্যাফেটেরিয়ায় বসে Pain aux raisins সহযোগে নাতিশীতোষ্ণ কফিতে চুমুক দিয়ে কিংবা সুভেনির শপ থেকে মোনালিসার ছবি আঁকা চাবির রিং কিনে বাড়ি চলে আসেন, তবু Lisa Gherardini-র ছবিটা আপনাকে দেখতেই হবে। সাধারণ লোকে যাঁকে মোনালিসা বলে চেনে। এটা আর্ট ভালো না-লাগার প্রশ্ন নয়, এটা তার থেকে অনেক গভীরের কথা। রোজ সকালে যে আকাশে সূর্য ওঠে, আপনি কি সেটা নিয়ে প্রশ্ন করেন? কিংবা সূর্যের দিকে ফ্রি টিবেটলেখা কালো ব্যানার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন? মোনালিসা হচ্ছে মানবসভ্যতার আকাশের হাতে গোনা সূর্যদের মধ্যে একটা। এ সূর্য মানুষের নিজেরই হাতে গড়া, আর তাই তার গরিমা আসল সূর্যের থেকেও অনেক বেশি।


মোনালিসার এত কাছে গিয়ে যাতে তাকে দেখা ফসকে না যায় আপনার, সে ব্যাপারে মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ ভয়ানক সচেতন। লম্বা লম্বা করিডর, চওড়া চওড়া সিঁড়ি পেরোনোর সময় অবিরত চোখে পড়বে পথনির্দেশ। এই যে এইদিকে। এইবার ডান, তারপর বাঁ। একের পর এক বাঁক যত ঘুরবেন আপনি, বুকের ভেতর ঢেঁকির পাড় ততই স্পিড তুলবে। শেষ করিডরটা যে আলোকোজ্জ্বল ঘরে গিয়ে মিশেছে, সে ঘর থেকে একটা গুনগুন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠবে। আপনি ভাববেন আওয়াজটা এত চেনা লাগে কেন, কোন বিস্মৃত অতীতে যেন এই আওয়াজটাকে নিজের নিঃশ্বাসপ্রশ্বাসের মতোই চিনতাম আমি...ভাবতে ভাবতে ঘরের ভেতর যেই না পা রাখবেন, অমনি অতীত-টতিত সব হুড়মুড়িয়ে চোখের সামনে ঘোর বর্তমান হয়ে এসে দাঁড়াবে।

অফ কোর্স, রেলস্টেশন।

পিলপিল করছে লোক, তাদের সম্মিলিত ফিসফিসানির চিৎকার আর মাথার ওপর তুলে ধরা স্মার্টফোনের খচাখচ---সব মিলিয়ে মোনালিসার সামনে পৌঁছে যদি আপনার অফিসটাইমের হাওড়া স্টেশনের (এয়ারকনডিশন্‌ড) কথা মনে না পড়ে, তাহলে আপনার কল্পনাশক্তির বলিহারি।


অবশ্য মোনালিসার সামনেই পৌঁছেছি কি না সেটা তখনও আমি জানি না, কারণ পাঁচ ফুট দুইঞ্চি হাইট নিয়ে আমি তখনও কেবল লোকের মাথা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনি। এবং পরিস্থিতি যা বুঝছি, আদৌ যে কিছু দেখতে পাব সেটাও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না।

অগত্যা কাজে লাগতে হল।


হাওড়া স্টেশন আর লুভ্‌ মিউজিয়ামের মোনালিসার ঘর, দুটো জায়গার মধ্যে সবথেকে বড় মিল হচ্ছে দুটোর কোনওটাই চক্ষুলজ্জা কিংবা ভদ্রতা প্র্যাকটিস করার জায়গা না। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের জিপ ঠিকমতো টেনে বন্ধ করা আছে কি না দেখে নিলাম। হাতে ক্যামেরা বন্দুকের মতো বাগিয়ে ধরলাম। (হাওড়া স্টেশনে ঠিক যে ভাবে ছাতা বাগাই।) তারপর জয় মোনালিসার জয়বলে সোজা ঝাঁপ দিলাম ভিড়ের ভেতর। ফুলের মতো টডলাররা পায়ের তলায় পিষেই গেল, না কি খুরখুরে বুড়ি দিদিমারা কানে কনুইয়ের মোক্ষম গুঁতোই খেলেন, সে দিকে বিন্দুমাত্র দৃকপাত না করে।

থামলাম একেবারে সামনের সারিতে পৌঁছে। পৌঁছতেই ভিড়ের রহস্যটা পরিষ্কার হয়ে গেল। রেলিং-এর গায়ে লাইন দিয়ে নারীপুরুষেরা দাঁড়িয়ে আছেন। সামান্য বিভঙ্গ তোলা শরীর, কোমরে হাত, মুখে অবিকল মোনালিসার মতো মুখটেপা মৃদু হাসি। হাসিটা না থাকলে দৃশ্যটা অনেকটা ফায়ারিং রেঞ্জের মতোই দেখাত। বন্দুক অর্থাৎ ক্যামেরা হাতে নিয়ে নাকের ডগায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন যার যার সঙ্গী। খচাৎ খচাৎ শাটার পড়ছে উঠছে, ফোটোগ্রাফারেরা চোখ থেকে ক্যামেরা নামিয়ে ভুরু কুঁচকে ভিউফাইন্ডারে নিজের সৃষ্টি দেখছেন, লিওনার্দোর ছবির মতো ভালো হয়নি দেখে মাথা নেড়ে আবার সাধনায় নামছেন। আবার শাটার পড়ছে, উঠছে।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মোনালিসাকে দেখলাম। মোনালিসার কোলের ওপর জড়ো করা দু'হাত, মাথার ওপর স্বচ্ছ কালো আস্তরণ, দুকাঁধের দুপাশের দুটি বেমানান দিগন্তরেখা, বাঁ কাঁধের ওপর থেকে খসন্ত আঁচল, অদৃশ্য ভুরুর তলায় নিভন্ত দুটি চোখ। আমি যেদিকেই যাই, সে চোখ আমার চোখ থেকে দৃষ্টি সরায় না।  

আর দেখলাম মোনালিসার হাসি। পাঁচশো বছর ধরে যে হাসির অর্থ খুঁজতে মানুষ মাথা কুটে মরেছে। শেষে হাল ছেড়ে রেগে গিয়ে বলেছে, হাসি না ছাই, ফোকলা দাঁত ঢাকতে গিয়ে ঠোঁট ওইরকম ছেতরে গেছে। কম্পিউটার অনেক হিসেবটিসেব কষে বার করেছে, মোনালিসার হাসির উপাদান হচ্ছে তিরাশি শতাংশ হ্যাপিনেস, নয় শতাংশ বিরক্তি, ছয় শতাংশ ভয় আর দুই শতাংশ রাগ।

হাসি তো অনেক তুচ্ছ জিনিস, মোনালিসা আসলে কে, সেটাও তর্কের ব্যাপার। ধনী বণিকপত্নী, নাকি লিওনার্দো নিজেই? নাকি লিওনার্দোর প্রিয়তম শিষ্য (এবং লিওনার্দোর বেশ কয়েকটি ছবির অফিশিয়াল মডেল) Salaì?

রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি এইসব ভাবতে লাগলাম। ভিড় থেকে বেরিয়ে এসে ভাবলেও হত, পিঠের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছিলও, কিন্তু আমি নড়লাম না। মডেলেরা সব মোনালিসার ঠিক সামনের অংশটুকু দখল করে দাঁড়িয়ে আছেন, কাজেই আমি মোনালিসাকে দেখছি সাইড থেকে। তাতে জগতের ক্ষতিবৃদ্ধি কিছুই হচ্ছে না, কিন্তু আমার জেদ চেপে গেছে। আমি মোনালিসার ছবি দেখব একেবারে সামনে থেকে। একএক করে মডেলরা মঞ্চ ছাড়তে লাগলেন, আর আমিও ইঞ্চিইঞ্চি করে মোনালিসার দিকে এগোতে লাগলাম। এত কষ্টের কেষ্ট অবশেষে মিলল। ক্যামেরা চোখ থেকে নামিয়ে, মোনালিসাকে শেষবারের মতো একবার দেখে নিয়ে আমি ভিড়ের বাইরে বেরিয়ে এলাম।


জম্মের মতো একটা কম্ম সারা হয়ে গেল। এবার শান্তি করে বাকি মিউজিয়ামটা দেখা যাবে।

মোনালিসা ছাড়াও লুভে আরও অনেক কিছু দেখার আছে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। লুভের ভেতরটা তো দেখার মতো বটেই
, বাইরেটাও চোখ চেয়ে দেখার মতো সুন্দর। লুভ্‌ আসলে হচ্ছে বারোশ শতাব্দীতে দ্বিতীয় ফিলিপের আমলে বানানো একটি দুর্গ। হাত এবং চেহারা দুইই বদলাতে বদলাতে শেষে লুভ্‌ এসে পড়ে চতুর্দশ লুইয়ের হাতে। লুইরাজার জামাকাপড়জুতোমোজার জন্য লুভে জায়গা কম পড়ছিল, তাই তিনি ষোলশ বিরানব্বই সালে লুভ ছেড়ে চলে গেলেন ভার্সাই প্রাসাদে। আর সেই প্রথম লুভ্‌ ব্যবহার হতে শুরু করল রাজার আর্ট-সংগ্রহের প্রদর্শনী হিসেবে।


এই হচ্ছে তৃতীয় নেপোলিয়নের গ্র্যান্ড সালোন।

আর এই হচ্ছেন তৃতীয় নেপোলিয়ন নিজে। প্রজাদের টাকা মেরে নিজের বাড়িতে ঝাড়লন্ঠন ঝুলিয়েছেন।

নেপোলিয়নের অগাধ ঐশ্বর্যের কিছুই আমার চাই না, কেবল বাঁদিকের ওই জানালার কোণটার ওপর বড় লোভ জেগেছে আমার। জানালার পাশে বসে আমি আর অর্চিষ্মান আনন্দবাজার পড়ব, আর এই কাপদুটোয় করে টাটা গোল্ড খাব। ভালো হবে না?


এটা কী বলতে না পারলে বুঝব, ক্লাস সেভেনের ইতিহাস ক্লাসে কিচ্ছু শুনছিলেন না, জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবছিলেন কখন টিফিন হবে। ইনি হচ্ছেন লে কোড দে হামুরাবি। আমি জানি না কেন, এত কিছুর মধ্যে এটা দেখেই আমার সবথেকে বেশি উত্তেজনা হয়েছে।            

লুভ্‌ আমার কেমন লাগল? আর্টের লিস্ট যখন টিক মারতে মারতে প্রায় শেষ, জলের বোতল ফাঁকা, বুড়ো আঙুল টনটনাচ্ছে, তখন বুকের ভেতর বেশ একটু দুঃখ দুঃখই টের পাচ্ছিলাম। পাঁচঘণ্টা হেঁটে, পঁয়ত্রিশ হাজারের মধ্যে মধ্যে মেরেকেটে গোটা পনেরো শিল্পকর্ম মন দিয়ে দেখেছি আমি। তাও নিতান্ত আনাড়ির মতো দেখা। ওপর ওপর। রংচঙে ছবির মেয়েটার মুখের হাসিটাই দেখছি শুধু, কত সূক্ষ্ম কারুকাজ ওই হাসিতে লুকিয়ে আছে, ঠোঁটের ওই ভঙ্গিটুকুর পিছু ধাওয়া করতে পাঁচশো বছর আগে একটা লোকের কত রাত নিদ্রাহীন কেটেছিল, তার বিন্দুমাত্র আন্দাজও কি আমার আছে? আর সেটা না থাকলে কি ছবিটার মর্ম উপলব্ধি করা আমার পক্ষে সম্ভব? মর্মের কথা যদি ছেড়েও দিই, কত কিছুর দিকে তো তাকিয়েও দেখলাম না। বিখ্যাত শিল্পীদের বিখ্যাত শিল্পদের ছায়ায় কত কিছু মুখ লুকিয়ে রইল। সেগুলোও তো অনেক যত্নের সৃষ্টি, অনেক পরিশ্রমের ফসল।

      
হাঁটতে হাঁটতে গলা চুলকোতে গিয়ে সিলিং-এর দিকে অজান্তে তাকিয়ে ফেলবেন, আর এই রকম সব দৃশ্য ভেসে উঠবে আপনার চোখের ওপর। সিলিং-এর গায়ে, সিঁড়ির তলায়, ঝুলবারান্দার রেলিং-এ, কত আর্ট যে বৃথাই অপচয় হচ্ছে লুভে, তার ইয়ত্তা নেই। কেউ দেখছে না, কেউ হাততালি দিচ্ছে না, কেউ ছবি তুলে ইনস্টাগ্র্যামে আপলোড করছে না। এতদিন যখন করেনি, আর করার আশাও নেই।


তাই বলে কি তাদের একটাকে চুপিসাড়ে সরিয়ে নিলে কিছু কম পড়বে না কোথাও? মোনালিসার ঘরের দরজার বাইরে যে একলা দেবশিশুটি গালে হাত দিয়ে বসে আছে, তার মণিহীন দু’চোখে বিষাদ যদি অত নিখুঁত নাই ফুটত, তাহলেও কি কারও কিছু এসে যেত?

যেত। সেই যে অনেকদিনের কথাটা জীবনের ধন কিছুই যাবে না ফেলা, ধরার ধূলায় যত হোক অবহেলা”---লুভের সম্পদও ঠিক তেমনি। আমার মতো অপোগণ্ডের দল ঝাঁক বেঁধে আসবে যাবে, হইহই করে মোনালিসার ছবি তুলে রইরই করে ফিরে যাবে। আমাদের মূল্যায়নের আশায় লুভ্‌ বসে নেই। মানুষের অবিশ্বাস্য অস্তিত্বের সাক্ষ্যপ্রমাণ বুকে নিয়ে সে নিজের গর্বেই নিজে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।


রু দে রিভোলি ধরে মেট্রোস্টেশনের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ব্যাগ থেকে ফোন বার করে নম্বর টিপলাম। লুভ্‌র্‌ দেখে বেরোলাম বাবা।” “দেখলি!বাবার গলায় উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ে। লেডি অফ দ্য রক্‌সের ছবিটা দেখলি সোনা? সেই যে যার পেছনে ল্যাংডন্‌ সেই চাবিটা খুঁজে পেয়েছিল?”

রাস্তার গাড়িঘোড়ার আওয়াজ ছাপাতে গিয়ে গলা বেশ খানিকটা তুলতে হল আমাকে। দেখলাম তো..."

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.