January 07, 2016

আসাম ৪/ ফুড হাট, এম জি রোড, জোড়হাট



কিছু অপ্রত্যাশিত বাধা এসে আমার আসামের গল্পের খেইয়ের সুতো ক্যাঁচ করে কেটে দিয়েছে। খেই ফিরে পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার ধৈর্য আমার নেই, তাই আমি কালান্তর দোষ ঘটিয়ে একটা পরের গল্প আগে বলে নিচ্ছি। বিপদের দিনে ফিলারের মতো করে ব্যবহার করলেও একটা কথা আমি আপনাদের দিতে পারি, এ গল্পটা নিজের জোরেই নিজের পায়ের দাঁড়ানোর ক্ষমতা রাখে। হাতির পিঠে চড়ে গণ্ডার দেখার মতো রোমহর্ষক নয় এ গল্প, কিংবা বোটে চেপে ব্রহ্মপুত্র পেরোনোর মতো ভাবগম্ভীর নয়, জ্বলন্ত আগুনের ধারে বসে রাইস বিয়ারে চুমুক দেওয়ার মতো গ্ল্যামারাস তো নয়ই, তবু এটা একটা ভালো গল্প। ছোট গল্প, মোটে আধঘণ্টাখানেকের, শেষও হয়ে গেছে সেই কবে, কিন্তু তবু এখনও মনের মধ্যে তার রেশ টের পাচ্ছি।

এ গল্পটা শুরু হচ্ছে যখন মাজুলি শেষ, হলংগাপার জঙ্গলের গিবনবাঁদর দেখা শেষ। এমনকি জোড়হাটের কোর্ট ফিল্ডের মাঠে আসাম মহোৎসবে পাপড়ি চাট খাওয়াও শেষ। যখন আমরা রওনা দিচ্ছি আমাদের আসাম বেড়ানোর লাস্ট স্টপ শিবসাগরের দিকে।

জোড়হাটে পৌঁছে দেখলাম শহরটা বেশ শহরশহর দেখতে, আর অমনি আমাদের মাথার পুরোনো পোকাগুলো নড়েচড়ে উঠল। দেখা যাক এখানে রেটিংওয়ালা কী কী রেস্টোর‍্যান্ট আছে। ইন্টারনেট ঘেঁটে বেশ কয়েকটা দোকানের নাম বেরোলো। বেজিং ব্যাংকোয়েট, লিটল সাউথ। আসামে বসে দোসাচাউমিন খেলে (যদিও সে পাপ আমরা এই ট্রিপেই করেছি, সে গল্প পরে আসবে) লজ্জায় আর মুখ দেখাতে পারব না ভেবে আমরা ব্রাউজারে ট্র্যাডিশনাল + আসামিজ + ফুড + জোড়হাট + টপ রেস্টোর‍্যান্টস লিখলাম।

তাতেও বেশ কয়েকটা নাম বেরোল। গুগল ম্যাপ দিয়ে একে একে সে সব দোকানের নাম বসিয়ে দেখা গেল ‘ফুড হাট’ আমাদের টুরিস্ট লজের একেবারে নাকের ডগায়। ফেরার দিন দুপুরে সেখানেই খাব ঠিক করলাম। বারোটার সময় চেক আউট করে লজের রিসেপশনেই সুটকেস রেখে ফুড হাটের সন্ধানে বেরোলাম।আমাদের টুরিস্ট লজের রাস্তার নাম এম জি রোড। একটু হাঁটতেই আমাদের মুখ হাঁ। জোড়হাটের সব রেটিংওয়ালা রেস্টোর‍্যান্টই দেখি এই রাস্তায়। বেজিং ব্যাংকোয়েট, লিটল সাউথ সব লাইন দিয়ে ওই রাস্তাতেই সাজানো। আমরা মন শক্ত করে এগিয়ে গেলাম। ফুড হাট এসে গেল।

সাজানোগোছানো লম্বাটে ধরণের দোকান। পরিচ্ছন্ন টেবিলে মেনুকার্ড রাখা। সবরকমের খাবারই পাওয়া যায় ফুড হাট-এ। ইন্ডিয়ান, চাইনিজ। আমরা আসামিজ থালির বিভাগে চলে গেলাম। ইনডিভিজুয়্যাল পদ কিছু ছিল কি না মনে পড়ছে না, কিন্তু আমাদের উৎসাহ ছিল থালির প্রতি। ফুড হাট-এ নানারকম থালি পাওয়া যায়। চিকেন, মাটন, ডাক, পিজিয়ন, ডাক+মাটন, মাটন+পিজিয়ন, চিকেন+মাটন ইত্যাদি। আমি ডাক আর পিজিয়ন নিয়ে অনেকক্ষণ দোনামনা করে শেষপর্যন্ত ডাক থালিই অর্ডার দিলাম। মুখ ফিরিয়ে দেখি অর্চিষ্মান আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সারামুখে বিতৃষ্ণা মাখামাখি।আমি তাকাতেই বলল, “তুমি কি মানুষ? ডাকগুলো কেমন সুন্দর দেখতে, জলে ভেসে ভেসে বেড়ায়, আর পায়রাগুলো কী মিষ্টি, আমাদের রান্নাঘরের জানালায় এসে কেমন বকবকম করে আর ডানা ঝটপটায়, তাদের নাকি তুমি ধরে ধরে খাবে।? কী করে পারবে?”

এই না বলে খুব স্মাগ মুখ করে ঘোষণা করল, “আমি বাবা চিকেন থালি খাব।”

এর উত্তরে যা যা যুক্তিপূর্ণ কথা আপনাদের মাথায় আসছে, পৃথিবীর সব সুস্থ মানুষের মাথাতেই আসবে, সে সব আমার মাথাতেও এসেছিল। কিন্তু মা বলে দিয়েছিলেন, কখন কথা বলতে হবে আর কখন চুপ করে থাকতে হবে সেটা বুঝে ফেলাই হচ্ছে একসঙ্গে থাকা সফল করার একমাত্র রাস্তা। তাই আমি কথাগুলো উগরে না দিয়ে সব গিলে ফেললাম।

পরিবেশক জিজ্ঞাসা করলেন, “লোকাল না ব্রয়লার?

এই ব্যাপারটা আসামে খুব চলে দেখলাম। মাংসের দোকানে, রেস্টোর‍্যান্টে, যেখানেই মুরগির মাংসের উল্লেখ আছে সেখানেই পাশে ব্র্যাকেটে লেখা আছে মুরগি লোকাল না ব্রয়লার।

অর্চিষ্মান ভুরূটুরু কুঁচকে বলল, লোকালই খাই, কী বল?

যেন লোকাল মুরগিরা মিষ্টি নয়, কোঁকর কোঁ ডাক ছেড়ে তাদের ডানা ঝটাপটিটা যেন ঝটপটিই নয়।

যাই হোক, পাঁচ মিনিটের মধ্যে দুজনেরই থালি এসে গেল।

আমার ডাক থালি

অর্চিষ্মানের চিকেন থালি

থালিতে কী কী ছিল সেটা দেখাতে গিয়ে বুঝছি, বাটিগুলো সম্পূর্ণ ভুল অর্ডারে সাজানো হয়েছে। বাটি সাজিয়ে খাওয়ার অভ্যেস নেই তো। এখন আর ভুল শুধরানোর উপায় নেই। তাই যেমন সাজিয়েছিলাম তেমনভাবেই বাঁ থেকে ডানদিকে যথাক্রমে পদের নাম বলছি।


হাঁসের মাংস, মাছের মাথার ঘণ্ট, কচুর শাক।


বাঁধাকপি, আরও দু'রকমের ডাল। গোটা থালির মধ্যে একমাত্র বাঁদিকের ডালটিই আমার পছন্দ হয়নি। তার কারণ ব্যাপারটার হড়হড়ে টেক্সচার। আমার একেবারেই পোষায় না। অর্চিষ্মানের ফেভারিট খাবার ঢ্যাঁড়স সেদ্ধ, হড়হড়ানিতে এ ডাল তার কাছে শিশু। ও দেখলাম চেটেপুটে বাটি পরিষ্কার করে ফেলল।


আলু পেঁয়াজকলির তরকারি, চাটনি, কাসুন্দি, পায়েস, আলুপিটিকা (আলুসেদ্ধ)। এদের কাসুন্দিটা আমাদের কাসুন্দির থেকে অনেক শুকনো। ঝাঁজটাও বেশি। শুধু ওই দিয়েই থালার অর্ধেক ভাত সাবাড় করা যায়।

হাঁসের মাংস আমি আগে কখনও খাইনি। মুরগির মতোই আবার মুরগির মতো নয়ও। তফাৎ মূলত দু’জায়গায়। এক, মুরগির মাংসের তুলনায় হাঁসের মাংসে ফ্যাট বেশি, কাজেই তেলতেলে ভাব। তাছাড়া টেকনিক্যালি হাঁসের গোটাটাই ডার্ক মিট। মুরগির বুকের অংশের মাংসের থেকে ঠ্যাঙের অংশের মাংসের স্বাদের সঙ্গে হাঁসের মাংসের স্বাদের মিল বেশি। আমার চিকেন ব্রেস্ট খুব খারাপ আর চিকেন লেগ খুব ভালো লাগে, কাজেই আমার ডাক মিট খুব ভালো লেগেছে। মাছের মাথার তরকারিও আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি কোনওদিন এ জিনিস খাইনি। চালের সঙ্গে মিশিয়ে মুড়িঘণ্ট খেয়েছি, ডালের সঙ্গে মিশিয়ে মাছের মাথা দিয়ে ডাল খেয়েছি, পুঁইশাকের সঙ্গে ইলিশ মাছের মাথার চচ্চড়ি খেয়েছি। কিন্তু শুধু মাছের মাথা দিয়ে যে এমন অমৃতের মতো জিনিস বানানো যেতে পারে এ আমার কল্পনায় ছিল না। দুহাজার ষোলর শুরুর হুলস্থূলটা কেটে গেলে এই রান্নাটা বাড়িতে করার চেষ্টা করা আমার অন্যতম লক্ষ্য।

আর কচুর শাক। এতদিন বাদে খেলাম, আর কী ভালোই না খেলাম। এমন কচুর শাক খেলে আমার ঠাকুমাও খুশি হতেন। বাঁধাকপির তরকারিও ওয়ার্ল্ড ক্লাস। চাটনি সম্পর্কেও আমার মতের থেকে অর্চিষ্মানের মত বেশি জরুরি। চাটনিটা কেমন জানতে চাওয়ায় অর্চিষ্মান মুখে কথা না বলে হাতের তর্জনী আর বুড়ো আঙুল জড়ো করে একটা ভঙ্গি করল। যার মানে ভরতনাট্যমের মুদ্রাও হতে পারে আবার “তোফা”-ও হতে পারে। অর্চিষ্মান সে মুহূর্তে কোনটা বুঝিয়েছিল সেটা বলার জন্য কোনও হাততালি নেই।

ওই হড়হড়ে ডাল ছাড়া থালির আর একটিমাত্র পদ আমার অসামান্য লাগেনি, সেটা হচ্ছে পায়েস। তবে ওটা যে আমার ভালো লাগবে না সেটা আমি আগে থেকেই জানতাম। কারণ মায়ের হাতে বানানো ছাড়া আর কোনও পায়েসই আমার ভালো লাগে না। আমি নিশ্চিত, ব্যাপারটা সাইকোলজিক্যাল। তবু, যা সত্যি তাকে অস্বীকার করি কী করে?

মোদ্দা কথা হচ্ছে, ফুড হাট আমাদের পেট আর বুক দুই-ই ভরিয়ে দিয়েছে। বাড়ির বাইরে এত ভালো ‘বাঙালি’ খাওয়া আমি স্মরণীয় অতীতে খাইনি। উঁহু, দিল্লি কলকাতার দামি রেস্টোর‍্যান্টেও না। আপনাদের বলে রাখলাম, যদি কখনও জোড়হাটে যান, এম জি রোডের এই নিরীহ চেহারার দোকানটিতে ঢুঁ মারতে ভুলবেন না।




17 comments:

  1. eta sotti besh bhalo golpo.. duck, pigeon ar local chicken er lorai tao besh.. :) tumi to khub shanti priyo manush.. ami to chup kore thaktam na... hehe.. asha kori sob badha periye Assam er porer porbo joldi asche..

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, ঊর্মি। আসলে বেড়ানোটাও তো লম্বা। এমনি উইকএন্ডের লখনৌ ভ্রমণ লিখতেই আমার তিনটে পর্ব লাগে, আসাম যে আরও বেশি লাগবে সেটা আমার আগে আন্দাজ করা উচিত ছিল। দেখা যাক, সামনের সপ্তাহে শেষ করার ইচ্ছে আছে।

      Delete
  2. Khub sundar lekha tar Cheyeo guchono bhavna... pen bhenge gelo mathew thukleo erom lekha amar kachor diye asbe na.bolchi ki iye apni fb te Ekta page khulun ar lekha publish karun..Amar moto lyad loke der notification ele aro bhalo lage ar ami nischit aro lokjon abantor ke bhalobasbe..ami Jodio Soni robibar ei choto dhu mari..just bolchilo kichu mind korben na jeno

    ReplyDelete
    Replies
    1. This comment has been removed by the author.

      Delete
    2. আরে অভীক, মাইন্ড করার কী আছে, আপনি তো ভালো পরামর্শই দিয়েছেন। দেখি ভেবে। লেখাটা আপনার ভালো লেগেছে জেনে আমারও খুব ভালো লাগল। তবে পেন ভাঙার কথাটা যে বলেছেন, সেটা একেবারেই সত্যি নয়। যা ঘটেছে সে জিনিস পরপর লিখে যেতে সত্যিই কোনও কেরামতির দরকার হয় না। সময় থাকলেই হয়।

      Delete
  3. thank you kuntala di,amar bahudin er eechcha duck khawar,sobai bhoy dekhay bole kina bikot gandho naki,eto aanshte gandho naki shutki mach o sishu,sei bhoy e khawa hoe oteh ni,ebar khetei hobe,bishsesh kore tumi jakhan mention kore dile je hans er meat chicken er leg piece er moto tasty,darun....khetei hochche.
    baki khabar gulo o to puro pagla,kochur shag,,,ahah ahaha...

    prosenjit

    ReplyDelete
    Replies
    1. কার কোন মাংসে গন্ধ লাগবে, সেটা না খেয়ে বলা অসম্ভব, প্রসেনজিৎ। আমার চেনা অনেকেরই ডাকে গন্ধ লাগে তবে আমার তো লাগল না দেখলাম। তবে পরে আবার লাগতেও পারে। তোমার ইচ্ছে থাকলে তুমি টেস্ট করতে পার।

      Delete
    2. khelam hans,dishi murgir motoi,aro dark and flavorful,tobe ghore Jodi kakhano banao...discard liver and pakoshtoli..oi gulo smelly chilo.aar ekbar lebu noon diye kochle dhuye niyechilam..bas bakita kosha chiken er moto

      prosenjit

      Delete
    3. ওরে বাবা, তুমি তো করিৎকর্মা লোক দেখছি, প্রসেনিজৎ। হাঁস জোগাড় করে খেয়েও ফেললে? ভেরি গুড। তোমার সঙ্গে আমি একমত, ব্যাপারটা কষা চিকেনের মতোই।

      Delete
    4. tatanagar e pawa jay,hans aar deshi murgi easily available,..arekta jinis,hoyto mangso ta katar o kayda ache,kenona je lokta kate se onke samay nilo,onek khon dhore rakto drip hote dilo,tarpor charalo taralo,hoyto oi rakto smell er karon..jag ge sahos jogale tumi e ,thanks..ebar hans cholbe puro,hehe

      Delete
  4. Duck meat sottyi khub bhalo khete. kochu shaak shune r dekha pranta huhu kore uthlo, ki r kora jabe....
    tabe ei lekhay ekta moha upojogi life skill diyechho dekhchhi..
    Bratati.

    ReplyDelete
    Replies
    1. কচুশাকটা যা রেঁধেছিল না, ব্রততী...

      ওই লাইফ স্কিলটা অবশ্য গৃহপালিত সম্পর্কের জায়গা ছাড়াও অনেক জায়গায়, ইন ফ্যাক্ট, সর্বত্রই কাজে লাগে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমি স্কিলটা আয়ত্ত করতে পারিনি। দেখি, সবে তো পঁয়ত্রিশ, সত্তরে পৌঁছতে পৌঁছতে পেরে যাব হয়তো।

      Delete
  5. আহা, জিভে জল আনা সব ছবি আর বর্ণনা। তবে কি জানেন, আমি লোভে পড়ে যতবার ডাক খেয়েছি এদেশে, আমার একটু শক্ত লেগেছে। হয়ত আসামের আর আমেরিকার হাঁস আলাদা, নয়তো রান্না করবার পদ্ধতি আলাদা।

    ReplyDelete
    Replies
    1. সেটা হতে পারে, সুগত।

      Delete
  6. গুরু, হাঁস আমারও হেব্বি লাগে! এবার ব্যাংকক গিয়ে ডাক রোস্ট খেলাম, এবার দিশি পদ্ধতিতে হাঁস কোথায় পাওয়া যায় খুঁজতে হবে। আর মাছের মাথা দিয়ে যেটা খেলে, সেটা আমরা বাড়িতেও করি - কাঁটা চচ্চড়ি, একটু তেল বেশি লাগে কিন্তু ঘ্যামা হয় খেতে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. তোমার কমেন্টটা পড়ার পর থেকে কাঁটাচচ্চড়ির রেসিপি খুঁজছি অনলাইন, প্রিয়াঙ্কা। কিছুতেই পাচ্ছি না।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.