অ্যান্ড আই সিনসিয়ারলি উইশ টু রাইট ইট কুইকলি
উপদেশ বা জ্ঞান নিয়ে আমার একটা থিওরি আছে। একটা প্র্যাকটিকালও আছে, এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বার করে দেওয়ার, কিন্তু আপাততঃ থিওরির কথাই হোক। আমার মতে উপদেশের ভালোমন্দ নির্ধারণের ক্রাইটেরিয়া হচ্ছে প্রয়োগক্ষেত্রের আয়তন। যে উপদেশ যত বেশিসংখ্যক ঘটে কাঁঠালি কলা, সে উপদেশের মান তত ভালো। উদাহরণ, পরিশ্রমের বিকল্প নেই।
পকেটমারিতে উন্নতি করতে চাইলেও পরিশ্রম। পি এইচ ডি রেকর্ড টাইমে শেষ করতে চাইলেও পরিশ্রম। ফলসিফায়েবিলিটি প্রায়, প্রায় না, সম্পূর্ণ শূন্য।
এর নিচের ধাপের উপদেশের উদাহরণ হচ্ছে পরচর্চা মহাপাপ। মহাও নয়, পাপও নয়, বিপজ্জনক ডেফিনিটলি। নিন্দের নিরাপদতম ক্যান্ডিডেটরা নৈর্ব্যক্তিক। আবহাওয়া। বাংলা সিনেমা। শারদীয়া সাহিত্য। চান্স পেলেই নিন্দে করুন। নিন্দে করে শুইয়ে দিন। ব্যক্তিবাচকের নিন্দে করতে হলে কালেক্টিভ নিয়ে শুরু করুন। আজকালকার প্রজন্ম। নারীবাদী। নিওলিব্যারালস। বুর্জোয়া পুঁজিবাদী। ব্যক্তিচর্চার আরাম করতে হলে শাহরুখ খান টাইপের লোক বাছুন, যিনি তারকা কাজেই পুরোপুরি ব্যক্তি নন। যেটা করবেন না সেটা হচ্ছে কমন চেনার সঙ্গে বসে আর একজন কমন চেনার নিন্দে। কর্মফল বা কেস - অবধারিত। অ্যাকচুয়ালি, কমন অচেনাকে নিয়েও করবেন না, কারণ আজকাল কেউ কারও অচেনা নয়। সবাই সবার ফ্রেন্ড নয় ফলোয়ার। এবার গাড়ি চালানোর সময় স্টিয়ারিং-এ দশটা দশ অবস্থানে হাত রাখা মার্কা উপদেশের কথা ভাবুন। গাড়ি, স্টিয়ারিং, হাত - যে কোনও একটা উপকরণ বদলে দিলে বা সরিয়ে নিলেই ইউজলেস। এগুলো হচ্ছে একেবারে নিম্নমার্গের উপদেশ। এ রকম উপদেশ দেওয়ার থেকে না দেওয়া ভালো।
ই হোক। এটা উপদেশের পোস্ট নয়। আমার এই দোষ, একটা বিষয় নিয়ে কথা বলতে বসে করে অন্য বিষয়ে পাঁচশো শব্দ খরচ করে ফেলি। ভাগ্যিস ব্লগের নাম অবান্তর রেখেছিলাম। বান্তর কথাটা হচ্ছে, আগাথা ক্রিস্টির একটা উপদেশ নিয়ে ভাবছি ক'দিন ধরে। বা উপদেশটার একটা অংশ নিয়ে। পুরো উপদেশটা গোয়েন্দা উপন্যাস কী করে লিখতে হয়, প্লট, ক্লু কীভাবে ফাঁদতে হয় ইত্যাদিসংক্রান্ত, যা অন্যান্য গোত্রের লেখার পক্ষেই হয়তো প্রযোজ্য নয়। জীবনের পথে তো নয়ই। কিন্তু উপদেশের ল্যাজায় পৌঁছে ক্রিস্টি যা বলেছেন, আমার অভিজ্ঞতায় লেখা বা জীবনেও কার্যকরী।
. . . অ্যান্ড দেন ইউ হ্যাভ টু রাইট ইট কুইকলি।
আমি নিজে কুইকনেসকে গুরুত্বের মইতে খুব ওপরের দিকে রাখি না। কারণ আমার বিশ্বাস যে কোনও কাজ বা প্রক্রিয়াতে সময় একটা উপকরণ এবং সে প্রক্রিয়া ঠিক করে নিষ্পন্ন করতে গেলে মাপমতো সময় দিতে হবে। সময়কে অগ্রাহ্য করে কাজ নামাতে গেলে কী হয় আজকালকার বাংলা সিনেমা বা শারদীয়া সাহিত্য তার প্রমাণ।
তবে ক্রিস্টি একেবারে হাওয়ায় কথাটা বলেননি। আমার মাথায় কথাটা যে ভাবে ঢুকেছে তা হচ্ছে - বিষয়টা কুইক বা স্লো-এর নয়, মোমেন্টামের। জাড্যের। জাড্য অতি জরুরি জিনিস। মানবসভ্যতায় জাড্যের গুরুত্ব নিয়ে যথেষ্ট সেমিনার হয়নি বলেই আমার ধারণা। গতি বা স্থিতি, দুই জাড্যের লুপই, পরিস্থিতিভেদে, জীবনের ভোল পাল্টাতে পারে। আমার সমস্যা সাধারণতঃ স্থিতিজাড্যে আটকে পড়া বা গতিজাড্য থেকে পিছলে যাওয়া। গতি দ্রুত হওয়ারও দরকার নেই। পাঁচশো শব্দের মোমেন্টামও মোমেন্টাম। সেটা ধরে রাখতে হবে। জাড্য হারাইলে সকলই হারাইল।
>পৌষমেলার পোস্টের যেটা হয়েছে। জাড্য হারিয়েছে, খেই হারিয়েছে, এবং ওই গুগল ডকটার তাকালেই আমার এখন বমি পাচ্ছে। আমার জীবন হচ্ছে সিরিজ অফ মাঝপথে ছাড়া, কাজেই মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া আমার মধ্যে যে পরিমাণ অপরাধবোধ এবং গ্লানির জন্ম দেয় তা আর কিছুতেই দেয় না। সেই গ্লানি নিয়েই পৌষমেলার পোস্টের শেষ কিস্তি লিখছি না। ওরও এই অবহেলা প্রাপ্য নয়, আমার এই অপরাধবোধে ভাজা ভাজা হওয়া প্রাপ্য হলেও সহনীয় নয়। কাজেই লো সিয়েন্তো। আদিওস। বুয়েনা সুয়ের্তে।
বদলে যেটা নিয়ে লিখছি, সেটা সদ্য ঘটেছে এবং যার জাড্য এখনও আমাকে ঠেলছে। বা নাকে দড়ি দিয়ে টানছে। সে ঠেলা বা টান আরও জোর হল যখন ইন্দ্রাণী জিজ্ঞাসা করলেন, অরুণাচল নিয়ে লিখবে তো কুন্তলা, আর আমি বললাম, লিখব তো বটেই কারণ না লিখলে আমার ভাত হজম হবে না।
অভিজ্ঞতা থেকে জানি, খুবই হজম হবে। সবই হজম হয়ে যায় যদি যথেষ্ট সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। পৌষমাসকে টেনেটুনে আশ্বিনে নিয়ে আসা যায়। তারপর পেছন ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, ওটা কি সত্যি লেখার মতো কিছু হাতিঘোড়া ব্যাপার হয়েছিল? ভালোই হয়েছে এই সব হাবিজাবি নিয়ে না লিখে। ভেবে যা গেছে তা গেয়ে খেল খতম করা হয়।
সেটা হতে দেওয়া যাবে না। পৌষমেলা গেছে যখন যাক, অরুণাচল আসুক।
*
রিমোট হাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে 'আমার সাধ না মিটিল' না 'সকলি তোমার ইচ্ছা' কোনটায় ক্লিক করব ভাবছি, অর্চিষ্মান এসে বলল, পাঁচদিনের ছুটি নিয়েছি, একটা বেড়াতে যাওয়ার জায়গা ঠিক করে ফেল দেখি কুন্তলা। ভালো দেখে।
একটা ভালো হাতের কাছেই আছে। আই এস বি টি থেকে রাতভর বাসে চড়ে জয়পুরের আর্যভবনে গিয়ে বডি ফেলব, সুন্দর সাজানো ঘরে ঘুমোব, ঘুম থেকে উঠে পুরি সবজি সাঁটিয়ে, খেলানো বারান্দায় চেয়ারটেবিল কুক্ষিগত করে ল্যাপটপ খুলে এই তো এক্ষুনি কাজ শুরু করছি বলে রিল দেখতে দেখতে বারোটা বাজাব, তারপর টেনশনে ঘেমে কোনওমতে একঘণ্টা তানানানা করেই লাঞ্চের লাইনে দাঁড়াব। প্রাণ ভরে ডাল রুটি গাঠঠে কা সবজি মুগ ডাল হালুয়া খাব। অর্চিষ্মানের লাল মাস বা জংলি মাস খেতে ইচ্ছে করলে চটি গলিয়ে, অটো ডেকে দোকানে যাব, অর্চিষ্মান জংলি মাস খাবে, আমি স্যালাডের প্লেট থেকে শশা তুলে রসুনের স্বর্গীয় চাটনিতে ডুবিয়ে মুখে পুরব আর টেবিলের ওপর ঝুঁকে পাশের টেবিলের এভিডেন্টলি বাঙালি দম্পতিকে নিয়ে ফিসফিসাব।
বললাম না, কারণ জানতাম হবে না। জয়পুর ভালো হলেও ভারহীন। অর্চিষ্মানের পাঁচদিন ছুটির মাহেন্দ্রযোগে নেক্সট পঞ্চাশ বছরে ঘটে কি না কে জানে, এর মর্যাদা রাখতে হলে যেতে হবে অক্সিজেন সিলিন্ডার চাগিয়ে লে লাদাখ, বিন্ধ্যপর্বত টপকে কেরালা, কালাপানি সাঁতরে আন্দামান। ওডিশা অনেকক্ষণ লড়াইতে ছিল, সবসময়েই থাকে। দারিংবাড়ি, কোরাপুট, গোপালপুর অন সি। ওডিশার জায়গাগুলো আমি, আমার ধারণা অর্চিষ্মানও, নাম দেখে যাওয়ার তাগিদ বোধ করে। কোরাপুট, পত্রপুটে পদ্মফুল নিয়ে মিষ্টি হেসে দাঁড়িয়ে আছে, ভিতরকণিকার ভেতর ঢুকলেই এককণা মুক্তো ঝকমকিয়ে উঠবে, পেখম মেলে ঘুরে ঘুরে নাচবে ঝলমলে ময়ূরভঞ্জ। সিমলিপালের আল ধরে, ক্ষুরের ধুলোয় সূর্যকে ডুবিয়ে বাড়ি ফিরবে মোষের পাল। তারপর কেউ না কেউ যাওয়ার পথে টুক করে পুরী হয়ে যাওয়া যায় কি না নাকি ফেরার পথে গোঁজা যায় খোঁজ নেবে এবং দেখা যাবে কোথাওই যাওয়া হয়নি, স্বর্গদ্বারের রেলিং-এ দুজনে দুটো লেবু চা হাতে বসে আছি।
নোপ।
অর্চিষ্মান দুয়েকবার পন্ডিচেরি যাবে নাকি বলেছিল, কিন্তু ইদানীং আমার একটা অ্যালার্জি ফ্লেয়ার আপ করেছে, পন্ডিচেরিকাটিং জলহাওয়া উপসর্গ বাড়িয়ে তুলতে পারে ভেবে শুনতে না পাওয়ার ভঙ্গি করলাম।
কারণ আমি জানতাম আসলে কোথায়, বা কোন দিকে যাওয়া হবে। আমার ধারণা, অর্চিষ্মানও জানত। এই যে অপশন নিয়ে আলোচনা, হোটেলের রিভিউপাঠ, আবহাওয়া অ্যানালিসিস - এগুলো নিজেদের প্রাপ্তবয়স্কতার প্রমাণ করার দায়। কিছুই রিসার্চ করলাম না, বর্ষায় ভিউ সুন্দর না বসন্তে খতিয়ে দেখলাম না, ল্যান্ডস্লাইড না একশো চুয়াল্লিশ ধারা খবর নিলাম না, ইচ্ছে করছে বলে চলে গেলাম, এ রকম অপরিণামদর্শিতা দেখায় শিশুরা। বা পঁয়তাল্লিশ বছরের ধেড়ে শিশুরা। অর্চিষ্মান এ সব মোটে পছন্দ করে না।
একঘণ্টা কাটল। পাঁচ মিনিট নীরবতা পেরিয়ে ঘুরন্ত ফ্যান থেকে চোখ নামিয়ে অর্চিষ্মান বলল, শোন না, নর্থ ইস্টই হোক নাকি?
মুখে 'হোক হোক', মনে 'বাপ রে বাপ রে বাপ ' বলে ল্যাপটপ বুক থেকে নামিয়ে টেবিলে রাখলাম। হওয়াতে হলে দ্রুত হওয়াতে হবে। এ গরমের ছুটিতে সিমলা কুলু মানালি যাওয়া নয় যে পয়লা জানুয়ারিতে টিকিট কেটে, সরস্বতী পুজোর আগে হোটেলবুকিং সেরে পয়লা বৈশাখে সুটকেস নামিয়ে রেডি স্টেডি অন ইয়োর মার্ক হয়ে থাকব। কিন্তু আজকের পক্ষে যথেষ্ট কাজ করা হয়ে গেছে, ভ্রমণের জন্য ভারতবর্ষের মানচিত্রের জেনারেল দিক বেছে ফেলেছি। আজ আর কিছু করা সম্ভব না। বাকিটুকু কাল হবে। তাছাড়া যা কাল করা সম্ভব তা আজ করে পাগলে। আমি ডেফিনিটলি পাগল নই। টিভিতে গ্যাংটকে গণ্ডগোল মৃদু ভলিউমে চালিয়ে, পিকচার অফ করে, পাশ ফিরে ফোনে অর্ধেক-পড়া ভয়ের উপন্যাসটা খুললাম, ও পাশে অর্চিষ্মান ল্যাপটপ খুলে খটাখট টাইপ শুরু করল।
*
পরদিন সকালে ক্যাফেতে পৌঁছলাম। লোকজন নেই। এখনও ঘণ্টাখানেক থাকবে না। অন্যদিন এই একঘণ্টা নিরুপদ্রব কাজের চেষ্টা করি, এমনকি গানও শুনি না, কিন্তু আর সাতদিন পরেই পাঁচদিন। হোয়াটসঅ্যাপ খুলে অর্পণকে খোঁচা দিলাম। ইউটিউব ফিডে চিগু ক্যাম্পের শর্ট প্রথম আসতে শুরু করার দুয়েকদিনের মধ্যে অর্পণের আনিনি ঘুরতে যাওয়ার খবর পেয়েছিলাম। অর্পণ কাজের লোক, পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ওর এজেন্টের ফ্লায়ারের পি ডি এফ পাঠিয়ে দিল। অর্পণ সম্ভবতঃ বলার চেষ্টা করেছিল যে এটা এমন কিছু হাতিঘোড়া ব্যাপার নয়, নিজেরাও দিব্যি বুকিং করা যায়, বিশেষ করে আমার যেহেতু লোকের সঙ্গে কথা বলতে খারাপ লাগে না, এজেন্টের ঘাড়ে বডি না ফেলে আমি নিজেই এটা নামিয়ে দিতে পারি।
মানছি যে আমার কখনওসখনও লোকের সঙ্গে কথা বলতে খারাপ লাগে না, কিন্তু সেগুলো স্ট্রিক্টলি অকাজের কথা। কাজের কথা আমি অর্চিষ্মানের সঙ্গেও যথাসম্ভব এড়িয়ে চলি। কাজেই এজেন্টই ভরসা।
একটাই খচ। ছ’দিন পাঁচরাতের ট্রিপে একটা শনি বা একটা রবি বলি হবে। শনিরবি আমাদের স্প্যানিশ ক্লাস। যে ক্লাসে আমি অ্যাদ্দিন হান্ড্রেড পারসেন্ট উপস্থিতি মেন্টেন করেছি। স্কুলকলেজ কামাই ব্যাপারটা আমার আসে না। কোনওদিন আসত না। আমাদের সময়েও অনেক পড়ুয়ারা, যারা বাবামা পড়তে বস বলার আগেই নিজেরাই বই খুলে সিলেবাস শেষ করে ফেলত, এই মোটা মোটা বিনুনি, এই মোটা মোটা চশমা, হাঁটা দেখলেই বোঝা যেত জীবনে কোথাও একটা না পৌঁছে থামবে না, কামড়াতে কামড়াতে নখ প্রায় অদৃশ্য, পূর্ণিমা অমাবস্যা ছাড়া হাসত না তারা স্কুলের কমিউটে সময় নষ্ট না করে বাড়িতে বসে পড়ত। তাতে নাকি বেশি পড়া হয়। আমি এই ব্যাপারটা কখনও বুঝিনি। আমার তো স্কুলে যেতে মারাত্মক ফুর্তি হত। কত মেয়ে। কত গল্প। কত মজা। ইন ফ্যাক্ট আমার মনে আছে, হায়ার সেকেন্ডারিতে স্কুলের শিক্ষিকারা আমাকে প্রায় কুমিরছানার মতো ডিস্প্লে করেছিলেন যে এই দেখো, রোজ স্কুলে আসত।
আমার আসলে রোজ কোথাও একটা যাওয়ার জায়গা লাগে। এই যেমন এখন ব্লু টোকাইতে আসি। সাতদিন। লোকে ভাবে আমার বোধহয় মারাত্মক কষ্ট হচ্ছে, ছুটিই পাচ্ছি না, কিন্তু আমার এটাই ছুটি। আমাকে দেখে বাকিরা হাসে যে ইনকো টেবিল কে বদলে বেড দে দো ইয়ার। শনিরবিবার জিমে ঢোকার আগে কফি নিতে ঢুকে আমাকে দেখে রীতিমতো বিরক্ত হন। জাস্ট টেল মি হোয়াই। আমি বলি বাড়ি থেকে পালানোর জন্য। তাতে তিনি বললেন যে আমার বাড়ি থেকে পালানোর কোনও যুক্তিই নেই কারণ বাড়িতে আমাকে ডিস্টার্ব করার কেউ নেই। আমি বললাম আরে দ্যাট ইজ দা প্রবলেম, ম্যায় খুদ হি খুদ কো ডিস্টার্ব কর দেতি হুঁ।
স্প্যানিশ ক্লাস শুরু হওয়ার পর প্রতি শনিরবিবার আমার বাড়ি থেকে পালানোর একটা নতুন জায়গা হয়েছে। আমাদের এ ওয়ান কোর্সের দুটো ভাগ, আ উনো উনো, আ উনো দোস। আ উনো উনো-তে একদিনও কামাই করি নি , আ উনো দোস-ও প্রায় মেরে এনেছি, এমন সময় বেড়াতে যাওয়ার প্ল্যান এসে মাথায় পড়ল। চেষ্টা করা হয়েছিল, রবিবার রাতে বেরিয়ে পরের শনিবার সকালে ফিরেটিরে কোনওমতে কামাই এড়ানো যায় কি না, গেল না। একটা ক্লাস কুরবানি দিতেই হবে।
আমার ক্লাসে যেতে সত্যি সত্যি ভালো লাগে। শেষ কবে জীবনে একটা কিছু এই রকম তেড়েফুঁড়ে করেছি মনে পড়ে না। স্প্যানিশ ক্লাস নিয়ে খেলিয়ে লিখব একটা পোস্ট। লিখতেই হবে। স্প্যানিশ ক্লাস আমার অস্তিত্বের ওপর ডোপামাইনের হোসপাইপ ধরেছে।
প্রফেসরাকে বলতে গেলাম। তিনি আমার থেকেও বেশি উৎসাহী হয়ে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ ঘুরে এস। আর্মি বাবার সুবাদে ভারতবর্ষ জুড়ে বড় হয়েছেন, ডুয়ার্সেও ছিলেন ক'দিন। আমরা পশ্চিমবঙ্গের লোক শুনে প্রথমদিনই উত্তেজিত হয়ে ফোন খুলে ভিডিও দেখিয়েছিলেন, সন্ধেবেলায় কোয়ার্টারের বাগানে একটা মোটামতো হাতি ঢুকে বিনা অনুমতিতে কলার কাঁদি পেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওঁরা জানালার এপাশ থেকে উত্তেজিত ফিসফাসসহ ভিডিও তুলেছেন। অরুণাচল বেড়াতে যাচ্ছি শুনে বললেন, আরে যাও যাও, সেদিন ক্লাসে বেশি জরুরি কিছু করাব না, ঘাবড়িও না।
কামাই না করা-সংক্রান্ত বাতিক নয়, ক্লাস মিসের অন্য একটা উদ্বেগও আছে। আমরা যাচ্ছি আ উনো দোস-এর বারো সপ্তাহের একেবারে শেষ সপ্তাহে। শুক্রবার ফিরব,শনিবার কোর্সের তিনটে গ্রেডেড অ্যাসাইনমেন্টের শেষটা হবে। মার্কেটপ্লেস এক্সারসাইজ। আমাদের দোকান দিতে হবে, সত্যি জিনিসের সত্যি দোকান। তারপর গোটা ইন্সটিটিউটের ছাত্রছাত্রী দিদিমণি মাস্টারমশাইরা এসে সে দোকান থেকে জিনিস কিনবেন, তাঁদের সঙ্গে আমাদের স্প্যানিশে কথোপকথন করতে হবে। কত দাম, ডিসকাউন্ট আছে কি না, ক্যাশ না ইউ পি আই। সব স্প্যানিশে। ইংরিজি হিন্দি বেরিয়ে পড়লে মরা মাছের মতো তাকিয়ে থাকবেন, যেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। তারপর প্রফেকে গিয়ে লাগাবেন আর আমার নম্বর ঘ্যাচাং হবে। আমি মসৃণ এস্প্যানিওলে বাতচিত করব সে আশা কেউ করছে না কিন্তু ভুলভাল বলারও একটা সীমা রাখতে হবে আরকি। এই দুঃস্বপ্ন সামলে উঠতে না উঠতে রবিবারের ফাইন্যাল পরীক্ষা।
জামাকাপড় ঢোকানোরও আগে বইখাতা ব্যাগে ঢোকালাম। বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে রিভিশন দিতে হবে। একটা ভালো ব্যাপার, একজন ক্লাসমেট সঙ্গে থাকবে, একসঙ্গে রিভিশন দেওয়া যাবে।
*
বারোটায় ফ্লাইট। বাড়ি থেকে বেরোতে দেরি হয়েছিল কিন্তু ব্রিকস-এর জন্য রাস্তা ফাঁকা, হুস করে পৌঁছে গেলাম। আমরা হচ্ছি সেই টাইপের লোক, একা একা মোছামুখে ঘুরি, দোকা হলেই নৃসিংহঅবতার ধারণ করি। আমি আগে ভাবতাম আমিই এ রকম, তারপর একদিন অর্চিষ্মান কোন একটা এক্সোটিক জায়গা থেকে ফিরে বলল, একদিক থেকে অপচয়, জানো। ও নাকি এক্সোটিক জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে ভাবছিল কুন্তলা থাকলে এই মজাগুলো কত বেশি উশুল করা যেত।
লাফিয়ে হায়েস্ট ফাইভ দিলাম। এক্সোটিক জায়গার দরকার নেই, আমার তো দু'নম্বর মার্কেটের মজাও অর্চিষ্মান ছাড়া উশুল হয় না। একা একা দু'নম্বরে যাওয়া, শাস্তি। কাকতালীয়ই হবে, কিন্তু আমি যখনই একা দু'নম্বরে যাই, গুচ্ছ খারাপ কাজ সঙ্গে যায়। ইলেক্ট্রিশিয়ানকে খবর দাও, জেরক্স করাও। ফোনের সাউন্ড কেন আপনাআপনি নেমে যাচ্ছে, পনেরোদিন আগে কেনা ইয়ারফোনের এক কান বাজছে না। অর্চিষ্মান গেলে এ সব থাকে না। এত বছর ধরে রোজ দেখা নোংরা বাজার, সম্পূর্ণ নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। এত মজা একসঙ্গে ঝাঁপায় যে আমরা অনেকসময় স্ট্র্যাটেজি করে দুজনে দুদিকে চলে যাই, আমি করুণাদির মোমোর দিকে, অর্চিষ্মান আলুর চপের দিক। ফুচকার সামনে মিট করার কথা দিয়ে। মিট করে দেখি আলুর চপের সঙ্গে ও অন্নপূর্ণা থেকে পান্তুয়া প্যাক করিয়েছে, দুজনে ফুচকা খাই। আমার খুব ইচ্ছে হলে আলুকাবলি প্যাক করাই। তারপর দুজনে দু'কাপ চা নিয়ে বাড়ি।
এয়ারপোর্টেও অনেকদিন পরে দুজনে একসঙ্গে গেছি। কাজেই যা যা মজা আছে উশুল করব। এমনকি যেগুলো ডেফিনিটলি মজার নয় যেমন লাইন দিয়ে লাউঞ্জে ঢোকা, সেগুলো থেকেও মজা নিষ্কাশনের অ্যাটেম্পট নেব। গেলাম। লম্বা লাইন। একা থাকলে হারগিজ দাঁড়াতাম না। ফুডকোর্টে কার্ণাটিক ক্যাফে দোকান খুলে বসে আছে, ওঁদের প্লাগপয়েন্টওয়ালা সিটটা আমি চিনি, এককাপ ফিল্টার কফি আর এক প্লেট ইডলি নিয়ে সোজা চলে যাব। বোর্ডিং পর্যন্ত নড়ব না।
কিন্তু এখন আমি একা নই, অর্চিষ্মান আছে। লাগালাম লাইন। সে এক দেখার মতো ব্যাপার। লোকজন ওয়ালেট খুলে যত ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড, মেট্রো পাস, অফিসের আই কার্ড, কোভিড ভ্যাকসিনেশন কার্ড, আধার, প্যান, ভোটার কার্ড সব চেক করাচ্ছে, লাউঞ্জ ফেসিলিটি আছে কি না দেখতে। দুই ভদ্রলোকের বারোটা কার্ডে দুটো লাউঞ্জ বেরিয়েছে, তাঁরা লাইন আটকে শলা করছেন, ফিমেললোগকো পহেলে ভেজ দেতে হ্যায়। তারপর কর্তৃপক্ষকে গলা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করছেন, ফিমেলরা বেরিয়ে এলে মেলরা ঢুকতে পারেন কি না। আমাদের কার্ড চেক হয়ে গেছে, মেল ফিমেল দুজনে চার হাত তুলে লাউঞ্জে ঢুকে পড়লাম। সিট বেছে ব্যাগ রেখে খাবারের সন্ধানে বেরোলাম। এটা আমাদের খাওয়ার সময় নয়, খিদেও পায়নি, তবু খাব। চতুর্দিকে কাউন্টারে বিভিন্ন রকম খাবারদাবার। পরোটা ইত্যাদি ভেতরের রান্নাঘর থেকে রান্না হয়ে আসছে, আন্ডা ভুরজি, দোসা ইত্যাদির কাউন্টারে লাইভ অ্যাকশন। যেটা সব কাউন্টারেরই কমন, কারণ এটা ভারতবর্ষের কমন - লাইন। আর বিবাহ থাকলেই বিবাহবহির্ভূতর মতো, লাইন থাকলেই লাইন ভাঙা থাকবে। এখানের লাইনটা ঠিক টিকিটকাউন্টারের লাইনের মতো নয়, চাইলেও ধাক্কাধাক্কি করা সম্ভব না, কারণ অত লোক নেই, তা সত্ত্বেও লোকে কীভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে দেখার মতো ব্যাপার। এই ভাঙাটা ঠিক প্রয়োজনের না, এটা একটা অন্য, অবচেতনের ঠেলা। আমি দোসার লাইনের অন্তে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। একটা দিব্যি সাপের মতো লাইন, কফি মেশিনের সামনে থেকে শুরু হয়েছে, গান্ধারীও মিস করতে পারবেন না, কিন্তু কিছু লোক লাইনটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে কাউন্টারের ঠিক সামনে গিয়ে উদাস মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। যাঁরা লাইন দিয়েছেন তাঁর নিজেদের অলরেডি নিড়বিড়ে প্রমাণ করেছেন কাজেই লাফিয়ে পড়ে প্রতিরোধ গড়বেন না, তাছাড়া অত দায়ও নেই, এটা আফটার অল দোসার লাইন ট্রেনের টিকিটের না। কাজেই লাইনভাঙারা আগেভাগে দোসা নিয়ে বেরিয়ে যাবেন।
যদি না কর্তৃপক্ষ বাগড়া দেন। সাধারণতঃ দেন না, তোদের ব্য্যাপার তোরা সারভাইভ্যাল অফ দা ফিটেস্ট বুঝে নে মুখে দোসা বানাতে থাকেন, কিন্তু এই দিদি ব্যতিক্রম। একহাতে বাটি দিয়ে ব্যাটার ঘোরাচ্ছেন, অন্য হাত তুলে কড়া গলায় বলছেন, আপ পিছে যাইয়ে, লাইন সে আইয়ে। আমি মুগ্ধ চোখে দেখছি। তারপর আমি লাইনের প্রথমে পৌঁছে গেলাম আর দোসা নিয়ে টেবিলে ফিরে এলাম। কফি নিতে হবে, কিন্তু হাত খালি নেই, দোসা রেখে আবার আসব, অর্চিষ্মান নির্ঘাত অরেঞ্জ জুস খেতে চাইবে, একটা কফি একটা অরেঞ্জ জুস নিয়ে আসব।
অর্চিষ্মান নেই। আমাদের ব্যাকপ্যাক দুটো পড়ে আছে। টেবিলে বসলাম। ব্যাকপ্যাক থাকলে রেখে যদি বা যেতে পারি, খোলা খাবার রেখে খুঁজতে বেরোনোতে মন সায় দিল না। বসে আছি, একটা হুশ হুশ হ্যাট হ্যাট কানে এল। কিছু লোক দৌড়ে এদিকে আসছে। আমি যথাসম্ভব সিঁটিয়ে, শরীর দিয়ে আমার সম্বরের বাটি আড়াল করার চেষ্টা করলাম। ভিড় আমি পর্যন্ত পৌঁছনোর আগেই ছত্রাকার হয়ে গেল। তখন দেখি অর্চিষ্মান দু'হাতে দুটো গ্লাস নিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে হেঁটে আসছে। আমার সামনে কফি, নিজের সামনে অরেঞ্জ জুসের গ্লাস রেখে বসল। স্ক্র্যাম্বলড এগের কাউন্টারে বেশি ভিড় হয়ে যাওয়াতে লাইন ভেঙে কাউন্টার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন কর্ডন করে দেওয়া হচ্ছে যাতে চাইলেও কেউ লাইন দিতে না পারে। ওই ছুটন্ত ভিড়, তাড়া খাওয়া আন্ডা ভুরজির লাইন।
বললাম, তুমিও নিশ্চয় লাইনে ছিলে, তুমি তাড়া খেয়ে কোনদিকে দৌড়লে, কফির দিকে? অর্চিষ্মান মুচকি হেসে জানাল লাইনে ও ছিল না। থাকতে পারত, কারণ ডিম খাওয়ার কথাটা ওর মাথাতেও এসেছিল, কিন্তু বাকি সব কথার মতোই, অর্চিষ্মান কথাটা নাড়ছিলচাড়ছিল, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, নানা দিক ও কোণা থেকে তলিয়ে দেখছিল আর কফি বানাচ্ছিল। এই করতে করতেই লাইনে তাড়া পড়েছে কাজেই অর্চিষ্মানকে আর দৌড়োদৌড়ি করতে হয়নি।
দোসাটা ফাটাফাটি বানিয়েছেন দিদি। জানতাম। যার দ্বারা হয়, সবই হয়। খেতে খেতে আমরা নানারকম হাবিজাবি গল্প করছি, এদিকসেদিক দেখছি। আমার ডানদিকে আর অর্চিষ্মানের বাঁদিকে একটু দূরে, একটা জায়গা। নিভু নিভু। ফাঁকা ফাঁকা। অর্চিষ্মান বলছে ও নাকি কখনও এক্সপ্লোর করেনি। কারণ ওদিকটা এত বেশি ফাঁকা ফাঁকা, এত বেশি নিভু নিভু, এত বেশি টুংটাং যে অর্চিষ্মান ধরে নিয়েছে, যে ওটা মনে হয় নর্ম্যাল লাউঞ্জের বাইরে। ঢুকতে গেলে নির্ঘাত কেউ বকবে। একা থাকলে আমিও তাই ধরতাম। কিন্তু আমি এখন একা নই। আমি এখন দোকা। একা বকা খেলে অপমানে কান লাল হত, এখন দুজনে মিলে বকা খেয়ে ফিরে এসে বকিয়ের পিণ্ডি চটকাব। তারপর রাগ মেটাতে দিদির আর একটা চমৎকার দোসা নিয়ে এসে খাব।
বিয়ের দরকারটা কী জিজ্ঞাসা করতে মায়ের উত্তরের মর্ম এখন বুঝতে পারি। মা বলেছিলেন, কোনও দরকারই নেই । কিন্তু জীবন যখন ঘোল খাওয়াবে - মা এই ভাষায় বলেননি, মায়ের ভাষা অনেক সংযত ও পরিশীলিত ছিল, দুঃখকষ্ট জাতীয় শব্দ ব্যবহার করেছিলেন নিশ্চয় - সেটা একা একা খাওয়া অনেক বেশি কষ্ট। কষ্ট পেতে পেতে যদি দেখা যায় আরও একটা লোক সেই একই কষ্ট পাচ্ছে, কষ্ট সামহাউ কম হয়। মোদ্দা কথা, একসঙ্গে ঘোল খাওয়ার নিশ্চয় বিয়ে ছাড়াও অনেক রাস্তা আছে, তবে বিয়ে ট্রায়েড অ্যান্ড টেস্টেড।
কেউ বকল না। আমরা গিয়ে গদিআঁটা চেয়ারে বসে পড়লাম। গদি তেমন পুরু নয়, তবে চেয়ারে আমি হাতপা নিয়ে গোটা ঢুকে যাব। এদিকওদিক দেখে বাটার জুতো খুলে দুই পা বাবু হয়ে চেয়ারের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ভুতের গল্পটা পড়তে লাগলাম। এত আরাম লাগছিল। এই যে কিছুই লেখা হচ্ছে না, মনে হয় চেয়ারের অভাবে। এই রকম একটা চেয়ার পাই তো মহাকাব্য লিখে ফেলি। উল্টোদিকে অর্চিষ্মানের ফোন বাজছে, ওর অফিসে কী একটা আগুন লেগেছে, ব্যাগ থেকে ল্যাপটপ বার করে টাইপ করতে লেগেছে। এই করে করে বোর্ডিং-এর টাইম হয়ে গেল, ব্যাগ গোছাচ্ছি, অর্চিষ্মান বলছে, কুন্তলা, অত তাড়াহুড়োর কিছু নেই, তোমাকে না নিয়ে প্লেন যাবে না। ওর দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিপাত করছি। কারণ আমাকে শুধু নয়, আমার সঙ্গে ওকে শুদ্ধু না নিয়ে প্লেন চলে গেছে। এবং সেটা হয়েছে দুজনে একসঙ্গে ছিলাম বলেই। কলকাতায় কফি বিন টি লিফে বসে খাচ্ছিলাম, প্লেন রাইট টাইমে ছেড়ে চলে গেছিল। আমরা সময়ের একঘণ্টা আগে পৌঁছে, এয়ারপোর্টে বসে প্লেন মিস করেছিলাম। আমি এখনও শিওর নই এই ঘটনা কী করে দুজন প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে ঘটতে পারে, কিন্তু ঘটেছে।
অর্চিষ্মান উড়িয়ে দিল।
আহা, ও তো মাত্র একবার হয়েছে।
ক’বার হলে যথেষ্ট হবে? তিন?
প্লেনে উঠে পড়লাম। যে ব্রিকস-এর কারণে বাড়ি থেকে লেটে বেরিয়েও আগেভাগে এয়ারপোর্টে পৌঁছেছিলাম, সেই ব্রিকস-এর কারণেই আগেভাগে বোর্ডিং সেরেও প্লেন লেটে ছাড়ল। ভেরি ইমপর্ট্যান্ট পার্সনরা বায়ুপথে গতায়াত করছেন বলে আমাদের হেঁজিপেঁজি এরোপ্লেনকে রানওয়ের কোণে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। পাইলট খ্যারখ্যার মাইকে জড়ানো উচ্চারণে কৈফিয়ত দিচ্ছেন। আমার কেন যেন ধারণা আগে পাইলটরা এত কথা বলতেন না। ইঞ্জিনে আগুনটাগুন না ধরলে। এখন দশ মিনিট দেরি হলেও এই যে চার্পি কণ্ঠে বিশ্বের খবর দিতে হয়, আমি বিশ্বাস করি না এটা ওঁরা যেচে করেন, নির্ঘাত ওপর থেকে বলেছে পাবলিক রিলেশন বাড়াও, বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার কর। প্রতিযোগী এয়ারলাইন্সের পাইলট টেল উইন্ডের খবর দিয়েছেন, তুমি ব্রেকিং নিউজ পড়ে শোনাও। যে রেটে ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে, কোনদিন মাইক তুলে, আজ্ঞে, আমি ছান টান করেই পুঁইশাক চচ্চড়ি আর কুমড়ো ছেঁচকি দিয়ে চাট্টি ভাত খেয়েই অমনি বেরিয়েছি - অবিশ্যি পাঁজিতে কুষ্মাণ্ড ভক্ষণ নিষিদ্ধ, কিন্তু কি হল জানেন? আমার কুমড়োটা পচে যাচ্ছিল কিনা - এই সব শুরু করবেন।
ভি আই পি-দের প্লেন উড়ে গেল। পাইলট মাইকে কেবিন ক্রু গেট রেডি ফর টেক অফ বা ওই গোছের কিছু নির্দেশ দিলেন। কেবিন ক্রু-রা নিজের নিজের সিটে বসে বেল্ট বাঁধলেন। আমাদের প্লেন দৌড়ে আকাশে উঠে পড়ল।
(চলবে)
Comments
Post a Comment