December 03, 2013

ভেঙে মোর দোরের তালা



সোনালি কাজ করা নবটা ধরে টানতেই একটা সংক্ষিপ্ত “ক্লিক” আওয়াজ করে দুটো পাল্লা একে অপরের গায়ের সঙ্গে সেঁটে গেল। সংক্ষিপ্ত কিন্তু দৃঢ় আওয়াজআমার মতো হরবখত ইনডিসিশনে ভোগা, হুঁ-হ্যাঁ-মানে-কিন্তু-যদি-ইয়ে-আচ্ছা-দেখি-বোধহয়-হয়তো-নয়তো ইত্যাদি একশোগণ্ডা কমজোরি আওয়াজ নয়, এককথায় নিজের মত প্রকাশ করে সেই মতে গ্যাঁট হয়ে থাকা আওয়াজ।

কাব্যেসাহিত্যে এই ধরণের গোঁ-কে গ্লোরিফাই করে দেখেছি। বলে এই রকম গোঁ না থাকলে নাকি জীবনে কোথাও পৌঁছনো মুশকিল। এক কোচিং ক্লাসের স্যার সপ্তাহে তিনবার আমাদের এইরকম একগুঁয়ে হওয়ার উপদেশ দিতেনবলেছিলেন একটা লক্ষ্য স্থির কর, করে সেইদিকে ছুটে চল। ঠুলি আঁটা ঘোড়ারা যেমন ছোটে। পথে শত শত বাধা, প্রলোভন, সুপারহিট মুকাবলা, পাড়ার দাদা ইত্যাদি আসবে, তাদের দিকে দৃকপাতমাত্র কোর না। ঠুলি আঁটা ঘোড়ারা যেমন করে না। তাহলেই দেখবে একসময় লক্ষ্য তোমার হাতের মুঠোয় এসে গেছে।

স্যারকে আমি ভীষণ ভয় পেতাম, ভক্তিও করতাম ততোধিককাজেই মুখের ওপর তাঁর কথার বিরোধিতা করার প্রশ্নই ওঠেনি কখনও। কিন্তু ঠুলি আঁটা ঘোড়া হওয়ার স্যারের পরামর্শটা কোনওদিনই মনে ধরেনি আমার। লক্ষ্য না হয় পেলাম, তার পর কী? ঠুলি আঁটা ঘোড়াকে কেউ কখনও সেই লক্ষ্যে চুমু খেয়ে মাথার ওপর তুলে ধরে ক্যামেরার সামনে পোজ দিতে দেখেছে? নাকি তোয়ালে ঘাড়ে প্রেস কনফারেন্সে বসে হাসিমুখে ইন্টারভিউ দিতে শুনেছে? সে সব দিচ্ছে দেখুনগে অন্য লোক, ঠুলি আঁটা ঘোড়া ততক্ষণ অন্য রেসকোর্সে ছুটতে গেছে, অন্য কারও লক্ষ্যপূরণের জন্য।

কিন্তু আমি হতে না চাইলেই যে অন্য কেউ হতে চাইবে না এমন তো কোথাও কোনও টেস্টপেপারে লেখেনি, অনেকেই ঠুলি আঁটা ঘোড়া হতে চায়, ভালোবেসেই চায়। আমার চেনা অনেক লোককেই চাইতে দেখেছি। বৃহস্পতিবার সকালে আবিষ্কার করলাম এমনকি আমার বাড়ির দরজাটাও চায়। আমি তার পায়ে ধরে সাধলাম, দুমদাম ধাক্কালাম, কান ধরে মোচড়ালাম, বললাম, “ওগো তুমি একটিবার ফাঁক হও গো, আমার চাবিটা যে ভেতরে রয়ে গেছে...” দরজা বিন্দুমাত্র হেলল না। ঠুলি আঁটা গোঁয়ার ঘোড়ার মতো ক্ষুর মাটিতে গেঁথে দাঁড়িয়ে রইল। 

কাজেই ধাক্কাধাক্কিতে ক্ষান্ত দিয়ে আমাকে এ গ্যাঁড়াকল থেকে মুক্তির অন্যান্য সমাধানের রাস্তা ভেবে দেখতে হল। সবথেকে সোজা এবং সবথেকে কার্যকরী সমাধানের কথাটাই প্রথমে মনে এসেছিল---ব্যাগ খুলে মাকে একটা ফোন করা এবং চেঁচিয়ে বলা, “মা, মা, ভীষণ বিপদ। শিগগিরি একজন চাবিওয়ালা জোগাড় করে চলে এস তো” কিন্তু বলাই বাহুল্য সেটা করা গেল না। মা আর সেই মা নেই। সেয়ানা হয়ে গেছেন। আমি এদিকে নিজেকে লকড্‌-আউট করে ভয়ে টেনশনে ঘামছি, আর উনি বাবার সঙ্গে সান্তালবাড়ির গেস্টহাউসের বারান্দার দোলনা চেয়ারে বসে পা দুলিয়ে মকাইবাড়িতে চুমুক দিচ্ছেন। গতকালের আনন্দবাজার ভাঁজ করে পাশে রাখা আছে, চা শেষ করে ইচ্ছে হলে পড়বেন, ইচ্ছে না হলে ডুয়ার্সের বিস্তৃত বনানীর শান্ত নীরবতায় আরও একটুখানি চোখ সেঁকবেন। আমি এদিকে মরলাম না বাঁচলাম, অত তুচ্ছ ব্যাপার তাঁর মগজে এখন জায়গাই পাবে না।

জঘন্য।

এই সব মনে পড়ে আমার এমন রাগ হয়ে গেল যে টেনশনমেনশন ভুলে আমি দুমদাম করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিজেই চাবিওয়ালা খুঁজতে বেরোলাম। নামতে গিয়ে দেখি বিল্ডিং-এর কেয়ারটেকার হাঁটু চেপে ধরে বাবাগোমাগো করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছেন, হাতে একতাড়া চিঠিচাপাটি। আমি তাঁকে আমার সমস্যাটা ডাম্বশারাড করে বুঝিয়ে বলতে, তিনিও উল্টে ডাম্বশারাডে তাঁর উত্তর আমাকে জানিয়ে দিলেন। ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে পড়ার মতো করে দুই হাত মাথার ওপর তুলে, দুই কাঁধ কানের কাছে তুলে নিয়ে গিয়ে, ভুরু কপালে তুলে নিচের ঠোঁট বাইরের দিকে ঠেলে বার করে দিলেন।

এই সিনেমার নাম গেস করার জন্য রটেনটোম্যাটোস্‌ গুলে খাওয়ার দরকার নেই---“নিজের রাস্তা নিজে দেখ”।

ততক্ষণে আমি বুঝে গেছি আজ আর অফিস পৌঁছনোর আশা নেই। অন্তত টাইমে পৌঁছনোর তো নেইই। রাস্তায় নেমে হাঁটতে শুরু করলাম। দুদিকের দোকানপাট দেখতে দেখতে, কোন দোকানে তালাচাবি সংক্রান্ত ব্যাপার থাকতে পারে সেই জরিপ নিতে নিতে। মিনিট পনেরো হেঁটে সুবিধে না হওয়ায় পাশের একটা মিনি সুপারমার্কেটে ঢুকে ক্যাশিয়ারের দ্বারস্থ হলাম। এক ভদ্রমহিলা সক্কালসক্কাল লিপস্টিক কিনতে বেরিয়েছিলেন, তাঁকে বিদেয় করে ক্যাশিয়ার আমার দিকে তাকিয়েই যা বোঝার বুঝে নিয়ে “বোঁজুঁ”র বদলে বলে উঠলেন, “গুড মর্নিং।”

যাক, এবার আর খেলাধুলোর ব্যাপার নেই আমার সমস্যার কথা শুনে তিনি ভাঙাভাঙা ইংরিজিতে বুঝিয়ে দিলেন কোনদিকে গেল চাবিওয়ালার খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। আমি তাঁকে নুয়ে পড়ে একগাদা মেহ্‌সি-টেহ্‌সি বলে সেই দিকে রওনা দিলাম।

ভদ্রলোকের দেখানো পথে মিনিট তিনেক হাঁটতেই দেখি এক দোকানের জানালায় সারিসারি নতুনপুরনো তালাচাবি ডিসপ্লে করা। দেখেই আমার মন আশায় নেচে উঠল। কিন্তু বিধি বাম। আবার পাঁচমিনিট ডাম্বশারাড, আবার সেই একই সিনেমার ক্লু। যেটুকু বুঝলাম, ভদ্রলোকের দোকানে উনি বই আর লোক নেই। কাজেই দোকান বন্ধ করে আমার সঙ্গে দরজার তালা ভাঙতে যেতে উনি অপারগ

যুক্তি অকাট্য। দোকানের বাইরে বেরিয়ে এসে আমি বুঝলাম আমার কেরামতি শেষ, এবার লোকের ঘাড়ে বডি না ফেললে চলবে না। ওয়াফাকে ফোন করলাম।

ওয়াফার কথা মনে আছে? ওয়াফা আমার বাড়িওয়ালির প্রতিনিধি। ওয়াফাই আমাকে প্রথম বাড়িতে ঢুকিয়ে, তালাচাবি বুঝিয়ে, দোকানপাট চিনিয়ে দিয়েছিল। ওয়াফাকে ফোন করে পুরো ঘটনাটা বলতে ওয়াফা বারদুয়েক “ওহ্‌ মাই গড” বলে তারপর বলল আচ্ছা ও দেখছে কী করা যায়।

নিজের হাতে যা যা করার ছিল সব করে ফেলার পর মনে কেমন একটা শান্তির ভাব জাগে না? আমার তূণের সব অস্ত্র শেষ এবার তোরা যে যা পারিস কর, এই আত্মসমর্পণের মধ্যে একটা অদ্ভুত আরাম লুকিয়ে থাকে গুটিগুটি হাউসিং-এ ফিরে, তিনতলায় উঠে এসে কাঁধ থেকে ভারি ব্যাকপ্যাকটা নামিয়ে, আমার ফ্ল্যাটের গোঁয়ার দরজাটার পাশের সিঁড়িতে বসে হাঁফ ছাড়লাম।

একদিক থেকে দেখলে আমার অবস্থা খুব একটা খারাপ ছিল না। ব্যাকপ্যাকে পাসপোর্ট ছিল, অফিসের আই কার্ড ছিল, মানিব্যাগ ছিল, মানিব্যাগের ভেতর মানি এবং ডেবিট কার্ড দুইই ছিল। ফোন ছিল, ফোনে প্যারিসে থাকা চেনা লোকজনের নম্বর ছিল---যদি কিছুই না হয় তবে রাত্তিরে কাউকে ফোন করে তার বাড়িতে চলে যাওয়া যাবে। ছোট্ট টিফিনবাক্সে জুকিনি, মাশরুম আর হ্যাম দিয়ে রাঁধা পাস্তা ছিল অন্যদিন ভুলে যাই, সেদিন মনে করে চামচটাও নিয়ে বেরিয়েছিলাম। আর সবথেকে ভালো যে জিনিসটা ছিল সেটা হচ্ছে অফিসের ফ্রি লাইব্রেরি থেকে তুলে আনা একটা সবে শুরু করা গল্পের বই।

সে গল্পের নায়িকা হলিউডের মহা সাকসেসফুল পরিচালক। মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে গোল্ডেন গ্লোব, গোল্ডেন বিয়ার, গোল্ডেন লোটাস, ক্রিটিকস্‌ চয়েস ইত্যাদি তুলে নিয়েছেন, বাকি আছে কেবল অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড। (গল্পের শেষ সিনে অবশ্য অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের অনুষ্ঠানে সে বছরের বেস্ট ডিরেক্টরের নামে আমাদের নায়িকার নাম ঘোষণা হচ্ছে আর আমাদের সাড়ে ঊনচল্লিশ বছরের নায়িকা কাঁদতে কাঁদতে স্টেজের দিকে চলেছেন।) নায়িকার হাইট পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি, মাপ আটত্রিশ-চব্বিশ-বত্রিশ, মোমের মতো ত্বক, মেঘের মতো কেশ, দিঘির মতো চোখ, শিশুর মতো মন। এমন চেহারা নিয়ে উনি ক্যামেরার ওদিকে না থেকে এদিকে কী করছেন যদি জানতে চান ভুল কিছু করবেন না। কেরিয়ারের শুরুটা উনি হিরোইন হিসেবেই করেছিলেন, ডেবিউ ছবিতেই বেস্ট অ্যাকট্রেসের নমিনেশনও পেয়ে গিয়েছিলেন---গোল্ডেন গ্লোব, গোল্ডেন বিয়ার, গোল্ডেন লোটাস এবং ক্রিটিকস্‌ চয়েস অ্যাওয়ার্ডে। জেতেননি, কারণ জিতলে গল্পটা আনরিয়্যালিস্টিক হয়ে যেত। প্রথম সিনেমায় ঝড় তুলে দিয়েই অবশ্য আমাদের নায়িকা উপলব্ধি করেছিলেন, গ্ল্যামারের জীবনের প্রতি তাঁর কোনও টান নেই, তাঁর আসল টান হচ্ছে আর্টে।

অগত্যা হলিউড ব্লকবাস্টার সিনেমার পরিচালক।

সিঁড়িতে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমি পড়ে চললাম, আর আমার চারপাশে হাউসিং-এর জীবন রোজকার ছন্দে বয়ে চলল। যে ছন্দটা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার কখনও আসে না।

প্রথমেই নিচের ফ্লোরে দল বেঁধে মিস্ত্রিরা এলেন। মাঝে মাঝে শনিবার ঠুকঠাক দুমদাম আওয়াজ পেয়ে বুঝতাম নিচের তলায় কাজ চলছে, কিন্তু সে কাজের পুরোদমের নমুনা সেদিন প্রথম পেলাম। ভারি ভারি বুট পরা পা ক্রমাগত মার্চ করে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে লাগল, দমাদ্দম হাতুড়ি পিটতে লাগল, ব্যারিটোন গলায় দু-একটা সংক্ষিপ্ত কথোপকথন শোনা যেতে লাগল। আর এই সব ছাপিয়ে গোটা বাড়ি কাঁপিয়ে ধাঁইধাঁই করে বাজতে লাগল ফ্রেঞ্চ হিপহপ সংগীত। (ফ্রেঞ্চ এবং হিপহপ, দুটোই অবশ্য আমার আন্দাজ, কিন্তু আমি কী বোঝাতে চাইছি সেটা নিশ্চয় আপনারা বুঝতে পেরেছেন। বাংলায় যাকে “বিটের গান” বলে সেই জিনিস।) একটু পরে আমার ওপরের তলার বাসিন্দা গটমটিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে অফিস গেলেন। যাওয়ার আগে অবশ্য আমাকে বিনীত স্বরে “বোঁজুঁ” বলতে ভুললেন না। তাঁর গায়ে দেখলাম পুলিশের ইউনিফর্ম। মাথার ওপর সকালসন্ধ্যে ধুমধাম শব্দের একটা কারণ পাওয়া গেল, এক্সারসাইজ করেন নির্ঘাত।

ঘণ্টাখানেক পর ওয়াফার ভাই এলেন চাবিওয়ালা সঙ্গে নিয়ে। ভাই ইংরিজিতে “ইয়েস নো ভেরিগুড” বলতে পারেন, চাবিওয়ালা ভদ্রলোক সেটাও পারেন না, আর আমি ফ্রেঞ্চে কেবল মাথা নাড়তে পারি। কাজেই আমাদের একে অপরের সঙ্গে আড্ডা মেরে সময় নষ্ট করার কোনও সুযোগ ছিল না। চাবিওয়ালা পত্রপাঠ কাজে নেমে পড়লেন।

অবশ্য কাজ না বলে তাকে দক্ষযজ্ঞ বলাই উচিত। চাবিওয়ালা প্রথমে খুব হেলাভরে একটা এক্সরে প্লেট ঢুকিয়ে হেলায় কাজ সারতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমার দরজাকে তো চেনেন না। এক্সরে প্লেট ক্রমে ঘুঁষি, ঘুঁষি ক্রমে লাথিতে পরিণত হল, আমার গোঁয়ারগোবিন্দ দরজা সিকি মিলিমিটারও হেলল না।

ভদ্রলোক ভুরুর ঘাম মুছে অবশেষে তাঁর বাক্সের দিকে হাত বাড়ালেন। বাক্স থেকে বেরলো হাতখানেক লম্বা ছোরা, হাতুড়ি, লোহার ডাণ্ডা এবং ড্রিল মেশিন। আমি সত্যি ভেবেছিলাম গল্পে সিনেমায় যেমন দেখায়, ভদ্রলোক তেমনি আলগোছে আমার মাথা থেকে একটা চুলের কাঁটা টেনে বার করে সেটা কি-হোলে ঢুকিয়ে কবজির স্লাইট মোচড়ে দরজা খুলে ফেলবেন, কিন্তু বাস্তবের ব্যাপারটা দেখলাম একেবারেই সে রকম নয়। আওয়াজের চোটে সারাবাড়ি কাঁপতে লাগল, নিচের তলার মিস্ত্রিরা ঘাবড়ে গিয়ে হিপহপ বন্ধ করে কান খাড়া করে রইলেন, ওপরনিচ তলা থেকে আতঙ্কিত বাসিন্দারা হাতে যে যা পারলেন---টর্চ, ছাতা, পাকানো খবরের কাগজ ইত্যাদি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে উঁকি মেরে দেখতে এলেন ব্যাপারটা কী। তাঁদেরকে গলবস্ত্র হয়ে “সরি সরি” বলতে গিয়ে আমার কোমর ব্যথা হওয়ার উপক্রম হল। অমন চমৎকার বইখানার দিকেও আর মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। অবশেষে ঝাড়া দেড়টি ঘণ্টা যুদ্ধের পর খটাস করে আমার দরজা খুলে গেল।

তারপরে ঘটনা আর বেশি বাকি নেই। এতক্ষণের মোচড়ামুচড়িতে তালার এদিকওদিক তুবড়ে গিয়েছিল, হাতুড়ি মেরে সে সব জায়গা আবার সমান করা হল। আমি ঘরে ঢুকেই কোটর‍্যাকে ঝুলন্ত চাবি উদ্ধার করে পকেটে পুরলাম, পুরে রান্নাঘর থেকে চাবিওয়ালা ভদ্রলোকের জন্য জল আনতে গিয়ে ভগবানই জানেন কেন পকেট থেকে সেটাকে বার করে মাইক্রোওয়েভের ওপর রেখে নেক্সট দু’মিনিট পাগলের মতো সারা বাড়ি ছুটে বেড়ালাম। চাবিওয়ালা সেই দেখে খুব আমোদ পেয়ে ফ্রেঞ্চে কী সব বলতে বলতে হোঃ হোঃ করে হাসতে লাগলেন, আর তর্জনী একবার আমার দিকে তাক করে তারপর মাথার কাছে নিয়ে গিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলেন। এ ক্লু-এর মানেও বাংলা-ফ্রেঞ্চ-এস্কিমো সব ভাষাতেই এক। অবশেষে টাকাপয়সা আর অসংখ্য “মেহ্‌সি বোঁকু”, “দু খিঁয়াঁ” ইত্যাদি বিনিময়ের পর তালাচাবিসংবাদের সমাপ্তি ঘটল।

আবার সব ঠিকঠাক চলছে। খালি অত চোট সওয়ার পর তালার ভেতর চাবিটা আর আগের মতো স্মুদলি ঘুরছে না, আর আমি ঘণ্টায় তিনবার রাস্তায়ঘাটে, দোকানেবাজারে, অফিসেরেস্টোর‍্যান্টে পকেট থাবড়ে চেক করে নিচ্ছি চাবি যথাস্থানে আছে কি না।


18 comments:

  1. দরজার পেছনে একটা পেরেক পুঁতে চাবিটা সেখানে ঝুলিয়ে রাখ্‌।

    ReplyDelete
  2. বা দরজার ওপরে। ভেতরে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. লোকের বাড়িতে তো পেরেক মারা যাবে না, তবে নিজের বাড়িতে এই সিস্টেমটা করার আইডিয়া মন্দ না। আমার স্মৃতিশক্তি দিনদিন আরও খারাপ বই ভালো হবে বলে তো মনে হচ্ছে না।

      Delete
  3. hahaha ki kando ...tor bejay dhakal geche bujhchi ,kintu pore khub maja pelam

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধকল বলে ধকল তিন্নি। তবে মেমোরি-মেকিং না কী সব বলে সে কথা যদি ভাবি, তাহলে সেটাও হয়েছে। কাজেই নো আফসোস।

      Delete
  4. 'আর আমি ফ্রেঞ্চে কেবল মাথা নাড়তে পারি'

    নাহ, তোমার জবাব নেই!

    তোমার কোনও পোস্টই মিস করি না, কিন্তু জানানো হয় না । আজ এটা পড়ে তোমার বর্ণনার গুণে এত মজা পেলাম, যে মনে হলো এর পরেও চুপ থাকলে বিলকুল না-ইনসাফি হবে! রাকা

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরে থ্যাংক ইউ থ্যাংক ইউ রাকা। মন ভালো করে দিলে।

      Delete
  5. এই দরজার বাইরে আটকে পড়ার ভয় আমার সারাক্ষণ করে। আমার হয়েওছে একবার এ জিনিস। আমি আর আত্রেয়ী যখন পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম, দুজনে দুজনকে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে রাখতাম। এখনও পাড়ায় এক বন্ধুকে চাবি দিয়ে রাখি, আর নিজের চাবিটা দরজার ভেতরে একটা হুকে ঝুলিয়ে রাখি।

    আপনার বর্ণনা, যেমন হয়, অসাধারণ। সব যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম। তাও আপনি অল্পের ওপর দিয়ে ছাড়া পেয়ে গেছেন। নবনীতা দেবসেনের লেখায় পড়েছি তিনি যখন অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বিদেশে ছিলেন তখন একবার এই কান্ড করার ফলে তাঁকে ফায়ার এসকেপ বেয়ে তিন তলায় উঠতে হয়েছিল। উঠতে উঠতে দোতলার জানালা দিয়ে আবার কিসব দেখেও ফেলেছিলেন, কিন্তু সে অন্য গল্প। সেদিক দিয়ে আপনি শুধু লোকের কাছে ক্ষমা চেয়েই ছাড়া পেয়েছেন।

    ReplyDelete
    Replies
    1. Uff oi golpo ta kintu durdanto!!! Mone porei ak chot hese nilam :)

      Delete
    2. এ মা, আমি তো পড়িনি এই গল্পটা, খুঁজে বার করে পড়তে হবে দেখছি।

      Delete
    3. ওটা অবশ্যই পড়ার মতন একটা লেখা। কোথায় পাবেন জানিনা, তবে আমি কোথায় পেয়েছিলাম বলতে পারি। অমর্ত্য সেন নোবেল পাওয়ার পর আনন্দমেলার যে বিশেষ সংখ্যাটা প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে ওই লেখাটা ছিল।

      Delete
    4. ওকে, খুঁজে দেখব। থ্যাংক ইউ সুগত।

      Delete
    5. mone hoy eta "bhalobasa kare koy" golposomogre ache. puro golposomogro tai bapok.

      Delete
    6. থ্যাংক ইউ স্বাগতা।

      Delete
  6. হে হে, বেজায় নাকাল করেছে আপনাকে বুঝতেই পারছি। তাও অল্পের ওপর ছাড়া পেয়ে গেছেন, আমার দুই বান্ধবী একবার এরকম চাবি হারিয়ে বারান্দায় রাত কাটিয়েছিল। প্যারিসের শেষ উইকেন্ডের বর্ণনার অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ইস আর শেষের কথা মনে করাবেন না দেবাশিস। তবে বেজায় কাশি হয়েছে, বুকের ভেতর সর্বক্ষণ ঘং ঘং করে ঠাকুরবাড়ির ঘণ্টা বাজাছে। শারীরিক নাকানিচোবানির চোটে আর মানসিক দুঃখু বেশি টের পাচ্ছি না।

      Delete
  7. new jalpaiguri station e bas er kaj kora onke kichu pawa jay.kumir,dolphin,gari,bari ...oi kumir ta oshadharon chabi rakhar janyo...otake gate er kache rakha..or ha mukhei ami chabi tabi rakhi...dibyo lage dekhte..birat baro ekta ha...onek chabi dhorbe.plus ami otate takao rakhi..beronor samay chot kore pawa jay..idea ta ude korte paro..kono jontur murti..tate ha er modhey atke dao...ami jani tomar mon etokhone koral kumbhir er barnona te mete uteche...lalmohon babu bolchen...bhabun moshay,bhabun

    ReplyDelete
    Replies
    1. এটা কিন্তু সত্যি ভালো আইডিয়া। থ্যাংক ইউ।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.