February 04, 2015

লালকুঠুরি



মূল গল্পঃ The Red Room
লেখকঃ H. G. Wells



“ভূতের মতো ভূত না হলে আমাকে ভয় পাওয়াবে তার সাধ্য নেই।” গ্লাস হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমি বললাম।  

তোমার মর্জিহাতের শিরা বার করা, শুকনো মতো লোকটা আমার দিকে তেরছা দৃষ্টি দিয়ে বলল

“আঠাশ বছর বয়স হল আমার, এখনও পর্যন্ত একটাও ভূত দেখিনি আমি

বুড়িটা একদৃষ্টে আগুনের দিকে চোখ মেলে বসে ছিল। ঘোলাটে, বিস্ফারিত চোখ। “আঠাশ বছরে এই বাড়ির মতো একটা বাড়িও তুমি দেখনি বাছা। আঠাশ বছরে মানুষের অনেক দেখা বাকি থাকে।” মাথা দুলিয়ে বলল বুড়ি। “অনেক দেখা, অনেক দুঃখ।”

এই বুড়োগুলো দেখছি আমার মনে ভয় না ঢুকিয়ে ছাড়বে নাখালি গ্লাসটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমি ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম। হঠাৎ নিজের চেহারাটা চোখে পড়ল। চাইনিজ একটা কাবার্ডের পাশে রাখা একটা পুরোনো আয়নায় আমার প্রতিকৃতি ফুটে উঠেছে। শক্তসবল, সুস্থ প্রতিকৃতি।

আমি বললাম, “যাই হোক, আজ রাতে যদি কিছু চোখে পড়ে তাহলেই প্রমাণ হয়ে যাবে। আমি মন খোলা রেখেই এসেছি।”

“তোমার মর্জি” শুকনো বুড়োটা বলল আবার।

এমন সময় বাইরের বারান্দা থেকে একটা লাঠির শব্দ এল। তার সঙ্গে একটা থমকে থমকে চলা পায়ের শব্দ। “ক্যাঁচ” আওয়াজ করে দরযা খুলে একটা লোক ঘরে ঢুকল এবার। এ লোকটা আরও বুড়ো, আরও নুয়ে পড়া, আরও বলিরেখাময়। একটা ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটছে। চোখ কালো চশমায় ঢাকা, ঝুলে পড়া নিচের ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ক্ষয়াটে হলদে দাঁত বেরিয়ে আছে। বুড়োটা টেবিলের উল্টোদিকে রাখা একটা চেয়ারে কোনওমতে বসে পড়ে কাশতে শুরু করল। প্রথম বুড়োটা এই বুড়োটার দিকে যে ভাবে তাকাল, বোঝা গেল বিশেষ প্রসন্ন হয়নি। বুড়িটা খেয়ালই করল না, সোজা আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল।

কাশি থামল। শুকনো বুড়োটা বলে উঠল, “আবারও বলছি, তোমার মর্জি।”

“আমার মর্জি।” মেনে নিলাম আমি।

আমার গলার আওয়াজ পেয়ে চশমা পরা বুড়োটা আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল এবার। কালো চশমার ফাঁক দিয়ে একমুহূর্তের জন্য একটা উজ্জ্বল, খুদে চোখ জ্বলে উঠেই নিভে গেল। আবার কাশতে শুরু করল লোকটা। এবার কাশির সঙ্গে সঙ্গে থুতু ছিটছে।

শুকনো বুড়োটা বিয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল, “এটা খাও।”। কাঁপা হাতে কাশতে থাকা বুড়োটা বিয়ার ঢালল গ্লাসে, যতটা না ঢালল তার থেকে বেশি ফেলল টেবিলের ওপর। দেওয়ালে বুড়োটার প্রকাণ্ড ছায়া কাঁপছে। যেন বুড়োটাকে ঠাট্টা করছে।

সত্যি বলছি, পাহারাদার হিসেবে এই তিনজন বুড়োকে পাব আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। বার্ধক্যকে চিরকালই ভয় পেয়ে এসেছি আমি। সে যেন ঠিক মানুষের মতো নয়, তার মধ্যে যেন কেমন একটা প্রাগৈতিহাসিক, অমানুষিক, অপ্রাকৃত ব্যাপার আছে। এই তিনজনকে দেখে আমার রীতিমত অস্বস্তি হতে লাগল। এদের নীরবতা, এদের ন্যুব্জ দেহ, আমার প্রতি এবং একে অপরের প্রতি এদের নিঃস্পৃহতা আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। হয়তো দোষটা এদের নয়, হয়তো সেই রাতটার অশুভ ভবিষ্যদ্বাণীময় ছায়া থেকেই আমি পালাতে চাইছিলাম।

“হানাঘরটা দেখিয়ে দিলে আমি সেখানে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারি।”

কাশতে থাকা বুড়োটা চমকে উঠে আমার দিকে তাকালো। আবার সেই কালো চশমার ফাঁকে রক্তবর্ণ চাউনি। আমি মিনিটখানেক অপেক্ষা করলাম। কোনও উত্তর এল না। বুড়িটা ঠায় আগুনের দিকে মরা মানুষের চোখ মেলে তাকিয়ে আছে।

গলা খানিকটা উঁচু করলাম আমি বাধ্য হয়ে। “আমাকে ঘরটা দেখিয়ে দাও, আমি তোমাদের আর বিরক্ত করব না।”

“দরজার বাইরে একটা মোমবাতি রাখা আছে।” বলল শুকনো লোকটা “কিন্তু যদি লালকুঠুরিতে যেতেই হয় . . .”

“তাও আবার বেছে বেছে আজকের মতো রাতে . . .” বিড়বিড় করে বলল বুড়িটা।

“একা যেতে হবে।” আমার চোখে চোখ ফেলছে না বুড়োটা। পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

“সে যাব। কিন্তু রাস্তা কোনদিকে?”

“বারান্দা ধরে হেঁটে যাও,” দরজার দিকে মাথা হেলাল লোকটা, “একটা ঘোরানো সিঁড়ি আসবে, সেটা ধরে উঠে যাও। দ্বিতীয় ল্যান্ডিং-এ পৌঁছে দেখবে একটা সবুজ চট দিয়ে ঢাকা দরজা। সেই দরজার ভেতর দিয়ে গিয়ে পাবে একটা টানা করিডর, সেটার শেষে পৌঁছে বাঁদিকে তাকালেই দেখবে লালকুঠুরিতে ঢোকার সিঁড়ি উঠে গেছে।”

আমি রাস্তাটা একবার পুনরাবৃত্তি করলাম। “এটাই তো?”

একটা ছোট ভুল ঠিক করে দিয়ে লোকটা ঘাড় নাড়ল।

“তাহলে সত্যিই যাচ্ছ?” কালো চশমা পরা বুড়োটা ঘাড় বেঁকিয়ে জিজ্ঞাসা করল।

“তাও আবার বেছে বেছে আজকের রাতেই!” আবার বিড়বিড় করে উঠেছে বুড়িটা।

“যাব বলেই তো এসেছি।” আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। চশমা পরা বুড়োটা উঠে দাঁড়িয়ে টলমল করতে করতে টেবিলের দিকে এগোল, যেন বাকি দুজনের কাছাকাছি যেতে চায়। দরজার কাছে পৌঁছে পেছন ফিরে তাকালাম একবার আমি। আগুনের কাছে তিনটে ছায়া ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে আছে। উদ্বেগে মাখামাখি তিনটে প্রাচীন মুখ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে আমার দিকে।

“শুভ রাত্রি।” দরজা খুলে বললাম আমি।

“নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছ।” শুকনো বুড়োটা আমাকে মনে করিয়ে দিল।

মোমবাতির আলোটা জোর না হওয়া পর্যন্ত আমি দরজাটা খুলে রাখলাম, তারপর দরজাটা বন্ধ করে ফাঁকা, ঠাণ্ডা প্যাসেজটা দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম।

মহামান্য লেডিশিপ এই তিন বুড়োর হাতে প্রাসাদের ভার ছেড়ে গেছেন কেন সেটা সত্যি আমার মাথায় ঢুকছিল না। এই বুড়োগুলোর, বাড়িটার, বাড়িটার আসবাবপত্রের গাম্ভীর্য, বিষণ্ণতা আমাকে প্রভাবিত করেছিল, সে আমি মানতে চাই আর না চাই। এরা যেন ঠিক আমার সমসাময়িক বাস্তবটার অংশ নয়, এরা যেন অন্য কোনও প্রাচীন দুনিয়ার বাসিন্দা, যে দুনিয়ায় অতিপ্রাকৃতদের ভয় পাওয়ার কারণ ছিল, যখন সাধারণ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অত সাধারণ ছিল না, যখন আশীর্বাদ, অভিশাপ, ওঝা, ডাইনি, ভূতপ্রেত, আত্মাপ্রেতাত্মারা অবিশ্বাস্য হয়ে যায়নি। এই তিনজনের গোটা অস্তিত্বটাই যেন অবিশ্বাস্য। এদের পরনের পোশাক, মস্তিষ্কের ভাবনা, সব যেন একটা বিস্মৃত জগতের অংশ যেটার এখন আর কোনও অস্তিত্ব নেই, শুধু তার স্মৃতিটা এখনও বর্তমান বাস্তবের ওপর একটা অমানুষিক ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। এই যে দীর্ঘ ছায়াময় প্যাসেজ দিয়ে আমি হাঁটছি, এর রুক্ষ, ঠাণ্ডা, স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালেও যেন মৃত্যুর অনিবার্য ছোঁয়া। কোথা থেকে একটা হাওয়ার দমক মাঝে মাঝে এসে আমার হাতে ধরা মোমবাতির শিখা আর দেওয়ালের ছায়াগুলোকে দুমড়েমুচড়ে, নুইয়ে, কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। সিঁড়ি বেয়ে প্রতিধ্বনিরা ছুটোছুটি করছিল। একেকটা ছায়া আমার পেছনে ধাওয়া করে আসছিল, একেকটা ছায়া আমার সামনে দিয়ে ছুটে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছিল অন্ধকারে।

জোর করেই আমি মাথা থেকে এসব আবোলতাবোল ভাবনা সরিয়ে দিলাম। ততক্ষণে ল্যান্ডিং এসে গেছে। পেছনে একটা খসখস শব্দ হচ্ছে কি? উঁহু, পুরোটাই আমার কল্পনা। কোথাও কোনও শব্দ নেইচারদিকে নিশ্ছিদ্র নীরবতা বিরাজ করছে। নিশ্চিন্ত হয়ে আমি আমার সামনের মোটা পর্দা দিয়ে ঢাকা দরজাটা ঠেললাম। সামান্য প্রতিরোধ সৃষ্টি করলেও দরজাটা শেষ পর্যন্ত খুলে গেল। আর আমি দেখলাম আমি আর একটা নিশ্চুপ করিডরের মুখে দাঁড়িয়ে আছি।

যা দেখলাম তা দেখব বলে আশা করিনি। সিঁড়িঘরের বড় বড় জানালা দিয়ে এসে পড়া চাঁদের আলো অপূর্ব রূপোলী নকশার জাল বুনেছে।। যেন বারো মাস আগে নয়, গতকালই এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে কেউ। যে জিনিসটা যেখানে থাকার সেখানেই আছে। দেওয়ালে মোমবাতিদানে মোমবাতি, পায়ের নিচে কার্পেটে যেটুকু মিহি ধুলো জমেছে তা আমার হাতের মোমবাতির আলোয় চোখেই পড়ছে না। গোটা দৃশ্যটার ওপর একটা মৌন প্রতীক্ষার ছায়া। এগোতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম। একটা ছায়া এমন নিখুঁতভাবে আলোকিত দেওয়ালে পড়েছে যে ঠিক মনে হচ্ছে কেউ যেন গুঁড়ি মেরে রয়েছে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে। মুহূর্তের জন্য আমি আড়ষ্ট হয়ে গেলাম। পকেটে হাত ঢুকিয়ে রিভলভারটা চেপে ধরে এগোতেই দেখি সেটা একটা গ্যানিমিড[1] আর ঈগলের মূর্তি, চাঁদের আলোয় চকচক করছে।

এই আচমকা বাধাটা আমার স্নায়ুর জোর খানিকটা ফিরিয়ে দিল।। একটা বাহারি কাজ করা টেবিলের ওপর একটা চায়নাম্যান পুতুল রাখা ছিল, যার মাথাটা আবার অল্প অল্প দোলে, সেটা দেখে আমি একটুও ঘাবড়ালাম ণা।

লালকুঠুরিতে ওঠার সিঁড়ি করিডরের শেষ প্রান্তে। কুঠুরির দরজার সামনের ছোট খুপরি মতো জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আমি মোমবাতি উঁচু করে ধরে ভালো করে এদিকওদিক দেখলাম। এই সেই লালকুঠুরি। এখানেই আমার আগের জনকে পাওয়া গিয়েছিল। সেই গল্পটা মনে পড়ে আমার সারা শরীরে হঠাৎ একটা আতংকের শিহরণ খেলে গেল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে গ্যানিমিডের মূর্তিটাকে একবার দেখলাম, তারপর চট করে, মুখ অর্ধেক পিছনে ফিরিয়ে রাখা অবস্থাতেই, লালকুঠুরির ভেতর ঢুকে পড়লাম।   

ঘরে ঢুকে আমি আর একটুও সময় নষ্ট করলাম না, দরজার চাবি লাগানোই ছিল, ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিলাম। হাতের মোমবাতিটা উঁচু করে ধরলাম। এই, এই সেই লালকুঠুরি! লোরেইন প্রাসাদের কুখ্যাত লালকুঠুরি! এই ঘরেই সেই তরুণ ডিউক মারা গিয়েছিলেন। বা ডিউকের মরণ শুরু হয়েছিল বলা ভালো। এই ঘরের দরজার খুলে তিনি সোজা গড়িয়ে পড়েছিলেন ওই সিঁড়ি বেয়ে, যে সিঁড়িতে পা রেখে আমি এক্ষুনি উঠে এসেছি। সিঁড়ির তলায় পড়ে থাকা কুমারের প্রাণহীন দেহ লালকুঠুরির কুসংস্কারময় আতংককে একমুহূর্তে নতুন করে বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছিল।

আরও অনেক গল্প আছে এই লালকুঠুরিকে ঘিরে। অদ্ভুত, প্রাচীন সে সব কাহিনির শুরু হয়েছিল বরের ভয় দেখানোর রসিকতার শিকার হওয়া একটি ভীতু বউয়ের মৃত্যু থেকে। অবিশ্বাস্য, জানি। কিন্তু এই প্রকাণ্ড ঘরে, প্রকাণ্ড জানালার বাড়িয়ে দেওয়া কালো হাতা, ধুলোপড়া মলিন রক্তরঙা পর্দা আর গাঢ়বর্ণের বিরাট আসবাবপত্রের মধ্যে জমে থাকা গর্ভিণী অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে গল্পগুলো আর অতও অবিশ্বাস্য ঠেকছিল না। এই প্রশস্ত কুঠুরিতে আমার মোমবাতির শিখা একটা ছোট্ট জিভের মতো প্রাণপণে লকলকাচ্ছে কিন্তু ও প্রান্তে পৌঁছতে পারছে না, তার চারপাশের ক্ষুদ্র আলোর দ্বীপটাকে ঘিরে আছে রক্তাক্ত রহস্যের আভাস, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে নজর রাখাছে ছায়াসৈন্যরাগোটা অন্ধকারটার ওপর ঝুলে আছে স্থির, অচঞ্চল শূন্যতা আর একাকীত্ব।

সত্যি বলছি, সেই মুহূর্তে ওই প্রাচীন কুঠুরির অদৃশ্য আত্মাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার রীতিমত অস্বস্তি হচ্ছিল। সে অস্বস্তিকে চাপা দিতে, মন শক্ত করে আমি গোটা জায়গাটার একটা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা নেওয়া স্থির করলাম। যাতে কল্পনার হাতে কিছু ছাড়া না থাকে। যাতে এই অজানা আতংক আমার ঘাড়ে চেপে বসার আগেই তাদের ধ্বংস করে ফেলতে পারি। দরজা বন্ধ আছে আরেকবার নিশ্চিন্ত হয়ে আমি ঘরটা ঘুরে দেখতে শুরু করলাম। প্রতিটি আসবাবের পেছনে উঁকি মেরে দেখলাম, বিছানার পাশ থেকে ঝুলে থাকা চাদর তুলে গুটিয়ে রাখলাম, খাটের চারদিকে টাঙিয়ে রাখা পর্দা হাট করে খুলে দিলাম। এক জায়গায় আমার পায়ের স্পষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা গেল। আমার উপস্থিতির সামান্য শব্দ ওই অসীম নীরবতাকে ভেদ করার বদলে তারা তাকে আরও যেন বাড়িয়ে তুলল।

আমি ব্লাইন্ড তুলে তুলে প্রতিটি জানালার ছিটকিনি পরীক্ষা করলাম। হঠাৎ এককুচি ধুলো পড়াতে আমার মনোযোগ চিমনির দিকে গেল। আমি ঝুঁকে পড়ে তার প্রশস্ত কালো সুড়ঙ্গের দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সবশেষে আমার বৈজ্ঞানিক, সন্ধিৎসু মনের শান্তির জন্য, আমি পুরো ঘরের ওক কাঠের প্যানেলিং-এ টোকা দিকে দিকে দেখলাম, পাছে কোথাও কোনও গুপ্ত কুঠুরি থাকে। এই করতে করতে ঘরের অ্যালকোভে পৌঁছনোর আগেই দেওয়ালে টাঙানো একটা আয়নায় নিজের মুখটা দেখতে পেয়ে আমাকে থমকে যেতে হল। রক্তশূন্য, সাদা।

ঘরটায় দুটো বড় বড় আয়না দেখতে পেলাম। আয়নাদুটোর দুপাশে মোমবাতিদানিতে মোমবাতি বসানো আছে। তাছাড়া ফায়ারপ্লেসের ওপরের ম্যান্টেলপিসেও চাইনিজ ধাঁচের মোমবাতিদানের ওপর মোমবাতি বসানো। আমি একে একে সবকটা জ্বালিয়ে দিলাম। ফায়ারপ্লেসে দেখলাম কাঠ সাজানোই আছে। এই অপ্রত্যাশিত বিবেচনাটুকুর পরিচয় পেয়ে আমি বেশ অবাকই হলাম। কাঠে আগুন ধরিয়ে দিলাম, যাতে শীত বা অন্য কোনও কারণেই কেঁপে ওঠা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি। আলো ভালো করে জ্বলে উঠলে ফায়ারপ্লেসের দিকে পিঠ করে আমি ঘুরে তাকালাম। ঘরটাকে দেখলাম আর একবার ভালো করে। একটা গদিমোড়া চেয়ার আর টেবিল টেনে এনে নিজের সামনে বেশ একটা প্রতিরোধের প্রাচীর মতো বানানো গেল। টেবিলের ওপর আমার রিভলবারখানা বার করে রাখলাম।

ঘরখানা খুঁটিয়ে পরীক্ষার পর আমার সাহস খানিকটা বেড়েছিল বটে, তবু ঘরের অন্ধকার কোণগুলো আমার মনে নানারকম আবোলতাবোল কল্পনার সৃষ্টি করছিল। জ্বলন্ত ফায়ারপ্লেসের আগুনের পটপট শব্দও এমন কিছু আরামদায়ক ঠেকছিল না। ঘরের কোণের অ্যালকোভটার নিশ্চুপ শুন্যতাটা যেমন ক্রমেই জীবন্ত হয়ে উঠছিল। আমি হাতে একটা মোমবাতি তুলে নিয়ে অ্যালকোভে গেলাম এবং নিশ্চিত হলাম যে সেখানে কিছুই নেই। জ্বলন্ত মোমবাতিটাকে অ্যালকোভের মেঝেতে বসিয়ে আমি ফিরে এলাম।

আমি টের পাচ্ছিলাম যে আমি রীতিমত নার্ভাস হয়ে পড়েছি, কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও বুঝতে পারছিলাম যে সে রকমটা হওয়ার কোনও কারণ নেই। আমার মাথা সম্পূর্ণ সাফ ছিল। আমি নিজেকে বোঝালাম যে অলৌকিক কিছু ঘটবার কোনও সম্ভাবনা নেই। সময় কাটাতে আমি মনে মনে ইনগোল্ডসবাই[2]-এর ছাঁদের ছড়া ভাঁজতে শুরু করলাম। লালকুঠুরির গল্পগাছার সঙ্গে সেগুলো বেশ মানানসইও হল। সে সব ছড়ার কয়েকটা আমি জোরে জোরে আবৃত্তি করার চেষ্টা করলাম কিন্তু তাতে যে প্রতিধ্বনির সৃষ্টি হচ্ছিল সেগুলো খুব একটা সুবিধের নয়। এই একই কারণে নিজের সঙ্গে ‘ভূত ও ভূতুড়ে’ বিষয়ে আলাপচারিতাটাতেও ক্ষান্ত দিতে হল। অবশেষে আমার মন ঘুরে গেল নিচের তলার তিনটে বিকৃত বুড়োর দিকে, এবং আমি তাদের নিয়েই ভাবতে লাগলাম।

কিন্তু ঘরের গম্ভীর, বিষণ্ণ লাল-ধূসর রঙের সাজসজ্জা আমাকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছিল না। সাতসাতটা মোমবাতি জ্বলছে, অথচ ঘরটা বিশেষ আলোকিত হয়নি। অ্যালকোভের মোমবাতিটা মাঝে মাঝেই কেঁপে কেঁপে উঠছিল, ফায়ারপ্লেসের আগুন ক্ষণে ক্ষণে ঝলসাচ্ছিল, আর সে আলোআঁধারিতে নিঃশব্দ, নির্ভার ছায়াগুলো ক্রমাগত আমার চারদিকে নেচে বেড়াচ্ছিল।

কী করা যায় কী করা যায় ভাবতে ভাবতে আমার করিডরটার কথা মনে পড়ল। দেওয়ালে অনেকগুলো মোমবাতি সাজানো আছে দেখেছিলাম না? একটা জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে তুলে নিয়ে, লালকুঠুরির দরজা অল্প খুলে রেখে বাইরের চাঁদের আলোয় পা দিলাম। প্রায় দশটার মতো মোমবাতি জোগাড় করে নিয়ে এলাম। সেগুলো ঘরের বিভিন্ন জায়গায়, ইতিউতি ছড়ানো চিনেমাটির মূর্তির গায়ে, মেঝেতে, জানালার খাঁজে – যেখানে যেখানে ছায়া সবথেকে গাঢ় হয়ে পড়েছিল – সেখানে সাজিয়ে দিলাম। এখানকারটা তুলে ওখানে বসালাম, ওখানকারটা তুলে সেখানে বসালাম যতক্ষণ ঘরের একইঞ্চিও আলোর নাগালের বাইরে রইল। ঘরটা এখন বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। মোমবাতির জ্বলন্ত, নাচন্ত শিখাগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে একটা বেশ ফুর্তি আর আশ্বাসের ভাব জাগছিল। নে হল, এইবার ভূত এলে তাকে সাবধান করে দিতে হবে, যাতে মোমবাতিতে হোঁচট না খায়। একটা কাজও পাওয়া গেল। ক্ষইতে থাকা মোমবাতির দিকে তাকিয়ে থাকা। রাত ফুরোচ্ছে। সামনের গোটা রাতটুকু পাহারা দিয়ে কাটানোর প্রত্যাশা আমার ওপর ভারি হয়ে চেপে বসছিল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম মিনিটের কাঁটাটা গুঁড়ি মেরে মাঝরাত্তিরের দিকে এগোচ্ছে।

এমন সময় অ্যালকোভে একটা কিছু ঘটল। মোমবাতিটা কখন নিভে গেল আমি দেখতেই পেলাম না। আমি ঘুরে তাকালাম এবং চমকে উঠে দেখলাম অন্ধকার। আচমকা অচেনা কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে লোকে যেমন চমকে যায়। কালো ছায়াটা স্বস্থানে ফিরে এসেছে।

“আশ্চর্য!” চমকটা কাটিয়ে উঠে আমি জোরে জোরে বলে উঠলাম, “হাওয়াটা খুবই জোর মনে হচ্ছে!”

টেবিল থেকে দেশলাইটা তুলে নিয়ে আমি ধীরেসুস্থে অ্যালকোভের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। প্রথম দেশলাইকাঠিটা জ্বলল না। দ্বিতীয়টা যেই না জ্বলল আমার সামনের দেওয়ালে একটা কিছু ঝিলিক দিল। আপনা থেকেই আমার মাথা ঘুরে গেল আর আমি দেখলাম ফায়ারপ্লেসের সামনের ছোট টেবিলটার ওপরের দুটো মোমবাতি নিভে গেছে।

“অদ্ভুত। আমি কি নিজেই অন্যমনস্ক হয়ে বাতিদুটো নিভিয়ে দিয়েছি নাকি?” হেঁটে হেঁটে টেবিলটার কাছে ফিরে এলাম আমি। একটা মোমবাতি ফের জ্বালালাম। জ্বালাতে জ্বালাতেই দেখলাম দুটো আয়নার একটার ডানদিকের মোমবাতিটা আমার দিকে ঠিক যেন চোখ টিপে নিভে গেল। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই গেল সেটার সঙ্গীটাও। একটুও ধোঁয়া বেরোলো না, শিখার গায়ে একটুও লালচে আভা লেগে রইল না, ঠিক মনে হল কেউ যেন দুটো আঙুলে টিপে ধরে আলোটা নিভিয়ে দিল। আমি সেদিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি, এমন সময় খাটের পায়ার কাছের মোমবাতিটা নিভে গেল। অন্ধকারটা যেন আমার দিকে এগিয়ে এল, এক পা।

“অসম্ভব!” চেঁচিয়ে উঠতে না উঠতেই ম্যান্টেলপিসের ওপরের মোমবাতিটা গেল।

“হচ্ছেটা কী?” আমার গলাটা এত তীক্ষ্ণ, ক্ষীণ শোনাচ্ছে কেন? আলমারির কোণের মোমবাতিটা . . . অ্যালকোভের মোমবাতিটাও নিভে গেছে!

“থামো থামো, ম্যান্টেলের বাতিটা ফের জ্বালাতে এই মোমবাতিগুলো আমার লাগবে তো!” রসিকতার চেষ্টাটা হাস্যকর ঠেকল আমার নিজের কানেই। আমার হাত এত কাঁপছে যে দেশলাইকাঠি আর বারুদে সংযোগ ঘটাতে পারছি না। যাক, জ্বলেছে অবশেষে! ম্যান্টেলের ওপরটা আলোকিত হয়ে উঠতেই ঘরের কোণের দুটো মোমবাতি নিভে গেল। আমি দেশলাই হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মেঝে থেকে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি তুলে নিলাম, দেশলাই ঠুকে আগুন জ্বালানোর সময় নেই আর! সময় হয়তো বাঁচল কিন্তু মোমবাতিদের নিভে যাওয়া থামল না। একের পর এক আলো নিভে যেতে থাকল। যে ছায়াগুলোকে আমি ভয় পাচ্ছিলাম, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলাম, তারা গুঁড়ি মেরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। প্রথমে এদিক থেকে এক পা, তারপর ওদিক থেকে।

আসন্ন অন্ধকারের আতংকে আমি তখন প্রায় পাগল হয়ে গেছি, আমার আত্মনিয়ন্ত্রণ লোপ পেয়েছে। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে এক মোমবাতি থেকে আর এক মোমবাতিতে লাফিয়ে বেড়াতে লাগলাম, বৃথাই, নির্মম ছায়ারা ক্রমে আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরতে লাগল। ছোটাছুটি করতে গিয়ে আমার ঊরুতে টেবিলের ধাক্কা লাগল, একটা চেয়ার উল্টে পড়ে গেল, হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে আমি টেবিলের ঢাকনাটা খামচে ধরলাম, সেটা টেবিল থেকে ফসকে গেল। আমার মোমবাতি হাত থেকে গড়িয়ে গেছে, আর একটা মোমবাতি তুলে দ্রুত নিজের দিকে টেনে আনতে গিয়ে হাওয়ার ঝাপট লেগে সেটাও গেল, মুহূর্তের মধ্যে ঘরের বাকি দুটো মোমবাতিও নিভে গেছে। কিন্তু এখনও তো আলো আছে দেখতে পাচ্ছি! সিলিং-এ একটা আবছা লাল আলো শান্ত ঢেউয়ের মতো ধীরে ধীরে বইছে। আমার থেকে ছায়াগুলোকে ঠেকিয়ে রেখেছে। ফায়ারপ্লেসের আগুন! সেই আগুনে আমার হাতে ধরা মোমবাতিটা আবার আমি জ্বালিয়ে নিতে পারি!

আমি ঘুরে তাকালাম। জ্বলন্ত কয়লার ফাঁকে ফাঁকে আগুনের শিখা তখনও নাচছে, আসবাবপত্রের ওপর তার লাল প্রতিফলন তখনও কাঁপছে। আমি দু’পা এগোলাম, শিখাটা দুর্বল হয়ে এল কি? দৌড়ে গিয়ে ফায়ারপ্লেসের খাঁচার দুটো শিকের মধ্য দিয়ে আমার মোমবাতিটা গুঁজে দিলাম যেই, আগুন নিভে গেল, আভা মিলিয়ে গেল, প্রতিফলনগুলো একে অপরের সঙ্গে জড়ামড়ি করে অদৃশ্য হয়ে গেল। চোখের পাতা বুজে ফেলার মতো করে অন্ধকার আমাকে চারদিক থেকে আষ্টেপৃষ্টে জাপটে ধরেছে। আমার দৃষ্টি অন্ধ, আমার মস্তিষ্কের শেষ নিয়ন্ত্রণটুকুর প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে গেল। এখন আর শুধু অন্ধকার নয়, এখন অসহনীয় আতংক। আমার হাত থেকে মোমবাতি পড়ে গেল, আমি দুহাত সামনে ছিটকে দিয়ে সেই ভারি, জমাট অন্ধকারকে আমার থেকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করলাম, গলায় যত জোর আছে সর্বস্ব দিয়ে চেঁচালাম, একবার, দু’বার, তিনবার। কখন যেন নিজের পায় উঠে দাঁড়িয়েছিলাম, চকিতে সেই চন্দ্রালোকিত করিডরের কথা আমার মনে পড়ে গেল, আমি দু’হাতে আমার মুখ ঢেকে ছুটে গেলাম দরজার দিকে। কিন্তু দরজা কোথায় আমি ভুলে গেছি, খাটের সঙ্গে ধাক্কা খেলাম। ফিরে আসতে গিয়ে অন্য একটা কী যেন প্রকাণ্ড আসবাব আমার পথ আটকে দাঁড়াল। এই ভাবে সেই অন্ধকারে আমি এদিকওদিক ধাক্কা খেয়ে ছুটে বেড়াতে লাগলাম। একটা জোর আঘাত লাগল কপালে, আমি পড়ে যাচ্ছি, মুহূর্তটা অনন্তের মতো দীর্ঘ হয়ে গেছে, আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছি . .  

চোখ খুললাম যখন তখন দিন। আমার মাথায় ব্যান্ডেজ। শুকনো মতো বুড়োটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কী ঘটেছে মনে করার চেষ্টায় আমি চারদিকে তাকালাম, কিছুই মনে পড়ল না। ঘরের কোণে চোখ পড়তে দেখলাম সেই বুড়িটা। কাল রাতের মতো সুদূর, নিঃস্পৃহ, বিশ্রী নয়, দিব্যি স্বাভাবিক। একটা ছোট নীল বোতল থেকে ফোঁটা ফোঁটা ওষুধ গ্লাসে ঢালছে।

“আমি কোথায়? তোমাদের আমি আবছা চিনতে পারছি, আবার পারছিও না, তোমরা কারা?”

ওরা আমাকে সব কথা মনে করিয়ে দিল। আমি ওদের মুখে আবার লালকুঠুরির কথা শুনলাম, যেমন করে মানুষ গল্প শোনে।

“তোমাকে আমরা ভোরবেলা খুঁজে পেয়েছি। তোমার কপালে আর ঠোঁটে রক্ত লেগে ছিল।” শুকনো মতো বুড়োটা বলল।

আমি ভাবার চেষ্টা করলাম, কাল রাতে একে আমার অত খারাপ লাগছিল কেন। দিনের আলোয় এদের তিনজনকে সাধারণ তিনটে বুড়োর মতোই দেখাচ্ছে। চশমাপরা বুড়োটা মাথা নিচু করে বসে আছে, দেখে মনে হচ্ছে ঘুমোচ্ছে।

ধীরে ধীরে আমার গোটা রাতের অভিজ্ঞতার স্মৃতি ফিরে এল।

“এখন বিশ্বাস হল যে ঘরটা অভিশপ্ত?” শুকনো বুড়োটা জিজ্ঞাসা করল। অপরিচিতকে চ্যালেঞ্জ করার মতো করে নয়, বন্ধুকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে।

“হ্যাঁ।“ আমি বললাম। “ঘরটা অভিশপ্ত।”

“তুমি তবু নিজে চোখে দেখলে। আমরা আজীবন এখানে থেকেও দেখিনি, সাহসে কুলোয়নি। আচ্ছা ওটা কি সত্যি সেই কি বুড়ো আর্ল, যে . . .”

“না, সে নয়।” আমি বললাম।

“বলেছিলাম।” ওষুধের গ্লাস হাতে নিয়ে বুড়িটা বলল। “ওটা হচ্ছে আর্লের যুবতী কাউন্টেসটা, যে ভয় পেয়ে . . .”

“সেও নয়।” বললাম আমি। “আর্লের নয়, কাউন্টেসেরও নয়। কারও আত্মাই নেই ও ঘরে। যেটা আছে সেটা আত্মার থেকেও বিশ্রী, আরও ভয়ংকর। এমন কিছু যা প্রত্যক্ষ করা যায় না।”

“কী?” ওরা জিজ্ঞাসা করল।

“নিরীহ, নশ্বর মানুষকে যা সবথেকে বেশি কাবু করে, সেই জিনিসটা আছে ওই ঘরে। তার সমস্ত নগ্ন নির্মমতা নিয়ে। সেটা হচ্ছে ভয়। যে ভয়ের আলো নেই, শব্দ নেই, কারণ নেই। তবু সে ভয় মানুষকে অন্ধ করে, বধির করে, গ্রাস করে। সেই ভয় আমার পিছু নিয়েছিল করিডরে, আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল লালকুঠুরির ভেতর।”

আমি থামলাম। হাত দিয়ে আমার মাথার ব্যান্ডেজটা ছুঁয়ে দেখলাম একবার। নৈঃশব্দ্য ছেয়ে রইল। “মোমবাতিগুলো একের পর এক নিভে যাচ্ছিল, আমি প্রাণপণ পালানোর চেষ্টা করছিলাম . . .”

“জানতাম। আমি জানতাম।” চশমাপরা বুড়োটা মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। “অন্ধকার। অন্ধকারের অভিশাপ আছে এ বাড়িতে। সবসময় থাকে। রোদঝলমল দিনেও তার উপস্থিতি স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। সে ঝাড়লণ্ঠন থেকে ঝোলে, পর্দার গায়ে লেগে থাকে। তুমি যেদিকেই মুখ ঘোরাও, তোমার পেছনে লুকিয়ে পড়ে। সন্ধ্যেবেলা করিডরে তোমার পিছু নেয়, যাতে তুমি ভয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে না পার। তুমি ঠিক যেমনটি বললে, ওই লালকুঠুরিতে আছে এই অন্ধকারের আতংক। থাকবে চিরদিন, যতদিন এই অভিশপ্ত বাড়িটা থাকে।”
   
    

22 comments:

  1. খুব সুন্দর হয়েছে অনুবাদটা। অনুবাদ বলে মনেই হচ্ছেনা (যদিও মূল গল্পটা ছোটবেলায় পড়েছি বলেই মনে হচ্ছে)।

    গ্যানিমেড নয়, উচ্চারণটা খুব সম্ভবত গ্যানিমীড। ওই নামে বৃহস্পতির একটা উপগ্রহ আছে, গ্যালিলিওর আবিষ্কৃত চার উপগ্রহের অন্যতম। সেই সূত্রেই NASAর কোন একটা videoতে উচ্চারণটা জেনেছিলাম। :-)

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ, তথাগত। আমি এক্ষুনি ঠিক করে দিচ্ছি।

      Delete
  2. khub bhalo laglo.. Mul golpota porte gele gaye kanta dey.. Anubad eo aboho ta bhalo futechhey.

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ, চুপকথা।

      Delete
  3. H G Wells er golpo ta porey ami raate maa ke ghumote diyini. Ei anubad ta porey aj nije ghumobo na. :) Khub bhalo legeche.
    -Ramyani.

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, রম্যাণি।

      Delete
  4. Eta pore ki sudhu maar e Khudito Pashan er kotha mone porlo???

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমার এতক্ষণ মনে পড়েনি, তবে তুমি বলার পর মনে হচ্ছে মিল আছে।

      Delete
  5. Khub bhalo likhechho. ami asol golpota almost bhulei gechhilam eto aage porechhi, tabe tomar ta jodi raat e portam, ni:sondehe aro beshi bhoy petam. - Bratati.

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, ব্রততী।

      Delete
  6. Khub bhalo onubad hoechhe Kuntala. Ga e knata deoa galpo.

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, ইচ্ছাডানা।

      Delete
  7. ভাল অনুবাদ
    মিঠু

    ReplyDelete
    Replies
    1. ধন্যবাদ, মিঠু।

      Delete
  8. অসাধারণ হয়েছে! এটা বই হলে নির্ঘাৎ উত্তেজনায় পাতার কোনাগুলো কুচিকুচি করে ফেলতাম। নেহাৎ কম্পিউটার তাই বেঁচে গেল।

    ReplyDelete
    Replies
    1. সত্যি সত্যি খুশি হলাম। অসংখ্য ধন্যবাদ।

      Delete
  9. Tomar onubad pore sotti bolchi Satyajit Ray r onubad golpo gulo mone pore gelo. Bujhtei parcho kotota bhalo legeche.

    ReplyDelete
    Replies
    1. কেলেংকারি, কুহেলি। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।

      Delete
  10. গল্পটা অসাধারন...আর অনুবাদ এ ভয়ের আবহটা সাংঘাতিক ভালো তৈরি হয়েছে...অনেকদিন মনে থাকবে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ভেরি গুড, প্রত্যুষা।

      Delete
  11. tumi didibhai chakri ta charo aar onubad plus nijasya galpo..full time author hoe jao..sobai pay na ei talent..eta orjjon o kora jay na..eta manush niyei jonmay..tumi jonmecho..do justice on that

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.