June 17, 2016

শাসন



বাবার নাকে একটা আড়াআড়ি কালশিটের মতো দাগ আছে যেটা দেখলে মনে হয় ক্লাস এইট থেকে চশমা পরার ফল। কিন্তু বাবা যখন চশমা পরে থাকেন তখন বোঝা যায় যে চশমার সঙ্গে ও দাগের কোনও সম্পর্ক নেই।

ওটা আমার ঠাকুমার এককালের প্রবল প্রতাপের চিহ্ন। আবার ঠাকুমাকে জিজ্ঞাসা করলে ঠাকুমা বিনয়ের সঙ্গে নিজের প্রতাপের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাবেন। বলবেন, ওটাকে বাবা ছোটবেলায় কী রকম বাঁদর ছিলেন সেটার প্রমাণ হিসেবেই দেখা উচিত। কোনও একটি মতদ্বৈতের পরিস্থিতিতে ঠাকুমা বাবার গালে একটি প্রকাণ্ড চড় বসান এবং বাবার মুণ্ডু ঘুরে গিয়ে জানালার শিকে ধাক্কা খায়। সেই থেকে ও দাগ নাকের ওপর বিরাজ করছে। 

ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা হচ্ছে, দাগের উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঠাকুমা এবং বাবা দুজনের মুখেই এমন নরম আলো ফোটে যেন তাঁরা কোনও হিংস্র ঘটনার স্মৃতিচারণ করছেন না, যেন পুরীর সমুদ্রতটে বসে জীবনে প্রথমবার ঢেউ গোনার কথা মনে করছেন। দাগটা যেন কোনও ক্ষত নয়, দুজনের জীবনেরই একটা সুখের সময়ে স্মৃতি। যখন ঠাকুমার অথরিটি সংসারে সর্বময় ছিল, আর আমার বাবার জীবনের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নাকে ব্যান্ডেজ বাঁধতে গিয়ে খেলতে যেতে দেরি হয়ে যাওয়া।

কিন্তু শুধু নস্ট্যালজিয়া নয়, ওই আলোর মধ্যে আরও একটা অনুভূতি লুকিয়ে আছে। ঠাকুমার ক্ষেত্রে সেটা গর্বের। মারসি, তবে না মানুষ হইসে? বাবার কাছে সেটা কৃতজ্ঞতার। ভাগ্যিস শাসন করেছিলে, তাই তো করে খাচ্ছি। দুজনেই যখন বিকেলবেলা বারান্দায় বসে থাকেন (এখন ঠাকুমা আর বসার অবস্থায় নেই, ক’বছর আগেও ছিলেন, এটা তখনকারই কথা) আর নিজেদের বিস্তৃত পরিবারের অপেক্ষাকৃত কম সৌভাগ্যজনক শাখাপ্রশাখার কথা আলোচনা করেন, যাদের উত্তরসূরিরা ততটাও দাঁড়াতে পারেনি, তখন দুজনেই একমত হন, শাসনের অভাবই তাঁদের ব্যর্থতার একমাত্র কারণ। দুজনের মৃদুগলার আলোচনা ডুবিয়ে দিয়ে সামনের রাস্তা দিয়ে চিৎকার করতে করতে ছেলেরা হুশ করে সাইকেল চালিয়ে চলে যায়, চমকে উঠে দুজনেই চুপ করে যান, অপ্রসন্ন মাথা নাড়েন, খানিকটা অননুমোদনে, খানিকটা খেদে। এদের বাড়িতে যদি নাক-ফাটানো মা থাকত।

আমার বাবা-ঠাকুমার শাসনসংক্রান্ত আরও একটা থিওরি হচ্ছে, মোর ইজ বেটার। শুধু শাসনই নয়, শাসন করার লোকও যত বেশি হয় তত ভালো। ঠাকুরদার বেশ কিছু বন্ধুর হাতে বাবাদের শাসন করার অধিকার দেওয়া ছিল। তাঁরা ইচ্ছে করলেই বা দরকার বুঝলেই ঠাকুরদা ঠাকুমার পাঁচ ছেলেমেয়ের কান মুলতে পারতেন। এ ব্যাপারে বাংলা ভাষার এক বিখ্যাত সাহিত্যিকের সঙ্গে তাঁদের মত মেলে। সে সাহিত্যিকের ছোটবেলার স্মৃতিচারণে পড়েছি, তিনি একদিন ভরদুপুরে পাশের পাড়ায় এক বন্ধুর বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে বন্ধুর নাম ধরে উচ্চস্বরে ডাকাডাকি করছিলেন। এমন সময় বন্ধুর পাশের বাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে তাঁর কান মুলে/ চড় মেরে তাঁকে বকে বলেছিলেন যে ভরদুপুরবেলা এ রকম চিৎকার করাটা ভয়ানক অসভ্যতা। সাহিত্যিক খুবই নস্ট্যালজিয়ার সঙ্গে সে ঘটনাটি স্মরণ করেছিলেন। তাঁর লেখায় এ আফসোস স্পষ্ট ছিল যে যত দিন যাচ্ছে তত এ ধরণের ঘটনা বিরল হয়ে যাচ্ছে। আজকাল রাস্তাঘাটে ছেলেমেয়েদের প্রচণ্ড অসভ্যতা করতে দেখলেও বড়রা কিছু বলে না, চোখ উল্টে বসে থাকে। শেখার জায়গা আমাদের ক্রমে কমে আসছে।

বাবাদের স্কুলের মাস্টারমশাইদের গল্প শুনে ছোটবেলায় আমার ঘাড়ের চুল খাড়া হয়ে যেত। তাঁরা কোনওরকম দুষ্কর্ম দেখলে ছাত্রের জুলপির চুল ধরে ওপরদিকে হ্যাঁচকা টান দিতেন, মাঝখানে পেনসিল রেখে দুই আঙুল পেঁচিয়ে দিতেন।  তাঁদের সবাই খুব সম্মান করত। বাবামারা ছেলেপুলেদের তাঁদের কাছে সারাদিনের জন্য গচ্ছিত রেখে শান্তিতে থাকতেন।

দুঁদে শাসকদের প্রতি সম্মানের এই ব্যাপারটা আমি পরেও খেয়াল করেছি। তখন বাবাদের যুগ শেষ। আমি বড় হচ্ছি। পেয়ারা গাছ পাড়ায় দ্রুত কমে আসছে কাজেই পেয়ারা গাছের ডাল ভেঙে ছেলেমেয়ে ঠ্যাঙানোর গল্প ক্রমে লিজেন্ডে পরিণত হচ্ছে। সেই সময়ে আমাদের পাড়ায় একঘর নতুন ভাড়াটে এল। রাজু, রাজুর বাবা, রাজুর মা। রাজুর বয়স দশ, কালো গোল মুখের ওপর খাড়া খাড়া চুল দেখলে স্ট্যাটিক খাওয়া সজারুর কথা মনে পড়ে, দাদারা কেউ বলে দোদোমা, কেউ বলে ধানি পটকা। পড়াশোনা খেলাধুলো কোনওদিকেই রাজুর প্রতিভার কোনও ছাপ দেখা যেত না। রাজুর জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল কারও কথা না শোনা।

তবু পাড়ার কারওরই, বিশেষ করে চল্লিশের বেশি বয়স যাদের, সন্দেহ ছিল না যে রাজু বড় হয়ে একজন সফল মানুষ হবে। তার কারণ, রাজুর মা। রাজু সারাদিন দুষ্টুমি করত। রাজুর মা সারাদিন রাজুকে শাসন করতেন। চিৎকার করে। অবশ্য ভালো কাজ লুকিয়েচুরিয়ে করবেনই বা কেন। অনেক সময় সে শাসনের নমুনা চোখেও দেখতে পেতাম। রাজু বিদ্যুৎবেগে বাড়ি থেকে ছুটে বেরোচ্ছে আর বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে রাজুর বাবার একখানা এগারো নম্বর সাদানীল হাওয়াই চটি উড়ে আসছে। সঙ্গে রাজুর মায়ের চিৎকার। জুতো কখনওই লক্ষ্যভেদ করতে পারত না। খানিকক্ষণ পর রাজুর মা হেলেদুলে বেরিয়ে এসে রাস্তা থেকে চটি উদ্ধার করে নিয়ে যেতেন। আশেপাশের বাড়ির প্রতিবেশীদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করতেন। তাঁর মুখে মিনিটকয়েক আগের ক্রোধের চিহ্নমাত্র থাকত না। আমরা ভাবতাম এত শাসন, কাজে তো লাগে না দেখি। কিন্তু বড়রা বলতেন, ভেতরে ভেতরে কাজ ঠিকই দিচ্ছে, বড় হয়ে রাজু একজন গ্রেট ম্যান হবে।

সময়সমাজ ভেদে শাসনের উপায়, তীব্রতা ভিন্ন হয়, তার থেকেও ভিন্ন হয় মানুষভেদে। বাবাদের একই সময়ে বড় হওয়া সত্ত্বেও আমার মা মামা মাসিরা একেবারেই মারধোর খাননি। অথচ তাঁরা কিছু কম নৃসিংহঅবতার ছিলেন না। তাছাড়া তাঁরা সংখ্যায় বাবাদের থেকে বেশি ছিলেন। বাবারা পাঁচ, মায়েরা আট। আটজনই একসঙ্গে বড় হচ্ছিলেন না ঠিকই, কিন্তু তাতে আমার দিদিমাদাদুর কিছু সুরাহা হয়নি। যারা বড়  হয়ে গেছে, তাঁদের ছেলেমেয়েরা এসে দলে ভিড়েছিল। তাদের খেলা, মারামারি, আক্রমণ, ডিফেন্স, কান্না, হাসি—সব মিলিয়ে কী পরিমাণ শব্দব্রহ্ম সৃষ্টি হত সেটা আমি আমার প্রৌঢ় মাসিমামাদের ডাইনিং টেবিলের চারদিকে বসে কুশলবিনিময়ের ডেসিবেল দেখেই আন্দাজ করতে পারি।

অথচ কেউ কিছু বলত না। দাদুর বলার সময় ছিল না, দিদিমা ভয়ানক শান্ত ছিলেন। পরিস্থিতি নিতান্ত খারাপ হলে রান্নাঘর থেকে মাঝে মাঝে “আহি, আহি” বলে হাঁক দিতেন। তাতে কোনও কাজ দিত না। কারণ ছেলেমেয়েরা জানত যে রান্নাঘর ছেড়ে মায়ের আসার সময় নেই। হুমকিই সার। দিদিমার আরেকটা বকুনি খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। ছেলেমেয়েদের দুষ্টুমি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলতেন, “জ্যান স্বরাজ পাইসে” (জ্যান-এর বানান অন্ত্যস্থ য হবে, কিন্তু টাইপ করা যাচ্ছে না। দুঃখিত।) দিদিমা যখন বড় হচ্ছিলেন তখন স্বরাজ পাওয়াকে একজন মানুষের আনন্দের, বাঁধনহীনতার, স্বাধীনতার চূড়ান্ত মনে করা হত। সমসাময়িক সমাজের স্বপ্ন, ইচ্ছে, আশা কেমন বকুনির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সেই রিসার্চে এই গল্পটা কাজে লাগতে পারে।

আমি যখন বড় হচ্ছিলাম তখন শাসনপদ্ধতি বাবাদের সময়ের থেকে অনেক বদলে গেছে। মারধোর কমে এসেছে, কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি একেবারে। তবে আমি চারপাশে যা যা দেখেছি, তাও গল্প করার জন্য যথেষ্ট।

আমাদের স্কুলে নিয়মিত মান্থলি টেস্ট হত। এখনকার ডেইলি টেস্টের বাজারে আমাদের জীবন কেকওয়াক মনে হলেও পঁচিশ বছর আগে সেটা যথেষ্ট কড়াকড়ির পর্যায়ে পড়ত। মান্থলি টেস্টের নম্বরের গড় করে সেটা হাফইয়ার্লি আর অ্যানুয়াল পরীক্ষায় যোগ কার ব্যবস্থা ছিল মনে হয়, কাজেই মাবাবারা সেটাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। এ রকম এক মান্থলি পরীক্ষার খাতা বেরিয়েছিল সে দিন। ছুটির পর কারও কারও মা আসতেন নিতে। সেরকম একজন মা ঝাঁপিয়ে পড়ে খাতা দেখতে চাইলেন। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে খাতা বার করে দিল। মায়ের নম্বর পছন্দ হল না। তিনি বললেন, “ছি ছি ছি। এই দ্যাখ, তোর জন্য সন্দেশ এনেছিলাম, কিন্তু দেব না।" এই না বলে ক্লাস ফাইভে পড়া সন্তানের চোখের সামনে বাক্স খুলে কপকপ করে চারটে কাঁচাগোল্লা খেয়ে ফেললেন।

ট্রেনে এরকম আরেকজন মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তিনি তাঁর পাশে বসা আরেকজন মায়ের সঙ্গে আলাপ করতে করতে যাচ্ছিলেন। ছেলেমেয়েরা যে কিছুই খেতে চায় না সে নিয়ে কথা হচ্ছিল। অন্য মা অনুযোগ করছিলেন যে ছেলে কিছুই খেতে চায় না। মানে চায়, কিন্তু সব খারাপ জিনিস। ডিমসেদ্ধ কপাকপ খেয়ে ফেলে কিন্তু হরলিক্সের গ্লাস যেমন কে তেমন পড়ে থাকে। সেই শুনে আমাদের মা বললেন, "আমি তো না খেলে একবার জিজ্ঞাসা করি, 'খাবি?' দুবার জিজ্ঞাসা করি, 'খাবি?' তারপর আর কথা না বাড়িয়ে নিজেই গ্লাস তুলে ঢক ঢক করে খেয়ে নিই।”

(এখানে খালি মায়েদের শাসন করার কথাই লিখছি। এই বাজারে, যেখানে টিভি খুললেই পরিষ্কার হয়ে যায় বাচ্চার সর্দি লাগা প্রতিরোধ করা থেকে শুরু করে দৌড়ে এরোপ্লেনকে হারাতে পারা থেকে শুরু করে ভাঙা পা নিয়ে সাঁতার কাটা শুরু করে নিজের জুতো গরিব বন্ধুকে দিয়ে দেওয়ার মহত্ব শেখানো সবই মায়েদের সাফল্য অথবা ব্যর্থতা, সেখানে কেবলমাত্র মায়েদের শাসনপদ্ধতি নিয়ে কথা বলাটা রিস্কি। লজ্জা পেয়ে আমি বাবাদের শাসনপদ্ধতি নিয়ে ভাবতে বসলাম। কিল চড় ঘুষি আর অত পরিশ্রম করার ইচ্ছে না থাকলে “কিস্যু হবে না” ভবিষ্যদ্বাণী ছাড়া আর কোনও ইন্টারেস্টিং উদাহরণ মনে পড়ল না। কাজেই আমি নিরুপায়। আপনাদের যদি বাবাদের শাসনের কোনও ইন্টারেস্টিং উদাহরণ জানা থাকে তাহলে মন্তব্যে এসে লিখতে পারেন।)

তবে স্কুলের শাসন বাবাদের সময়েও অদ্ভুত ছিল, আমাদের সময়েও ছিল। কিছু সাইকোপ্যাথ তখনও সেধে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানোর পেশা বেছে নিতেন, আমাদের সময়েও নিতেন। জোড়া স্কেল ক্লাস থ্রি-র বাচ্চার পিঠে ভেঙে ফেলতে দেখেছি আমি নিজে চোখে। আরেকজনকে দেখেছি, ক্লাসে খাতা না আনার বা ওই গোত্রের কোনও অপরাধের জন্য একটি বাচ্চা মেয়ের জামা খুলে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। এবং খুলতে শুরু করে দিয়েছেন। ক্লাসশুদ্ধু আতংকিত বন্ধুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে মেয়েটি ঠকঠক করে কাঁপছে।

আমি নিজে বেশি মারধোর খাইনি। মা শান্ত ছিলেন, আমি মায়ের থেকেও শান্ত ছিলাম। আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালেই আমার হয়ে যেত। তবু চড়থাপ্পড় খেয়েছি কয়েকখানা। দুঃখের বিষয় সেগুলোর বেশিরভাগই অন্যের ভাগের। রাগ হলে যাদের ওপর রাগ হয়েছে তাদের ধরে মারা যায় না, তাই মা আমাকে ধরে মারতেন। তবে সে মার মাঝারি গোছের চড়ের সীমা ছাড়ায়নি কখনও। আমার এইরকম বোরিং শাসনের জীবনে একটা ঘটনা মনে রাখার মতো। তখন আমি খুবই ছোট। পাতিহাঁস আঁকা টেপফ্রক পরে ঘুরি। সেই সময় একদিন সন্ধ্যেবেলা ইংরিজি কোনও বানান উপর্যুপরি ভুল করার অপরাধে মা আমাকে বাগানে বার করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা যত এলেবেলে শুনতে লাগছে ততটাও নয়, কারণ তখনও আমাদের নতুন ঘর হয়নি, বাগান জুড়ে আম কাঁঠাল নিম পেয়ারা কুল নারকেলের ছড়াছড়ি। তারা সব ভূতের মতো হাতপা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। আর এখন কেন যেন মনে হয় সে রাতে চাঁদের আলোও ছিল না।

আমার ভয় করছিল খুবই, কিন্তু ভয়ের থেকেও চমকে গেছিলাম বেশি। তাই কাঁদিটাদিনি। মিনিটখানেক পরেই মা দরজা খুলে আমাকে তুলে আনলেন। অনেক অনেক দিন পর বকাঝকা নিয়ে গল্প করার সময় আমি মাকে বাগানের এপিসোডটার কথা মনে করাতে মা জিভ কেটে কান ধরেছিলেন। ঘটনাটা মা-ও ভুলতে পারেননি। কারণ নিজের আচরণ তাঁকেও অবাক করেছিল। তারপর মা আমাকে বললেন এ সবই হচ্ছে অবচেতনের খেলা। মায়ের যখন পাতিহাঁস আঁকা টেপফ্রক পরার বয়স ছিল তখন নাকি মানুষের দেহে ক’টা হাড় থাকে বলতে না পারায় সেজমাসি মাকে বাড়ির বাইরে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। ভাগ্যিস দাদু তখন বাজার করে ফিরছিলেন তাই মায়ের অপমান দীর্ঘ হয়নি। সেই থেকে মায়ের অবচেতনে ছিল যে শাসনের তূণে 'বাইরে বার করে দেওয়া’ অস্ত্রটা থাকা জরুরি। সে অস্ত্র জীবনে একবারের জন্য হলেও প্রয়োগ না করে মায়ের মুক্তি ছিল না।


16 comments:

  1. Amader shanto shishto, aantel, brahmo ishkool. Maar dhorer rewaj chhilo na bishesh. Kokhono sokhono kono sir karor gaaye haat tulleo seta chheleder bhaagei porto beshi. Meyera nistaar peye jeto. Ta ekrokom besh bhaloi.

    Tobey amar maa gender parity te bishwasi. Ami ebong bhai - dujonei entaar maar kheyechhi. Tao maa'r ekhono dukkho, aro beshi shashon korle amra naki aro beshi manush hotam.

    9 bochhor boyeshe amar bharatnatyam teacher ekbar amay mere paa diye rokto ber kore diyechhilen. Ekhono bharatnatyam dekhle majhe majhe gheme uthi. Chhotobelar trauma bhari ashchorjo jinish.

    Tobe oi jama kholar golpota porey ekhono shiure uthchhi. Sei teacher ke ki keu kichu bolechilo? Meyetir sheshporjonto ki holo?

    ReplyDelete
    Replies
    1. কে আবার কী বলবে, বিম্ববতী। কিছুই বলেনি। মেয়েটার চোখে ধরা পড়ার মতো ড্যামেজ হয়নি, অন্তত আমরা কিছু ধরতে পারিনি। পাঠভবনের আরও অনেক কিছুই নিশ্চয় ভালো, কিন্তু এই মারধোরের চল না থাকাটা বেশ ভালো বলতে হচ্ছে।

      Delete
  2. "জোড়া স্কেল ক্লাস থ্রি-র বাচ্চার পিঠে ভেঙে ফেলতে দেখেছি আমি নিজে চোখে। আরেকজনকে দেখেছি, ক্লাসে খাতা না আনার বা ওই গোত্রের কোনও অপরাধের জন্য একটি বাচ্চা মেয়ের জামা খুলে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। এবং খুলতে শুরু করে দিয়েছেন। " এগুলোকে ঠিক শাসন বলতে মন চায় না, বরং বলা উচিত দুর্বলের ওপর সবলের গায়ের ঝাল ঝাড়া, আর এধরনের অত্যাচারে অত্যাচারিতের ঐহিক অথবা পারলৌকিক কতটা উন্নতি হয় সেটাও আমার জানা নেই| তবে আমাদের বাবামা-র প্রজন্ম বড়দের হাতে মার খাওয়াটাকে যেমন মারাত্মক ভক্তির চোখে দেখেন/দেখতেন (মারসি, তবে না মানুষ হইসে?), সেটাকে আমি সমর্থন করতে পারছি না| শাসন করাটা অবশ্যই দরকারী, বরাবরই যে কারুর একটা শাসনে থাকতে হবে - মাবাবার, বসের, নিদেনপক্ষে নিজের, সেটা শুধু ছোটবেলায় নয়, সারাজীবন ধরে মনে রাখতে হয়, কিন্তু মারধর করাটাই শাসন ফলানোর একমাত্র উপায় হতে পারে না, হওয়া উচিত নয় ( আমার অবশ্য এটাও মনে হয়, দু-এক ঘা খেলে বাচ্চাকাচ্চার খুব একটা ক্ষতি হয় না, তবে সেটা কালেভদ্রেই হওয়া উচিত)|

    ReplyDelete
    Replies
    1. এ ব্যাপারে আমি তোমার সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত, অন্বেষা। আর ঠিকই, ওগুলো শাসন নয়, ওগুলো নিজের গুরুতর এবং অ্যাড্রেসড না হওয়া সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।

      Delete
  3. “জ্যান স্বরাজ পাইসে” আমার ঠাকুমাও বলতেন।
    ক্লাস ১ এ কোনো পরীক্ষাতে পুরো ক্লাসের লেখা শেষ হয়ে গেছিল। আমি জানিনা কি করছিলাম, সবার শেষে পরীক্ষাহল থেকে বেড়িয়েছিলাম তাও আর্ধেক লিখে। মা অফিস থেকে ফিরে এটা শুনে তেলে বেগুনে ব্জলে উঠে (মা পড়াত তখন) যেই মারতে যাবে আমার ঠাকুমা " ওরে মাইয়াটারে মেরে ফেল্লরে" বলে চিল চিৎকার জুড়েছিলেন।

    বাবার শাসন হল "জীবনে কি করে খাবি"--এখন ও এটাই বলে চলেছে। এযাবৎ উত্তর পাওয়া যায়নি, যাবার আশাও কম।
    আর মা বেচারা নাকি "বাবার আস্প্দাতেই আমি এত বেড়েছি" বলে হাহুতাশ করে কাটিয়ে দিল।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহাহা, এরকম ঠাকুমা কিন্তু বাড়িতে থাকা ভালো, প্রিয়াঙ্কা।

      Delete
  4. আমার ছোটবেলায় আমি মারধর কম খেয়েছি , যা হয় , যৌথ পরিবারে সব চেয়ে ছোট হলে। খালি মনে পরছে তুমুল একটা ভয় পাওয়ানোর বস্তু ছিল আমাদের সিড়ির ঘর , ওখনে চাষ বাসের জিনিস থাকত ওখানে বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখানো হত। আর স্কেলের মার হাত পেতে নিয়েছি জ্যাঠতুতো দাদার থেকে প্রায়ই ( যে কিনা মা আমায় বকলেই মাকে এসে বকে যেতো ) . আর বাবাই কে খুব ভয় পেতাম ওই রক্ত চক্ষুর কল্যানে। তবে আমার দিদিরা বিস্তর মারধোর খেয়েছে। ( এ থেকে অবশ্যই ধারণা করা যেতে পারে আমি কি ভালোমানুষটি ^_^ )

    ReplyDelete
    Replies
    1. তোমার কমেন্টটার মধ্যে সবথেকে ইন্টারেস্টিং জায়গাটা আমার লাগল ওই চাষবাসের জায়গাটা। তুমি কি তার মানে চাষবাস হতে দেখেছ? এই অভিজ্ঞতাটা এবং আমার গণ্ডির লোকজনের কারও নেই।

      Delete
  5. :):)amio besh koyekbar maar kheyechi jibone, maar kachei beshi,bhai ar amar loraie titibirakto hoye marto..matha thuke dewa,pithe chapor,baba ekbar scale die hantute merechilo,!!

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহা, সাংঘাতিক ব্যাপার কিন্তু, তিন্নি।

      Delete
  6. ami apato shanto holeo chirokal e bidghute bidghute dustumi kortam(kori)
    ebong didar kache prochondo bokuni ar mar rojakr routine chilo, uporontu chutir somoy baba mar barite geleo maer bokuni theke rehai petam na.baba gaye hat diten na sref 'aj tui shyash' ei chitkar diyei khanto thakten, otei montrer moto kaj dito. tobe ekta mojar kotha seta hochhe amar posha tiya pakhita o amar motoi hare haramjada jinis. to keu amake bokle ba marle o chechiye bari mathay korto, or jonyoi besh koekbar bhoyanok shastir hat theke beche gechi.

    ReplyDelete
    Replies
    1. পোষ্য এরকম হওয়াই দরকার।

      Delete
  7. বাচ্চা নম্বর কম পেলো বলে তার সন্দেশ খেয়ে নেওয়া! এ কি রকম মা - বাঙালি মা রা মাঝে মাঝে বড্ডো নৃশংস type হয় - তোমার এই গল্প গুলো পড়ে ইচ্ছে সিনেমা টার কথা মনে পরে গেলো। সুচিত্রা ভট্টাচাৰ্য র গল্প, কিন্তু সেটার নামটা মনে নেই।

    ReplyDelete
    Replies
    1. শুধু বাঙালিরা হয় কি না জানি না, কাকলি, তবে মাবাবারা তো নৃশংস হনই।

      Delete
  8. আমি অনেক ধেড়ে বয়েস,মানে ক্লাস ইলেভেনে পড়াকালীনও বাবার কাছে মার খেয়েছি, সুতরাং আন্দাজ করাই যায় আমি কি পরিমাণ বাঁদরী ছিলুম!আর মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে অব্দি বাবার কাছে অঙ্ক করতে বসলেই সে খাতা আর আস্ত থাকতো না। মায়ের কাছে শুনেছি ছোটবেলায় মা মারতে এলেই আমি "মেরে ফেললো, মেরে ফেললো, বাঁচাও বাঁচাও,পুলিশ পুলিশ "- ইত্যাদি বলে চিৎকার করতাম আর আশেপাশের বাড়ি থেকে আত্মীয়স্বজনরা এসে পড়তেন।

    ReplyDelete
    Replies
    1. ইলেভেনে মার খাওয়ার ঘটনাটা আমার মতে তোমার বাঁদর হওয়ার নয়, তোমার অত্যন্ত বাধ্য এবং নমনীয় হওয়ারই প্রমাণ, শাল্মলী।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.