একপাটি জুতো



সেদিন মেট্রো স্টেশনের চাতালে দেখি একপাটি জুতো পড়ে রয়েছে।

দৃশ্যটা বেশ অনেকগুলো কারণে নজর করার মতো। এক নম্বর, দিল্লির মেট্রো অসম্ভব পরিষ্কার। এদিকসেদিক ছেঁড়া জুতো, বাতিল পলিথিন, একখাবলা জল, এইসব ছড়ানোছেটানো নয় একেবারেই।

দু’নম্বর কারণ, দিল্লি মেট্রোতে ভিড় হলেও, ধাক্কাধাক্কিতে পা থেকে জুতো খুলে যাওয়ার মতো চরিত্র সে ভিড়ের নয়। রাজীবচক মার্কা জাংশান স্টেশন হলে তাও বুঝতাম। হাজারহাজার দিক থেকে লক্ষলক্ষ লাইন এসে মিশেছে, আর সেসব লাইন থেকে কোটিকোটি লোক এসে নেমেছে। এবং নেমেই অন্য একটা ট্রেনে ওঠার জন্য ছুটেছে। তার মধ্যে আবার কিছু অ্যাক্টিভিস্ট লাঠিসোটা ব্যানারপোস্টার নিয়ে বিপ্লব শুরুর তোড়জোড় করছে। চারদিক থেকে মাইকে ক্রমাগত ট্রেন আসাযাওয়ার ঘোষণা, নিরুদ্দেশের প্রতি হাঁকডাক, ডিটেক্টরের অবিরাম কানের পর্দা ফাটানো তীব্র পিঁপিঁ শব্দ---সব মিলিয়ে একজন সুস্থ মানুষের অসুস্থ বোধ করার পক্ষে যথেষ্ট।

কিন্তু জুতোটা যে স্টেশনে পড়ে ছিল, সেখানে একত্রিশে ডিসেম্বর রাতেও অত ভিড় হয় না। এমনি দিনে সন্ধ্যে ছ’টার সময় তো ছেড়েই দিলাম।

তিন নম্বর কারণ (এবং এই কারণটাই জুতোর পাটিটার দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সবথেকে বেশি জোরালো) হল জুতোটার সাইজ। জুতোটা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে জুতোর মালিকের উচ্চতা বত্রিশ ইঞ্চি, কোমর একুশ ইঞ্চি, ছাতি বাইশ ইঞ্চি...

...কবজি সাড়ে চার।

সিনেমার নাম বলতে পারলে হাততালি।

বোঝাই যাচ্ছে জুতোর মালিক কোনও একজন প্রাপ্তবয়স্কের কোলে চেপে আরাম করে এদিকসেদিক দেখতেদেখতে হেলতেদুলতে চলেছিলেন। এদিকে জুতো যে পা থেকে খসোখসো হয়েছে সেদিকে কারোরই খেয়াল ছিল না। না মালিকের, না মালিকের বাহকের। তারপর ঠিক ওই জায়গাটায় এসে জুতোটা ছোট্ট গোল পা’টা থেকে টুপ করে খুলে পড়ে গেল। তখন হয়তো জুতোর মালিক পড়ে যাওয়া জুতোটার দিকে ছোটছোট আঙুল দেখিয়ে, দুর্বোধ্য ভাষায় সঙ্গীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন, হয়তো সঙ্গীর গালে মাথায় গোলগোল হাত দিয়ে দু-চারটে মৃদু থাবড়াও মেরেছিলেন, কিন্তু তাতে কাজ দেয়নি।

জুতোটা দেখে আমার এমন মনখারাপ হয়ে গেল যে কী বলব। প্রায় নতুন জুতোখানা। হালকা গোলাপি রঙের, বো বাঁধা। আমি নিজের বিয়ের জুতো খুঁজেখুঁজে হয়রান হচ্ছি, একটাও পছন্দ মতো হচ্ছে না। ডক্টর শোল’স আর চুমকি বসানো স্টিলেটোর মাঝামাঝি যত জুতো, ষড়যন্ত্র করে সব দোকান থেকে একসঙ্গে উধাও হয়েছে মনে হচ্ছে। অথচ এই রকম একটা পারফেক্ট জুতো অনাদরে অবহেলায় পথের মাঝে পড়েপড়ে মাটি হচ্ছে, ভাবা যায়?


উৎস গুগল ইমেজেস

দাঁত থাকতে যেমন লোকে দাঁতের মর্ম বোঝে না তেমনি হাঁটতে শিখলেও লোকে জুতোর মর্ম বোঝে না। যেমনতেমন পায়ে গলিয়ে ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে চলে। বর্ষাকালে কলকাতার কাদামাখা রাস্তায় বেরোলেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আমার মা এমনিতে ঠাণ্ডা মানুষ, কিন্তু জুতো পরা নিয়ে তাঁর ভয়ানক কড়া মতামত রয়েছে। মা মনে করেন, কলকাতা শহরে যত লোক জুতো পরে চলে তাদের অর্ধেকেই হাঁটতে শেখেনি। শিখলে চটি থেকে অত কাদা ছিটত না।

মায়ের মতে জুতোর কদর যদি সত্যি কেউ করতে পারে তারা হল কোলে চাপা শিশুর দল। আমার ছোটবেলার লক্ষলক্ষ বাজে গল্পের মধ্যে একটা গল্প মায়ের ভীষণ প্রিয়। সেটা হচ্ছে আমার জীবনের প্রথম জুতোর গল্প। যখন আমি মোটা হতে হতে এমন ভারি হলাম যে আর কেউ আমাকে কোলে নিতে চাইল না, তখন আমার মাবাবা ঠিক করলেন যে এবার মেয়েকে সত্যিকারের জুতো কিনে দেওয়ার সময় হয়েছে।

একমাত্র সন্তানের জীবনের প্রথম জুতো বলে কথা, তাই এক রবিবার তাঁরা আমাকে কোলে নিয়ে রিষড়া থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে এসপ্ল্যানেডের বাটায় উপস্থিত হলেন। অনেক ঝাড়াবাছার পর অবশেষে একটা জুতো পছন্দ করা হল। দোকানে বসিয়েই সে জুতো পায়ে পরিয়ে তাঁরা আমাকে বললেন, “এবার হাঁটো তো দেখি সোনামা।”

আমি এমনিতে কোল ছাড়া মোটে নড়াচড়া করতে চাইতাম না, কিন্তু নতুন জুতো পরে আমার ভোল পাল্টে গেল। দুই হাতে বাবামার হাত ধরে আমি ধীরেসুস্থে, একটি একটি করে পা ফেলে চলতে শুরু করলাম। নিজের জুতো পরা পা দেখে আমি এমন মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম যে প্রত্যেক পা ফেলার পর অন্তত পাঁচ সেকেন্ড তার থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না।

এদিকে আমার পেছনে এসপ্ল্যানেডের ফুটপাথে পথচারীদের জ্যাম লেগে যাচ্ছিল।

বেগতিক দেখে মাবাবা আমাকে পত্রপাঠ কোলে তুলে ফেলেছিলেন। আর আমি বাবার কোলে চেপে সেই এসপ্ল্যানেড থেকে রিষড়া পর্যন্ত বিরাট মুখব্যাদান করে কাঁদতেকাঁদতে ফিরেছিলাম, কেন আমাকে নতুন জুতো পরে হাঁটতে দেওয়া হচ্ছে না।

আমি ওঁদের জায়গায় থাকলে আমার মেয়ের কপালে দুঃখ ছিল, কিন্তু মাবাবার কেন জানি গোটা ব্যাপারটা ভারি মজার লেগেছিল। আমার বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকে আরও বেশি মজার লাগছে দেখছি। যাকে পাচ্ছেন তাকেই ধরে ধরে শোনাচ্ছেন।

জঘন্য।

সে যাই হোক, সেদিন থেকে আমার পড়ে থাকা জুতোটার মালিকের জন্য মনটা খারাপ হয়ে রয়েছে। বেচারা অবোলা জীব, নিশ্চয় জুতো হারানোর দুঃখ কারও কাছে খোলসা করে বলে মন হালকাও করতে পারছে না।

Comments

  1. 'একপাটি জুতো' darun laglo. aha amaro boro mon kharap hoe galo, omon sundor jutota jutor malik harie phelechhe dekhe. Ar tomar chhotobelar galpo obossoi DARUN !!!

    ReplyDelete
    Replies
    1. ভাবুন। বেচারা হয়তো মুখ ভার করে বসে রয়েছে। গোমড়ামুখো বাচ্চা কী মজা লাগে না দেখতে?

      Delete
    2. ar tader gomra mukh e hasi photate parle aro beshi kore bhalo lage, taina?

      Delete
  2. জুতোর ব্যাপারে এ কথাটা সত্যি যে পছন্দসই জুতো পাওয়া আজকাল বেজায় কঠিন । এমন সব রঙ,সলমা চুমকি পাথর আর ডিজাইন থাকবে যে কি বলব। হিলের বাহারও কিছু কম নয়। পছন্দমত জুতো পেলে মনে হয় একেবারে দু তিন জোড়া কিনে নি । গল্পটা খাশা । একপাটি একা জুতো একটা মন কেমন করা ছবি।

    মিঠু

    ReplyDelete
    Replies
    1. সত্যি মন কেমন করা মিঠু। পছন্দের জুতো দুতিন জোড়া কিনে নেওয়ার কথাটা আগে মাথায় আসেনি তো, এবার থেকে তাই করব।

      Delete
  3. Ehh...puchke jutor malik er kotha bhebe mon kharap hoye gelo...:(
    Apnar jutor malik k khuje jutota ferot dewa uchit chilo...Nagorik kortobbo bole kotha..:P

    r cinemar nam ki Joy Baba Felunath?

    ReplyDelete
    Replies
    1. জুতোর মালিকের কথা ভেবে আমারও দুঃখ হচ্ছে।

      কাছাকাছি গিয়েছিলেন সৌমেশ। সোনার কেল্লা। জটায়ু ট্রেনের কামরায় বসে প্রখর রুদ্রের বর্ণনা দিচ্ছিলেন।

      Delete
  4. ইশ হাততালিটা ফসকে গেল!

    গল্পটা দারুন। আমারও প্রথম বাটার জুতো কিনতে ওই এসপ্ল্যানেডের দোকানটাতেই যাওয়া হয়েছিল।

    একপাটি জুতো নিয়ে আমারও একটা গল্প আছে। একবার খুব ছোটবেলায় পুজোর বাজার করে আসার পর বাড়িতে কেউ একটা এসেছে, আর নতুন জামা-জুতো কিসব কেনা হয়েছে সেগুলো আমি ভয়ানক উত্সাহ ভরে তাকে দেখাচ্ছি। আমার মায়ের একজোড়া চটি কেনা হয়েছিল, পাশের ঘর থেকে তার এক পাটি এনে আমি বলেছিলাম, "অন্যটা ঠিক এইরকমই দেখতে, তাই সেটা আর দেখালামনা।"

    বিশ্বাস করুন, আজ পর্যন্ত সেই গল্পটা বলে লোকের কাছে আমায় নিয়ে হাসাহাসি করা হয়, কিন্তু আমি আজও বুঝতে পারিনা আমি ভুলটা কি করেছি। ওই বয়েসে বুদ্ধি করে "Effort optimization" করার জন্য কোথায় প্রশংসা পাব, তা নয়। বড়দের না, একদম বুদ্ধি নেই!

    ReplyDelete
    Replies
    1. :-) :-) ..eta besh majar!

      Delete
    2. হাহাহাহা, এটা দারুণ গল্প সুগত। সত্যি বড় হলে লোকে যে হোঁৎকা হয়ে যায়, তার যে আরও কত প্রমাণ পাওয়া যাবে...

      Delete
    3. সুগতর গল্পটা শুনে খুব মজা পেলাম। ওই বহুছোটবেলা থেকে জুতোর গল্প আমার একটাই মনে আছে, আমাদের বাড়ি কেউ এলে, তাঁকে যদি আমার পছন্দ হোত, আমি নিশ্চুপে গিয়ে তাঁর জুতোর এক পাটি লুকিয়ে রাখতাম। আমার জননী এখনও এইটা লোকজনকে বলে হাসাহাসি করেন। (সব মায়েরাই কিরকম এক ধরণের যেন!!)

      Delete
    4. হ্যাঁ সুগতর গল্পটা সত্যি মজার। তোমার তো ছোটবেলাতেই বেশ ধারালো মগজ ছিল দেখছি কৌশিক। মায়েদের সম্পর্কে ওই প্রবাদটা খুব খাটে আসলে। যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। মা হলেই সবাই টপাটপ একটা ধাঁচে পড়ে যান।

      Delete
  5. khub bhalo lekha...tor galpotao darun.:-) choto kuntala mugdho hoye nijer juto dekhte dekhte esplanade-e hente choleche ...

    ReplyDelete
    Replies
    1. থ্যাংক ইউ তিন্নি।

      Delete
  6. darun laglo pore..achha akhono ki sei rokomer juto pawa jay jegulo pore hatle pnyak pnyak shobdo hoy? amar akta chilo chotobelay, laal ronger juto ar hatlei anek gulo hnaas deke uthto..ami oboshyo oto kolorob mote pochhondo kortam na, tai juto paye kole chore jetei beshi pochhondo kortam :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাই ফাইভ স্বাগতা, আমারও ওটাই ফেভারিট ছিল। জুতোমোজা পরে বাবা কিংবা মায়ের কোলে চেপে ভ্রমণ। সাজও হল, আরামও হল।

      কী জানি পাওয়া যায় কি না। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।

      Delete
    2. Amader low-tech pyank pyank juto ar pawa jaay kina janina, ajkalkar juto guloy lal nil electronic alo jwole dekhi.

      Delete
    3. আবার কিছু জুতোয় দেখি একটা ছোট্ট চাকা ফিট করা আছে। Far cry from সেদিনের হবুচন্দ্র রাজা আর গবুচন্দ্র মন্ত্রীর জুতা আবিষ্কার! :)

      Delete
    4. সুগত, আমাদের যুগ কি আর আছে?

      কৌশিক, একটা কোথায় পড়েছিলাম (ইন ফ্যাক্ট অবান্তরের সাপ্তাহিকীতে লিংকও বেরিয়েছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে খুঁজে বার করার ধৈর্য নেই) একটি বছর চারেকের মেয়েকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তার কীরকমের জুতো পছন্দ। সে পয়েন্ট করে করে গুছিয়ে বলেছিল, আর সে লিস্টের একাধিক পয়েন্ট ছিল, "ইট হ্যাস টু বি ফাস্ট"।

      দোকানওয়ালারা সেই বুঝেই চাকা জুড়েছেন বোধহয়।

      Delete
  7. kuntala ki misti lekhata..amar cheler jokhon doshmas boyos ekta shopping mall e giye or juto pore giyechilo..chele kintu amake bojhanoro chesta koreche or bhashay,kintu ami bujhini.jokhon berobo mall theke tokhon chokh porlo payer dike dekhi juto nei.ami bypok bokajhoka suru korechi.pase ekjon mohila amar bhasa na bujhleo expression e bujhechilen ami juto niyei bokchi..uni sathe sathe bollen "ami oi jutor pati ta information desk e diye esechi"..ebong uni naki announce o koriyechilen kintu ami sunini byparta .jak juto peye puchke ke ami ekbar sorry o bole niyechilam boka-jhokar jonnyo.

    ReplyDelete
    Replies
    1. সুমনা, দেখেছ, তোমার ছেলে তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল। তুমি সেটা তো বোঝইনি, উল্টে বেচারাকে বকেছঝকেছ। বাবামা'দের ওপর কি সাধে রাগ হয় ছেলেপুলেদের?

      যাই হোক তোমার ছোট্ট ছেলের ছোট্ট পায়ের ছোট্ট জুতো ফেরৎ পাওয়া গেছে শুনে খুশি হলাম। নিশ্চয় খুব ভালো দেখতে ছিল জুতোটা?

      Delete

Post a Comment