March 27, 2012

হিংসুটি


ব্লগার’স ব্লক বলে যদি পৃথিবীতে কিছু থেকে থাকে তবে গত ক’দিনের ডুব মারার দায় তার, আমার না।

সত্যি বলছি দোষটা পুরোটা আমার নয়। আমি দুবেলা নিয়ম করে ল্যাপটপ চালিয়ে, MS Word খুলে একদৃষ্টে চেয়ে ধ্যানে বসেছিলাম, কিন্তু ওই চেয়ে থাকাই সার হয়েছে। শেষে অতিকষ্টে কী যেন একটা বাজে গল্প ভেবেচিন্তে স্মৃতি হাঁটকে বারও করেছিলাম, কিন্তু লিখতে গিয়ে এমন অপ্রত্যাশিত বিঘ্নের সম্মুখীন হলাম যে লেখাটেখা সব হাওয়া হয়ে গেলো।
সেই বিঘ্নের কথাই শোনাবো আপনাদের।

কলেজের ছবি খুঁজছিলাম। যে বাজে গপ্পটা মাথায় এসেছিলো, তার সাথে গুঁজবো বলে। কিন্ত খুঁজে পেলে তো? বিখ্যাত কলেজে চান্স না পাওয়ার শতকোটি ঝামেলার মধ্যে একটা ঝামেলা হচ্ছে একখানাও পদস্থ ছবি পাওয়ার জো নেই। মহিমান্বিত করিডোর নেই, বাঙালির নবজাগরণের সাক্ষী প্রবাদপ্রতিম সিঁড়ি নেই, অভ্রংলিহ মিনার থেকে শহরের ওপর দিবারাত্র নজর রাখা ঐতিহাসিক ঘড়ি নেই। অ্যাঙ্গেল নেই, কনভারজিং ভারটিক্যালস নেই, হোয়াইট ব্যালেন্স, ডিফিউসড লাইট কিসসু নেই। আমাদের কপালে কেবল হেদোর ধারে বসে বাদামভাজা চিবোতে চিবোতে হঠাৎ কী খেয়াল হতে পকেট থেকে রদ্দি মোবাইল বার করে ২ মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় খচাত করে তোলা, আউট অফ ফোকাস, ঝাপসা, ভদ্রসমাজে চালানোর অযোগ্য ছবি।


Google Images থেকে 


দেখেছেন? অবস্থাটা? রাগ ধরে কিনা বলুন? এ ছবি নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছে করে? তিতিবিরক্ত হয়ে উইন্ডো বন্ধ করে ঘুমোতে যাবো, এমন সময় আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেলো।

৫ নম্বর সারির বাঁদিক থেকে ৩ নম্বর ছবিটা। আমি একে চিনি।

লোকের অনেকরকম ফোবিয়া থাকে। অক্টোপাস কিংবা ইনজেকশনের ফোবিয়া তো কমন ব্যাপার, অনেকের শুনেছি ভূতুড়ে গরুর দুঃস্বপ্ন দেখে রাতে ঘুম ভেঙে যায়। আবার অনেকের বিজোড় সংখ্যায় চোখের পলক পড়ে গেলো কিনা সেই ভেবে ভেবে ঘুমই আসেনা।

আমার এসমস্ত কঠিন ফোবিয়া নেই। আমি মাকড়শা দেখলে চেঁচাই না, আরশোলার শুঁড় ধরে দুলিয়ে দিব্যি ডাম্পস্টারে ফেলতে পারি। চায়না টাউনে বসে অম্লানবদনে ব্যাংভাজা খেতে পারি (তাও আবার চপস্টিক দিয়ে), রিংগু দেখে একা একাই অন্ধকার ঘরে শুতে যেতে পারি, কেবল পুরোনো বন্ধু দেখলেই আমার হাত পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যায়।

সে এমনকি গুগল ইমেজেসে বন্ধুর ছবি দেখলেও।

নিশির ডাক কানে গেলে যেমন লোকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পথে বেরিয়ে পড়ে, মাঘমাসের মাঝরাত্তিরে লেপের তলা থেকে বেরিয়ে দুবার না ভেবে কনকনে পুকুরে সোজা নেমে যায়, খাবোনা খাবোনা করে আধখানা বাদামভাজা খেয়ে ফেললেই যেমন পুরো ঠোঙা শেষ না করা পর্যন্ত থামার উপায় থাকেনা, তেমনি পুরোনো বন্ধুর খোঁজ পেয়ে যদি আপনি তার সম্বন্ধে গোয়েন্দাগিরি না করে থাকতে পারেন, তবে আপনি সাক্ষাৎ ভগবান। কিংবা পয়লা নম্বরের মিথ্যুক।

আমি ক্লিক করতে শুরু করলাম। ব্যাপারটা খুব খারাপ দিকে গড়াতে পারে জেনেও। অভিজ্ঞতা আর সেলফ হেল্প ব্লগ আমাকে শিখিয়েছে, আশেপাশে ট্রিগার দেখলেই পত্রপাঠ সেখান থেকে কেটে পড়তে। পুরোনো বন্ধুর cv, personal এবং professional সেরকম একটা ট্রিগার, যেটা পরিস্থিতিকে মৃদু মনখারাপ থেকে গভীর বিষাদ ঘুরে শেষপর্যন্ত চায়ের কাপের ধ্বংসলীলায় পর্যবসিত করতে পারে। 

কিন্তু কী আশ্চর্য, এসব কিছুই হলনা। উল্টে প্রত্যেকটা ক্লিকের সঙ্গে সঙ্গে আমার মেজাজ লাফিয়ে লাফিয়ে চড়তে লাগলো, হৃদপিণ্ডের গতি ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে এলো, শেষটায় আমি ফুর্তির চোটে ঠোঁট সরু করে অসম্ভব বেসুরে শিস দিয়ে একটা গোটা রবীন্দ্রসঙ্গীত পর্যন্ত গেয়ে ফেললাম।

এত আনন্দ, কারণ দেখেশুনে আমার মনে হলো, এ মেয়ে আমার থেকে এমন কিছু বেশি ভালো নেই।

আমি জানি কথাটা কীরকম শুনতে লাগছে। আপনারা আমাকে ঠিক কতখানি ছোটো আর নীচ আর জঘন্য ভাবছেন। আমি নিজেও নিজেকে দেখে শঙ্কিত, লজ্জিত, মর্মাহত। এই মেয়েটা এককালে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ছিলো। এর পাশে বসব বলে আমি এক্সময় প্রাণ হাতে করে লেভেল ক্রসিং ছুটে পেরিয়ে ট্রেন ধরতাম। কলেজে সারাদিন বকবক করে বাড়ি ফিরে আবার ২ ঘণ্টা ধরে ফোনে গুজগুজ করে গল্প করতাম।

এখন, বাকি সমস্ত পুরোনো বন্ধুর মতো এও আমার কাছে স্রেফ একটা মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছে। আমি কতোটা ভালো আছি, বা কতোটা খারাপ, সেটা মেপে দেখার একমাত্র ফিতে। বন্ধুর থেকে বেশি মাইনে পেলে তবেই আমি বড়োলোক। বন্ধুর থেকে বেশি সুখে থাকলে তবেই আমি সুখী।

কেন এরকমটা হওয়া উচিত নয় সে নিয়ে লক্ষ লক্ষ কথা বলা হয়েছে। কী করলে 
এরকমটা আর হবে না, সে বিষয়েও পরামর্শের অন্ত নেই। হিতৈষীরা পইপই করে বুঝিয়েছেন, আমার প্রতিযোগিতা যদি কারও সাথে থেকে থাকে আদৌ, তবে সেটা শুধু আমারই সাথে।

যখন চোখে আঙুল দিয়ে বোঝানো হয়, তখন বুঝি। কিন্তু তারপরে আবার যে কে সেই। হিংসের আগুনে জ্বলেপুড়ে মরা। নিজের আধখ্যাচড়া জীবনটা নিয়ে ছুটে ছুটে অন্যের জীবনের পাশে দাঁড় করিয়ে করিয়ে দেখা, কতোটা কম পড়লো। কতোটাই বা অন্যকে কম পড়ানো গেলো।

বীভৎস, তাই না?

এসব করে যদি সময় নষ্ট করি, তাহলে কি আর পোস্ট লেখা যায়? আপনারাই বলুন? তবে এখন আপনাদের কাছে সত্যিটা স্বীকার করে অনেক হালকা লাগছে। পরের পোস্ট অলরেডি মাথায় এসে গেছে। কিন্তু সেটা কাল বলবো। আজ টা টা।  


8 comments:

  1. Apnar moner bhaabta 100% bujhte parchhi. Konta kora uchit, ar konta uchit noy seta niye bitorke jete chaaina. Apnar jaigay aami thakle onyorakom kichhu kortamna etuku bolte pari. Phobiar website tar jonyo dhonyobaad.

    ReplyDelete
    Replies
    1. jak, apnio amar moto hingsute jene sukhii holam. udaarmonader ami sotyi bujhte parina, tai ghNatai na.

      Website-te bhalo na?

      Delete
  2. yo, I am back! jak, tumi je poila nomborer mithyuk der moto noy, e jene ami khub khushi holam :D. amio erom i kore thaki :(. tobe jai bolo, erom phobiar website kotheke jotali tumi? scary!

    ReplyDelete
    Replies
    1. Yo! Atreyee! tumi je back, eite Kuntala bilokkhoN khush hua. Site-ta kirokom jogaR korechhi bolo?

      Delete
  3. ki bikat website..ratdupure ghabre gelam...!

    ReplyDelete
    Replies
    1. বিকট কোথায়, সুইট তো।

      Delete
  4. hingshar katha ar ki bolbo....purono bondhuder profile dekhi ar nijer mone fonsh fonsh kori

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমি তো ওই কারণেই অ্যাকাউন্টের ধার মাড়াইনি তিন্নি।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.