June 11, 2012

অতিথি দেবো ভব



কেউ আমার বাড়িতে বেড়াতে আসছে শুনলে আমার মনে প্রথমেই যে ভাবটা হয় সেটা লোকসমক্ষে স্বীকার করা শক্ত। আমার দোষ নেই। জিনের দোষ। আমার ঠাকুরদার এক খুড়তুতো ভাই ছিলেন। রামরাজাতলায় থাকতেন। গল্প শুনেছি সেই খুড়ঠাকুরদার নাকি বাড়িতে আসা অতিথিদের প্রতি প্রথম সম্ভাষণ হত, অকস্মাৎ?” ভাবুন একবার। বেলা এগারোটার চাঁদিফাটা রোদ্দুরে হাতে রসগোল্লার হাঁড়ি নিয়ে ঘর্মাক্ত অতিথি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন, ওদিক থেকে খট করে ছিটকিনি নামিয়ে দরজা খুলে, সাড়ে ছ’ফুট লম্বা, ফর্সা গায়ে পৈতে ঝোলানো রাশভারী গৃহকর্তা গম্ভীর মুখে জিজ্ঞাসা করছেন, “অকস্মাৎ?”

সে দাদু আবার ঘোর ফেমিনিস্টও ছিলেন শুনেছি। বেলা বারোটা থেকে তিনটের মধ্যে তাঁর বাড়িতে আগাম খবর না দিয়ে গিয়ে কেউ উপস্থিত হলে তার কপালে জল বাতাসা ছাড়া কিচ্ছু জুটত না। ওই সময়টা ছিল মেয়েদের বিশ্রামের সময়। কাজেই হেঁশেল বন্ধ। আবার বেলা তিনটের সময় উনুনে আঁচ পড়বে, ততক্ষণ বসে বসে হাওয়া খাও। সে তুমি রক্তের সম্পর্কই হও কিংবা রানী ভিক্টোরিয়া।

আমার অতিথি-বিমুখতাটা অবশ্য খুড়োদাদুর মতো এতটা বাড়াবাড়ি নয়। মাঝখানে দু প্রজন্ম কেটে গেছে তো, জিনের বৈশিষ্ট্য ফিকে হয়ে এসেছে। আমি “অকস্মাৎ”-এর বদলে “ওহ” বলি। তারপর তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে, উফ কী মজা হবে, তোমাদের কতদিন দেখিনি-টেখিনি এসব বলে ম্যানেজ দিই। কিন্তু মাথার ভেতরে যে আসল কুন্তলাটা বসে আছে সে ভুরু কুঁচকে মুখ ভেচকে বলে, “কেন বস? ই-মেল লিখে আর চ্যাট করে কি হচ্ছিল না? যত্তসব।”



ছবি গুগল ইমেজেস থেকে


কিন্তু আমার মা কিনা “অন্য বাড়ির মেয়ে” (আমি বলিনি, মা মাঝে মাঝে নিজেই বলে ওঠেন। ৩৫ বছর কেটে যাওয়ার পরেও মা কিছুতেই নিজেকে আমাদের বাড়ির লোক বলে স্বীকার করতে চান না।) কাজেই লোক আসছে শুনলে মায়ের আনন্দ আর বাধা মানে না। দিব্যি গোছানো বাড়ি আবার গুছিয়ে, পর্দা ঝেড়ে, বেডকভার পাল্টে সে এক দক্ষযজ্ঞ শুরু করে দেন। গোছান আর গুনগুন করে গান করেন। পর্দা বেডকভার পর্যন্ত ব্যাপারটা ঠিকই থাকে, কিন্তু মা সেখানে থামলে তো। দাবি করেন, আমাকেও নাকি সেজেগুজে থাকতে হবে। গা ধুয়ে, চুল টেনে বেঁধে, ভালো দেখে একটা জামা পরে পটের বিবি সেজে বসতে হবে। আমি প্রতিবাদ করি। বলি আমি তো আর লোকের বাড়ি যাচ্ছি না, লোকে আমাদের বাড়ি আসছে। অন্যদিন আমি যেমন থাকি---চুল উলুঝুলু, গাল বেয়ে তেল গড়াচ্ছে, কোঁচকানো রঙচটা পাজামা---সেরকম থাকাটাই ভালো নয় কি? নাহলে কি অতিথিদের সাথে হিপোক্রিসি করা হল না? যা নই নিজেকে তাই বলে চালিয়ে দেওয়া হল না?

একদমই হল না নাকি। বরং তাঁদের আমাদের বাড়িতে আসাটাকে যে আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে ভাবছি, চারপাশ এবং নিজেদেরকে সেই ঘটনার জন্য সময় নিয়ে প্রস্তুত করছি সেটা বোঝানো হল। অতিথিদের সম্মান জানানোর জন্য এটুকু নাকি মিনিমাম।

অগত্যা আমাকেও পরিশ্রম করতে হয়। সাড়ে তিন হাত দেহটাকে ঝেড়েমুছে ভদ্রসমাজের উপযোগী করে তুলতে হয়। তারপর মায়ের নির্দেশে, তুলে রাখা ভালো কাপ প্লেটগুলো নামিয়ে রান্নাঘরে এনে রাখতে হয়। রোজকার কাপপ্লেটে তো বাইরের লোককে চা দেওয়া যায় না। কিন্তু এসব করতে করতে আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়, অতিথি আপ্যায়ন ব্যাপারটার সাথে আমি কীরকম একাত্মবোধ করতে থাকি। ঘন ঘন ব্লাইন্ড ফাঁক করে রাস্তার দিকে তাকাই। উফ এখনও আসছে না কেন কেউ। রাগ হতে থাকে। বাঙালির সময়জ্ঞান নিয়ে একটা ছোটখাটো বক্তৃতাই দিয়ে ফেলি। মা অবশ্য নির্বিকার। বলেন, আহা সবাই মিলে সব গুছিয়ে বেরনো কি সোজা কথা। ও একটু দেরি হয়েই যায়। এক্ষুনি এসে পড়বে দেখবি।

অবশেষে অনেক অপেক্ষার পর অতিথিদের আগমন হয়। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে প্রায় জাপটে ধরি। ইস কত্তদিন পর দেখছি। এস এস। এমা আবার এসব এনেছ কেন, আমাদের সাথে কি ফর্ম্যালিটির সম্পর্ক তোমাদের? ছবির মতো গোছানো বসার ঘরের যত্রতত্র সবাই হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ে। এদিক ওদিক ব্যাগ, স্কার্ফ ছত্রাকার। কেউ হাত পা নেড়ে উচ্চস্বরে কথা বলে, কেউ রিমোটটা কই গেল দেখি বলে টিভি চালায়, কাপের পর কাপ চা উড়ে যায়, মুঠোর পর মুঠো চিঁড়েভাজা আর কুচো নিমকি নিঃশেষ হয়ে যায়। পুরনো দিনের স্মৃতি হুড়মুড়িয়ে ফিরে আসতে থাকে। মনে আছে সেই সেবার বেড়াতে গিয়ে কী হয়েছিল? তোমরা সাহসীরা গেছিলে কায়াকিং করতে আর আমরা ভীতুর দল বোটে চেপে গেলাম। তারপর মাঝনদীতে দুদলের দেখা হয়ে গেল। সে অনেক দূর, বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিল তোমাদের, কিন্তু তাও চিনেছি ঠিক। চিনে ফেলে সে কী হাত নাড়ানাড়ি আর কানফাটানো চিৎকার। তারপর তো আমরা ফিরে এসে খেয়ে দেয়ে একচোট ঘুমিয়ে নিলাম, তোমরা ৫ ঘণ্টা কায়াকিং-এর পর সর্বাঙ্গে ব্যথা আর হাতেপায়ে এই বড় বড় কালশিটে নিয়ে ফিরলে।

নদীর ধারে পাথরের গায়ে নোনা হাওয়া কতরকম কারুকার্য করে রেখেছিল, কোথাও গুহা তো কোথাও নিখুঁত আর্চ। কোথাও কোথাও পাথর ক্ষয়ে মনে হচ্ছিল অবিকল একটা ফুলদানি। অসংখ্য ছবি তোলা হয়েছিল, সেগুলো আর বার করে দেখাও হয়না। কিন্তু তোমাদের সাথে দেখা হয়ে যাওয়াটা জ্বলজ্বল করছে মনের ভেতর। ছবি নেই, তাও।


রাত এগোয়। সবাই প্রাণপণে ঘড়ির দিকে তাকানো এড়ায়। আগে থেকে ভাবা ছিলনা, কিন্তু তাৎক্ষণিক পিৎজা পার্টির প্ল্যান ছকে ফেলা হয়। সবাই এককথায় রাজি। খেতে খেতে আবার একরাশ গল্প, একঝাঁক স্মৃতিচারণ। খেয়েদেয়ে মা’কে প্রণাম করে আর আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে তোমরা যখন রওনা দাও তখন বাইরে রাত ঘন হয়ে এসেছে।

আর ভেতরে? আঠেরো দিন যুদ্ধের পরে কুরুক্ষেত্রের মাঠটাকে আমাদের বসার ঘরের মতোই দেখাচ্ছিল নির্ঘাত। সে ধ্বংসস্তুপের দিকে তাকিয়ে আমি আর মা ধপাস করে হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ি। ক্লান্ত মুখে তবু তৃপ্তি মাখামাখি। ভাগ্যিস এসেছিল সবাই, বল মা?

সেই তো। সাধে কি অতিথিকে ভগবান বলে সোনা?

একটু পরে উঠে যখন মা সিংক ভর্তি বাসন মাজতে যান আর আমাকে হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে সোফার তলা হাতড়ে ন্যাতানো নিমকি বার করে আনতে হয় তখন অবশ্য মায়ের থেকে রামরাজাতলার খুড়োদাদুর সাথেই মতের মিল বেশি টের পাই আমি। কিন্তু সেকথা এখন থাক।

14 comments:

  1. আশা করি আপনার অতিথিরা আপনার ব্লগ পড়েননা|
    আমার দাদু অতিথিবত্সল ছিলেন না সেটা বলা যাবেনা, আর যেহেতু মাস্টার মানুষ, সারাক্ষণ বাড়িতে লোকের মেলা বসেই থাকত| তবে একটু রাত হয়ে গেলে যে দাদু ঘন ঘন ঘড়ি দেখত, আর তোমরা কিভাবে ফিরবে ইত্যাদি প্রশ্ন করত সেটা আমি নিজে দেখেছি| এমনও বলেছে দাদু, "তোমরা যদি এখনো যাও তাহলে লাস্ট বাসটা পাবে, এর পর গেলে রিকশা খুঁজতে হবে|"
    আমার বাড়িতে অবশ্য আত্রেয়ী ছাড়া কেউ আসেনা পারতপক্ষে| লং উইকেন্ডে দুজন অতিথি এসেছিল, তার আগে সেই পুজোর সময়ে , আর তার আগে গত বছর চৌঠা জুলাই| কাজেই একটু আধটু লোকজন বেড়াতে এলে খারাপ লাগেনা|

    ReplyDelete
    Replies
    1. আমিও এক্স্যাক্টলি সেই আশাতেই আছি সুগত।

      আপনার দাদু তো রীতিমত প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভ হয়ে অতিথি বিদায় করতেন মনে হচ্ছে। আমি নিজে যদিও না যেতে চাওয়া অতিথিদের শুধুমাত্র অ্যাগ্রেসিভ হয়েই তাড়ানোর পক্ষে।

      Delete
  2. aami prothome bideshe eshe (mane nijer bashothan holo aarki) erokom i bhabtam (mane oi "kaal kete kumir ke anbe" gocher) kintu maa baar doshek eshey ebong pratyek baar rabon gushti nemontonno kore, khete khete tader aappayon kore, aamar attitude ta paalte diyechey. ekhon praye barite mela boshe aar satyi katha bolte gele besh bhaloi lage :)))

    ReplyDelete
    Replies
    1. ঠিক বলেছ শম্পা, মায়েদের যে নেমন্তন্ন করে খাওয়ানোর কী অসম্ভব লিপ্সা। বুঝেছি তোমার অতিথি আপ্যায়ন অভ্যেস হয়ে গেছে। ভালো অভ্যেস।

      Delete
  3. Ami sob somoyei besh lokjon niye thaka pachhondo kori, eta hoyto joint family te manush hoyar jonye hoyeche. Student life eo amar dorm e lokjon ashto regular, amar roommate er bondhu rao ashto prochur. Ekhono weekend e tuktak lokjon ashtei thake. Ei weekend e to ma'r sange dekha korte 3 sondhye te 3 set bondhu bandhob elo. Amar besh bhaloi lagey. Ekta jinish oboshyo amar poshay na, seta holo "oshobhyo bachha", jara amar beral der lyaj dhore tane, sob jinish tene tene ekhan okhan fele daye ar tader baba-ma ra he he kore hashe. Orokom ekjon eshechilo ekbar, tarpor tar barir lok ke ami ar konodino dakini.
    Aro ek dol ke poshay na, tara holo boyeshe boro beshi paka party. Serokom o ekjonera eshechilo, amar lyaj er jhaptay ure geche. Ebar Seattle ashar agey 2 baar bhebe dekhbe mone hoy :D

    ReplyDelete
    Replies
    1. অসভ্য বাচ্চা আমারও বিশ্রী লাগে রিয়া। তবে আরও বিশ্রী লাগে তাদের বাবা মাকে। যারা ভাবেন তাদের বাচ্চার অসভ্যতা করাটা প্রাণবন্ততার লক্ষণ।

      হাহা তোমার ল্যাজের ঝাপটা ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে।

      Delete
  4. (চুপি চুপি, আশাকরি কেউ দেখছে না) হাইফাইভ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাই ফাইভ। হাই ফাইভ।

      Delete
  5. ami ei otithi biday howar por pore thaka khabar guchhiye fridge e tola ar bason / ghor saaf sutro korar jonyo tomar ei feeling tay onekta sohomot tobe lokjon ashar aage seta thik mathay thake na.. tokhon kintu khuub anondo hoy.. amio kakima r motoi oi bichhanar chador palte, sofar cushion thik kore ready hoi tader motamuti ekta comfortable corner dite... basically adda marte boro bhalobashi ar chhoto theke oi ekgada [talkative] loker majhe bor howar fol maybe..

    ReplyDelete
    Replies
    1. হ্যাঁ সোহিনী, গেস্ট ভালো লাগে, গেস্টদের বাসন মাজতে ভালো লাগে না।

      Delete
  6. ami aboshyo besh bokbok korte bhalobashi jehetu, to lokjon thakle besh mojai lage. chotobelay aboshyo beshii barabari kortam. even parar kakima jethima ra eleo ami taader r jetei ditamna bari. emon o hoyechhe ami pasher barir jethima asar pore tNar barir chabi niye washing machine er bhitore lukiye rekhechilam. bhabo ki kando! aboshyo akhon r sei utsaho ta nei :)

    ReplyDelete
    Replies
    1. হাহাহাহাহা, তুমি তো ভয়ানক জনপ্রিয় বাচ্চা ছিলে মনে হচ্ছে আত্রেয়ী। এত লোক ভালোবাসো? শুনেও ভালো লাগছে। কোনদিন সুযোগ হলে তোমার বাড়ি যাব, নিজেই নেমন্তন্ন নিয়ে রাখলাম।

      Delete
  7. BARITE OTITHI ELE TADER SATHE HAT PA CHORIYE GOLPO KORTE AMI EXPART.KINTU KAJER BELAI OSTOROMBHA.....TOBE HA ONCE UPON A TIME AMAR BORO MAMA AR MAMIMA AMADER BARITE ESECHILEN,OTHER AMI AKDOM KHATI BANGALI RANNA REDHE KHAIYECHILAM....OTHER MUKHER SEI PROSONSA MONE PORLEI MONE HOI CHUTIR DIN AMAR PRIYO LOKJON BARITE ASUK AR TADER AMI RANNA KORE KHAOAI....O HA JODI RANNAR JOGAR TA KEU KORE DEI TAHOLE TO KOTHAI NEI....KUNTALA TUMI BORONG AKDIN ESO AMAR BARITE...........

    ReplyDelete
    Replies
    1. আরে আরে নেমন্তন্ন যে। বাঃ। সময় করে যাব একদিন।

      Delete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.