November 18, 2013

নাগরদোলা



বৃষ্টি আর শীত, এ দুটো ব্যাপারের সঙ্গে উত্তমকুমার আর ব্যোমকেশের মিল আছে। আলাদা আলাদা ভাবে দুজনেই চমৎকার, একসঙ্গে মেশালেই গণ্ডগোল। পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সঙ্গে পঁচাত্তর পার সেন্ট হিউমিডিটি আর একশো পার সেন্ট বৃষ্টির সম্ভাবনা মেশালে যে ছেড়ে-দে-মা-কেঁদে-বাঁচি অবস্থাটা হয়, প্যারিসে এখন অবিকল সেই অবস্থাটা চলছে।

এদিকে সময় শেষ হয়ে আসছে দ্রুত। এটা শুধু আমারই নাকি গোটা মানবজাতির রোগ জানি না, যে কোনও বিষয়কে পরীক্ষায় পরিণত করতে আমরা ওস্তাদ। প্যারিসের শেষ ক’টা দিন কোথায় ঘুরবফিরব বাদামভাজা খাব, তা না কেবলই হিসেব কষছি কী কী “করা” বাকি রয়ে গেল। ভার্সাই, Musee d'orsay, রাতের আলোয় আইফেল। থিয়াগো গত সপ্তাহে ভার্সাই দেখে এসে রায় দিয়েছে, ও জিনিস না দেখলে এ জীবন রাখাও যা না রাখাও তাই। অবশ্য ফাউজি থিয়াগোকেও টেক্কা দিয়েছে, পাঁচ-পাঁচ দশঘণ্টা বাস ঠেঙিয়ে নরম্যান্ডি ঘুরে এসেছে। আমি অত অ্যাম্বিশাস হচ্ছি না। নরম্যান্ডি তো দূর অস্ত, প্যারিসের সিলেবাস শেষ করতে পারলেই আমি বর্তে যাব। শুধু সাইটসিয়িং তো নয়, Breizh Café-র গ্যালেত্‌ কমপ্লেত্‌ খাওয়া হয়নি এখনও, Pierre Herme-র ম্যাকারনও না। এত দিন ধরে এত ফুডিদের লেখা এত ফুড ব্লগ পড়ে যদি এসব না খেয়েই প্যারিস ছাড়ি, নিজেকে এ জীবনে আর ক্ষমা করতে পারব না।

এই এতশত বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো চেপে বসেছে বৃষ্টি। আর শীত। আর কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া। তাও আবার বেছে বেছে উইকএন্ডগুলোতেই। আগের দুটো উইকএন্ড রোদের আশায় গালে হাত দিয়ে বসে বসে মাটি করেছি। ফোরকাস্টে শুক্রবার রাত্তির পর্যন্ত হলুদ রঙের হাসিমুখ সূর্যের পাশে লেখা থাকে “পার্টলি ক্লাউডি”, শনিবার সকালবেলা আকাশের গতিক দেখে ব্যাটারা “পার্টলি” কেটে “মোস্টলি” লিখে দেয়। এ সপ্তাহেও রোদঝলমল উইকএন্ডের আশা দেওয়া ছিল গোটা সপ্তাহ জুড়ে, কিন্তু আমি আর সে ফাঁদে পা দিইনি। মন স্থির করে রেখেছিলাম, সূর্য উঠুক ছাই না উঠুক, ঝড়ঝঞ্ঝা বজ্রপাত সুনামি আসুক কিংবা নাই আসুক---এ শনিরবি আমাকে রাস্তায় বেরোনো থেকে কেউ আটকাতে পারবে না।

যা ভেবেছিলাম তাই হল। ঘড়িতে সাড়ে দশটা বেজে গেল, আকাশভরা মেঘের ফাঁকে সূর্যের ‘স’ দেখা গেল না। আমি ব্যাকপ্যাকে পাসপোর্ট আর জলের বোতল গুঁজে, কনভার্সের ফিতে বেঁধে, দরজায় চাবি ঘুরিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সিলেবাসের অন্তত তিনটে আইটেম শেষ না করে আজ বাড়িমুখো হব না এই শপথ করে।

ইচ্ছে করলে মানুষ কী না পারে? তিনটের জায়গায় সাড়ে তিনটে আইটেম কভার করে বিজয়গর্বে আজ আমি বাড়ি ফিরেছি। লিস্টের তিনটে আইটেমের গল্প সময় পেলে পরে কোনওদিন হবে, এখন আপনাদের ওই ফাউ হাফ-টুকুর গল্প শোনাব। ওই হাফ-টুকুই পড়ে পাওয়া কি না, তাই তার আনন্দ ষোল আনার জায়গায় আঠেরো আনা।


Arc de Triomphe থেকে শুরু করে Avenue des Champs-Élysées ধরে হাঁটছিলাম। কেউ কেউ বলে পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর রাস্তা নাকি এটাই। বেশি রাস্তায় হাঁটিনি কাজেই সবথেকে সুন্দর কি না বলতে পারব না, কিন্তু রাস্তাটা যে সুন্দর তাতে কোনও সন্দেহ নেই। দু’পাশে সুন্দর করে ছাঁটা চেস্টনাট গাছের সারি, সারির ফাঁকে ফাঁকে Louis Vuitton, Cartier ইত্যাদি হাইফাই ব্র্যান্ডের দোকান উঁকি মারছে। ওসব দিকে মন না দিয়ে আমি সোজা হেঁটে চললাম Place de la Concorde-র দিকে। Place de la Concorde হচ্ছে শহরের সবথেকে বড় পাবলিক স্কোয়্যার। সাইজের থেকেও ঐতিহাসিক কারণে জায়গাটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফরাসি বিপ্লবের সময় এখানে অনেক লোক গিলোটিনে বলিপ্রদত্ত হয়েছিল।


হাঁটতে হাঁটতেই নাগরদোলাটা চোখে পড়ল। অবশ্য যা দৈত্যাকার চেহারা, চোখে না পড়লে চোখ এবং মাথা দুই-ই খারাপ ধরে নিতে হবে। নাগরদোলা আর নাগরদোলার সামনে দাঁড়ানো ওবেলিস্ক। তখন জানতাম না এখন জানি, ইজিপ্ট এই ওবেলিস্কটা ফ্রান্সকে উপহার দিয়েছিল উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে। ওবেলিস্কের হাইট পঁচাত্তর ফুট, ওয়েট আড়াইশো মেট্রিক টন। গ্রানাইটের শরীরের ওপর সোনার পাতায় মোড়া টুপি।


দেখার মতোই জিনিস, কিন্তু আমার মনোযোগ ততক্ষণে টেনে নিয়েছে নাগরদোলা। ছোটবেলায় আমরা যেটাকে জায়ান্ট হুইল বলতাম। বাহারি জিনিস। বিরাট চুড়ির গায়ে জমকালো পাথরের মতো ক্যাপসুল বসানো, যেগুলোয় লোকজন বসবে। আর চুড়ির বেড় জুড়ে ঝিকমিক ঝিকমিক আলো। আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমার কেমন যেন ঘোর লেগে গেল, আর ওইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আমি ঠিক করে ফেললাম যে আমি নাগরদোলা চড়ব। তাতে যদি আমার আর প্যারিসের আর কিচ্ছুটিও দেখা না হয়, ডোন্ট কেয়ার।

আর এই ব্যাপারটা ঠিক করে ফেলে আমার মনটা যে কী ফুরফুরে হয়ে গেল কী বলব। মাথার ভেতর থেকে টেনশন, তাড়াহুড়ো, ডেডলাইন সব খালি হয়ে গিয়ে পড়ে রইল শুধু নাগরদোলা। নাগরদোলা আর আমি। একসময় কী ভালোবাসতাম নাগরদোলা চড়তে। যত উঁচু, তত ভালো। যত জোরে ঘোরে, তত মজা। আমার মতো ওরকম নিড়বিড়ে বাচ্চার এরকম দুঃসাহসী মনোরঞ্জনের প্রতি ঝোঁক গিয়েছিল কী করে সেটা সত্যি একটা রহস্য। আমার সেজকাকু, যিনি কি না ফি বছর কালীপুজোয় হাতে করে তুবড়ি জ্বালাতেন, তিনিও আমার ঠ্যালায় শকুন্তলাপুজোর মেলায় জায়ান্ট হুইলে উঠে চোখ টিপে বুজে দু’হাত দিয়ে সামনের রড চেপে ধরে রামনাম করতেন। নেমে এসে কান ধরে বলতেন, “সোনা, এই কিন্তু শেষ। আর না।” পরের বছর আবার আমাকে সাইকেলের সামনে বসিয়ে মেলায় যাওয়া, আবার জায়ান্ট হুইলে চেপে রামনাম।

টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অবশ্য যদি ওটাকে লাইন বলা যায়। শকুন্তলা মেলার জায়ান্ট হুইলের সঙ্গে এখানকার জায়ান্ট হুইলের প্রধান তফাৎটা হচ্ছে এখানে লোকের তুলনায় বসার জায়গা বেশি। একটা গোটা ক্যাপসুল আমার একার জন্য, ভাবা যায়? আনন্দে ডগমগ করতে করতে ক্যাপসুলে চড়ে বসলাম। গেটরক্ষক দরজা বন্ধ করে হুড়কো লাগিয়ে দিলেন। হুইল চলতে শুরু করল। 

আর অমনি আমার চোখের সামনে প্যারিস ফুলের মতো ফুটে উঠল।

Tuileries  বাগান। বাগানের বুকচেরা রাস্তাটা সোজা গিয়ে মিশেছে লুভ্‌ মিউজিয়ামের দালানে।

Tuileries বাগানের উত্তরদিক। ওই বাড়িগুলোর গা বেয়ে চলে গেছে রু দ্য রিভোলি। গোটা প্যারিসে আমার ফেভারিট রাস্তা।

ওই দূরে Montmartre-র টিলার ওপর জেগে আছে Basilica of Sacré-Cœur।

Avenue des Champs-Élysées

এত সৌন্দর্য প্রতিরোধ করে কী করে মানুষ? “কিছুতেই ভুলব না” পণ করে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে কীসের জোরে? শত ক্ষোভ, হাজার অভিমানের পাহাড় পেরিয়েও শেষটায় হাঁটু গেড়ে বসতে হয় প্যারিসের রূপের কাছে। মানছি, তোমার মতো আর দেখিনি আগে। পরেও দেখব কি না জানি না। (প্যারিস অবশ্য জানে যে ওর মতো আর কাউকে দেখব না আর আমি কোনওদিন। কারণ ওর মতো আর কেউ নেই।)

তিনপাক ঘুরে আমার বাক্স আবার সমতলে এসে থামল। হুড়কো খুলে বিদায়বাণী উচ্চারণ করে দ্বাররক্ষক বুঝিয়ে দিলেন আমার সময় শেষ। মালপত্র সামলে নেমে এলাম। মনে মনে ভাগ্যকে থ্যাংক ইউ বললাম। ভাগ্যিস নাগরদোলায় চড়তে সেজকাকুর মতো ভয় লাগে না আমার, লাগলে কী মিস্‌টাই না হত।

  

9 comments:

  1. Eki. Amar aager comment ta kothay galo? :(

    ReplyDelete
    Replies
    1. আগের কমেন্ট তো কিছু পাইনি বিম্ববতী।

      Delete
    2. Jah! :(
      Jai howk, bolchhilam je chhobigulo daroon. Ar bolchhilam je Arc de Triomphe ke ekdom India Gate er moto dekhte.

      Delete
    3. সেটা ঠিকই বলেছ বিম্ববতী। সব শহরেরই একটা করে নিজস্ব ইন্ডিয়া গেট থাকে বোধহয়।

      Delete
  2. দারুন অভিজ্ঞতা, দারুন ছবি। আমি জোরে ঘোরা নাগরদোলায় উঠিনা কারণ আমার বমি পায়, কিন্তু এরকম নাগরদোলা পেলে কি করব বলা শক্ত। একটা ছোট্ট টিপ দিয়ে রাখি: এর পর যখন কাঁচের ভিতর থেকে ছবি তুলবেন, ক্যামেরার সামনেটা এক্কেবারে কাঁচের গায়ে ঠেকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। তাহলে কাঁচের গায়ে ছায়াগুলো ছবিতে আসেনা। অবশ্য আপনার পক্ষে সেটা করা সম্ভব ছিল কিনা না জেনেই কথাটা বললাম।

    ReplyDelete
    Replies
    1. একেবারেই সম্ভব ছিল। এর পর থেকে তাই করব। থ্যাংক ইউ সুগত।

      Delete
  3. darun darun :) ami nagardolay uthte prachanda voi pai, :(

    ReplyDelete
    Replies
    1. সেকী ভয় কীসের? দারুণ আরামদায়ক ব্যাপার তো।

      Delete
  4. darun !!! Nagordola chorar obhignota ar chhobi..... dutoi :-)

    ReplyDelete

 
Creative Commons License
This work is licensed under a Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivs 3.0 Unported License.