এখনও পড়িনি, পড়বঃ মার্সেল প্রুস্তের ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম


খারাপ বইয়ের তাৎপর্য মানুষের জীবনে অসীম। খারাপ যে কোনও কিছুর। খারাপ বই, খারাপ লেখা, খারাপ সিনেমা, খারাপ খাবার, খারাপ বন্ধু্‌, খারাপ প্রেমিক, খারাপ সময় - ভালো বই থেকে শুরু করে ভালো সময় খায় না মাথায় বোঝার একমাত্র পথ।

ভালো বই চিনতে খারাপ বই পড়তেই হবে। বেছে ভালো বই পড়েন যাঁরা তাঁদের 'অমুক বইটা পড়ে দেখিস, ভালো' রেকোমেন্ডেশন আমি সিরিয়াসলি নিই না। উনি খারাপ বই না পড়ে ভালো বই চিনলেন কী করে বুঝে ফেললেই নেব।

কিন্তু না পড়া বই? তারাও কি আমাদের জীবনে তাৎপর্য বহন করে? আমার তো মনে হয় করে। সব না পড়া বই করে না, বুককেসে যত বই পড়ে পড়ে ধুলো খাচ্ছে, ফোল্ডারে যে সব পি ডি এফ পাঁচ পাতার বেশি এগোয়নি, তাদের সবাই কি আর করছে? কিন্তু সোমেন যেই 'না পড়া বই নিয়ে একটা লেখা দিন, কুন্তলা' ফোনে বললেন - আমার উবার তখন বইমেলা থেকে বেরিয়ে উল্টোডাঙার জ্যামে ফেঁসে - এই বইটা মনে পড়ে গেল। মার্সেল প্রুস্তের সাত খণ্ডের 'ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম', যার ফ্রেঞ্চ নাম 'À la recherche du temps perdu' । যে বইটা আমি সেই কবে থেকে পড়ব বলে কোমর বাঁধছি অথচ ম্যানেজ করে উঠতে পারছি না।

সবাই জানে 'ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম' লিখতে প্রুস্তের বারো বছরের বেশি লেগেছিল, সবাই জানে সাত খণ্ডের তিন খণ্ড প্রকাশ পেয়েছিল প্রুস্তের মৃত্যুর পর, সবাই জানে প্রথম খণ্ড কোনও প্রকাশক ছাপতে না চাওয়ার পর প্রুস্ত নিজের পয়সায় ছাপান এবং কেউ কেউ দাবি করে নিজের পয়সা দিয়ে প্রুস্ত সে বইয়ের সমালোচনা লিখিয়েছিলেন। "নিজের পয়সা" অবশ্য সামান্য ফুটনোট দাবি করে। প্রুস্ত জীবনে চাকরি করেননি। প্রুস্তের বাবা, বাবার বাবা, বাবার বড়ছেলে (প্রুস্তের বড়দা) অন্যায্য রকম সফল ও কৃতী ছিলেন, ওই বাড়িতে প্রুস্তের মতো পিস কী করে পয়দা হল সে নিয়ে পি এইচ ডি নামানো যায়। প্রুস্তের বাবা একবার রেগেমেগে নিদান দিয়েছিলেন যে রকমই হোক, যত কম মাইনেরই হোক, প্রুস্তকে একটা কিছু চাকরিবাকরি করতেই হবে, বলে নিজেই খুঁজেপেতে ছেলেকে একটা 'ভলান্টারি' পোস্টে ঢুকিয়েছিলেন। ঢোকানোর অব্যবহিত পরেই প্রুস্তের প্রবল পেটব্যথা শুরু হয় এবং সিক লিভ নিয়ে প্রুস্ত সেই যে অফিস থেকে বাড়ি চলে আসেন আর কেউ তাঁকে বাড়ি থেকে বার করতে পারেনি। প্রুস্তের এনাবলার ছিলেন প্রুস্তের মা, যিনি মারা যাওয়ার আগে সম্পত্তি প্রুস্তের নামে রেখে যান। তাতেই প্রুস্তের বাকি জীবন চলে যায়।

যাই হোক। সবাই জানে লস্ট টাইম পড়ে ভার্জিনিয়া উলফ ডিপ্রেশনে গেছিলেন (What remains to be written after that?), সবাই জানে নাবোকভ মনে করতেন জয়েসের ইউলিসিস আর কাফকার মেটামরফসিস-এর পর প্রুস্তের 'ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম' বিংশ শতাব্দীর গ্রেটেস্ট গদ্য। সবাই জানে কাজুও ইশিগুরোর মতে প্রুস্ত হচ্ছেন 'crushingly dull'.

সবাই জানে চার হাজার দুশো পাতার, সাড়ে বারো লাখ শব্দের 'ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম', প্রুস্ত মরে যাওয়ার একশো চার বছর পরেও বিশ্বের দীর্ঘতম উপন্যাসের গিনেস রেকর্ডহোল্ডার।

*

মন্টি পাইথনের এই স্কিটটা হয়তো অনেকেই জানে না।


*

এমন কিন্তু নয় যে লম্বা বলে আমি 'ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম' শেষ করতে পারছি না। আমি প্রত্যেকবার আটকে যাচ্ছি প্রথম খণ্ড 'সোয়্যান'স ওয়ে'র দেড়শো পাতা নাগাদ। দেড়শোর থেকে অনেক বেশি পাতার বই আমি সপ্তাহে একটা করে নামাই। আমার সন্দেহ আমি আটকে যাচ্ছি 'লস্ট টাইম' আমার সময়ের ধারণা, আমার জীবনের আইডিয়ার সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না বলে। বেসিক্যালি আমি 'আমি' বলে ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম' পড়ে উঠতে পারছি না, অন্য একটা 'আমি' হয়ে উঠলেই নামিয়ে ফেলব। সেই আমিটা যেদিন এই আমিটার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে, 'ইন সার্চ অফ লস্ট টাইম নিয়ে' দোর দেব, বেরোব এক্কেবারে শেষ করে। বেরিয়ে অর্চিষ্মানকে বলব, পড়ে দেখতে পার। ভালো লিখেছে। 

*

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের ফেব্রুয়ারির ফিচার  'যে বই পড়বইঃ মননবিশ্ব ও পাঠকের অ্যান্টি লাইব্রেরি'। আমার লেখার লিংক এই যে। 

যে বই পড়ার সময় হয়নি এখনও

*

বহু, বহু বছর আগে অবান্তরে প্রুস্ত প্রশ্নমালা, উত্তরসহ ছেপেছিলাম। এই ক'বছরে প্রুস্ত পড়ার মতো না বদলালেও, প্রুস্ত প্রশ্নমালার উত্তর ডেফিনিটলি বদলেছে। সেই প্রশ্নমালা, পরিবর্তিত উত্তরসহ, কাল বেরোবে।

Comments