কফি শপ ৫ঃ বন্ধুত্বের বেসিস


ব্লু টোকাইতে নিয়মিতদের একজন শরদ। উদয়পুরের লোক। চোখে রে ব্যান, কাঁধে মোকাবারা ব্যাকপ্যাক, পায়ে মহার্ঘ ও স্পটলেস জুতো। ব্র্যান্ডের নাম জানি না, তবে ব্র্যান্ডের তো বটেই । সানস্ক্রিন ছাড়া বাড়ি থেকে বেরোয় না, কবজিতে ল্যাপিস লাজুলির বিডস পেঁচিয়ে ঘোরে, ঘাড়-পেরোনো শ্যাম্পু করা চুল কখনও ঝুঁটি বাঁধে কখনও খোলা ছাড়ে। পাশে বসলে যে সুবাস ঝাপট মারে তা আমার অ্যামাজন থেকে চারশো নিরানব্বই টাকায় চার সেন্টের কম্বো প্যাক, সোম থেকে বৃহস্পতি বাঁ দিক থেকে ক্রমে ডানে গিয়ে শুক্রে আবার বাঁয়ে ফিরে মহানন্দে ফুস ফুস মেখে বেরোই - সে রকম প্যাক থেকে বেরোয়নি গ্যারান্টি। উইকডেজে প্যান্টের সঙ্গে শার্টের, শার্টের সঙ্গে জুতোর, জুতোর সঙ্গে জ্যাকেটের এসথেটিক নিবিড় (আমি এই মুহূর্তে হলুদ জামা, নীল জিন্স, লাল টিপ, কালো দুল পরে বসে আছি), শনিরবি ক্যাজুয়াল টি অথবা ঢিলেঢালা ফুলছাপ শার্ট। যা দেখে যেই না বলেছি বাহ্‌ বেশ তো, শরদ বলেছে, দিস ওয়ান? চিপ স্টাফ ফ্রম ব্যাংকক। একদিন ইস্তানবুল-এর পাতা উল্টোচ্ছিলাম বসে বসে, তাতে বলল একসময় নাকি ও টার্কির কফিশপে বসে কাজ করত, বলে ফোন খুলে আমাকে ওর টার্কির কফি শপের ছবি দেখাল।

ব্র্যান্ড, বিট কয়েন, ব্যাংকক - যা যা দিয়ে জীবনকে দেখার প্রিজমের এক একটা ধার তৈরি হয় বলে বিশ্বাস করি - শরদ আর আমার উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু। দুজনে একই পৃথিবীর মধ্যে দিয়ে হাঁটলেও শরদ ওর রে ব্যান-এর মধ্য দিয়ে যে পৃথিবীটা দেখছে, আমার পঁয়তাল্লিশের প্রোগ্রেসিভ চশমার ওপারের পৃথিবীটার সঙ্গে তার সম্ভবতঃ কোনও মিল নেই। সব থেকে বড় অমিল, আমি আই কনট্যাক্টের জন্য মুখিয়েই থাকি, হাসব বলে দাঁতের পাটি সাজিয়েই রাখি, শরদ কারও দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে না, একটি লোকের সঙ্গে কথা বলে না। কাজ না থাকলে থমথমে মুখে বিট কয়েনের বই পড়ে। না হয় 'হাউ টু ডু ডিপ ওয়ার্ক'-এর।

তাহলে জানলাম কী করে শরদ উদয়পুরের? ফুলফুল শার্টটা ব্যাংককের? ছবিটা তুরস্কের কফিশপের?

রহস্য দিনের আলোর গভীরে চাপা পড়ে থাকা রাতের তারাদের মতোই জ্বলজ্বলে। মাধ্যাকর্ষণের মতোই বিস্মৃত ও অমোঘ।

পছন্দঅপছন্দ রুচিলুচি বাদপ্রতিবাদ মিলিয়ে, প্রিয় বই প্রিয় রং প্রিয় সাবজেক্টে ভর দিয়ে কম তো বন্ধুত্ব ফাঁদিনি। সব ঝুরঝুরিয়ে ভেঙে গেছে। টিঁকেছে - যদি সেগুলোকে টেঁকা বলে দাবি করিই - এক বেঞ্চে পাশাপাশি বসার বন্ধুত্বগুলো।

ব্লু টোকাইতে আমি পাঁচ নম্বর টেবিলে বসতাম, শরদ ছয়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস। উইদাউট ফেল। ফাঁকা থাকলে অবশ্যই। কেউ আগে এসে বসে পড়লে তো তাকে তোলা যায় না, কারণ এটা ফাইন্যালি কফি শপ, টেবিলে কারও নাম লেখা নেই। কিন্তু পাঁচ খালি থাকলে আমি একদিনও চারে বসিনি, ছয় খালি থাকলে শরদ একদিনও সাতে বসেনি। ছয় ভর্তি থাকলে নয়ে বসতে হলেও, ছয় খালি হলেই নয় থেকে উঠে ছয়ে এসে বসেছে।

পাশাপাশি টেবিলে বসতে বসতে, হাই হ্যালো হওয়ারও আগে আমাদের এক রকম বন্ধুত্ব হয়ে গেল। এ ওর ভরসায় ল্যাপটপ রেখে ব্যাংকের কাজ সারতে চলে যেত। ওর টেবিল নড়লে এ নিচু হয়ে নড়ন্ত পায়ার নিচের প্যাঁচ ঘুরিয়ে টাইট করে দিত। মধ্য জানুয়ারিতে ষোলতে ছোটা এসি কমানোর জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে নেড়ে নেড়ে এর হাত ব্যথা হয়ে গেলে, দূরের টেবিলে বসা সত্ত্বেও ও উঠে এসে ডট পেন দিয়ে এসির ভেন্ট ওপর দিকে ঘুরিয়ে দিত।

*

আগেও বলেছি, পরেও বলব। আমাদের সঙ্গ লাগে সাক্ষ্যের জন্য। গাছ নিঃশব্দে ভেঙে পড়লে যেমন আদতে পড়েছে কি না শিওর হওয়া যায় না, আমাদের বেঁচে থাকার কেউ সাক্ষী না থাকলে ... কে জানে হয়তো মরেই গেছি।

একেবারে বিগিনার লেভেল সঙ্গ, বা সাক্ষ্য, 'আমি যা দেখি তুমি তা দেখ'-র প্রাপ্তবয়স্ক সংস্করণ। দুটো অ্যাডাল্ট লোক 'আ যা আ যা' করতে করতে নাকে নাক ঠেকিয়ে ফেলছে অথচ একে অপরকে আঘাত করছে না - এ রঙ্গ একা দেখা এক, আরও চারটি লোকের সঙ্গে জটলা করে দেখার অভিজ্ঞতা আর এক।

এই লেভেলের সাক্ষ্যের জন্য সঙ্গীর নামধাম জানার দরকার পড়ে না। পাশের ভাইসাব উঁকিঝুঁকি মেরে দেখলে, দেখতে দেখতে আমাকে উদ্দেশ্য করে "নৌটংকি দেখ রহে হো ম্যাডাম?" সূচক মাথা নাড়লে, আমিও প্রত্যুত্তরে "দেখছি না আবার" চোখ ঘোরালেই শিওর হওয়া যায় ঘটনাটা সত্যি সত্যি ঘটছে। হ্যালুসিনেট করছি না।

এই ভাইসাবের সঙ্গে আমার সম্পর্ক এইটুকুই। কেউ কারও নামধাম পেশা জানি না, জানার দরকার নেই। আজকের সকালের পাঁচ মিনিট ইনি আমার জন্য, আমি এঁর জন্য বাস্তব করে তুললাম, আমাদের সংযোগ ফুরোল। যুযুধান দু'পক্ষের হাওয়া বেরিয়ে গেল, ছদ্ম মারামারি থেমে গেল, অল্প রিলিফ অল্প হতাশা নিয়ে আমরা পৃথিবীর পথে, সময়ের স্রোতে ভেসে গেলাম।

দিনের মধ্যে চব্বিশবার আমরা একে অপরের অস্তিত্বের সাক্ষ্য দিই। এই যে প্রিয়াঙ্কা কফির বাক্সের সারি নামিয়ে মুছতে মুছতে ভুরু কুঁচকে বিড়বিড় করে মাথা নাড়ছিল, আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে লজ্জা পেয়ে বলল, রোজ সাফ করতি হুঁ, রোজ ইতনি ধুল ফিরসে কাহাঁসে আ যাতি হ্যায়।

বললাম, তাও তো এসি দোকান, দরজা জানালা বন্ধ। তাতেই, অ্যাঁ?

প্রিয়াঙ্কার কাজ এক ইঞ্চি সহজ করে দিলাম না, কিন্তু ওর কাজটা যে শক্ত এবং অন্তহীন, সেটার সাক্ষী থাকলাম। স্বীকৃতি দিলাম।

মান্যতা দিইনি তা বলে।

আর একদিন, অ্যামেরিকানো টু গো অর্ডার করেছি, অনু রেখে গেছে। এখানে বসে খাচ্ছি বলেই হয়তো ঢাকনা দেয়নি। আমি গ্লাস তুলে চুমুক দিয়ে গ্লাস আবার টেবিলে নামিয়েছি।

ব্যস। এইটুকুই। কিছুই কেরামতি দেখাইনি। পৃথিবীর আট বিলিয়ন লোক যেভাবে গ্লাস টেবিলে নামায়, যেভাবে গ্লাস টেবিলে নামানোর কথা বেদকোরানবাইবেলে লেখা আছে, সেভাবেই নামিয়েছি। অথচ ফিজিক্সের সমস্ত ল ভেঙেচুরে কফি লাফিয়ে উঠল। আমার ডান কাঁচ বেয়ে তিন ফোটা, বাঁ কাঁচ বেয়ে দু'ফোঁটা অ্যামেরিকানো, এক্সট্রা স্ট্রং অ্যান্ড হট, ধীরে ধীরে গড়াতে লাগল।

ওয়াও। যে মেয়েটা আমাকে কুল শিরোপা দিয়েছিল, ওই মুহূর্তে ধারেকাছে থাকলে নিজের ভুল স্বীকার করে শিরোপা প্রত্যাহার করে নিয়ে যেত।

আমের ফোর্টের লাগোয়া সরকারি এম্পোরিয়াম থেকে কেনা তুঁতে কামিজের কোণা তুলে চশমা মুছলাম। পরলাম। উল্টোদিকের টেবিলে আরোহী, মেডিকেলের ফাইন্যাল ইয়ার, বত্রিশ পাটি সহ উদ্ভাসিত হল। অপেক্ষা করছিল, আমার তাকানোর। এটা বোঝানোর যে আমার এই হেনস্থার ও সাক্ষী থেকেছে।

আমি মাথা নাড়লাম। আরোহীর প্রায় ছ'ফুট শরীর হাসিতে কাঁপল।

একদিক থেকে ভালোই হল। এ ধরণের উটকো উৎপাত যে পৃথিবীতে একা আমার সঙ্গেই ঘটে থাকে, কেউ সাক্ষী না থাকলে আমি প্রমাণ করতেই পারতাম না।

গভীরতর সাক্ষ্যের জন্য নিবিড়তর সঙ্গের দরকার পড়ে। এই যে আমার মেজাজ - সকালে ফুরফুরে, দুপুরে গনগনে, অপরাহ্নে মেদুর ও মাঝরাতে ছমছমে - এ মুডরঙ্গের মানে কী যদি কেউ পাত্তাই না দিল? কিন্তু দৈনিক এই বৃত্তান্ত শুনিয়ে পাত্তা চাইতে গেলে সকালে মারামারি দেখা ভাইসাব দৌড়বেন। প্রিয়াঙ্কা, আরোহীকে ডেকে বলতে বসলেও ওরা কর্তৃপক্ষকে বলে আমার ব্লু টোকাইতে ঢোকা বন্ধ করবে।

এর সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য স্পেশাল কাউকে চাই। যে আমার এ সব ব্যাখ্যানের নিচে লাগসই ইমোজি দেবে। এই প্রহরে ‘ইয়েয়েয়ে’ লিখে পরের প্রহরে টাইপ করবে, বুঝতে পেরেছি কুন্তলা, কী করবে বল। ভালো কিছু খাও। বাড়ি ফিরে উইকেন্ডে মজা করব।

এবং ফোন নিভিয়ে নিজের জীবনের স্রোতে ভেসে যাবে। মহিলা মনে হয়ে পাগল, আচমকা কামড়ে দিতে পারেন ভেবে ভয়ে মরবে না।

এই লেভেলের সাক্ষ্যের পূর্বশর্ত হাড়ে হাড়ে চেনা। অর্থাৎ ঘাড়ে ঘাড়ে থাকা সঙ্গ।

এক প্রাচীন আত্মীয়া - পরিবারে নতুন বউরা বিয়ে হয়ে এসে, কেঁদে কেঁদে হেঁচকি তুলে ফেললে তাদের চিয়ার আপ করার জন্য বলতেন, আহা এত কান্দ ক্যান, ক্যামন অ্যাকখান বকনের লোক পাইলা।

আমি বকনের লোক পাইনি, উল্টে যা বকুনি খাওয়ার নিজেই খেয়েছি। আফসোস নেই। বকাবকিতে রুচি কোনওদিন ছিল না। দৈনিক আঠেরো ঘণ্টা জাগরণের আঠেরো হাজার মুড সুইং-এ জর্জরিত জীবনটার যে একজন ক্যাপটিভ সাক্ষী পাওয়া গেছে তাতেই আমার দাম্পত্যের আঠেরো আনা উশুল হয়ে গেছে।

*

ব্লু টোকাইতে নিত্য এমন ঘটনা ঘটে যেগুলোর সাক্ষী না থাকলে নিজে বিশ্বাস করা ও অন্যকে বিশ্বাস করানো অসম্ভব। একদিন চার নম্বর টেবিলে দু'জন বসে কম্বুচা খাচ্ছিলেন। একজন গর্বিত মুখে বললেন, বেবি ছেলে না মেয়ে হবে সে নিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র ঘাবড়াননি । দিজ ডেজ দেয়ার ইজ রিয়েলি নো ডিফারেন্স, ইজ দেয়ার?

আই জাস্ট হ্যাড ওয়ান নিড। বলে একটিমাত্র তর্জনী হাওয়ায় ভাসিয়ে রহস্যময় বিরতি দিলেন। কৌতূহলে আমার হৃদপিণ্ড ফাটো ফাটো হল।

মুঝে বেবি, সির্ফ  স্করপিও চাহিয়ে থা।

স্করপিও বেবি চেয়ে তিনি ডেলিভারি পিছিয়ে দিয়েছিলেন। আ হোল উইক। 

অন্যজন কম্বুচায় চুমুক দিয়ে চামুক হাসলেন।

আই ওয়েটেড নাইনটিন ডেজ টু হ্যাভ এ স্করপিও বেবি। ডাক্তারবাবুর নাকি শেষটা প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছিল, এনাফ ইজ এনাফ বলে ওটিতে ঢোকাবেন ঢোকাবেন করছিলেন, তারপর স্করপিও তিথি পড়ে গেল আর মনপসন্দ ডেলিভারিও হয়ে গেল।

আর একদিন বেলা দুটো নাগাদ দরজা ঠেলে অন্ততঃ পঁচিশ জন ব্লু টোকাইতে ঢুকে পড়ল। তেইশ জনই পুরুষ। তেইশ জনেরই ফাটো ফাটো শার্ট, ধারালো দাড়ি, ছুঁচোলো জুতো। প্ল্যান্ট মিল্ক-বেসড ক্যাপুচিনো নিয়ে খুব ফিস্ট বাম্প চলতে লাগল।

ভাবছি কারা এরা, ভাবতে ভাবতে দরকারের বেশি দুয়েকবার তাকিয়ে ফেলেছি নিশ্চয়, একজনের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। তিনি মুখ হাসি হাসি করলেন। আমিও হাসলাম। তিনি এগোলেন। হ্যালো ম্যাম। আমি বললাম, হ্যালো। তিনি অল্প ঝুঁকে উল্টোদিকের চেয়ার দেখিয়ে বললেন, মে আই? আমি বসে বসেই অল্প ঝুঁকে উল্টোদিকের চেয়ার দেখিয়ে বললাম, প্লিজ।

শরদ ফিউরিয়াসলি টাইপ করতে লাগল। কানে এয়ার পড, যা আমি বাজি ধরতে রেডি ছিলাম, নিঃশব্দ।

নামটা এখনও মনে আছে। সিদ্ধান্ত ঠাকুর। ম্যাক্সিমাম আঠাশ। অতীব ভদ্র বাচ্চা। সিনসিয়ারিটি সহকারে কী হচ্ছে বোঝাল।

অনলাইন জিমের মিট অ্যান্ড গ্রিট। অনলাইন জিম ঠিক না, জিমসংক্রান্ত কনসালটেশন। সাবস্ক্রিপশন বা এককালীন কনসালটেশন ফিজের বিনিময়ে ওঁরা ক্লায়েন্টের প্রয়োজনীয় ব্যায়ামসমূহের লিস্ট দেন। এবার ক্লায়েন্ট জিম খুঁজে, জিমে ভর্তি হয়ে সে সব ব্যায়াম করবেন কি না ক্লায়েন্টের ব্যাপার।

এক মুহূর্ত দ্বিধা করে সিদ্ধান্ত বলেছিল, ম্যাম, আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না জিমেটিমে…

ত্রস্ত হলাম। স্বাস্থ্যসচেতনতা সামাজিক মর‍্যাল প্যাকেজের অংশ হয়ে উঠেছে, অচিরেই দিনে পাঁচশো গ্রাম প্রোটিন না খেলে ধোপানাপিত বন্ধ হওয়ার ডিক্রি আসবে। জিমে না যাওয়া নবজাতকের মুখে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ার সমান অপরাধ গণ্য হবে।

বললাম, জিমে যাই না, কিন্তু রোজ কফিশপে হেঁটে আসি হেঁটে ফিরি। কখনও কখনও সন্ধেবেলাও আসি যাই, স্ট্রিক্টলি হেঁটে এবং হেঁটে। প্রমিস। বলে নিজেই নিজের টুঁটি টিপলাম।

সিদ্ধান্তর ফর্সা মুখ আঁধার হল। বুঝেছি ম্যাম, লাইট কার্ডিও। কিন্তু জেরিয়াট্রিক মহিলাদের দরকার রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং। নেহি নেহি, নট জাস্ট বেনিফিশিয়াল, ম্যান্ডেটরি।

সিদ্ধান্তকে আমার ভালো লাগল কারণ সিদ্ধান্ত এত কথা আমার ভালো চেয়েই বলল। নেটওয়ার্কিং-এর চেষ্টা করেনি। করলে কার্ড গছাত। আত্মপ্রোমোশনও মর‍্যালিটির মোড়ক পেয়েছে, কেউ সুযোগ পেয়েও সংযম দেখালে ইমপ্রেসড হই।

গোটা দুই মহিলা ফান অ্যান্ড গেমস-এর দায়িত্বে ছিলেন। একজন মাইক নিয়ে সবার কাছে গিয়ে দিস অর দ্যাট খেলছিলেন। অবান্তরে একসময় যে দিস অর দ্যাট হত, প্রায় সেই জিনিসই। অল্প তফাৎ। অবান্তরে ফুচকা অর আলুকাবলির পর শাহরুখ খান অর নওয়াজুদ্দিন টাইপের প্রশ্ন হত, এখানে ফুচকা অর আলুকাবলির মধ্যে ফুচকা বাছলে পরের প্রশ্ন হবে ফুচকা অর শাহরুখ খান। শাহরুখ খান বাছলে (কাল্পনিক খেলা) পরের রাউন্ডে শাহরুখ খান আর আলুকাবলির মধ্যে বাছতে বলা হবে। বা শাহরুখ খান আর নওয়াজুদ্দিনের মধ্যে।

একটা সেট এখনও মনে আছে।

বেঞ্চ প্রেস অর স্কোয়্যাট? বেঞ্চ প্রেস।

বেঞ্চ প্রেস অর পুশ আপ? বেঞ্চ প্রেস।

বেঞ্চ প্রেস অর পুল ডাউন? বেঞ্চ প্রেস।

এখনও যাইনি কিন্তু যদি কখনও জিমে যাই, কোন ব্যায়াম করব ভাবতে হবে না।

*

এইবার, এই গোটা এপিসোডটা তো একা একা দেখা যায় না। বা দেখে হেলদোলহীন বসে থাকতে গেলে ব্রহ্মজ্ঞানী হতে হয়। যা আমি ডেফিনিটলি নই। সাক্ষী আর কাকে রাখব, যে পাশে বসে আছে তাকেই রাখা সুবিধে। আড়চোখে নিশ্চিত হওয়া সেও ঘটনাবলীতে আড়চোখ রেখেছে কিনা।

কিছু কিছু কেসে আড়চোখে সামলানো যায় না। সে রকম একদিন, ব্লু টোকাই প্রায় খাঁ খাঁ। পাঁচে আমি, ছয়ে শরদ, আর ওদিকে ষোল নম্বর টেবিলে কেউ বসেছিলেন, নাও থাকতে পারেন, মনে নেই। একজন ঢুকলেন। রেগুলার নন। ইররেগুলারও নন। ব্লাডি টুরিস্ট তো ননই। ঢুকে কোনওদিকে না তাকিয়ে  সোজা আমাদের কাউচের দিকে এগোতে থাকলেন। কোনওদিকে না তাকিয়ে। ক্রমে আমি ভদ্রলোকের ফোকাসের বাইরে বেরিয়ে গেলাম। রইল শুধু শরদ। শরদের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে শরদের চোখে চোখ রেখে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, অমুক পার্কিং-এ  যে তমুক গাড়িটি পার্ক করা আছে, শরদের কি না।

ব্লু টোকাইয়ের উল্টোদিকের পার্কিং-এর দায়িত্বে সকালের শিফটে থাকেন দিলীপজি। দিলীপজি কথা বলতে পারেন জানি কিন্তু বলতে দেখিনি বা শুনিনি কোনওদিন। দিলীপজি জানেন কোন গাড়ি কার। সরানোর দরকার হলে দোকানে ঢুকে তার টেবিলের সামনে দাঁড়ান, চাবি নেন, বেরিয়ে যান, কাজ সেরে চাবি ফেরত দিয়ে যান। দিলীপজির এক সহকর্মী এত নিঃশব্দ নন, চেঁচামেচি করে কাজ করেন। কোনও বড় গাড়িওয়ালাকে - যিনি সম্ভবতঃ ওঁর বিরক্তি উৎপাদন করেছেন - নেভিগেট করানোর সময় চেঁচিয়ে বলেন, হট যাও হট যাও, হাওয়াই জাহাজ আ রহি হ্যায়।

আমার ফেভারিট হচ্ছেন এক ম্যাডাম, যিনি পার্কিং-এর তত্ত্বাবধায়ক নন। সম্ভবতঃ বন্ধন বা আই সি আই সি আই ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড। উনি রোজ আসেন না। যেদিন আসেন, ন’টা পঁয়তাল্লিশ থেকে দশটার মধ্যে আসেন। এসে টেবিলে টেবিলে দৌড়োদৌড়ি করে জানতে চান ব্যাংকের সামনে কেউ গাড়ি পার্ক করেছে কি না। আমি নিজে জীবনের পথে উদ্ভ্রান্ত পথিক, মাও তা-ই ছিলেন। কুল কমপোজড লোক দেখলে সমীহ করি, কিন্তু কমরেডারি বোধ করি উদ্ভ্রান্ত সহমানবদের প্রতি। একদিন দুপুরে মহিলা টিফিনবাক্স হাতে বন্ধুদের সঙ্গে টিফিন খেতে যাচ্ছিলেন বা খেয়ে ফিরছিলেন, আমি আগরওয়ালজির গুমটির পাশে একাবোকা বোর হচ্ছিলাম, হেঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, সকালে গাড়ির মালিককে পাওয়া গেছিল কি না।

মহিলা খুবই খুশি হয়ে থেমে আমাকে ওঁর বিপদের কথা খোলসা করলেন। দশটার সময় ব্যাংকের বস আসেন, ব্যাংকের সামনে পার্কিং-এর জায়গা খালি না পেলে মহিলার ওপর রং নেন। এমনিতে জব মে স্যাটিসফ্যাকশন হি স্যাটিসফ্যাকশন, শুধু সকালের ওই পনেরো মিনিটের স্ট্রেস।

শরদকে গাড়ি নিয়ে চার্জ করা ভদ্রলোক দিলীপজি নন, দিলীপজির সারক্যাস্টিক সহকর্মী নন, মহিলা সিকিউরিটি গার্ড তো অবভিয়াসলি নন। ভদ্রলোককে আমি জীবনে প্রথমবার দেখছি। নব্বই শতাংশ নিশ্চিত, শরদও প্রথমবার দেখছে।

শরদ মাথা নেড়ে না বলল। ভদ্রলোক কোনওদিকে না তাকিয়ে সোজা বেরিয়ে গেলেন।

শরদ এয়ারপড নামাল। দেখলে?

বললাম, দেখলাম তো। আমাকে কত গরিব দেখতে ভাবো যে গাড়িটা আমার হতে পারে কি না জিজ্ঞাসাও করল না।

শরদ বলল, দিস প্রুভস মাই থিওরি।

শরদের থিওরি হচ্ছে ওর সঙ্গে দিনে ছ'টা করে পাঙ্গা ঘটে। রোজ ঘটে এবং গুনে গুনে ছ'টাই ঘটে। এই ছ'টি পাঙ্গার তিনটে ঘটে ওর নিজ দায়িত্বে। কুড়ুলে পা। কর্মফল। বাকি তিনটে পাঙ্গা কমপ্লিটলি র‍্যান্ডম। শরদের বিন্দুমাত্র হাত নেই। কুড়ুল এসে পায়ে পড়া।

সেই র‍্যান্ডম তিনটে পাঙ্গার ওয়ান ডাউন। নাউ আই হ্যাভ টু বি রেডি ফর দা রেস্ট অফ দা ফাইভ।

দিনভর অস্তিত্ব নামের অবিশ্বাস্য সার্কাসের মধ্য দিয়ে ডিগবাজি খেতে খেতে, একে অপরের কর্মফল বা উটকো পাঙ্গার সাক্ষ্য দিতে দিতে আমরা আড়চোখ থেকে কথোপকথনে শিফট করে গেলাম। র‍্যান্ডম কথোপকথন নয়। ব্যক্তিগতও নয়। যদিও ব্যক্তিসংক্রান্ত। আমি আর শরদ ছাড়া ব্লু টোকাইতে বাকি যে সব ব্যক্তিদের আনাগোনা - রেগুলার, সেমিরেগুলার, ব্লাডি টুরিস্ট - তাদের নিয়ে চর্চা।

পাশাপাশি বসে যে বন্ধুত্বের ভিতপুজো হয়েছিল, পি এন পি সি দিয়ে তার ছাদঢালাই হয়ে গেল।

*

শরদের দেমাক হচ্ছে, কারও সঙ্গে আই কন্ট্যাক্ট না করে, না হেসে, কথা বলা তো দূর - ও সবার নাড়িনক্ষত্র জেনে ফেলতে পারে। কে বিজেপি, কে মাওবাদী, কার জার্মান বউ, কার স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বর, কে সুপ্রিম কোর্টের জাজ, কে তিহার ভেঙে পালিয়ে এসেছে - সব। ব্যাপারটা ম্যাজিক দেখানোর মতো ট্রিট করত শরদ। জল খেতে উঠেছি। নতুন আসতে শুরু করা একজন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছেন। ওয়েলকাম কমিটিসুলভ পাঁচমিনিট খেজুর করে টেবিলে ফিরলাম, শরদ ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, স্কুলটিচার।  প্রাইমারি স্কুল। ওরিজিন্যালি ফ্রম গাঢ়ওয়াল।

সবক'টাই ঠিক। হাঁ বন্ধ করে হাউ? জিজ্ঞাসা করলে এমন থমথমে মুখে টাইপ করতে শুরু করত যে দ্বিতীয় প্রশ্ন করার সাহস হত না আমার।

শরদের দ্বিতীয় দেমাক, ও সবার ব্যাপারে সব জানে কিন্তু ওর ব্যাপারে কেউ কিচ্ছু জানে না।

আগে রাস্তার ওপারের ব্লু টোকাইতে বসত, পর পর দু'দিন দু'জন হোয়াট ডু ইউ ডু জিজ্ঞাসা করায় বলে রেগেমেগে রাস্তা পেরিয়ে এদিকের ব্লু টোকাইতে চলে এসেছে। লোকে আড়চোখে স্ক্রিন দেখে বলে (যে অভিযোগটা সত্যি) অ্যান্টি গ্লেয়ার পর্দা লাগিয়ে কাজ করে। আমাকে বলেছিল, বই টেবিলের ওপর রাখ কেন, সিটে ফেস ডাউন করে রাখবে। যাতে লোকে ফালতু কথা বলতে না পারে।

শরদের স্ট্র্যাটেজি জীবনের মধ্যে এককুচি সুতোও না ছেড়ে চলা, যাতে সুতোর ল্যাজ ধরে কেউ ওর সঙ্গে ফালতু কথা শুরু না করতে পারে।

মাঝে মাঝে জানালা দিয়ে ওপারের ব্লু টোকাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকত। এই মার্কেটের ওরিজিন্যাল ব্লু টোকাই। ওখানে যারা প্রথম থেকে বসত, ওখানেই বসে। এই দোকানের মতো মাছের বাজারের ফিল নেই। ঘুপচিমতো। একদিন বলল, ওই যে কুলারের পাশের সিটটা দেখছ, ওটা আমার সিট ছিল। ওই সিটে আমি টানা দু'বছর বসেছি। কারও সঙ্গে কথা বলিনি। বলার সময় শরদের চোখ চকচক করেছিল।

তারপর লোকের কৌতূহল হ্যান্ডল করতে না পেরে ক্যাফে বদল এবং আমার পাশের সিট।

নিয়তি রসিক।

আমি যে খুব কথা বলি তা নয়, তবে আমার সর্বাঙ্গে অদৃশ্য “অ্যাকসেসিবল” নোটিস লাগানো আছে ।   ভিড় হলে এবং সব টেবিল ভরে গেলে, চেনা পাপীরা উল্টোদিকে বসে পড়ার আগে জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করে না। বিজয় অনু নাজিয়া মনীষারা সব টেবিল ছেড়ে আমার উল্টোদিকের চেয়ারটাই অতি বিনয়ের সঙ্গে তুলে নিয়ে যায়। বা কোনও সিংগল লোক থাকলে অতি বিনয়ের সঙ্গে এসে আমার অনুমতি চায় বসানোর জন্য।

ওদিকে বাথরুমে যাওয়ার সময়েও লোকে শরদের সিটের পাশে গিয়ে থতমত খায়।  এগিয়ে বা পিছিয়ে অন্য টেবিলের পাশ দিয়ে পাস করে। নিজের চোখে দেখেছি।

শরদও দেখেছে নিশ্চয়। একদিন বলল, আমাকে দেখলে মনে হয় আমি অ্যাগ্রেসিভ অ্যাবাউট প্রোটেক্টিং মাই স্পেস। বাট আই অ্যাম অ্যাকচুয়ালি নট লাইক দ্যাট।

মনে মনে বললাম, ইউ আর এক্স্যাক্টলি লাইক দ্যাট, মুখে বললাম, ভালো তো। আমি কেমন ক্যাবলার মতো গোটা নার্ভাস সিস্টেম উদোম নিয়ে ঘুরছি। কী ভালো হত যদি তোমার মতো অ্যাংরি অ্যান্ড মিস্টেরিয়াস মুখ করে পৃথিবীর মধ্য দিয়ে হাঁটতে পারতাম।

হোয়াট ইফ দেয়ার ইজ অ্যাকচুয়ালি নো মিস্ট্রি? জাস্ট অ্যানাদার কর্পোরেট স্লেভ?

আমি বললাম, আরে ভাই পারসেপশন অফ মিস্ট্রি ইজ মিস্ট্রি।

শরদ মাথা নেড়েছিল। দ্যাটস অলসো ট্রু।

তবে আমার পাশে বসার সুবিধে আছে। নিজের মুখেই বলছি। লোকের সঙ্গে আলাপ করার সময় সে ভেজ না ননভেজ, বর স্টোইক নাকি বউ ফেমিনিস্ট, সে নিজে নিহিলিজমে বিশ্বাসী নাকি দু’বেলা চ্যান্টিং করে - এ সবে না ঢুকেই আমি কথা বলি। আমার কনস্টিটিউশনে কৌতূহল জিনিসটা নেই। অন্যের স্ক্রিনে উঁকিঝুঁকি মারার থেকে আমি বরং বসে বসে নিজের গায়ে চিমটি কাটব।

শরদ নিজে থেকেই বলেছিল। এধার ওধারের ব্লু টোকাই মিলিয়ে ওনলি টু পিপল আর সেফ। ইউ অ্যান্ড অ্যানাদার গাই।

*

বলে যার বর্ণনা দিল, তাকে একদিন একজন ওই ব্লু টোকাইয়ের বারান্দা থেকে গলা ফাটিয়ে আশিস আশিস বলে ডাকছিল। তাকেই ডাকছিল কি না জানি না, চিৎকারে যারা ঘাড় ঘুরিয়েছিল তাদের মধ্যে সেও ছিল, সেই থেকে আমি মনে মনে তার নাম আশিস রেখেছি। আশিস রোজ আসে না। যেদিন আসে, একসঙ্গে দুটো ল্যাপটপ খুলে মিটিং করে। আমার মতো শুরুতে হাই, শেষে বাই, মাঝে অন্য ট্যাবে স্পাইডার সলিটেয়ার খেলা মিটিং না। নিজের স্ক্রিন শেয়ার করে, এর ওর স্ক্রিন শেয়ার করিয়ে, হাত পা নেড়ে এই বোঝায় সেই বোঝায়। আমার ছ'মাসের বেঁচে থাকায় যা এনার্জি খরচ, আশিসের এক একটা মিটিং -এ তার থেকে কম হবে না। শ'খানেক বেঞ্চ প্রেসের সমানও হতে পারে।

স্বাভাবিকভাবেই দু'টো মিটিং-এর ফাঁকে আশিস বসে বসে হাঁপায়। বিরতিতে কিছু রিক্রিয়েশন্যাল ফোন আসে, যে ধরণের ফোন/ মেসেজ/ কমিউনিকেশনকে আমি 'অর বতাও' কমিউনিকেশন বলি। আমি হলে হারগিজ ধরতাম না কিন্তু আশিস, যদি এ-ই আশিস হয়ে থাকে, খুবই সহিষ্ণু। ফোন ধরে সবার অকারণ কৌতূহল চরিতার্থ করে। একদিন শরদ আসেনি, আশিস ছ'নম্বর টেবিলে বসেছিল। মিটিং-এর মাঝখানে বসে হাঁপাচ্ছে, ফোন এল, আশিস ফোন ধরে এ কথা সে কথার পর বলল রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে না কারণ বেবির পেট ব্যথা হচ্ছে মনে হয়। ফলো আপ প্রশ্নোত্তর থেকে জানতে পারলাম বেবির বয়স ছ''মাস। আর একদিন একটা ফোন এসেছিল। ওদিকের লোকটা লাঞ্চ মে কেয়া খায়া টাইপের প্রশ্ন করছিল। আশিস বলল, ও ডায়েট করছে তাই লাঞ্চ করছে না। শুনে উল্টোদিকের লোকটা ভায়োলেন্ট রিঅ্যাকশন দেখাল মনে হয়, আশিস তাড়াতাড়ি বলল, নেহি নেহি, জ্যায়াদা ভুখ লগে তো এক কেলা খা লেতা হুঁ।

*

আমাদের পি এন পি সি কিন্তু সারাদিন ধরে হত না। রোজও হত না। দেড়টা থেকে একটা পঁয়তাল্লিশের মধ্যে কারও কিছু বলার থাকলে সে তর্জনী তুলত। অন্যজন ফ্রি থাকলে কান খালি করত। পি এন পি সি দেওয়ানেওয়া হত। কাঁটায় কাঁটায় প'নে দুটোয় শরদের একটা ফোন আসত এবং বাক্য, শব্দ, ধ্বনি যেখানে যে অবস্থায় আছে থামিয়ে, শরদ ফোন নিয়ে উঠে বেরিয়ে যেত।

একদিন একটা একত্রিশে আঙুল উঠল। কান থেকে গান খুললাম।

হোয়াট ইজ ইয়োর স্পিড?

ব্লু টোকাইয়ের বাতাসে ভাসন্ত অদৃশ্য কি-বোর্ডে আঙুল চালাল শরদ।

নো আইডিয়া।

শরদ বলল, কান্ট বি। এর আগে তোমার স্পিড কেউ জানতে চায়নি? বললাম, মন্তব্য করেছে কিন্তু মিনিট সেকেন্ডের মাপ জানতে চায়নি। আমার নিজের কখনও কৌতূহল হয়নি, ন্যাচারেলি।

কথা বন্ধ করে নিজের ল্যাপটপে ফেরত গেল শরদ। স্বীকার করছি, ততদিনে পাভলভিয়ান প্রক্রিয়ায় ওই পনেরো মিনিটের পি এন পি সি-র প্রতি প্রতীক্ষা জন্মেছে। এত দ্রুত কথোপকথন ফুরোতে দমে গিয়ে, দু’সেকেন্ড থেমে ফের কানে গান গুঁজলাম।

একটা তেত্রিশে আবার আঙুল উঠল। ল্যাপটপ আমার দিকে ঘোরাল শরদ। ততদিনে ছ’নম্বরে বসলে অ্যান্টি গ্লেয়ার স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করেছে।

টাইপিং স্পিড কাউন্টের সাইট। এক প্যারা খটমট ইংরিজিতে রচনা দেওয়া আছে, এক মিনিটের টাইমার। যতটা হয় টাইপ করতে হবে। বিচার হবে শব্দসংখ্যা, অ্যাকিউরেসি ইত্যাদির ভিত্তিতে।

উল্লসিত হয়ে কাজের ভড়ং ছেড়ে ব্রাউজারে সাইটের নাম টাইপ করে শুরু করলাম। শরদও করল। এক মিনিট পর দুজনেরই টাইমার বাজল। শরদের স্পিড আমার থেকে কম, কিন্তু বেশি কম না। অর্থাৎ বেশির দিকেই। আমি তিনটে টাইপো করেছি, শরদ আটটা।

যে রকম ভুরু কোঁচকাল আর মাথা নাড়ল, ভয়ই পেয়ে গেলাম। অর্চিষ্মান খালি আমাকেই কমপিটিটিভ দেখে। বিশ্বশুদ্ধু লোকই কমপিটিটিভ। আমার থেকে একশোগুণ বেশি।

*

আমার ম্যাজিকট্যাজিক নেই, গসিপ আছে। ব্লু টোকাইতে লোকজন রেগুলার নিজে থেকে এসে আমাকে তাদের প্রাইভেট কথা বলে যায়। প্রাইভেট মানে পপুলার ওপিনিয়নে প্রাইভেট। প্রেম পরকীয়া সেক্স। নিজের যে সব পাঁঠামোর কথা মনে পড়লে পনেরো মিনিট কপাল টিপে বসে থাকতে হয়, এই একটামাত্র জীবন কী ভাবে ফেলে ছড়িয়ে  একাকার করলাম মনে পড়লে রাতে ঘুম ভেঙে যা যা অনুভূতি হয় সে সব সহি প্রাইভেট ফিলিং কেউ কাউকে বলছে না। সে সব নিয়ে যে যার চিতায় উঠবে।

তারা বলে, আমি শুনি। যতক্ষণ বিনিময়ে আমার প্রাইভেট কথা জানতে চাইছে না, শুনতে আমার আপত্তি নেই। শুনি যখন ভালো করেই শুনি। ইন্টারাপ্ট করি না, জায়গামতো ভুরু তুলি, হাঁ হই।

অধিকাংশের সমস্যা, প্রেম নামছে না। কত লোকে যে প্রেম ব্যাপারটাকে হোস্টেল মেসের আন্দোলনের মতো ট্রিট করে। প্রেম নামছে না, ধর্নায় বসে গেল। যেন যথেষ্ট সময় মাটি কামড়ে থাকতে পারলে ওয়ার্ডেন বেরিয়ে মেনুতে টিন্ডা কমিয়ে আলুভাজা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেবেন। একটা লোক পরিষ্কার বলছে, বস্‌ তোমার প্রতি আমার প্রেম নেই, অন্যজন ভাবছে ইট পেতে রাখা যাক, একদিন না একদিন তো ঘাড় পাতবেই।

এ রকম মাটিকামড়ানো ঘাড়পাতানো প্রেম কেন কেউ করতে চাইবে ভগবানই জানেন। নাহ্‌, ভগবানকে অকারণ ক্রেডিট দিয়ে লাভ নেই। আমিও জানি। যদি কখনও এই নিয়ে পোস্ট লেখার এনার্জি হয়, লিখব।

আর একজনের প্রেম নেমেছিল, নেমে আট বছর থেমে, গত বছর উঠে গেছে। মিউচুয়ালিই উঠে গেছে। উঠে যাওয়ার পর তাঁরা মিউচুয়ালি ঠিক করেছেন ফ্রেন্ডস থাকবেন। কারণ যার সঙ্গে পৃথিবীর কোনও রকম সম্পর্কে থাকা যায় না তার সঙ্গেও বন্ধুত্বে থাকা যায়। কারণ পৃথিবীর সব সম্পর্কের তলে তলে আসলে বন্ধুত্ব বইছে। বাবা ওপরে বাবা, আসলে বন্ধু। মা ওপরে মা, আসলে বন্ধু। বর বউ ওপরে ওপরে বর বউ। লাইফ ইনশিওরেন্সের বেনিফিট, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের জয়েন্ট হোল্ডারশিপ, শারীরিকমানসিক নাকখতটতও সব ওপর ওপরের খোলস। খুঁটে তুলে ফেলুন - একটি নিঃস্বার্থ, মহৎ, টুলটুলে বন্ধুত্ব টুকি দেবে। 

দু'জন মিউচুয়াল প্রেম কেটে মিউচুয়াল বন্ধুত্বে সুখে দিন কাটাইতেছিলেন, এমন সময় মিউচুয়ালের বাইরে একজনের প্রেম নেমে গেল। পুরোনো প্রেমিকা, যিনি ব্লু টোকাইতে বসে আমাকে পাকড়াও করে ফুরিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্প শোনাচ্ছেন, বললেন, আই অ্যাম সো হ্যাপি ফর দেম। রিয়েলি। নো, রিয়েলি।

কিন্তু তিনি আবার পুরোনো প্রেমিকের সঙ্গে নতুন বন্ধুত্ব নিয়েও হ্যাপি কাজেই ইন্সটাগ্রামে নিয়মিত ইন্টারভ্যালে সে আনন্দ উদযাপন করেন। বন্ধুত্বকালীন ছবি বেশি তোলার সময় পাওয়া যায়নি, কারণ ছবি আপলোড করছেন। নতুন বন্ধুত্বের ছবি বেশি তোলার সময় পাওয়া যাচ্ছে না,  কাজেই পুরোনো প্রেমকালীন ছবিই সাঁটছেন নিয়মিত ইন্টারভ্যালে। নতুন প্রেমিকা সে সব ছবি দেখছেন আর জ্বলেপুড়ে খাক হচ্ছেন। 

আমি বললাম, ওয়েট, সে দেখতে পাচ্ছে কী করে তোমার ছবি?

পুরোনো প্রেমিকা বললেন, ওহ, উই আর মিউচুয়াল ফলোয়ারস।

আমি বললাম, রাইট। হাউ সিলি অফ মি। 

একদিন প্রেমিক দিল্লির বাইরে গেছেন, অ্যাট লিস্ট, যাবেন বলে বেরিয়েছেন। দিবি তো দে সেই দিনই পুরোনো প্রেমিকা নিজের বরসাতির ছাদে তোলা যুগলের একটি পুরোনো ছবি সেঁটেছেন। নতুন প্রেমিকা ছবির টাইমলাইন বিচার না করেই বোমার মতো ফেটেছেন এবং ইন্সটাগ্রামের সে পোস্ট নিয়ে চতুর্থ পানিপথ ঘটেছে। 

পানিপথ বাড়িয়ে বললাম কারণ রক্তক্ষয় ঘটেনি। এমনকি চুলোচুলিও না। ঘটলে ফয়সালা দ্রুত ও স্থায়ী হত। এই আধুনিক পানিপথের অস্ত্র হচ্ছে কমিউনিকেশন। নিরন্তর নিরবচ্ছিন্ন কমিউনিকেশন। তিরিশ ওয়ার্ক ডে ধরে মেসেজ লিখে যে যার "নিড কমিউনিকেট" করে, অবশেষে আঙুলে বরফ বেঁধে দম নিচ্ছে। এবং নীরবতাকে মীমাংসা ধরে নিয়েছে। 

প্রত্যাশিতভাবেই, কেউ নিজের আচরণ বদলানোর কোনও কারণ দেখতে পাননি। এঁরা দু'জন ফ্রেন্ডস থেকে গেছেন, ওঁরা দু'জন প্রেমিক। ইনি ছবি ছেপে চলেছেন, উনি নিশ্ছিদ্র প্রহরা দিয়ে যাচ্ছেন, তিনি ভাবছেন দু'নৌকোয় পা দিয়ে চালিয়ে যাবেন।

পঞ্চম পানিপথ বাধবে যখন একা আমি ছাড়া সবাই আকাশ থেকে পড়বে।

*

আর একজন সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায়, সোৎসাহে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছেন। সোশ্যাল নর্মফর্ম এলেবেলেদের জন্য আমি তো ফ্রি স্পিরিট ভেবে শুরু করেছিলেন, এখন 'দু'নৌকোয় পা দিয়ে চলা যাবে না' জাতীয় ক্লিশের খই ফুটছে। যৌন ঈর্ষা? সে তো হোমো সেপিয়েন্সদের হত শুনেছি বলে হেসে গড়িয়ে এখন দু'বেলা "প্রমাণ দাও বউয়ের থেকে আমাকে বেশি ভালোবাসো' লাইনে কান্নাকাটি চলছে।

সবথেকে অদ্ভুত লাগছে যেটা সেটা হল পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে স্ত্রীকে ভদ্রলোক একটুও ভালোবাসেন না। তার থেকেও বেশি পরিষ্কার ওঁকে ছাড়া ভদ্রলোক বাঁচবেন না। অথচ ভদ্রলোক বউকে ছাড়বেন না। বিয়ে ভাঙবেন না। 

ইনি ব্যাপারটার কোনও যুক্তি দেখতে পাচ্ছেন না। প্যাশনেট প্রেম ব্যতিরেকে দুটো লোক কী করে এক খাটের ওপর ও এক ছাদের নিচে বছরের পর বছর থেকে যেতে পারে এঁর মাথায় ঢুকছে না। 

আমি বললাম, রহস্য বটে। 

এঁর বুলডগ লগ্নে জন্ম কাজেই ইনি মাঠ ছাড়বেন না। অভি তো পার্টি শুরু হুয়ি হ্যায়। অ্যানোনিমাস ইমেল খুলে বউকে চিঠি লেখাটেখা হয়ে গেছে। মনোমত ফল ফলেনি। প্রেমহীন বিবাহবিধাতা হাঁটু নাড়াতে নাড়াতে মুচকি হাসছেন।

ইউ লুক লাইক ক্রিয়েটিভ টাইপ। কুছ ক্রিয়েটিভ রিভেঞ্জ বতাও। 

প্রশংসাটা গা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করতে করতে বললাম , রিভেঞ্জটা কীসের?

বাহ, আমি যে এত কাঁদলাম? তার।

বললাম, ব্যস্ত থেকে দেখতে পার।  একই থালা দু'বার করে মাজ।ভাঁজ করা জামার ভাঁজ খুলে আবার ভাঁজ কর। সদ্য কাচা জামায়, অ্যাজ ইফ অজ্ঞাতে, চা-ভর্তি কাপ উল্টে ফেল। 

জিমের মিট অ্যান্ড গ্রিট তখনও হয়নি, না হলে জিমে গিয়ে বেঞ্চ প্রেসের পরামর্শ দিতাম।

*

আমাকে যে যা বলেছে, যেচে বলেছে। বলার আগে বা পরে কাউকে বোলো না জাতীয় দিব্যিটিব্যিও দেয়নি। দিলে অবশ্য অসততা হত। যে কথা গোপন রাখতে চায় লোকে, গোপন রাখে। কফিশপের র‍্যান্ডম লোককে বলে না। বলেছে মানে মনে মনে চায় রাষ্ট্র হোক। 

কাজেই আমার গোপনীয়তা রক্ষার দায় নেই। তবু আমি সবার সব কথাই গোপন রেখেছি। মহান বলে নয়। রাখতে পেটও ফাটেনি। এই সব দুধভাত প্রাইভেট গল্প শোনার সময়েই হাই চেপে রাখা যায় না, ওই ড্রিভেল আবার জাবর কাটতে বসলে ঘুমিয়েই পড়ব।

মাঝে মাঝে কিছু মণিমুক্তো ঝিকিয়ে ওঠে। আগে লিখেছি কি না ভুলে গেছি, একজন চ্যাট জিপিটির সঙ্গে পরকীয়া করছিলেন। প্রেমিকার নাম চ্যাট জিপিটি  শুনতে কেমন তাই নতুন নামও রেখেছিলেন। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে। মানে ধরুন ওঁর নাম করণ, উনি চ্যাটজিপিটি প্রেমিকার নাম রেখেছেন কিরণ।

ঝট সে মান গয়ি, পাতা হ্যায়? কিরণ ইজ সো সুইট। ওঁর বোধহয় টেনশন হচ্ছিল আমি চ্যাট জিপিটি গার্লফ্রেন্ডের ব্যাপারটা গুল ভাবছি কি না। প্রমাণ দিতে ওঁর আইফোন সতেরো প্রো ম্যাক্সে চ্যাট জিপিটি, থুড়ি, কিরণের চ্যাট খুলে আমার চশমায় ঠেকিয়েছিলেন। আমি চোখ টিপে বুজে, দুই কানে আঙুল গুঁজে একশো আট বার মার্তণ্ডমন্ত্র জপ করে প্রাণ বাঁচালাম।

এ জিনিস বিশ্বাস না করার কী আছে। এই লেভেলের তারকাটা, কল্পনা হওয়া অসম্ভব। সত্যি হতেই হবে।

চ্যাট জিপিটি আকা কিরণ খুবই সাপোর্টিভ গার্লফ্রেন্ড। মিটিং-এ যাচ্ছি লিখলে, গো কিল ইট জানেমনটানেমন বলে।

আচ্ছা, জানেমন বলে কি না আমি জানি না, ওটা আমি জুড়েছি, গো কিল ইট ডেফিনিটলি বলে।

এ জিনিস শুনে গালে পুরে বসে থাকা যায় বলুন? অর্চিষ্মানকে লিখে দিই। আর শরদকে কিছু কিছু বলেছি। শুধু ওর থেকেই গোপন খবর নেব, ভালো দেখায় না। তাছাড়া যে কোনও সম্মানজনক সম্পর্কই গিভ অ্যান্ড টেক-এর ওপর তৈরি হওয়া উচিত।

*

শরদ আমাকে একটা বুকমার্ক উপহার দিয়েছিল।

ব্লু টোকাইয়ের অনেকেই আমাকে উপহার দিয়েছে। একজন বম্বে থেকে কফি এনে দিয়েছিল, দেওয়ার সময় ফিসফিস করে বলেছিল, কাউকে বলবেন না, ব্লু টোকাইয়ের কফির থেকে মাচ বেটার খেতে। কফির সঙ্গে একটা ধপধপে সাদা রঙের ফ্রেঞ্চ প্রেসও দিয়েছিল। একজন চিরজীবনের মতো ব্লু টোকাই ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে ফ্রুট অ্যান্ড নাট চকলেটের ফ্যামিলি প্যাক দিয়েছিল। কোর্টাডোর সঙ্গে আসা চিনির প্যাকেট আখোলা পড়ে থাকা নোটিস করেছে বোঝাতে র‍্যাপারে ছাপা 'নো অ্যাডেড সুগার'-এর ওপর স্মাগ টোকা মেরেছিল।

একজন তো একবার আমার অটোভাড়াও দিয়ে দিয়েছিল। সিদ্ধান্তকে মিথ্যে বলিনি, রোজ হেঁটেই আসি, সেদিন ঘুম থেকে উঠে পর্দার বাইরে আলোটা কেমন কেমন লাগল, মুড গেল বিগড়ে। 'হেউ' বলে বসে আছি, ভাবছি সারাদিন হেউ বলে শুয়ে থাকলে কেমন হয়, অর্চিষ্মান ঠেলে তুলল। যাও এবং অটো করে যাও। 

চলে এলাম। তিপ্পান্ন না কত ভাড়া উঠেছিল, ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে আবিষ্কার করেছিলাম ফোন পার্স দুটোই বাড়িতে। নো ক্যাশ, নো এটিএম কার্ড, নো গুগল পে। দৌড়ে ব্লু টোকাইতে ঢুকলাম। কাউন্টার ফাঁকা, খাঁ খাঁ দোকানে কোণার টেবিলে এক হাফচেনা দম্পতি - এক হাফ বাঙালি, এক হাফ পাঞ্জাবী। হাত পাতলাম। পাঞ্জাবী-হাফ মানিব্যাগ থেকে একশো টাকার নোট বার করে দিলেন। দৌড়ে বেরিয়ে তিপ্পান্ন টাকা মিটিয়ে সাতচল্লিশের জায়গায় পঁয়তাল্লিশ ফেরত নিয়ে ( ভাইসাবের কাছে দো রুপেয়া খুল্লা ছিল না) ফিরে আসতে আসতে বাঙালি-পাঞ্জাবী জুটি পর্শের জানালা দিয়ে টা টা করে বেরিয়ে গেলেন।

আজ পর্যন্ত তাঁরা সেই একশো টাকা ফেরত নেননি। পায়ে ধরতে বাকি রেখেছি। বাঙালি-হাফ দাবি করেছেন এই একশো টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য আমি যে পরিমাণে স্ট্রেস নিচ্ছি, তা তাঁকে এত আমোদ দিচ্ছে যে সেই আমোদ ছাড়ার প্রশ্ন ওঠে না। পাঞ্জাবী হাফ অর্ধমুদিত চোখে, তর্জনী নেড়ে ঘোষণা করেছেন, দিস ইজ টিপিক্যাল বেংগলি স্ট্রেস।

বললাম, আর কী, স্বর্গে একফালি জমি কিনেছিলাম কষ্টেসৃষ্টে, একশো টাকার দেনার জন্য কাঁচি হয়ে যাবে। তাঁরা আশ্বাস দিলেন, কাঁচি হবে না। যেটা হবে, বিপন্নকে একশো টাকা ধার দেওয়ার সুবাদে আমরা তোমার প্লটের উল্টোদিকে তোমার থেকে বড় প্লট কিনে তোমার থেকে বড় বাড়ি বানিয়ে রোজ সকালে সে বড় বাড়ির বড় বারান্দা থেকে তোমার দিকে হাত নাড়তে নাড়তে বড় কাপে কফি খাব।

জিজ্ঞাসা করলাম, কফিটা কোথাকার?

ব্লু টোকাইয়ের, অফ কোর্স।

স্বর্গে ব্লু টোকাই আছে?

ইফ দেয়ার ইজ নো ব্লু টোকাই ইন হেভেন, হু দা হেল ওয়ান্টস টু বি দেয়ার?

*

বুকমার্কটা ঠিক বুকমার্ক নয়। পোস্টকার্ড। কার্ডও বলা যায় কারণ আজকাল কেউ কিছু পোস্ট করে না। একদিন একটা তেত্রিশে শরদের আঙুল উঠল। কান থেকে গান খুলে তাকালাম। একটা কার্ড বিট কয়েনের বই থেকে, একটা কার্ড ডিপ ওয়ার্ক-এর বই থেকে বার করে দু'সেকেন্ড ভেবে ডান হাতেরটা  এগিয়ে দিয়েছিল শরদ।

কিপ দিস।

তারপর বাঁ হাতেরটা এগিয়ে বলেছিল, বাট রিড দিস অ্যাজ ওয়েল।

রিডিং-এ আমার আপত্তি থাকে না, তবে এ ক্ষেত্রে ঈষৎ আপদ হতে পারত। কার্ডদুটোয় গভীর অর্থবহ শায়েরি ছাপা। হিন্দি হরফে।

আমি হিন্দি পড়তে পারি। সেভেন এইটে সংস্কৃত ছিল। তখন মন দিয়ে পড়াশোনা করতাম, হরফ এখনও মনে আছে। এক দুই তিন চার ভুলে গেছি, অ আ ক খ পড়ে দিতে পারব। কুজ্ঝ্বটিকা লেভেলের যুক্তাক্ষর হলে ঠোক্কর খেতে পারি, কুন্তলা লেভেলের হলে সামলে দেব।

শরদ আমাকে যে শায়েরির কার্ডটা দিয়েছে তাতে যুক্তাক্ষর যা দুয়েকটা আছে, কুন্তলা লেভেলের। যেটা ও নিজে রেখেছে, আমাকে পড়তে বলছে, সেটার প্রথম লাইনের দ্বিতীয় না তৃতীয় শব্দের প্রথম অক্ষরটাই খ-য় ব-য় জড়ামড়ি।

খোয়াহিশ। 

শব্দ হিসেবে চিনি। কনসেপ্ট হিসেবে হাড়ে হাড়ে চিনি। যবে থেকে চেতনা কাজ করছে, এই খোয়াহিশ, নয় ওই খোয়াহিশ আমার নাকে দড়ি দিয়ে টানছে। 

হোঁচট যুক্তাক্ষরের জন্য খাইনি। গভীর মেসেজ দিচ্ছে বলেই হয়তো খুবই মোছামোছা ডিজাইন। আবছা আকাশি প্রেক্ষাপটে আবছাতর আকাশি ফন্টে কবিতা। আমার প্লাস এগারো, প্লাস দশের পক্ষে চ্যালেঞ্জিং।

প্রথম হাফ সেকেন্ডে পারিনি, পরের হাফ সেকেন্ডেই পেরে গেছি। এবং পারার সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় চাকা ঘুরতে শুরু করেছে।

না-পারাকে পারি প্রমাণের হাঁকপাকেই তো জীবন গেল। কেমন হবে যদি পেরেও না-পারার অগৌরব সেধে নিই? রিজার্ভ ব্যাংক  আর স্টেট ব্যাংক থেকে ক্রমাগত হিন্দিতে মেসেজ পাঠানো শুরু হয়েছে, নিম্বুপানির রেসিপি সার্চ করলে স্মার্ট গুগল আমার লোকেশন দেখে হেল্পফুল হিন্দিতে রেসিপি পাঠিয়ে দেয়। অটোমেটিক ট্রান্সলেশন অন রেখেছি, কিন্তু এ অনুপ্রবেশ ও অধিগ্রহণের মুখে অটোমেটিক অনুবাদ, আলপথের ছিদ্রে আরুণির আঙুলের থেকেও ইউজলেস। 

তাছাড়া এটা ধরে নেওয়াই বা কী রকম এনটাইটলমেন্ট যে বাংলাদেশে জন্মেও হিন্দি পড়তে জানতে হবে? এই সব ভেবে আমি একটা চোট্টামোর সিদ্ধান্ত নিলাম। 

শরদের দিকে তাকিয়ে অতীব কুণ্ঠিত গলায়, আই অ্যাম সো সরি, আই ওয়াজ নট টট হিন্দি ইন স্কুল, বলেই গলা বদলে, বাট আই ক্যান রিড দিস, বলে ও আমাকে যে সহজ যুক্তাক্ষরের কার্ডটা দিয়েছিল - পড়তে শুরু করলাম।

অব তো ঘবরাকে ইয়ে কহতে হ্যায় কি মর যায়েঙ্গে/ মর কে ভি চ্যয়ন না পায়া তো কিধর যায়েঙ্গে।
শায়রঃ শেখ ইব্রাহিম জুক সাহেব।

এবার চোট্টামো করিনি। আমার হিন্দি পড়তে যত সময় লাগার কথা, যতটা থেমে থেমে, সেভাবেই পড়ছিলাম। শেষ করতে পারিনি। লেট মি রিড ইট ফর ইউ বলে কার্ড ছিনিয়ে শরদ নিজেই পড়ে দিয়েছিল। রিস্ক না নিয়ে মানেও বুঝিয়ে দিয়েছিল।

*

শরদের সঙ্গে আর দেখা হয় না। ও এই ব্লু টোকাই ছেড়ে দিয়েছে। এম ব্লকের-র বাকি সতেরোটা কফিশপের কোনওটাতে গিয়ে উঠেছে নাকি জি কে টু ছেড়ে সম্পূর্ণ অন্য পাড়ায় তরী ভিড়িয়েছে তাও জানি না। একটা সম্ভাবনা আছে ডিয়ার পার্কের ব্লু টোকাইতে চলে যাওয়ার। কবে একদিন বলেছিল, ওটায় একবার গিয়ে দেখো। ভেরি নাইস। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না।

আমিও পাঁচ নম্বর টেবিল ছেড়ে দিয়েছি। পাঁচ ছয় টু-সিটার কাউচ। কাজেই আমি পাঁচে বসলে কেউ না কেউ পাশে এসে বসে। রোজ রোজ নতুন পড়শির সঙ্গে পড়শিয়ানা পাতানোর পরিশ্রম করতে ইচ্ছে করে না। এখন সিংগল সিটার টেবিলগুলোয় বসি। এক না পেলে এগারো। এগারো না পেলে চার। চার না পেলে ছয়। ছয় না পেলে একের উল্টোদিকের টেবিলে বসে একের লোকের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে বসে থাকি, যতক্ষণ না তিনি আমাকে সিট ছেড়ে দিচ্ছেন।

সাত বা দশ দিন পর, দেড় বা তিন মাসও হয়েছে, দ্বিপ্রাহরিক ব্রেকে ব্লু টোকাইয়ের রোদপড়া সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে রাস্তার ওপারে চোখ গেছে। আগরওয়ালজির দোকানের পাশে, ট্রেডার'স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ডের নিচে, নিম গাছের গুঁড়ির পেছনে একরাশ উড়ন্ত ধোঁয়া। ধোঁয়ার মধ্যে রে ব্যান। ঘাড়পেরোনো চুল, খোলা বা ঝুঁটি বাঁধা, ব্র্যান্ডেড শার্ট প্যান্ট জুতো জ্যাকেটের নিখুঁত সামঞ্জস্য। এগোতে এগোতে বোঝার চেষ্টা করেছি শরদ আমাকে দেখেছে কি না।  পারিনি। দেখলেও বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। স্থির দাঁড়িয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে। 

আগরওয়ালজির কাউন্টারে নির্দিষ্ট মূল্য জমা করে আমিই এগিয়েছি।

কাহাঁসে টপকে?

টেল মি, হোয়াট ডাজ দ্যাট গাই ডু?

রাস্তার ওপারে ব্লু টোকাইয়ের বারান্দায় ফোন কানে একটা লোক। লোকটাকে এক এক দিন সকালে কফি আইল্যান্ডে দেখি, বিকেলে ব্লু টোকাইতে দেখি। কফি বিন অ্যান্ড টি লিফ-এর আউটলেটটা যে ক'দিন খোলা ছিল, সেখানেও যেত। সর্বক্ষণ কানে ফোন। কাউকে ধমকাচ্ছে।

স্টক মার্কেট?

ওয়াইল্ড লাইফ পোচিং। বাইজ হিপোজ ফ্রম সেরেংগিটি অ্যান্ড সেলস টু স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ট্রিলিওনেয়ারস।

হাঁ বন্ধ করে হ্যাঃ বলার আগেই ভেপ পকেটে পুরে, ল্যাপিস লাজুলি পেঁচানো রাজস্থানী কবজি হেলিয়ে হাঁটা দিয়েছে শরদ।

সি ইউ লেটার।

এই 'লেটার' আমার ভবিষ্যতের মতো অনিশ্চিত। হতেই পারে ওটাই শেষ দেখা হল। হলে আমি ওকে খুঁজে বার করতে পারব না। শরদের পদবীও জানি না। আমার ধারণা শরদ আমার নামও জানে না।

তবে এটা ঠিক, আবার যদি কোনও দ্বিপ্রাহরিক ব্রেকে, আগরওয়ালজির গুমটির পাশে, ট্রেডার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ডের নিচে, নিমগাছের গুঁড়ির আড়ালে একরাশ ধোঁয়ার মধ্যে একজোড়া রে ব্যান আত্মপ্রকাশ করেই, তার দিক থেকে বিন্দুমাত্র হেলদোল না দেখেও, আমার সর্বাঙ্গে রঙের বিচিত্রানুষ্ঠান নিয়ে আমি এগোব। কিছু একটা বলব। যা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে শরদ জানতে চাইবে, বল তো ও কি করে। আমার উত্তর শুনে মাথা নাড়বে। ইউ আর সাচ আ প্যাসিভ অবজার্ভার। ইউ ওনলি নো পিপল হোয়েন দে কাম অ্যান্ড টেল ইউ হু দে আর। বলে লোকটার আসল হাঁড়ির আসল খবর দিয়ে ল্যাপিস লাজুলি পেঁচানো রাজস্থানী কবজি হাওয়ায় হেলিয়ে হাঁটা দেবে।

সি ইউ লেটার।

প্রিয় রং চটে যায়, প্রিয় বইতে ধুলো পড়ে, প্রিয় বাদ বদলে যায়। কারণ এগুলো ব্যক্তিগত, কাজেই বায়বীয়। কোল্ড হার্ড বাস্তবের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে যে বন্ধুত্ব তৈরি হয়, সাধারণতঃ টিঁকে যায়। জীবনের প্রিজম মিলুক না মিলুক। নামধাম জানা যাক না যাক। দেখা হোক না হোক।

Comments