ম্যাকলিওডগঞ্জ ২/২
ম্যাক্সিমাস মল থেকে ম্যাকলিওডগঞ্জ বাস স্টপ গাড়িতে তিরিশ মিনিট। ব্যক্তিগত ট্যাক্সিতে আটশো থেকে হাজার টাকা, ভাগাভাগি জিপে মাথাপিছু পঁচিশ। মলের সামনে তিনজন ট্যাক্সি ভাইসাবকে হেসে এড়িয়ে বারো পা এগিয়ে মোড় ঘুরে জিপ স্ট্যান্ড। একটা বড় স্থানীয় লোকের গ্রুপ অপেক্ষা করছিল, একটা খালি জিপ আসামাত্র ভর্তি হয়ে গেল। দুঃখী মুখে দাঁড়িয়ে আছি, ড্রাইভারজি বললেন, দো লোগ হো? উদগ্রীব ঘাড় নাড়লাম। ভদ্রলোক মাঝের সিট থেকে একটা সরুমতো ছেলেকে সামনের সিটে ডেকে নিলেন। তার জায়গায় আমরা উঠে পড়লাম। পাছে দরজা খুলে পড়ে যাই, অর্চিষ্মান আমার গলা জাপটে থাকল। আমি রাস্তার কংক্রিটে, নিচু পাঁচিলে, ঝোপে ঝাড়ে, পাইন গাছের গুঁড়ি ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছোটা গাড়ির ছায়ায় নজর রেখে চললাম। জামাকাপড়ের ব্যাগ গাড়ির ছাদে ছুঁড়ে উঠেছি, বাঁধাছাঁদা নেই, পড়লে ছায়া দেখে টের পাব আশা করি।
জায়গার মতো হোটেল বাছাতেও বৈচিত্র্যের অ্যাটেম্পট নিইনি আমি। ম্যাকলিওডগঞ্জ যতবার গেছি হয় সরকারি ভাগসু-ত থেকেছি নয় ভাগসুর উল্টোদিকে প্রাইভেট পেমা থাং-এ। একবার বুকিং ছাড়া এসে কোনওটাতেই জায়গা না পেয়ে মেন মার্কেটে একটা রেস্টোর্যান্টের ওপরের গেস্ট হাউসে থাকতে হয়েছিল, কারওরই পোষায়নি। ভাগসু পেমাথাং-এর মধ্যে মনে মনে টস করে এবার পেমা থাং-এ বুক করেছি।
ম্যাকলয়েডগঞ্জে প্রথম একসঙ্গে বেড়াতে আসা আমাদের জীবনের প্রথম একসঙ্গে বেড়াতে আসাও। সেবার এই দুটো হোটেলেই ছিলাম। প্রথম আসার শেষ দিন দুপুরে পেমা থাং-এ চেক আউট করার পর রাতের বাস ছাড়া পর্যন্ত রাস্তায় রাস্তায় ঘোরার প্ল্যান ছিল, ধুঁয়াধার বৃষ্টি নামাতে ভাগসুতে ঘর বুক করে কয়েকঘণ্টা কাটাতে হয়েছিল। সেই কয়েকঘণ্টাতেই বিয়ে নিয়ে প্রথম সিরিয়াস আলোচনা হয়েছিল মনে আছে।
টেলর সুইফটের যে গান আমি প্রথম শুনেছি তা হল আওয়ার সং। ম্যাকলয়েডগঞ্জ হচ্ছে আওয়ার প্লেস। যে কোনও রেস্টোর্যান্ট চেনা চেনা লাগে। মনে আছে, এই নরলিং -এ থুকপা খেতে এসেছিলাম, ঝিমঝিম বৃষ্টি পড়ছিল। অর্চিষ্মান বলবে, হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে আছে। বৃষ্টি পড়ছিল, তুমি রেগে গেছিলে। যে কোনও গলিতে ঢুকলে মনে পড়ে এ গলিতে আগেও হেঁটেছি। অর্চিষ্মান বলবে, হ্যাঁ হ্যাঁ অনেক রাত হয়ে গেছিল, তুমি রেগে গেছিলে। আবার যে সব দোকানে এতবার গিয়েও একবারও ঢোকা হয়নি, যেমন নিক’স ইটালিয়ান, কেন ঢুকিনি বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করলে অর্চিষ্মান বলবে, নিশ্চয় তোমার দোকানটার প্রতি কোনও রাগের কারণ ঘটে থাকবে কুন্তলা।
পেমা থাং-এ চেক ইন একজন ফোনে বলেছিলেন দুটোয়, এখন আর একজন সশরীরে বলছেন একটায়। তখন সবে দশটা। মহিলা বললেন, আমাদের রেস্টোর্যান্টে গিয়ে বসতে পারেন। বসলাম। দুটো অ্যামেরিকানো নিয়ে উপত্যকার দিকে মুখ ফেরানো পেমা থাং-এর রেস্টোর্যান্টের বারান্দা। উপত্যকা জুড়ে ধরমশালা শহর বিছিয়ে আছে। হোটেলের ছাদ থেকে সামনের গাছ পর্যন্ত তিনটে দড়ি থেকে প্রার্থনা রুমালরা পতপতিয়ে উড়ছে। ঠাণ্ডা হাওয়া শরীরের আনাচেকানাচে, শরীর চেয়ারের খাঁজে খাঁজে ঢুকে যাচ্ছে।
অর্চিষ্মান বলল, বুঝে গেছি, বুঝলে কুন্তলা। ল্যাংগুইড আমার ফেভারিট ফিলিং। এই যে ঘুমোচ্ছি না কিন্তু ঘুমঘুম, নেশা করিনি অথচ ঝিমঝিম, সব নিস্তব্ধ, সব ঠাণ্ডা, সব স্লো মোশন। ল্যাংগুইডের বাংলা কী হবে বল দেখি। শব্দ মনে পড়ল না, অন্য একটা পরিস্থিতি মনে পড়ল যেখানে সিমিলার অনুভূতি হয়। অলস দুপুরে। গুগল বলল ল্যাংগুইড মানে অবসন্ন। অর্চিষ্মানের অবসন্ন পছন্দ হল না। অলসটাই অ্যাপ্ট। অর্চিষ্মান আমাদের যুগ্ম ল্যাংগুইড মুহূর্তদের হিসেব নিচ্ছে। একটা রিষড়ার বাড়ির ছাদে। আমারও মনে আছে। নিমগাছের ছায়ায় ক্যাম্পখাটে ও শুয়ে আমি বসে ছিলাম। গঙ্গাফড়িং আর প্রজাপতিরা উড়ছিল। অর্চিষ্মান শুয়ে শুয়ে আমলকির আচার খেতে খেতে আমাকে মনে করাচ্ছিল জীবনানন্দ দাশ সত্যিই কবিতা খুব ভালো লেখেন।
তারপর আই ব্লকের মাঠে কবে নাকি দুপুরবেলা দুজনে চিৎপাত শুয়ে ছিলাম। এটা আমার আবার মনে নেই। দুপুরবেলা প্রকাশ্য পার্কে স্টারফিশ হয়ে শুয়ে থাকা আমার জলভাত হলেও অর্চিষ্মানের চরিত্রবিরোধী বলেই মনে হল আমার। কিংবা কে জানে তখন থেকেই অর্চিষ্মান একটু একটু আমার মতো হতে শুরু করেছে। চিৎ বললে আমার চিল্কা মনে পড়ে। শুশুকের নাচ দেখে ফেরার পথে নৌকোর পাটাতনে চিৎ হয়ে ছিলাম। কত রকম আকার আয়তন মেজাজের মেঘ আকাশ জুড়ে ভাসছিল।
অদূরে মেমসাহেবদের জটলা। ইট প্রে লাভ-এর প্রে অংশটার খোঁজ চলছে তিব্বতি স্পিরিচুয়ালিটির পীঠস্থানে। অর্চিষ্মান বাংলায় ফিসফিস করে জানতে চাইছে, কোনও জনগোষ্ঠীর সম্পর্কে বলা সম্ভব নাকি যে এঁরা মোর প্রোন টু স্পিরিচুয়ালিটি। অফ কোর্স, এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আগে প্রবণতা কী, তা কী ভাবে গড়ে ওঠে এ সব স্পষ্ট করতে হবে, সে সব করতে করতে আরও অনেক অস্পষ্টতা স্পষ্ট হয়ে উঠবে, এই করতে আলোচনা গোটানোর বদলে ছেতরে যাবে। সে রকম ভালো ছেতরাতে পারলে এক সময় পর কোথা থেকে শুরু করে কোথায় পৌঁছতে চেয়েছিলামও গুলিয়ে যাবে। এই সব ল্যাংগুইড সকালের জন্য এই সব আলোচনা পারফেক্ট।
বসে থাকলে বসেই থাকা হত কিন্তু আমরা ওয়ার্কিং ক্যাফেস ইন ম্যাকলিওডগঞ্জ খুঁজে রেখেছি। দুটোর ছবি দেখে পছন্দ হয়েছে। আদার স্পেস আর স্কোল কালচার ক্যাফে। দুটোর লোকেশন প্রায় এক, পেমা থাং থেকে তিরিশ মিনিট হাঁটা। পুরোটাই উতরাই। নামছি তো নামছি। টের পাচ্ছি ওঠার সময় কেমন মজা লাগবে। এক সময় আমি শিওর হয়ে গেলাম ম্যাপে সব ভুলভাল দেখাচ্ছে। নামতে নামতে প্রায় ধরমশালা পৌঁছনোর জোগাড়।
ওই তো।
আদার স্পেসে ঢুকলেও হত, লাস্ট মোমেন্ট পর্যন্ত নিজেদের সাসপেন্সে রেখে স্কোলে ঢুকে গেলাম। স্কোলে প্রচুর নোংরা ঝুপো কুকুর, প্রচুর কোণাদোমড়ানো বই, প্রচুর প্লাগ পয়েন্ট, তখনও পর্যন্ত প্রচুর ফাঁকা টেবিল। কোণ বেছে বসে পড়লাম। সামনে ফ্রেঞ্চ উইন্ডো টাইপের ব্যাপার দিয়ে বেরিয়ে খোলা ফালি বারান্দা। নীল আকাশ। আকাশের গায়ে ধওলাধার।
চোখ প্রার্থনা রুমাল টাঙানো দড়িতে সুইং খেয়ে লাফ মারল। জানালার উত্তরপশ্চিম কোণ থেকে দক্ষিণপূর্ব কোণে ঢালু নেমে এসেছে ঘন সবুজ পাহাড়, তার পর আরও একটা, তার পর আরও একটা। সে সব পাহাড়ের মধ্যে নিশ্চয় দেদার ফাঁক কিন্তু চোখ সে সবের পরোয়া করছে না, মেঘে পা ফেলে ফেলে লাফিয়ে লাফিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ক্রমশঃ সবুজ থেকে ধূসর পাহাড় ঢালে। লাফাতে লাফাতে এই পা ফসকালো, গেল গেল, ফুলস্পিডে নামছে চোখ, মাধ্যাকর্ষণ জিতে যাচ্ছে অবিসংবাদিত, লাস্ট মোমেন্টে বাঁচিয়ে দিচ্ছে পুতুলদের বাড়িদের লালনীল ছাদ, যাদের কারও কারও চিমনি থেকে অল্প অল্প ধোঁয়া উঠছে।
চোখের কান মলে গুগল ডক খুললাম। টাইপ করতে থাকলাম, অর্চিষ্মান অনলাইন দাবা খেলতে খেলতে কাজ, কাজ করতে করতে অনলাইন দাবা খেলতে থাকল। দোকানের দরজা খুলে ততক্ষণে লোক ঢুকতে শুরু করেছে, ব্যাপারটা ঘটছে আমার পেছনে আর অর্চিষ্মানের বাঁ দিকে। নতুন কাস্টমারদের আড়চোখে রেখেছে অর্চিষ্মান আর মাঝে মাঝে বলছে, এরা মনে হয় বাঙালি। ঝুপো কুকুরেরা পালা করে এসে আদরের চাঁদা নিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে কফি এল, খাবার এল, আবার কফি, আবার আলুভাজা, ব্লু লাগুন আর অরেঞ্জ মিমোসা। এই সব চলতে চলতে মেঘেরা সংঘবদ্ধ হয়ে বৃষ্টি নামাল, গোটাল, রোদের তাড়া খেয়ে পালাল, চোরাগোপ্তা জমতে শুরু করল পাহাড়ের ঢালে। আবার বৃষ্টি নামানোর আগে উঠে পড়া দরকার। দুটো বেজে গেছে, ঘর রেডি নিশ্চয়, ক্লান্তও লাগছে। কুকুরেরাও আর পাত্তা দিচ্ছে না।
উঠে পড়লাম। দরজার গায়ে নোটিস বোর্ডে পোস্টার, ‘ওম চ্যান্টিং এনার্জি ফ্লো’-র কর্মশালার পোস্টার। অর্চিষ্মান বলল, এনার্জি ফ্লো করাতে চাও তো এই বেলা লজ্জা না পেয়ে বলে ফেল কুন্তলা।
ফেরার পথে প্রত্যাশিত চড়াই। শর্ট কাট করতে গিয়ে গলিতে ঢুকলাম। জানতাম নোংরা হবে, কিন্তু জানা সত্ত্বেও প্রতিবারের মতো বিস্ময় জাগল। আচারবিচার এঁটোকাঁটা ছোঁয়াছুঁয়ি নিয়ে এত প্যারানয়েড জাত ছাড়া এই পরিমাণ ঐতিহাসিক নোংরার মধ্যে বসে থাকা সম্ভব না। দম বন্ধ করে পেরিয়ে এলাম।
ঘর রেডি। এক গ্লাস জল পুরো খাওয়ারও জায়গা নেই পেটে, শাওয়ারে ধারাস্নান সেরে এসি চালিয়ে সোজা লেপের তলায়। কেমন ঘুম হল? সত্যিকারের ক্লান্তির পর ঘুম যেমন হয়। যে রকম ঘুম আজকাল হয়ই না। ঘুম ভাঙল। এ ধরণের ঘুম যেমন ভাঙে। একেবারে অচেতন থেকে সম্পূর্ণ চেতন। যেন চকচকে মোছা চশমা পরে নিজের জীবনটার মধ্যে নেমে এসেছি। তিরিশ সেকেন্ডের জন্য কিছু চাপাচুপি দেওয়ার নেই, নিজেকে টুপিটাপা পরানোর নেই। দু-তিনটে মুখ, তিন-চারটে আফসোস, একখান স্বপ্ন।
ভাগ্যিস তিরিশ সেকেন্ড। তার পরেই সব ভুলে থাকার নাটক শুরু।
ঘড়িতে সন্ধে কিন্তু আকাশে আলো। অর্চিষ্মান বলছে। বিমিল সোসাইটি বলে একটা বার নাকি হোটেলের নাকের ডগায়। পাহাড়ে নাকের ডগা মিসলিডিং। দেখাচ্ছে দশ মিটার কিন্তু সে দশ মিটার আসলে একশো মিটার পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি উতরাই নেমে, মোড় ঘুরে নব্বই মিটার আবার পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি চড়াই উঠে আসা। এ পর্যন্ত তবু ঠিক ছিল। বিমিল বার একটা বাড়ির ছাদে। বাড়ির পাশ থেকে ছাদ পর্যন্ত একটা সিঁড়ি সোজা উঠে গেছে। একহাত সরু অন্ধকার, এক নম্বর সিঁড়িতে দাঁড়ালে তিন নম্বর সিঁড়ি বেসিক্যালি আমার বুকের কাছে। শেষ করতে পারলে রাবণের স্বর্গের সিঁড়ি এই রকমই কিছু একটা দাঁড়াত শিওর।
বিমিল সোসাইটির ছাদে বসে থেকে আমরা সন্ধে পেরিয়ে রাত নামতে দেখলাম। নিচে ধরমশালায় টিমটিম আলো জ্বলে উঠল। এতক্ষণ যে সহকাস্টমারদের মোটামুটি স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল তাঁরা ক্রমশঃ ছায়া হয়ে গিয়ে টেবিলে টেবিলে রেখে যাওয়া অপ্রতুল মোমবাতির আলোয় দেওয়ালে দেওয়ালে কাঁপতে থাকলেন। ওঠার সময় তবু এক রকম। বিমিলে দু’ঘণ্টা কাটিয়ে ওই সিঁড়ি দিয়ে নামা, খতরো কা খিলাড়ির ফাইন্যাল চ্যালেঞ্জ হতে পারে। আবার আর এক দিক থেকে ভাবলে সিঁড়িটার একটা উপযোগিতা আছে হয়তো। যেটুকু টনক হারিয়েছিল, সিঁড়ির নিচে অক্ষত নামতে নামতে আবার পুরো ফেরত এসে যাবে।
শনিবার রাতে কোটি কোটি পাঞ্জাবী, সম্ভবতঃ চণ্ডীগড় বা সংলগ্ন অঞ্চল এসে উপস্থিত হয়েছে। পাঞ্জাবীরা বাঙালিদের মতো, যেখানে যাবে নিজেদের খাবার খুঁজবে। ধাবাগুলো রমরমিয়ে চলছে। তন্দুরের আঁচ, হাত থেকে হাতে পরোটা বানানোর চটাপটের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গিয়ে জিমি’স কিচেনে ঢুকলাম। বিমিলে একগাদা আলুভাজা বাদামভাজা পাঁপড়ভাজা খেয়েছি, তবু খাব। কারণ খাওয়া ছাড়া এই মুহূর্তে কিছু করার নেই।
ম্যাকলিওডগঞ্জে খানচুয়াল্লিশ জিমিস কিচেন আছে, একটা ইটালিয়ান, একটা হিমালয়ান, আর একটা যেন কী, আমরা মোড়ের মাথারটায় ঢুকলাম। আমি ভেজ থুকপা নিলাম, অর্চিষ্মান কোনও এক টাইপের মাংসখণ্ড। প্রথমে বাইরের ফালি বারান্দায় জায়গা ছিল না, উঁকিঝুঁকি মারছি দেখে দুজন বাচ্চা ছেলে বলল, অপেক্ষা করুন আমাদের হয়ে যাবে এক্ষুনি। ছেলেদুটোর সঙ্গেই আরও অনেকের হয়ে গেল, আমরা খালি বারান্দায় কোণের একটা ভালো টেবিল দেখে বসলাম। বসে বসে লোক দেখতে দেখতে আবার কিছুক্ষণ বকবক হল। খেয়ে বেরিয়ে উল্টোদিকে কিছুটা হেঁটে হেঁটে গেলাম। পাহাড়ি শহর ঝাঁপ ফেলছে। বেশ কয়েকটা ইন্টারেস্টিং নামওয়ালা দোকানের নাম মনে করে রেখেছিলাম, সব ভুলে একটাই মনে পড়ছে। সেম সেম বাট ডিফারেন্ট। এটাই নাম দোকানের । মেন মার্কেটে ফিরে অর্চিষ্মান একটা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া বেকারি থেকে চকোলেট ট্রুফল পেস্ট্রি না ওই গোছের কী একটা কিনল। হোটেলে ফিরে তখনই ঘুমোলাম না দেরি হল, মনে পড়ছে না। পেমা থাং-এর একমাত্র খারাপ হচ্ছে টিভিতে সি আই ডি নেই। ভারতবর্ষের হোটেলে এ রকম টিভি থাকার মানে কী যাতে সি আই ডি চলে না? চলছে কতগুলো হিন্দিতে ডাব করা তেলুগু নয়তো ম্যায় খিলাড়ি তু আনাড়ি টাইপের হিন্দি সিনেমা। চোখকান উল্টে রাখলেও যা দেখে অন্তরাত্মা খাঁচাছাড়া হতে বাধ্য। মনে মনে ছিছিক্কার করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লাম। পুরো ঘুমোনোর আগে অর্চিষ্মানের বারতিনেক, কুন্তলা কেকটা একটু টেস্ট করে দেখো অন্ততঃ, অসামান্য খেতে, শুনতে পেয়েছিলাম মনে আছে।
*
রবিবার ভোরে অনেকগুলো জিনিস একসঙ্গে ঘটল। আমার অ্যালার্ম বাজল, আলো ফুটল, অসম্ভব নিচু স্কেলে নিকটবর্তী তিব্বতি মন্দির থেকে চ্যান্টিং শুরু হল আর একটা পাখি টি টি টি ডাকতে শুরু করল। এই হল্লাগুল্লার মধ্যে অর্চিষ্মান অকাতর ঘুমোচ্ছে। বারান্দায় এসে বসলাম। গা শিরশির করছে। একটা হাতকাটা জ্যাকেট এনেছি কিন্তু এখন কে বার করে পরবে। দুই হাতে কাঁটা জাগিয়ে বসে থাকলাম পাইন গাছ, প্রার্থনা রুমাল, পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে। এত রকম শব্দ, অথচ কী নৈঃশব্দ্য। কত কিছু ভাবছি আবার কিছুই ভাবছি না। ঘণ্টাখানেক পর ঘর থেকে টিভির শব্দ এল। অর্চিষ্মান উঠেছে। রেডি হয়ে ব্রেকফাস্টে গেলাম।
ব্রেকফাস্টে আমরা আছি, কালকের মেমসাহেবরা আছেন, নতুন এক চশমাপরা ভদ্রলোক ল্যাপটপে কাজ করছেন। এমন সময় একটা জার্মান শেপার্ড, যাকে আমরা ছোটবেলায় অ্যালসেশিয়ান বলতাম, হাঁপাতে হাঁপাতে, লালা ছেটাতে ছেটাতে, মাথা দোলাতে দোলাতে ম্যাকলয়েডগঞ্জের যত ধুলো সর্বাঙ্গে মেখে এন্ট্রি নিল। পরের পনেরো মিনিট খুবই আনন্দে কাটল আমার। তারপর ও-ও বোর হয়ে চলে গেল, আমরাও উঠে পড়লাম।
এখন ধরমকোট গেলেও হয়, না গেলেও হয়। কাজেই যাব। হেঁটে না অটোতে ঠিক করতে করতে অর্ধেক রাস্তা হাঁটা হয়ে গেল। উঠতে উঠতে শান্তশিষ্টতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। কারা ধীরস্থির কারা নয় সেই সব স্টিরিওটাইপ নিয়ে। অবিচলিত ও অনুদ্বিগ্নমনা ব্যাপারটা দুজনেরই আকর্ষণীয় লাগে। অর্চিষ্মানের অফিসে নাকি কয়েকজন দক্ষিণ ভারতীয় আছেন খুবই কাম অ্যান্ড কমপোজড। অর্চিষ্মান বলল বাঙালিরা ক্যাবলা, কিন্তু ঠিক শান্ত নয়।অর্চিষ্মান নিজের উদাহরণ দিল। ও কম কথা বলে,কিন্তু কথা বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে পড়তে পারে। আন্তরিক প্রতিবাদ করলাম। অর্চিষ্মানের থেকে কমপোজড লোক আমি প্রায় দেখিনি। ক্যাবলাকান্ত এবং অস্থির একজন বাঙালি আমাদের বাড়িতে থাকে বটে, কিন্তু সে লোকটা ডেফিনিটলি অর্চিষ্মান নয়।
ধরমকোট মূলতঃ ইজরায়েলি বসতি। যাওয়ার পথে নির্মীয়মাণ হোটেলের গায়ে কারা স্প্রে পেন্ট দিয়ে ফ্রম দা রিভার টু দা সি লিখে গেছে। এত হোটেলটোটেল হতে দেখলেই রিফ্লেক্সে একটা রাইটুয়াস রাগ হয়ে যেতে থাকে - ইস, সব জঙ্গল সাফ করে ফেলল এবং ভারি অন্যায় করল - তখন নিজেকে মনে করাতে হয়, আমি যে হোটেলে আছি সেটাও পাইনবন ধ্বংস করেই হয়েছে। ওই যে সকালে তিনটে পাইনের দিকে তাকিয়ে অত কাব্যিক হওয়ার চেষ্টা করছিলাম, আমি না থাকলে তিনের জায়গায় তিন হাজার পাইনগাছ থাকতে পারত। ছিলও। নেই যে তাতে আমার দায় আছে।
ধরমকোটের মোড় এসে গেছে। এমনি ফ্যা ফ্যা করে ঘুরতে আসিনি অফ কোর্স, ইন্টারনেটে গুচ্ছ ওয়ার্কিং স্পেসের নাম লিখে রেখেছে, তাদের মধ্যে একটার বিবরণ পড়ে ছবি দেখে বিশেষ করে মনে ধরেছে, সেটায় ঘণ্টা তিন-চার বসব বলে এসেছি। অনেক খুঁজে জানা গেল উঠে গেছে। হতোদ্যম হয়ে একটা ক্যাফেতে ঢুকে হানি লেমন জিঞ্জার টি নিলাম। ইচ্ছে ছিল ওখানেই বডি ফেলার কিন্তু মনে হল ওটা ঠিক কাজ করার মতো জায়গা নয়। মানে আমরা ছাড়া কেউ করছে না। কোনও দোকানে ল্যাপটপ খাটানো যাবে কি না তার অ্যাসিড টেস্ট হচ্ছে অলরেডি কেউ ল্যাপটপ খাটিয়ে বসে আছে কি না। দোতলা ক্যাফে। হয়তো ওপরের তলায় কাজের জায়গা ভেবে নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে দেখি ফাঁকা ফ্লোরে দুটো বাচ্চা হিপি প্রেম করছে। আমাদের দেখে বিষদৃষ্টি হানল, পত্রপাঠ নেমে এলাম।
জেদ চেপে যাচ্ছিল। এই রকম একটা হিপি জায়গায় দু’ঘণ্টা ল্যাপটপ খোলা যাবে না এটা হতে পারে? একটা দোকান উঠে যাবে, দুটো দোকান উঠে যাবে, গোটা বাজার তো আর উঠে যায়নি রে বাবা। যারা উঠেছে তাদের জায়গায় তো কেউ খুলেছে। এ মহাবিশ্বে জায়গা ফাঁকা থাকে না, যে যায় তার জায়গা অন্য কেউ ভরাট করে। অসামান্য চিপা গলি দিয়ে ক্রমশঃ ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলাম।
ভাগ্যিস এগোলাম।
দা স্পেস আউট-এর নাম ধরমকোটের সব ওয়ার্কিং ক্যাফের লিস্টে ছিল। কেন খুঁজছিলাম না কে জানে। আপনারা যদি ধরমকোটে যান, ল্যাপটপ খাটান বা এমনি বসুন, স্পেস আউট খুঁজবেন। এ সব দোকান যেমন হয়, মাটিতে বসার জায়গা আর টেবিল চেয়ার নিয়ে দারুণ সাজানো। আমরা একটা টেবিল অধিকার করে বসলাম। দেওয়ালে প্লাগ পয়েন্ট, উজ্জ্বল ও আনঅ্যাপোলজেটিক। যেটুকু সন্দেহ ছিল দূরীভূত হল। এটা আর একটা শিওর শট লক্ষক। এঁরা সক্রিয়ভাবে চান আমরা এঁদের দোকানের টেবিল আটকে কাজ করি। না করলে দুঃখও পেতে পাবেন।
ধীরে ধীরে দোকান ভরে উঠল। আমরা মনের সুখে কাজ আর কাজ থামিয়ে গল্প করছিলাম, বোর হয়ে গেলে ব্রেক নিতে বাইরে গিয়ে বসছিলাম। গুছিয়ে রোদ উঠেছিল। বাইরের তপ্ত মার্বেল টেবিলটপে কামিজের হাতাবৃত কনুইও ঠেকানো যাচ্ছিল না। হাত পা যথাসম্ভব গায়ের কাছে গুছিয়ে বসে এদিকওদিক দেখছিলাম। নানা দেশের লোক এসে জুটেছে। ইজরায়েলি চেহারা প্রত্যাশিত ভাবেই বেশি। কোঁকড়া চুল, খাড়া নাক, ফরসা রং। নিজে জীবনসমুদ্রে ভেসে আছি বলেই হয়তো আজকাল লোকের সাঁতারসংগ্রাম চোখে পড়ে। চারদিকে তাকাই, কী প্রচণ্ড কর্মযজ্ঞ চলছে, প্রতিটি মানুষ কী পরিশ্রম করছে। স্পেস আউট ব্যস্ত দোকান, এত ব্যস্ত যে মূল দোকানের বাইরে গলির ওপারের একটা ফাঁকা বাড়িতেও টেবিল চেয়ার পেতে লোক বসাতে হয়েছে। দোকানের তিনজনের সার্ভিস ক্রু, যাদের মধ্যে এক পুরুষ ও এক নারী সম্ভবতঃ দোকানের মালিক, এক সেকেন্ড দাঁড়ানোর চান্স পাচ্ছেন না। কাউন্টার থেকে রান্নাঘরে, রান্নাঘর থেকে টেবিলে, টেবিল থেকে টেবিলে, হাতে ভরা প্লেট, খালি প্লেট, ভরা কাপ, খালি কাপ নিয়ে হেঁটে চলেছেন। সারাদিন অত হাঁটলে আমি পরের দিন আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতাম না। এঁরা এটা রোজ করে যাচ্ছেন এবং সোৎসাহে করছেন।
একবার আমরা কফির অর্ডার দিয়ে বাইরে গেছি। কফি হয়ে গেলে টেবিলে রেখে দেওয়া হবে আমরা ফিরে এসে খাব সে রকম প্ল্যান। ভদ্রলোক দেখি কফির কাপ নিয়ে বাইরে আমাদের দিতে এসেছেন। এই ব্যস্ততার মধ্যে এত খেয়াল রাখা, রাখলেও কেয়ার করা - মুখ থেকে তিনবার থ্যাংক ইউ পাঁচবার সরি বেরিয়ে গেল।
বেরোনোর আগে টাকা দিতে গেলাম। যে ভদ্রলোক আমাদের অর্ডার নিয়েছিলেন এবং টেবিল ছেড়ে বাইরে কফি পৌঁছে দিতে গেছিলেন বললেন কোথা থেকে আসছ। অর্চিষ্মান বলল, দিল্লি থেকে। বলে চুপ করে গেল। যেন ওটাই সত্যি এবং সম্পূর্ণ সত্যি। ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন। আমি বললাম অরিজিন্যালি ফ্রম ওয়েস্ট বেংগল। ভদ্রলোকের ভুরু সোজা হল। থট অ্যাজ মাচ। রেয়ারলি সিন পিপল ফ্রম ডেলহি দিস কাম অ্যান্ড কোয়ায়েট। আদারওয়াইজ দে আর মোস্টলি নাইটমেয়ারস।
চিপা গলি পেরিয়ে বড় রাস্তা পর্যন্ত কোনওমতে চেপেচুপে ছিলাম, তারপর “আমাদের কাম বলেছে! আমাদের কাম বলেছে!” বলে লাফাতে লাফাতে ম্যাকলয়েডগঞ্জ পর্যন্ত নামলাম।
ক্লান্ত লাগছিল। আপ ডাউন মিলিয়ে একঘণ্টা হাঁটা। ওর থেকে বেশি আমি রোজ হাঁটি কিন্তু সমতলে। হোটেলে ফিরে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘুমোলাম। ঘুমিয়ে উঠে বেরিয়ে বাইরে এসে বসলাম। সেই তিনটে বান্টিং, তিনটে পাইন গাছ। দুলছে। দূরে বিভিন্ন শেডের ধূসর। বাঁ দিকে গাছপালার ওপাশে রেস্টোর্যান্টের বারান্দায় মোটকা নোংরা অ্যালসেশিয়ান দৌড়োদৌড়ি করছে। কংক্রিটে নখের টুপটাপ। অনেক কিছু ভাবছি, আবার কিছু ভাবছিও না। কত লোকের সঙ্গে সম্পর্ক কত রকম জট পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিন সব জট ছাড়িয়ে ফেলব ভাবি রোজ কিন্তু এক একটা করে দিন তো চলেই যাচ্ছে। এই করে করে একদিন আমি চলে যাব, জটেরা জটেদের মতো পড়ে থাকবে।
ভেতরে টিভির আওয়াজ শুরু হল। চা খেয়ে আরও কিছুক্ষণ গড়াগড়ি খেয়ে সন্ধে নামার পর বেরোলাম। খিদে না পেলে খাওয়া যাবে না মর্মে আইন থাকলে কত পরিশ্রম বাঁচত ভাবি মাঝে মাঝে। আজ রাতে আমরা খাব দোলজাম কিচেনে। আমি মিস করে গেছি কিন্তু অর্চিষ্মান ইন্টারনেটে দেখেছে, হিডেন জেম অফ ম্যাকলিওডগঞ্জ।
ধরমকোটের স্পেস আউট-এর পর আমার দ্বিতীয় রেকোমেন্ডেশন ম্যাকলিওডগঞ্জের দোলজাম কিচেন। গেলে অবশ্য করে যাবেন। আমি ভেজ থালি নিলাম, মাটন থালি শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে অর্চিষ্মান চিকেন থালি। ঘরোয়া বিশেষণটা সর্বদা পজিটিভ হয় না, দোলজাম হচ্ছে বেস্ট কাইন্ড অফ ঘরোয়া।
কাল অর্থাৎ সোমবার সকালে চলে যাব। সোম সন্ধেয় বেরিয়ে হোলনাইট বাসে গেলেও হত কিন্তু অর্চিষ্মান বলল সারা রাত জার্নি করে এসে মঙ্গলবার অফিস যাওয়া অসুবিধে, তাই গাড়ি বুক করা হয়েছে। এই বেড়ানোর ওই একটিমাত্র অংশ আমার ভালো লাগেনি। খুব খারাপ লেগেছে। তেরো ঘণ্টা গাড়িতে ভ্রমণ অসহ্য।
মোট কথা, রবিবার রাতই ম্যাকলিওডগঞ্জে আমাদের শেষ রাত। মেন বাজারের হট্টগোল পেরিয়ে টেম্পল রোডে ঢুকতে মেন বাজারের আঁচ নিভে আসে। শ’খানেক পা এগিয়ে এসে রাস্তার পাশে হোটেল ইত্যাদির মাঝে একটা ফাঁকা তৈরি হয়। গাছটাছও নেই। এক মহিলা ওই ফাঁকে ফোন তাক করে দাঁড়িয়েছিলেন। মহিলাকে আগেও দেখেছি, পাশের হোটেলেই উঠেছেন সম্ভবতঃ। বাঙালি হতে পারেন কি না তিরিশ সেকেন্ড সে বিষয়ে আলোচনা সারতে সারতে কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম আর মহিলা ফোন নামিয়ে চলে গেলেন। আমি আর অর্চিষ্মান ওঁর ছেড়ে যাওয়া জায়গায় পাথরের পাঁচিলে কনুই রেখে দাঁড়ালাম। কালো আকাশের নিচে ধরমশালা টিমটিম করছিল।
স্কোল কালচার ক্যাফেতে বসে থাকাকালীন নাকতলার মা ফোন করেছিলেন। অবশেষে বেড়াতে যাওয়া হয়েছে শুনে যত খুশি হলেন, বেড়াতে গিয়ে কফি শপে ল্যাপটপ খুলে বসে আছি শুনে তার থেকে বেশি দুঃখ পেয়ে গেলেন।
সেকি, বেড়াতে গিয়েও কাজ করছ? তোমাদের কী শক্ত জীবন, বাবাগো।
একটা ছবি মাথায় ঘাই মেরে উঠল। যে ছবিটা মা দেখতে পাচ্ছেন না। ছবিটায় একটা অকূল পাথার, একটা রংচঙে পুল ফ্লোট আছে। একটা টুপি একটা সানগ্লাস। কাঁচের গ্লাসে ক্যারিবিয়ান নীল পানীয়, স্ট্র আর ছোট্ট প্লাস্টিকের ছাতা। মৃদুমন্দ ঢেউ আর মনোরম সমীরণ। রোদ্দুর আছে, যতটুকু থাকলে আরাম। আমিও আছি।
*
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর হোস্টেল নাইট হত। টেবিল বেঞ্চ সব সরিয়ে দেওয়া হত। মেস কাউন্টারে ডিজে তাঁর কর্মশালা মেলে দাঁড়াতেন। মেসের চার কোণে প্রকাণ্ড স্পিকার থেকে তাঁর রান্না করা গীতবাদ্য যারা শরীরের ভেতর ঢুকে রক্তস্রোতে ঢেউ তুলত, কানের পর্দা ফাটাত, পিলে চমকাত। সাইকেডেলিক উৎস থেকে বিচ্ছুরিত লালনীল আলোর ম্যাজিকে অন্ধকার সামহাউ আরও ঘনীভূত হত। সে অন্ধকারে অনেকগুলো আলাদা আলাদা ছায়া মিলেমিশে গিয়ে একটা পিণ্ডে পরিণত হত, সেই ছায়াপিণ্ডটা একই তাল ও লয়ে লাফাতঝাঁপাত ঢেউ তুলত, পছন্দের গান শুরু হলে একই উল্লাসে হুংকার ছাড়ত। ক্রমে আরও ছায়ারা এসে জুটতে জুটতে অবশেষে মেসের পরিধি ছাড়িয়ে বেরিয়ে পড়ত।
আমার সবসময় সংশয় হয়েছে হোস্টেল নাইটের আসল পার্টিটা কোথায় জমেছে। অন্ধকার পঞ্চাশ ষাটটা ছায়াশরীরের ছন্দোবদ্ধ আন্দোলনে, নাকি মেসে জায়গা না পেয়ে বা বড়দের মধ্যে ঢোকার আত্মবিশ্বাস দেখাতে না পেরে কুলারের সামনে যেখানে ফার্স্ট সেমেস্টারের বাচ্চারা নাচছে, নাচতে নাচতে হেসে গড়াচ্ছে, নাকি আরও দূরে মূল হোস্টেলের সিঁড়িতে অন্ধকারে বসে আছে একজন একা, দোতলার রুম থেকে দৌড়ে নামছে অন্যজন, সমস্ত ফোকাস দিয়ে ফুল স্পিডে মেসের দিকে দৌড়তে দৌড়তে থমকে দাঁড়াচ্ছে একা বসে থাকা বন্ধুকে চিনতে পেরে, কী রে, এখানে একা একা বসে আছিস কেন? বন্ধু বলছে, আমার ইচ্ছে করছে না, তখন একবার ওহ্ বলে একবার মেসের দিকে তাকিয়ে বন্ধুর পাশে বসে পড়ছে। এবং বসেই থাকছে, যতক্ষণ না বন্ধুর মূড যথোপযুক্ত উত্থিত হয়ে দুজনে মিলে দুই হাত আকাশে তুলে নাচতে নাচতে মেসে ঢোকা যায়।
নিজের জীবনের পার্টি নিয়ে আমার আর কোনও কনফিউশন নেই।
আমি, আমার সামনে গুগল ডক আর দুহাত পরিধির মধ্যে অর্চিষ্মান, এটা হচ্ছে আমার জীবনের পার্টি। এই ছবিটার সঙ্গে এবার আপনি পার্বত্য ক্যাফে যোগ করুন, পর্বতের ঢালে মেঘ গড়িয়ে দিন, বাউন্ডারি কাকে বলে না-জানা জানার ইচ্ছেও নেই ঝুপো কুকুর লেলিয়ে দিন, আচমকা বৃষ্টিতে চারদিক সাদা করে দিন, বা হাতে ব্লু লাগুন ধরিয়ে মাথায় টুপি পরিয়ে জীবনসমুদ্রে অল্প অল্প দোলা লাগান, আমি মুগ্ধ হব, আমি গদগদ হব, কপালের প্রতি হাঁ হব, কিন্তু এরা সবই ডেকোরেশন। পার্টির দেওয়ালে রংবেরঙের কাগজের ঝালর, সুগন্ধী মোমবাতি, নিভু নিভু আলো, টুং টাং গিটার আর গুনগুন গজল। আসল পার্টি ওটা নয়। আমার পার্টি ওটা নয়। আমার পার্টির গেস্ট লিস্টে আছি আমি আর অর্চিষ্মান। অর্চিষ্মান দু’হাতের মধ্যে। চাইলে কথা বলা যায়, নাও যায়। সামনে ল্যাপটপ খোলা, টাইপ করাও যায়, নাও যায়।
এবারের বেড়ানোটা যে ভালো হয়েছে তার প্রমাণ হচ্ছে, জায়গাগুলোর কথা মনে পড়ছে। স্কোল কালচার ক্যাফে স্পেস আউটে আবার বসতে ইচ্ছে করছে, খুব ভোরে আর খুব রাতে পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে ইচ্ছে করছে, পেমা থাং-এর বারান্দায় বসে তিব্বতি লামাদের গোঁ গোঁ মন্ত্রোচ্চারণ শুনতে শুনতে তিনটে ঘেঁষাঘেঁষি পাইনগাছের দুলুনি দেখতে ইচ্ছে করছে। অর্চিষ্মানও বলছে, আর ক’দিন থাকলে ভালো হত, না গো? পরের বার আর একটু সময় নিয়ে যাব। কাল বলল ওর অফিসের যে শান্তশিষ্ট ধীরস্থির সাউথ ইন্ডিয়ান ভদ্রলোকের কথা বলেছিল, তিনি নাকি সপরিবারে পাহাড়ে চলে গেছেন, তিন সপ্তাহ ওয়ার্ক ফ্রম হিলস করবেন। তিন সপ্তাহ, দুজনেই একমত হলাম, অল্প বাড়াবাড়ি কিন্তু এক সপ্তাহ ম্যানেজ করা যায়। বাস্তবে না গেলেও কল্পনাতে তো খুবই যায়।
অর্চিষ্মান দাবি করছে কল্পনা নয়, বাস্তবেই হবে। আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে ভালো দেখে জায়গা বেছে, ফুডিংলজিং ট্র্যাভেলিং-এর বুকিংটুকিং সেরে ওকে জানিয়ে দেওয়ার। ওর জীবনে ভীষণ জরুরি কাজ চলছে কি না। আমিও অল্প কম জরুরি একটা বিষয়ে ব্যস্ত আছি, শেষ হলেই লেগে পড়ব। তারপর আবার আই এস বি টি বা অন্য কোনও টার্মিনাল থেকে পিঠে ল্যাপটপ আর ডান কনুইয়ে অর্চিষ্মানের কনুই জড়িয়ে রাতভরের বাস বা ট্রেনে চড়ে কোথাও একটা গিয়ে উপস্থিত হব। ভালো দেখে একটা কফি শপ খুঁজে বার করব যারা প্রকাশ্য দেওয়ালে প্লাগ পয়েন্টের সিগন্যাল সেঁটে রেখেছে। জানালার বাইরে পর্বতের মাথার বরফ রোদ্দুরে ঝকঝক করবে, উত্তাল সমুদ্র গর্জন করবে বা শালবনের গভীরে থাবা তুলে হালুম বলে হাসিমুখে হলুদ থাবা নাড়বে কেউ। আমি টাইপ করব, অর্চিষ্মান আমার পাশে বসে কাজ করবে, দাবা খেলবে, বাঙালির গন্ধ পেলে চোখ তুলবে। সুযোগ পেলে ফিসফিসিয়ে, না পেলে চোখে চোখে কমিউনিকেশন সেরে যে যার স্ক্রিনে ফেরত যাব।
যদি যাওয়া হয়, সে গল্প অবান্তরে লিখব তো বটেই।
বেশ ঘুরে আসা গেল মনে মনে এই লেখটা পড়ে । চোখের সামনে স্কোল কালচার ক্যাফে, পেমা থাঙ, জটপড়া ঝুপো কুকুর সব বেশ দেখতে পেলাম ।
ReplyDeleteসব হোটেলে cid আর নাপতোল বাধ্যতা মুলক হওয়া উচিৎ । আমি কাজাখস্তান গিয়ে যে হোটেলে ছিলাম সেখানে একটা বলিউড চ্যানেল ছিল রাশিয়ান এ ডাব করা, অমিতাভ বচ্চন, দিলীপ কুমার, রাজপাল যাদব, সালমান খান সব্বাই ভাবলেশহীন রাশিয়ান ভাষায় কথা বলে । সে এক বিচিত্র ব্যাপার ।
তোমার পার্টি লিস্টের ব্যাপার তা চমৎকার । একটু হিংসে করলাম
"আমি কাজাখস্তান গিয়ে যে হোটেলে ছিলাম সেখানে একটা বলিউড চ্যানেল ছিল রাশিয়ান এ ডাব করা, অমিতাভ বচ্চন, দিলীপ কুমার, রাজপাল যাদব, সালমান খান সব্বাই ভাবলেশহীন রাশিয়ান ভাষায় কথা বলে।" 🤨
Deleteসি আই ডি আর নাপতোল যারা বাধ্যতামূলক করবে, পরের বার তাদের ভোট দেব আমি।