কফি শপ ৪ঃ রা
রা-এর সঙ্গে অধিকাংশ দিন কথা হয়। যেদিন হয় না, একে অপরকে হাত তুলে সংকেত দেওয়া হয় আমি তোমাকে দেখলাম, তোমার আমাকে দেখারও প্রাপ্তিস্বীকার করলাম।
রা পাঞ্জাবী মেয়ে, যোগব্যায়ামের দিদিমণি। রেগুলার যোগসাধনার পরিণতি রা-কে দেখে বোঝা যায়। একটা জলজ্যান্ত ধ্যান যেন সাউথ দিল্লির ঢিকচিক ঢিকচিক ভাংড়ামিক্সের মধ্যে দিয়ে চলেছে। রা-এর কথা দাঁড়িকমাশুদ্ধু শুনতে হলে আমাকে রেগুলার গলা বাড়িয়ে মুণ্ডু প্রায় ধড় থেকে আলাদা করে ফেলতে হয়। জীবনের যাবতীয় প্রত্যাখ্যাত প্রেমের ইজাহারও আমি ওর থেকে বেশি ডেসিবেলে করেছি। রা-এর হাঁটা ওপর ওপর দেখলে নর্ম্যাল - এ পায়ের গোড়ালি থেকে আঙুল, আবার ও পায়ের গোড়ালি থেকে আঙুল। সবাই যে রকম হাঁটে। কারণ হিউম্যান অ্যানাটমি ওই রকম হাঁটার জন্যই উপযোগী।
কিন্তু অ্যানাটমি তো বাঁশ খড় মাটি। একই বাঁশ খড় মাটি দিয়ে বাগবাজারও হচ্ছে, কলেজ স্কোয়ারও হচ্ছে। আমিও হয়েছি, দীপিকা পাড়ুকোনও হয়েছেন।
তেমনি রা আর আমার হাঁটার শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সিমিলার এবং সিমিলারিটির ওখানেই শেষ। দূর থেকে আমাকে আসতে দেখলে মনে হবে মফঃস্বলী মেলায় বেঁকেচুরে যাওয়া বেলুন মানুষ। প্রতি পদক্ষেপে চটি ছিটকে যাচ্ছে। শরীরের অণুপরমাণুরা কেন্দ্রাতিগ বলে ছত্রাকার হয়ে যেতে চাইছে নেহাত সাড়ে তিন হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে পালাতে পারছে না।
একদিন ব্লু টোকাইয়ের গোল জানালার পাশে বসে ছিলাম। রা হেঁটে হেঁটে আসছিল। রা তখনও আমাকে দেখেনি, আমি রা-কে দেখেছি। চেয়ার থেকে চার ইঞ্চি উত্থিত হয়ে কনফার্ম করতে হয়েছিল রা-এর জুতো আর মাটির ভেতর গ্যাপ আছে কি না। রা কি হাঁটছে? না ভাসছে?
*
আমাদের কথোপকথন শুরু হয়েছিল, যে কোনও সেলফ-রেসপেক্টিং স্মল টক যা দিয়ে শুরু হয়। আবহাওয়া। দু'হাজার পঁচিশে দিল্লিতে যে লেজেন্ডারি বৃষ্টিটা হল, তার মধ্যে কোনওদিন স্যাঁতসেঁতে, কোনওদিন হাফভেজা, কোনওদিন কাকভেজা হয়ে ব্লু টোকাইতে ঢুকতে ঢুকতে আমার আর রা-এর বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
*
মানুষে মানুষে সম্পর্ক স্থাপনে নাকানিচোবানির ভূমিকা নিয়ে গবেষণার আর্লি মাইলস্টোন উনিশশো বাষট্টি সাল Schachter and Singer-এর টু ফ্যাক্টর থিওরি অফ ইমোশন। যা Schachter-Singer theory নামেও পরিচিত।
যে কোনও আবেগের প্রথম ম্যানিফেস্টেশন ঘটে শরীরে। বুক ধড়ফড়, কান কটকট, গলা শুকনো, হাতের তালু ভেজা। দ্বিতীয় ধাপে ব্রেন পরিপার্শ্ব বিচার করে এই সব লক্ষণকে এক কথায় প্রকাশ করে তার নাম দেয়। লেবেল সাঁটে। কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ মাৎসর্য।
Schachter ও Singer-এর দাবি ছিল এই পরিপার্শ্ব বিচার ও লেবেল সাঁটাসাটিতে ব্রেন রেগুলার গোলমাল করে।
স্বাভাবিক। শারীরিক লক্ষণের রেঞ্জ সীমিত। হৃদস্পন্দন হয় বাড়বে নয় কমবে। একবার ধামারে একবার দীপচন্দিতে তো বাজবে না। রক্তচাপেরও তাই। উচ্চ বা নিম্ন। হাতের তেলো হয় ঘামবে নয় কিছু একটা হবে, আমি শিওর না কী হবে। পিলে হয় চুপ থাকবে নয় চমকাবে।
কিন্তু অনুভূতি বা আবেগের ভ্যারাইটি ভাবুন। শাস্ত্রে রিপুর লিস্টেই ছ'টা কভার হয়েছে। নাটকনভেল লিখতে শেখার পর তো মিলনবিরহের মেলা। কঠিন বাংলা কনসিডার করলে গ্লানি, অনুতাপ, বিষাদ, স্মৃতিমেদুরতা, দুঃখবিলাস। তারপর স্ট্যান্ড অ্যালোন আবেগের পারমুটেশন কম্বিনেশন - অম্লমধুর, হর্ষবিষাদ। ভাষা জাতিস্পেসিফিক আবেগও আছে শুনেছি, ইংরিজিতে অনুবাদঅযোগ্য। জার্মানে শ্যাডেনফ্রয়েড (পরের ছেলে পরমানন্দ/যত গোল্লায় যায় তত আনন্দ), ডেনিশে হিগে (সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং-এর আরাম), ওয়েলশে হিয়ারইথ (সেই সব স্থানকালপাত্রদের জন্য নস্ট্যালজিয়া যারা কোনওদিন ছিল না কোথাও), ইনুইটে ইকসুয়ারপোক (কারও আসার অপেক্ষায় বার বার দরজা বা জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারা), পর্তুগিজে সওদাদে (যে প্রেম চলিয়া গিয়াও রহিয়া গেল). ঘুরে আমাদের একান্ত নিজস্ব কেমনকেমন।
ক স্তম্ভে পাঁচটা শারীরবৃত্তীয় উপসর্গ, খ স্তম্ভে পনেরোহাজার আবেগ চুলোচুলি করছে। এবার টানো তীরচিহ্ন।
ব্রেনের বিপদটা বুঝেছেন? রক্তচাপ তুঙ্গে, ফুসফুস ফাটোফাটো, পেটের ভেতর ভাসানের নাচ। তখন ব্রেনকে পরিস্থিতির পর্যালোচনায় নামতে হবে। অন্ধকার রাত না হেমন্তের বিকেল? ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য না টাইমস স্কোয়্যারের কংক্রিট-মানুষের জঙ্গল? পেছনে হালুম বলে লাফ মারছে ডোরাকাটা শ্বাপদ, নাকি সামনে থেকে মুচকি হেসে হেঁটে হেঁটে আসছে লম্বা রোগা দুপেয়ে?
এমনও তো নয় যে পরীক্ষা শুরুর প্রথম একঘণ্টা হস্তাক্ষর মুক্তোর মতো রাখতে গিয়ে শেষে মিহিগলায় 'দিদিভাই আর পাঁচ মিনিইইইট' চেঁচালেই দিদিভাই ধমক ও পনেরো মিনিট এক্সট্রা দেবেন। ব্রেনকে একটা অত্যাশ্চর্য অভূতপূর্ব অন্যায্যরকম দ্রুততায় উত্তর বার করে দিতে হবে
উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে না চাপলেই চিন্তার। মিসঅ্যাট্রিবিউশন না ঘটলেই অদ্ভুত।
>ব্রেনও মিসঅ্যাট্রিবিউট করে লেফট অ্যান্ড রাইট। একটাকে বলে দেয় প্রাণঘাতী। অন্যটাকে প্রেম। কেউ যদি বলেও, আচ্ছা দ্বিতীয় কেসে পেটের মধ্যে এই যে লাফালাফি চলছে এটা কি পিলে হতে পারে? ব্রেন বলবে, ধুর পিলে না ওটা প্রজাপতি। আর লাফালাফি যেটাকে মনে হচ্ছে সেটা ওড়াউড়ি। রামধনুরং বাটারফ্লাইয়ের দল পেটের মধ্যে ফরফরাচ্ছে। চোখ বুজে ঝাঁপ মারো। আর যেখানেই থাক এখানে বিপদ নেই।
*
সব আবেগেরই মিসঅ্যাট্রিবিউশন হয় হয়তো, কিন্ত ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলম্বিয়ার প্রফেসর ডোনাল্ড ডাটন আর স্টোনি ব্রুকের প্রফেসর আর্থার অ্যারনের উনিশশো চুয়াত্তর সালে যখন এই বিষয়ে পেপার লেখার কথা মাথায় এল, তাঁরা একটি বিশেষ আবেগকেই বাছলেন। কারণ বুদ্ধিমান হওয়ার সুবাদে তাঁরা জানতেন ভালো পেপার লেখা আর সে পেপার ছাপা হওয়ার সম্পর্ক জটিল। এডিটর কোনটা খাবেন, রিভিউয়াররা কোনটা খাবেন, কোন পেপার ছাপলে জার্নালের সার্কুলেশন ডবল হবে সে সবও ভাবতে হবে।
আবার হবেও না। কোন আবেগের ওপর ভিত্তি করে লেখা গল্প সবথেকে বেশি পাঠকপ্রিয়? কোন ঘরানার সিনেমা ধারাবাহিকভাবে বক্স অফিসে সাফল্য পেয়ে আসছে? একমাত্র কোন আবেগ, আখ্যানের মূল আবেগ না হয়েও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রেগুলারলি সাবপ্লটে নিজের উপস্থিতি জাহির করে যাচ্ছে?
*
প্রেমঘটিত মিসঅ্যাট্রিবিউশন পরীক্ষা করার জন্য ডাটন ও অ্যারন একদল লোককে দু'দলে ভাগ করলেন। দু'দলই একটা করে ব্রিজ পেরোবেন। ব্রিজের ওপারে হোমো সেপিএন্স প্রজাতির একজন রূপসী স্যাম্পল দাঁড়িয়ে থাকবেন। এই রূপসী যে বিজ্ঞানীদের চর আগে বলা হবে না। ব্রিজ পেরোনোর পর রূপসীর সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের দেখা হবে। তখন ডাটন অ্যারন দুই দলের হৃদয়াবেগ পরীক্ষা করবেন।
ডাটন অ্যারন-এর হাইপোথেসিস ছিল আবেগ আলাদা হবে। কারণ ব্রিজ আলাদা।
কনট্রোল গ্রুপকে তোলা হল একটা নর্ম্যাল ব্রিজে। নর্ম্যাল ব্রিজ যেমন হয়, শক্তপোক্ত টেঁকসই। ট্রিটমেন্ট গ্রুপকে পেরোতে বলা হল একটি সাসপেনশন ব্রিজ। যা একশোজন পা রাখলেও দুলবে, একজন পা রাখলেও। নেপালে রানিপুলেও সেম কেস। রূপসী মহিলার ব্যাপারে বলতে পারি না, 'ওপারে চায়ের দোকান আছে, দুজনে দুকাপ চা খেয়ে আসি' লোভ দেখিয়েও অর্চিষ্মানকে যে পুল পার হতে উদ্বুদ্ধ করতে পারিনি। দুলন্ত ব্রিজে নেমে, গুনে গুনে দু'পা ফেলে, 'নোপ, কুন্তলা' বলে অর্চিষ্মান শক্ত জমিতে ফেরত গেছে।
ডাটন অ্যারন-এর পরীক্ষা হয়েছিল ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজে। ক্যানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রদেশের আপার ক্যাপিলানো অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বইছে ক্যাপিলানো নদী। সেই নদীর ওপর প্রথম সেতুবন্ধন হয়েছিল আঠেরোশো ঊননব্বই সালে, শনের দড়ি দিয়ে সেডার কাঠের তক্তা বেঁধে বেঁধে। তক্তার সেতুতে পা দিলেই আকাশবাতাস দুলে উঠত। ক্যাপিলানো ব্রিজ এখন সম্পূর্ণ ধাতব, এখনও পা দিলে আকাশবাতাস দুলে ওঠে।
নর্ম্যাল ব্রিজের লোকজন পকেটে হাত পুরে শিস দিতে দিতে স্মলটক করতে করতে ব্রিজ পেরোলেন। এখন হলে ফোন দেখতে দেখতে পেরোতেন। ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজের লোকজন ব্রিজে পা দিলেন, আকাশ দুলে উঠল, সত্তর মিটার নিচে জমি দুলে উঠল। জমি মানে জমির কল্পনা। সে তো ঢাকা পড়ে গেছে নিশ্ছিদ্র বৃষ্টিঅরণ্যে। ডগলাস ফার, রেড সেডার আর দানবিক হেমলকদের বিনিদ্র পাহারার তলে তলে বুনো বাঁধাকপির ওপর ফিস্ট লাগিয়েছে কচি কলাপাতা জোঁকের দল, ধারালো খাঁজকাটা কাস্তের মতো পাতার গুচ্ছ উঁচিয়ে সাহসী ফার্নেরা নরমসরম লেডি ফার্নদের বলছে, কিচ্ছু হবে না, আমি আছি তো। সেই ফার্নের মতো সাহস যদি থাকে, দুলন্ত দ্যাবাপৃথিবীর মধ্যবর্তী শূন্যতায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে হয়তো দেখা যাবে ক্যাপিলানোর স্বচ্ছ জলে চিনুক স্যামনের ঝাঁকের পিঠে কেমন রোদ্দুর চিকচিক করছে। সাহস আরও বেশি হলে আকাশের দিকে ঘাড় তুললেই পাক খাবে ইন্দ্রলুপ্ত ঈগল। বাঁকানো ঠোঁট খুলে মাঝে মাঝে তীক্ষ্ণ ডাক ছাড়ছে যা প্রায় শিশুর কান্নার মতো।
উনিশশো নিরানব্বই সালে এক মহিলা তাঁর ডাউন সিনড্রোমাক্রান্ত শিশুকে ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজ থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেন। দু'হাজার ছয়ে তিনশো বছর আর ছেচল্লিশ টনের একটি ডগলাস ফার ঝড়ে উপড়ে ব্রিজের ওপর পড়ে। কর্তৃপক্ষ দাবি করেন সে সময় ব্রিজের ক্ষতিগ্রস্ত অংশটুকু জনশূন্য ছিল। দু'হাজার দশের জুন মাসে ক্লাস ট্রিপে গিয়ে এক টিনএজার ব্রিজের রেলিং টপকে তিরিশ মিটার ভিউয়িং প্ল্যাটফর্মের ওপর পড়ে মারা যায়। কর্তৃপক্ষ দাবি করেন ছাত্রের রক্তে এল এস ডি ছিল। ক্যাপিলানো সাসপেনশন ব্রিজের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে বেশ কিছু সিনেমা সিরিয়ালের শুটিং হয়েছে, যাদের মধ্যে একটার নাম হচ্ছে স্টেয়ারওয়ে টু হেভেন।
অবশেষে স্বর্গ আসে, বা নরক ফুরোয়। ব্রিজ শেষ, শক্ত মাটি। অ্যাসাইনমেন্ট অনুযায়ী নিজের চার্মের রেগুলেটর পাঁচে ঠেলে এগিয়ে আসেন রূপসী মহিলা।
একদল তখনও ফোন দেখতে ব্যস্ত। বা স্মলটকের ছুতোয় নিজের নিজের ইনসিকিউরিটি ঢাকতে। মহিলাকে দেখে চকিতে একবার, দু'বারও হতে পারে, মেপে বেশ বেশ বলে আবার ফোনে ফেরত যান।
অন্য দল টের পান প্রেম হয়ে যাচ্ছে। যে রকম প্রেম রোমিও জুলিয়েটের হয়েছিল, হীররান্ঝার হয়েছিল, লায়লামজনুর হয়েছিল। দিবারাত্র রক্ত পাম্প করে যাওয়া বোরিং বুড়োহাবড়া হৃদপিণ্ডের পাশে গজাচ্ছে আনকোরা হৃদয়, কবচকুণ্ডলহীন কিন্তু অকুতোভয়, নেক্সট তিনমাসের (তেমন বাড়াবাড়ি হলে ছ'মাসও টানতে পারে) কুরুক্ষেত্রে রক্ত ঝরিয়ে বেঘোরে মরে যাওয়াই যার নিয়তি। মরে গিয়ে পূর্ববর্তী কুরুক্ষেত্রের হত হৃদয়দের পাশে পড়ে থাকা। একটাই কিউরিয়াস, এই সব মৃত হৃদয়দের কেউ দাহ করে না, কবর দেয় না, ক্ষুধার্ত পাখিদের জন্য মিনারে তুলে রেখে আসে না - তবু এরা পচে না গলে না উল্টে যত সময় যায় এক আশ্চর্য সুবাসের উৎস হয়ে ওঠে। কোনও কোনও আচমকা অবসরে যে সুবাস নাকে আসে, এদিক ওদিক তাকাতে চেনা চেনা মুখ। চিনতে চিনতে, 'আরেএএ' বলতে বলতেই সে হেসে চলে যায়।
*
নন্দনে ফোয়ারার ধারে বসে যাদের কোমরও ধরল ফ্রেন্ডজোন হলেন, পড়াশুনো ডকে তুলে বিরহের কবিতা লিখে গান শুনে যাদের কপালের বাতি জ্বলল না ভবিষ্যৎ নিভল, হোয়াটসঅ্যাপে হত্যে দিয়ে যাদের মেসেজের উত্তর এল না নিজের প্রতি শ্রদ্ধাটুকু গেল তাদের বলছি।
ওভাবে হবে না।
প্রেম চাইলে পিরানহাপ্রতুল মহাসমুদ্রে কামনার ধনের সঙ্গে ঝাঁপান, ইন্সট্রাকটরকে বলে ফুটো করে রাখা প্যারাশুট নিয়ে একসঙ্গে এরোপ্লেন থেকে লাফান, অমাবস্যা রাতে ভুতুড়ে কেল্লায় চেয়ারে পাশাপাশি বসে একে অপরের হাত একসঙ্গে বেঁধে পঁয়ষট্টি ইঞ্চি স্ক্রিনে রিংগু চালিয়ে রিমোট নাগালের বাইরে ছুঁড়ে ফেলুন।
প্রেম না এলে আমার নাম বদলে দেবেন।
*
এই পর্যন্ত লিখে চ্যাট জিপিটিকে 'বোস, আসছি' বলে বাইরে এলাম। একটা ভয়াবহ চলছে দিল্লিতে। ঠাণ্ডাটা তবু নেওয়া যাচ্ছিল, এর মধ্যে আকাশ থেকে কয়েক বালতি জল ঢেলে দেওয়ার আইডিয়া নির্ঘাত ভগবানের।
সকাল থেকে এই প্রথম রোদ উঠেছে। জিম, স্পা, ব্যাংক আর তেঁতুলগাছের মাথায় ঠোক্কর খেয়ে এক ফুট বাই দেড় ফুট সোনালি খোপ তৈরি করেছে ব্লু টোকাইয়ের কোণাকুণি সামনেটায়। ওই নাতিশীতোষ্ণ উজ্জ্বলতায় নিজেকে ঠেসেঠুসে ঢোকালাম। পিটার ছুটে এসে আমার বাসন্তী চিকনকারিতে ছোট ছোট দুই নোংরা থাবার ধাপ্পা দিয়ে পালাল।
জন্মে থেকে দেখছি, প্রেমের প্রোপোজাল সাবমিশন হয় পুজোয় কিন্তু সে সাবমিশন সাতজন্মের শপথে পরিণত হয় শকুন্তলা কালীপুজোর মেলায় জায়ান্ট হুইল থেকে নেমে। জসোলার হলে নাইট শো-তে লাস্ট যে হরর সিনেমাটা দেখতে গেছিলাম, 'ওয়েপন্স' সম্ভবতঃ, নাইন্টি নাইন পার সেন্ট দর্শক টিন এজার জুটি, একা আমি আর অর্চিষ্মান আমাদের মিডলাইফ ক্রাইসিস নিয়ে হল আলো করে বসে আছি।
র্যান্ডম?
আচ্ছা ক্রাইসিস শুধু আমার। মিডলাইফ, ক্রাইসিস - এ সবের কোনওটার সঙ্গে অর্চিষ্মান অ্যাসোসিয়েট করতে অস্বীকার করছে।
ডাটন অ্যারন সাহেব মাথা খাটিয়ে হিসেবনিকেশ কষে পরীক্ষানিরীক্ষার হাঙ্গামা করেছেন ভালোই করেছেন, মানুষের চিন্তাভাবনার সীমান্ত কতটা ঠেলা হল তার খতিয়ান রাখা জরুরি। কিন্তু কবে রীণাদি'ভাই শ্বসনের চ্যাপ্টার শুরু করবেন তার অপেক্ষায় কেউ দম বন্ধ করে বসে থাকে না। ক্লাস ফাইভের কুন্তলার মোটা মাথায় আহ্নিকবার্ষিক গতি ঢুকতে এত টাইম লাগছে কেন বলে পৃথিবী হাতপা ছুঁড়ে ঘোরা বন্ধ করে দেয় না।
প্রেমে পড়া আর বাঘে তাড়া খাওয়ার শারীরবৃত্তীয় আত্মীয়তার বৈজ্ঞানিক সূত্র কণ্ঠস্থ থাকার দরকার নেই, সকলেই সহজাত প্রবৃত্তিতে জানে কী করলে কী হয়। কারণ এ সব ইভলিউশনারি লার্নিং। অভিযোজনীয় অভিজ্ঞতা। মানবসভ্যতার একমাত্র মিনিংফুল উত্তরাধিকার।
*
দু'হাজার পঁচিশের বর্ষায় প্রতিদিন সকালে রা যখন গোবরভেজা হয়ে দৌড়ে ব্লু টোকাইতে ঢুকল, কোনওদিন ছাতার জল ঝাড়তে ঝাড়তে, কোনওদিন রেনকোট ভাঁজ করতে করতে, একই সঙ্গে ভিজে এবং ঘেমে, তখন চোখাচোখির মাধ্যমে আমাদের যে হেনস্থার হ্যান্ডশেক হল, দুজনেরই মনে হল এটাই নিশ্চয় বন্ধুত্ব।
আমিও কয়েকঘন্টা আগে ওই নাকানিচোবানি খেতে খেতেই ঢুকেছি। সকাল সাতটাতেও ভোর চারটের মতো অন্ধকার হয়ে আছে, অর্চিষ্মান বোঁ বোঁ ঘুরছে কে জানে কোথায়, মাঝে মাঝে হোয়াটসঅ্যাপে টোকা মেরে খবর নিচ্ছে বৃষ্টি থামল কি না। থামেনি শুনে, 'ভালোই তো আছ এখানে আমি রোদে ভাজাভাজা হচ্ছি' বলে, যেন এ ষড়যন্ত্র নির্ঘাত আমার, হিন্ট দিয়ে ফোন রেখে দিচ্ছে।
অর্চিষ্মান নেই অথচ আমি বাড়িতে আছি গল্পের প্লট এ রকম হলে সে প্লটে হাতিবাঁধা শেকলও থাকতে হবে। কাজেই আমি ওই অন্ধকারেই উঠে ব্রাশ গালে গুঁজে চায়ের কেটলি অন করে, কুলকুচি করতে করতে চুল আঁচড়ে, চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে চায়ে চুমুক দিতে দিতে টিপ পরতে পরতে দুল আর ঘড়ি খুঁজে পেয়ে, হারিয়ে, 'হেউ' বলে ব্যাগ গুছোতে গুছোতে গুছোতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে হৃদয় দিলে যার হৃদয় মেলে, হৃদয় যাবে সে কাল পিছে ফেলে ডুয়েট গেয়ে উবার ডেকে... এই তো! দুল! ঘড়ি! যথাক্রমে যথাস্থানে গুঁজে ও পেঁচিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে অর্ধেক নেমে গ্যাস বন্ধ করেছি কি না ভুলে গিয়ে (হান্ড্রেড পারসেন্ট জানি করেছি) যে শব্দ বাংলায় মরে গেলেও উচ্চারণ করতে পারব না, না ইংরিজিতে পাড়াশুদ্ধু লোককে শুনিয়ে চেঁচিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে চাবি ঘুরিয়ে ঘরে ঢুকে গ্যাস চেক করে, ঢুকেছিই যখন বারান্দার দরজা বন্ধ কি না দেখে দৌড়ে নেমে অটোতে উঠেছি। সিঁড়ির দরজা থেকে অটো পর্যন্ত চল্লিশ পা দৌড়তে দৌড়তেই ভিজে গোবর।
*
ছাতা? আছে তো। ব্যাগেই আছে। অর্চিষ্মান কনফারেন্স থেকে এনে দিয়েছে। অপূর্ব ছাতা। শক্তপোক্ত। খুললে তিনটে আমি আরাম করে ঢুকে যাব এদিকে ভাঁজ করলে ছাতা এইটুকু একটা বাকসে ঢুকে যাবে। চশমা ছাড়া সে বাক্সের সঙ্গে চশমার বাক্সের তফাৎ করতে পারলে আপনি জিনিয়াস।
তবে ভাঁজ করতে জানতে হবে। রীতিমত বড় বয়সে আবিষ্কার করেছি যে পৃথিবীর কত শতাংশ সবল সক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক ছাতা ভাঁজ করতে জানে না। এবং কত শতাংশ (হিন্টঃ আগের শতাংশের থেকে বেশি) সবল সক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক ছাতা ভাঁজ করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না। ঘুচিমুচি করে বেল্ট ঘুরিয়ে বোতাম টিপে খেল খতম করে।
আগে জাজ করতাম। এখন করি না। সবার তো সব বিষয়ে দক্ষতা থাকে না। ওঁরা মানবজমিন চষে সোনা ফলান, আমি ছাতা নিখুঁত ভাঁজ করি।
আমি মশারিও ভালো ভাঁজ করি। ভালো মানে খুবই ভালো। পঁয়তাল্লিশে পৌঁছতে পৌঁছতে মায়ের দুটো শিক্ষাই টিঁকেছে -শাড়ি পরা আর মশারি ভাঁজ।
বাড়ি গেলে শ্যামলীই বিছানা পাতে আর তোলে, ইতি গজ- র ভঙ্গিতে বলি আরে তোমাকে করতে হবে না আমি করে নেব। একবার বলেই থেমে যাই পাছে শ্যামলী রাজি হয়ে যায়। একদিন সকালে অদ্ভুত কিছু ঘটে থাকবে, নিজেই বিছানা তুলেছি। রাতে মশারি টাঙাতে এসে শ্যামলী বলল, আরিসস্যাটা, সোনা হেবি মশারি পাট করতে পারে তো।
শ্যামলীর ঠাকুমা নাকি বলতেন যারা মশারি ভাঁজ করতে পারে তারা সব কাজ ভালো করে করতে পারে। এমনকি সারাদিন যারা শুয়ে শুয়ে চানাচুর খায় আর জল খাওয়ার সময় মাথাটা ততটুকুই তোলে যতটুকু না তুললে শ্বাসনালীতে জল ঢুকে বিষম খেয়ে মরবে - যদি তারাও মশারি ভাঁজ করতে পারে - বুঝলে সোনা, শ্যামলী বলল, ঠাকুমা বলত চাইলে তারাও কাজ করতে পারে।
শ্যামলীর প্রশংসা, আগেও খেয়াল করেছি, শুনলে খুশি হতে নার্ভাস লাগে।
*
মোট কথা, ছাতা ব্যাগে আছে। খুলিনি। ভিজে চুবড়ি হয়েছি, তবু খুলিনি।
কেন খুলিনি? কারণ বৃষ্টিতে ছাতাফাতা খোলা শীতে টুপিফুপি পরার মতো আনকুল আমি নই। একসময় থেকে থাকতে পারি, গত কয়েকবছর ধরে নেই, আমৃত্যু থাকব না। এই যে দিল্লিতে শৈত্যপ্রবাহ চলছে, আমি শাল গলায় - গায়ে নয় মাইন্ড ইউ - জড়িয়ে চালাচ্ছি। গোটা ডিসেম্বরটা চালিয়েছিলাম, জানুয়ারিতে পরপর পাঁচদিন পাঁচজন আমার সোয়েটারহীনতা পয়েন্ট আউট করাতে একটা পাতলা দেখে হাতকাটা জ্যাকেট - বোতাম না লাগিয়ে,অফ কোর্স - গলিয়ে তার ওপর রংবেরঙের শাল আলগোছে ফেলে ঘুরছি।
মা একটা লাইন বলতেন, মরিব মরিব কৌশল করি মরিব। আমারও বাকি জীবনের স্লোগ্যান, নিউমোনিয়া হইয়া মরিব মরিব, কুল হইয়া মরিব।
ছাতা না খুলে অটোতে ওঠার সময় একপ্রস্থ ভিজেছি, নেমে আবার একপ্রস্থ। ভাইসাব দয়াপরবশ হয়ে অটো দোকানের যত কাছেই আনুন, ভেতরে তো আর ঢুকিয়ে দিতে পারেন না। কাজেই অটো থেকে নেমে আবার ছুটছি, পেরিফেরি ভিশনে তিনদিক থেকে পিটার, জ্যাকি, ভিন্ডি ছুটে আসছে, নাগাল পেলেই লাফিয়ে উঠে যে শরীরের যে অণুপরমাণু শুকনো আছে ভিজিয়ে দেবে। ভিজতে আমার অসুবিধে নেই, তিন জোড়া কাদামাখা টিপছাপ অঙ্গে নিয়ে গোটা দিন ঘুরতে ডেফিনিটলি আছে। কাজেই স্পিড বাড়িয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকছি,,ব্লু টোকাইয়ের মেঝে জলে ভেসে যাচ্ছে, 'গুড মর্নিং ম্যাম' চেঁচিয়ে ন্যাতা নিয়ে দৌড়ে আসছে তনুরাজ বা আবরার।
ফেক 'সরি সরি' বলে শরীরের এক্সট্রা জলটুকু ঝেড়ে সিটের ওপর নীল অয়েলক্লথের টুকরো পাতিয়ে, টেবিলে ল্যাপটপ খুলে, খাতাপেন মেলে বসেছি। । তারপর শরীর বেঁকিয়ে ব্লু টোকাইয়ের গোল জানালার বাইরে তাকিয়ে আছি। ভেজা ভুষো কম্বলমোড়া চরাচরে জিমন্যাশিয়ামের বিলবোর্ড - মাইন্ডের দায়িত্ব নেয়নি শুধু বডিকে দেবভোগ্য করে তোলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে দপদপাচ্ছে। পুরুষ মডেলের এদিকে চার ওদিকে চার, আট ভাঁজ পেট বেয়ে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে।
*
এমন সময় দরজা খুলে দৌড়ে রা ঢুকত। রা প্রকৃত কুল কাজেই কুলনেস নিয়ে কাঁটা হয়ে থাকে না কাজেই কোনওদিন হাতে ছাতা, কোনওদিন গায়ে রেনকোট সবদিনই ল্যাজেগোবরে।
আমি তো সকল নিয়ে সেই কখন থেকে বসেই ছিলাম আই কন্ট্যাক্টের আশায়। রা-এর চোখ আমার চোখে পড়তেই হাসতাম। রা লজ্জা পেয়ে, কপাল চাপড়ে, জানালার বাইরে তাকিয়ে চোখ ঘোরাত। আমিও চোখ ঘুরিয়ে কপাল চাপড়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে চোখ ঘোরাতাম।
বন্ধুত্ব হয়ে গেল।
*
রা হচ্ছে সহি স্পিরিচুয়াল। জাতধর্ম দেখে না, সবারই যা ভালো আত্মস্থ করে। যোগব্যায়ামের পর বাড়তি সময়ে বুদ্ধিস্ট চ্যান্টিং করে। কুড়ি বছর ধরে সিরিয়াসলি করছে। মাঝে মাঝেই দিল্লি ছেড়ে পাহাড়ে বৌদ্ধ মঠে যায়। এই কুড়ি বছরে পাহাড় কেটে এত সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছে যে পাহাড় বলে চেনা অসম্ভব। আমরা যে ফ্লাইওভারের পর ফ্লাইওভার পেরিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে নাকবরাবর বাড়ি পৌঁছই, পাহাড়েও নাকি সেম অভিজ্ঞতা।
হবে না ক্লাইমেট চেঞ্জ? হবে না এমন সৃষ্টিছাড়া বৃষ্টি?
*
যে অনুভূতিরই মিসঅ্যাট্রিবিউশনই হোক না কেন, রা আর আমি এখন বন্ধু। একে অপরকে দেখলেই খুশি হই।
অর্চিষ্মান শুধরে দেয়। কুন্তলা, বল তুমি রা-কে দেখলে খুশি হও। রা তোমাকে দেখলে কী হয় সেটা জানার তোমার উপায় নেই। কার মাথায় কী চলছে সেটা কি হান্ড্রেড পারসেন্ট নিশ্চিত হয়ে বলা যায়?
যায়। কে আমাকে দেখলে খুশি হয় কে হাসি চাপে বুঝতে যতটা বুদ্ধি লাগে আমার আছে। তাছাড়া সেদিন আমার রসিকতায় রা অট্টহাসি করল তো। অপছন্দ করলে মুচকি হাসে লোকে, অট্টহাসি হাসে না।
অর্চিষ্মান মুচকি হেসে বলল, শুনি কী নিয়ে এত অট্টহাসাহাসি করলে তোমরা।
কীটনাশক নিয়ে কথা হচ্ছিল। ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে যাদের সম্পর্ক শুরু হয় কোনও না কোনও পয়েন্টে মানবসভ্যতা ধ্বংসে কীটনাশকের ভূমিকা নিয়ে তাদের সেমিনার দিতেই হবে। কীটনাশকের প্রভাব ফলফলাদির অন্তরাত্মার কী পরিমাণ ক্ষতিসাধন করে সে বিষয় সেরে আমরা কসমেটিক দিক নিয়ে পড়লাম।
আজকালকার খাবারদাবার কী নিখুঁত দেখেছ? বড়লোক দেশ হলে না হয় বুঝি তা বলে কালকাজীর লাভলি মেগামার্ট ব্লিংকিটে স্পটলেস কলা ডেলিভারি দেবে?
রা টানা চোখ গোল করল। অর সাইজ দেখা হ্যায় পত্তাগোবি কা?
*
শনিরবি হবে, সাড়ে পাঁচটা মতো বেজেছিল। অর্চিষ্মান আর আমি ব্লু টোকাইতে বসে ছিলাম। দু'জনকে ঘিরে একটা কমন এক্সিসটেনশিয়াল ড্রেডের কুয়াশা ঘনাচ্ছিল। রোজ এই সময়টায় যা ঘনায়।
কী গো, প্রসেনজিৎকে কী রান্না করতে বলবে?
যে কোনও রকমের লুচি রুটি পরোটা, প্রসেনজিৎ খুব ভালো বানালেও মাঝারি হবে। আর কিছু কিছু রান্না হেলাফেলা করে হাই তুলে রাঁধলেও কেয়া বাত বলার মতো হবে। বাঁধাকপি এই দ্বিতীয় দলের। সে জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমরা সপ্তাহে তিনদিন বাঁধাকপি খাই। আলু টমেটো কড়াইশুঁটি দিয়ে যে তরকারিটা হয় সেটাই মেনলি তাছাড়াও চাউমিন ফ্রায়েড রাইস ইত্যাদিতে নির্বিচারে বাঁধাকপি দিতে থাকি।
অর্চিষ্মানকে বললাম, কী আর রাঁধাবে, বাঁধাকপিই করতে বল।
অর্চিষ্মান বলল, কালকের দু'চামচ বাসি আলুভাজা ফ্রিজে আছে না? গরম করে রেখে যেতে বলব।
মহাভোজের কল্পনায় দুজনে বাক্যরহিত হয়ে থাকলাম। দু'মিনিট পর অর্চিষ্মান বলল, বাঁধাকপি আছে বাড়িতে? বললাম, আমি কী করে জানব? অর্চিষ্মান বলল, ঠিক আছে আমি নিয়ে যাব।
অর্চিষ্মান বাঁধাকপি নিয়ে বাড়ি গেল, প্রসেনজিৎ রাঁধাবাড়া সেরে বাড়ি গেল, আমি কফিশপ ছেড়ে বাড়ি গেলাম। বাংলা সেলিব্রিটিদের ইন্টারভিউ দেখতে দেখতে, নাহ্ বাঁধাকপিটা প্রসেনজিৎ সত্যি ভালো রাঁধে, বলাবলি করতে করতে ডিনার সারলাম। দিনের শেষ ইন্সটলমেন্টের চা নিয়ে রান্নাঘর ছাড়ার আগে সন্দেহজনক সেলোফেনে চোখ পড়ল।
ট্র্যাশ থেকে তুলে দুই হাত দিয়ে টেনে যথাসম্ভব সমান করলাম। স্টিকার তখনও লেগে আছে। পি এল ইউ কোড, বারকোড, ফুড সেফটি লাইসেন্স নাম্বার। সবুজ টিপ। বাঁধাকপির নিরামিষত্ব নিশ্চিত করতে যাতে আমার মতো লোকেদের অজ্ঞাতে ধর্মভ্রষ্ট না হয়। মডার্ন বাজারের লোগো। নেট ওয়েট। ম্যাক্সিমাম রিটেল প্রাইস।
মায়ের বিয়েরও আগে মরে যাওয়া দিদিমা ইয়াদ এসে গেলেন। ঘরে এসে অর্চিষ্মানের কান থেকে গান টেনে খুললাম।
তুমি মডার্ন বাজার থেকে বাঁধাকপি কিনেছ? দশ পা এগিয়ে তো সফল।
ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়নের সফলতম তরিতরকারি ফলফলাদির দোকান সফল। মাদার ডেয়ারির সাইড ভেঞ্চার। দিল্লির মোড়ে মোড়ে মাদার ডেয়ারি, অলিতেগলিতে সফল।
দশ সেকেন্ড লাগল কিন্তু অর্চিষ্মান অবশেষে বুঝল সফল কী এবং কোথায়। বড় বড় চোখ গোল গোল করল।
ওই যে দোকানটায় নর্দমা থেকে তোলা সবজি তাকে সাজিয়ে রাখে? তুমি কি ওখান থেকে সবজি কিনে খাচ্ছ নাকি কুন্তলা? তার থেকেও সাংঘাতিক, আমাকে খাওয়াচ্ছ?
অর্চিষ্মানের সঙ্গে থেকে অগুন্তি শিক্ষা হয়েছে আমার। একটা হচ্ছে টেবিল ঘোরানোর। পাশা পলট্নার। প্রতিআক্রমণের। আমি যদি বলি, তুমি এতদিন সূর্য পশ্চিমে ওঠে জানতে নাকি? অর্চিষ্মান বলবে, কেন তুমি এতদিন কী জানতে কুন্তলা? পূর্বদিকে ওঠে? এ ব্যাপারে ওর সলমন রুশদির সঙ্গে মিল। রুশদিকে একবার একজন জিজ্ঞাসা করেছিল,আর ইউ আ ফেমিনিস্ট? রুশদি বলেছিলেন, হোয়াট এলস ইজ দেয়ার টু বি? এভরিথিং এলস ইজ বিয়িং অ্যান অ্যাসহোল।
বললাম, ফার্স্ট অফ অল, নর্দমা থেকে মোটেই তোলে না। দিব্যি সাফসুতরো পরিপাটি। সেকেন্ড অফ অল, মডার্ন বাজারের একচতুর্থাংশ দাম। থার্ড অফ অল...
অর্চিষ্মান কানে গান গুঁজতে গুঁজতে বলল, ও জিনিস ফ্রি দিলেও নেওয়া উচিত না। অরগ্যানিক্যালি গ্রোওন, আনটাচড বাই আনগ্লাভড হ্যান্ডস, হিউমেনলি হারভেস্টেড বাঁধাকপির জন্য ওই দাম যথেষ্ট কম। আরও বেশি নেওয়া উচিত ছিল।
*
সত্যি কথা বলব? দামটা ফ্যাক্টর নয়। মানে ফ্যাক্টর তো বটেই। ফ্যাক্টর হলে আমার অসুবিধেও নেই। অনেক অসম্ভব অলটারনেটিভ অপ্রাপণীয় জীবনের স্বপ্ন দেখেছি, একটির কাছেও বাঁধাকপির দাম ফ্যাক্টর না হওয়ার দাবি রেখেছি বলে মনে পড়ছে না।
তবু, বাঁধাকপি বা বাঁধাকপির দাম ইজ নট দা পয়েন্ট। অর্চিষ্মান যে দিনদিন নিওলিব্যারাল আগ্রাসনের নির্লজ্জ ধারকবাহক হয়ে উঠছে, কর্পোরেশনদের কালোবাজারি হাত শক্তপোক্ত করতে স্বেচ্ছায় ঘাড় পাতছে - সেটা আমার আসল ব্যথার জায়গা।
যাকগে, প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ইচ্ছেঅনিচ্ছে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আমার নেই, যেটার ক্ষমতা আছে সেটাই করেছি - বাঁধাকপি কেনার দায়িত্ব ফেরত নিয়েছি। ফেরার পথে হয় সফল থেকে নিই, নয় ব্লিংকিট থেকে আনাই। দু'নম্বরের টঙে বসা ডাকাতসর্দার তো আছেনই। কীটনাশক দেওয়া বাঁধাকপির আকারআয়তন সম্পর্কে আমার নলেজ আছে।
কাজেই রা যখন বলল, সাইজ দেখা হ্যায় পত্তাগোবি কা? দেখা নেহি আবার? বলে গুল যে দিচ্ছি না প্রমাণ করতে নিজের মাথার দু'পাশে দুই হাত তুলে ধরলাম।
ঠিক এই পয়েন্টে রা অট্টহাসি করল।
*
তা বলে আমার অট্টহাসির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গেলে হবে না। হাঁটার মতো আমার আর রা-এর অট্টহাসির আকৃতিপ্রকৃতি উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু, অ্যানাটমি এক। ডায়াফ্রাম আর অ্যাবডমিন্যাল পেশির নাচের ঠেলায় ফুসফুস থেকে দমকে দমকে হাওয়ার নিঃসরণ। ধাক্কার তীব্রতায় ফুসফুসের শেষ বাসি হাওয়াটুকুও বেরিয়ে দমবন্ধ হওয়ার অনুভূতি হলে বিশ্বরূপ দর্শানোর সমান হাঁ করে নতুন অক্সিজেন ভেতরে নেওয়া। নিঃসৃত হাওয়া যখন আমাদের ল্যারিংক্স আর ল্যারিংক্স অভ্যন্তরস্থ ভোক্যাল কর্ডের ভাঁজের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন যে শব্দের সৃষ্টি হয়, তাকে চ্যাট জিপিটি বলছে 'হা হা ভোকালাইজেশন'। অনেকসময় এই ভোকালাইজেশন হাহা-তে সীমাবদ্ধ থাকে না,বাবাগো মাগো, মরে যাচ্ছি, প্লিজ থাম, স্টপ ইট ইত্যাদিও বেরোতে শোনা গেছে।
পেশির ক্রমাগত সংকোচন প্রসারণের ফলে তলপেট ব্যথা হলে তখন কাউকে কাউকে পেট চেপে ধরতে শোনা গেছে। ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেতেও।
সবশেষে চ্যাট জিপিটি বলছে, "This integrated physiological cascade serves a crucial psychological and social function, facilitating non-verbal positive affect and social cohesion among individuals."
*
খেয়াল করেছেন নিশ্চয়। শারীরিক উপসর্গগুলো বেসিক্যালি সেই দমের ঘাটতি, দ্রুত হৃৎস্পন্দন, ফুসফুসে হাওয়া বেরিয়ে যাওয়া এবং হাঁ করে অক্সিজেন ভেতরে ঢোকানো। বেসিক্যালি, বাঘে তাড়া করলেও যা, প্রেমে পড়লেও তা, পরশুরামের ছোটগল্প পড়লেও তা-ই।
অট্টহাসি বেসিক্যালি একটা কার্ডিওভাসকুলার এক্সারসাইজ। একটা স্ট্রেসফুল সিচুয়েশন। অনেকে বলেন এই রকম হাঁ করে সশব্দ হাওয়া ছাড়তে গিয়ে মুখমণ্ডলের পেশির সংকোচন প্রসারণে ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড বা অশ্রুগ্রন্থির ওপর চাপ পড়ার ফলে চোখ থেকে জল বেরোয়।
তাছাড়াও ব্রেন যেমন মিসঅ্যাট্রিবিউট করে, তেমনি কোনও কোনও পরিস্থিতিতে আত্মসংশয়েও ভোগে। অট্টহাসি তাদের মধ্যে পড়ে। এই সব গড়াগড়ি, টেবিল চাপড়াচাপড়ি, বাবাগো মাগো, মরে গেলাম গো ব্রেনকে মুহূর্তের জন্য দ্বিধান্বিত করে - যা হচ্ছে ভালো না খারাপ। রাইডে চড়ার পরের মুহূর্তের সংশয়, প্রথম প্রেমে পড়ার পরের প্রফেটিক পস্তানি।
আনপপুলার ওপিনিয়ন, আত্মসংশয় ভালো জিনিস। নিজের চিন্তাভাবনা কাণ্ডকারখানা নিয়ে হান্ড্রেড পারসেন্ট নিশ্চিত হয় একমাত্র পাগলে, যে রকম পাগলের উদাহরণে ইতিহাস রক্তারক্তি। কাজেই সংশয় রাখুন। সংশয় রাখা উচিত কি না সেই নিয়েও সংশয়ে থাকুন। হোসিয়ারির থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছুকে চোখ বুজে ভরসা করতে যাবেন না। ব্রেনও করে না। এই স্ট্রেসের মানানসই চোখের জল তলব করে।
তাছাড়া রাম শর্মার প্রবাদটা শুধু আপনিই শোনেননি, ব্রেনও শুনেছে।
*
ওপরে অট্টহাসির অ্যানাটমি। নর্ম্যাল হাসিও। হাসলে আমি এ রকম হাসিই প্রেফার করি। আমার হাসি একটা পাঁচ মিনিটের হাই ইনটেনসিটি ওয়ার্কআউট। যে জন্য মা সিরিয়াসলি বলেছিলেন, মানে মায়ের পক্ষে যতখানি সিরিয়াস হওয়া সম্ভব - সোনা, আর যা খুশি কর রাত দশটার পর হাসিস না।
রাত দশটার পর যদি আমি হেসে থাকি তাহলে তার দুটো কারণ থাকতে পারে। এক আমি খুব হাসির একটা গল্পের বই পড়ছি। কিন্তু গল্পের বই পড়ে খুকখুক হাসিই বেশি পায়। তার থেকে অনেক বেশি সম্ভাব্য হচ্ছে মা কিছু একটা হাসির কথা বলেছেন। রোজই রাত দশটার পর যদি আমি বিকট হেসে প্রতিবেশীদের ভয় পাইয়ে থাকি তার মানে হচ্ছে রোজই রাত দশটার পর মা হাসির কথা বলছেন। মায়ের হাসির কথা কর্ম, আমার হাসি কর্মফল। আমার হাসি বন্ধ করতে হলে মাকে হাসির কথা বলা থামাতে হবে। মা হাসির কথা বলা থামাননি। কাজেই আমার হাসি থামানোর প্রশ্নই ওঠে না।
রোজই রাত দশটার পর আমি হাসতাম, মা শিউরে ওঠার ভঙ্গি করতেন। বকতেনঝকতেন না। অন্যান্য ব্যাপারেও মা আমাকে তেমন বকুনিঝকুনি দিতে পারেননি কখনও, পার্শিয়ালিটি ছিল মনে হয়। মায়ের মাতৃত্বের এই নিড়বিড়েপনায় মাথা নেড়ে বাড়ির বাকি প্রাপ্তবয়স্করা আমার শাসনের দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁরা মায়ের মতো ছিলেন না, তাঁদের থিওরি ছিল, শাসনই আসল লালনপালন। শাসন যত হিংস্র হবে লালনপালন ততই নিখুঁত হবে। স্পেয়ার দা রড, স্পয়েল দা চাইল্ড। রড পর্যন্ত যায়নি ব্যাপারটা কারণ আমার মা সাতচল্লিশ কেজির এবং হাস্যমুখ হলেও একে যে একটা লিমিটের বাইরে ঘাঁটানো চলবে না সে সম্পর্কে একটা আঁচ ছিল। মাকে না ঘাঁটানোর অবভিয়াস স্টেপ মায়ের মেয়েকে একটা লিমিটের বাইরে না ঘাঁটানো। শারীরিক প্রহার সে লিমিটের মাইল মাইল বাইরে ছিল।
তবু তাঁরা নিজের নিজের মতো করে আমাকে শাসন করতেন। সে ভালোই করতেন। তাছাড়া শাসন করার যা পূর্বশর্ত, সোহাগ, সেটা আমাকে দরকারের বেশিই করতেন তাঁরা। মূলতঃ, ঠাকুমা।
*
ঠাকুমা নেই আট বছর, শাসন শেষ কবে করেছেন মনেও পড়ে না। ঠাকুমার শাসনের প্যাটার্ন এই প্রথম খেয়াল করছি। অদ্ভুত।
অধিকাংশ শাসনের বড়সড় এলিমেন্ট হচ্ছে হুমকি। এটা করলে বা না করলে, ওটা হবে। বাবাকে বলে দেওয়া হবে। গার্জেনকে কল করা হবে। ভগবান পাপ দেবেন। পরজন্মে মশা হয়ে জন্মাতে হবে। বেসিক্যালি, অনিশ্চিত পরিণামের ভয় দেখানো।
ঠাকুমার হুমকির পরিণাম ছিল একটাই। পাগল হয়ে যাওয়ার। অকারণে হাসে পাগলে আর এই পরিমাণ হাসি কারণে হাসা সম্ভব নয় কাজেই আমি হয় অলরেডি পাগল হয়ে গেছি বা অচিরেই হতে চলেছি। ছোটবেলায় আমাকে গাজর, উচ্ছে এই সব খেতে দেওয়া হত এবং না খাওয়ার চয়েস দেওয়া হত না কাজেই আমি খাওয়ার দশমিনিট সহনীয় করতে গল্পের বই নিয়ে খেতে বসতাম। ঠাকুমার আসল আতংক ছিল ভাত পড়ে বই এঁটো হওয়ার কিন্তু তিনি আতংকটাকে স্পিন দিতেন এই বলে যে খাইতে খাইতে বই পড়লে পাগল হয়। বই ব্যান হল। আমাকে তূণ থেকে অন্য তীর বার করতে হল। উচ্ছে সেদ্ধ থেকে গাজর সেদ্ধর মাঝখানে নি রে গা মা (কড়ি) পা ধা নি-র আরোহীঅবরোহী, ডালফালের আগে স্থায়ী স্থায়ীর তান সেরে ডাল ও মাছের ঝোলের মাঝে অন্তরা অন্তরার তান। ঠাকুমার তাতেও প্রবল আপত্তি।
কারণ খাইতে খাইতে গান করলে কী হয় বলুন দেখি?
*
আমি যখন বাঁধাকপির সাইজ বোঝাতে দুই হাত তুলে মাথার দুপাশে ধরলাম, রা-এর শরীর আধ ইঞ্চি হেলল না শুধু পাখির মতো তিরতির কাঁপল, আর হাহা হোহো হিহি মাগো বাবাগো বাঁচাও স্টপ ইট-এর বদলে ঝর্নার মতো রিনঝিন বাজল।
রিনঝিনটাও সম্ভবতঃ আমার কল্পনা। এই পাহাড়ে দাঁড়িয়ে ওই পাহাড়ের ঘন সবুজ চিরে নেমে আসা যে সব ঝর্না দেখলে মনে হয় মাঝখানের শূন্যতা উবে গেছে, আপনি খাদটাদ টপকে ঝর্নার একেবারে ঘাড়ের ওপর, গায়ে জলের ছিটে, কানে রিনঝিন - সে রকম। শুধু তিরতিরানিটা দীর্ঘ সময় চলল আর থামার পর রা হাত বাড়িয়ে টিস্যু দিয়ে চোখের কোণ মুছল দেখে কনফার্ম হলাম যে ওটা অট্টহাসিই ছিল।
তাছাড়া গোটা এপিসোডটা আমাদের মধ্যে যে পরিমাণ নন ভার্বাল পজিটিভ ফিলিং ও সোশ্যাল কোহেশনের জন্ম দিল তার পরেও যদি সন্দেহ করি আমি পাগল তো বটেই, ছাগলও হতে পারি।
Comments
Post a Comment