একা মেয়ে বেঁকা মেয়ে
এবারের কলকাতা বইমেলায় গুরুচণ্ডা৯ থেকে আমার একটা গল্প সংকলন বেরোচ্ছে। নাম ‘একা মেয়ে বেঁকা মেয়ে’। বইটা এ’রকম দেখতে। প্রচ্ছদ করেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়।
আগের বছরই কমফর্টেবলি বার করা যেত, এ বছরেও যে বেরোচ্ছে তাতে আমি নিজেকে নিয়ে ইমপ্রেসড। গল্পগুলো সব লেখা ছিল, ভেবেছিলাম টুকটাক সারিয়ে নিলেই হবে কিন্তু এত সময় ধরে সারানোর দরকার বোধহয় ছিল না। সময় যে কোনও প্রক্রিয়ার যেমন জরুরি উপকরণ তেমন দীর্ঘসুত্রিতার ছুতোও। একবার হাত থেকে বেরিয়ে গেলে আর যে কিছু করার থাকবে না সেই আতংকের কোপিং মেকানিজমও।
এই বইটার ক্ষেত্রে সম্ভবতঃ দ্বিতীয়টা। জাস্ট ছাড়তে পারছিলাম না। অথচ লেখা গালে পুরে বসে থাকার সঙ্গে লেখার মানের সম্পর্ক নেই। একটা প্যারাগ্রাফের দিকে তাকিয়ে একঘণ্টা ধ্যান করলে সেটার বানান দাঁড়ি কমা বাক্যগঠন আপনাআপনি ভালো হয়ে যায় না। একটা বাক্য পাঁচবার লিখলে পাঁচবারেরটা প্রথমবারেটার থেকে পাঁচগুণ বেটার হয় না। একটা পয়েন্টের পর সময় নেওয়া শুধু নষ্ট করার জন্য। কারণ সময় আর - পুরুষকারবাদীরা রেগে যাবেন জেনেও বলি - পরিশ্রম দিয়ে সাধ্যের সীমা অতিক্রম করা যায় না।
*
বইটাকে আমি ছোটগল্প সংকলন বলছি না, কারণ সব গল্প ছোট নয়। ছত্রিশশো শব্দের গল্পও আছে আবার সাড়ে আটহাজারেরও আছে।
বইটা সারানোর সময় শব্দসংখ্যা নিয়ে সামান্য অবসেসড ছিলাম। অকারণ, কারণ, যে কোনও গল্প এক একটা পার্টিকুলার সাইজেই বলা উচিত। বা বেস্ট বলা সম্ভব। যদিও গল্পের সেই মাপমতো সাইজ আগেভাগে ধরে ফেলা রাইটিং-এর অ্যাডভান্সড কোর্স। অধিকাংশ সময়েই ‘অনেক হয়েছে দেওয়ালপত্রিকায় কবিতা লেখা এবার আমি ঔপন্যাসিক হব’ বলে লেখক এককুচি আইডিয়া নিয়ে টানতে থাকেন, নয়তো দু’দিনে গল্প শেষ করার দায় ঠেলে মহাভারতের মেটেরিয়াল পনেরোশো শব্দে ঠুসতে থাকেন।
বিবেচনার ভুল বা তাড়াহুড়ো ছাড়াও আরও কিছু কারণ থাকে গল্পের ছোটবড় হওয়ার। ভাবনার , স্ট্যামিনার অভাব। আমার বিবেচনা বা ভাবনা পারফেক্ট পাগলেও দাবি করবে না কিন্তু তাঁর মেয়ের যে শারীরিক মানসিক দু’রকমের স্ট্যামিনারই অভাব আছে, মাকেও স্বীকার করতে হত। শর্টে সারা আমার শ্যাডো সেলফ। শিশিবোতলের জায়গাটা শক্ত ঠেকলেই হাল ছেড়ে হাত তুলে বেরিয়ে আসা আমার পরম ধর্ম। আমি একজন বিশ্বমানের কুইটার। কিন্তু সব ছেড়ে বেরিয়ে আসতে আসতে দেখা যায় হাতে একটা, বড় জোর দুটো জিনিসই পড়ে আছে। সেগুলোও ছেড়ে বেরিয়ে গেলে নিজের থাকারই মানে থাকে না।
*
শেষ দিকের কয়েকটা লেখায় ‘এত ছোট কেনে’ মন্তব্য এসেছিল। আমার যা বলার এইটুকুতেই বলা হয়ে গেছে, এর থেকে বেশি বললে খেই হারাব - ইত্যাদি বলে ডিফেন্সিভ হয়েছিলাম, কিন্তু মাথার ভেতর একটা খচখচ থাকেই। হয়তো আর একটু ভাবলে বলার কথা আরও বেরোত। সে সব কথা আর একটু খেটে, সময় দিয়ে সাজালে খেই হারাত না হয় তো।
সেটা হলে বই আর একটু মোটা হত আর শীর্ষেন্দু তো বলেছেন, পাঠকরা মোটা বই পছন্দ করে
ক্ষিতিমোহন সেন আবার অমর্ত্য সেনকে বলেছিলেন, যদিও পরীক্ষার খাতা প্রসঙ্গে, বেশি লিখবি না। বেশি লিখলে তুই কত কম জানিস প্রকাশ হয়ে যাবে।হেমিংওয়ে দেড়শো পাতায় ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দা সি’ নামান। বুদ্ধদেব বসু হলে চুরাশি পাতাতেই রাত ভরে বৃষ্টি নামিয়ে দেওয়া যায়। শার্লট পার্কিন্স গিলম্যান পঞ্চাশ পাতার দা ইয়োলো ওয়ালপেপার-এই “ফিমেল হিস্টেরিয়া”র মহামারী/ ঢেলে প্রেসক্রিপশন লেখার পর্দাফাঁস করেন। প্রথম ছেপে বেরোনোর আটাত্তর বছর পরেও, শার্লি জ্যাকসনের দশ পাতার কম ‘দ্য লটারি’-র সেটিং, সিম্বলিজম, স্টাইল, থিম টুকে উঠতে পারে না লোকে।
কিন্তু এঁরা হাইফাই। এঁদের দেখে আমার রাস্তা ঠিক করতে গেলে বিপদ হবে। আমার রাস্তা বার করতে গেলে তাঁর কাছেই যাওয়া ভালো যিনি আগেও অনেক রাস্তা দেখিয়েছেন। তাঁর কাছেই যাই গল্প ফেনাব না শর্টে সারব - এ প্রশ্ন তো করা যাবে না অন্য একটা প্রশ্ন করি। বা অলরেডি করা প্রশ্নটার সময়টায় ফিরে যাই।
ভাবসম্প্রসারণ অ্যাটেম্পট করব না সংক্ষিপ্তসার? মা ভাবছেন। আমিও ভাবছি। আমিও যেখানে মাও সেখানে। কিন্তু আমার বিশ্বাস মা পৃথিবীর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন, কাজেই এয়ারও পারবেন। মা অনেক ভেবে বলছেন, সারসংক্ষেপ করতে বেশি ক্ষমতা লাগে, কিন্তু ভাবসম্প্রসারণে পরিশ্রম প্রস্ফুটিত হয়। নিজের অপরিশ্রমী মেয়ের দিকে সস্নেহ নয়নে তাকিয়ে বলেছিলেন মা, তুই বরং ভাবসম্প্রসারণই অ্যাটেম্পট করিস।
আমি তাই এখন বেশি লেখার দিকে মনোযোগ দিয়েছি। অবশ্যই ফ্লাফ যথাসম্ভব কম, ভাবনা যথাসম্ভব সংগঠিত রাখার চেষ্টা করে। সে রকমই চেষ্টা থাকে, কিন্তু সেটা রেখে যতটা টানা যায়। কারণ কে জানে আমার গল্পগুলো ছোট হয়, কম কথাতেই সব বলে দেওয়া যায় বলে নয়, স্ট্যামিনা কম আর ফাঁকিবাজি বেশি বলে।
*
নামকরণের ক্ষেত্রে প্রথমে একেবারে ডিরেক্ট হব ভেবেছিলাম। গল্পগুলোর কমন পয়েন্ট যা সেটাই বইয়ের নাম হবে।
মেন রোলে মেয়েরা।
অর্চিষ্মানকে বুক ফুলিয়ে শোনাতে গেলাম। অর্চিষ্মান শুনল। বলল, ইসস্স্স্স্। ছ্যা ছ্যা ছ্যা ছ্যা ছ্যা। রাম রাম রাম রাম রাম।
তারপর আমি ভেবেচিন্তে ‘একা মেয়ে বেঁকা মেয়ে’ নাম দিলাম। ‘একা’র প্রতি চিরকালের দুর্বলতা আর গল্পগুলোর মেয়েরা অনেকে বেঁকাও। একা-র সঙ্গে বেঁকা-র ধ্বনিগত সাদৃশ্য আঁকাবাঁকার সঙ্গে আকৃতিগত সাদৃশ্য, ডিল সিল করল। আমার ধারণা এই নামটাও অর্চিষ্মানের মনে ধরেনি। আমি খোঁচাতে যাইনি বলে চুপ করে থেকেছে। যে কারণে আবার আমার অর্চিষ্মানকে মনে ধরে।
*
জিম সার্ভ আর তিলোত্তমা সোমের যুগ্ম ইন্টারভিউ শুনছিলাম। নারীবাদী শিল্পটিল্প, সিনেমাটিনেমা নিয়ে কথা হচ্ছিল। জিম সার্ভ বললেন এই সব নারীকেন্দ্রিক পুরুষকেন্দ্রিক উনি বোঝেন না। গল্প ইজ গল্প। তার হিরো নারী না পুরুষ, শুড নট ম্যাটার অ্যাট অল। যে গল্পে শংকরের জায়গায় দীপাবলীকে বসিয়ে দিলে, সত্যবতীর জায়গায় নবকুমারকে, আনা কারেনিনা-র জায়গায় কাউন্ট ভ্রমস্কিকে, লিসবেথ স্যালান্ডারের জায়গায় মিকায়েলকে গল্প রং বদলায় না, অটল অনড় অবিচল দাঁড়িয়ে থাকে জিম সার্ভ সেই বাদের গল্প শুনতে চান।
অর্চিষ্মানের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টি দিলাম। অর্চিষ্মান সোজা টিভির দিকে তাকিয়ে আছে।
শুনলে?
কী?
জিম সার্ভ কী বলল?
কী বলল? শুনেছ যখন তুমিই বলে দাও।
ততক্ষণে তিলোত্তমাও বললেন। তিনি জিমের কথা বুঝতে পারছেন, কিন্তু গল্প বাস্তবের ক্যারিকেচার আর বাস্তবে নবকুমার সত্যবতী ইন্টারচেঞ্জেবল নয়। রক্তমাংসের পৃথিবীতে নারী পুরুষ এবং নারীপুরুষের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা, সময়ে সময়ে বিপ্রতীপ। বিপ্রতীপতা শুধু ওপর নিচ বা শোষক শোষিতের হতে হবে তেমনও নয়, জুতোজোড়রও হতে পারে। ডান পায়ের জুতো বাঁ পায়ে আর বাঁ পায়ের জুতো ডান পায়ে পরে যেমন বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়া যায় না।
আমার অবশ্য সে রকম একটা জুতো ছিল। মাবাবার অফিসের বন্ধু সম্ভবতঃ দার্জিলিং থেকে এনে দিয়েছিলেন। বেসিক্যালি, হলুদ ফোমের খড়ম। আঙুলের মাঝখানে বিভাজিকার বদলে, আঙুল আড়াআড়ি ঢাকা দেওয়া চওড় হলুদ স্ট্রিপের ওপর সাদাকালো পাণ্ডার মুখ। ডান পা বাঁ পা বলে কোনও ব্যাপার নেই, পরলেই হল।
হলুদ আমার প্রিয় রং, পাণ্ডা সবারই কিউট লাগে, কিন্তু তার থেকেও বেশি আমাকে ফ্যাসিনেট করেছিল জুতোর এই নন-পোলারিটি। ক্লাস ওয়ানে পড়তাম, ডান চোখে মাইনাস প'নে চার, বাঁ চোখে মাইনাস সাড়ে তিন পাওয়ারওয়ালা আনকোরা চশমার এক ইঞ্চি দূরে সে জুতো তুলে ধরে, নামিয়ে, পায়ে পরে, পা থেকে খুলে, পা বদলে আবার পরে, আবার খুলে, আবার পা বদলে পরে - ধরে ফেলার চেষ্টা করেছিলাম যে নিশ্চয় একটু হলেও তফাৎ আছে।
নেই। জুতোদুটো এক্স্যাক্টলি এক। দুটো পাণ্ডা এক্স্যাক্টলি সমান কিউট। দুদিকের হলুদ সমান উজ্জ্বল ও মন ভালো করা।
অর্চিষ্মানের দিকে অত অর্থপূর্ণ দৃষ্টিপাতাপাতির কারণ এই বিষয় নিয়ে, আই মিন, এক্স্যাক্ট এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের কথা হয়েছে। একাধিকবার। অর্চিষ্মানের স্ট্যান্ড এক্স্যাক্ট জিমের স্ট্যান্ড, আমার এক্স্যাক্ট তিলোত্তমার। অর্চিষ্মান বলে, মেয়েদের গল্প হলেই কি অন্যায় অবিচার অত্যাচার ধর্ষণের হতে হবে নাকি? সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে, বদ বস-এর বদমতলব গুঁড়িয়ে সাফল্যের সিঁড়ি অতিক্রম করে নারীবাদের ঝাণ্ডা লহরিয়ে দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠার? এমনি ঘুরছে ফিরছে বাদামভাজা খাচ্ছে টাইপ গল্পও তো ফাঁদা যায়।
আমি তিলোত্তমার যুক্তি দিয়েছি। বাদামভাজা ইজ নট রিয়েলিটি। রিয়েলিটি ইজ নট বাদামভাজা। আর গল্প রিয়েলিটিতে যা ঘটে তার ক্যারিকেচারমাত্র।
অর্চিষ্মান বলেছে, কিন্তু গল্প তো চাইলে আনরিয়েলও হতে পারে, কুন্তলা। যা ঘটে তার জায়গায় লেখকের যা ঘটাতে ইচ্ছে করে তা ঘটানোর কল? বক্তব্য রাখার, বা না রাখার। সাইড নেওয়ার, বা না নেওয়ার। সবাই যখন ঠিকভুল উচিত অনুচিত ঝগড়া করে মরছে, সাহিত্য সমাজকে ডোবায় না সমাজ সাহিত্যকে সেই নিয়ে সেমিনার দিচ্ছে - ছাদের রেলিং-এ পা ঝুলিয়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে বাদামভাজা খাওয়ার।
চুপ করে থাকি কিন্তু জিম আর অর্চিষ্মানের স্ট্যান্ড আমাকে আকৃষ্ট করে। লেখক হওয়ার আমার যত হাঁকপাক, তার থেকেও বেশি হাঁকপাক ইস্যুকেন্দ্রিক লেখক না হওয়ার। ব্যাপারটা কল্পনা করলেই আমার দরজাজানালা বন্ধ করে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। একা মেয়ে বেঁকা মেয়ে-র সব গল্প বলব না, কিন্তু অনেকগুলোই, ওয়েল, বেশিরভাগই এমন সব ঘটনা ঘিরে যা মেয়েদের সঙ্গেই ঘটে। এমন সব পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে যে সব পরিস্থিতিতে মেয়েরাই পড়ে।
ব্যাপারটা নিয়ে আমার অস্বস্তি আছে। এমন একটা গল্প যদি লিখতে পারতাম যেখানে মেয়েরা ক্যাজুয়ালি হিরো, যেমন অধিকাংশ গল্পে পুরুষরা ক্যাজুয়ালি হিরো হয়। এবং এ রকম গল্প লেখা সম্ভব, আমি নিজেই পড়েছি। শুধু গল্প না, অবিশ্বাস্যরকম ভালো গল্প। এই মুহূর্তে ওটেসা মশফেঘ-এর 'মাই ইয়ার অফ রেস্ট অ্যান্ড রিল্যাক্সেশন' মনে পড়ছে যেখানে মেয়ে কেন্দ্রে কিন্তু ইস্যুগুলো মেয়েলি নয়।
মেয়েলি বলতে আপনি কী বোঝেন বা বুঝতে চান, আপনার ওপরেই ছাড়লাম।
যা লিখে ফেলেছি তা তো লিখেই ফেলেছি এবং সে নিয়ে লজ্জা পাচ্ছি না (গর্বও বোধ করছি না), কিন্তু জীবনে একটা হলেও এমন গল্প লিখব যার হিরো মেয়েও হতে পারে, ছেলেও হতে পারে, নন-বাইনারিও হতে পারে, এন পি সি-ও হতে পারে, পাণ্ডাও হতে পারে। গল্পের কিস্যু যাবে আসবে না। গল্প ঘুরবে ফিরবে বাদামভাজা খাবে।
*
বইমেলা ২২শে জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে গেছে চলবে ৩রা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। গুরুর স্টল নম্বর মনে রাখাও অসুবিধের কিছু নেই। ৫৬৭। লিটল ম্যাগাজিন প্যাভেলিয়নের একেবারে নাকের ডগায়। একা মেয়ে বেঁকা মেয়ে সে স্টলে পাওয়া যাচ্ছে আর নিচের লিংকে বোধহয় অনলাইনও কেনা যাচ্ছে।

Comments
Post a Comment