পনীরের বাজার


একটা জিনিস বুঝেছি এই বয়সে এসে। সবের বাজার আছে। সবের। যাদের মনে হচ্ছে বাজার নেই, মনে হয়ে দুঃখ হচ্ছে, গ্যারান্টি দিচ্ছি ভুল বাজারে আছেন। নিজেকে বদলাবেন না, মানে ইচ্ছে হলে বদলাতে পারেন আমি বলার কে, কিন্তু যদি শুধু বাজারের জন্য নিজেকে বদলানোর প্রয়োজন মনে করেন, থামুন। নিজে যেমন আছেন থাকুন। বাজার বদলান।

ব্র্যাকেটে বম্বে লেখা শিল্পীরা কলকাতায় এসে মান ও মানি নিয়ে চলে যাচ্ছেন বাবদে ক্ষোভদুঃখ প্রকাশ করে টাইমিং-এর গোলযোগে কলকাতার যে শিল্পী লিজেন্ডারি বিপদে পড়েছিলেন - একই ভুল করেছিলেন। কলকাতার শিল্পীদেরও বাজার আছে। কলকাতার বাইরে। যেমন দিল্লিতে। কলকাতার উচ্ছে থেকে শিল্প ডবল দামে ও আদরে বিক্রি হয়। পুজো, রবীন্দ্রজয়ন্তী, কালীবাড়ির ভোটে কলকাতার শিল্পী, ব্যান্ডপার্টিরা আসেন। আমরা দৌড়ই। পৌষমেলায় মনোময় ভট্টাচার্য, ঋষি পাণ্ডা, জয়তী চক্রবর্তী এলেন। আমরা দৌড়লাম। দৌড়ের পুরোটাই কলকাতার খাতিরে না, এঁরা সবাই নিপুণ গাইয়ে ও দক্ষ পারফর্মার বলেও।

যেমন জয়তী চক্রবর্তী। জয়তী চক্রবর্তীর গান আমার পছন্দ। বাড়াবাড়ি রকম পছন্দ। কিন্তু গান পেরিয়েও জয়তীর প্রতি একটা প্যারাসোশ্যাল টান আমি পোষণ করি। মনে হয় জয়তী লোক ভালো। কোনও বেসিসই নেই মনে হওয়ার, তবু হয়। বছর তিন-চার আগে অ্যামেরিকায় বঙ্গ সম্মেলন নিয়ে গোল বেধেছিল, জয়তী প্রতিবাদ করেছিলেন। বঙ্গসম্মেলনের তরফের যুক্তি না শুনেই জয়তীর সবক'টি অভিযোগ বিশ্বাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। জয়তী জয়তী বলে, বঙ্গসম্মেলনের কর্তৃপক্ষকাটিং লোকজন সম্পর্কে আবছা আইডিয়া আছে বলেও। জয়তী সম্ভবতঃ কমিয়েই বলেছেন। আমাকে মিলিয়ন ডলার দিলেও ও সব লোকের ধার ঘেঁষব না। ।

*

রিষড়া গেলাম, বিজলীদি বাড়ি থেকে পনীর রেঁধে আনল। মুখে দিয়ে আহাবাহা করলাম। বিজলীদি বাবাকে বলল, দাদা দেখবেন নাকি এক পিস চেখে? বাবা হাতা দিয়ে পোস্ত নিতে নিতে বললেন, এক পিসের সঙ্গে একশো টাকা দিলেও না। ।

বিজলীদি হাসল। আমিও হাসলাম। দরকারের থেকে বেশ বেশিই। কিন্তু সে তো জানা কথা।।

পনীর আমারও ভালো লাগে না। বাঙালিরা ডালনায় যে ছানা দেয় সেটাও আমার ভালো লাগে না। ছানাফানা রসগোল্লাতেই ঠিক আছে। অর্চিষ্মান তরকারিতে ছানা খেয়ে নেয়, কিন্তু পনীর সহ্য করতে পারে না। রাজমা সরসো দা সাগ দিব্যি সইয়ে নিয়েছে (দিল্লির খাবার কীভাবে আমাদের ধীরে ধীরে পোষ মানাচ্ছে সে নিয়ে একটা পোস্ট লিখতেই হবে) কিন্তু পনীর পারেনি।

খারাপ লাগার প্রধান কারণ পনীরের অনমনীয়তা। বাইরে টক ঝাল নোনতা তেতো উমামি দিয়ে লটপট করে ফেলুন, কামড় দিয়েই ক্লিয়ার হয়ে যাবে ভেতরে পনীর শুধু পনীর এবং শুধুমাত্র পনীর হয়েই বিরাজ করছে। দ্বিতীয় কারণ ব্যাপারটার সর্বময়তা। এখানকার নর্থ ইন্ডিয়ান দোকানের মেনু এক পাতার হোক বা বত্রিশ পাতার, পড়ার পরিশ্রম করি না আমি। ভেজিটারিয়ান পদ যেটা পনীর নয় ওইটা আনুন, ভাইসাব। ওইটা, অবভিয়াসলি, মাশরুমের কিছু একটা। 

এত সহজলভ্যের প্রতি মনোযোগী হওয়া কঠিং। 

সেদিন দুটো সাঁইত্রিশে ব্লু টোকাই থেকে বেরিয়ে তিনটে সতেরোয় কাশ্মীরী ভবন পৌঁছে দেখি ক্যান্টিন বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তার ওপারে বিহার ভবন, ওড়িশা নিবাস। নিমের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ্দুর বরদলৈ মার্গ লেখা সবুজ বোর্ডে লুটোপুটি খাচ্ছে - কাজেই দেখা না গেলেও আসাম ভবন থাকতেই হবে কাছাকাছি।

অর্চিষ্মান যথারীতি বন্দুক আমার ঘাড়ে রাখল। তোমার যেখানে পছন্দ কুন্তলা, সেখানে যাব। বিহারে গেলেও হয়, আসামে গেলেও হয়, আবার পুরী গেলেও হয়। কতদিন যাইনি। বলে ওডিশা নিবাসের বোর্ডের দিকে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল।।

ভেবেছিলাম ওডিশা ভবনে মাটন থালি নেবে, কিন্তু আমাকে চমকে দিয়ে অর্চিষ্মান প্রন থালি নিল। আমি ডিলাক্স ভেজ। ভাত শাক আলুভাতে একটা শুকনো তরকারি (আলু শিম বা ওই গোছের কিছু) একটা ঝোল ( আলু ফুলকপি), সেমুইয়ের পায়েস। একটা পদ তো মিস করছিই, দুটোও হতে পারে। রাইট, পাঁপড়। একটা এখনও মনে পড়ছে না।

অর্চিষ্মানের অত বাহারের শাকসবজি ছিল না, ডাল তরকারি চিংড়ি। কিন্তু কিছু চিংড়ি, বস্‌। অর্চিষ্মান  খাচ্ছে তো খাচ্ছেই, থালার ধারে চিংড়ির খোলসের পাহাড় হচ্ছে তো হচ্ছেই। অবশেষে চিংড়ি ফুরোল। কপালের ঘাম মুছে অর্চিষ্মান বলল, অনেকদিন পর এত ভালো খেলাম। তোমারটা ভালো ছিল কুন্তলা? 

বললাম, ভালো তো ছিলই কিন্তু ভেজ থালি তাও আবার ডিলাক্সে পনীর মাশরুমকে পাত্তা না দেওয়ার  জন্য এক্সট্রা মার্কস।

*

কোনও ভালো লাগা খারাপ লাগাই গাছ থেকে পড়ে না, কনটেক্সট ও কনডিশনিং-এর জলমাটি লাগে। জলমাটির বাঁধুনিতে তফাৎ হয়। এঁটেল বা বেলে। অ্যাসিডিক বা অ্যালকালাইন।

আমাদের পনীর-অপ্রীতির জমি বালিবালি, ফুসফুসে, নড়বড়ে। বাবার পনীরবিদ্বেষ নিশ্ছিদ্র, ঠাসবুনোট।বাবা পনীরের স্বাদ পছন্দ করেন না, যেমন গাজরের স্বাদও অপছন্দ করেন। গাজরের হালুয়া নিয়ে 'খান খান' করলে বাবা বলবেন না ভাই আমার পোষায় না। বলে খেল খতম করবেন। কত টাকা দিলে খাবেন, কত দিলে ভেবে দেখবেন, কত না দিলে খাবেন না - ও সবে যাবেন না। 

পনীরের বেলা যাবেন। কারণ গাজর বাবার কাছে গাজর, পনীর পলিটিক্স। বাবার আর্থিক সামাজিক সাংস্কৃতিক আইডেন্টিটিতে আঘাত। পনীর প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে বাবার একটা ঘোষণা আছে, একটা ধিক্কার আছে, একটা চিৎকার আছে। বাঙালির পাতে পনীরের অবলীলায় ঢুকে পড়া ও  গেঁড়ে বসা, বাবাকে ইমোশন্যাল করেছে। বাবার কাছে পনীর চিঁড়েচ্যাপ্টা একতাল ছানা নয়, বহিরাগত। পনীরের পেপার নেই। বা যে দেয় দিক, বাবা পনীরকে পেপার দিচ্ছেন না। একশো টাকা দিলেও না। 

বন-এর মাথিয়াস বলেছিল ওর বাবা জীবনে ডিনারে পিৎজা খাননি। ততদিনে ডয়েশল্যান্ডের পাড়ায় পাড়ায় পিৎজার দোকান খুলে গেছে, বার্থডে পার্টির মেনুতে পিৎজা না থাকলে জার্মান বাচ্চারা সাতাশটা অলরেডি এক্সিস্টিং জার্মান গালি সন্ধি করে নতুন গালি বানিয়ে বাপমাকে পাড়ছে। মাথিয়াসের বাবা ঘাড় পাতেননি। গোটা পিতৃভূমি যখন পিৎজার সুনামিতে ভেসেছে, মাথিয়াসের বাবা শ্নিটজেল কুম্ভ তৈরি করে একা তা কামড়ে পড়ে আছেন। 

মাথিয়াসের বাবার যা পিৎজা, আমার বাবার তাই পনীর।

*

ব্যাপারটা শুধু ঢুকে পড়াপড়ির নয়। টমেটোও বহিরাগত। উনিশশো তিরিশের আগে নাকি বাঙালিরা রান্নায় টমেটো দিত না। বা দিলেও ঠাকুরবাড়িটারির লেভেলে দিয়ে থাকবে, আমার পূর্বপুরুষরা বাজার থেকে শিওর টমেটো কিনতেন না, পূর্বনারীরা রাঁধতেন না। এখন টমেটোর বিরুদ্ধে স্বয়ং গর্গও গলা খুলবেন না।

আসলে ঢোকা ইমমেটেরিয়াল। কে ঢুকছে, আমার চোখের সামনে ঢুকছে কি না - এ সব ম্যাটার করে।

ভাষার কনটেক্সটে ঢুকে পড়া নিয়ে অর্পণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বাংলাভাষায় ফার্সি, আরবি, চিনা, জাপানি, কোল, মুন্ডা আরও যত ভাষা আছে বিশ্বের, সব ঢুকে পড়েছে। ঢুকে পড়েছে কারণ ঢুকে পড়াই ভাষার নিয়ম। তাছাড়া শুধু বাংলার ভেতরেই সবাই ঢুকে পড়ছে তেমনও তো নয়, বাংলাও পড়শিদের ভাষাতে গটগটিয়ে ঢুকে পড়েছে। সবল প্রতিবেশীদের ভাষায় কম ঢুকছে, দুর্বল প্রতিবেশীদের বেশি।

এখানেও কোথায় ঢুকছি বা ঢুকতে পারছি জরুরি। সাঁওতালি ভাষায় বাংলার উপনিবেশ বিস্তার নিয়ে সেমিনারে ইন্টারেস্টেড নয় কেউ, অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে বি-এর লিস্টে 'বাবু' আছে খবর পেলে বাবুর মা পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপে সাত দিন আর কাউকে গুড মর্নিং গুড ইভনিং লিখতে দেবেন না, একা দাপাবেন।

আপাততঃ মাথাব্যথা দুটো ভাষাসংক্রান্ত। ইংরিজি আর হিন্দি। দুটোই ইন্দো ইউরোপিয়ান ভাষা, দুটোই বাঁ থেকে ডানে লেখাপড়া হয়, দুটোতেই দাঁড়ি ফুলস্টপ ছাড়া বাকি সব যতি কমন পড়ে, দুটোতেই সাবজেক্ট বাক্যের শুরুতে বসে - এই সব বাদ দিলে বাকি সব অমিল। বাঙালির কাছে একটা অ্যাসপিরেশন, একটা থ্রেট। থ্রেটের থেকেও খারাপ। এককালের বাংলা শিল্পসাহিত্যের কমেডি স্টেপল, এখন বাংলাকে উল্টেপালটে যা খুশি করে চলে যাচ্ছে। ইনশিওরেন্সের বিজ্ঞাপন সবার জীবনকে রঙ্গিয়ে দিচ্ছে, উল্লাসকে সহজ করে নিয়ে বলছে উলাস, আগেকে পরে পরেকে আগে করে দিচ্ছে।

কোনও মাই কা লাল হেসে দেখাক।

আমরা সময় নষ্ট না করে নরমতর মাটির খোঁজে বেরিয়েছি। হইচই-তে একেনবাবু সিরিজের সাম্প্রতিকতম গল্পের প্রেক্ষাপট পুরী। প্রতি এপিসোডের রানটাইমের অন্ততঃ পাঁচ মিনিট রাখা হয়েছে ভুলভাল ওডিয়া বলার কমিক রিলিফে। পঞ্চাশ বছর পর সাউথ ক্যালকাটার টিনএজাররা একে অপরকে 'কেমিতি আছন্তি' বলে ফিস্ট বাম্প দেবে যখন, কারা কারা হাসবে ভাবছি।

পঁয়তাল্লিশ বার 'বিকজ' দিয়ে বাক্য শুরু করুন, তেমন স্মার্ট হলে 'কজ' দিয়েও করতে পারেন, লোকে ঢোঁক পর্যন্ত গিলবে না। কেন-র পর কী বসিয়ে দম নিয়ে উঠতে পারবেন না, কলকাতা লিট মিটের মঞ্চ থেকে সেলিব্রিটি রেডিও জকি, সেলিব্রিটি কবি, সেলিব্রিটি ব্যান্ডমেম্বার আর বক্তৃতাবাজরা, 'আহ্‌, এখানে ইন্টেলেকচুয়াল কথা হচ্ছে দেখছেন না' বলে বকে দেবেন।

আমি ব্যতিক্রম নই। আমিও একই পদ। পাঁচ শব্দের বাংলা বাক্যে চারটে ইংরিজি শব্দ ব্যবহার না করে পারি না (চাইও না), এদিকে স্বীকৃতির জায়গায় মান্যতা দেখলে রাগ ধরে যায়। আমার অবশ্য সবেতেই রাগ ধরে যায়। সম্পূর্ণ বাংলা বাক্যের মধ্যে একটা করে বাট আর দুটো করে সো গোঁজে যারা, তাদের দেখলেও গা জ্বালা করে। কল্পনায় নানারকম প্রতিশোধমূলক পরিস্থিতি ভাঁজি। একটা ফেভারিট ফ্যান্টাসি হচ্ছে এত ঠোক্কর খেয়ে বাংলা বলতে হচ্ছে দেখে পডকাস্টার যদি দয়াপরবশ হয়ে ইন্টারভিউ ইংরিজিতে শিফট করেন? ইংরিজিতেই প্রশ্ন করতে থাকেন এবং করতেই থাকেন? বাংলায় ফেরত আসার কোনও উদ্যোগই না নেন?

কী হবে?

সবাই জানে কী হবে। এমন তোড়ে বাংলা বেরোবে যে বঙ্কিমদা পালানোর পথ পাবেন না।

 

                                                                                                                                                        (চলছে)



Comments