Posts

পুরী ৬ (শেষ): স্নানযাত্রা ও সূর্যমন্দির

রাস্তায় বিগ বাজার গোছের একটা দোকানে দাঁড় করালেন পূর্ণচন্দ্র। কাল সকালে স্নানের উপযুক্ত চটি জামাকাপড় কিনতে হবে। জুতো খুলে ঢুকতে হল। এদিকে দোকানের মেঝেজোড়া কাঁটা কাঁটা কার্পেট। কিছু আনকমফর্টেবল। ঢোকার মুখে আরেক ড্রামা। এক বালতি জল রাখা ছিল; একটা ফুল সাইজ গরু এসে সে জলে মুখ দিতে গিয়ে পাশাপাশি দাঁড় করানো খানসাতেক সাইকেল ফেলে দিয়েছে। অর্চিষ্মানের সাইজের ফুল ট্র্যাকপ্যান্টস পাওয়া গেল না। হাফপ্যান্ট ওর আছে। আমার পোশাকগুলোর সবক'টার বুকেই চুমকির প্রজাপতি কিংবা হেলো কিটি। এক ভদ্রলোক, দোকানেরই কর্মচারী, এমন কিছু শিশু নন, আমার সমবয়সী বা বছর পাঁচেক বড়ও হতে পারেন, কাউন্টারে কনুই রেখে কোমর বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমনিই। দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ে আমাদের জিনিসপত্র দেখানোর দায়িত্ব দিব্যি পালন করছিল। উনি অধিকন্তু ন দোষায়। আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুব ক্রিটিক্যালি দৃষ্টি ওঠাচ্ছিলেন নামাচ্ছিলেন এবং মতামত প্রকাশ করছিলেন কোন সাইজ ম্যাডামের "আ যায়েগা।" ফ্রাস্ট্রেটিং হচ্ছে এঁরা বদ নন, জাস্ট সোশ্যাল সেনসিটিভিটি নেগেটিভে। জামার আশা ছেড়ে চটির সন্ধানে নামলাম। অর্চিষ্মানকে দিব্যি সুন্দর একজোড়া হাল...

পুরী ৫ঃ চিলিকা ঘোরা ও ফেরা

Image
বাবা শিখিয়েছিলেন বাইরে গিয়ে গাড়ি, বাস, অটো যা-ই চড়বি, নম্বরটা সবার আগে মুখস্থ করবি। আমাদের বোটের নম্বরও মুখস্থ করেছিলাম, এখন মনে নেই। এখন শুধু মনে আছে নৌকোর মুখে বাঁধা লাল চেলি, ঝিরি ঝিরি সোনালি পাড়। নৌকোয় নেমে ছাউনির তলায় বসলাম। অর্চিষ্মান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জেটির ওপর ডাঁই করা লাইফজ্যাকেটের দিকে থটফুল দৃষ্টিপাত করতে লাগল। জ্যাকেটগুলো যা ধুলোধূসরিত, ডুবে গেলেও আমি ও জিনিস গায়ে ঠেকাব না। পূর্ণচন্দ্র বললেন, এ হাঁটুজল, পড়লেও ডুববেন না। কিন্তু এ সাঁতার না জানা শহরের ছেলে। বলল, এমারজেন্সি পারপাসে থাক। পূর্ণচন্দ্র উবু হয়ে পাহাড় ঘেঁটে দুটো জ্যাকেট, যাদের কমলা রং তখনও বোঝা যাচ্ছে, বেছে দিলেন। পরার দরকার নেই, সঙ্গে রেখে দেন। মাঝি ছেলেটা একটা লম্বা বাঁশ দিয়ে নৌকো জলে ঠেলে, লাফ দিয়ে নৌকোয় উঠে আমাদের মাঝখান দিয়ে স্প্রিন্ট টেনে অপর প্রান্তে পৌঁছে গেল। সে প্রান্তে একটা লম্বা ডাণ্ডা, মাথায় সুদর্শন চক্র সাঁটা। এঞ্জিন চালু করতে চক্র বনবন ঘুরতে শুরু করল। আস্তে করে চক্রটাকে জলের মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে হাল ধরল ছেলেটা। পূর্ণচন্দ্র চেঁচিয়ে বললেন, সব ভালো করে দেখিয়ে দিবি, নো কমপ্লেন। প্রথম দ্রষ্টব্য ক্র্যাব ...

তিন্নির জন্য

ইয়ে দুখ কাহে খতম নহি হোতা বে-র মতো আমারও এখন ভাবখানা হচ্ছে ইয়ে পুরী ভ্রমণবৃত্তান্ত কাহে খতম নহি হোতা বে। আড়াই দিনে এত কিছু করেছি ভেবে নিজেই অবাক। যখন অ্যাকচুয়ালি ঘুরছিলাম তখন তো সময়টা ফস করে ফুরিয়ে গিয়েছিল। লিখতে গিয়ে এত স্মৃতি ঝাঁকানি খাওয়া বোতলের লিমকার মতো বেরোচ্ছে কেন, কোথা থেকেই বা বেরোচ্ছে জগন্নাথই জানেন। হয়তো আমিও জানি। বুড়ো হয়েছি তার আর একটা প্রমাণ। এক কণা কথা ফেনিয়ে ফেনিয়ে এক পাহাড় করে তোলার রাইট অফ প্যাসেজটাটা পেরিয়ে গেছি। তিন্নি খুবই ভদ্র ননদ, সেটা মুখের ওপর সোজা বলতে পারছে না। ঘুরিয়ে তা দিচ্ছে, নতুন বছরের নতুন রেজলিউশনের পোস্টের জন্য। জিজ্ঞাসা করলাম তুই কি রেজলিউশন নিলি বল, তাতে দুঃখী গলায় বলল, সেটাই তো ঝামেলা হয়ে গেছে, তোরা কে কী রেজলিউশন নিলি জানালে তাদের মধ্যে থেকে একটাদুটো পছন্দ করে নিজের জন্য রাখতে পারি। রেজলিউশন নিয়ে আমার এ বছর একটা স্ট্র্যাটেজি ছিল। রিভার্স সাইকোলজি। বছরের পর বছর আমাকে রেজলিউশনরা ঘোল খাওয়ায়, এ বছর রেজলিউশনদের আমি ঘোল খাওয়াব। প্রেমকে যেমন ঘৃণা দিয়ে ঘোল খাওয়ানো যায় না, উদাসীনতা লাগে, রেজলিউশনকে ঘোল খাওয়ানোর উপায় হচ্ছে আস্তে করে তাকে কাটিয়ে দেওয়...

পুরী ৪ঃ চিলিকা

তখন অলরেডি প'নে দশটা বাজে। খুব দৌড়ে হোটেলে ফিরে চুল আঁচড়ে বেরোতেও সাড়ে দশটা বেজেই যাবে। বিশ্বনাথের মতে সাড়ে দশটায় বেরোলে আরামসে চিলিকা প্যাকেজ সেরে সন্ধের আগেই ফিরতে পারব। আড়াইঘণ্টার মোটে রাস্তা। যেতে আসতে আড়াই আড়াই পাঁচবার চা খাওয়ার জন্য থামলেও । এদিকে বাবা বলছে, চিল্কা প্যাকেজ টুরের বাস নাকি সকাল সাতটায় বেরিয়ে যায়। দশ মিনিট পর জানাচ্ছি বলে বিশ্বনাথের ফোন ছাড়লাম। গল্পের খেই ছিঁড়ে গেছে। বসে বসে চিলিকা যাওয়ার প্রোস অ্যান্ড কনস ভাবছি। বললাম, একটা প্রোস হচ্ছে যে সেই ছোটবেলা থেকে এতবার পুরী এসেছি একবারও চিল্কা দেখিনি, দেখা হয়ে যাবে। অর্চিষ্মান বলল, অ্যাঁ! চিল্কা দেখোনি মানে কী? সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেল। ছোটবেলা থেকে চিল্কা বলে এসেছি, এখনও চিলিকার থেকে চিল্কা শব্দটাই আমার বেশি সুন্দর লাগে। যেমন ডেঙ্গির থেকে ডেঙ্গু । যেমন মান্যতার থেকে স্বীকৃতি। কিন্তু সে তো আমার এখনও প্লুটোকে গ্রহ ভাবতে ভালো লাগে। তা বলে তো আর সময়ের দৌড়ে পিছিয়ে পড়া যায় না। সেই বাবদে এবার থেকে চিল্কাকে চিলিকাই বলব। পূর্ণচন্দ্র এলেন গাড়ি নিয়ে। বেড়াতে যাওয়ার সময় আমাদের শরীর থেকে প্রোক্র্যাস্টিনেশনের সমস্ত চিহ...

পুরী ৩ঃ কোথাও যাবার নেই, কিচ্ছু করার নেই

পুরীর বিচে সূর্যোদয় দেখার আনন্দ যারা দেখেছে সবাই জানে। সে আনন্দের জন্য অ্যালার্ম দিয়ে উঠতে আমার আপত্তি নেই। এদিকে অর্চিষ্মানের মতে পুরীর বিচের পাঁচশো মিটারের মধ্যে শুয়ে, অ্যালার্ম বন্ধ করে যতক্ষণ ইচ্ছে ঘুমোনোর আনন্দও কম নয়। একসঙ্গে থাকতে থাকতে দুটো লোক একে অপরকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করে। বদলায়। যার ব্যক্তিত্বে পাপোষভাব প্রবল, স্বাভাবিকভাবে তার বদলই বেশি ঘটে। কাজেই আমিও আজকাল অ্যালার্ম দিয়ে উঠে সূর্যোদয় দেখতে বেরোনোর বদলে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোনোই প্রেফার করি। যদিও ওই তীব্রতা এবং ফ্রিকোয়েন্সির ট্রাকের হর্নের মধ্যে অর্চিষ্মানের পক্ষেও ঘুমোনো অসম্ভব। চা খেয়ে বেরোলাম। হোটেলের সামনে স্নানের ধুম। ঢেউয়ের থেকে মানুষ বেশি। লোকের মজা যে সংক্রামক, সে নিয়ে ইউটিউব রিল দেখেছি। নিউ ইয়র্ক সাবওয়েতেই হবে, কারণ সব রিল ওখানেই শুট হয়। একটা স্টেশন থেকে একজন পেশাদার অভিনেতা মোটামুটি ফাঁকা একটা ট্রেনে উঠলেন। উঠে উল্টোদিকের দরজার কাছে চলে গেলেন তারপর কানে এয়ারপড গুঁজে ফোন স্ক্রোল করতে শুরু করলেন। এই পর্যন্ত কোনও বিস্ময় নেই। তারপর ভদ্রলোক হাসতে শুরু করলেন। যেমন আমরা হাসির রিল দেখে হাসি। আমাকে জোর করে হাসতে বললে...

পুরী ২ঃ অর্চিষ্মানের সঙ্গে দেখা

পান্থনিবাসকে গাল পাড়লাম, পুরী হোটেলেও কেউ ফোন তুলছিলেন না। অর্চিষ্মানের কাছে কাঁদুনি গাইতে গেলাম, সে 'ওরে বাবা কুন্তলা এখন টাইম নেই, পরে দেখছি' বলে কাটিয়ে দিল। তক্ষুনি বাবা ফোন করলেন। ভালনারেবল্‌ মোমেন্টে বেরিয়ে পড়ল। এই তো পুরী যাব ভাবছি, এদিকে কোথাও ঘর নেই। চেনা অনেক বাবা এই তথ্যটাকে জাস্ট একটা তথ্য হিসেবে নেবেন। নৈরাশ্যবাদী বাবা হলে বলবেন, এত ঘনাঘন বুকিং করে যাওয়া যায় নাকি? আশাবাদী বাবা হলে বলবেন, চেষ্টা করতে থাক, পেয়ে যাবি নিশ্চয়। গীতা পড়া বাবা হলে বলবেন, চেষ্টা করার কর, পেলে যাবি, না পেলে যাবি না। আমার বাবা এই টাইপের নন। আমার মাও এই টাইপের ছিলেন না। আমার মা হ্যান্ডস্‌ অন মা এবং হ্যান্ডস্‌ অন শাশুড়ি ছিলেন। একবার অর্চিষ্মানের জন্ডিসের খবর পেয়ে মা গোটা আষ্টেক বাতাবিলেবু পৌঁছতে আজকের ট্রেনে দিল্লি এসে কালকের ট্রেনে আবার ফিরে গিয়েছিলেন। বাবা মায়ের মতো বাড়াবাড়ি করেন না। বাবা আমার জীবনের বাছাবাছা ক্ষেত্রে হ্যান্ডস্‌ অন। পড়াশোনা, কেরিয়ারের ক্ষেত্রে একেবারেই হ্যান্ডস্‌ অফ। সেই অ আ ক খ স্টেজ থেকেই। কেন, সে নিয়ে অবচেতনে কোনও ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছিল নিশ্চয়। এক বিরল দিনে বাবা বাড়ি...